• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  সমাজ  শনিবারবেলা

  • লেবারের বিদেশ যাত্রা - ৫

    মঞ্জীরা সাহা
    ধারাবাহিক | সমাজ | ০৭ আগস্ট ২০২১ | ৭১১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)

  • খন্যান থেকে ইরান (দ্বিতীয় পর্ব)

    বাস থামল শেষে পুরোপুরি। চাবাহার এসে পৌঁছেছে বাস। বাস যেখানে দাঁড়াল, সেখান থেকে কিছু দূর - তারপর উঁচু একটা জায়গা। উঠতে হবে ওখানে। ওখানে থাকার ঘর ওদের। পিঠে, কাঁধে, হাতে ব্যাগ-বাক্স। চার দিনের লম্বা জার্নির শেষ। ক্লান্ত শরীর। কিছুদূর উঠেই ঘরখানা। খুলে গেল দরজাটা। অবাক। এত বড় একটা ঘর! এই বিস্ময়কর বস্তুটির থেকে আরও কিছু বিস্ময়কর জিনিস যে অপেক্ষা করছে সেদিকে ওদের চোখ পড়েনি তখনও।

    এ তো প্রায় পঞ্চাশ ফুট-বাই-একশ ফুট! খন্যানের আট-দশ ফুটের ঘর, ইন্দোরের বোম্বে বাজারের ঘুপচি ঘর ছেড়ে আসা মানুষটার থাকার জন্য এত বড় একটা জায়গা! ঢুকে পড়ল। ভেতরে আর ওরা এগারোজন নয় শুধু। প্রথমে এতসব নতুন কিছুর মধ্যে গুনে উঠতে পারেনি। পরে গুনে বুঝেছিল এক ঘরে তেত্রিশ-জন। তেত্রিশ-জনের একটা বাথরুম।
    ভেতরে কিছু মুখের আদল অন্যরকম। ঠিক চেনা চেনা মুখের আদলের মতো নয়। ফর্সা টিকালো নাক। লম্বা। কারা এরা? ওই বেশি টিকালো নাকের পাঁচজন পাকিস্তানের। চাবাহারের কাছেই পাকিস্তান-ইরানের বর্ডার। পাকিস্তানের করাচি দিয়ে বর্ডার পেরিয়ে এসেছে ওরা। অন্য দু’জনকে আবার অন্যরকম দেখতে। তারা ফিলিপাইনের। তাছাড়া কেউ কেরালা, কেউ অন্ধ্র - আর বাদবাকি পশ্চিমবঙ্গের। সবাই সোনার কাজে এসেছে। এই ঘরে। এই কোম্পানিতে। এখন থেকে সবাই থাকবে একসঙ্গে। আর কাজ করবে ওয়ার্কশপে।


    সামনের উপসাগর

    হলঘরের তিনদিকে দেওয়াল। আর ওই উল্টোদিকে, ওখানে কি? ওই দিকে তাকিয়ে আবার অবাক। এতক্ষণ ধূসর, রুক্ষ, প্রাণহীন পাথর দেখতে দেখতে চোখগুলো ধূসর, রুক্ষ রঙে কীরকম একটা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল। কাচের বাইরে একেবারে আলাদা একটা ছবি! ডানে-বাঁয়ে যতদূর দেখা যাচ্ছে বালির উপর বিশাল জলরাশি। তার শেষ দেখা যাচ্ছে না। ইরানের আকাশের সাথে মিশে গেছে। স্রোত এসে ধাক্কা মারছে পাথরের উপর। তার পিছনে আবার স্রোত - আবার স্রোত - স্থির হচ্ছে না একবিন্দুও। ওটা ওমান উপসাগর। বড় কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সেই উপসাগরের জল। ওরা দাঁড়িয়ে আছে এখন ওমান উপসাগরের ঠিক ধারেই। আর ওই হলঘর থেকে যদি বাইরে বেরিয়ে ডানে-বাঁয়ে হাঁটা যায়, একেবারে অন্যরকম একটা জায়গা। সমুদ্রের পাশ ধরে, পিছনে অনেক-দূর অবধি আলোয়-আলোয় ঝলমল করছে। ইরানের এই দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তের রাতের অন্ধকারকে আলোকোজ্জ্বল করে রেখেছে আলোর মালা। উত্তর-চব্বিশ-পরগনা, দক্ষিণ-চব্বিশ-পরগনা, হুগলি, হাওড়া, বর্দ্ধমান-এর পার্ক সিনেমাহল-স্ট্রিট লাইট থেকে একেবারে অন্যরকম লাইট। ওরা ঢুকে পড়েছে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের একেবারে প্রান্তে, ইরানের একমাত্র বন্দর এলাকায়। এই চাবাহার বন্দরের মূল দু’টো ভাগ। ‘শহীদ কালান্তরি’ আর ‘শহীদ বেহস্তি’। মইনুদ্দিন বলছিল, ‘আমরা ইরানে ইন্ডিয়ান পোর্টের পাশেই ছিলাম’। বেহস্তি বন্দরটি নিয়ে ভারতের সাথে ইরানের বারবার চুক্তি হয়। ইরাক-ইরানের যুদ্ধ। আমেরিকার হস্তক্ষেপ। থেমে যায় যৌথ অগ্রগতির কাজ। আবার ২০১৬-তে শুরু হয় যৌথ কাজ। ইরান-আফগানিস্তান-ভারতের মধ্যে চুক্তি সাক্ষরিত হয় বন্দরটি পুনর্গঠনের। চুক্তির সাক্ষর-ভাঙন চলতে থাকে। অগ্রগতির কাজ কখনও চলতে থাকে, কখনও থেমে যায় অন্য দেশের হস্তক্ষেপে। আর ওই শহিদ বেহস্তি বন্দর এলাকায় দেশ থেকে বিদেশে যাওয়া লেবারদের জীবন যাপন চলতে থাকে কোম্পানির মালিকের গড়া নিয়মে।


    কালো মোমের উপর সোনার কারিগরি

    সকাল ন’টার মধ্যে কাজ শুরু। ওয়ার্কশপে। সেটা খানিক দূরে। দুপুরে একটা-নাগাদ টিফিন। রাত আটটা অবধি কাজ। ওই ওয়ার্কশপের ভেতর গ্যাস-বার্নারে আগুন জ্বলে ওঠে। সোনা বিস্কুট গলে যায় কারিগরদের হাতে। সেই তরল ধাতু তারের মতো হয়ে ওঠে। ছাঁচ বানানো চলতে থাকে কালো এক ধরনের মোমের ভেতর। প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে ছাঁচ ওঠে। কম্পিউটারে ডিজাইন তৈরি হয়। আর হাতের কারিগরিতে হয়ে ওঠে অপূর্ব সব অলংকার। ছেলেরা এক নাগাড়ে তাকিয়ে থাকে ওই দুর্লভ ধাতুর দিকে। হাতুড়ি, জম্বুরা, কাঁসলা, ওয়াটার-পাম্প, গ্যাস-কাটার, প্লাস, চিমটে, আয়রন-প্লেট, কম্পাস, কালো-মোম ঘোরে ওদের হাতে-হাতে। সামনে ঝলমল করে ওঠে রাশি-রাশি অপূর্ব সব গহনা। মইনুদ্দিন ওই তেত্রিশ-জনে একমাত্র অ্যান্টিক ম্যানুয়াল ডিজাইনের কারিগর। কাজগুলো আলাদা ধরনের হলেও তেত্রিশ-জনের রুটিন চলতে থাকে মোটামুটি এক ছাঁচে। ওয়ার্কশপের রুটিন বাদে সারাদিনে ভোরে উঠে রান্না, বাসন ধোওয়া, জামা-প্যান্ট কাচা। সারাদিন ওই জানালা দিয়ে বিশাল জলরাশি দেখা গেলেও জলের অভাব ঘরের ভেতর। ইরানের তীব্র দাবদাহে পঞ্চাশ-বাই-একশ ফুটের বিশালাকার হলঘরে যে পরিমাণ শীতল বাতাস ওই তেত্রিশ-জনকে আরাম দিতে পারে ততটা আরাম দেওয়ার ক্ষমতা ছিল না দু’খানা মাত্র কম পাওয়ারের শীতাতপ-নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের। অসহ্য গরম হয়ে উঠত মাঝে মাঝে হল ঘর। সঙ্গে ঘরের ওই মানুষগুলোর শরীর। স্নান করবে - স্নানের জলের অভাব। রোজ স্নান করা যাবে না। জল কিনতে হবে। খাওয়ার জল কোনওরকমে কিনে আনা গেলেও স্নান-বাথরুম-পায়খানায় ব্যবহারের জল জোগাড় করাটা খুব কঠিন। টায়-টায় ভাবে এ.সি. মেশিনের জল ব্যবহার শুরু হয়। রান্নার জন্য বা নিজেদের টুকটাক দরকারের বাজার করতে গেলে যেতে হবে অনেক দূরের লোকাল মার্কেটে। কাছাকাছি কোনও মার্কেট নেই। ওখানে বাস নেই। ট্যাক্সি ছাড়া উপায় নেই। লোকাল মার্কেটে ডাল-আটা-তেল-রুক্ষ মাটির শাক-সবজি – যা-ই পাওয়া যাক, কোনটা চাই বোঝানোটা কঠিন হত এই বাঙালি ছেলেদের। ফার্সি ভাষা ছাড়া অন্য ভাষা বোঝেনা লোকাল মার্কেটের মানুষ। নেট থেকে ছবি ডাউনলোড করে সেটা দেখিয়ে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাটা ছিল পথ। বাকিটা বলে দিতে হত কোম্পানিকে। আগের দিন বললে পরের দিন এনে দিত কোম্পানি।

    টাইট শিডিউলে রান্না খাওয়া সোনার কাজের মধ্যেও ওই সমুদ্রের ঢেউয়ের সামনে বেড়ানোটা ছিল মজার। ৫ ই জুন ২০১৮, মইনুদ্দিনের ফেসবুকের ওয়ালে ওমানের সাগরের জোর ঢেউ দেখা যায়। ভিডিও পোস্ট। ক্যাপশনে লেখা ‘উই আর এনজয়িং’। বিদেশের মাটিতে কোনও এক দালালের সঙ্গে কাজে গিয়ে লেবারদের এনজয়মেন্টের গতি প্রকৃতি কীভাবে বদলাতে থাকল বুঝতে পারলো একমাস পর থেকে।


    মইনুদ্দিনের ট্যুরিস্ট ভিসা

    যাওয়ার পরেই কোম্পানিতে নাম রেজিস্টারের সময় পাসপোর্ট জমা রেখে দিয়েছিল কোম্পানি। এটাই নিয়ম। অন্তত সোনার কারিগরির কাজে যে ছেলেরা ইন্ডিয়া থেকে বা অন্য দেশ থেকে যায় তাদের নিজেদের কাছে পাসপোর্ট রাখতে দেওয়া হয় না। হয়ত অন্য কাজের লেবারদের জন্যেও একই নিয়ম। সঠিক জানা নেই, কথাগুলো ধীর লয়ে বলে চলছিল মইনুদ্দিন। আমাদের পাসপোর্ট সব রেখে দিল। আর পাকিস্তান থেকে যারা এসেছিল তারা বর্ডার ক্রস করে এসেছিল। উইদাউট পাসপোর্টে। তাই ওদেরটা জমা রাখার দরকার পড়েনি।
    আর ভিসা? এমপ্লয়মেন্ট ভিসা হয়েছিল তোমাদের?


    হ্যাঁ নব্বই দিন শেষ হওয়ার দু একদিন আগে কোম্পানি করে দিয়েছিল এমপ্লয়মেন্ট ভিসা।


    মইনুদ্দিনের এমপ্লয়মেন্ট ভিসা

    এই অবধি কোনও সমস্যা নেই। প্রথম মাস শেষ। এক তারিখে স্যালারি। সপ্তাহে দু’দিন চিকেন-সবজি-ভাত রুটিন করে খাওয়া-দাওয়া। জল-কষ্টটা কমন। রুক্ষ আবহাওয়া। সারাদিনের লু। তাতেও বেশ মানিয়ে নিয়েছিল এই পশ্চিমবঙ্গের মৌসুমি জলবায়ুর ছেলেরা। দ্বিতীয়-তৃতীয় মাসের স্যালারি হতে হতে আট-দশ-বারো তারিখ। চতুর্থ-পঞ্চম মাস আর স্যালারি হল না। ষষ্ঠ মাসের পরে তিন মাসের স্যালারি থেকে অনেকটা কেটে নিয়ে ধরিয়ে দিল অনেক কম। তারপর স্যালারি বন্ধ হল পুরোপুরি। ওয়ার্কশপে কাজ চলতে লাগল আগের মতোই। কাজের মাথাগুলো গরম হতে শুরু করল দিন-কে-দিন। খুব জোর চিৎকার ঝামেলা শুরু হল মাঝেমাঝেই। কাজ থামিয়ে দেবে ওরা। উল্টোদিক থেকে জোর গলার আওয়াজে যে হুমকিটা আসছিল, তাতে এই এগারোজনের আর চিৎকার করার মতো গলার স্বর বেরলো না।

    হুগলির পোলবা থানার সেই এজেন্ট গিয়াসুদ্দিন মোল্লা তখনও সেখানেই। কোম্পানির সোনার কাজের তদারকিতে থেকে গেছে। ওদের দিয়ে যাতে ভালোভাবে কাজ করিয়ে নেওয়া যায়, সেসব দেখাশোনা করছে সে।
    আর যাদের নিয়ে গেছে সেই দূর দেশে, তাদের মাইনে হল কি-না, সেসব দেখাশোনা? জিজ্ঞাসা করেছিলাম মইনুদ্দিনকে।
    ‘সব জানত ও। ও মাঝে-মাঝে বোঝাতো এসে আমাদের। মাঝে মাঝে গরম নিত। হুমকি দিত কোম্পানির লোকেদের মতোই। রাগ ঝাল দেখাত। ভয় দেখাত। আসলে গিয়াস তখন ওদের হয়েই কাজ করছে। ওরও লাভ ছিল আমাদের দিয়ে ফ্রিতে কাজ করিয়ে নিলে’।

    কোম্পানির মালিকের লোকেদের হুমকির ভাষা সারসংক্ষেপ করলে হয় – ‘চিৎকার-চ্যাঁচামেচি করলে, কাজ না করতে চাইলে - কোম্পানি তুলে দেবে টেররিস্টদের হাতে’। মালিকদের লোকেরা বলেছিল, ওই বন্দরের কাছেই আছে টেররিস্টদের ঘাঁটি। টেররিস্ট শব্দটা বলতে-বলতে মইনুদ্দিন বলে ফেলল আরেকটা শব্দ। কোম্পানির লোকেরা হুমকি দিয়ে আরও বলেছিল, ডনদের হাতে বেচে দিয়ে আসবে। সেই ডনেরা ইরানের উগ্রপন্থীদের থেকে একটু বেশি ভয়ানক, না কম ভয়ানক - সেটা আন্দাজ করতে পারেনি ওরা। পশ্চিমবঙ্গে থাকতে হয়তো সিনেমায় শুনেছিল এ শব্দ। দুর্গা-কালী-সরস্বতী পূজার প্যান্ডেলে, বিয়েবাড়িতে, বড়-বড় বক্সে বেজেছিল “ড…ন, ড…ন, ড…ন - ম্যায় হুঁ ড…ন” গান। কিন্তু সত্যিকারের ডন কেমন হয়! সেই বিদেশের বন্দর এলাকায়, ডনের হাতে তুলে দেওয়ার হুমকিটা কেমন লাগছিল বোঝাতে মইনুদ্দিনের গলাটা এখনও কেঁপে উঠছিল। ভয় আর ভয়ঙ্কর অনিশ্চিত একটা ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছিল সবাই মিলে। এই আজ বুঝি ঘটে যাবে! এই কে যেন চেঁচিয়ে ফেলল! সব চিৎকার থেমে যাচ্ছিল এই এগারোটা তরুণ কণ্ঠস্বরের। এই এগারোজন বাদে উগ্র মেজাজের আরও কিছু কারিগর ছিল। কিছুতেই থামানো যাচ্ছিল না তাদের। ভয় দেখাচ্ছিল মালিক-পক্ষ। ভয় পাচ্ছিল। তাও চ্যাঁচাচ্ছিল প্রাপ্য টাকাগুলোর জন্য। মাসের মাইনেটুকুর জন্য। কিন্তু সোনালি ধাতুতে ডিজাইন তুলতে বাধ্য হয়ে রইল তারাও। পাসপোর্ট ওদের কাছে জমা। ফিরবে! কীভাবে? কোথায়?

    জানালার বাইরে ওমান উপসাগরের ঢেউ আগের মতোই খেলে চলেছে পাথরের গায়ে। কাচের জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে সকালের আলোয় বালির উপর রোদ চিকচিক করছে। আর জানালার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে দুশ্চিন্তা। ভোরে উঠে রান্না করে খেয়ে চলে যেতে হবে ওয়ার্কশপ। রুটিনটা একই থেকে গেছে। কোম্পানিকে বললে খাবার জিনিস এসে পৌঁছায় দেরিতে। দেরির পরিধি কেবল বাড়তে লাগল। দু’দিন আগে বললে চারদিন পরে এসে পৌঁছায়। চাল। তেল। সবজি। জল। বা আসে না। ঝামেলা করলে আবার হুমকি। সেই এক হুমকি নয়তো আবার অন্যরকম হুমকি। মেরে মাটির তলায় পুঁতে দেব। কেউ টের পাবে না। কোম্পানির লোকেরা বলেছিল ফার্সিতে। কিন্তু অর্থ করে নিতে পেরেছিল ওরা মাতৃভাষায়। লোকাল মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে ততদিনে ফার্সি বুঝতে শুরু করে দিয়েছে। লোকাল মার্কেটে যাওয়ার মতো টাকা আর রইল না হাতে। হাতখরচের টাকা নেই। কিছু খাবার কিনে খাওয়ার টাকা নেই। যা ওই কোম্পানি পাঠাবে - যতদিনে পাঠাবে, সেটাই খেয়ে থাকতে হবে। জল যতটুকু পাঠাবে, ততটুকুই ভরসা। নিজের দেশের বাড়ি থেকে টাকা পাঠানোটাও কঠিন। হরিদাসপুরের মতোই ওই ছেলেদের আরও অন্য সব পাড়ার বাড়িগুলি থেকে বিদেশে পাঠানোর মতো টাকা কোথায়? যদিও বা সুদে/বিনা সুদে ধার করা যায়, পাঠাবে কিভাবে! ওদেশের অ্যাকাউন্ট চাই। কোম্পানিকে বলতে গেলে আবার সেই হুমকি।

    ওই আলোকোজ্জ্বল বন্দর, বিশালাকার সব জাহাজ, গোডাউন, গুডস, ট্রাক, অন্যরকম পোশাকের মানুষ, বিশাল বিশাল বিল্ডিং - সব কিছুর মধ্যে কেমন একটা ভয় চেপে বসছিল। গা ছমছম করছিল ওদের। যেখানে সেখানে মনে হচ্ছে তখন - এই সেই ডেরা নয়তো! মানুষ দেখলে মনে হচ্ছে - এরা সেই ইরানের চাবাহারের টেররিস্ট নয়তো! এই বুঝি তুলে নিয়ে চলে যাবে ওই হলঘর থেকে। আট মাসে কোম্পানির আসল মালিকের দেখা পেয়েছিল মাত্র দু’দিন। এসেছিল ওয়ার্কশপে। সাথে লোকলস্কর নিয়ে। তার নিজস্ব শিপ আছে। গুডস এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট করে। বাস আছে অনেকগুলো। ট্রান্সপোর্টের বিজনেস আছে। সঙ্গে গোল্ডের কোম্পানি। নানা দেশ থেকে প্রচুর লেবারকে নিয়ে গিয়ে পুষতে পারে সে। ওই ইরানের মালিকটির ক্ষমতা যে কতটা হতে পারে, কী কী করে ফেলতে পারে সে, পশ্চিমবঙ্গের চাল-ডাল-তেল-নুন-চিনির মাসকাবারি মালের হিসেব দেখে বড় হয়ে ওঠা ছেলেদের সে কথা ভেবেই পা-হাত ঠান্ডা হয়ে আসছিল। হাত দিয়ে তাও গলছিল সোনা। সোনার ওয়্যার তৈরি হচ্ছিল মাপমতো। কম্পিউটারে ডিজাইন উঠছিল। ঝালাই করে পিটিয়ে খুদে ধাতু বদলাচ্ছিল তার চেহারা। ওদের চেহারা বদলাচ্ছিল দিন-কে-দিন মাথা ভর্তি দুশ্চিন্তায়। হাতের ঘষায় ভুরি ভুরি সোনার গহনা তৈরি হয়ে চলেছিল আগের মতোই। বিনা বেতনের কারিগরদের সামনে বিদ্যুতের চড়া আলোয় ঝলমলিয়ে উঠছিল রাশি রাশি সোনালি ধাতুর গয়না।


    ভুরি-ভুরি সোনার গয়না

    অন্য কোনও রোজগারেরও পথ নেই। সারাদিন কাটত আগের মতোই সোনার ওয়ার্কশপে। এবার টাকা দরকার যে কোনও একটা উপায়ে। উপায় ছিল একটাই মইনুদ্দিনের কাছে। যা সবার কাছে ছিল না। অনেক ভেবে বার করে ছিল সেই উপায়। ওরা যখন লোকাল মার্কেটে বাজার করতে যেত, ট্যাক্সিতে যেত। একটাই ট্যাক্সি ধরা ছিল ওদের। ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে হল কথা। তার ইরানের ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট আছে। মইনুদ্দিনের পিসতুতো দাদা তখন কুয়েতে। সেখানকার ট্রাভেল এজেন্ট। সেই দাদার মারফৎ ইরানের ট্যাক্সি ড্রাইভারের অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা হল। খন্যানের বাড়িতে ধার-কর্জ চলল। ইন্ডিয়ার হিসেবে কুড়ি হাজার মতো টাকা দেওয়া হল। ইরানের ট্যাক্সি ড্রাইভারের একাউন্ট থেকে সে টাকা পৌঁছল মইনুদ্দিনের কাছে ইরানের কারেন্সিতে। টাকার সমস্যাটা ওই হলঘরের ভেতর মইনুদ্দিনের যে কেবল একলার হচ্ছিল তেমন নয়! ওই ঘরের এগারোটা ছেলে - আরও সব ছেলের অবস্থা আরও খারাপ। মইনুদ্দিন যে ব্যবস্থা করতে পেরেছে, ওরা পারেনি। এরকম সম্পর্কের দাদা-মামা-কাকা বিদেশে আর কারুর নেই। বাড়ি বাড়ি থেকে বিদেশে টাকাও পাঠাতে পারবে না অত ঝুট-ঝামেলা করে। তাই কুড়ি হাজার টাকায় এবার ভাগ বসল। কিছু কিছু করে ভাগ করেও যাতে কিছুদিন চলা যায়। মাস গড়াচ্ছে আরও। বেতনের একটা টাকা পাওয়ার নামগন্ধ নেই। পুরোপুরি বন্ধ। সোনার কাজ চলছে আগের মতো। উল্টোদিকে চলছে ভয় দেখানোর পালা আরও চড়া সুরে। সবাই চুপচাপ হয়ে গেছে। টাকা চাইছে। চাইতে চাইতে চিৎকার করে ফেলছে। আবার সব থেমে যাচ্ছে মালিক-পক্ষ থেকে আসা ভয়ঙ্কর ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব কল্পনায়। এবার ওই ক’টা টাকাও শেষ হতে চলেছে। আর টাকা পাঠানোর সামর্থ্য নেই খন্যানের বালু-খাদের পাশের বাড়িটির মানুষের। বাড়ি থেকে আর টাকা না পৌঁছলেও একটা খবর পৌঁছল মইনুদ্দিনের মোবাইলে। মইনুদ্দিনের মায়ের অকালমৃত্যুর সংবাদখানা।

    এই অবধি এসে মনে হচ্ছে এই কুড়ি-একুশ-বাইশ-পঁচিশের ছেলেরা বন্দি হয়ে গেল সারা জীবনের মতো এক বিদেশি মালিকের হাতে। রাশি-রাশি পেটি-পেটি মাল চলে যাবে পাশের শহিদ বেহস্তি বন্দর থেকে জাহাজে-জাহাজে করে সমুদ্র দিয়ে দূরের দেশে-দেশে। এই রক্তমাংসের মানুষগুলো আটকে থেকে যাবে ওই বন্দরের পাশেই। এই তরুণ যুবকদের জীবনের বাদ-বাকি অধ্যায়গুলো কাটবে এবার থেকে নিজেদের ইচ্ছে-মতো নয়, মালিকের ইচ্ছে-মতো। হলঘরে-সোনার ওয়ার্কশপে বা টেররিস্টের ডেরায়। অন্ধকার-জগতে হয়তো কাজে লাগবে ওদের শরীরগুলো। ফিরতে পারবে না আর কখনও ঘন-সবুজের মধ্যে আম-জাম-কাঁঠাল গাছের গা-ঘেঁষা চেনা-চেনা মুখের ভেতর নিজেদের অনাড়ম্বর জীবনে। সারাটা জীবন ওরা হয়ে থাকবে বিদেশের মাটিতে পোতাশ্রয়ের চড়া আলোর নীচে সোনার কাজে পারদর্শী বিনা বেতনের কারিগর।

    এমনটা কিন্তু হল না। মইনুদ্দিনের উপস্থিত বুদ্ধি ঘটনাগুলো বদলে ফেলতে থাকল এক রাতে…


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ০৭ আগস্ট ২০২১ | ৭১১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ০৮ আগস্ট ২০২১ ০৯:১২496552
  • দাস ব্যবসা বোধয় অন্যতম আদিম ব্যবসা। মানুষ যবেথেকে সভ্য হয়েছে তবে থেকেই অপেক্ষাকৃত দুর্বল  আরো কিছু মানুষকে দাস বানিয়ে বিজ্রি করতে শুরু করেছে। কোনও আইনই তাকে আটকাতে পারে না। 

  • সুদেষ্ণা মৈত্র | 42.110.152.113 | ০৮ আগস্ট ২০২১ ২০:০৯496564
  • ভালো 

  • সুদেষ্ণা মৈত্র | 42.110.152.113 | ০৮ আগস্ট ২০২১ ২০:০৯496565
  • ভালো 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন