• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • নকশিকাঁথা (১১)

    বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৪৪৬ বার পঠিত
  • নকশিকাঁথা – উপন্যাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাঙালি অভিবাসী জীবনের না জানা সময়

    ১৮৯০ এর দশক। তখন আমেরিকা এক সন্ধিক্ষণে। কালো মানুষেরা সদ্যই স্বাধীন। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিভিন্নভাবে তাদেরকে আবার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে এসে মধ্যবিত্ত সাদা মানুষের আমেরিকা নিজেদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য পেরিয়ে ধর্ম এবং সংস্কৃতির খোঁজ শুরু করেছে। বিবেকানন্দের আমেরিকা বিজয়, হিন্দু ধর্মের জন্য আমেরিকার কৌতূহল এবং পৃষ্ঠপোষকতার খবর আমাদের জানা আছে। কিন্তু এই আগ্রহ শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়। পণ্য এবং বিনোদনের জগতেও ছিল। তারই হাত ধরে এমনকি বিবেকানন্দ আসার আগেও আমেরিকায় এসে গেছিল চুঁচুড়া, তারকেশ্বর, চন্দনপুর, বাবনানের কিছু লোক তাদের চিকনের কাজের পসরা নিয়ে। হাজির হয়েছিল উত্তর আমেরিকার সমুদ্রতটে। ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকার বিভিন্ন শহরে, সংসার পেতেছিল কালোদের সমাজের অংশ হয়ে। শুধু চিকনদারেরা নয়। শতাব্দীর শেষের দিকে বৃটিশ জাহাজ থেকে পালিয়ে নিউ ইয়র্কে নেবে যাচ্ছিল সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে আসা মাঝি-মাল্লারাও। মধ্য আমেরিকার শিল্পাঞ্চলে কাজের অভাব ছিল না কোন।

    বড় অদ্ভুত এই সময়। একদিকে দ্রুত শিল্পের বিকাশ ঘটছে, দেশ বিদেশ থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে আমেরিকায়। আবার পাশাপাশি কালোদের উপর নিপীড়ন বাড়ছে, এশিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে সব নিয়মকানুন। বাবনানের চিকনদার আলেফ আলি আর পাঁচকড়ি মণ্ডল, সিলেটের গোবিন্দ সারেং কি আক্রাম, বেদান্ত সোসাইটি গড়ে তুলতে আসা অভেদানন্দ - এমনি আরও অনেকের জীবন জড়িয়ে যাবে অনেক রঙের মানুষের দেশ আমেরিকার এক উথালপাথাল সময়ে, বুনবে নানা রঙের নকশিকাঁথা।


    ১১

    ওরা ঘুম থেকে ওঠার আগেই পাঁচকড়ি সকলের জন্য খাবার বেঁধেছেদে তৈরি করে রেখেছিল। বোর্ডওয়াকে খাবারের কোন অভাব নেই। কিন্তু না সে খাবার ওদের মুখে রুচবে, না জেবে কুলাবে। এক এক মুঠো ভাত আর পার্চ মাছভাজা সকাল সকাল খেয়ে মাথায় ফেরির পেটি নিয়ে পাঁচজনে হাঁটা মারল। আজকের বোঝা কালকের মত ভারী নয়। মোকসাদ আলির সঙ্গে কদম মিলিয়ে হনহনিয়ে হাঁটছিল সবাই। ফয়জলের অপছন্দটা মাছির ভনভনানির মত জারি ছিল সারাটা রাস্তা। সমুদ্রের নোনা বাতাসে সে কথাগুলো উড়ে যাচ্ছিল দিগ্বিদিকে। মোকসাদের কাছে পৌঁছালেও তার এখন এইসবে কান পাতার ফুরসৎ নেই। সকাল সকাল হাজির হয়ে জুতমতো জায়গায় পশরা সাজিয়ে না বসা অবধি তার মনের তরাশ যাবে না।

    পাঁচকড়ি বরং একটু পিছিয়ে পড়েছিল। মাঝে মাঝে গলা তুলছিল, ও মোকসাদ, এট্টু ধীর পায়ে চলো মিয়া। পায়ের খিল ক’খানা বেইরে যাবে। পাঁচকড়িদাদার ইজ্জত রাখতে মুখে হাসি টেনে মোকসাদ দাঁড়াচ্ছিল কখনো বা, কিন্তু একটু কাছাকাছি হতেই আবার জোর কদমে শুরু। শেষমেশ পাঁচকড়িও থামানোর আশা ছেড়ে দিয়ে পিছন পিছন নিজের চালে আসছিল। এই জায়গার নাড়ি নক্ষত্র তার হাতের কড়ে গোনা, আলেফদের মত হারিয়ে যাওয়ার চিন্তা নেই। দেখাদেখি ফায়জল ধীর গতি করে পাঁচকড়ির সঙ্গ নিয়েছিল। যখন বোর্ডওয়াকের অনেকটা নিকটে এসে গেছে, চোখে পড়ল এক বিশাল চাকা যেন আসমান ছুঁই ছুঁই। সেই চাকার উপরে আবার একটা ঘরের মত। হাঁটবে কি, এটা দেখেই ফায়জলের চোখ ছানাবড়া। হুই কি দেকা যায় গো জ্যাটা? ও কিসের কল!

    পাঁচকড়ি অনাবিল হাসি হাসল। ফায়জল অবাক না হলেই দুঃখ পেত। প্রথমবার এসে সেও তো এমনি অবাক হয়েছিল। তাই ফায়জলকে অভিজ্ঞ স্থানীয় লোকের ভঙ্গিমায় বোঝাতে কসুর করে না। আশবারির বোর্ড ওয়াকের মহিমে ফায়জল মিয়া। সাধে কাতারে কাতারে লোক জোটে এখেনে? স্নিজলার সাহেব এলেমদার লোক। মেলাই তংখা লোকটার, আর ঢেলেছেও অনেক।

    পাঁচকড়ির দীর্ঘসূত্রিতায় ফায়জল অস্থির হয়ে ওঠে। ওই চাকাটা কিসের বলো না জ্যাটা। হুই উঁচু, আল্লা মিয়া!
    বাবনানের চড়কের মেলায় যেয়েচিস নে? বাজিগরের তাঁবুর পাশে নাগরদোলা বসায় দেখিসনি কো? তেমনি-ধারা ব্যাপার।

    সে বাঁশের নাগরদোলা দেখেছে, সে তো অতটুকু। চারটে লোক নিয়ে ক্যাঁচকোঁচ করতে করতে ওঠে আর একটা লোক হ্যান্ডেল ঘোরাতে থাকে। এখানে তো মনে হচ্ছে শুরু আর শেষ ঠাহর করে যায় না। বসবেও নিশ্চয় আর না হয় পঞ্চাশটা লোক। কার হাতে এত তাকত আছে ওই চাকা হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে আকাশে ওঠাবে?

    এই সব চলে ইস্টিমে, কল বসিয়ে রেকেচে আমাদের স্নিজলার সাহেব। পাঁচকড়ি এমন ভাবে বলছিল যেন তার সঙ্গে স্নিজলার সাহেবের দহরম মহরম, আর ওই লোকটার প্রতিটা সাফল্যে তার নিজের দান কম নয়। ওই যে দেকচিস উপরপানে উটে যাচ্চে, ওকেনে গিয়ে ঠেরে যাবে। আর যে সব লোকগুলো উপরিতে রইবে, তারা বেইরে ওই সিসা দেওয়া ঘরে সিঁধেল হবে। দূর দূর সব দ্যাকা যায় যেন হাতের পাঞ্জা।
    কত দূর জ্যাটা? এলি আইল্যান্ড?
    হ্যাঁ, সে তো যাবেই।
    সাদাম্পটন?

    ফায়জলের এহেন ছেলেমানুষি কথার পাঁচকড়ি মণ্ডল কি জবার দেবে?
    বোর্ডওয়াকের খুব কাছে চলে এসেছে ওরা। বাইরে রাস্তায় সার সার ঘোড়ায় টানা বাগি দাঁড়িয়ে। কলকাতায় এমন দেখা যায়, ফিরিঙ্গি বাবু-বিবিরা চড়ে। তাই বলে এতগুলো একসঙ্গে? যেন স্বপ্নপুরী।

    চাকাটা ঘুরতে শুরু করেছিল। ওরা এখন বেশ কাছে চলে এসেছে। সকাল সকাল আমোদ করতে আসা লোকের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল দূর থেকেও। ফায়জলের ইচ্ছা হচ্ছিল মাথার পেটি নাবিয়ে ওই চাকায় করে সেও একদম উপরে চলে যায়। তুমি ওটায় চড়েচো জ্যাটা?
    পাগল? কত পয়সা নেবে বল দেকিন? আমরা এয়েচি ওদের কাচ থেকে কামাই করতে, এইসব আমোদে পয়সা ঢাললে হবে? দেকো মিয়া, এ দেশে আমোদের অন্ত নেই কো, একবার ওদিকে চোক পড়ে গেলে আর নিজের কাজটা গুচিয়ে উটতে পারবে নি।
    তুমি যাওনি কো? ভয় পেলে, যদি উপরি উটে কল বিগড়ে যায়?
    মার্কিনী যন্তর মিয়া, বিগড়োবে কেন?
    মাথা বনবন করে? কেউ পড়েচে ককনো উপর থিকে?
    আমি এমন ধারা শুনিনি মোটে।
    বসিরভাই আর আলেফকে জুটিয়ে যাবো ঠিক একদিন। দেকে নিও।

    চাকার ঘুরান দেখে ব্যোমকে গেছে আলেফ আর বসিরও। যখন ফায়জলের সঙ্গে আবার একজোট হল তখন তাদের উত্তেজনা দেখার মত। অবাক হওয়ার কারণ ছিল। এক তো সকাল থেকেই সমুদ্রের ধারে প্রচুর লোক। বোর্ড ওয়াক ধরে হেঁটে চলেছে। সাহেবেরা কোট প্যান্টুল আর মেমেরা সাদা গাউনে। ঠিক যেমনটি কলকাতায় আসার কালে দেখেছে। কিন্তু এতো ফিরিঙ্গি একসঙ্গে দেখেনি কোনোখানে। এখানে আবার বালির উপরে গড়াগড়িও দিচ্ছে। নানা রঙের ছাতা লাগিয়ে সার দিয়ে বসে কি শুয়ে পড়েছে অনেকে। সেসব লোকেরা কোট প্যান্টুল খুলে ছোট প্যান্ট আর বেনিয়ান পরেছে। মেয়েদের পরনেও রঙ-বেরঙের জামা, সে শুধু হাঁটু অবধি। অনাবৃত পা ছড়িয়ে শুয়ে রয়েছে কেমন। ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে এদিক ওদিক। জীবনের এমন ছবি দেখা নেই ওদের, চেনা কিছুর সঙ্গে মেলানো যায় না।

    সেই বিশাল চাকায় ওঠার জন্য সার দিয়ে দাঁড়ানো লোক। কাছে আসতে চোখে পড়ল রোদে চকচক করা এক আলিশান চাঁদোয়া। মাথাটা ডিমের মত, সেখান থেকে চুড়ো উঠে গেছে। ঠিক ওই চাকার ধার ঘেঁষে।

  • এটাই নতুন হল পাঁচকড়িদা? মোকসাদও তার বিস্ময় চাপতে পারেনি।
    তবে আর কইচি কি? অ্যামিউজমেন্ট প্যালেস। বাইরে যে কাজগুলি দেকচো, সব তামা দিয়ে তোয়ের করেচে। আসবারি পার্কের রোশনাই বেড়ে গ্যাচে মোকসাদ ভাই।
    আমাদের ব্যাপারের জন্যি লাভ। এদের জলুশ যত লোক টানবে তত ভাল। খুশির হাসি মোকসাদের দাড়ি চুঁইয়ে চুঁইয়ে পড়ে। তাদের যাত্রার কষ্ট সার্থক।
    মোকসাদ বলল প্যালেসের পাশেই এক দফা পশরা বসান হবে, আর সবাই হাতে হাতে কিছু মাল দেখিয়ে পুরো দরিয়া কিনার ধরে ঘুরে বেড়াবে।

    প্যালেসটায় কত রকমের চেকনাই। দেওয়ালে ঝোলানো নানান ঢঙের নকশা। তামার তৈরি চিত্রবিচিত্র মুখোশ। ভিতরে কত রকমের কাঠের পুতুল শূন্যে ঝুলছে। কোনোটা হাসছে, কেউ ভেঙাচ্ছে, বেগম আর নবাব, জিন-হুরি-পরী এসব নিয়ে এলাহি কারবার। সেগুলো আবার চরকি পাক দিচ্ছে। ওই চার মহলা সমান বাড়ির ঠিক বাইরে এ হরেক রঙের চকরা বকরা পোশাক আর মাথায় বড় ঠোঙ্গার মত টুপি পড়া একটা লোক মুখে চোঙা লাগিয়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছিল –
    All hail the jumping horse, the camels and the zebras, the lions and the ponies! All hail the merry-go-round, with its prancing steeds and whirling rhythm.

    প্যালেসের জাঁক দেখে ফায়জলের চোখ ছানাবড়া। ও জ্যাটা! লোকটা কি ব্যাখ্যান করে গো?
    ভিতরে এক আজব মেশিন বসিয়েচে মিয়া। সেখানে তিন থাক করে কাটের ঘোড়া, উট, হাতি মেশিনে লাগানো আচে। সামনে না গেলে পেত্যয় যাবে না আসল না কাটের। ওর উপরে গিয়ে মানুষ থির হয়ে বসবে আর সব বনবন করে পাক মারবে।
    চড়েচো কখনো?
    বেচবো না আমোদ করবো মিয়া?

    ইস, আমিনা থাকলে কি তাজ্জবটাই না হত। আলেফ হাতের পেটি নাবিয়ে এমনটাই ভাবছিল। আমিনা, ফেলে আসা গ্রাম, নিজের ভিটের টান থেকে থেকে ঘাই মারে। ফায়জলের মত নতুন দেখার আনন্দে ভেসে যেতে পারে না। কাজ থেকেও মন উড়ে উড়ে যায়। চাচার কথায় তড়িঘড়ি পশরা সাজানোয় মন দিল।

    ফায়জলকে রোখা যায়নি। সে পায়ে পায়ে দরজা অবধি চলে গেছিল। লম্বা লম্বা শিক লাগানো পেল্লায় তার কপাট। সেই শিক ধরে ভিতরে চোখ রাখল ফায়জল। সঙ্গে সঙ্গে যেন আলিবাবার গুহার মত এক আজব দুনিয়া চিচিং ফাঁক হয়ে চোখের সামনে হাজির। কি বনবন করে ঘুরছে সবাই। সঙ্গে গান করছে কেউ মিঠে সুরে। ছোট-বড়, রোগা-মোটা, বাচ্চা-বুড়ো সবাই চরকি-ঘোরান ঘুরতে ঘুরতে খলখল করে হাসছে। জীবনটা এত মজার, এসব না দেখলে বোঝাই যায় না। পায়ে পায়ে ভেতরে ঢুকে গেছিল ফায়জল, নিজেকে গুটিয়ে কারো সঙ্গে গা ঘেঁষাঘেঁষি না করে। ভিতরে কত রকমের বাতি ঝুলছে। চলতে চলতে এক আয়নার সামনে গিয়ে তার চোখ কপালে। হুবহু তার মত একটা লোক, শুধু কেউ যেন হামান দিস্তা দিয়ে এমন পিষে দিয়েছে লম্বায় এক হাত আর চওড়ায় তিন হাত। পোশাক দেখে শুধু বুঝতে পারল, যে এটা তার নিজের সুরত। এমন সেই সিসার কেরামতি। এমনি অনেক সিসা দিয়ে একটা দেওয়াল মুড়ে রেখেছে। কোনখানে ফায়জল বেঁটে, তো কোথাও হিলহিলে লম্বা, আর এক জায়গায় সে হয়ে গেল বেলুনের মত গোল। যেন এখুনি হাওয়া বেলুন হয়ে উড়ে যাবে। আলেফ ডেকে না নিয়ে এলে সেখানেই বুঝি পুরো দিনমান কাটিয়ে দিত ফায়জল।
    চলো ফায়জল ভাই, মোকসাদ চাচা খুব গুসসা কচ্চে।
    মুখ হাঁড়ি করে বেরোল ফায়জল, যেন কোন এক বেহেস্ত থেকে বের করে নিয়ে আসা হল।
    মিয়া তোমার মতিগতি তো ভাল ঠেকে না! এমন নাদান হলে কামকাজ করবে কি করে?

    ফায়জল এবার লজ্জা পেল। সবাই এসে থেকে কাজ করছে। বোর্ড ওয়াকের ঠিক বাইরে ঢোকার মুখে দুটো খুঁটি পুঁতে দিয়েছে আলেফ আর বসির। চিকনের চাদর, শাল, টেবিলঢাকা ঝুলিয়ে দিয়েছে সেখান থেকে। সামনে একটা ফরাস পেতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে ঘর সাজানোর রকমারি হাতের কাজ। ফায়জল আর কোন কথা না বলে কাজে লেগে গেল।
    দোকান সাজানো হয়ে যেতে পাঁচকড়ি বিড়া পেতে জায়গা বানিয়ে বসল। ওরা চারজন হাতে করে কয়েকটা চিকনের চাদর, শাল ঝুলিয়ে বোর্ড ওয়াকের বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়ল।
    বিক্রিবাটা মন্দ হচ্ছিল না। সবাই একটা দুটো সামান বিক্রি করতে পেরেছে। কখনো যাদের বেশি উৎসাহ দেখেছে, ধরে নিয়ে এসেছে পাঁচকড়ির কাছে আরও সব জিনিস দেখাতে। পাঁচকড়ির কাছে বেশ ভিড় জমে গেছে সকাল থেকে। এইসব কারনে মোকসাদের মনের মেঘ খানিক হাল্কা। দুপুর বেলায় খাওয়ার জন্য সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল সেই ভাত, নুন আর পার্চ মাছ। এতো হাঁটাহাঁটি করে সবার তখন রাক্ষুসে খিদে।

    কি মিয়া, কাটের ঘোড়ায় চড়ার সাধ হয়?
    ফায়জল লজ্জা লজ্জা মুখে তাকাল, আমাদের গাঁ গেরামে এমনটা নেই কো চাচা।
    হা হা করে হাসল মোকসাদ। আচ্ছা যাস তোরা তিনজনা একদিন। যখন ভিড় কমে যাবে, বিক্রিবাটা কম থাকবে একদিন উট্টে বসিস ওটায়। ভিরমি খেলে আমাকে দুষতে আসিস নে যেন।
    ফায়জলের মুখ উজ্জল হয়ে উঠল। তোমরাও যাবে চাচা, যাবে নে?
    হ্যাঁ, এই বয়সে পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙ্গি আর কি। চেটেপুটে খেতে খেতে একচোট হাসল মোকসাদ আলি। ছেলেগুলো এখনো নাদান। একটু আমোদ করতে না দিলে নিজের দেশ ছেড়ে এসে মন টিকবে কেন?

    বেশ একটা খুশির হাওয়া বুকে নিয়ে আবার সবাই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। দুপুরের পর লোকে চাদর পেতে বালিতে গড়াগড়ি দিচ্ছে। মাথার উপরে রোদের তাত বড় বেশি। সেসবে এদের ভ্রূক্ষেপ নেই। যেচে গায়ে রোদ মেখেই এদের সুখ। তাদের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেচতে লাগল ওরা। এই দেশি লোকেরাও নানান জিনিস ফেরি করে বেড়াচ্ছে। চিনে ব্যাপারিও আছে। তবু হিন্দু জিনিসের উপর নেক নজর লোকজনের। টপাটপ কিনছে।

    সব ঠিক ছিল। কিন্তু হঠাৎ চোঙা নিয়ে কয়েকটা লোককে ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। কি বলছে কে জানে, ফায়জল মাথামুন্ডু বুঝতে পারল না। না চাচা কাছাকাছি আছে, না দেখা যাচ্ছে আলেফ আর বসিরভাইকে। শুধু দেখল ভিড়ের মধ্যে লোকজন হঠাৎ খুব হুড়োহুড়ি শুরু করেছে। এতক্ষণ চারদিক রোদে ঝলমল করছিল, হঠাৎ ভীষণ আঁধার ঘনিয়ে এল। অদ্ভুত ব্যাপার! একদিকে একটা কালো অন্ধকার দেওয়াল, অন্যদিকটা ফটফটে ফরসা। ঠিক ওই সীসার মত। একধারের মানুষটার সঙ্গে অন্য পারের ছবির মিল নেই। সমুদ্রের মাঝখানে একটা কালো অন্ধকার দেওয়াল উঠে এসেছে, অথচ অন্যদিক আলোয় ঝলমল। সেই কালো দেওয়ালের পিছনে কিছু দেখাও যাচ্ছে না। ফায়জল কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওই কালো অন্ধকারটা খুব কাছাকাছি চলে এল। কাছে আসতে মনে হল সেটা ঠিক ওই ভিতরের ক্যারুসেলের মত, বনবন করে ঘুরছে। আর কি আশ্চর্য সেই ঘুরন্ত কালো চোঙাটার মধ্যে অনেক লোকও বনবন করে ঘুরছে। এখানে না আছে ঘোড়া, না আছে হাতি। তবু সাঁতার কাটার মত হাঁকপাক করতে করতে ঘুরছে লোকগুলো। কিছু বোঝার আগেই ফায়জল নিজেও ওটার মধ্যে ঢুকে বনবন করে পাক খেতে লাগল। আর শুধু পাক খাওয়া নয়, সিধা উঠে যাচ্ছিল আসমানের দিকে। ফায়জল একটুও ভয় পেল না। তার চোখের সামনে নিচের ছুটে যাওয়া মানুষগুলো পিঁপড়ের মত হয়ে গেল। ওই যে অতবড় চাকা, তার পাশে কাঁচের ঘর সেগুলো দেখতে দেখতে কতটুকু ছোট এখন। আলিশান সেই বাড়িটা এখন দেশলাইয়ের বাক্স। তার নিচে এখন অতলান্ত সমুদ্র যাকে এখান থেকে লাগছে যেন কত শান্ত, বড় বড় ঢেউগুলো কেমন মিইয়ে গেছে। সেই উঁচু থেকে ফায়জল এখন ম্যানহাটানের জনবসতি দেখতে পাচ্ছে, যেন সব খেলার পুতুল। বন্দরে ভিড়ে থাকা জাহাজগুলো এক একটা সাদা বিন্দু। এমন কি স্ট্যাচু অব লিবার্টিকেও আর আলাদা করে চেনা যায় না। ফায়জল তবু উপরে উঠেই চলেছে। তার মনে হল একটু বাদে সে হয়তো পুরো পৃথিবীটাকেই দেখতে পাবে। সেখানে সাদাম্পটনের বন্দর থাকবে, কলম্বো থাকবে, খিদিরপুরের জাহাজঘাটা দেখা যাবে আর দেখা যাবে তার দাদপুরের ভিটে। একটুও ডর লাগছিল না ফায়জলের। যখন ভিটে দেখা যাবে তখন হাসণু বিবি হয়তো বদনা নিয়ে ঘাটে যেতে যেতে আসমানের দিকে তাকাবে। জানতেও পারবে না, উপরে যে একটা কালো তারার মত ভেসে আছে সেটা আসলে ফায়জল মিয়া।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৪৪৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ইন্দ্রাণী | ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ০৭:৪৮498709
  • এই পর্বের শেষে ভয়ঙ্কর ঝড়ে (টর্নাডো?) ফায়জলের মৃত্যু বর্ণন শৈল্পিক -মনে থাকবে।
  • প্রতিভা | 2401:4900:1040:f349:0:61:e364:8e01 | ০১ অক্টোবর ২০২১ ০৭:৩৯498903
  • টর্ণাডো ?  আহা ফয়জল ! 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন