• হরিদাস পাল  আলোচনা  সমাজ

  • আয়শা সিদ্দিকা কাজী হইতে পারিবে না! 

    Muhammad Sadequzzaman Sharif লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | সমাজ | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৪৯৯ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • অদ্ভুত এক হাস্যকর কাণ্ড ঘটে গেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের হাই কোর্ট এক রায়ে নারীরা কাজী হতে পারবে না বলে দিয়েছেন। কেন এমন রায়? কারণ হিসেবে বলেছেন যেহেতু বিয়ের সাথে ধর্মীয় ব্যাপার জড়িয়ে আছে আর নারীরা মাসের ভিতরে কিছুদিন অপবিত্র (!) থাকে তাই তাদেরকে বিয়ের পড়ানোর মত পবিত্র কাজে যোগ করা যাবে না। আর সব চেয়ে মজার বিষয় যেটা তা হচ্ছে এই রায় যে দুইজন বিচারক মিলে দিয়েছেন তাদের একজন নারী! কি চমৎকার না?

    এই রায়ের ইতিহাস বলা প্রয়োজন আগে। ঘটনা হচ্ছে ২০১২ সালের। দিনাজপুরের ফুলবাড়ি উপজেলার কাজী পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আয়শা সিদ্দিকা নামের এক নারী কাজী পদের জন্য আবেদন করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কোথাও শুধু মাত্র পুরুষের জন্য এই পদ এমন কিছু লেখা ছিল না। আর যেহেতু তিনি আর বাকি সব দিক দিয়ে যোগ্য ছিলেন তাই তিনি আবেদন করে দেন। যথা সময়ে পরীক্ষা হয়, তিনি প্রথম হন। তার সাথে আরও দুইজন নারী আবেদন করেন। এবং পরবর্তীতে পুরো প্যানেলকেই বাদ দেওয়া হয় শুধু মাত্র নারী এই যুক্তিতে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, রাত বিরাতে বিয়ের জন্য যেতে হবে ইত্যাদি নানান কারণ দেখিয়ে তাদের না করে দেওয়া হয়। এবার শুরু হয় আয়শার লড়াই। ২০১৪ সালে তিনি আদালতে যান। আইনের কোথাও নারী হিসেবে নিকাহ রেজিস্টার হতে পারবে না এমন কথা না থাকার পরেও এতদিন পরে আদালত এই রায় দেয় যে নারী বিবাহ পড়াতে পারবে না। আয়শা সিদ্দিকা আবার আবেদন করবেন বলে জানিয়েছেন। কি হতে পারে এখনই অনুমান করা যাচ্ছে। বিশেষ করে মানুষের যে পরিমাণ সমর্থন এই কয়দিনে আদালত পেয়ে গেছে তাতে আরও সহজ হয়ে গেছে এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার। আমার দুইটা কথা না বললে ভাল লাগছে না তাই লিখতে বসছি।

    বিষয়টা কয়েকদিক দিয়েই হাস্যকর, অযৌক্তিক। আদালত বলেছে আমাদের দেশে বিয়ে নাকি বেশির ভাগ মসজিদে হয়, আর যেহেতু অপবিত্র (!) অবস্থায় নারী মসজিদে যেতে পারবে না তাই তারা এই পদের জন্য অযোগ্য! এইখানেই আমার প্রথম কথা। আমার জীবনে আমি দুই একটা বিয়ে শুনছি যে মসজিদে হয়েছে। আজ পর্যন্ত মসজিদে বিয়ে খাইতে পারি নাই। অমুকের অমুক মসজিদে বিয়ে করছে শুনছি, এ ছাড়া আমার মসজিদে বিয়ের কোন অভিজ্ঞতা নাই। বেশির ভাগ বিয়ে মসজিদে হয়, নারী যেতে পারবে না ধরনের আজগুবি কথার মানে কি?

    আরেকটা বিষয় খেয়াল করার মত। নিকাহ রেজিস্টারের কাজ বিয়ে পরানো না। সে লেখালেখি করে, সাক্ষী সই সবুদ নিবে আর ধর্মীয়ে যে কাজ তার জন্য আলাদা ব্যবস্থা। রেজিস্টার বইয়ে দুইটা অংশই থাকে। রেজিস্টার কে আর বিয়ে কে পড়িয়েছে। সব জায়গায়ই এই একই কাজ হয়। ঘরে আর মসজিদে যেখানেই হোক না কেন বিয়ে, নিয়ম একই। তাহলে কীভাবে নারী কাজীর পদে অযোগ্য হয়?

    এবার অপবিত্র নামক আশ্চর্য এক অশ্লীল কথার কথা বলতে হয়। মাসিকের সময় নারী অপবিত্র থাকে! এই যুক্তি যদি মেনে নেই তাহলে কেউ কি বলবেন আমাকে কোন বিয়ের কনের বিয়ের দিন মাসিক হলে তাকে অপবিত্র বলে বিয়ে বন্ধ করে রাখা হবে না কেন? এই মহা পবিত্র কাণ্ডে তো তাকে সামিল করা যাবে না, তাই না? কিংবা যারা অপবিত্র অপবিত্র বলে গলা ফাটাচ্ছেন তারা কি পোস্ট মেনোপোজাল নারীকে কাজী হিসেবে মেনে নিবেন? তখন অন্য কোন যুক্তি এনে হাজির করবেন না তো?

    যুগের পর যুগ নারীকে এমন নানান খোঁড়া যুক্তিতে পিছনে ফেলে দেওয়া হয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর প্রবল পুরুষতান্ত্রিক ধর্ম গুলো এই কাজে সহযোগিতা করে গেছে। কোন ধর্মই পিছিয়ে নেই এই কাজে।নারীকে নানান ছুতায়, নানান অপবাদ দিয়ে পিছনে ফেলতে সকল ধর্ম, জাতি গোষ্ঠী মিলে মিশে একাকার। কেউ কারো কাছ থেকে পিছিয়ে নেই এক রত্তিও। আজকে আয়শা আইনি লড়াই করছে আরেক আয়শা বহু বছর আগে যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু আমরা আলোচনা করব আয়শা কয় প্রস্থ পর্দা করছেন তা নিয়ে। আমরা আলোচনা করব তার পরম পতি ভক্তি নিয়ে এবং সব গুলিয়ে খেয়ে ফেলব, তারপর কঠিন পর্দার আদেশ জারি করব। অপবিত্র বলে ছুঁড়ে ফেলে দিব নারীকে।

    আমরা মন্দিরে নারীকে দেবী হিসেবে বসাব। মা মা বলে কেঁদে বুক ভাসব। শক্তির প্রতীক, জ্ঞানের প্রতীক, অর্থের প্রতীক রূপে নারীকে কল্পনা করব আর নারীকে বলব অপবিত্র, তুমি মন্দিরে প্রবেশ করতে পারবা না! হয় মন্দিরের মাতৃ মূর্তি শুধুই মূর্তি, তারা দেবী, মানুষ না, তাদের মাসিক নামক অপবিত্র কোন কিছুর বালাই নাই, তাই তারা মন্দিরে থাকতে পারে আর রক্তে মাংসের জ্যান্ত মানুষের যেহেতু সেই সুযোগ নাই তাই তারা অপবিত্র অবস্থায় মন্দিরে যেতে পারবে না। তাই যদি হয় তাহলে তাদেরকে নারী রূপে কল্পনাই বা করা কেন?

    কিন্তু আমরা জানি এই সব সত্য না। সত্য হচ্ছে নারী অপবিত্র বলে নারীকে ঠেলে আরও দূরে, আরও পিছনে পাঠিয়ে দেওয়া। আর তাই নতুন কোন কাজে এখন বাঁধা হয়ে হাজির ধর্ম, সমাজের দোহাই। বিচারক রায় লিখতে পারছেন, রাষ্ট্র চালাচ্ছেন আর বিয়ের রেজিস্টার হতে পারবে না? জল স্থল অন্তরিক্ষ জয় করছে নারী আর আমরা এখন হিসাব নিয়ে বসছি মাসিক অপবিত্র, কাজেই তুমি বাদ!

    পুরুষ হিসেবে আমার মনে মাঝে মধ্যেই সন্দেহ হয় আমরা কি অবস্থান হারানোর ভয়ে এমন করি? নারী ধা ধা করে আমাদের ফেলে এগিয়ে যাবে, এতদিনের সমস্ত তাচ্ছিল্যের, সমস্ত অপমানের শোধ নিবে এই ভয়ে আমরা কি আজো, এই একুশ শতকে এসেও হাস্যকর যুক্তি দিয়ে নারীকে পিছনে ঠ্যালার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছি? কিন্তু অন্ধ হলেই কি প্রলয় বন্ধ থাকবে?
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৩ জানুয়ারি ২০২১ | ৪৯৯ বার পঠিত | ১ জন
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে প্রতিক্রিয়া দিন