• হরিদাস পাল  লিঙ্গরাজনীতি

  •  বহু বাসনায় প্রাণপণে  চাই  

    Sandipan Majumder লেখকের গ্রাহক হোন
    লিঙ্গরাজনীতি | ১৬ জুন ২০২১ | ৪২৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • পঞ্চশরে দগ্ধ করে করেছ একি সন্ন্যাসী,
    বিশ্বময় দিয়েছ তারে ছড়ায়ে!

    (মদনভস্মের পর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর )

    ভারতীয় পুরাণ অনুসারে কামদেবের অপর নাম অনঙ্গ (অঙ্গহীন)। তারকাসুরের দ্বারা উৎপীড়িত হয়ে দেবতারা প্রজাপতি ব্রহ্মার শরণাপন্ন হলে তিনি কামদেব বা মদনকে প্রেরণ করেন শিবের যোগনিদ্রা ভাঙানোর জন্য কারণ শিব ও পার্বতীর সন্তানই শুধু তারকাসুরকে বধ করতে সমর্থ। কামদেব তাঁর পঞ্চশর সন্ধান করতেই তা দেখে শিবের ক্রোধ জন্মায় এবং তাঁর তৃতীয় নেত্র থেকে আগুন নির্গত হয়ে কামদেবকে ভস্ম করে। পরে শিব শান্ত হলে কামদেব তাঁর প্রাণ ফিরে পান কিন্তু অঙ্গহীন থেকে যান। ভারতে তাই বুঝি কাম শুধু শরীর কেন্দ্রিক নয়। বাৎসায়নের কামসূত্রে চৌষট্টি কলার মধ্যে নৃত্য, গীত, বাদ্যের চর্চা থেকে পুস্তক পাঠ, সবকিছুকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে যদিও কামসূত্র পুরুষের দৃষ্টিতেই লেখা। কিন্তু ত্রিবর্গের সাধনায় ধর্ম ও অর্থের সঙ্গে কামকে সমগুরুত্ব দেওয়া এবং কামকে শুধু শরীরকেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না রেখে বাসনায় (Desire) উত্তরিত করায় বাৎসায়নের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। মনে রাখতে হবে এই গ্রন্থের রচনাকাল আজ থেকে অন্তত আঠারশ বছর আগে।

    বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মে গৃহস্থের বিবাহ, সন্তান (বিশেষত পুত্রসন্তান) উৎপাদন অবশ্যকরণীয় কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। এ ব্যাপারে নারদ মুনির সঙ্গে রাজা হরিশ্চন্দ্রের একটি কথোকথনে নারদের বিবাহের পক্ষে সওয়াল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মে ব্রহ্মচর্যের গুরুত্ব খুব বেশি ছিল শ্রমণদের মধ্যে। পাশাপাশি সীমিত ব্রহ্মচর্যর ধারণা হিন্দু ধর্মেও চলে আসে। যেমন মনুসং হিতায় স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মিলনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিনকে নানা কারণে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু অবশিষ্ট অনুমোদিত দিনগুলিতে মিলিত হলেও ব্রহ্মচর্য্যের কোনো হানি হয় না – এরকম দাবি করা হয়েছে। যেমন মনুসং হিতার এই শ্লোকটি — “যিনি পূর্বোক্ত নিন্দিত ছয় রাত্রি ও তদব্যতিরিক্ত অনিন্দিত অষ্ট রাত্রি এই চতুর্দ্দশ রাত্রিতে স্ত্রী-সংসর্গ পরিত্যাগ করিয়া অবশিষ্ট পর্ব্ব-বর্জ্জিত দুই রাত্রিতে স্ত্রী সংসর্গ করেন, তিনি যে কোন আশ্রমবাসী হউন না কেন, তাঁহার ব্রহ্মচর্য্যের হানি হয় না“ ( ৫০নং শ্লোক, বানান মূল অনুসারী)। এখানে অবশ্য কামশাস্ত্রের মত নিছক আনন্দর সন্ধান মিলনের উদ্দেশ্য নয়, নেহাতই ‘পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা’র মতই মিলনের উদ্দেশ্য এখানে কেজো বা যান্ত্রিক। পরবর্তীকালে শংকরাচার্য প্রতিষ্ঠিত মঠ বা আখড়ার সন্ন্যাসীদের ব্রহ্মচর্য পালন ছিল আবশ্যকীয়। তন্ত্রসাধনা, হঠযোগ, অভিনবগুপ্তদের দক্ষিণাচারী তন্ত্র, বিবেকানন্দ নির্দেশিত কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ — এসবের মধ্যে বীর্যরক্ষা, উর্ধ্বরেতা হওয়ার প্রচেষ্টা, ব্রহ্মচর্য এসবের ধারণা বিভিন্ন জায়গায় মিলেমিশে আছে। আসলে মানুষের বাসনার (Desire) এক বিস্তৃত দিগন্ত আছে। সেখানে কামসূত্র যেমন সত্য, কামহীনতাও সত্য। সমকাম যেমন সত্য, বিষমকামও তেমন সত্য। ভারতবর্ষ তার সংস্কৃতিতে, চিত্রে, ভাস্কর্যে এই ধারণাকেই স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে।

    ১৯৯৮ সালে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো প্রেস থেকে জেফ্রে জে ক্রিপাল রচিত ‘Kali’s Child: The Mystical and the Erotic in the Life and Teachings of Ramkrishna’ বইটি প্রকাশিত হয়। বিবেকানন্দ বিদেশে মূলত অদ্বৈত বেদান্তর তত্বই প্রচার করেছেন। কিন্তু কৃপাল রামকৃষ্ণ দর্শনের তান্ত্রিক সংসর্গর ওপর জোর দেন। কিন্তু রামকৃষ্ণদেব যে তন্ত্রসাধনা করলেও তার পঞ্চম ‘মকার’ অর্থাৎ মৈথুন থেকে বিরত ছিলেন সেটা আমরা জানি। এবার এর কারণ খুঁজতে গিয়ে ক্রিপাল রামকৃষ্ণদেবের Homo-erotic impulses এর কথা বলে অগ্নিকাণ্ডটি ঘটালেন। দেশ বিদেশে নিন্দার ঝড় তুললেন রামকৃষ্ণদেবের অনুরাগীরা। কলকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় নরসিংহ শীল পাতাজোড়া সমালোচনায় ‘Sloppy, sensationalist, scandal-mongering scholar’ বলে ক্রিপালকে আক্রমণ করলেন। এই সমালোচনার পরে পত্রিকায় যত পাঠকের চিঠি এসেছিল এবং প্রকাশিত হয়েছিল তা নাকি পত্রিকার ১২৩ বছরের ইতিহাসে একটা রেকর্ড। এর পর থেকে নিন্দার ঝড়ে আর অলিখিত সেনসরশিপের চাপে বইটি প্রায় নিষিদ্ধ বস্তুতে পরিণত হয়। কিন্তু একটু ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে ভাবলে এই নিয়ে ভক্তদের এত ক্রোধান্বিত হওয়ার কারণ পাওয়া যায় না। রামকৃষ্ণ কথামৃত জুড়েই বিষমকামী যৌনতার প্রতি তাঁর বীতরাগ ছত্রে ছত্রে প্রকাশিত। একই সঙ্গে নারীসত্তায় উত্তরিত হওয়ার বাসনাকে তিনি মহিমান্বিত করেন - ‘জিতেন্দ্রিয় হওয়া যায় কিরকম করে? আপনাতে মেয়ের ভাব আরোপ করতে হয়। আমি অনেকদিন সখীভাবে ছিলাম। মেয়েমানুষের কাপড়, গয়না পতুম, ওড়না গায়ে দিতুম। ওড়না গায়ে দিয়ে আরতি করতুম। তা না হলে পরিবারকে আট মাস কাছে এনে রেখেছিলাম কেমন করে? দুজনেই মার সখী!’ (রামকৃষ্ণ কথামৃত, অখণ্ড সংস্করণ, উদবোধন, পৃষ্ঠা ৬৩৫)। আসলে ভক্তরা দুটো কথা বোঝেন নি। প্রথমত হোমো-ইরোটিক ইমপালস থাকা মানেই শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হওয়া নয়। দ্বিতীয়ত, কারো মধ্যে ‘প্রকৃতিভাব’ থাকা বা হোমো ইরোটিক ইমপালস থাকলে সেটা কোনো অপরাধ বা ত্রুটি নয় এবং তার দ্বারা তাঁরা অন্য কোনো মহৎ ভাবের কোনো হানি হয় না। রামকৃষ্ণদেব নিজেই তাঁর প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্র প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ওর মদ্দের ভাব (পুরুষভাব) আর আমার মেদীভাব (প্রকৃতিভাব)’ [ঐ, পৃষ্ঠা ৭৩২]। অধিকন্তু, রামকৃষ্ণ কথামৃতর মধ্যে তাঁর এই প্রবণতার কিছু উদাহরণও আছে ( ঐ, পৃ ৮৭২ এবং ৮৭৩ এর কিছু লাইন)। মজার ব্যাপার হল রামকৃষ্ণ কথামৃতর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রকাশিত নিখিলানন্দ সরস্বতী অনূদিত যে চমৎকার ইংরেজি অনূবাদটি আছে তাতে মিলিয়ে দেখলে (আমি দেখেছি) ঐ লাইনগুলি পাওয়া যাবে না। এই সেনসরশিপ কি কারণে সেটা মিশন কর্তৃপক্ষই ভাল জানেন। কিন্তু ভারতবর্ষে, গুরু শিষ্য পরম্পরার মধ্যে এই হোমো ইরোটিক আবেগের অনেক উদাহরণ আছে। এটা ঠিক যে এই সম্পর্কগুলিকে পাশ্চাত্য উদ্ভাবিত নামকরণের মাধ্যমে সংজ্ঞায়িত করলে ভুল বোঝার অনেক সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সুফী ঘরানায় পীর এবং মুরিদ অর্থাৎ গুরু এবং শিষ্যের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে যে সম্পর্ক তাদের গানে, কবিতায় প্রকাশিত হয়েছে তা প্রণয় সম্পর্কের ভাষায় বিদ্ধৃত। ত্রয়োবিংশ শতাব্দীর মহাকবি আমীর খসরু এবং তাঁর গুরু নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সম্পর্ক বিখ্যাত কাওয়ালিতে আছে — ‘ছাপ তিলক সব ছিনি রে মোসে নয়না মিলাকে’। খুসরু এই গানে তাঁর গুরুর সঙ্গে এক কটাক্ষ বিনিময়ে তাঁর নিজের কী দশা সেটা বর্ণনা করছেন। অষ্টাদশ শতকের পাঞ্জাবি সুফি সাধক বুল্লে শাহর গানে তাঁর পীর শাহ ইনায়েত কাদরির শয্যাগমন প্রতীক্ষায় তার নিজের বিবশ দশাও বর্ণিত হয়েছে। সুফি সাধনায় এই ভাষার সঙ্গে ইরোটিক শব্দটি কতদূর যায় তা নিয়ে আমরা গবেষণা করতে পারি কিন্তু এই সাধনার উদ্দেশ্য আত্মবিলোপের (ফানা) অনুভূতি লাভ তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এখন পাশ্চাত্য পরিভাষা ব্যবহার করে এই সম্পর্কগুলিকে এই নামে অভিহিত করছি বটে কিন্তু সমলৈঙ্গিক আকর্ষণ এবং সম্পর্ক এই উপমহাদেশে বিভিন্ন রূপে ছিল। অনেকসময় তা ব্রহ্মচর্য এবং বিষমলৈঙ্গিক সম্পর্কের প্রতি বীতরাগের সঙ্গে সহাবস্থান করেছে। যেমন কেরলে শবরীমালার মন্দিরের আয়াপ্পান দেবতা। তার জন্ম দুই পুরুষের থেকে — শিব ও বিষ্ণু। যদিও বিষ্ণুর মোহিনী রূপের সঙ্গে শিবের মিলন হয়েছিল। এই আয়াপ্পান ব্রহ্মচারী ও চিরকুমার। এই মন্দিরে ১২ থেকে ৫০ বছরের ঋতুমতী মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তদুপরি যে পুরুষ ভক্তরা সেখানে তীর্থযাত্রায় যান তাঁদেরও যাত্রার পূর্বে মাসাধিককাল যৌন সংসর্গ থেকে বিরত থাকতে হয়। শবরীমালার যাত্রাপথ যেখানে শুরু হয় সেই এরুমেলিতে আছে এক মসজিদ, যা শোনা যায় আয়াপ্পান তার বন্ধু বাবরের জন্য বানিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর পিতাকে অনুরোধ করে। এছাড়াও শবরীমালাতেও বাবরের নামে দরগা আছে এবং সেখানে প্রার্থনা না করে আয়াপ্পানের পুজো সম্পূর্ণ হয় না। কিংবদন্তী অনুসারে আয়াপ্পান নিজেই তাঁর পিতা রাজা পাণ্ডুলামকে বলেছিলেন ‘ধরে নিন বাবর আর আমি একই’। কাছেই আছে আয়াপ্পানের কাছে পাণিপ্রার্থিনী হয়ে চির-প্রত্যখ্যাতা মলিকাপ্পুরমের মূর্তি। তবে শিব আর বিষ্ণুর এই মিলন থেকেই কিনা জানি না, দক্ষিণ ভারতে, বিশেষত তামিলনাড়ুতে অর্ধনারীশ্বর মূর্তির মন্দির এবং উপাসনার বাহুল্য দেখা যায়। লিঙ্গ নির্মাণ এবং বাসনার বিচিত্র প্রকাশকে এই সমস্ত প্রকরণ দিয়ে বুঝতে আমাদের সুবিধা হয়।

    দুই

    কামস্তদগ্রে সমবর্ততাধি মনসো রেতঃ প্রথমং যদাসীৎ
    ( প্রথমে তাঁহার উপরে আবিষ্ট হল কাম, যার থেকে জন্ম হল প্রথম মানস বীজের )
    - নাসদীয় সূক্ত (সৃষ্টি সূত্র), ঋগবেদ ।

    মাধবী মেনন তাঁর লেখায় ব্রহ্মচর্যের সামাজিক মুক্তিকামী বীক্ষার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেমন ব্রহ্মচারিণী মীরাবাঈয়ের জীবন। মীরাবাঈয়ের ব্রহ্মচর্য তাকে রক্ষণশীল অভিজাত হিন্দু সমাজে সেই ষোড়শ শতাব্দীতেই পতিব্রতা নারীর অবশ্যপালনীয় গার্হস্থ্যধর্ম থেকে মুক্তি দেয়। আরো অনেক আগে দ্বাদশ শতাব্দীতে দক্ষিণ ভারতের আরেক শৈব ভক্তিবাদী সাধিকা মহাদেবীয়াক্কার উদাহরণও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। মেনন আরো দেখিয়েছেন ইসলামে ব্রহ্মচর্যের কোনো ধারণ না থাকলেও মহিলা সুফী সাধিকাদের মধ্যে ব্রহ্মচর্য যাপনের ধারা রয়েছে। পিতৃতান্ত্রিক গার্হস্থ্যধর্মের প্রাতিষ্ঠানিকতা থেকে মুক্তির উপায় হিসেবে সাধিকারা এই ব্রহ্মচর্যকে বরণ করে নিয়েছিলেন এমনটা ভাবা যেতেই পারে। বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্মে সংসারধর্ম, পুত্রোৎপাদন সমধিক গুরুত্ব পেলেও পরবর্তীকালে রচিত কোনো কোনো উপনিষদে ব্রহ্মচর্যর ধারণা শ্রমণদের মধ্যে জনপ্রিয় হতে শুরু করে। সম্ভবত এখান থেকেই পরবর্তীকালে বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্মে কৃচ্ছতাসাধন এবং ব্রহ্মচর্য এত গুরুত্ব পায়। উইলিয়াম ডারলিম্পল তাঁর একটি বইতে জনৈকা জৈন সাধিকা প্রসন্নমতি মাতাজীর ‘অপরিগ্রহ’ সাধনার গল্প বলেছেন। মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে ধনী পরিবারের আদরের সন্তান মাতাজী স্বেচ্ছায় এই সন্ন্যাসিনীর জীবন বেছে নেন। ডারলিম্পলের সঙ্গে যখন তাঁর সাক্ষাৎ হয় তার কিছুদিন আগে মাতাজীর কুড়ি বছরের সঙ্গিনী সাধিকা প্রজ্ঞামতী তাঁকে ছেড়ে গেছেন মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে, স্বেচ্ছামৃত্যুর মাধ্যমে। মাতাজী তাঁকে তখনও ভুলতে পারেন নি। কাঁদা উচিত নয় তবুও তিনি কেঁদেছেন বান্ধবীর জন্য। সংসারের সঙ্গে এটাই তাঁর শেষ সংযোগ বা ‘আসক্তি’। কৃপাল হয়ত এটাকেও হোমো-ইরটিক ইমপালস নাম দিতেন। তাতে ক্ষতি কিছু নেই। যে কোনো অ্যাটাচমেন্ট একধরণের বাসনা তো বটে।

    আমাদের ঐতিহ্যে যৌনতার খোলামেলা উদযাপন ছিল। একই সঙ্গে অবদমন ও যে ছিলনা তা নয়। কামসূত্র এবং মনুসংহিতা দুটিই আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। আমাদের ধর্মের ইতিহাসেও এই দুই ধারারই প্রতিফলন দেখা যায়। আবার সবসময় একে অবদমন না বলে দ্বৈতাভাস বলাই ভালো মনে হয়। যেমন পতঞ্জলির যোগশাস্ত্রে কোথাও কুলকুণ্ডলিনী তত্বের উল্লেখমাত্র নেই । গোটাটাই তান্ত্রিক ঘরানার উত্তরাধিকার। বীর্যরক্ষা, উর্ধ্বরেতা হওয়ার ধারণা - এ সমস্ত কিছুও। তাই একদিকে শরীর যা বাসনার আদি উৎস তাকে ঘিরে উদযাপন রয়েছে তেমনি শরীরের প্রতি তীব্র ঘৃণাও প্রকাশিত হয়েছে। মহাপণ্ডিত অরিন্দম চক্রবর্তী লিখেছেন ‘প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর শান্তিদেব রচিত বোধিচর্যাবতার থেকে আরম্ভ করে শ্রীরামকৃষ্ণের কথামৃত পর্যন্ত রয়েছে শরীরকে ঘেন্না করার সাধন-উপদেশ।’ কিন্তু সমস্তকিছুর একটা সংশোধিত, সুসংস্কৃত সংস্করণ আমাদের সামনে এখন হাজির করা হয়েছে। তাতে এমনিতে আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু ওই পরিমার্জিত সংস্করণটিকেই যখন নতুন প্রাতিষ্ঠানিকতার চেহারা দেওয়া হয় তখন তার পেছনের সামাজিক ইতিহাসটা চাপা পড়ে যায়। সেই ইতিহাসের পুনরুদ্ধারটাও জরুরী, ইতিহাসের এই ক্রান্তিলগ্নে। নয়ত আগামীদিনে হয়ত সামাজিক অবদমন রাজনৈতিক অবদমনের হাত ধরবে। যৌন অবদমন নারী অবদমনের পথ আরো প্রশস্ত করবে।

    তথ্যসূত্র :

    (1) Infinite Variety : A History of Desire in India by Madhavi Menon.
    (2) শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, অখণ্ড, উদবোধন কার্যালয়, ২০১৬
    (3) বাৎসায়নের কামসূত্র, নবপত্র প্রকাশন
    (4) Nine Lives: In Search of the Sacred in Modern India by William Darlymple
    (5) The Gospel of Sri Ramkrishna by Mahendranath Gupta , Translated from Bengali by Swami Nikhilananda, reproduced from the webpage of ramkrishna Math and Ramkrishna Mission.
    (6)Tantra: Sex, Secrecy, Politics and Power in the study of Religion by Hugh B Urban
    (7) Kali’s Child, The Mystical and the Erotic in the Life and Teachings of Ramkrishna by Jefre J kripal.
    (৪) এ তনু ভরিয়াঃ দর্শন আপাদমস্তক, অরিন্দম চক্রবর্তী, অনুষ্টুপ ।
    (9) মনুসংহিতা, উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত, বসুমতী সাহিত্য মন্দির।
  • বিভাগ : লিঙ্গরাজনীতি | ১৬ জুন ২০২১ | ৪২৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
ছাদ - Nirmalya Nag
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Ranjan Roy | ১৬ জুন ২০২১ ২৩:৫৭494990
  • চমৎকার লেখা।  -


    কিন্তু  ওর মদ্দের ভাব(পুরুষভাবআর আমার মেদীভাব (প্রকৃতিভাব) [পৃষ্ঠা ৭৩২]? 


    আমার স্মৃতি বলছে,' নরেনের  মদ্দা ভাব, ভবনাথের মেদীভাব'। 


    আমার হাতের কাছে বইটি নেই, একটু চেক করবেন কি? আমার ভুল হতেই পারে।

  • Sandipan Majumder | ১৭ জুন ২০২১ ০০:১৬494993
  • @Ranjan Roy চেক করলাম। নরেন্দ্রর কথাই বলেছেন। এত যত্ন নিয়ে পড়া এবং উৎসাহিত  করার  জন্য ধন্যবাদ। 

  • Anindita Roy Saha | ১৮ জুন ২০২১ ১৬:১৮495058
  • খুব উৎসাহ নিয়ে ​​​​​​​পড়লাম। ব্যতিক্রমী ​​​​​​​আলোচনা। মনোযোগ ​​​​​​​দাবী ​​​​​​​করে। ভাবনার ​​​​​​​খোরাক ​​​​​​​দেয়। ​​​​​​​তাই ​​​​​​​একটি ​​​​​​​খুব ​​​​​​​প্রাথমিক ​​​​​​​আবেদন ​​​​​​​রাখছি। 


    ''এবং কামকে শুধু শরীরকেন্দ্রিকতায় আবদ্ধ না রেখে বাসনায়  (Desire)  উত্তরিত করায়.....'' 


    কাম কামনা এবং বাসনা এই তিনটি ধারণার মধ্যে সম্পর্ক  একটু বুঝিয়ে বললে ভাল হয়। তাহলে লেখাটির শীর্ষকের তাৎপর্য বুঝতেও সুবিধা হবে। 

  • Sandipan Majumder | ১৯ জুন ২০২১ ১১:৩১495072
  • @Anindita Roy Saha এই যে শব্দগুলি, তা সবসময় পরিপ্রেক্ষিতের ওপর নির্ভর করে । ইংরেজিতেও এরকম হয়। ইতালির বিখ্যাত পরিচালক ফেদেরিকো ফেলিনির একটা সাক্ষাৎকারে পড়েছিলাম, ' Eroticism is as important as religion' . আমি নিশ্চিত যে এখানে  ইরটিসিজমের বদলে সেক্স শব্দটি উনি ব্যবহার করতে পারতেন না, অর্থ বদলিয়া যেত। আমাদের দেশে কাম শব্দটিকে এক বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিতে বোঝার অবকাশ ছিল, সেটা কামসূত্রের চৌষট্টি কলার বিবরণ থেকেই অনুমান করা যায়। পরবর্তীকালে ঐতিহাসিক কারণে সেই অর্থের সংকোচন ঘটলে বাকি শব্দগুলির প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ফ্রয়েড যেভাবে সমস্ত সৃষ্টিশীলতার মধ্যে কামকে দেখেছিলেন, সেভাবে দেখলে কামনা, বাসনা শব্দগুলিকে উদ্ধার করা যেতে তাদের আনুষঙ্গিক নঙর্থকতা থেকে। 


    যে কোনো যৌন অবদমন সবার আগে  নারীর প্রতি প্রযোজ্য হয়। সেখান থেকে পিতৃতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গীর সূত্রপাত। ধর্মের অনুশাসনগুলি দেখলে তা আরও পরিষ্কার হয়। তাই এই লেখার শীর্ষকে সেকথা এসেছে।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন