• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন 

    Bagchi P লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৪ জুলাই ২০২১ | ৩৩৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন : প্রবুদ্ধ বাগচী

    দৌহিত্রী নন্দিনী ও নন্দিতা (পুপে) র আবদার মেটাতে রবীন্দ্রনাথকে গল্প বানিয়ে যেতে হত অবিরত। সেসব গল্পের সঙ্গে থাকত ছবি, আজ যাকে আমরা বলি ইলাস্ট্রেশন। কবি নিজেই আঁকতেন সেইসব। আর গল্পের পান্ডুলিপির মধ্যে যখন অনিবার্য হয়ে উঠত কাটাকুটি তখন প্রতিভার আশ্চর্য পরশে সেইসব কাটাকুটি থেকেই জন্ম নিত একেকরকম আকার, নানারকমের ছবির আদল। সেইসব ছবির যে কোনো পূর্ব নির্ধারিত ছক আছে এমন নয়, নিতান্তই একটা তাৎক্ষণিক ভাবনা থেকে গড়ে উঠত এইসব ---- অথবা হয়তো তার পেছনে থেকে যেত গভীর কল্পনার কোনো খেয়ালখুশির ছন্দ, যাকে বলা যেতে পারে একরকম কল্পনার হিস্টিরিয়া। নিজের লেখা কবিতা বা অন্যান্য লেখার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছিলেন এক কাটাকুটির জগৎ। কে জানে, অবনীন্দ্রনাথ যখন একটা সময় কাটুম কুটুম এর নেশায় মেতে উঠেছিলেন, তার আড়ালেও থেকে গিয়েছিল কি না তাঁর রবিকাকার এই বিচিত্র জীবনভঙ্গি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে জানতে বা বুঝতে গেলে ওই কাটাকুটির খেলাগুলোকেও আমাদের খুঁটিয়ে দেখতে হয়। কারণ ওগুলোরই ভিতর দিয়ে ছুঁতে পারা যায় একজন স্রষ্টার মন। রবীন্দ্রনাথ মানে কবিতা গান উপন্যাস প্রবন্ধ ছবি এবং ওই কাটাকুটিগুলোও।

    তিনি যখন ‘গোরা’ লিখছিলেন তখন তার শেষ পর্যায়ে এসে সিস্টার নিবেদিতা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন পাণ্ডুলিপি বদল করে উপন্যাসের পরিণতি খানিক পাল্টে দেওয়ার। কে জানে, সেই অনুরোধ মাথায় রেখে তিনি পান্ডুলিপির অদলবদল করেছিলেন কি না। ‘গোরা’ র মূল পাণ্ডুলিপি বিশ্বভারতীর রবীন্দ্র ভবনে রক্ষিত আছে কি না আমার জানা নেই। তবে খুঁজে দেখলে নিশ্চয়ই দেখা যেত তার অবিকৃত পরিবর্তনের চেহারা। তবে ‘রক্তকরবী’ নাটকের যে অনেকগুলি পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়েছিল এটা আমরা জানি। বারবার বদল হয়েছে ওই নাটকের। সেই পরিবর্তনের নিশ্চয়ই একটা মনস্তত্ত্ব আছে। যারা সেই পাণ্ডুলিপি দেখেছেন, তার উপরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালিয়েছেন তাঁরা বলতে পারবেন সেই বিবর্তনের কথা। সম্ভবত, কলকাতার আকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের মিউজিয়ামে ‘রক্তকরবী’-র একটা পাণ্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে। যতদূর জানি, ‘ডাকঘর’ নাটকেরও পাণ্ডুলিপি পরিবর্তন হয়েছে --- একটা পান্ডুলিপিতে ‘সমুখে শান্তিপারাবার’ গানটিও সংযোজন করা হয়েছিল। পরে অবশ্য ছাপা হওয়ার সময় সেই পাণ্ডুলিপি অনুসরণ থেকে সরে এসেছিলেন নাট্যকার। এইসব প্রতিটি পরিবর্তনের পেছনে এক অন্তর্লীন ভাবনা নিশ্চয়ই গবেষণার উপজীব্য, কিন্তু পাশাপাশি ওই স্বহস্তে লিখিত পান্ডুলিপিগুলি নিজেরাই একেকটি দ্রষ্টব্যের ভূমিকা নিতে পারে। নেয়ও। তাই তাদের যত্নে সংরক্ষণ করে থাকি আমরা।

    আসলে লেখকের নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি তার সৃজন ও ব্যক্তিত্বের একটা অংশ বলেই যেন মনে হয় আমাদের। মনে পড়তে পারে, শিলাইদহ থেকে দিনের পর দিন ইন্দিরা দেবীকে ‘ছিন্নপত্র’-এর যে চিঠিগুলি লিখছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিশোরী ইন্দিরা মূল পান্ডুলিপিগুলিকে আগলে রেখে নিজে একটি খাতায় কপি করে নিচ্ছিলেন সেইগুলি। পরে ‘ছিন্নপত্র’ প্রকাশিত হয় ওই নকল করা খাতা থেকেই। বলা হয়, রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা এমনই এক নতুন ধাঁচের ছিল যা প্রায় পরের একশো বছর শিক্ষিত বাঙালির হাতের লেখাকে প্রভাবিত করেছে। ছেলেবেলায় আমরা যারা মা-বাবার কাছে লেখা শিখেছি, তারাও যেন অবচেতনে ওই রাবীন্দ্রিক আদলটাকেই সামনে পেয়েছি বলে মনে করতে পারি। ‘চারুলতা’ চলচ্চিত্রে ‘অমল’ চরিত্র করার সময় সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে পরিচালক পরামর্শ দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের মতো হাতের লেখা তৈরি করে নিতে। ছবিতে ঠিক সেই রকমটাই আমরা দেখি। সৌমিত্র লিখেছেন, এই ছবি করার পর থেকে তাঁর হাতের লেখার ওই ধাঁচটাই স্থায়ী হয়ে যায়। সত্যজিতের হস্তাক্ষরেও সাবেকি রাবীন্দ্রিকতার ছাপ আমাদের নজর এড়ায় না।

    জীবনানন্দ দাশের কবিতার পাণ্ডুলিপি যারা দেখেছেন তাঁরা জানিয়েছেন, অজস্র কাটাকুটির কথা। একটি শব্দ লিখছেন, আবার তা কেটে দিচ্ছেন, নতুন একটা শব্দ যোজনা করেও যেন তৃপ্ত নন, আবার তাকে কেটে দিচ্ছেন। এইসবের মধ্যে দিয়ে আলোড়িত এক কবিমনকে আমরা স্পর্শ করতে পারি। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গানের পাণ্ডুলিপি তুলনায় অনেক ঝকঝকে। অবশ্য আমরা এটা হলফ করে বলতে পারি না, কারণ যেটা প্রকাশ্যে এসেছে তার বাইরে কবির কোনো ধূসর পাণ্ডুলিপি থেকে গিয়েছিল কি না। জীবনানন্দের মৃত্যুর পরে তাঁর যেসব পাণ্ডুলিপি খুঁজে পাওয়া গেছে তার পাঠোদ্ধার করতে সমস্যা হয়েছে একথা জানিয়েছিলেন স্বয়ং ভূমেন্দ্র গুহ, যার অধিনায়কত্বে এই কাজ পরিচালিত হয়েছিল। ‘প্রতিক্ষণ’ প্রকাশিত রচনাবলীতে এমন কিছু উল্লেখ আছে, যেখানে মূল পাণ্ডুলিপির অস্পষ্টতার জন্য কোনো কোনো শব্দ বা বাক্য নিয়ে অনুমান করতে হয়েছে। এটা হস্তাক্ষরের ধাঁচের জন্যও হতে পারে।

    কিছুদিন আগে একটা আলোচনায় শুনেছিলাম, কার্ল মার্ক্সের হাতের লেখা নাকি ছিল খুবই খারাপ। ফলত, তার মৃত্যুর পরে যখন ‘ক্যাপিটাল’ এর তৃতীয় খন্ডের কাজ সম্পাদনা করছিলেন ফ্রেড্রিক এঙ্গেলস, তিনি নাকি যথেষ্ট সমস্যায় পড়েছিলেন। ইদানিং অনেক গবেষক দাবি করছেন, ওই খারাপ হাতের লেখার কারণে নাকি মার্ক্সের মূল লেখা থেকে ‘ক্যাপিটাল’ এর তৃতীয় খণ্ডে কিছু কিছু ভুল সম্পাদনা হয়েছে ---- তাদের বক্তব্য এঙ্গেলস নিজের মতো কিছু সংযোজন করে থাকতে পারেন। একজন গবেষক তো, মার্ক্সের ‘থিসিস অন ফয়েরবাখ’ এর মূল পাণ্ডুলিপি ও এঙ্গেলসের অনুবাদ পাশাপাশি রেখে দেখিয়ে দিয়েছেন এঙ্গেলস কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের মতো শব্দ ব্যবহার করেছেন। সব থেকে আশ্চর্য হল, ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটুট অফ সোশ্যাল হিস্ট্রি (আমস্টারডাম)-এর হেফাজতে থাকা মার্ক্সের মূল পান্ডুলিপির সঙ্গে পাওয়া গেছে তার দুশোটি নোটবুক। সেখানে কার্ল মার্ক্স বিভিন্ন বিষয়ে নোট লিখেছেন একই সঙ্গে একাধিক ভাষায়। হয়তো একটা বাক্য ইংরিজি, পরেরটাই জার্মান, তার পরেরটা গ্রীক বা ফরাসি ভাষায় --- কারণ তিনি নিজে সাত/আটটি ভাষা জানতেন। এও এক বিচিত্র পাণ্ডুলিপি, যার বিশ্লেষণে উঠে আসে এক অসম্ভব প্রতিভাধর মনীষার মানসজগত।

    বাংলা ভাষার লেখকদের মধ্যে শোনা যায় সুবোধ ঘোষের হাতের লেখা ছিল খুব খারাপ। প্রায় ছাপাখানার কর্মীকে দাঁড় করিয়ে রেখে পুজো সংখ্যার উপন্যাস বা গল্প একদম শেষ সময়ে লিখতেন তিনি। হতে পারে এই দ্রুততার জন্য হয়তো খারাপ হত হাতের লেখা। রমাপদ চৌধুরীর হাতের লেখা খুব স্পষ্ট ছিল না, যদিও তাঁর লেখায় কোনো তাড়াহুড়োর ব্যাপার ছিল না ---- তিনিই সেই বিরল লেখক যিনি বছরে একটা উপন্যাস লিখতেন, আর কোনো অনুরোধ কানে তুলতেন না। বাংলা ভাষার কিছু কবিদের নিজেদের মূল পাণ্ডুলিপি নিয়ে একসময় একটা কবিতা সংকলন ছাপা হয়েছিল ---- ‘নিজ হাতে, নিজস্ব ভাষায়’ শিরোনামে ---- সেই বই এখন আর পাওয়া যায় কি না জানি না। তবে তাতে অনেকের হাতের লেখা দেখা গিয়েছিল, এই দেখবার একটা আকর্ষণ আছে বইকি। ছাপার অক্ষরের বাইরে প্রিয় কবি বা লেখকের নিজের হাতের লেখা কেমন, পাঠকের কাছে সেটা একটা আগ্রহের উপাদান।

    আরও পড়ুন
    মালিক - Chayan Samaddar


    ঘটনাচক্রে, বাংলা কবিতার উল্লেখ্য তিনজনের পাণ্ডুলিপি আমার স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে ---- অরুণ মিত্র, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। সকলেরই পাণ্ডুলিপি খুব সুন্দর। আর দেখেছি অশোক মিত্রের কিছু চিঠিপত্র, তখন শারীরিক কারণে উনি ঠিকমতো কলম ধরতে পারতেন না বলে লেখার ধাঁচ বেশ খারাপ হয়ে গেছে। বুদ্ধদেব বসু বা বিষ্ণু দে-র পাণ্ডুলিপি তাঁদের পরিবারের পক্ষে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না জানি না, তবে উত্তরকালের কাছে তা অবশ্যই দেখবার মতো বিষয় হতে পারত। বছর কয়েক আগে (সম্ভবত ২০১০) তাঁর মেয়ে জুজু-কে লেখা সমর সেনের কিছু চিঠি ও ডায়েরির অংশ দে’জ প্রকাশনা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে, তাতে সমর সেনের লেখার সামান্য কিছু দৃষ্টান্ত ছাপা হয়েছিল বলে মনে পড়ছে। এই ধরনের প্রকাশনায় লেখকের পাণ্ডুলিপির অংশ বিশেষ ছাপলে প্রকাশনাটির মর্যাদা বাড়ে।

    অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে যারা চর্চা করেন তাদের মতে, ব্যক্তি মানুষের হাতের লেখায় তাঁর মনের ধরন বোঝা সম্ভব। এটা সারা বিশ্বেই প্রমাণিত সত্য। আজও কোথাও অপরাধ সংগঠিত হলে তদন্তকারীরা সম্ভাব্য অপরাধীর কোনো হাতের লেখার নমুনা সংগ্রহ করতে ভুল করেন না। তবে আমরা যে সৃজনশীল মানুষদের কথা ভাবছি, অপরাধ নয়, তাদের লেখার মধ্যে নিশ্চয়ই তাঁর কিছু মনের উপাদান খুঁজে পাওয়া অসম্ভব নয়। আবার ব্যক্তি মানুষের নিজের হাতের লেখার একটা বিবর্তন থাকে। আমরা ছোটবেলায় যখন লিখতে শিখেছি তখন যেভাবে যেসব অক্ষর লিখতাম আজ আর হয়তো সেইভাবে লিখি না। লেখা পাল্টে পাল্টে যায়। তারপর বয়সকালের মতোই তার একটা পরিণত চেহারা তৈরি হয়।

    কিন্তু পাণ্ডুলিপি বা হাতের লেখা নিয়ে আজ এত কথা বলার প্রয়োজন হয়ে পড়ল একটাই কারণে যে গত কয়েক দশকে এই পান্ডুলিপির জগতে এক যুগান্তর ঘটে গেছে। শুরুটা হয়েছিল অবশ্যই ইংরিজিতে। যারা ইংরিজি ভাষায় লেখালিখি করেন তাঁদের একটা অংশ নিজেদের হাতে লেখা কপি টাইপ করে প্রকাশকের কাছে পাঠাতেন। মনে থাকতে পারে, নবনীতা দেবসেন লিখেছিলেন আফ্রিকান লেখিকা নাদিন গার্ডিমারের সঙ্গে তাঁর প্রথম সাক্ষাতের বিবরণ ---- নিজের লেখার ঘরে লেখিকা তখন টাইপ রাইটারে বসে লিখছিলেন। যদিও বিজ্ঞান বা সমাজবিদ্যার গবেষণার ক্ষেত্রে থিসিস টাইপ করে জমা দেওয়াটাই ছিল রীতি, টাইপ করা পাণ্ডুলিপি ছাড়া তা প্রকাশযোগ্য বিবেচিত হত না। আজও হয় না। এমনকি, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে যারা গবেষণা করেন তাঁদেরও নিজেদের গবেষণা সন্দর্ভ বাংলায় টাইপ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দিতে হয়। তবে অবশ্যই গবেষণাপত্র কোনো সৃজন সাহিত্যের আওতায় আসে না।

    টাইপ রাইটার যন্ত্রটি আজ সারা পৃথিবী থেকেই অবলুপ্ত, তার জায়গা নিয়েছে কম্পিউটার ---- ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ। সুবিধের দিক দিয়ে ল্যাপটপ আরো এগিয়ে কারণ একেবারে হাল্কা এই যন্ত্র নিয়ে শুয়ে বসে সব রকম ভাবে কাজ করা যায়। এর সঙ্গে জুড়ে নিতে হবে ল্যাপটপে ব্যবহারযোগ্য বাংলা ভাষার কীবোর্ড-এর কথা, যে বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা আমাদের প্রতিবেশী বাংলাদেশের তরুণ প্রযুক্তিবিদদের। এখন খুব সহজে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপ বা ইদানিং স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে দিব্যি বাংলা লেখা যায়। প্রযুক্তির এই দিগ্বিজয় আসলে মুছিয়ে দিল পাণ্ডুলিপির সেই সোঁদা মাটির দুনিয়া। নিছক দু-চারটে বাক্যের মেসেজ লেখা নয় বাংলা ভাষায় হ্রস্ব-দীর্ঘ সব ধরনের লেখালিখিই ক্রমশ অবাধ ও সাবলীল হয়ে উঠেছে ল্যাপটপের মধ্যবর্তিতায়। এটা একটা উল্লম্ফন, এটা এক যুগান্তর। মুঠোফোনের সর্বজনীন হয়ে ওঠায় আমরা যেমন চিঠি লেখা ভুলে গেছি, তেমনি সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও আজ ল্যাপটপ আর বাংলা সফটওয়ার আমাদের প্রতিদিনের অঙ্গ হয়ে উঠেছে আজ এই যুগমুহূর্তে ।

    তসলিমা নাসরিন যখন লিখতে শুরু করেন শুনেছিলাম তিনি নাকি কম্পিউটারেই লেখেন। পরে শুনেছি ল্যাপটপ নাকি তাঁর একটা পরম আগ্রহের বিষয়, তাঁর নিজেরই নাকি দশ দশটি ল্যাপটপ আছে। এই জনশ্রুতি সত্যি কিনা খতিয়ে দেখিনি তবে তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ যখন এই রাজ্যে ‘নিষিদ্ধ’ ঘোষিত হয় তখন খুব দ্রুত তিনি তাঁর লেখাটি ইন্টারনেটে আপলোড করে দেন ---- সেটা কোনো হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি ছিল না। কার্যত ওই বইটি সেই সূত্রেই পড়া হয়ে যায়। যতদূর জানি, বাংলা ভাষার নবীন লেখকরাও আজ আর কাগজ কলম ব্যবহার করেন না। বাংলা সংবাদপত্রের সাংবাদিকরাও আর সেই আগের মতো নিউজপ্রিন্টের লম্বা প্যাডে নিজেদের প্রতিবেদন লিখে ছাপাখানায় পাঠান না। সবটাই প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রিত। তবে নিশ্চয়ই সব লেখকরাই প্রযুক্তি ব্যবহারে দড় এমন ভাবার কোনো কারণ নেই, কেউ কেউ এখনো হয়তো কাগজে কলমেই লেখেন, তাতে কাটাকুটি করেন। আমরা ছোট থেকেই শুনে এসেছি --- কালি কলম মন / লেখে তিনজন। তবে এই প্রবাদবাক্যও আজ একটু একটু করে ফিকে হতে আরম্ভ করেছে। ভাল মন্দ যাই হোক কালি কলম ছাড়াই দিব্যি লেখা হয়ে চলেছে।

    গত দেড় দুই বছরে কোভিড মহামারী হাতে লেখা পান্ডুলিপির প্রায় একরকম অন্তর্জলি যাত্রাই ঘটিয়ে দিয়েছে বলা যায়। পত্র-পত্রিকার ছাপা হওয়া সংখ্যার পালে আর বাতাস নেই। অনেক নামী পত্রিকা ছাপা মাধ্যম ছেড়ে চলে এসেছে ডিজিটাল পরিসরে। প্রচুর প্রচুর লেখা প্রকাশ হয়ে চলেছে ডিজিটাল দুনিয়ায় --- গল্প উপন্যাস কবিতা নিবন্ধ রাজনৈতিক প্রতিবেদন সব রকম লেখা হাতের মুঠোয় চলে আসছে নানা পোর্টালে ভর করে। আর এইসব পোর্টালের কর্তৃপক্ষ বাধ্যত চাইছেন ডিজিটাল পাণ্ডুলিপি, কারণ খুব সহজে তা সম্পাদনা করে প্রকাশ করে ফেলা যায়। নামী সমস্ত বাংলা সংবাদপত্রে পাঠকের চিঠি থেকে উত্তর সম্পাদকীয় সবই বলা হচ্ছে ডিজিটাল ফরম্যাটে জমা করে দিতে। হাতে লেখা পান্ডুলিপির থেকে যুগের দাবি বড় কঠিন আর তীব্র। আমরাও যারা একটু আধটু লেখা মকশো করি তারাও যেন কেমন করে ভুলে গেছি কলম আর কাগজকে । পাণ্ডুলিপি, সেই কাগজের ওপর বিচিত্র কালি দিয়ে লেখা পাণ্ডুলিপি, নতুন কলমের নতুন গন্ধে ঝকঝকে মসৃণ কাগজের ওপর যত্নে লেখা একেকটা শব্দ-বাক্য যেন এক ধূসর অতীত। আমাদের ডিজিটাল পান্ডুলিপিতে কোনো কাটাকুটি নেই, ভুল হলে বা কিছু বদলালে তা তো সহজেই মাউস আর কী বোর্ডের কেরামতিতে পাল্টে নেওয়া যায় এমনভাবে যাতে তার কোনো স্বাক্ষর আর পড়ে না থাকে। প্রযুক্তি এমনই নিষ্ঠুরভাবে উজ্জ্বল।

    ফ্রান্স কাফকা নিজেই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি, আর বন্ধু ম্যাক্স ব্রডকে বলে গিয়েছিলেন তাঁর মৃত্যুর পরে বাকি সব পাণ্ডুলিপি ধ্বংস করে দিতে। কার্যত অবশ্য বন্ধু ব্রড তা করেন নি। এই বাংলায় মৃণাল সেন ইচ্ছাপত্র করে গিয়েছিলেন তাঁর প্রয়াণের পর তাঁর লেখাপত্র যেন নষ্ট করে দেওয়া হয়। কেন তাঁরা এমন ভাবেন জানি না। মানুষ তো অমৃতের পুত্র --- তাই সে অমরত্বের পিয়াসী। আর সেই অমরতাকে কখনো কখনো ছুঁয়ে থাকা যায় তার সেই পান্ডুলিপির সাহচর্যে। প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে লিপ্ত থাকে এক ধরনের আবেগ, প্রতিটি শব্দের সঙ্গে অন্বিত হয়ে থাকে লেখকের আত্মার একটা টুকরো। পান্ডুলিপির কাটাছেঁড়ার মধ্য দিয়ে উঁকি দেয় স্রষ্টার মন। কাগজে কলমের সহবাসে জেগে ওঠে নতুন পৃথিবীর কত অব্যক্ত কথা। শাজাহান বাদশার দিন গিয়েছে, দিন গিয়েছে সেই নরম পান্ডুলিপির।

    কখনো মনে হয় দিনাবসানে, প্রিয়ার কোলের মতো সেই পান্ডুলিপির গায়ে মাথা রাখি। এক টুকরো কাগজে লিখে রাখি সুখ দুঃখ জীবন মৃত্যু বিষ অমৃত। মধু মাঝির ওই নৌকাখানির মতোই কারো কাজে না লাগলেও ওটাই না হয় বাঁধা থাকল এই নশ্বর জীবনের পারঘাটায়।
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৪ জুলাই ২০২১ | ৩৩৩ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২৮ জুলাই ২০২১ ০৭:০৬496151
  • দারুণ লেখা। সত্যিই কি অনাদরে টুপ করে খসে গেল কলম। 


    সৈয়দ শামসুল হকের মতো আগামীতে আর কোনো লেখক হয়ত বলবেন না, "কলম হয়ে উঠল আমাদের ছয় নম্বর আঙুল!" 


    তবু মুক্তমনা শিক্ষ্ক অভিজিৎ রায় বেঘোরে খুন হলে হ্যাস ট্যাগে লিখেছি, কলম চলবেই! প্রতীকী, আসলে পড়তে হবে - কি বোর্ড চলবেই

  • বিপ্লব রহমান | ২৮ জুলাই ২০২১ ০৭:১১496152
  • পুনশ্চ : ইচ্ছে করলে লগইন এর ঘরে গিয়ে "ব্যবহারকারি " খোপে নিজের নাম সম্পাদনা করে বাংলায় লিখে নিতে পারেন। 


    আরো লিখুন 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন