এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  ইতিহাস

  • দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলপড়ুয়াদের সেই অবিস্মরণীয় মিছিল আর আত্মবলিদান স্মরণে 

    Suchetana Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | ইতিহাস | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৭২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ১৬জুনের মিছিল তথা সাবেক ঔপনিবেশিক দক্ষিণ আফ্রিকার ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত পরিপ্রেক্ষিত : 
    " যেহেতু আমি নেটিভদের শিক্ষার দায়িত্বে আছি, তাই আমি এই শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিবর্তন করব; যাতে নেটিভরা শৈশব থেকেই বুঝে যাবে যে তারা ইউরোপিয়ানদের সমতুল্য নয়। ... যেসব পড়ালেখা শেখা নেটিভরা সাম্যে বিশ্বাস করে তারা নেটিভ শিশুদের যোগ্য শিক্ষক হওয়ার উপযুক্ত না। ... নেটিভরা যে স্তরের শিক্ষার যোগ্য বা যে শিক্ষা তারা নিজেদের রোজকার জীবনে ব্যবহার করতে পারবে, তাদের জন্য সেরকম শিক্ষার ব্যবস্থাই আমার দপ্তর করবে। ... বান্টু শিশুরা অঙ্ক শিখে কী করবে, যদি তারা সেসব জীবনে প্রয়োগ করতেই না পারে! ... কিছু লেবারের কাজ ছাড়া এখানকার ইউরোপিয়ান সমাজে আফ্রিকানদের কোনো জায়গা নেই, ফলে তাদের ইউরোপিয়ান সমাজের সমান উঁচুস্তরের শিক্ষা ব্ল্যাকদের দেওয়ারও কোনো মানে হয় না। ....দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শিক্ষার সমতা আনয়ন পুরোপুরি অবাস্তব একটা প্রস্তাব!... " --- হেন্ড্রিক.এফ. ফুভার্ড; সাবেক ইংরেজ উপনিবেশ দক্ষিণ আফ্রিকার নেটিভ অর্থাৎ কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান জনগোষ্ঠী সংক্রান্ত দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীমশাই। ( বান্টু এডুকেশন এক্ট, ১৯৫৩)

    দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৬৫২ সাধারণ অব্দ থেকে ইউরোপের নানা দেশ উপনিবেশ গড়ে তুললেও মূলত নেদারল্যান্ডস আর ইংল্যান্ডের অধীনে ছিল এই দেশ। সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী নিয়মে সংখ্যালঘু শ্বেতাঙ্গ শাসকরা তাদের দক্ষিণ আফ্রিকান উপনিবেশের মূল অধিবাসী সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের ওপর সর্বাঙ্গীন প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা সমেত সর্বোচ্চ শোষণমূলক এক শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল শুরু থেকেই। আফ্রিকানদের ওপর নিয়ত দমন পীড়ন জারি থাকলেও নতুন করে ১৯৪৮এ ইংল্যান্ডের প্রত্যক্ষ মদতপুষ্ট চরম বর্ণবিদ্বেষী ন্যাশনাল পার্টির শ্বেতাঙ্গ সরকার দক্ষিণ আফ্রিকা জুড়ে 'অ্যাপারথেড' বা 'পৃথকীকরণ নীতি' চালু করেছিল । ১৯৬১তে দক্ষিণ আফ্রিকা ইংল্যান্ডের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও সেখানে আরও ৩ দশক ভয়াবহ শ্বেতাঙ্গ বর্ণবৈষম্যবাদ ও অ্যাপারথেড-এর অত্যাচার জারি ছিল।  

    দক্ষিণ আফ্রিকার আম আদমিরা কথা বলতেন/বলেন জুলু, ক্হোসা, সেসোথো, ন-দেবেলে, সোয়াতি, ইতসোঙ্গা ইত্যাদি নানারকম ভাষায়। তবে মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষাকেও সেখানে পড়াশুনোর মাধ্যম হিসেবে মান্যতা দেওয়া হয়েছিল দীর্ঘদিন। ফলে ছাত্র বা শিক্ষক সকলেই নিজস্ব মাতৃভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় স্বচ্ছন্দ ছিলেন। এদিকে সংখ্যালঘু শাসক শ্বেতাঙ্গ গোষ্ঠী যারা ঔপনিবেশিক দক্ষিণ আফ্রিকায় 'আফ্রিকানার' নামে পরিচিত ছিল, তাদের ভাষা ছিল ডাচ আর জার্মান ভাষার মিশ্রণে উদ্ভূত আফ্রিকান্স ভাষা। শোষক শাসকদের এই ভাষাকে সে দেশের কৃষ্ণাঙ্গরা এতটাই 
    ঘৃণা করতেন যে তাঁরা এই ভাষাটি শিখতেন পর্যন্ত না।

    ১৯৫৩ সালে ফুভার্ডের মগজ থেকেই বেরিয়েছিল বান্টু ( ভূমিজ আফ্রিকান জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত একটি অপমানজনক শব্দ) এডুকেশন অ্যাক্ট। এই আইনের মাধ্যমে অ্যাপারথেড ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছিল আরও ভয়ঙ্কর ভাবে। এর আগে অবশ্য শ্বেতাঙ্গ সরকার আফ্রিকানদের জন্য গড়ে ওঠা পুরোনো খৃষ্টান স্কুলগুলিকে বন্ধ করে দিয়েছিল। তবে তারা যথেষ্ট সংখ্যক নতুন স্কুল গড়ে তোলেনি। ফলে সামান্য কিছু সরকারি স্কুলেই পড়তে যেতে বাধ্য হতো দরিদ্র আফ্রিকান শিশুরা। একদিকে শ্বেতাঙ্গ শিশুদের শিক্ষার জন্য ছিল উন্নত স্কুল সহ বহুতর ব্যবস্থা। অন্যদিকে আফ্রিকান স্কুলগুলির জন্য সরকারি ব্যয় ছিল নামমাত্র। শিশুদের বইখাতা, ব্যাগ, ইউনিফর্ম সবই কিনে দিতে হতো তাদের শ্রমজীবী অভিভাবকদের। এই সব স্কুলে পর্যাপ্ত ক্লাসঘর সহ বাকি পরিকাঠামো, এমনকি প্রয়োজনীয় ডিগ্রিধারী শিক্ষকেরও অভাব ছিল প্রকট। ফলে ১৯১০ নাগাদ থেকেই আফ্রিকান স্কুলগুলির ছাত্ররা প্রায়শ বিক্ষোভে ফেটে পড়তেন। ক্রমে ব্ল্যাক কনশাসনেস মুভমেন্ট, সাউথ আফ্রিকান স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন ইত্যাদির ছায়াতলে আফ্রিকান স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং সক্রিয়ভাবে অ্যাপারথেড বিরোধী মুক্তি আন্দোলনে যুক্ত হতে শুরু করেন। 

    শেষমেশ আফ্রিকান শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি সহ বিবিধ ন্যায্য দাবিতে বহু বছর ধরে জমে থাকা অসন্তোষ চরমে উঠেছিল ১৯৭৪ এর একটি সরকারি নির্দেশিকায়। নির্দেশিকায় বান্টু শিক্ষার আঞ্চলিক পরিচালক কৃষ্ণাঙ্গ স্কুলের প্রিন্সিপালদের জানান, ১) শ্বেতাঙ্গ সরকার যেহেতু কৃষ্ণাঙ্গ স্কুলগুলির জন্য টাকা খরচ করছে, তাই কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রছাত্রীদের ১৯৭৫ এর ১ জানুয়ারি থেকে মাতৃভাষা আর ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে শ্বেতাঙ্গদের আফ্রিকান্স ভাষা শিখতে হবেই। 
    বলা হয়, ২) পড়ুয়ারা অঙ্ক ও সমাজবিজ্ঞানের ৫টি বিষয় এবার থেকে আফ্রিকান্স ভাষাতে পড়বে। বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক বিষয়গুলি পড়বে ইংরেজিতে এবং মাতৃভাষা বরাদ্দ থাকবে কেবল ধর্মশিক্ষা, নাচ,গান ইত্যাদির জন্য। ৩) পাশ করে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণীতে উঠে যাওয়া পড়ুয়াদের আবার করে আফ্রিকান্স মাধ্যমে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তে হবে। ৪) আফ্রিকান্স ভাষার বদলে মাতৃভাষা বা ইংরেজিতে লিখলে জুনিয়র হাই থেকে হাই স্কুল যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পাশ করান হবেনা অষ্টম শ্রেণীর পড়ুয়াদের। ৫) বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষকদের প্রশ্নপত্র করতে হবে আফ্রিকান্স ভাষাতেই। বান্টু শিক্ষা বিভাগের 
    উপমন্ত্রী বলেন, খনি, কারখানা বা খেতখামারে মজুর হিসেবে শ্বেতাঙ্গদের অধীনে কাজ করার জন্য কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্রছাত্রীদের আফ্রিকান্স ভাষাটা শিখে নেওয়া নাকি বড্ড জরুরি আর এ জন্য তাঁর ব্ল্যাকদের অনুমতি নেওয়ার দরকার নেই!  

    শ্বেতাঙ্গ সরকারের এই কুৎসিত নির্দেশে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন আফ্রিকান স্কুলের ছাত্রছাত্রী থেকে শিক্ষক ও অভিভাবকরা! শোষক শ্বেতাঙ্গ সরকারের আফ্রিকান্স ভাষায় লেখাপড়া বা প্রশ্ন তৈরি করার কাজকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন তাঁরা। এদিকে হাফ ইয়ারলি পরীক্ষায় সরকারি নির্দেশে আফ্রিকান্স ভাষায় প্রশ্নপত্র তৈরিতে বাধ্য হন শিক্ষককুল আর আফ্রিকানসেই উত্তর লিখতে বাধ্য হয় পড়ুয়ারাও। উভয়পক্ষ স্থির করে আগামীতে এই নির্দেশিকা অমান্য করা হবে। তার প্রস্তুতি হিসেবে ১৩ জুন সোয়েটো টাউনের মিটিংয়ে নবগঠিত ছাত্র সংগঠন ‘অ্যাকশন কমিটি অফ দ্য সোয়েটো স্টুডেন্টস রিপ্রেজেন্টিটিভ কাউন্সিল’এর কিশোর-তরুণ সদস্যরা স্থির করেন জোর করে আফ্রিকান্স ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার স্বৈরাচারী নির্দেশিকার বিরোধিতা, অ্যাপারথেড-এর সরকারি কালা কানুনের প্রতিবাদ আর আফ্রিকান স্কুল শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নতির দাবিতে টাউনের সমস্ত স্কুল পড়ুয়াদের নিয়ে ১৬জুন সকালে একটি বিশাল মিছিলের আয়োজন করা হবে। জোর কদমে শুরু হয় ছাত্রমিছিলের প্রস্তুতি!  
    ...........

    অবিস্মরণীয় সেই ছাত্রমিছিল : 
    ১৬ জুন, সকাল ৭.৩০! স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং বাকি শিক্ষকদের কাছ থেকে আশীর্বাদ আর শুভেচ্ছা নিয়ে মিছিল শুরু করল নালেডি হাই স্কুলের ছাত্রছাত্রীরা! তারা যাবে অরল্যান্ডো স্টেডিয়ামে। এসেম্বলিতে সমবেত মিছিলে অংশগ্রহণকারী ছাত্রছাত্রীদের শান্তিপূর্ণ এবং অহিংস পথে থাকার জন্য কিছুক্ষণ আগেই সতর্ক করে দিয়েছে তাদের স্কুলের ছাত্র তথা অ্যাকশন কমিটির প্রথম চেয়ারপার্সন টেপেলো মোটোপেনিয়েন। সকাল ৮টা নাগাদ অরল্যান্ডো অভিমুখী নালেডি স্কুলের মিছিলে যোগ দিল মরিস আইজ্যাকসন হাই স্কুল আর ফেফেনি জুনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলের হাজার দুয়েক ছাত্রছাত্রীও! অনেক ছাত্রছাত্রীই জানত না যে ১৬জুন মিছিল হবে, কিন্তু স্কুলে এসে যখন তারা জানতে পারে, স্বতঃস্ফূর্তভাবে মিছিলে যোগ দিয়েছিল তারা। আর যারা মিছিলের কথা জানত, তারা? স্কুলের একমাত্র ইউনিফর্মটা কেচে ধুয়ে ইস্তিরি করে পরে আর ধুলোমলিন জুতোজোড়া পালিশ করে যথাসম্ভব ধোপদুরস্ত হয়ে মিছিলে হাঁটতে এসেছিল সেই সব উজ্জ্বল কিশোর কিশোররা! 

    একসঙ্গে গান গাইতে গাইতে, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আফ্রিকান্স ভাষা বিরোধী শতেক হাতে লেখা প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে হৈ হৈ করে এগিয়ে চলেছিল তারা। ক্রমে সোয়েটো টাউনশিপের সমস্ত “ব্ল্যাক স্কুল” মিছিলে পা মেলায় এবং সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে হাজার দুয়েক ছাত্রছাত্রীর ১১টি সুদীর্ঘ মিছিল স্টেডিয়াম সংলগ্ন ‘আঙ্কল টম’ মিউনিসিপ্যাল হলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। স্থির ছিল, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রকৃত বাসিন্দা আফ্রিকান ছাত্রগোষ্ঠী এবং শিক্ষক সমাজের ওপর বর্ণবিদ্বেষী সরকারের দ্বারা আফ্রিকান্স ভাষাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ কিন্তু সুসংহত আন্দোলন ঘোষণা করে বক্তব্য রাখবেন ৎসেইৎসি মাশিনিনির মতো বিপুল জনপ্রিয় ছাত্রনেতারা। 

    মিছিল পথে নামার আগে ভোরবেলা থেকেই পথের মোড়ে মোড়ে মোতায়েন ছিল প্রচুর সশস্ত্র পুলিশ। আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীরা শুরু থেকেই জানত, পুলিশবাহিনী তাদের মিছিলকে বাধা দেবেই! তাই বন্দুকধারী পুলিশকে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে তাঁরা উত্তেজিত হয়ে ওঠে। সেসময় ছাত্রনেতা ৎসেইৎসি মাশিনিনি ভিড়কে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “ আমার ভাই বোনেরা; তোমাদের অনুরোধ করছি পুলিশকে তোমরা ব্যঙ্গ কোরো না, তাদের কোনো ক্ষতিও কোরো না। আমরা যুদ্ধ করছিনা, কেবল নিজেদের ন্যায্য দাবিটুকু আদায় করতে চাইছি। তাই অনুরোধ করছি তোমরা শান্ত আর সুশৃঙ্খলভাবে সামনে এগিয়ে চলো…।” এবার মিছিলের পথ আঁটকানোর জন্য সশস্ত্র পুলিশ মাইক হাতে পড়ুয়াদের ফিরে যেতে আদেশ দেয়। কিন্তু একজন পড়ুয়াও তাঁদের দাবিগুলি আদায় না করে সেদিন ফিরে যেতে রাজি হননি। একদিকে হিংস্র কুকুরের দল নিয়ে পুলিশের প্রস্তুতি আর অন্যদিকে মিছিলের গতিপথের ওপর আকাশ থেকে পুলিশের কিছু হেলিকপ্টার টহল দিতে শুরু করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকে।

    সকাল সাড়ে ৯টা! উঁচু স্বরে গান আর স্লোগানের ধ্বনিতে সোয়েটো শহরের সকাল মুখরিত করতে করতে  অরল্যান্ডো হাই স্কুলের কাছাকাছি এসে পৌঁছয় বিশাল মিছিলটি। পুলিশের তরফ থেকে ক্রমাগত ধেয়ে আসা উস্কানিমূলক নানা মন্তব্য সত্ত্বেও আগাগোড়াই ছাত্রছাত্রীরা শান্ত আর শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিল। কিন্তু হঠাৎই এক সাদা চামড়ার পুলিশ মিছিল অভিমুখে কাঁদানে গ্যাসের ক্যান ছুঁড়ে মারে! মুহূর্তে গোটা জায়গাটি ধোঁয়ায় ভরে যায়। বেশ ক’মিনিট ছাত্রছাত্রীরা কাশি আর চোখের যন্ত্রণায় কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেও আবার তারা গলায় গান আর হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে নিয়ে এগোতে থাকে পুলিশের ব্যারিকেডের দিকে। এরপর পুলিশ পড়ুয়াদের দিকে হিংস্র কুকুর লেলিয়ে দেয়, যার ফলে মারাত্মকভাবে আহত হয় বহু ছাত্রছাত্রী। এদের নিয়ে হাসপাতালে ছোটে অনেকে। কিন্তু কুকুরের আক্রমণ সত্ত্বেও অকুতোভয় পড়ুয়ারা স্লোগান দিতে দিতে পুলিশের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। এসময় ব্যারিকেডের এক পাশে দাঁড়িয়েছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ স্কুল ছাত্রদের এই ঐতিহাসিক মিছিলখানি 'কভার’ করতে ‘কালো’ সাংবাদিকরা। তাঁদের একজন হঠাৎ খেয়াল করেন, চুপিসাড়ে নিরস্ত্র নিরীহ বাচ্চাদের দিকে নিজের রিভলভার তুলছে এক শ্বেতাঙ্গ পুলিশ। একটি গুলির গর্জন! ভয়ংকর আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠা বাচ্চারা পরমুহূর্তে দেখল পাশেই গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারিয়েছে তাদের সহপাঠী ১৫ বছরের হেস্টিংস এনডিলভু। পরের গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে ১২ বছরের ছোট্ট হেক্টর পিটারসন। হেক্টরের প্রাণ বাঁচানোর জন্য তার ছোটো বোন আঁতোয়ানেতকে সঙ্গে নিয়ে তরুণ ছাত্র এমবুইসা মাখুবু দৌড়োয় হাসপাতালের দিকে! 

    ওদিকে তখন প্রাণ বাঁচানোর জন্য আশপাশের বাড়ি আর ডাস্টবিনের আড়ালে লুকোতে চেষ্টা করা মিছিলের বাকি বাচ্চাদের লক্ষ্য করে নিষ্ঠুর গুলি বৃষ্টি শুরু করেছে শ্বেতাঙ্গ পুলিশ বাহিনী। সঙ্গে নাগাড়ে চলেছে কাঁদানে বোমা নিক্ষেপ। সকাল ১০টার মধ্যেই সেদিন আরও ৪টি তাজা প্রাণ ঝরে গেছিল পুলিশের গুলির ঘায়ে! চিত্র সাংবাদিক স্যাম নাজিমা সহ বাকিদের ক্যামেরায় তোলা ১৬ জুনের ছাত্রমিছিলের ওপর পুলিশি বর্বরতার গায়ে কাঁটা দেওয়া সব ছবি গোটা দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল ঘটনার অব্যবহিত পরেই। এই ছবিগুলি ( এই নিবন্ধের সঙ্গে ছবিগুলির কয়েকটি সংযুক্ত রয়েছে) দক্ষিণ আফ্রিকার নীতিহীন শ্বেতাঙ্গ সরকারের কার্যকলাপের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকা নিয়েছিল। 

    দুপুর দেড়টার মধ্যে গোটা সোয়েটো টাউন জুড়ে ছাত্র বিক্ষোভের বিস্ফোরণ ছড়িয়ে পড়েছিল। এ সময় সোয়েটো টাউনের অন্যান্য প্রান্তের স্কুলগুলির ছেলেমেয়েরা ছুটির পর নতুন করে মিছিল শুরু করে। রাজপথে দাঁড়ানো পুলিশের ব্যারিকেড এড়িয়ে অলিগলি দিয়ে এগোতে থাকে তাদের বিশাল মিছিল। গলায় তাদের ছিল স্লোগান আর হাতে ছিল সরকারের চাপিয়ে দেওয়া আফ্রিকান্স ভাষা বিরোধী অসংখ্য প্ল্যাকার্ড। অকুতোভয় এই স্কুল ছাত্রছাত্রীদের পাশে সেদিন দাঁড়িয়েছিল কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ তরুণীরাও। তারা সকলে মিলে একজোট হয়ে ইঁট-পাথর, কাঁচের বোতল, গাড়ির টায়ার, ডাস্টবিনের ধাতব ঢাকনাকে অস্ত্র বানিয়ে বন্দুকধারী পুলিশের সঙ্গে মুখোমুখি খণ্ডযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বাড়ি, শ্বেতাঙ্গ সরকারি কর্মচারীদের, এমনকি তাদের গাড়িগুলোকেও আক্রমণ করে, পুড়িয়ে, ধ্বংস করছিল তারা। " মদ্যপান নিপাত যাক, উন্নততর শিক্ষাব্যবস্থা আসুক"... এই স্লোগান তুলে তারা আক্রমণ করছিল সরকারি টাকায় গড়ে তোলা টাউন ও আশপাশের সমস্ত পাব আর মদের দোকানগুলোকে। কারন ছাত্রছাত্রীরা সঠিক ভাবেই উপলব্ধি করেছিল যে, সরকার আসলে
    কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে মাদকের ফাঁদে আঁটকে দরিদ্র ও দুর্বলতর করে রাখতে চায়।

    সন্ধ্যে গড়ানোর পর ছাত্র বিক্ষোভকে দমন করার জন্য সোয়েটো জুড়ে খোলা বন্দুক হাতে পথে নেমেছিল  ১৫০০জনের কুখ্যাত "হিপ্পোস" পুলিশ দল। সরকারি হিসেবে ১৬জুন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পুলিশের গুলিতে নাকি মাত্র ২৩ জন ছাত্রছাত্রী মারা গেছিল! অথচ বেসরকারি হিসেব বলে, সেদিন রাষ্ট্র সন্ত্রাসের বলি হয়েছিল দুই শতাধিক ছেলেমেয়ে আর মারাত্মকভাবে আহত ছেলেমেয়ের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার। ১৬তারিখ গভীর রাতে অ্যাকশন কমিটির ছাত্রনেতারা এক গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে স্থির করেন, সরকার আফ্রিকান্স ভাষা সংক্রান্ত নির্দেশ প্রত্যাহার করে মাতৃভাষা তথা ইংরেজিতে তাদের পড়াশুনোর অধিকার না দেওয়া পর্যন্ত তারা মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাবে। এই মিটিং থেকে উঠে আসা নতুন স্লোগান, "একজনের আঘাত, আমাদের সকলের আঘাত", " অ্যাপারথেড নিপাত যাক" ইত্যাদি গলায় তুলে দিয়ে ১৭ তারিখ ভোররাত থেকে সোয়েটোর আশপাশের সমস্ত কৃষ্ণাঙ্গ অঞ্চলের ছাত্ররা বিক্ষোভে সামিল হয়েছিল। রেল ও পথ অবরোধ করা হয়, ধ্বংস করা হয় সরকারি বর্ণবিদ্বেষ নীতির প্রতিভূ সরকারি অফিস আদালতগুলি, সরকারের সমর্থক ধনী কৃষ্ণাঙ্গ ব্যবসায়ীদের আক্রমণ করা হয়। এদিকে ১৭ জুন দুপুরে খোদ হেক্টর পিটারসনদের গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে জড়ো হয়ে ব্ল্যাকদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেওয়া আফ্রিকানস ভাষা প্রত্যাহারের দাবিতে মিছিল শুরু করে তিন শতাধিক শ্বেতাঙ্গ স্কুল ছাত্রছাত্রী। আশ্চর্যের বিষয়, শ্বেতাঙ্গ পুলিশ যেমন অস্ত্র হাতে সেদিন ধেয়ে এসেছিল এদের ওপরেও, তেমন পুলিশি আক্রমণ থেকে এদের বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিল কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্ররাই! ১৭ ও ১৮ তারিখে কৃষ্ণাঙ্গ ছাত্র বিক্ষোভের সমর্থনে ধর্মঘট ও অবরোধ পালনে এগিয়ে এসেছিলেন সমগ্র অঞ্চলের খনি, কারখানা, ক্ষেত খামারে খেটে খাওয়া অগণিত কৃষ্ণাঙ্গ জনতা। তবে ১৬ তারিখের মতো পরের দু'দিনও নিরস্ত্র ছাত্র ও গণবিক্ষোভের লাখো কন্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, স্টেনগান, স্বয়ংক্রিয় রাইফেল, কার্বাইন, সাঁজোয়া কামান, যুদ্ধের হেলিকপ্টার ইত্যাদি সমেত বর্বর হামলা জারি রেখেছিল, যার ফলে আবারও হতাহত হয়েছিলেন বহু ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষ.....।

    সোয়েটো আন্দোলন শুরু হওয়ার ৪মাসের মধ্যে গোটা দেশের ১৬০টি আফ্রিকান জনগোষ্ঠী সক্রিয়ভাবে বিদেশি শাসনের প্রতিবাদে প্রতিরোধ আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। শুধুমাত্র সোয়েটো অঞ্চলেই যুক্ত ছিলেন ২.৫লক্ষ মানুষ। মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের দাবিকে বুকে আঁকড়ে ধরে সোয়েটোর উজ্জ্বল পড়ুয়াদের মিছিল তথা বলিদান কিন্তু বিফলে যায়নি। বরং সোয়েটোর  ঐতিহাসিক বিদ্রোহের পর আরও বড়ো মাপে পরবর্তী দু'দশক জুড়ে অ্যাপারথেড সমেত শ্বেতাঙ্গ সরকারের সমস্ত রকম সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে গৌরবময় সংগ্রাম চালিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার আপামর কৃষ্ণাঙ্গ জনতা। যার ফলস্বরূপ ১৯৯৪ সালে চিরকালের মতো দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বর্ণবৈষম্যবাদী সরকার বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিল। সাঙ্গ হয়েছিল অ্যাপারথেড সমেত সমস্ত কালা কানুনের দিন। বর্তমানে স্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৬জুনের অবিস্মরণীয় সেই মিছিল তথা পড়ুয়াদের আত্মবলিদানের দিনটিকে "যুবদিবস" হিসেবে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করা হয়।

    ...........

    অন্যতম ৩টি তথ্যসূত্র : 

    ১) The Youth Struggle : essay from south african history online 

    ২) The June 16 Soweto Youth Uprising : essay from South African History Online

    ৩) "I Saw a Nightmare…" Doing Violence to Memory : The Soweto Uprising, June 16, 1976
     -  Helena Pohlandt-McCormick : Columbia University Press

    নিবন্ধে সংযুক্ত প্রতিটি ছবি ইন্টারনেটে সহজলভ্য।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১৭২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন