• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস  শনিবারবেলা

  • নকশিকাঁথা (১০)

    বিশ্বদীপ চক্রবর্তী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৩১৬ বার পঠিত
  • নকশিকাঁথা – উপন্যাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং বাঙালি অভিবাসী জীবনের না জানা সময়

    ১৮৯০ এর দশক। তখন আমেরিকা এক সন্ধিক্ষণে। কালো মানুষেরা সদ্যই স্বাধীন। কিন্তু আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিভিন্নভাবে তাদেরকে আবার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। অন্যদিকে শিল্প বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে এসে মধ্যবিত্ত সাদা মানুষের আমেরিকা নিজেদের জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য পেরিয়ে ধর্ম এবং সংস্কৃতির খোঁজ শুরু করেছে। বিবেকানন্দের আমেরিকা বিজয়, হিন্দু ধর্মের জন্য আমেরিকার কৌতূহল এবং পৃষ্ঠপোষকতার খবর আমাদের জানা আছে। কিন্তু এই আগ্রহ শুধু ধর্মের ক্ষেত্রে নয়। পণ্য এবং বিনোদনের জগতেও ছিল। তারই হাত ধরে এমনকি বিবেকানন্দ আসার আগেও আমেরিকায় এসে গেছিল চুঁচুড়া, তারকেশ্বর, চন্দনপুর, বাবনানের কিছু লোক তাদের চিকনের কাজের পসরা নিয়ে। হাজির হয়েছিল উত্তর আমেরিকার সমুদ্রতটে। ছড়িয়ে পড়েছিল আমেরিকার বিভিন্ন শহরে, সংসার পেতেছিল কালোদের সমাজের অংশ হয়ে। শুধু চিকনদারেরা নয়। শতাব্দীর শেষের দিকে বৃটিশ জাহাজ থেকে পালিয়ে নিউ ইয়র্কে নেবে যাচ্ছিল সিলেট, চট্টগ্রাম থেকে আসা মাঝি-মাল্লারাও। মধ্য আমেরিকার শিল্পাঞ্চলে কাজের অভাব ছিল না কোন।

    বড় অদ্ভুত এই সময়। একদিকে দ্রুত শিল্পের বিকাশ ঘটছে, দেশ বিদেশ থেকে মানুষ এসে জড়ো হচ্ছে আমেরিকায়। আবার পাশাপাশি কালোদের উপর নিপীড়ন বাড়ছে, এশিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে সব নিয়মকানুন। বাবনানের চিকনদার আলেফ আলি আর পাঁচকড়ি মণ্ডল, সিলেটের গোবিন্দ সারেং কি আক্রাম, বেদান্ত সোসাইটি গড়ে তুলতে আসা অভেদানন্দ - এমনি আরও অনেকের জীবন জড়িয়ে যাবে অনেক রঙের মানুষের দেশ আমেরিকার এক উথালপাথাল সময়ে, বুনবে নানা রঙের নকশিকাঁথা।


    ১০

    আমরা একন কোদ্দিকে যাইবু চাচা?
    ফায়জলের মনে হচ্ছে এখনও খোয়াব দেখছে। সত্যি সত্যি ওদের এই দেশে ঢুকতে দিয়েছে, বিশ্বাস হয়নি এখনও। তাজ্জুব না চাচা, কদ্দিন আগে এলেম হাবুজখানায় রেকে দিল, দরকাস্ত নাকচ করে এক্কেরে দরিয়া পার। ফের এই কিস্তির কলমচি মামুলি সওয়াল করে মঞ্জুরি বকসে দিল।

    ফায়জল বিয়েসাদি করা জোয়ান। কিন্তু অনেক ব্যাপারে উতপটাং কথা বলে দেয়। সওয়াল জবাবের শেষ নেই মোটে। যা দ্যাখে তাতেই তাজ্জব, চোখেমুখে একটা নাদান হাবভাব। দেখে বোঝা যাবে না বাড়িতে তার একটা বিবি বাচ্চা রেখে এসেছে। হাসনুবি ছাড়তে চায়নি মোটেই। ফায়জলের খুব দেশ দেখার সাধ, বিবিকে মানিয়ে তবে আসার জন্য ছুট পেয়েছে। আর থাকবেই বা কিসের আশায়, মিলের কাপড়ের সঙ্গে তাঁতের মাকু টেনে আর জুঝে ওঠা যাচ্ছে না তো।

    ফায়জলের ছটফটানি আলেফ যদি বা মেনে নেয়, বসির উঠতে বসতে গালিগালাজ করে দু’বছরের ছোট ফুফাত ভাই ফায়জলকে। এতদিন জাহাজে ঘুরে ঘুরে তার মেজাজ চড়েই ছিল। ধমক দিল ফয়জলকে! জায়াজে ফিরতে চাস, দিলদিমাগে এমনি খায়েস যকন, চাচা ওকে ফের সাদাম্পটনে পাট্যে দাও দিকিন।
    ফায়জল ছাড়া সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

    তাদের সব বাক্স প্যাঁটরা ডাঁই করে রাখা আছে পথের ধারে। নিজেদের জামা কাপড় তো নগণ্য, কিন্তু চিকনের কাজের পেটি অনেক, বড় বড় চটের বস্তা মোটা ধাগায় সেলাই করা। বারোজনের সব মাল এখন চারজনের জিম্মায়। মোকসাদ আলির দিমাগ ভড়কাচ্ছে কিভাবে সব কিছু সামলে নিয়ে যাওয়া যায় সেই চিন্তায়। এইসব ভাবনা মাথায় নিয়ে আনমনে বলল, কানুন যেমন আচে, তার ছ্যাঁদাও তো আচে মিয়া। এই দফায় আমরা গুনতিতে কম, তার উপরে ওরা দেকলো যে আমি যাচ্চি কালিমোহন সরকারের বাসায় আটলান্টিক সিটিতে, ফায়জল যাচ্চে পাঁচকড়ি মণ্ডলের কের লেনের ঘরে, আশবারি পার্কে। আমরা তো আর ঘোঁট বেঁধে যাচ্চি না আগের মত।

    শুনেই আলেফের টনক নড়েছে। সে আবার কি হুজ্জোত গো চাচা। আমার বয়ানেও ছিল কের লেন, আমি আর ফায়জল একা একা পথ চিনে সেকেনে যাবো কেমন করে?
    আরে মিয়া, ওটা তো মুকের জবান, দস্তাবেজের হিসেব। মুসা আর আমি অনেক সুলুক সন্ধান করে এইসব করিচি। আইনের ফাঁক ফোঁকর গলে বেরিয়ে আসার গর্ব মোকসাদ আলির গলায় প্রচ্ছন্ন। এবার ওরা আর কন্ট্রাক্ট লেবারের তকমা পায়নি, ওরা ব্যাপারি। কিন্তু পৌঁছানোর তাড়াও আছে। সে যদি একবার এদের হাজার সওয়ালের জবাব ফাঁদতে বসে, তাহলে আর নিশুত হবার আগে পাঁচকড়ির ঘরে ঢুকতে হচ্ছে না। অনেকগুলো রেলের পথ বদলে বদলে যেতে হবে, সে যন্তরখানি আবার কত রাত অবধি চালু থাকে তার নেই ঠিক। অত তরাস পেয়ো না মিয়া, একোত্তরেই যাবো আশবারি পার্ক। পাঁচকড়িদাদা আমাদের চন্দনপুরের মানুষ। নব্বুই সনে একজোটে এয়েচিলাম আমরা। কিন্তু পা চাইলে চলতে হবে একন। একেনে গরমের দিনের আলোয় কই মাছের জান, তাই বলে ভেইবে বসো না যে নিশুত হয়নি কো।

    ওরা ম্যানহাটনের জাঁকজমক দেখে ভ্যাবাচ্যাকা। পারলে মোকসাদের আঙুল পাকড়ে ঘোরে। আলাদা যেতে হবে শুনে বড়ই তরাশ উঠেছিল, এখন জিগর ঠান্ডা হল।
    এখন বলো মিয়া, সবখানি মাথায় চাপ্যে হাঁটতে পারবে? আমাদের থার্টি ফোর্থ ইস্ট্রিট পানে যেতে হবে, রেলের গাড়ি ছাড়বে সেকেনে। এক কোশ পথ, হবে হিম্মত?

    চারজনে চলল সার দিয়ে। মাথায় দুটো পেটি, পিঠে একখান বোঁচকা, দুই হাতেও দু’টো করে পোঁটলা। একেকজনকে দেখে মনে হচ্ছে চলমান গন্ধমাদন পর্বত। জোয়ান ছেলে, তাকতদার, গাঁ-গঞ্জে এমন বয়েছে ঢের। ওরা মোকসাদকে বেশি কিছু নিতেই দেয়নি। পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে তো সেই, তার উপর বুজুর্গ মানুষ।
    বুঝলে মিয়া, এই শহরের পথের নিশান বেশ সিধা সিধা, ক্ষেতের আলের মত। সার দিয়ে এইসব ইস্ট্রিট গেছে, ওদিক থেকে আবার তাঁতের মাকুর মত আভেনু এয়েচে সব। নাক বরাবর চলতে থাকো।

    ম্যানহাটানের রেলের লাইন সব মাথার উপর দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তো আর অমন গন্ধমাদন সেজে যাওয়া যায় না। এক এক করে সব উপরে তুলতে ঢের সময় লেগে গেল। তার মধ্যেই আলেফ, ফায়জল আর বসির চারদিকের জলুশ দেখে তাজ্জব। ফায়জল ছটফট করে উঠল, দেকেচো বসিরভাই, কী রোশনাই দিয়েচে!

    তার ছমাস জাহাজে জাহাজে ঘোরা সার্থক আজ। রাস্তায় মেলা লোক, কত রং তামাশা যে হচ্ছে! এমন আর কোথায় দেখতে পেত? এইসব দেখে মাল বওয়ার ব্যথাবেদনা ভুলে গিয়েছিল আলেফ আর বসিরও। মাল টানাটানির জন্য অনেক পথ তখনও বাকি। মোকসাদ জানে সেটা। একখান রেলেই তো আর সোজা আশবারি নিয়ে ফেলবে না ওদের। কত যে লাইন বদলাতে হল। ফার্মিংটান রেলরোড গেল বেলমার, বেলমার থেকে সি গ্রিড রেলরোড, সি গ্রিড থেকে লং ব্রাঞ্চ, শেষমেশ যখন পৌঁছাল বে হেড জাংশানে, তখন রাত দশটা। ছেলেগুলো ততক্ষণে মাল এক ট্রেন থেকে আর এক ট্রেনের কামরায় নিয়ে নিয়ে হেদিয়ে গেছে।

    পাঁচকড়ি মণ্ডলের বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। চন্দনপুর গ্রামে তার বউ মালতী থাকে চার ছেলে মেয়ে নিয়ে। পাঁচকড়ির ভাই বেরাদরি সবাই ওখানেই, কিন্তু নিজে দেশের মুখ দেখেনি পাঁচ বছর। মোকসাদকে দেখে সে আনন্দে আত্মহারা। একেবারে বুকে জড়িয়ে ধরল, যেন পারলে দেশের মাটির ঘ্রান শুষে নেয় তার ঘর্মাক্ত কলেবর থেকে।
    পেন্নাম পাঁচকড়িদা, অনেক ঘুরপথে এয়েচি এ যাত্রায়।
    এতো দিন লেগে গেল মোকসাদ মিয়া, গাঁয়ে সব কুশল মঙ্গল তো।
    আল্লার হেফাজতে দুরস্ত আচে সবাই। তোমার ছেলে দুখান হলহলিয়ে বাড়ছে দাদা, আর কবচ্ছর গেলেই তাগড়া জোয়ান।

    পাঁচকড়ির দুচোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। মোকসাদ তার গাঁয়ে গিয়েছিল ছমাস আগে। পাঁচকড়ির কাছে সেটাও কিছু কম না। আর একটু বড় হলে নকুড়কে এখানে বসিয়ে দেশে ফিরবে পাঁচকড়ি। দাঁড়িয়ে থেকে দুই মেয়ের বিয়ে দেওয়াবে। এইসব ভাবনায় মন ডগোমগো হল। তোমার ফৌজে এবার নয়া আমদানি দেকচি, কাদের ধরে আনলে?
    আলাপ-পরিচয় মিটলে মোকসাদ আর পাঁচকড়ি বসলো মালের হিসাব নিয়ে। রাত যদিও অনেক, মোকসাদ আর একদিনও নষ্ট করতে চায় না। আশবারির বোর্ডওয়াকে এখন ভিড় নিশ্চয় কমতির দিকে, তবু গ্রীষ্মের শেষ কদিনে যেটুকু ব্যবসা করে নেওয়া যায়। নয় নয় করে এই চত্বরে লোক তো কিছু কম আসে না।

    আসবারি পার্ক শহরের বয়েস পঁচিশ ছাড়িয়েছে। ওসান গ্রোভের শান্ত জনপদ এত তাড়াতাড়ি যে নিজের মহিমায় বেড়ে উঠেছে তার অনেকটাই বর্তায় শহরের মালিক ব্রাডলির উপর।
    ১৮৬৯ সালের কোন এক গ্রীষ্মের বিকালে জেমস ব্রাডলি আর তার হাতের পাঁচ নিগ্রো সাথী জন বেকার নিউ জার্সির ওসান গ্রোভে সমুদ্রতীর ঘেঁষে ঘুরে বেরাচ্ছিল। নিউ ইয়র্কের ব্যবসাদার ব্রাডলির কারবার হলহলিয়ে চলছে। হাতে বেজায় কাঁচা পয়সা। এখানে এসেছিল পত্তন গড়ার মত ভাল জায়গার খোঁজে। নিজের একটা আস্তানা গড়বে। তটরেখা ধরে চলতে থাকলে শুধু নীল জল আর মসৃণ বালুচর। ব্যবসায়ী মানুষ ব্রাডলি, কিন্তু অন্তহীন সমুদ্রতট, বিকেলের মৃদুমন্দ বাতাস আর পাড়ে ঢেউ ভেঙ্গে পড়ার নির্ঘোষ তাকে এতো মুগ্ধ করল, সে জামা কাপড় খুলে ঝাঁপ দিল জলে। জন তার অনুগত ভৃত্য, কিন্তু তাকে জলে নামান গেল না কিছুতেই। জল থেকে উঠে উচ্ছ্বসিত ব্রাডলি হইহই করে উঠল। John! This is the best nervine for a man who is not past repair.

  • জিমের কথায় মাথা দোলালেও জন বুঝতে পারছিল না শহর ছেড়ে কে এখানে থাকতে আসবে। তার ব্যবসায়ী মনিবকে সে চেনে তো। এখন হঠাৎ এই বালি আর জল দেখে মেতে উঠলেও, টাকা রোজগারের উপায় না থাকলে সে কি আর এক পাও এগোবে?
    কে আসবে? বলছিস কী জন, সবাই আসবে। শহরে শুধু টাকার ধান্দায় ঘোরা লোকগুলো জীবনে শান্তির খোঁজ করতে আসবে এখানে। ক’দিন থেকে জ্বালা জুড়িয়ে ফেরত যাবে। ব্রাডলি মনে মনে ভবিষ্যৎ ছকে ফেলেছে ততক্ষণে। শহর গড়বে এখানে, নিউ ইয়র্কের কাছ ঘেঁসে বিনোদনের জায়গা। মেথডিস্ট চার্চের পত্তন করবে। সব কিছু যেন ছবির মত মাথায় সার দিয়ে আসতে থাকল।

    যেমন কথা তেমনি কাজ। ডিল আর ওয়েসলি লেকের মাঝ বরাবর পাঁচশো একর জমি কিনে পত্তন হল আসবারি পার্ক। মেথডিস্ট চার্চের বিশপ ফ্র্যান্সিস আসবারির ভক্ত ব্রাডলি, তার নামেই হল এই নতুন শহর। তখনো কি সে ভেবেছিল এত তাড়াতাড়ি জায়গাটা এমন গা-ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াবে? দশ বছরের মধ্যে আসবারি পার্কের সমুদ্র সৈকতে ভিড় উপচে পড়তে শুরু করেছিল। গরমের সময়ে ঘুরতে আসা লোক শুধু না, শহরে বাড়ি বানিয়ে রয়ে যাওয়া লোকের সংখ্যাও বাড়ছিল। তেমনি বাড়ছিল কাজে হাত বাটানোর লোকের প্রয়োজন। সাদাদের সঙ্গে সঙ্গে নিগ্রোদের জন্যেও তাই জায়গাটার আকর্ষণ ছিল। একটা শহর গড়তে কাজ কি কিছু কম! দিন দিন ব্রাডলি আরও ঢেলে সাজিয়ে চলেছিল এই বালুচর, শুরু হল আসবারি পার্ক বোর্ড ওয়াক।

    দ্যাক না দ্যাক, লোক আরও উপচে পড়চে মোকসাদ মিয়া। মনে আচে গরমে লোক আসবার কালে ওরা কেমন চার ফুটিয়া কাঠের পাটাতন দে হাঁটার জায়গা করত? এখন ব্রাডলি সাহেবের বোর্ডওয়াক একদম পারমানিন্ট, এক মাতা থিকে অন্য মাতা অবধি কাট ফেলে ফেলে কী একটা কাণ্ড করিচে!
    বলো কী? রবরবা বেড়ে গ্যাচে বলো?
    তাইলে আর বলচি কী? এত্তোখানিক বেড় সেই পথের। বলে দুহাত পাখির ডানার মত ছড়িয়ে দিল পাঁচকড়ি। আমাদের আর বালিতে বসতি হবে নে।
    তোমায় বসতে দিল ওখেনে?
    বোর্ড ওয়াকে কে যেতে পারবে আর কারা পারবে না, সেই নিয়ে শুরু থেকেই গোলযোগ দেখে গেছে মোকসাদ।
    দেবে নি কি গো? খুব একচোট তৃপ্তির হাসি হাসল পাঁচকড়ি। তবে নিগ্রোদের হ্যাটা করে ওরা, পুব দিকটায় আসতেই দেয় নাকো। শহরের মধ্যে আর একটা শহর ওয়েস্ট এন্ড, সব নিগ্রোদের ডেরা হচচে ওখেনে।
    হ্যাঁ, দেকেচিলাম গেল বারেও। কালো লোকেদের সিনানের জন্যি পচ্চিম দিকের নিকাশি পানির পাশ দে জায়গা দিইচিল।
    একনো ওমনি আচে। এক হুঁকোয় তামুক খায় না ওরা। মাজে মাজে এক একটা কালো লোক মাথা চাড়া দে ওঠে, নিকেশ করে দেয় তাকে ঠিক। জানো ইদানি কী হয়েচে?

    পাঁচকড়ি বেশ জমিয়ে গল্প করে। নতুন দেশে এসে সেই দেশের কথা শুনতে কার না মন চায়। আলেফ, বসির, ফায়জল আরও ঘন হয়ে বসে।

    তুমি দেকো নি মোকসাদ, ভিক্টোরিয়া প্যালিস হয়েচে একটা লতুন। তার পাশে বরফকল লাগিয়েচে, সেখেনে কাজ করত নেলসন বলে এক নিগ্রো। সে ব্যাটা প্যালিসের খাম্বা ধরে দাঁইড়ে ভেতরে বনবন করে ঘোরা ক্যারুসেল দেকচিল – ক্যারুসেল বুজলে না? এমনই হাওয়ায় ঝুইলে দিয়েচে হাতি ঘোড়ার মত দেকতে কেদারা, তেনারা বনবন করে পাক মারতেচে। ওর ইচ্ছে হয়েচে চড়বে বুজি, এক সাদা পালোয়ান এসে কী হম্বিতম্বি। ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের কইরে দিল।
    তারপর? কেউ কিচু কইল না?
    নেলসন লোকটাকে দেকলে বুজবে কারো কিচু কইতে হয় না কো, সে নিজেই এমন মুশকো। সেও দিয়েচে দু’ঘা। খুব খানিক হাতাপাই, সাদা লোকটাই শেষে গো বেড়েন হল। কিন্তু সে নিয়ে কী ধুম ধুমাক্কার মিয়া! ভিক্টোরিয়া প্যালিসের মালিক স্নিজলার সাহেব চালু লোক। নতুন নিয়ম করল ওই প্যালিসে ঢুকতে গেলি পর পুরো মাসের টিকেট কিনতে হবে। বুঝলে কী ফিকিরটা? নিগ্রোদের অত রেজগি কোতায়? এমন টিকেট কেটে ঢোকার মুরোদ কার হবে?
    তাইলে নিগ্রোদের আর আসতে দেয় না ওখেনে?
    দেকো, নিউ অরলিন কি শারলটে কী হচ্চে, ওরা সরকারি নিয়ম করে নিগ্রোদের ভেন্ন করচে। কিন্তু উত্তরের রাজ্যিগুলো সেটা করে নাকো। এইসব ফন্দি ফিকির চালায় ভিতরে ভিতরে। তবে কিনা এখেনে কালোরাও তাকতদার। এই শহর গড়ার সময় কত রকমের কাজের জন্য দিক দিক থেকে নিগ্রোরা এসে জমেচে। শহরের অনেকটা জুড়ে এখন ওদের বসতি। ওরাও ছাড়বে কেন? কাজ একবার বন্ধ করে দিলে আসবারি পার্ক মুখ থুবড়ে পড়বে নে? খুব কিছু কেচ্ছা হল। তকন আবার স্নিজলার সাহিব নতুন বিলি-ব্যবস্তে করলে যে দিনের কিচু সময় নিগ্রোরা আসতে পারবে, সব সময় নয়কো। অনেকে গাঁইগুঁই করেচে, নেলসন একন ওদের পাণ্ডা, কিচুতেই মানবে না। কিন্তু ওদের অত তাকত একনো হয়নি কো। শেষমেশ ওইটাই মেনে নেইচে।
    আমরা না সাদা, না কালো। এইটাই বাঁচোয়া। হিন্দু, কী বলো দাদা? এখেনে এসে আমরা হিঁদু মোছলমান এক হইয়ে গেচি।
    পথে বেরোলে কি আর ভেদাভেদি চলে মোকসাদ ভাই!

    এতদিন যাত্রায় ক্লান্তির সঙ্গে একরাশ চিন্তা ছিল মাথায়, আজ অনেকটা ঝাড়া হাত-পা। গলায় গল্প শোনার আয়েশ জমিয়ে বলল মোকসাদ, আর কী নতুন করেচে ব্রাডলি সাহেব?
    ওই যে বননু ভিক্টোরিয়া প্যালিস হয়েচে, মেলা ভিড় সেখেনে। ওটাকে বেড় দিয়ে আরও কত কী হচ্চে। নোক দেকলে ভিরমি যাবে, এত ধুন্দুমার!
    তাহলে বিক্কিরি ভাল হবে বলচো?
    আমাদের হাতে যা মাল ছেল সে জষ্টিতেই বিকিয়ে গেল। তারপর থেকে হাতে হাত দিয়ে বসে আচি। তোমরা এলে, তো একেবারে বেসজ্জনের সময়।
    শুনে মোকসাদের মুখ শুকিয়ে আমসি। আর লোক নেই একন? কতো উমিদ করে পেটি পেটি মাল আনালুম।

    আর সাত-দশ দিন, এরপর বাতাস শীতল পড়বে, সাগরপারে আর কি লোক আসবে? দেকো কতোটা কী হয়। হেমন্তের কালে নিউ অরলিন্সে ব্যাপার করতে হবে, ইদানি মেলাই লোক হচ্চে সেকেনে। আমি তো এবাদুরভাইয়ের নিকট থেকে মাল আনিয়েচিলুম কিচু, কতা দেচিলাম ওদের ওখেনে জলুশ বাড়ার আগেই আবার মাল তুলে দেবো।
    এটা শুনে মোকসাদের মুখ জ্বলজ্বল করে উঠল। তাহলে এত হুজ্জত বেফালতু হবে না, বলো পাঁচকড়িদাদা? যা থাকবে সব নিয়ে চলে যাবো নিউ অরলিন। এই দশ দিনে যা পারি বেচি এখেনে। কাল ভোর ভোর বোর্ডওয়াকে চিকনের পেটি নিয়ে বেইরে পড়ি চলো।

    আলেফ, বসির, ফায়জল এতক্ষণ পেটি থেকে বের করে সামান সাজাচ্ছিল। শরীর যেন ভেঙে পড়ছে। মোকসাদ চাচার কথা শুনে আক্কেল গুড়ুম। কালকের দিনটা এট্টু জিইরে নিলে হতো না চাচা?
    ফায়জলের কথায় মোকসাদের চোখ দিয়ে যেন আগুন ছুটল। জিরোনোর হলে দাদপুরে বিবির হেফাজতে রেকে আসতুম না হয় তুমারে। কামকাজ করতে এয়েচি, মজা লুইটতে নয়।
    মোকসাদ চাচার উপরে কথা বলবে এমন হিম্মত ওদের কারুর নেই। পাঁচকড়ি মণ্ডলের দুই কামরার বাড়ির কাঠের মেঝেতে চাদর বিছিয়ে মাথায় নিজের নিজের পোঁটলা রেখে গুড়িমুড়ি হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল তিনজনা।


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ | ৩১৬ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১০:৩৬498365
  • পড়ছি পড়ছি। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন