এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • একই চরিত্র – ছায়ায় মায়ায় – অনেক চরিত্র

    Pradhanna Mitra লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ এপ্রিল ২০২৪ | ১৯৩ বার পঠিত


  • “’অদ্বৈতসিদ্ধি’ গ্রন্থটি সে সমাপ্ত করিয়াছে। ইহার কঠোর যুক্তিজাল সে আজিকালি অধ্যাপনা করে। এইসব অন্ধকার রাত্রির গর্ভের ভিতর বসিয়া সংশয় আসে, কে তাহার গ্রন্থ মনে রাখিবে? শতাব্দী অতিক্রান্ত হইবার পর কেহ ইহা পড়িবে কি? অথবা, ইহা একটা নামমাত্র বাঁচিয়া রহিবে? এত কঠিন বিতর্কবিন্যাস ভাবীকালের মানবকের উপযোগীতাবাদী মস্তিষ্কে প্রবেশ করিতে পারিবে? অথবা, সে শুধু একটা কিংবদন্তী হইয়া বাঁচিয়া রহিবে? ইহার বেশি কিছু নয়! কেহ বলিতে পারে না। কত মহামহোপাধ্যায়ের গ্রন্থ কালের বিবরে হারাইয়া গিয়াছে, এ গ্রন্থও সেইসব লুপ্তচিহ্ন গ্রন্থরাজির পন্থা অনুসরণ করিবে কি না, কোন্‌ ক্রান্তদর্শী তাহা বলিয়া দিতে পারে?”

    সন্মাত্রানন্দের ‘ছায়াচরাচর’ উপন্যাসের প্রোটাগনিস্ট চরিত্র মধুসূদন সরস্বতী এক পর্যায়ে এসে এমন একটা ভাবনা ভাবছেন। তিনি জীবদ্দশায় কিংবদন্তী হয়ে পড়েছিলেন, এতটাই যে, জ্ঞানী অদ্বৈতবাদী এই সন্ন্যাসী সম্পর্কে প্রচলিত ছিল,

    বেত্তি পারং সরস্বত্যাঃ মধুসূদনসরস্বতী।
    মধুসূদনসরস্বত্যাঃ পারং বেত্তি সরস্বতী।।

    মধুসূদন সরস্বতীর জ্ঞানের সীমানা যে কোথায়, তাহা একমাত্র বিদ্যার দেবী সরস্বতী জানেন। আর সরস্বতীর সীমা কোথায়, তাহা মধুসূদন সরস্বতীই জানেন।

    কিন্তু, লেখকের ভাবনাকে ছাপিয়ে যদি বলতে হয়, সময়ের কয়েকশো বছর পার হয়ে এসে, তাহলে, মধুসূদন সরস্বতী তার নিজের কার্য সম্পর্কিত ভাবনাটি যে অমূলক নয়, তা প্রমাণিত। সাধারণ মানুষ যদি তার সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জানতে চায়, তাহলে বলা যেতে পারে যে ---

    মধুসূদন সরস্বতী (১৫২৫ — ১৬৩২) ঊনসিয়া-ফরিদপুরে থাকতেন। চন্দ্ৰদ্বীপের রাজা কন্দর্পনারায়ণের সভাসদ কবি প্রমোদন পুরন্দরাচার্য। শৈশবে পিতার কাছে শিক্ষালাভ করেন। মথুরানাথের কাছে ন্যায়শাস্ত্ৰ, বারাণসীর বিখ্যাত পণ্ডিতদের কাছে দ্বৈত ও অদ্বৈতবাদ ও আচার্য রামতীর্থের কাছে বেদান্ত শেখেন। এইখানেই মহাপ্ৰভু-প্রবর্তিত দ্বৈতবাদ থেকে শঙ্কারাচার্যের অদ্বৈতবাদে তাঁর বিশ্বাস ও উপলব্ধি হয়। দীর্ঘ পরিশ্রমে তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্ৰন্থ ‘অদ্বৈতসিদ্ধি’ রচনা করেন। এরপর বিশ্বেশ্বর সরস্বতীর কাছে সন্ন্যাসে দীক্ষা নিয়ে ‘সরস্বতী’ উপাধি পান ও গীতার টীকা প্ৰণয়ন করেন। বারাণসীতে বাসকালে বহু ছাত্রকে শিক্ষাদান করেন। দিল্লীর রাজসভায় যথেষ্ট প্রতিপত্তি থাকার ফলে আত্মরক্ষার্থে সন্ন্যাসীদের অস্ত্ৰ ব্যবহারের অনুমতিলাভে সমর্থ হন। শঙ্করাচার্যসৃষ্ট সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের সংস্কার সাধন করেন। শেষ-জীবনে নবদ্বীপে প্ৰত্যাগমন করলে অদ্বৈতবাদের অদ্বিতীয় পণ্ডিত হিসাবে নবদ্বীপের বিশিষ্ট বিদ্বজ্জন দ্বারা সংবর্ধিত হন। মায়াপুরীতে যোগ-সমাধিস্থ অবস্থায় মারা যান। তাঁর রচিত ‘ভক্তি রসায়ন’, ‘সিদ্ধান্ত বিন্দু’, ‘মহিমঃস্তোত্র’ টীকা উল্লেখযোগ্য।

    উইকিপিডিয়া যা জানাচ্ছে, তাতে মাত্র তিন প্যারাতেই তার পরিচয় শেষ। অর্থাৎ, মধুসূদন সরস্বতীর লেখা হয়তো, বর্তমানে, স্কলারি আর্টিকেল হিসাবে কলেজের অধ্যাপকেরা, কিম্বা অদ্বৈত সন্ন্যাসী ছাত্রেরা, অথবা সংস্কৃত ভাষাচর্চাকারী কৃতি ছাত্রছাত্রীরা, তাদের মধ্যে কতিপয়, পড়ে থাকতে পারেন। কিন্তু মোদ্দা কথা হল এই, তিনি লোকবিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছেন। তার একটাই কারণ, আমার মনে হয়, সাধারণ জনসমাজে তার চিন্তার কোন প্রভাব বিস্তার হতে পারে নি, যেমনটা হয়েছেন শঙ্করাচার্য, যেমনটা হয়েছেন গোস্বামী তুলসীদাস।

    তাকে আবার জনসমক্ষে আনার চেষ্টা করেছেন সন্মাত্রানন্দ। এখন সন্মাত্রানন্দের এই উপন্যাস সম্পর্কে কিছু বলার আগে আরও দু-চার কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তর্জমাকার আশিস দেব একটি বইয়ের মুখবন্ধে লিখেছেন, “ধ্রুপদী চীনা বা ভারতীয় সাহিত্য অনেক সময়েই পশ্চিমের আরিস্ততলীয় সাহিত্যতত্ত্ব মেনে চলে না। চীনা সাহিত্যে একটি ধারা আছে, যেখানে অনেকগুলো কাহিনী পুঁতির মালার মতো গাঁথা হয়েছে একের সঙ্গে অন্যের যোগ আছে, আবার প্রত্যেকে আলাদাও বটে।” এর একটা উদাহরণ সম্প্রতি আমি পেয়েছি জাপানী সাহিত্যিক কিয়েগি হিগাশিনো’র ‘দ্য জেনারেল নামিয়া স্টোর’ উপন্যাসে। সন্মাত্রানন্দ, ঠিক এই প্যাটার্নটাকেই এখানে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। পার্থক্য এই যে, এখানে একই চরিত্র বিভিন্ন রূপে-রূপান্তরে এসেছে। অর্থাৎ, একই মধুসূদন সরস্বতী বিভিন্ন মধুসূদন সরস্বতী হয়ে কালচক্রের সমান্তরালে এক-এক চরিত্রে যেন অভিনয় করে গেছেন, এবং, মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে ‘ক্রস’ হচ্ছে, তারা মুখোমুখি হচ্ছেন। এইভাবে তিনি এই চরিত্রটিকে অনেকটাই সার্থকভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন, এবং আমার মতে, সফলও হয়েছেন। 

    এছাড়া আর কি-ই বা করার ছিল তার? এমন কৃতবিদ্য এক মহান পন্ডিত সম্পর্কে উইকি-তে যেখানে তিন প্যারার বেশি নেই, সেখানে তিনি উপন্যাসটাকে আড়াইশো পৃষ্ঠা পর্যন্ত টানতেন কি করে? তাও সম্ভবপর হত, যদি মধুসূদন সরস্বতী’র লেখাগুলোর সূত্র ধরে অদ্বৈত বেদান্তবাদের সাথে দ্বৈতবাদের নির্মম দ্বন্দ্বের কূটতর্কের আরও গভীরে যেতেন।

    হয়তো ওনার সে ক্ষমতাও ছিল। যতটুকু এই অদ্বৈতবাদ ও মায়াবাদ নিয়ে লিখলেন, তাতে আমার অন্তত তাই মনে হল। কিন্তু অত গুরুপাক বাংলা সাহিত্যের সরলমতি পাঠক-পাঠিকাদের সহ্য হত না। ফলে, তাকে একটু ‘কম্প্রোমাইজ’ করতে হল। এক চরিত্রকে চার ভাগ করে চারটে গল্প ফাঁদতে হল। বেচারা মধুসূদন সন্ন্যাসীর এক চরিত্রকে লুতুপুতু প্রেম করতে হল; আর এক চরিত্র মহাপ্রভুর শিষ্য হয়ে মায়াবাদী হয়ে গেল; অন্য এক চরিত্র অদ্বৈতবাদ ও নাগা সন্ন্যাসী সহযোগে সমাজে ধুন্ধুমার বাঁধিয়ে দিল, এবং আরেক চরিত্র বাঁশির সুরে সুরে এক অপার্থিবকে স্পর্শ করার জন্য পাগলপারা শিল্পী হয়ে গেল। পদ্মাক্ষ, রাজীবলোচন, কমলনয়ন, উৎপলদৃষ্টি --- চার পাগলে মিলে ছায়াচরাচরে দাপাতে লাগল। দুর্ভাগ্য, পাঠকদের সেটা বোঝানোর জন্যে, তাকে এক ‘যোগিনী’ এবং ‘যোগবশিষ্ঠ’-র স্মরণাপন্ন হতে হল। গল্পের জটিলতার মাধুর্যকেও সরলমতি পাঠকদের খাতিরে সরল হতে হল। নিজের প্রতি আশঙ্কা, না কি পাঠকদের ওপর আত্মবিশ্বাসের অভাব? না কি এটাই বাস্তব অবস্থা!

    তবুও, সন্মাত্রানন্দকে কেয়াবাৎ। আলাদা গল্প নয়। এক চরিত্রে চার সমান্তরাল গল্পকে একসূত্রে বলার চেষ্টা, তাও ‘শরদিন্দুক’ সাধুভাষায়। তার লক্ষ্য যদি বর্তমান জেনারেশানে যুবক-যুবতীরা হত, তাহলে এই সাধুভাষার কূটভাষ্যে যেতেন না। মাঝখান থেকে তাকে একটা জেনারেশান হারাতে হল। সাধুভাষাটা সবার যে আসে না, বিশেষত, যাদের বাংলাটা ঠিক আসে না, তাদের তো আরও।

    সন্মাত্রানন্দের মধ্যে ভাবের গভীরতা পাই; সন্মাত্রানন্দের মধ্যে অতীতকে খুঁজে বের করার তাগিদ পাই; সন্মাত্রানন্দের মধ্যে একটু অন্যরকম স্টাইলে লেখার প্রচেষ্টা পাই। কেবল তাকে আমার একটাই অনুরোধ, প্রকাশকদের ‘শারদীয়া’ বায়না থেকে সরে গিয়ে একটা, বছরে একটা এরকম লেখা লিখুন। গভীরে গিয়ে, যতটা গভীরে গিয়ে লিখলে আপনার আত্মা প্রসন্ন হয়, ততটা গভীরে গিয়ে লিখুন। আপনি অলরেডী একজন সেলিব্রিটি হয়েই গেছেন, আপনার আর ভয় কি? অদ্বৈততত্ব এবং দ্বৈততত্ত্বের আরও গভীর আলোচনা, সুচিন্তিত আলোচনা, তৎকালীন সমাজে তার আরোও গূঢ় প্রভাব আপনার লেখায় আমি আশা করেছিলাম, যাতে করে ভাষা ভাষা ধারনা থেকে এগিয়ে গিয়ে পাঠকের দিক থেকে একটা চিন্তার উৎকর্ষের দিকে ঠেলে দেওয়া যায়। সেখানে হয়তো পাতার পর পাতা জুড়ে আপনি এ আলোচনা দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করতে পারতেন। বইয়ের বপু বাড়ত, কিন্তু তা সার্থক হত। তেমন হলে নারায়ণ সান্যালের মতো (নক্ষত্রলোকের দেবতাত্মা, মনে পড়ে আপনার?), আপনি লিখতেই পারতেন যে, পাঠকেরা যদি গল্প পড়তে এসে থাকেন, তাহলে, তারা এই অংশটা বাদ দিয়ে পরের পর্বে চলে যান। এ অংশটা কৌতুহলী পাঠকদের জন্য।    

    ============================

    ছায়াচরাচর
    সন্মাত্রানন্দ
    ধানসিঁড়ি
    মুদ্রিত মূল্যঃ ৪০০ টাকা
    ছবি কৃতজ্ঞতাঃ ধানসিঁড়ি, সমর্পিতা
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কিছু লেখকের মতামত | 2409:40e6:2d:8e95:f836:e5ff:feba:8936 | ১১ এপ্রিল ২০২৪ ১০:০৬530454
  • মলাটে অর্জুনদেব সেনশর্মা লিখলেন, 

    হিন্দু খতরে মে হ্যায় 
    ...........................

    সন্মাত্রানন্দ শোভনের 'ছায়াচরাচর' পড়লাম। হবাল্টার স্কট ঐতিহাসিক আখ্যানের ক্ষেত্রে একটি শর্ত দিয়েছিলেন, খ্যাতকীর্তি ব্যক্তিকে উপন্যাসের নায়ক না করাই শ্রেয়। তাতে লেখকের কল্পনাশক্তির সঙ্গে সিদ্ধরসের সঙ্ঘাত হতে পারে।
    আজকের লেখক, বঙ্কিমচন্দ্র থেকে সেলিনা হোসেন, শরদিন্দু থেকে সন্মাত্রানন্দ কেউই সে শর্ত মানেন নি।
    কিন্তু শুধু সিদ্ধরসের সঙ্গে সঙ্ঘাতই নয়, অশিক্ষার প্রসারের ও যে এটি একটি বড় মাধ্যম, তাও অস্বীকার করে লাভ নেই।
    স্বয়ং হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বেণের মেয়ে লিখে যে ঐতিহাসিক 'দুবিধা'(Binary)র মধ্যে বাঙালিকে স্থাপন করেছিলেন, তাকেই প্রলম্বিত করে বাংলাদেশের লেখককুল ইতিহাসের আভিপ্রায়িক উপস্থাপন করে চলেছেন।
    এই আভিপ্রায়িকতাদোষ ঐতিহাসিক উপন্যাসের মূল দোষ।
    এই উপন্যাসটিতে শোভন কী করেছেন। একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্তমান রাজনীতির মধ্যে দাঁড়িয়ে রণোন্মুখ হিন্দুর হয়ে যুক্তি সাজাতে একটি অনৈতিহাসিক কল্পকাহিনির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি কিছু শাস্ত্র পড়েছেন। সে যা বুঝলাম, খুবই উপরিতলচারী। সেই শাস্ত্রজ্ঞানে তিনি বুঝেছেন, হিন্দুধর্ম, হিন্দু ধর্মের অস্তিত্ব বিষয়ে উদাসীন। সেই উদাসীনতার মিনমিনে একটি ডিসকোর্স পাশে রেখে, তিনি মধুসূদন সরস্বতীকে একদিকে যুদ্ধবাজ, অন্যদিকে রসাস্বাদী করে এক আশ্চর্য চরিত্র হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এই অসাধ্যসাধন করতে গিয়ে তিনি অযথা অনৈতিহাসিক কল্পনায় উপন্যাসটি ভরিয়ে তুলেছেন। যেখানে তাতেও কুলোয়নি, সেখানে এনেছেন অতিপ্রাকৃতর ব্যবহার। বঙ্কিমচন্দ্রের দেওয়া শর্তানুসারে অতিপ্রাকৃত সেরকমই হবে যা অতিপ্রাকৃতবৎ হবে, কিন্তু অতিপ্রাকৃত নয়। এই শর্ত একমাত্র অত্যাধুনিক লাতিন আমেরিকীয় উপন্যাসগুলি ছাড়া, মোটামুটি অনুসৃত। শোভন বলতে পারেন, এই অতিপ্রাকৃত অংশগুলি লোকবাহিত। কিন্তু অনেকগুলিই লোকবাহিত নয়। সেগুলিকে আধ্যাত্মিকও করে তুলবার ক্ষমতা শোভনের নেই, যে সেগুলি গ্রহণযোগ্য মনে হবে, কারণ তিনি লিখছেন উপন্যাস, কোনো দিব্যজীবনী নয়। ফলে বেদান্তের একটি মাত্র সূত্র অর্থাৎ সবকিছুই সবকালে হয় শূন্য, নয় সর্বতোব্যাপ্ত এই শর্তের সাহায্যে তিনি পরপর কয়েকটি চরিত্রের সন্নিবেশ করে গেছেন, তাদের অবাস্তব সংলাপ লিখে গেছেন, কিন্তু সংলাপগুলি অত্যন্ত ক্লিসে। এই একটি সংলাপও কোনো মহতী শিল্প বা প্রস্থান কিছুই হয়ে ওঠেনি।

    তাঁর ভাষায় শরদিন্দুর অক্ষমতম অনুকরণ আছে। সেট তৈরিতেও শরদিন্দুর ব্যবহৃত চিন্তারত নায়ক ও নদীতটের পুন:পুন: ব্যবহার আছে। তাঁর সব রাজপুরুষেরই মুখ কিশোরের মত সরল, কিন্তু গাল ভারী, চোখের তলা স্ফীত।
    কিন্তু এসব 'এহ বাহ্য'। আকবর শাহী দরবারে ইমামের সঙ্গে ঝগড়া করে, মুসলিম পেটানোর জন্য হিন্দু সৈন্য তৈরি করতে, হিন্দু দার্শনিককে অর্থ দিচ্ছেন, এবং সেই টাকায় কাশীশহরে নাগাসন্ন্যাসীরা আক্রমণোদ্যত মুসলিমের মাথা কেটে নিচ্ছে, এমন ঐতিহাসিক কল্পনা তো আজকের দিনেই কতটা সম্ভব বোঝা যাচ্ছে না। আবার এই কল্পনাটি লেখকের নিজের মনোমত কিনা তা গুলিয়ে দিতে বৃদ্ধ দুই সন্ন্যাসীকে ক্ষীণকণ্ঠ বিরোধী হিসেবে রেখে দিয়েছেন।
    শ্রীজীব তুলসীর মালা খুলে, ছদ্মপরিচয়ে শ্রীপাদ মধুসূদনের কাছে অদ্বৈতবাদ পড়তে যাচ্ছেন, এমন কল্পনা তো রসভঙ্গের মধ্যে গণ্য হবে। শ্রীজীবাদি কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে বেশাশ্রয়ের প্রধান অবলম্বন ত্যাগ করবেন, এ একপ্রকার অসম্ভব। শ্রীপাদ মধুসূদন সরস্বতীর সঙ্গে শ্রীজীবের সাক্ষাৎ হয়েছিল, এ আমি কুত্রাপি শুনিনি বা পড়িনি, শ্রীজীব কাশীতে উপস্থিত হয়েছিলেন, মধুসূদন বাচস্পতির কাছে বেদান্তপাঠ করেন। শোভন উভয় মধুসূদনের সন্নিপাত করেছেন। নাগা সন্ন্যাসীদের অস্ত্রবিদ্যা ভগবৎপাদ শঙ্করের সময় থেকেই পাওয়া যায়। তাঁরা শুধু মুসলিমদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেন নি। তাঁরা অযোধ্যার নবাবের সৈন্যদলেও ছিলেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ভাবে এইসব হিন্দু সন্ন্যাসীরা ব্যবহৃত হয়েছেন। এঁরা ইংরেজের বিরুদ্ধেও বিদ্রোহ করেছেন। কাশীতে আকবরের অর্থে শ্রীপাদ মধুসূদন সরস্বতী নাগাসন্ন্যাসীদের সংগঠিত করছেন, এই ঐতিহাসিক কল্পনা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। শোভন আসলে পসিবিলিটি দিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। প্লসিবিলিটি দিয়ে লেখেননি। আরও বড়কথা, নাগাসন্ন্যাসীরা ভিন্নমতে অসহিষ্ণু। অ-হিন্দুমতই সেই ভিন্নমত হতে হবে, তার কোনো মানে নেই। শোভন ভূমিকায় লিখে দিলেই পারতেন, নাগা সন্ন্যাসীরাই নাগপুরে আস্তানা গড়েন। তবে সোনায় সোহাগা হত। আরো একটি অংশে আমার সবিশেষ হাসি পেয়েছে। আকবরের তৃতীয়া স্ত্রীর ছেলের জন্মের পর পেট ব্যথা শুনে, সরস্বতীপাদ তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন- ছেলের নাম কী। নাম 'সেলিম' শুনে সরস্বতীপাদ ভাবলেন, পাপের ভারে পৃথ্বীজননীর চাপ হচ্ছে, তাঁরও যেন পেটব্যথা করছে। পরে আগ্রায় তিনি সেলিম চিস্তির মনস্কামনা দরগা দেখেন। এই উপন্যাসে সেলিম আসেনও নি। সেলিম-সূত্রে পেটব্যথা এসেছে। এইখানে বুদ্ধজননীর বুদ্ধজন্মের পরে সেপটিকরোগে মৃত্যু না রাহুলের জন্মের পরে, গৌতমের তাঁর পুত্রকে রাহুরূপে ভাবা, কোনটি লেখককে প্রভাবিত করেছে, তা অস্পষ্ট। কিন্তু প্রভাব স্পষ্ট। কারণ আর কোনো উদাহরণ নেই। আচ্ছা সেলিমের নাম শুনেই যদি সরস্বতীপাদের পৃথিবীময় পাপের কথা মনে আসে, তাহলে আগ্রায় সেলিম চিস্তির দরগা দেখে, তাঁর কী ধারণা হল। তা লেখক বলেননি। কিন্তু কী বলতে চেয়েছেন, তা একান্ত অস্পষ্ট।

    ভাষা অমসৃণ। তৎসমশব্দের ব্যবহারে লঘুগুরুধ্বনিতরঙ্গময় যে অনুপ্রাসের ব্যবহার শরদিন্দুর বাক্যবন্ধের হার্দ্যতম সংঘটনা, শোভন তা পারেননি।
    উপন্যাসটি দুর্বল। কেন? ঐ যে বলেছি, লেখকের একটি বিশেষ ডিসকোর্সকে প্রতিষ্ঠা করবার জন্য আকস্মিকভাবে নায়কচরিত্রের নির্বাচন। অথচ সেই এজেণ্ডার সঙ্গে মধুসূদন সরস্বতীর আদৌ কোনো বিশেষ যোগ নেই।

    উপন্যাসটির আরেক বৈশিষ্ট্য 'সম্ভাবনা'। লেখক নিজেই পাঠককে সম্বোধন করে একবার বলেছেন, একটি চরিত্র, আরেকটি চরিত্রের আরেকরকম সম্ভাবনা। অন্তত তিনজোড়া চরিত্রের মধ্যে এইরকম সম্ভাব্যতার সূত্রে বাঁধা আছে। সম্ভবত এইজন্যই 'ছায়াচরাচর'। কিন্তু এতো ব্রেখটীয় নাটক নয়। চরিত্রের একাধিক সম্ভাবনার সুযোগ নিশ্চয় থাকে। কিন্তু চরিত্রটি তো একটিই থাকে। আসলে এই জোড়গুলি তৈরি করে, সরস্বতীপাদের জীবনবিবর্তনের কারণ দেখানোই হয়তো লেখকের অভিপ্রায়। কিন্তু এজাতীয় একচরিত্রের সমার্থক নামের আরেক চরিত্র এনে, তার জীবন আরেকরকম ভাবে গড়ে, দুইকে মেলাতে বা না-মেলাতে লেখক হিমসিম খেয়েছেন। তাই বঙ্কিমীভঙ্গিতে তার একটা ভূমিকা করেছেন। কাঁচা হাতের কাজ, বলাই বাহুল্য।

    তিনি একটি স্বকৃত কালানৌচিত্য দোষের উল্লেখ করে দিয়েছেন। তিনি এত কালভঙ্গ, স্থানভঙ্গ এবং নতুন ইতিহাস লিখেছেন, তাতে ওটি না করলেও চলত।

    উপন্যাসটি শোভন লিখলেন কেন? তাঁর উদ্দেশ্য উপরে বলেছি। কিন্তু আরেকটি দিককে এড়িয়ে গেলে হবে না। সন্মাত্রানন্দ শোভনের ঢাকা বিক্রমপুরের উপর দুর্বলতা বিদিত। নাস্তিক পণ্ডিত থেকেই তার শুরু। তিনি দেখিয়েছেন মধুসূদন সরস্বতী বিক্রমপুরের সুসন্তান। ফল - ঐতিহাসিক রোমান্সের অশ্বডিম্ব।
     
     
    অর্ণব সাহার মত,
     
    সন্মাত্রানন্দ বাংলা লিখতে জানেন না। উনি যেটা লেখেন, সেটা বাংলা নয়। একটা ক্লস্টোফোবিক খিচুড়ি ভাষা, তার মধ্যে আবার বাংলার বিভিন্ন শ্রেষ্ঠ লেখকের ভাষা ও সিকোয়েন্স নির্মাণ থেকে চুরি। এইমুহূর্তে বাংলা গদ্যসাহিত্য এতোটাই দীনতায় ভুগছে যে, সন্মাত্রানন্দের মতো ছুপা হিন্দুত্ববাদী চাড্ডি লেখককেও বড়ো লেখক মনে হচ্ছে। একটা জাতি তখনই রসাতলে যায়, যখন তার সার্বিক প্রতিরোধের শক্তি লুপ্ত হয়। ইতিহাসের গাজাখুরি, ভূতপ্রেত, তন্ত্র-মন্ত্র, পাতি দু-পয়সার থ্রিলার এখন বাংলা সাহিত্যের পাতে শেষ উচ্ছিষ্ট। সেকারণেই সন্মাত্রানন্দের মতো অশিক্ষিত কলম চালাতে না-জানা লেখককে বাঙালি বড়ো লেখক মনে করছে।
  • Pradhanna Mitra | ১৯ এপ্রিল ২০২৪ ০৩:১৯530772
  • কারো ব্যক্তিগত মত থাকতেই পারে। আমার ব্যক্তিগত মত আমি বলেছি। ব্যকরণগত কিম্বা ইতিহাসগত বিকৃতি থাকলে বিশেষজ্ঞেরা অবশ্যই রব তুলবেন। আমি পাঠিকা মাত্র। আমার রিভিউ একজন পাঠিকার দৃষ্টিভঙ্গীতে করা...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন