এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  লিঙ্গরাজনীতি

  • শাহানারার কথা

    Suchetana Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    লিঙ্গরাজনীতি | ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯৯ বার পঠিত | রেটিং ৪.৫ (২ জন)
  • শাহানারা সবে যখন ক্লাস নাইনে উঠেছে,সেসময় ওকে আমি প্রথম দেখি। পেছন বেঞ্চে বসে থাকা চুপচাপ শাহানারা, ক্লাসের আর সকলের মধ্যে আমার নজর আর মনোযোগ দুই-ই নীরবে কেড়ে নিয়েছিল ওর সহজাত মিঠে স্নিগ্ধতার জোরে........।

    পরপর ৪টে মেয়ে বিয়োনো ভরা পোয়াতি বিবিকে ছেড়ে ওর বাবা দ্বিতীয় নিকে করে নিজের জমানো সব-সমস্ত টাকা ট্যাঁকে গুঁজে যখন বাড়ি ছাড়ে, তখন ঘরে আর একটা দিন চলার মতোও পয়সা নেই।

    সাড়ে ৫খানা পেট চালানোর জন্য বাড়িতে ওর বড় দুই দিদি দিনরাত ব্লাউজ সেলাই করে ৫টাকা-১০টাকা আয় করা শুরু করে। এদিকে অকূল বিপদের ভিতর বসে ওদের মা ভাবেন, পেটেরটাকে দুনিয়ায় আনলে তো আরো ঝামেলা! ফলে গাঁ-দেহাতে চলতি বাচ্চা খসানোর জড়িবুটি খেয়ে নেন তিনি। পড়ালেখা না জানা মা ভালোই জানতেন, যখন খুশি বাচ্চা খসানো যায়না...তবু ওইটুকু পথই কেবল দৃশ্যমান ছিল তাঁর সামনে সেসময়.....।

    ঠিক ৪মাস পরে শাহানারার সবচেয়ে ছোট বোন জন্ম নিল বাড়িতেই। কোন অভিজ্ঞ সহায়িকা ছাড়াই হয়েছিল সে প্রসব প্রক্রিয়া। প্রসব মুহূর্তে শাহানারার মা দাঁড়িয়ে ছিলেন, ফলে পেটের ভিতর থেকে সবেগে নির্গত হওয়া তাঁর ৫নম্বর কন্যাটির নিচু নরম তুলতুলে মাথা সজোরে ঠুকে যায় মাটির মেঝেতে। প্রকৃত অর্থেই ভূমিষ্ঠা এই কন্যা জড়িবুটি আর মাথায় লাগা আঘাতের জোড়াফলায় জীবনের মতো জড়বুদ্ধি হয়ে বড় হচ্ছে এখন.....। 

    এদিকে ছোট্ট শাহানারা কাকভোরে উঠে লোকের মাঠে সবজি কাটতে যায়। দ্রুত হাতে কাস্তে চালায়। কাঁধে, হাতে, মাথায় সবজি, ডাঁটা, শাকপাতা এনে তোলে বাজারগামী ভ্যানে। বদলে কোনদিন পাওয়া ২-১ টাকা আর রোজকার ঝড়তি পড়তি শাক সবজি কাঁখে করে নিয়ে আসে বাড়িতে, তাই দিয়ে মা চাল কেনেন, রান্না বসান....। শাহানারারা ৪বোন খেয়ে ইস্কুলে ছোটে।

    একসময় ২ দিদি দেখলো, ইস্কুলে সময় নষ্ট হলে যথেষ্ট ব্লাউজ সেলাই করা সম্ভব নয়। তাই ইস্কুল ছাড়লো ওরা। এদিকে সপ্তায় ৩দিন করে শাহানারা ৪০টাকা রোজে যেতে শুরু করলো প্লাস্টিক কারখানায়। আমাদের খেয়ে ফেলে দেওয়া দুনিয়ার 'কাচড়া'(কারখানার ভাষায়)প্লাস্টিক এরকম সব কারখানায় আলাদা করে ধোয়া পাকলা করা হয়, তারপর শুকিয়ে কাটিং করে বিক্কিরি হয়ে যায় দূরের রিসাইক্লিং কারখানায়....। 

    সকালে বস্তা বস্তা প্লাস্টিক আসে। সেগুলোকে সকাল ৮টা থেকে ১টা অবধি শেপ আর মেটেরিয়াল অনুযায়ী আলাদা আলাদা ভাগে রাখা হয়। তারপর রয়েছে ৫টা পানিট্যাঙ্কি। দুপুরের ভাত খেয়ে একগলা জল ভর্তি সেই ট্যাঙ্কিতে নামে ক'জন। গরিবের তো কোন ঘেন্নাপিত্তি-অসুখবিসুখ থাকতে নেই!! তাই কোনরকম বর্ম ছাড়াই ওই একগলা জলের ভিতর দাঁড়িয়ে পা দিয়ে কচলে কচলে ধোয়া হয় 'কাচড়া' প্লাস্টিক....শোধনের দীর্ঘ সেই ৩ ঘন্টায় সুপারভাইজারের চোখ এড়িয়ে উঠে আসার কোন উপায়ই নেই। 

    শীতে, বর্ষায়, গরমেও কেঁপে কেঁপে প্লাস্টিক সাফ করে চলে শাহানারা আর ওর মতো কত আরো কিশোরী, মহিলারা। তারপর গোসল করে, কিছুক্ষণ প্লাস্টিকের আগুনে নিজেদের ঠকঠক করে কাঁপতে থাকা দেহ সেঁকে যে যার বাড়ি ফেরে মজুরমেয়েরা।শাহানারার ক্লাস বাড়ে, ওর অনুরোধে স্কুলের হেড স্যার মিডডে মিলের ভাত ওকে ক্যানে করে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেন, কারখানায় ওর রোজ ৪০টাকা থেকে বেড়ে ৭০ টাকা হয়, সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ে তেল-চালের দাম আর জনতার গরিবি। কিশোরী শাহানারার পরনের জামা দরকার হয়- ঈদের সময় ইচ্ছে জাগে নতুন সালোয়ারের। কিন্তু কার কাছে চাইবে ও!! 
    চোখ ওপচানো কান্নায় ভেসে শাহানারা স্কুলের খাতায় লেখে, "আল্লাহ, আমার জামার বড্ড দরকার। তুমি আমার আব্বুকে এনে দাও। আব্বুকে এনে দাও..."।

    আব্বুকে যে আল্লাহ এনে দেবেন না, সেটা বুঝতে শাহানারার বেশ ক'বছর লেগেছিল। ততদিনে ওর আশপাশের চাচারা- ভাইরা ওকে নোটের টোপে ডাকছে। 
    "আমার সঙ্গে পুলের নিচের ঘাস কাটবি? তোকে ১০০টাকা দেব।"
    "ভোরে আমার মাঠের ডাঁটা কাটতে আসবি? ৫০টাকা দেব।"
    "আমার আমগাছের ডালটা কেটে দিয়ে যা না, দুপুর বেলায়..১০টাকা দেব।"

    আল্লার কিরে! এসব কথা শুনলে বড্ড ভয় করতো ওর। মা'কে এসে সব বলে দিত ও। মা ওকেই উল্টে বকাঝকা করতেন। তারপর বলতেন, সাবধানে বুঝেশুনে চলিস রে মেয়ে। ডাগর হচ্ছিস যে তুই!

    ৯ক্লাস নাগাদ, সারাদিন ধরে কাজ করে চলা মজুরমেয়ে শাহানারাকে হাতে ধরে নাম- ঠিকানা লিখতে শেখায় ওর স্কুলের বন্ধু, ক্লাসের সেকেন্ড গার্ল শাহিনা। পরম মমতায় সপ্তায় ৩দিন স্কুলে আসতে পারা বন্ধুকে সমস্ত পড়াও বুঝিয়ে দেয় সে-ই। বন্ধু আফরুজা ওকে গোপনে দিয়ে দেয় প্রাইভেট আর ক্লাসের নিজের সব নোটপত্তর। শাহানারার রোল ৭১ থেকে উঠে আসে ২১-এ।

    প্লাস্টিক কারখানার বদলে এবার ও নেলপালিশ কারখানায় কাজ শুরু করে রোজের ১২০টাকায়। সঙ্গে শাহানারা মাধ্যমিক পাশ করে, উচ্চ মাধ্যমিকও পাশ করে। তবে তারপর আর পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি ওর পক্ষে। ২০১৮ থেকে  আরো ১৩জন মেয়ের সাথে  adamas university তে নাইট গার্ডের কাজ করে চলেছে শাহানারা খাতুন। 

    রাতের পর রাতের জাগরণে ওর মাথায় তীব্র যন্ত্রণা হলেও, ১২হাজারি বেতন এজেন্সির হাত ঘুরে ওর হাতে সাড়ে ৬হাজারে এসে পৌঁছালেও, কারো সাহায্য ছাড়াই বাড়ির সকলের খাওয়া-পড়া আর পরের বোনটার পড়াশুনো চালিয়ে যাচ্ছে ও। শাহানারার ইচ্ছে, বোনকে যতদূর সম্ভব পড়াবে ও। ইতিমধ্যে অবশ্য লকডাউনের ২বছর ওর আব্বুরতনটি ফিরে এসে ওর জমানো টাকা সাবড়ে ওদের ছেড়ে পালিয়েছে আবার!!

    বড়রা সব বড্ড পন্ডিত বলে চিরকালই ছোটমানুষদের কাছ থেকে শিখি আমি। জ্ঞানবুদ্ধি হওয়া ইস্তক রুক্ষতম জীবনযুদ্ধের ঠিক মাঝখানে দাঁড়ানো শাহানারার সঙ্গে যখনই দেখা বা কথা হয়, ওর কাছ থেকে আমি আবারো নীরব ধৈর্য, প্রগাঢ় আত্মসম্মান, অপরিসীম ভদ্রতাবোধ আর এক অদ্ভুত প্রশান্তির পাঠ নিই।  

    শাহানারা ভীষণ সুন্দর কাঁথা সেলাই করে। রীতিমত শৈল্পিক সে কাজ। অনেক দিন ধরেই ওকে বিয়ে করে নেওয়ার জন্য চাপাচাপি করছে বাড়ির সবাই, কারণ ধর্মের দিক থেকে দেখলে "বিয়ে না করা এক অনাচার"..। কিন্তু শাহানারার সামনে যে এখনো অসীমসম দায়িত্ব। ও জানে দুকাঁধে ওকেই একলা সামলে যেতে হবে সেইসব কিছু। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত জানি, বাড়ির লোককে শাহানারা জানিয়ে দিয়েছে ওর সিদ্ধান্ত, "আমার একার পাপ-পূণ্য, আল্লাহর সঙ্গে একলা বুঝে নেব আমি...আল্লাহ জানেন, বিয়ে না করে আমি সঠিক কাজই করছি...।"

    পুনশ্চ : সঙ্গের ছবিটি এবারের টিচার্স ডে'র দিন তোলা। শাহানারা প্রতি টিচার্স ডে'তে স্কুলে দেখা করতে আসে। কারণ, স্কুলের ফাংশনে অংশ নেওয়ার ওর সেই সর্বোত্তম আনন্দের দিনকে ও খুব খুব আদরে মনে ধরে রেখেছে আজও। ছবিতে আমাদের সঙ্গে ওর সেই অমৃতা ছোট বোন, যাকে শাহানারা আমাদের সরকারি স্কুলেই ভর্তি করে দিয়েছে, যাতে অন্তত মিড ডে মিল, ঐক্যশ্রী বা কন্যাশ্রীর মতো সুবিধাগুলো পাওয়া যায়। শাহানারার অনুমতিক্রমেই এই লেখায় ওর নিজের নাম আর ছবি ব্যবহার করেছি আমি।

    শাহানারা খাতুন বা ওর মতো অমৃতসমান মেয়েদের তাঁদের আসল নাম আর চেহারাতেই চিনুক নাগরিক সমাজ।
  • লিঙ্গরাজনীতি | ০৭ ডিসেম্বর ২০২২ | ১৯৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    থ: ! - Bitan Polley
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • দীপ | 42.110.146.101 | ০৯ ডিসেম্বর ২০২২ ২৩:৫৬514467
  • শাহানারা ও আর সবাই জীবনযুদ্ধে জয়ী হোক, এই কামনা করি। আর কিছু লেখার ক্ষমতা নেই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন