• হরিদাস পাল  আলোচনা  পরিবেশ

  • করোনা, পরিবেশ ও সমাজতন্ত্র  

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | পরিবেশ | ২৬ জুন ২০২১ | ২৬০ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • বেশ সপ্রতিভ লোকদের মুখে কথাটা মাঝে মাঝে শুনতাম প্রবাদের মত। কথাটার অস্যার্থ আপনি যদি কুড়ি বছর বয়সে সমাজতন্ত্রী না হন তাহলে আপনার হৃদয় নেই আর আপনি যদি ত্রিশ বছরেও সমাজতন্ত্রী থাকেন তাহলে আপনার মস্তিষ্ক নেই (অনেকসময় সমাজতন্ত্রী শব্দটার বদলে কম্যুনিস্ট শব্দটার ব্যবহারও দেখেছি)। বার্ণাড শ, চার্চিল থেকে আরো অনেকের নামে উক্তিটা চললেও এর সঠিক উৎস কেউ বোধহয় জানেন না। নিশ্চয়ই কোনো ধুরন্ধর সমাজতন্ত্র বিরোধীর মস্তিষ্ক থেকে এটা বেরিয়েছিলো। তবে জোকস অ্যাপার্ট, আমার নিজের জীবনে, একটু বয়স হলেই বাম মতাদর্শের ঝাঁঝ কমে আসাটা অনেকের ক্ষেত্রেই দেখছি। চারু মজুমদার, লিন পিয়াও থেকে শ্রীরামকৃষ্ণ বা শ্রীঅরবিন্দে পৌঁছে যাওয়া, শ্রেণী রাজনীতি ছেড়ে গান্ধীবাদের শরণ নেওয়া ইত্যাদি এক্কেবারে জলভাত এখন। এখন নিজের কথা বলতে গেলে বলতে হয়, আমার ইমিউনিটি রেসপন্স বরাবরই কম। এত বড় ঝাঁকুনি সহ্য করার ক্ষমতা নেই বলেই বোধহয় অল্প বয়সেও খুব বেশি বাম ছিলাম না। তাই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে টুক করে আরেকটু ডানদিকে সরে এসে পেটি বুর্জোয়া জীবনযাপনে সুখে শান্তিতে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো এমন ধান্দাই করেছিলাম বটে। এমনিতেও আমাদের মধ্যে মধ্যবিত্ত ঘোষিত বামপন্থীরা মাঝে মাঝে ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ গাইলেও কী ওভারকাম করব তা সাধারণত জানি না। সিস্টেমের সঙ্গে আমরা এতটাই ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত যে এর কোনো ‘বাহির’ আমরা দেখতে পাই না। এখন কিন্তু এই করোনা এসে আমার সব হিসেব গুলিয়ে দিলো। যা বুঝছি, বুর্জোয়া হতে চেয়ে, একা একা নিজের স্বার্থ গুছিয়ে আর বেশিদিন বাঁচতে পারবো না। আমাকে বুড়ো বয়সেও সমাজতন্ত্রীই হতে হবে। সেই সঙ্গে পরিবেশের কথাও ভাবতে হবে। এককথায় হতে হবে ইকো-সোশ্যালিস্ট।

    এখন প্রশ্ন হচ্ছে কী কারণে আমার মত লোকদের এই শ্মশ্মান বৈরাগ্য, সমাজতন্ত্রের গুণকীর্তন? ব্যাপারটা ঐ ঠেলার নাম বাবাজী ছাড়া আর কী কিংবা ঠেকে শেখা যাকে বলে। করোনা ভাইরাস উদ্ভুত সংকটকে বুঝতে গিয়ে দেখলাম এটাকে স্রেফ একটা রোগ হিসেবে দেখা ভাবের ঘরে চুরি ছাড়া কিছুই নয়। পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রকে ধরে যেভাবে ঝাঁকানি দিচ্ছি আমরা তাতে এরকম আরো অনেক রোগ, বিপর্যয় এবং মহামারী আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে। আর বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে যে বিপর্যয় অদূর ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে তার কাছে এই বিপদ তো কিছুই না। আসলে আমরা পৃথিবী নামক এই গ্রহের জন্য এক জরুরী অবস্থার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। কতটা জরুরী? পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যদি ২ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড বাড়ে তাহলেই আমরা এক অনিবারণযোগ্য মহাপ্রলয়ের চৌকাঠ অতিক্রম করে যাবো এটা আমরা এখন জানি। জানি কিন্তু খেয়াল রাখিনা। পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে কার্বনের ঘনত্ব ৪৫০ পিপিএম (পার্টস পার মিলিয়ন) পৌঁছোলে মহাবিপদ। বর্তমানে তা ৪১৫ পিপিএম। এটাকে ১৯৫০ সালের জায়গায় অর্থাৎ ৩৫০ পিপি এমে নিয়ে যাওয়ার জন্য রাষ্ট্রসংঘের ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) সুপারিশ করেছে। এরজন্য ২০১০ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরলে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে ৪৫ শতাংশ আর ২০৫০ সালের মধ্যে এটাকে ১০০ শতাংশ কমিয়ে শূণ্যতে নিয়ে যেতে হবে। শুধু তাই নয় ১৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন কার্বনকে শুষে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে বৃক্ষরোপন, বনাঞ্চল বৃদ্ধি, সঠিক ভূমিব্যবহার এবং প্রযুক্তির সাহায্যে।একটা সময় আমরা ভয় পেতাম কয়লা, তেল, গ্যাস ইতাদি ফসিল ফুয়েল বোধহয় ফুরিয়ে যাবে। এখন উলটো ভয় মাটির তলায় যে ২.৮ গিগাটন কার্বনসমৃদ্ধ ফুয়েল রয়েছে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তা গোটাটাই না ব্যবহার করে ফেলে। অবশ্য তার আগেই পৃথিবী ধ্বংসের দিকে চলে যাবে। কারণ এর সঙ্গে আছে মহাসাগরের অ্যাসিডিভবন, ওজোন স্তরের ধ্বংস, জৈববৈচিত্রের বিলোপ, ভূমিস্তরের ক্ষয়,ব্যবহার্য জলের অভাব এবং রাসায়নিক দূষণ।

    এসব মন খারাপ করা খবর আমরা পড়িনি যে তা নয় কিন্তু ভেবেছি পুঁজিবাদ এসব ঠিক সামলে নেবে তার বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি দিয়ে। এমনকি ‘সবুজ পুঁজিবাদ’ বলে একটা টার্মও চালু হয়েছে। এই ধারণায় কার্বন নিঃসরণের ওপর আরো কর বসাতে হবে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও গবেষণায় আরো খরচ করতে হবে কিন্তু ব্যবস্থার কোনো মৌলিক পরিবর্তন না করলেও চলবে। বারাক ওবামাই ছিলেন এই মতের পথিক। কিন্তু পরিবেশ দূষণের বিষয়টি পুঁজিবাদী অর্থনীতির ‘বৃদ্ধি’ র ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত। এক পরিবেশবিদের ভাষায় “কোনো মানুষকে যেমন শ্বাসপ্রশ্বাস নেওয়া বন্ধ করানো যায় না পুঁজিবাদকেও তেমনি বৃদ্ধির হারকে সীমায়িত করার জন্য রাজি করানো যায় না”। অনিয়ন্ত্রিত এই বৃদ্ধির পিছনে, আরো পুঁজির সঞ্চয়ের পিছনে ছুটে চলাই পুঁজিবাদের নিয়তি। এর সঙ্গে পরিবেশচিন্তার মৌলিক বিরোধ আছে। কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে সেঁধিয়ে আছে বাড়তি, অনাবশ্যক,অপ্রয়োজনীয় উৎপাদন যা জন্ম দেয় অর্থনৈতিক বর্জ্যের । এই অপ্রয়োজনীয় উৎপাদনকে ছেঁটে ফেলতে হলে চাই সামাজিক পরিকল্পনা, অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের সংযুক্ত উৎপাদক (associated producers) এবং বৃদ্ধির ধারণাকে প্রত্যাহার। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় তা সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্রের ধারণার মধ্যেই একমাত্র এর প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। বিংশ শতকে যে সমাজতন্ত্রের অনুশীলন আমরা দেখে এসেছি সেখানেও এ সমস্ত বিষয় ছিল অবহেলিত। কিন্তু এটাও সত্যি, একমাত্র সমাজতান্ত্রিক ধারণার মধ্যে, সামাজিক পরিকল্পনার মধ্যেই এর সমাধান নিহিত রয়েছে, অন্য কোথাও নয়। হতে পারে সেটার নাম ইকো-সোশ্যালিজম। হতে পারে সেটা একুশ শতকের সমাজতন্ত্র।তাই আমি আগে নিজেকে লিবারাল বুর্জোয়া ভাবতে ভালোবাসতাম বটে কিন্তু এখন সমাজতন্ত্র ছাড়া অন্য কিছু ভাবতেই পারছি না। এই ভাবনার জন্য বেশি তত্বচর্চা বা বুদ্ধির দরকার নেই। নেহাত কাণ্ডজ্ঞান থাকলেই হবে।তবে সেটার অভাবই পৃথিবীর বহু রাষ্ট্রনায়ক ও তাদের ভক্তদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে এটাই আশঙ্কার।
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৬ জুন ২০২১ | ২৬০ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
ছাদ - Nirmalya Nag
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন