• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  সমাজ  শনিবারবেলা

  • লেবারের বিদেশ যাত্রা ৮

    মঞ্জীরা সাহা
    ধারাবাহিক | সমাজ | ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৬৪৮ বার পঠিত
  • কোথায় যান কাজ করতে? উত্তরে বললেন, লেবারি করতে যাই। সেকি এখানে নাকি! সে তো বিদেশ!
    রাজ্যের বর্ডার পেরিয়ে পেরিয়ে ওরা যখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে দিল্লী মুম্বাই কেরালা ত্রিপুরা লেবার হয়ে চলে যায় সেই দুরের রাজ্যটা ওদের কথায় ‘বিদেশ’।
    ২০২০ র মার্চ থেকে দেশ জুড়ে হঠাৎ লকডাউন। শয়ে শয়ে কিলোমিটার হাঁটতে থাকা লেবারদের আটকে দেওয়া হচ্ছিল রাজ্যের বর্ডারে বর্ডারে। পাহারা দেওয়া বাহিনী তখন রাজ্যগুলির বর্ডারে অতি সক্রিয়। নিয়ম ভেঙে কে ফিরতে চাইছে তার নিজের রাজ্যে নিজের গ্রামে? পড়ল লাঠির বাড়ি । ফিরিয়ে দেওয়া হল উল্টো পথে। বা বিধান হল আরও কোনও শাস্তির। রাজ্যের বর্ডার যেন তখন দেশের বর্ডার। নিজের দেশটাই যেন তখন বিদেশ।
    আরও একদল যায়। ধানি জমি বসত বাড়ি বন্দক দিয়ে বেচে চড়া সুদে টাকা ধার করে। আসল বা নকল পাসপোর্ট তৈরি করে লেবার পাঠানোর এজেন্ট। ওরা যায় সত্যিকারের বিদেশ।
    পশ্চিমবঙ্গের নানা জেলা থেকে দেশ বিদেশে লেবার হয়ে যাওয়া আসা আটকে পড়া বাঁচা মরার কথা নিয়েই শুরু হচ্ছে ধারাবাহিক ‘লেবারের বিদেশ যাত্রা’।


    খাজা’র ডেস্টিনেশন… (দ্বিতীয় পর্ব)

    সামনে টেবিল চেয়ারে বসা কারা যেন। গতকাল অবধি ভুবনেশ্বরের হোটেল রুমে বসে বসে নাড়ু দালালের এই লেবারদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বুঝতে পারেনি কিছুই। কিন্তু মিনিট খানেক আগের মনের ভেতর ঘুরপাক খাওয়া ভবিষ্যৎবাণী মিলে যেতে লাগল এবার। প্রশ্ন করা হচ্ছে ওকে। উত্তর দিতে পারছে না একটিরও। সামনে বসে থাকা লোকগুলো আসলে কারা! খাজার মুখে শব্দটার উচ্চারণ যাই হোক, শব্দটা আসলে যে ‘ইমিগ্রেশন অফিসার’ – সেটা বুঝতে আমার বেশ কয়েক মিনিট লেগে গেল। আর সঙ্গে মালয়েশিয়ার পুলিশ।

    সামনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে দাঁড়িয়ে আছে খাজা। ওর বড়বড়িয়ার ইছামতি নদীর আশপাশের জমিজমা, বাগানের আম-কাঁঠাল নিয়ে ঝগড়া অশান্তি, দত্তফুলিয়ার মাছ-বাজারে মাছের দাম নিয়ে দর-কষাকষি, লুঙ্গি-টেরিকটের প্যান্ট পরা মানুষগুলোর চায়ের দোকানে ঝগড়া-মারপিট, পচা-পুকুরে পাট ছাড়াতে ছাড়াতে দু’টো গালাগাল, প্লাস্টিক-পানা-নোংরা-ভর্তি মজা ইছামতির জল-বর্ডার দিয়ে মাল-পাস করার সময়ে বিএসএফ আর পাচারকারির দর-কষাকষি-ঝগড়া-মারধোর, বড়জোর বিদেশের মাটিতে কম মজুরিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটাতে কন্ট্রাকটারদের বকাঝকা-গালাগাল – এই অবধি বুঝত এই কদম-ছাঁট-চুলের মানুষটা। সেরকম বকাঝকা-গালাগাল খেলে কীভাবে কী করতে হয়, ততটুকুও জানা ছিল। কিন্তু এই বিরাট ঝলমলে আলোর নিচে ঝাঁ-চকচকে এয়ারপোর্টের ওই টেবিলের ওপারের মানুষদের কী করলে, কী বললে ছাড়া পাওয়া যায় – তা আর কোনওভাবেই বুঝে উঠতে পারছিল না।

    পরপর অনেক প্রশ্ন আসছে খাজার দিকে। ওর অবস্থা আগের মতই। হাতে তাদের খাজার ভিসা-খানা। শুধু বোঝা যাচ্ছে – ভিসা দেখে দেখে প্রশ্নগুলো আসছে সামনে থেকে। সমস্ত অজানা শব্দের ভেতর এবার মনে হচ্ছে কিছু কিছু শব্দ খাজা মণ্ডল বুঝতে পারছে।

    কোম্পানির নাম? বারবার এই প্রশ্নটাই। তারপরের প্রশ্নগুলো অনুমান করে নিচ্ছে। বা আমার অনুমান, হয়তো ওখানেই কেউ খাজাকে ওর ভাষায় অনুবাদ করে বলে দিচ্ছিল, যতটুকু দরকার। এখন আর এত ডিটেলে বোঝাতে পারছে না খাজা। সে যেভাবেই বুঝুক আর অনুবাদ করে দিক – উত্তরদাতার কাছে কোনও উত্তর নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।
    কোম্পানিটা কোথায়? সে কোম্পানির ঠিকানা কী?
    বলতে বলতে ওই ভাঙা প্লাস্টিকের চেয়ারটা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিয়েছে খাজা মণ্ডল।
    ওরা পশ্ন করসে আর দেখেন আমি এরম দাঁড়িয়ে আছি ওইখানে।

    বলেই চুপ। মাঝে এক মিনিট মত থেমে রইল। ২০১৯-এর সেই দিন, বিদেশের এয়ারপোর্টে ওর অবস্থাটা বোঝানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আমাকে। যেন এই বড়বড়িয়ার মুসলিম-পাড়ার শাল-বাগানের সামনের উঠোন এক্ষুনি কোয়ালালামপুর এয়ারপোর্ট। আমি সেই বিদেশের ইমিগ্রেশন অফিসার। আমার সামনে কোনও টেবিল নেই। কিন্তু তবু যেন চেয়ার-টেবিল-ফাইলপত্র-ডেক্সটপ-ল্যাপটপ। প্রমাণ দিতেই হবে আমার কাছে – সেদিনের ওর হতভম্ব অবস্থার। আমার হাতে যেন খাজার ভিসা-খানা ধরা। খাজা মণ্ডলের চোখ আমার দিকে ড্যাব-ড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ঠোঁট, খোঁচা-খোঁচা দাড়ি-ভরা গাল, চোয়াল এমন শক্ত করে রেখেছে, যেন জোর করে এক্ষুনি কেউ কয়েকটা সেলোটেপের স্ট্রিপ আটকে দিয়েছে ওর মুখে। আধ মিনিট-এক মিনিট। আবার শুরু কথা।
    ওরা বলসে আর আমি এইভাবে দাঁড়ায়ে দাঁড়ায়ে শুনসি শুধু। কী বলব?
    এর পরের প্রশ্নটা অদ্ভুত। সেটা খাজার মুখের উচ্চারণে শোনাল আরও অদ্ভুত।
    কত ডোলার আছে সঙ্গে?
    ডলারের সঙ্গে টাকার হিসেবটা খাজার জানা ছিল কিনা জানিনা। সঙ্গে এটাও বুঝতে পারলাম না – ডলার থেকে মুখে মুখে কীভাবে সেটা টাকায় পরিণত হয়ে গেল?
    আমাকে পশ্ন করল ওরা, ত্রিশ হাজার টাকা সঙ্গে আছে?
    ওই ইমিগ্রেশন অফিসারদের সামনে এবার এয়ারপোর্টে খাজা মণ্ডলের মৌনব্রত ভাঙল। খাজা বলেছিল, আসে।
    সেই ত্রিশ হাজার টাকা তো সেলো আমার কাছে।
    চট করে আমার মনে পড়ে গেল, আগের রাতে সেই ভুবনেশ্বরের হোটেলের এজেন্টের দেওয়া ত্রিশ হাজার টাকার কথা।
    খাজা প্রশ্ন করেনি উল্টে। কেন? কী কারণে?

    টাকাটা পকেট থেকে বার করল। হয়তো গুনেছে আরও একবার। বা, না গুনেই টেবিলে রেখে দিয়েছে। জানিনা, ওই বাতানুকুল এয়ারপোর্টে, ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা যাচ্ছিল কিনা। এখন উঠে দাঁড়িয়ে পড়ায়, গামছাটা সরে গেছে বুক থেকে। গলা দিয়ে ঘাম গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছে ছেঁড়া স্যান্ডো-গেঞ্জির দিকে। টাকাটা দিয়ে দিল সবটা। কিন্তু কেন দিল, কি কারণে, কাদের হাতে দিয়ে দিল – সেটা আজ অবধি বোঝেনি। বুঝেছে বড়বড়িয়ার ওর প্রতিবেশী। যা বুঝেছে, আন্দাজ করেছে তার চেয়ে বেশি। তার প্রমাণ পেলাম সাথে সাথে। পাশ থেকে একজন বলে বসল, ঘুষ ঘুষ। ওসব দেশে ইমিগ্রেশন অফিসারেরা ঘুষ নেয় ওরকম। পাশ থেকে ‘হ্যাঁ হ্যাঁ’ করে আরও কয়েকটা গলায় সম্মতি শোনা গেল। দু’একজন বলল, না না। ওইটা তো ফিরতি টিকিটের দাম।

    ওদের কথায় কান না দিয়ে খাজা গম্ভীর মুখ নিয়ে, আমার দিকে সেরকমই বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল, টাকা যা সেলো দেলাম। ভাবলাম সাড়া পাবো এইবারডা।
    ওখানকার প্রশ্নপর্ব শেষ। ইমিগ্রেশন অফিসারের মন্তব্য করার পালা। তারপর শাস্তি শোনানোর। সেই কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে বিদেশি ইমিগ্রেশন অফিসার যেভাবেই বলুক না কেন, তার যতটুকু খাজা বুঝেছিল, এই আজকের শ্রাবণ মাসের দুপুরবেলা খাজার কণ্ঠে তার সারাংশ যা শোনা গেল সেটা এরকম, তোরা চুরাই ভিসা নিয়ে এদেশে এসেছিস। তোরা ঢুকবি এইভাবে, আর তারপর আর যাবিনে। এইভাবে কাজ করে যাবি এইখেনে। এই দেশে তুরা চোরাই পথে থেকে যাবি।
    চোরাই ভিসা মানে! আপনাদের ভিসাটা নকল ছিল নাকি?
    না। ওই ঘুরার ভিসা, ঘুরার ভিসা। কাজে গেলে যে ভিসা লাগে, সে সেলো না আমাদের কাসে।

    বুঝলাম, যে ভিসা নাড়ু দিয়েছিল – সেটা ট্যুরিস্ট ভিসা। মেয়াদ মাত্র ত্রিশ বা নব্বই দিন। কোনও এমপ্লয়মেন্ট ভিসা সঙ্গে নেই। কোম্পানির নাম বলেনি। কী কাজে, ঠিক কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে জানায়নি – যাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাদেরই।
    এরপর কী ঘটল, শোনার জন্য ভেতরে ভেতরে ব্যস্ত হয়ে গেছি। খাজা আরও কিসব বলে চলছিল। কথার মাঝেই থামিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, তারপর?
    তারপর ব্যাগ পত্র যা সেলো জমা নেয়ে নেল। টান মেরে সোজা নেয়ে গেল আমাকে।
    কোথায়?
    তখনও আমি একবিন্দুও আন্দাজ করতে পারছি না কোথায় নিয়ে যাচ্ছে ওকে। শুনলাম, যে গেটের সামনে নিয়ে দাঁড় করিয়ে দিল। গেটের ভেতর প্রচুর মানুষ। গাদাগাদি ভিড়।
    ওরা আমাকে পাছায় লাত্থি মেরে জেলে পুরে দিল।

  • কী! জেল! সেকী! কোন জেল?
    এয়ারপোর্টের ভেতরডাতেই জেলখানা আসে। সেইখানে।

    খাজার মন এরকম কোনও ডেস্টিনেশনের জন্য প্রস্তুত ছিল কিনা জানিনা, কিন্তু এই ডেস্টিনেশনের কথা শোনার জন্য আমার কান প্রস্তুত ছিল না একেবারে। চমকে উঠলাম। সুদখোরের কাছে চড়া সুদে লাখ টাকার উপর ধার, পাড়ার সুদখোরের গালাগাল শোনার জন্য নিজের বৌ বাচ্চাদের রেখে দিয়ে, লেবারের কাজের মজুরির জমানো টাকা খরচ করে, ভিন রাজ্যের কোনও হোটেলে দিনের পর দিন অপেক্ষার পর যে যাত্রা শুরু হয়েছিল সুদূর বিদেশের দিকে, সেরকম এক যাত্রার ডেস্টিনেশন যে এমন হতে পারে, বড়বড়িয়া না এলে অনুমান করতে পারতাম না।

    সেই পুলিশগুলো লাত্থি মেরে ঢুকেয়ে দেল আমাকে। সেইখানে একডা ঘর। তার ভেতরডাতে পাঁচশর উপরে লোক। এইভাবে ঠেসাঠেসি করে সবকটাকে এটকে রেখে দিয়েসে। গেদাগেদি করে বসা সব। কী গ্যাস গন্ধ ভিতরে! উঃ মাগো! মনে হচ্ছেল এই বমি করে দেলাম গো!
    কথাটা কোনওরকমে শেষ করেই “খো…য়া…ক…” শব্দ করে নিজের ডান পায়ের পাশে থুতু ফেলে নিল খানিকটা।

    গল্পটা শুনতে শুনতে কেমন একটা গন্ধ আসছিল আমার নাকে। খাজার থেকে মুখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলাম আমার পিছনে-ডানে-বাঁয়ে বেশ অনেক ভিড় জমে গেছে। এর মধ্যে ভিড়টা অনেকটা আমার চেয়ারের কাছে এগিয়ে এসেছে। একেবারে আমার গায়ের কাছে ভিড়। কেউ আমার চেয়ারের পিছনে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো। কেউ আমার মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে হাঁ করে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। যে স্ক্রিনে খাজা মণ্ডলকেই আবার ছোটো করে নড়েচড়ে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে ভিডিও রেকর্ডিংয়ে। কেউ খাজার কথায় হ্যাঁ… না… উঁ… উঁ … নানা ধ্বন্যাত্মক শব্দ করে চলেছে। কেউ ইতিমধ্যেই আওয়াজ করে, গলা খাঁকরে দু’একবার থুতু ফেলে নিয়েছে খাজার সঙ্গে সঙ্গেই। তাই অনেক রকম ঘামের গন্ধ আসছে নাকে।

    আপনার টাকাও নিল আবার জেলেও ভরে দিল?
    তখন খাজা মণ্ডল ঠিক আমার কোনও প্রশ্ন শোনার মত অবস্থায় নেই। টাকার কথাটা শুনতে পেল কিনা জানিনা, বলে চলল নিজের মত করে।
    ভিতরে ওই গেদাগেদি ভিড়ের ভেতর আমাকে ঠেলে ঢুকেয়ে দেল। আমি ঢুকে গেলাম চুপচাপ। আওয়াজডা করিনি কোনও। কী নোংরা ভেতরে! মেঝের মধ্যে ডললে ময়লা উঠে আসে চেটোয়। বসতে পারিনা গ্যাস-গন্ধে। একটাই পায়খানা ভিতরে। ওই পাঁচশ’ ছয়শ’ লোকের ওই একখানাই। তেমনি গ্যাস। কেউ কিছু মুখে আওয়াজ করতে পারবে না ওই জেলখানায়। যে একটু চেল্লাস্যে, লাত্থি মারসে আবার। না দেখলে বিশ্বাস যাবেন না! বুট হয় না বুট, বুট! ছেলেদের বুট। ওই ভারী ভারী বুট! ওই বুটজুতো দিয়ে যেইখানে পারসে লাথাস্যে। নাইলে ঝুলায়ে দেস্যে।
    সেকি!

    খাজা মণ্ডল একটু এগিয়ে আসছে সামনে।
    হাত দু’টো এইর'ম বেঁধে ঝুলায়ে দেস্যে, বলেই হাতদু’টো মুঠো করে, ক্রস করে আমার সামনে তুলে ধরে বলল, এইর’ম এইর’ম! বেঁধে ঝুলিয়ে দেস্যে উপর থেকে।
    আপনি দেখলেন ওরকম ঝুলতে?
    হ্যাঁ। আমি নিজে স্বয়ং দেখলাম। ওই ঘরডার মধ্যেই ঝোলাস্‌সে। বলসে, নে কত চিল্লাবি চিল্লা। আমি চুপডা করে বসে রইলাম ওইসবের মধ্যেই।

    ভুবনেশ্বরের হোটেলেও খাজা মণ্ডল ওই অচেনা এজেন্টদের আদেশ চুপচাপ শুনে গিয়েছিল। জানার ছিল অনেক কিছুই, তাও বলেনি একটা কথাও। আর এবার বিদেশের লক-আপে! যেখানে চোখের সামনে আওয়াজ করলেই ঝুলতে দেখা যায়, সেখানে এই খাজা মণ্ডলের মত এক লেবার – যে নাকি তার দালালকে কোন্‌ কোম্পানিতে কাজে যাচ্ছে, এ প্রশ্নটাও করতে ভয় পেয়েছিল – সে ওই বীভৎস, বদ্ধ জায়গাটাতে যে কতখানি নির্বাক হতে পারে, সেটা আন্দাজ করতে পারছিলাম।

    বলে চলল, এইরম পচুর ছেলে ওই জেলখানাডায়। ওই আমারই মতো সব লেবারি করতে গ্যাসে। ওই একই ঘুরার ভিসায় লেবারি করতে গ্যাসে ওই দেশে। পুলিসগুলাও বুঝতে পারে। কোনও কোম্পানির নামধাম নেই ভিসায়। সিলছাপ মারা নেই। ঠিক বোঝে ওরা, নিগঘাত চুরাই করে দেশে ঢুকে কাজ করবে। আর বেরোবে না দেশ ছেড়ে।
    শুনেন। পাশ থেকে অন্য একটা গলার স্বরে। সেই যুবক। ব্যাপারখানা বুঝিয়ে দিতে এগিয়ে এসেছে কিছুটা সামনে। শুনেন, এদের ড্রেস পত্র দেখলে তো বোঝা যায় এরা ঘুরতে আসেনি। লেবারি করতেই এসেছে। ঘুরতে এলে হোটেলের নাম কী কোথায় যাবে কিছু তো বলতে পারবে।

    খাজা এ কথায় আরও একটু উৎসাহ পেয়ে গেল। আবার বলতে শুরু করল, এবার কথার স্পিড আরও একটু বেড়ে গেল। যারা ঘুরার ভিসায় লেবারি করতে যায়, ওইর’ম বেশির ভাগডাকে ওই জেলাখানার ভিতর পুরে রেখে দেয়। যাদের কোম্পানির সিল ছাপ আছে, কাগজ আছে, তাদের ছাড়ে। বা কোম্পানির লোক যাদের নেতে আসে, তাদের সাথে ঝামেলা করে না। ভিসাটা দেখে ছেড়ে দেয়। আর ওই যারা কোম্পানির নামধাম কিসুই বলতে পারেনা, তাদের ওই জেলে পুরে রেখে দেয়। আমাদের নাড়ু তো কিছুই বলে নে। খালি বলসেলো, যা দেখবি কোম্পানির লোক দাঁড়ায়ে আসে।
    ঘুরার ভিসায় এইরম অনেকে ছেলে যায় কাজে। তাই বলে সবডারেই কী জেলে ঢুকায়? সবডারে জেলে ঢুকায় না। নসিব! নসিব! নসিব ভালো থাকলে বেরয়ে যায়। ওই কৃষ্ণনগরের ছেলেডার নসিবডা ভালো ছিল, ওরে খেয়াল করেনে কেউ। ওর আগে একটা কোন কোম্পানির কয়জন ছেলে সেলো। ওদের পেছন পেছন দলে দলে বেরায়ে গেল ও। আমি এটকে গেলাম। এই হল নসিব। একশ জন দেড়শ জনে একজন এইরমডা ছাড়া পায়।

    ভালো নসিব আর খারাপ নসিবের যে উদাহরণগুলো আমার সামনে দৃষ্টান্ত-স্বরূপ তুলে ধরা হল, তাতে ভালো আর মন্দ বিচার করা আমার পক্ষে কঠিন হল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই যুবকের কাছে কৃষ্ণনগরের ছেলেটির বাদবাকি মালয়েশিয়া ভ্রমণের বৃত্তান্তটুকু শুনলাম। বিদেশযাত্রী দুই লেবারের একজন বিদেশের লকআপে বন্দি হল। গাদাগাদি করে, দুর্গন্ধ-ভরা একখানা আশ্রয় পেল। আর বাকিজন এয়ারপোর্ট থেকে মুক্তি পেল। বেরোতে পারল বাইরে। মাথার উপর পেল মালয়েশিয়ার ঝকঝকে খোলা আকাশ। পাশ দিয়ে বড়-ছোট-মাঝারি গাড়ি চলে যাচ্ছে কোনও একটা দিকে। চকচকে প্লেন রাস্তা। ঝলমলে স্ট্রিট লাইট। ফ্লাইওভার। টুইন-টাওয়ার ঝকঝক করছে। কোয়ালালামপুর টাওয়ারে আলো জ্বলছে। মানুষ এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে চলে যাচ্ছে নানা দিকে। হোটেলের দিকে, কোম্পানির দিকে, কাজের আস্তানায়, হোস্টেলে, শ্যুটিং-এ। কেউ বাড়ি। ও যাবে কোথায়? রাস্তার কোন দিক ধরে হাঁটলে একখানা কাজ খুঁজে পাওয়া যায়? যে কাজের জন্য হয়তো জমি বেচে, সামান্য সম্বল মা-বৌয়ের নাকের ফুল-কানের দুল বেচে, চড়া সুদে ধারকর্জে এই দূরদেশে আসা। করবে কী? কোন কোম্পানি? কোম্পানির লোক কোথায়? খাবে কী? থাকবে কোথায়? খাজা যা যা জানে না, সেসব সে-ও জানে না। তিন দিন কোয়ালামপুরের আশপাশ ঘুরে বেড়াল। রাত কাটলো রাস্তায় রাস্তায়। কাজ খুঁজল। নতুন করে বিদেশি-দেশি দালাল খুঁজল। দালাল বা কাজ কোনওটাই জুটল না । আধাপেটা খেয়ে রাস্তায় দিন কাটল। ফেরত টিকিট কাটল। বিদেশে কাজে এসে বেকার হয়ে আবার দেশের দিকে যাত্রা করল। কীভাবে সেই ত্রিশ হাজার টাকা থেকে ডলারে টিকেট কাটা হল, আর জানা যায়নি। কারণ কৃষ্ণনগরের ছেলেটির সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়নি আমার। খাজার সহযাত্রীটি তিন রাত, তিন দিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোতে খাজার লাভ হল খানিক। সাবিনার কাছে ফোনে খবরটা অন্তত পৌঁছলো, যে খাজা এখন জেলে বন্দি।

    স্বামী বিদেশ গেছে সামান্য কিছু বেশি রোজগারের আশায়। সেটা কোন দেশ! লেবারের কাজে। কিন্তু কাজটা কী! জানা নেই ঠিক মত। মাথার উপর জঙে-খাওয়া টিনের চাল আর চড়া সুদে অনেক টাকা ধার। প্রতিদিন বাড়ছে একশ টাকায় পাঁচ টাকা হারে, ধার করা টাকার অঙ্কখানা। লেবারের বৌয়ের ওই সুইচওয়ালা ছোট্ট ফোনে স্বামীর এ ধরণের পৌঁছ-সংবাদে মুখের ভাবখানা ঠিক কেমন হয়েছিল, আন্দাজও করতে পারিনি।
    কদিন ছিলেন ওই লক আপে?
    তিন দিন সেলাম।
    খাওয়া দাওয়া করেছিলেন?
    ওই গ্যাস গন্ধে মানুষে খেতে পারে? দিয়েছিল খিচুড়ির মত একখানা কী! কী বলে ওইডাকে ওই খেপচা না থেপচা! মুখে তুলিনি এক দানাও। শুধু এক বোতল জল সেলো সাথে তিন দিন – ওই জল এক ঢোক করে গিলেছি। ওই ভেতরডাতে থাকা যায় না চিৎকার-চেঁচামেচি-গ্যাস গন্ধে! ওইখেনডাতেই মারসে, ওই খেনডাতেই ঝুলিয়ে রাখসে। কেউ কাতরেস্যে। কানসি বসে আমি। তিনদিন বসে সেলাম ওই ভাবেই। তিনদিন পর ওরা বার করলো ওই জেলখানা থেকে।

    তারপর?


  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ২৮ আগস্ট ২০২১ | ৬৪৮ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন