• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • স্টোরিটেলার

    Ritwik Sengupta
    গপ্পো | ১১ জুলাই ২০২০ | ২১০ বার পঠিত

  • নীলকন্ঠ মিশ্র, আমাকে অনুরোধ করেছিল, আমি যেন তার পরিচয় দিতে গিয়ে তাকে "স্টোরিটেলার" নামে আখ্যা দেই, কথক বা কাহানীবাজ নয়। বহুবছর পূর্বে কোন এক সাহেব এসেছিলেন দেওঘর-এ; নীলকন্ঠকে তিনি কথা দিয়েছিলেন যে তিনি, নীলকন্ঠকে নিয়ে, আমেরিকাতে ফিরে গিয়ে একটা পুঁথি লিখবেন। লিখেছিলেন, "দ্য স্টোরিটেলারস অফ ইন্ডিয়া" নামক একটি বই - তার প্রথম দুইখানা গল্প নীলকন্ঠকে নিয়ে। সেই থেকে, নীলকন্ঠ মিশ্র, ওই "স্টোরিটেলার" আখ্যাটা একরকমের উপাধি সমঝে নিয়েছে। তার পরে নাকি অনেক সাহেব ও মেম দেওঘর বেড়াতে এসে তার খোঁজ করে, সাক্ষাৎ করে, তাকে অনেক উপহার দিয়েছে। সেই যোগাযোগের সুত্র ধরে, তার কন্যা, বিলেতে কোন একটি লাইব্রেরিতে চাকরি পেয়ে, সেখানেই বসবাস করছে। এই সব মিলিয়ে, নীলকন্ঠ বিশ্বাস করেছে, যে কথক বা কাহানীবাজ আখ্যাতে, তার এত উপকার হয়নি, ওই ইংরেজি আখ্যাতে অনেক আয় দিয়েছে! বইটার এক কপি, আমাকে দেখিয়েছিল, নীলকন্ঠ মিশ্র।
    তাই, তাকে নিয়ে লিখতে বসে আমার এই রচনার শিরোনামে ইংরেজি অক্ষর!

    রচনার প্রেক্ষাপট, দেওঘর, ২০০৪ সালের মার্চ মাস, আমি, অফিসের কাজে দেওঘরের কালীবাড়ি ও হনুমান মন্দির নিকটবর্তী, শ্রীকান্ত রোডে অবস্থিত, অপর্ণা হোটেলে দিন তিনেকের ডেরা বেঁধেছি। আমি ট্যুরে এসেছি বলে, আমাদের সংস্থার টেরিটরি ম্যানেজার শশীকান্ত কুমার, ও তার এক সহকর্মীও ওই হোটেলে উঠেছে, আমাকে সঙ্গ দিতে। এই সব মিলিয়ে, ডেরা। আসার আগে আমার একটাই রিকোয়েস্ট ছিল, ময়ূরাক্ষী নদী দেখা যায়, এমন কোন হোটেলে থাকবো। এই হোটেলের পাঁচতলার ছাদে একটা টি-লাউঞ্জ আছে, সেখান থেকে নদীপার বেশ পরিস্কার দেখা যায়। চেক-ইন করবার পরে আমরা যখন আমাদের কাজে যাবার তোড়-জোড় করছি, শশীকান্ত জানালো যে এই হোটেলে থাকবার একটা 'বোনাস পয়েন্ট' আছে, এবং সেটা সন্ধ্যেবেলা ফিরবার পর জানা যাবে। মনে মনে আন্দাজ করলাম, সে নিশ্চয় নদীর দিকে সূর্যাস্ত দেখাবে, ওই রুফ-টপ টি-লাউঞ্জটাতে বসে। হোটেল থেকে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে, হাইওয়ে ধরে, একবার নদীর পারে একটা ছোট বিরতি নিয়ে, দিনের কাজ শুরু করলাম। দেওঘড়ে, সেই কালে, সকাল সাড়ে-দশটার আগে, কোন অফিসেই কোন অফিসারের সাক্ষাৎ পাওয়া যেতো না। তাই, সকালের দিকে হাতে কিছুটা সময় ছিল, নদীর পারে সাইট-সিইং সেড়ে নেওয়ার।

    দিনের শেষে হোটেলে ফিরে, শশীকান্তকে জিজ্ঞাসা করলাম "বোনাস"এর কথা। একটু হেসে বললো, চা খেয়ে নিয়ে তারপর যাই চলুন। আমি জানতে চাইলাম কোথায়, কারণ সন্ধ্যেবেলা একবার কাছাকাছি কালীমন্দিরে যেতে চাই, সেটা আগে থেকে বলে রেখেছিলাম শশীকে। শশী সংক্ষেপে বললো, ওই আপনি যেদিকে যেতে চেয়েছিলেন স্যার, সেই রাস্তা ধরে আরো কিছু পথ। এতটা হেঁয়ালি করছে দেখে, আমি খানিক ঠাট্টার সুরে বললাম যে এত রহস্য, তা সঙ্গে করে ক্যামেরা, দূরবীন বা টেপ রেকর্ডার নিতে হবে কিনা! শশী বললো ও'সব নাহলেও চলবে, তবে সেখানে পৌঁছে যে আপনি খুশী হবেন, এই ব্যাপারে আমি নিশ্চিত। আমরা প্রথমে কালীমন্দিরে প্রণাম সেড়ে, তারপর নদীর ধারে একটা চায়ের দোকানে গিয়ে বসলাম। নদীর পারে বাঁধানো পায়ে চলার পথ ও তার পাশে দূরে-দূরে সিমেন্টের বেঞ্চি। আমরা কিছুটা হেঁটে, একটু নিরিবিলিতে একটা বেঞ্চিতে বসলাম, নদীর হাওয়া উপভোগ করব বলে। আমার হাতের সিগারেট যখন এক-দুই টান বাকি, তখন শশীকে জিজ্ঞাসা করলাম, আর কতক্ষণের সাসপেন্স? শশী হেসে বললো, এই সময় হয়ে এলো স্যার, এই আটটা নাগাদ হনুমান মন্দিরে পৌঁছালেই হবে। আমরা যেখানে বসে আছি, তার ঠিক পিছনে, রাস্তার ধার ধরে রাধাচুড়া গাছের সাড়ি। এখন ফুল বেশী, পাতা কম। সদ্য সূর্যাস্তের রাঙা আকাশের নিভু-নিভু আভায়, বেশ রোমাঞ্চকর আবছায়া তৈরী হয়েছে গাছগুলো ঘিরে। তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হল, এমন পরিবেশেই বোধহয় বাউল গেয়েছিল, "কোন ফুলেতে কেষ্ট আছেন, কোন ফুলেতে রাধা?"!

    আমরা কালীমন্দিরে গিয়ে, মিনিট দশেক সন্ধ্যারতি দেখে, পৌনে-আটটার সময় গিয়ে বসলাম হনুমান মন্দিরের মন্ডপে। খেয়াল করলাম, প্রবেশপথ আর গর্ভগৃহের বরাবর যে সরলরেখা, তার একদিকে একফুট উঁচু একটা বেদী। শশী বললো, ওই বেদীর উপর বসে হনুমান-চালিসা পাঠ, কীর্তন, বেদগান এমনকি ভজন পরিবেশন ও হয়। এই মন্দিরটা নাকি অনেক পুরাতন। তাই খানিকটা সাংস্কৃতিক পিঠস্থান ও বটে। শশীর কথা শেষ না হতেই, আমি হেসে জিগেস করলাম, "আমার বোনাস?"
    শশী বললো, "স্যার, এখানে একজন কাহানীবাজ আসে প্রতি বৃহষ্পতি ও শুক্রবার, ছড়াগান, কাহানী এইসব শোনায়, অনেক মানুষ শুনতে আসে, আমি আগেও এসেছি, আমার ইচ্ছা আপনি একবার শুনুন"।
    আমি বললাম সেতো খুব ভালো কথা, কিন্তু তুমি জানলে কী করে যে আমার এইসব ভালো লাগে, আর এর মধ্যে বোনাসের কি? শশী বললো যে ওই কাহানীবাজ লোকটার মধ্যে একটা রহস্য আছে, এবং ওর মনে হয়েছে, যে আমি ও নাকি ওই লোকটার সাথে কথা বলে, সেই রহস্য অনুভব করতে পারবো।
    আমি হেসে বললাম, "শশী আমি তো গোয়েন্দাও নয় আর ফিল্মের হিরো ও নয়!"
    শশী গম্ভী্র হয়ে বললো, "না স্যার, আমাদের স্টেট ব্যাঙ্কের রাকেশ সিং ও বলেছেন, যে আপনি ও ওই লোকটার যে রহস্যটা, সেটা অনুভব করতে পারবেন; একটু সময় শুনুন, আমার মনে হয় আপনার ভালো লাগবে"।

    আমাদের কথা শেষ হতে না হতেই দেখলাম, ওই বেদীর উপর, তিন-চারজন লোক উঠে বসল। তাদের মধ্যে, একজনের গায়ে লাল কুর্তা, কপালে লাল তিলক, পরিস্কার রঙ আর একটা চৌকিদারি গোঁফ। সব মিলিয়ে বাকি তিনজনের থেকে আলাদা। দেখে মনে হয় লোকটা নিয়মিত শরীর চর্চা করে। আমার কাছে লোকটির চেহারা ও উপস্থিতি, বেশ আ্যপিলিং মনে হল। শশী হঠাৎ উঠে গিয়ে লোকটার সাথে কিছু বাক্যালাপ শুরু করল। আমরা, ওই বেদীটার থেকে, পাঁচ -ছ'হাত দূরে, দ্বীতিয় সাড়িতে বসে আছি, মাদুর-পাতা মেঝের উপর। খেয়াল করলাম ক্রমশঃ বেশ জনা-চল্লিশের জমায়েৎ হয়েছে। আমার মতন , স্পষ্টত শহুরে চেহারার ও বেশ কিছু মানুষ। বেশ বুঝতে পারলাম, যে এই কাহানীবাজের আসর, এই দেওঘড় শহরে এখনও জনপ্রিয়। চারিপাশের সব দেখছি, এর মধ্যে দেখি সেই কাহানীবাজ, শশীর সাথে আমার পাশে এসে হাঁটু-গেড়ে বসে নমস্কার জানালো, নিজের পরিচয় দিল নীলকন্ঠ মিশ্র বলে। আমি প্রতি-নমস্কার জানিয়ে, অসোয়াস্তি কাটিয়ে ওঠার আগেই, লোকটা আমাকে এই সন্ধ্যার অতিথি বলে আখ্যা দিয়ে, সভার মাঝখানে উঠে দাঁড়িয়ে বললো যে আমি যেমন গল্পশুনতে চাই ও তেমন গল্প শোনাবে! সকলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে দেখে, আমিও উঠে দাঁড়িয়ে, সকলকে নমস্কার জানিয়ে, আর্জি জানালাম, এই শহরের এই মন্দিরের কোন মনে রাখার মতো 'কাহানী' থাকলে, শোনাতে। নীলকন্ঠ মিশ্র, স্মিত হেসে বললো, 'জো।হুকুম'!

    লোকটা শুরু করবার আগে, শশীকে বললাম, যে লোকটাকে দেখেই বেশ একটা কিউরিওসিটি জাগছে আমার ভিতরে, লোকটার চোখ দুটো বেশ গভীর, কিছু একটা তো আছে ব্যাপার!
    শশী হেসে বললো, "আমি জানতাম আপনার ও ওইরকম মালুম হবে"।

    নীলকন্ঠ মিশ্র, গল্প শুরু করল।
    সে নাকি ১৯৬০ সালের ঘটনা। এই মোর নদীর ( ময়ুরাক্ষীর স্থানীয় নাম) উজানে, ত্রিকুট পাহাড়ের পশ্চীমদিকে কিছু যাযাবর পরিবার দল বেঁধে তাঁবু গেঁড়েছিল। তাদের চলন-বলনের কোনকিছুই স্থানীয় মানুষের সাথে মেলে না। তবে, শাওন-মেলাতে তারা অনেকে মিলে ছাউনি খাটিয়ে, দঁড়ির চৌপায়া, আটা-চালুনি আর কিছু বাতের মলম বেচতো। সন্ধ্যাবেলা, যখন বাকি ফেরিওয়ালারা পসার গুটিয়ে ঘরমুখো হতো, ওই যাযাবর গোষ্ঠী তখন হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান বাজনা করতো। দেওঘর কালীমন্দিরের সেই সময় কার পূজারির ছেলে, মুরারী, সেই যাযাবরের দলের সাথে বেশ ভাব জমিয়ে ফেললো।

    তখনকার যিনি এই এলাকার পুলিশের বড়বাবু ছিলেন, তিনি নাকি খোঁজ নিয়ে জানিয়েছিলেন যে ওই গোষ্ঠী ছিল গাড্ডি-ঊপজাতির মূল-উদ্ভুত। এদের মূল ধারায় কিছু মুসলমান উপজাতি মিশে গিয়েছিল একসময়, ফলতঃ এরা মহাদেব ও কালীমাতার পুজারি হলেও, মুসলমানদের মতন দিনে পাঁচবার প্রার্থনা করে। এদের রীতি বা আচার অনুযায়ী, মহিলারা অনেক বেশী সক্রিয় সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও, এবং বিশেষ করে কোন উৎসব বা উদযাপনে, মহিলাদের দায়িত্ব, বেশী।অতিথিদের আমন্ত্রণ জানানো। অতিথি-সেবার অংশ হিসেবে, এই গোষ্ঠীর বিবাহিতা মহিলারা, অতিথির সাথে এক হুঁকোতে ধুমপান ও করে থাকেন। সব মিলিয়ে, সেইসময়ের দেওঘরেরবাসিদের থেকে, এদের একটা আচার ও আচরণগত দুরত্ব ছিল। তবে শিবরাত্রি ও কালীপুজোর রাতে এরা মন্দিরে এলে, কোন সময় কেউ আপত্তি করেনি। অনেক ক্ষেত্রে, ওই যাযাবর গোষ্ঠীর মহিলারা, মন্দিরের সেবায়িতদের পুজোর সময় মন্দির প্রাঙ্গন পরিস্কার করে আলপনা দেওয়ার কাজে ও সাহায্য করতো। বিশেষ করে ওদের দলের পান্ডার দুই মেয়ে রুবিণা ও ঈশানি। একবার শিবরাত্রির প্রস্তুতির সময়, মন্দিরের পুরোহিত, রামচরণের ছেলে, মুরারি, ওই রুবিণার সাথে ভাব করে একটা হুঁকো যোগাড় করে, তামাক সমেত। গাড্ডিদের প্রথা অনুযায়ী, রুবিণাও, মুরারিকে সঙ্গ দিতে, ওই কালিমন্দিরের পিছনে অশ্বথ গাছের নীচে, সেই তামাক সেবন করে। রুবিণা জানত না, যে মুরারি, পুজোর সরঞ্জামের থেকে, কিছু ধুতরা ফুলের শাঁস ও বীজ ওই তামাকে মিশিয়েছে। মুরারির ধারণা ছিলনা যে রুবিণা তামাক সেবন করবে। প্রথম দুটো টানের পরে দুজনেই বুঝেছিল, যে খানিক প্রমত্ত অনুভুতি আসছে। তারা সম্ভবতঃ, কিছু সময়ের জন্য সেখানে ঝিমিয়ে পড়ে। যখন ঘোর কাটে, তখন সামনে মোটর-সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন থানার বড়বাবু জগদীশ সিং , আর তার সঙ্গী হাবিলদার, মুরারি আর রুবিণার মুখে জল ছিটাচ্ছে। সেই সময় পুলিশের ডাকসাইটে অফিসার হিসেবে জগদীশ সিংয়ের সুখ্যাতি ছিল - দেওঘর-মথুরা হাইওয়ের উপর, ট্রাক বা বাসে ডাকাতি একবছরের মধ্যে থামিয়ে দিয়েছিলেন। মুরারি আর রুবিণাকে সঙ্গে করে থানায় নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। কিছুক্ষণ পরে, মুরারিকে চিনতে পেরে, ছেড়ে দিলেন। আটকে রাখলেন রুবিণাকে। মুরারি, থানার সামনে পান-বিড়ির দোকানের পাশে অপেক্ষা করতে থাকলো কখন রুবিণা ছাড়া পাবে। প্রায় আধাঘন্টা অতিক্রান্ত, এমন সময় সেখানে একটা বড় মোটরসাইকেল চেপে উপস্থিত হলেন, নিতীশ শর্মা। তাকে দেওঘরে অনেকেই 'রাজাবাবু' নামে জানতেন। নিতীশবাবুদের হিম-ঘরের ব্যাবসা ছিল। ধনী পরিবার। বিপদে-আপদে, দেওঘরের গরীব মানুষকে অনেকভাবে সাহায্যও করতেন নিতীশবাবু। মন্দিরে দান-ধ্যান ও করতেন। মুরারি তার সামনে গিয়ে দুই-কান ধরে, ক্ষমা চেয়ে, সব ঘটনা জানিয়ে তার সাহায্য চাইলেন, রুবিণাকে বড়বাবুর হাত থেকে ছাড়ানোর জন্য। নিতীশবাবু মুচকি হেসে থানার ভিতরে চলে গেলেন, বাইরে অপেক্ষা করতে বললেন মুরারিকে। কয়েক মিনিট পড়ে, রুবিণা হাসিমুখে বেড়িয়ে এলো। বললে, "ওই বাবুটা ভালো লোক, জিগেস করলে কি কি কাজ করতে পারো? আমি বললাম রান্না , মুরগি পালা, মাদুর বোনা....তো বাবু বললে আর কখনো নেশা করবে না, কাল আমার বাড়িতে, দেখা করতে এসো....আর বড়বাবুকে বললেন ছেড়ে দিতে "। ওরা যখন মন্দিরে ফিরল, তখন মহাদেবের পুজোর ডালি নিয়ে লাইন দিয়ে অনেকে দাঁড়িয়ে। মন্ডপে স্তোত্রপাঠ চলছে। রুবিণা মুরারিকে বললো, সে পরেরদিন ওই বাবুর বাড়ি যাবে না। মুরারি বললে, "দেখা যাবে"।

    পরদিন, বেলা গড়িয়ে দুপুর হবে, মুরারি হাটে যাচ্ছে ফুল আনতে। পথে রুবিণার সাথে দেখা - নিতীশবাবুদের ঘর থেকে ফিরছে। বললে বাবুদের বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালবার কাজ পেয়েছে তারা দুই বোন - আর সন্ধ্যাবেলা অতিথি-শালায় রান্নার কাজ। বাবু আর মাজি খেতেও দিয়েছে।

    এই ঘটনার কিছু-মাস পরে, শাওন-মেলায়, আবার দেখা হলো মুরারির, রুবিণা ও তার বোন ঈশানির সাথে। রুবিণা বললো যে তারা আর দুই মাস পরে চলে যাবে দেওঘর ছেড়ে, কিন্তু রাজাবাবু তাদের দুই বোন ও তাদের বাবা-মাকে তাদের বাড়িতে থেকে যেতে বলছে। অথচ, তাদের জাতে, কেউ কখনো, স্থায়িভাবে এক যায়গায়, এক বছরের বেশী থাকে না, প্রচলন নেই। আর বিশেষ করে কোঠি বাড়িতে তো নয়ই। মুরারি, এই প্রথম অনুভব করল যে রুবিণার প্রতি তার একটা টান আছে! সেটা আড়াল করবার জন্যে সে বললে, "তোমার বাবা-মা কি বলছে, আর তোমাদের সর্দারকে জিজ্ঞাসা কর, অনুমতি দিতেও তো পারে!"
    রুবিণা বললো, তা হবেনা, আমরা তাহলে চিরতরে দলছুট্ হয়ে যাবো। সেটা হয় না। মুরারি খানিক অধৈর্য্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলো, "তাহলে তোমাদের জাতির বাইরে কারো সাথে মেলা-মেশা হয়না?"
    রুবিণা আর ঈশানি, একসাথে বলে উঠেছিল, হয়। "আমাদের কোন মেয়ে যদি শাদি করে অন্য কোন জাতির মরদকে, তাহলে একবছর পরে তারা আবার সেচ্ছায় এসে আমাদের দলে যোগ দিতে পারে - কিন্তু একবছর কোনরকম যোগাযোগ থাকতে পারবে না - পরিবারের সাথে নয়, দলের সাথেও নয়"!
    মুরারি খানিকটা হতোদ্যম হয়ে বলেছিল, "তাহলে শাওন-মেলার পরে তোমরা আর মন্দিরে আসবে না, দেওঘড় ছেড়ে চলে যাবে?"
    রুবিণা বললো, "আমরা দেওঘরের মানুষকে দিল্ দিয়ে ভালো বেসেছি, আমাদের মনের মানুষ এখানেই থাকে - আমরা আবার ফিরে আসবো"।
    মুরারি বললে, "আমিও দেওঘর ছেড়ে নকরি করতে যাচ্ছি মধুপুরে, একটি স্কুলে, তোমরা যদি ছট্ পুজো অথবা দীপাবলির সময় কখনো আসো, তাহলে দেখা হবে, আমিও তোমাদের মনে রাখবো"।
    সেদিন নৈশভোজের পরে, মুরারি সমাচার শুনছে রেডিওতে, তখন তার বাবা এসে বললেন, বাইরে একটি পরিবার তার সাথে দেখা করবে বলে এসেছে, মন্দিরের পাশে অপেক্ষা করছে। বাবার সাথে বাইরে এসে দেখে, রুবিণারা দুই বোন, তার বাবা-মা হাতে একটা ভাঁজ করা কাপড় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে মুরারি ও তার বাবা তাদের নমস্কার জানালো। রুবিণার বাবা, সেই কাপড়টা মেলে ধ'রে দেখালো, তার উপর রুবিণার হাতে আঁকা ত্রিকুট পাহাড় আর তিনটে মানুষ পাহাড়ের পথে হাঁটছে। মুরারির বাবা খুশী হয়ে তাদের অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে সেই ছবিটি গ্রহন করে কথা দিল, যে সে এই মন্ডপে ওই ছবিটা দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখবে।
    গল্প বলতে বলতে, নীলকন্ঠ সকলকে বললো, সেই থেকে, কালীমন্দিরের মন্ডপে, পশ্চিম দিকের দেওয়ালে, সেই ছবি টাঙানো রয়েছে।
    আমাদের সামনের সাড়িতে বসা এক ভদ্রলোক, তার মাথার চুল সাদা, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "ওই গাড্ডির দল কি আর এসেছিল?"
    নীলকন্ঠ মিশ্র, একটু স্মিত হেসে বললে, বাবুজি, আমার কহানী এখনো বাকি!"
    "সেই ছবি দিতে আসার দিন তিনেক পরে, সেদিন দুপুরে মুরারি বাসে করে মধুপুর চলে গেছে, সন্ধ্যাবেলা মন্দিরের আরতি শেষ হবার পর, মুরারির বাবা দেখলেন রুবিণার বাবা ও আরো দুইজন তার দলের লোক, তার সাথে দেখা করতে এসেছে। তারা তাকে জানালো, যে সেদিন বিকেলে রুবিণা গিয়েছিল ত্রিকুট পাহাড়ের পশ্চিমদিকের টিলায় মুরগি চড়াতে। তারপর থেকে সে নিরুদ্দেশ। পুলিশ হয়তো তাদের কথায় ডাইরি লিখবে না, সুতরাং 'পন্ডিতমশাই' যদি তাদের হয়ে, একটা খবর দেন পুলিশের থানাতে। সেবছর আশ্বীনমাসে, মুরারি যখন ছুটিতে এলো, তখন সে সব ঘটনা জানলো। যাযাবরের দল, ততদিনে দেওঘর থেকে উধাও। তাদের স্মৃতি বলতে, রুবিণার হাতে আঁকা ফ্রেমে বাঁধানো সেই ছবি। মুরারি, তার বাবাকে নিয়ে একবার থানায় গিয়েছিল, জানতে, পুলিশ সেই ঘটনার কোন হদিশ পেলো কিনা! পুলিশ জানিয়েছিল, যেদিন ওই গাড্ডি গোষ্ঠী দেওঘর ছেড়ে যাবে, তার আগেরদিন বিকেলে, নাকি, রুবিণার বোন, সেই টিলার উপর একটা পাথরের গায়ে লিখে দিয়েছিল, যে রুবিণা নাকি নিরুদ্দেশ নয়, পুলিশ যেন খোঁজ খবর না করে!
    "সেই সাদাচুল-মাথা ভদ্রলোক, আবার প্রশ্ন করলেন, "পুলিশ না হয় খোঁজ ছেড়ে দিল, কিন্তু শহরের লোক হদিশ করলো না কেন, এ'তো মহিলাদের নিরাপত্তার ব্যাপার?"
    নীলকন্ঠ, সংক্ষেপে বললো, "সে আমি বলতে পারবো না, বাবুজি, আমি তো তখন মধুপুরে চাকরি করছি, সব কিছু জানা যায়না - তারা এসেছিল, দেওঘরে কিছু মানুষ তাদের মনে রেখেছে, সেই থেকে ত্রিকুট পাহাড়ের ওই পশ্চিম দিকের টিলার উপর আলপনা দেওয়া আছে, স্থানীয় মানুষ ওই টিলার নাম দিয়েছে, ঈশানী-টিলা"।

    *** **** *******

    আমার বেশ মনে আছে, সেদিন রাত তিনটে নাগাদ আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল, হোটেলে। চোখ বুজে শুয়ে আছি, কিছুতেই মাথা থেকে মুরারি গল্প আর বেরোতে চায় না। খালি মনে হচ্ছে, গল্পে গোঁজামিল আছে, ঘটনা অন্যরকম। একটু ঝিমিয়ে পড়েছিলাম, যখন ঘোর কাটলো, তখন আকাশ বেশ আলোকিত, সকাল সাড়ে-পাঁচটা বাজে। চোখ মুখ ধুয়ে, ইলেকট্রিক কেটলিটাতে এক কাপ চা বানিয়ে খেলাম। ঠিক ছটার সময়, শশীকে ইন্টারকমে কল করে বললাম, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, বেরোতে হবে। শশী বলল "স্যার এত ভোরে কোথায় যাবেন"?
    বললাম "মর্নিং ওয়াক প্লাস, কিন্তু তুমিও চলো"।

    আমরা, দেড়-কিলোমিটার হেঁটে কালীমন্দির পৌঁছালাম। যাবার পথে কিছু জবা ফুল তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। মা-কালীর মূর্তিতে প্রণাম সেড়ে শশীকে বললাম, "ওই প্রিস্ট কোয়ারটার থেকে, নীলকন্ঠ মিশ্রকে ডেকে আনো, একটা ছোট প্রশ্ন আছে"।

    এক মিনিটের মধ্যে নীলকন্ঠ মিশ্র হাজির। আমি তাকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম আমার অনুরোধে, আগের সন্ধ্যায় দেওঘরের অজানা গল্প শোনানোর জন্য। সে খানিক লাজুক মুখ করে বললো, আবার আসবেন তো আবার শোনাবো। আগলাবার আপনার থেকেও গল্প শুনবো। আমার মনে হচ্ছে আপনার কাছে অনেক এইরকম গল্প আছে। আমি বললাম, আমার একটা 'অনুরোধ' আছে, আমার মনে একটা ছোট প্রশ্ন ঘোরা-ফেরা করছে, তার উত্তর চাই।
    নীলকন্ঠ বললেন, "পুছিয়ে না!"
    আমি বললাম, "মুরারির আসল নাম কি?"
    বেশ কিছু মুহুর্ত স্থির তাকিয়ে, তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরল নীলকন্ঠ, বললে "আপনি আমাকে হালকা করে দিলেন বাবু-সাহাব....আপনাকে বলতে পারি, কিন্তু আপনি দশ বছর কাউকে বলতে পারবেন না, ওয়াদা করুন!"
    আমি বললাম, "যো হুকুম!"
    নীলকন্ঠ বললো, "আমিই মুরারি!!!"
    "রুবিণা দেবীর সাথে একবার দেখা করব, উপজাতির মানুষদের থেকে অনেক শেখা যায়....", বলে আবদার জানালাম।
    মুরারি জানালো, ছয় বছর আগে, ম্যালেরিয়া রোগে তার দেহান্ত হয়েছে।

    * ** *** **** *****

    ঋত্বিক সেনগুপ্ত।।
  • বিভাগ : গপ্পো | ১১ জুলাই ২০২০ | ২১০ বার পঠিত
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
আরও পড়ুন
খোপ - রৌহিন
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • স্টোরিটেলার | 98.114.105.164 | ১১ জুলাই ২০২০ ১৯:১১95120
  • বেশ
    শেষটাও কি মানুষগুলোর মত সহজ সরল? এ গল্প কি এমনই হওয়া উচিত?
  • Kaushiki | 180.151.89.57 | ১১ জুলাই ২০২০ ১৯:১৯95121
  • Khub e sunday golpo. Eta pore Deoghor berate jete ichhe korchhe

  • Aloka Bhattacharyya | 171.79.104.219 | ১১ জুলাই ২০২০ ২২:১৫95131
  • Storyteller galpo ta khub bhalo laaglo. Tor lekha eto sabolil je chokher saamne charitro gulo dekhte paai

  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত