• বুলবুলভাজা  সমোস্কিতি  বুলবুলভাজা

  • টুরু লাভ: আদতে কোনও প্রেমের গল্পই নয়

    আত্রলিতা
    সমোস্কিতি | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৫০৪ বার পঠিত | ২ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • হইচই নামক ওটিটি প্ল্যাটফর্মে বিনামূল্যে দেখানো হচ্ছে টুরু লাভ। এই ওয়েব সিরিজে প্রদর্শিত ভালবাসা ও রাজনীতির আন্তঃসম্পর্কের বিশ্লেষণ, চাঁছাছোলা ভাষায়।

    যে কোনও মাধ্যমের একটা রাজনীতি থাকে। তার প্রত্যেক পদক্ষেপ হয় মাপা, সুপরিকল্পিত। পেশাদার একটি ওটিটি প্ল্যাটফর্ম অবধারিত ভাবেই সুনির্দিষ্ট কিছু কনটেন্ট স্ট্র্যাটেজি নির্ভর। যৌন সুড়সুড়ির সিউডো দর্শন, অগভীর স্যাটায়ারের ওপর ভর করে যে প্ল্যাটফর্মটি তাদের ভিত শক্ত করেছিল, প্রেমকে তারা যে একেবারেই একটি বস্তাপচা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখবে, সে আর আশ্চর্য কী! হইচই-এর সাম্প্রতিক রিলিজ, ‘’টুরু লাভ’’ সত্যিকারের প্রেম অথবা ট্রু লাভ-এর যে ব্যাখ্যা দেয়, তা হাস্যকর তো বটেই, পাশাপাশি পরিবেশনার মানের দিক থেকে এ সিরিজ একটি অপুষ্ট বনসাই।

    বনসাই যাঁরা বেচেন তাঁরাও বোঝেন আর যাঁরা কেনেন, তাঁরাও বোঝেন যে এটি প্রাকৃতিক নয়। বামন আর বনসাই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন তল ও মাত্রা। বামনত্ব তার স্বকীয়তায় উজ্জ্বল, তার নিজস্ব একটি আর্ক আছে। অন্যদিকে, বনসাই একটি আরোপিত দৃষ্টিনান্দনিকতা তৈরি করে যা প্রকৃতির ভাবনায় ছিল না কখনও। বনসাই মানেই সেখানে রয়েছে হিউম্যান ইন্টারভেনশন-- একটি পরিকল্পনা কাজ করেছে, বিশেষ পরিচর্যাও। তাই প্রাকৃতিক নিয়মে, ঋতুচক্রে, শুকিয়ে যাওয়া গাছকে অসুন্দর মনে হয় না। কিন্তু সুসজ্জিত ঘরে একটি অপুষ্ট বনসাইকে প্রতিষ্ঠা করলে, তা চোখে লাগে বইকি! কাঠখড় পুড়ছে যেখানে, সেখানে নির্মাণ যথাযথ হওয়া বাঞ্ছনীয়।

    হইচই-এর এই সিরিজটি হল মিনি সিরিজ অর্থাৎ অন্যান্য সিরিজের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম দৈর্ঘ্যের। তা নিয়ে সমস্যা ছিল না। কিন্তু মিনি বলেই চরিত্র ও ঘটনাগুলি রণপায়ে হেঁটে যাবে এবং দর্শক হাঁফাতে হাঁফাতে পিছনে ছুটবে, তা কি কাম্য? ৫ এপিসোডে গল্পটি শেষ হয়, কিন্তু দানা বাঁধে না। পুরোটাই বিজ্ঞাপনী তারাবাজি। আহা, ইন-ফিলিম ভালো। কড়ি না ঠেকালে জীবনে প্রেম টিকিয়ে রাখাও যে মুশকিল, সিরিজের চিত্রনাট্যকার নিজেই তা বেশ ‘পষ্ট’ করে বুঝিয়ে দিয়েছেন এই গল্পে। কিন্তু তা বলে এত নির্লজ্জভাবে ইন-ফিলিম?

    প্রেম সপ্তাহ নিয়ে আপনি যতটা না ভাবিত, বিজ্ঞাপনদাতারা তার শতগুণ হবেন, সেটাই কাঙ্ক্ষিত এবং বাঞ্ছিত। রথের মেলায় পূজাবার্ষিকী প্রকাশের মতোই, পরবর্তী বছরের প্রেম সপ্তাহের পোঁ শোনা যায় নাকি শারদোৎসবের ছুটি খতম হলেই। তবে কেন এত হেলা হে নাথ? বাঙ্গালার (ঙ টাইপ না করাটা এক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত) সর্ববৃহৎ ওটিটি মাধ্যমের ভ্যালেন্টাইন ধামাকায় কেন এত চেয়ে-থাকা সবজি সমাহার?

    সেনকো গোল্ডের ভ্যালেনটাইন অফার, সোনার আংটিতে ছাড় ইত্যাদি যখন গন্তব্য, তখন সিরিজের প্রথম এপিসোডেই একটি মুখ্য চরিত্র বলে বসে— বিয়ে করতে হলে, একটা ডায়মন্ড রিং কিনে, এক পায়ে বসে, প্রেমিকাকে বলতে হয় আই লাভ ইউ। এই উথাল-পাথাল বিজ্ঞাপনী ভারে সংলাপের ঢেউ-কুচকুচ যখন একদিকে ঝুলে গিয়েছে, তখন তাকে ঠেকনা দিতে এল পরবর্তী লাইন—আর সেই রিংটা নিজের টাকায় কেনা হতে হয়।

    আসলে ‘টুরু লাভ’ যতটা না সেনকো গোল্ডের বিজ্ঞাপন, তার চেয়ে অনেক বেশি আত্মনির্ভরতার ক্যাম্পেন। আইটি সেল কেন যে এখনও এর মাহাত্ম্য অনুধাবন করল না, তা আর এক আশ্চর্যের বিষয়। বামপন্থী বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ও প্রলেতারিয়েত সম্পর্কে এই শ্রেণির ধারণা নিয়ে যে নিম্নমানের হাস্যকৌতুক তৈরি করা হয় এই সিরিজে, তা থেকে মেকারদের রাজনৈতিক অন্তঃসারশূন্যতা অত্যন্ত প্রকট।

    আর মেকিংয়ের কথা না তোলাই ভাল। পরিচালক অভিজিৎ চৌধুরীর এযাবৎ নিকৃষ্টতম কাজ। এই সিরিজটি হইচই-এর ফ্রি কনটেন্ট। সাবস্ক্রিপশন ছাড়াই দেখা যায়। সম্ভবত এটা বিজ্ঞাপনদাতাদের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিউ জেনারেট করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু তা বলে মুফতের মালের কোনও মান থাকবে না? এখানে মান একমাত্র ধরে রেখেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা, বিশেষ করে রাজনন্দিনী, ঋষভ, ঊষসী, পিঙ্কি এবং সুমিত। বাংলা থিয়েটারের নব্য প্রজন্মের অন্যতম দক্ষ অভিনেতা রাজু বেরা একেবারেই অব্যবহৃত। আসলে মেইনস্ট্রিম মাধ্যমগুলির এটাই সমস্যা। এরা শুধুই গ্লস বোঝে, ম্যাট নয়।

    এই সিরিজ নিয়ে তার চেয়েও বড় আপত্তি প্রেমের সংজ্ঞা গুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা নিয়ে। আসলে যত সময় এগোচ্ছে, মেকি গতিময়তায় হারিয়ে যাচ্ছে ভাবনার গভীরতা। যে প্রজন্ম প্রেম বলতে বুঝত অপুর সংসার, সেই প্রজন্ম ঠিকঠাক উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারেনি বোধহয়।

    অথচ তা-ই বা বলি কী করে? উত্তরা-ও তো ছিল অথবা সাম্প্রতিক অতীতে এসেছে লেবার অফ লাভ। যে কোনও সময়কালে, যে কোনও প্রেক্ষাপটে সত্যিকারের প্রেম বা ট্রু লাভ সবসময় লারজার দ্যান লাইফ। নাহলে সেটা প্রেমই নয়, সম্পর্কের সমঝোতা মাত্র। ওয়েব সিরিজের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যমে, প্রেম যদি এভাবে, এত ঠুনকো হয়ে ধরা দেয়, তবে তা দুশ্চিন্তার।

    টুরু লাভ আদতে কোনও প্রেমের গল্পই নয়, একটি মোড়ক দেওয়া বিচ্যুতি মাত্র।

  • বিভাগ : সমোস্কিতি | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ৫০৪ বার পঠিত | ২ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সত্যিকারের প্রেম বা ট্রু লাভ সবসময় লারজার দ্যান লাইফ | 165.225.8.109 | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ২৩:২৮103104
  • ওফ্ফ্ফ্ফ্ফ্ফ 


    জাআআস পারা যায় না! 

  • dc | 2405:201:e010:5038:28ed:313a:9ec:a52c | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৮:৩০103107
  • টুরু লাব ইজ লার্জার দ্যান লাইফ - এক্কেবারে খাঁটি কথা। সেজন্যই তো কবি গেয়েছেন - প্রেম জেগেছে আমার মনে বলছি আমি তাই, তোমায় আমি ভালোবাসি তোমায় আমি চাই। উরি উরি বাবা উরি বাবাগো! 

  • Asim Bhattacharya | ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ০৯:৫০103108
  • ভালই লিখেছেন তো।আরো লিখুন

  • বিপ্লব রহমান | ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৯:৩২103121
  • পুরাই ন্যাকাবোকা পোলাপান ছবি, ইন্টারনেট  ডেটার অপচয়! 


    আরও লিখুন 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

turu love, turu love web series, hoichoi turu love, hoichoi turu love web series, what is love, what is true love, Love and Politics, Bangla Web Series, Turu Love Web Series Review
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন