• হরিদাস পাল  গপ্পো

    Share
  • বিকেলের চা

    Ritwik Sengupta লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ৩৭৮ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • ব্রজ কিশোর মিশ্র, চাকরির অবসরের চার বছর আগে দিল্লীতে এসেছিলেন। পদোন্নতি ও বদলি হেতু - বেঙ্গলের স্টেট cadre এ তার আগে ২২ বছর কলকাতা থেকেছেন। খানিকটা ইচ্ছাকৃত, যাতে ছেলের স্কুল কলেজের পাট- চুকানো পর্যন্ত কোন বিঘ্ন না ঘটে। সেন্ট লরেন্স, প্রেসিডেন্সির পাঠ শেষ করে পুত্র রাজেশ যখন মার্কিন মুলুকে, ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে, স্নাতোকোত্তর স্তরের ছাত্র, তখন প্রোমোশন ও বদলি সুগ্রাহ্য করে, দিল্লীতে Ministry of Home এর উচ্চ-পদে যোগদান করলেন, ব্রজ কিশোর। বছর আট, হল।
    কলকাতায় দীর্ঘ ২৩ বছর বসবাস করে, দিল্লীর পশ্চিম-বিহারের বাঙালী-পাড়ায় ঘর ভাড়া নিয়ে থাকার যৌথ-পছন্দ ও খানিকটা পক্ষপাত ছিল, ব্রজ কিশোর ও তাঁর স্ত্রী, আরাধনা দেবীর। কলকাতার জীবন-যাপন, বাঙালীদের বাজার-দোকান, আদব কায়দা, ভেসে আসা রান্নার গন্ধ ও বারান্দার রেলিং ধরে ছুটির-দিন-বিকেলের আড্ডা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের গতের বাঁধন-সম। সেই সুত্রে, পয়লা বৈশাখ ও বিজয়া দশমীর দিন ফোনে ছেলে রাজেশকে আশীর্ব্বাদ করার রিতি-রপ্ত হয়েছেন এই দম্পতি। দিল্লীর পিনকোড 110063 অন্তর্গত, ব্যাঙ্ক কলোনিতে এঁরা সুপরিচিত ও বাঙালি-বৃত্তে বন্ধুজন-বেষ্টিত। এমনকি, অনেক অবসরপ্রাপ্ত বাঙালি পতির মতন, গত দেড়-বছর, সন্ধ্যাবেলা ঠাকুরঘরে ধূপ ও প্রদীপ জ্বালানোর কাজটাও ব্রজ কিশোর করে আসছেন।
    এছাড়া, বিকেলবেলা, বারান্দার বেতের টেবিলে দু'কাপ চা রেখে, ঘর থেকে প্লাস্টিকের চেয়ার-দুটো এনে বসে সান্ধ্যকালীন আয়েশের সূচনা, এটা একরকম কর্তব্য-প্রায়। এই অভ্যাস অবশ্য চাকরি-জীবন থেকে অবসরপ্রাপ্তির পর।

    পাশের বাড়িটা, builder flat হবার পড়ে, তিনতলায় এক বাঙালি নব-দম্পতি ভাড়াটে এসেছে। বাড়ির সদর গেটে তাদের নাম লেখা আছে সুমিত ও সুমনা। বারান্দায় বসে চায় চুমুক দিতে-দিতে, ব্রজবাবু বারবার আর চোখে খেয়াল করেছেন, সুমনা ও সুমিত, ওনার চা-খাওয়াতে দৃষ্টিপাত করে। আজ তেমন বোধ হওয়াতে, ব্রজবাবু সরাসরি জিগেস করলেন, "কিছু বলবেন"?
    ইতস্তত সুমনা বললো "হ্যাঁ, মানে আপনারা বাঙালি"?
    "ছিলাম না, হয়ে গেছি" বলে মুচকি হাসলেন, ব্রজবাবু।
    উত্তরে, "আজ তো শনিবার, আমরা কি একটু গল্প করতে আসতে পারি?", বলে সাড়া দেয় সুমিত।
    "চলে আসুন", সম্মতি দেন ব্রজবাবু।

    প্রায় আধঘন্টা পেড়িয়ে, উপস্থিত হল, সুমনা-সুমিত।
    খানিকটা বার্তালাপ শুরু করবার দায়, সুমনা বললো, "আপনাদের বয়সে বাড়ি-ঘর-দোর এত সাজানো খুব একটা চোখে পড়েনা"।
    "না বোধহয়, আমাদের বয়সেই মনে হয় ঘর গুছিয়ে থাকা সহজ, আমার 64 বছর পার হল"।
    "আর কাকিমা কোথায়"?, সুমনার প্রশ্ন।
    "আগে বল চা না কফি"?
    "আগে একটু আলাপ সেড়ে নেই কাকু, তারপর"।
    3 seater টায় মাঝে একটু যায়গা ছেড়ে বসল সুমন-সুমিত, আড়াআড়ি 2 seater এর কোনা ঘেঁসে ব্রজবাবু। বসামাত্র, একগাল হেসে সুমনা বলল, "আপনি এই যে রোজ বিকেলে - মানে আমরা অবশ্য উইকেন্ডেই খেয়াল করি - আপনি এই যে আপনার আর কাকিমার চা বানিয়ে বারান্দায় এনে বসেন, আমরা খুব তারিফ করি"। "আমাদের দু'জনেরই খুব ভালো লেগেছে, কাকু! কাকিমা খুব লাকি"।

    "আমার ও ভালো লাগে বলে করি, কেউ তো জোড়াজুড়ি করেনা। বছর দুই হল, এইরকম একটা সন্ধ্যায় এক রবিবারে, আমরা চা খেয়ে ঘরে ঢুকে টিভিটা সবে খুলেছি, আমার স্ত্রি ঠাকুরঘরে সন্ধ্যা দিতে গিয়ে আমায় ডেকে বললেন, শরীরটা খুব খারাপ লাগছে, ঠাকুরকে ধূপটা দিয়ে দাও বলে বসে পড়েছিল মাটিতে। সেই বোধহয় প্রথম আমি ঠাকুরঘরে ধুপ জ্বালালাম - তবে আমি নাস্তিক নই। এরমধ্যেই অচেতন। তোমাদের নীচে থাকেন দাশ-বাবু, তাঁর সাহায্যে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম, ডায়াগনোসিস্ হল ট্র্যানসিয়েন্ট ইস্কেমিক আ্যটাক, তার থেকে দুদিন পর সেরিব্র্যাল। ১০ দিন পরে আমার স্ত্রী আরাধনা বাড়ি ফিরলেন, কোমড়ের নীচে প্যারালিসিস নিয়ে। ভেতরের ঘরে শুয়ে থাকতো, নার্স দেখাশুনা করতো দিনে ১০ ঘন্টা। তবে এই বিকেলের সময়টা, ওর আদেশ মেনে, আমি বারান্দায় বসে চা খাওয়া শুরু করলাম। হুইলচেয়ারে এসে পাশে বসতো - দু-তিনবার বলেছিল, এই বিকেলের চায়ের আলগা আড্ডা নাকি ওর বড়ো ভালো লাগতো। এটাই নাকি আমাদের দুজনকে চাঙ্গা রেখেছে। বলতো এখন তো আর একসাথে বেড়াতে যাওয়া হয়না,।এই বিকেলের নিরালা আড্ডাতেই আমরা ঘুরে বেড়াবো। একবছর আগে, থার্ড আ্যটাকে দেহ ছাড়লো। আমি যদি দুইকাপ চা নিয়ে না বসি, তাহলে তো ওর সাথে আড্ডার আয়োজন সম্পূর্ণ হয়না!...ওঁর সঙ্গ পাওয়ার আনুসঙ্গিক ওই চায়ের টেবিল আর দু'কাপ চা। আমরা একান্তে আড্ডা মারি! অনেক কথা!"

    সুমনা উঠে দাঁড়িয়ে বললো, "কাকু, কফিটা আমি করি, একটু বলে দিন"। তারপরে বিষয়-বদল করতে বলে উঠল, "আপনার বাড়িতে যেখানে ঠাকুরঘর, আমাদের বাড়িতে স্টোর-রুম"।
    ব্রজবাবু বললেন, "আমার ও তেমনি, আমি এখন ওই ঠাকুরঘরে সন্ধ্যা দিতে বসলে ওটা আমার স্মৃতির স্টোর-রুম হয়ে ওঠে; তাই সন্ধ্যা দিতে বসি - আমি আস্তিক ও নয়।"

    ঋত্বিক সেনগুপ্ত।।
  • বিভাগ : গপ্পো | ২৭ এপ্রিল ২০২০ | ৩৭৮ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
    Share
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Jharna Biswas | 162.158.50.219 | ২৭ এপ্রিল ২০২০ ২০:৪৯92749
  • বাহ্‌...সুন্দর গল্প... 

  • Joy Dutta | 172.68.146.127 | ২৮ এপ্রিল ২০২০ ১৪:২০92762
  • অসাধারণ, মনে দাগ কেটে গেলো। শর্ট অ্যান্ড সুইট । 

  • Aloka Bhattacharyya | 172.69.135.241 | ২৮ এপ্রিল ২০২০ ২১:৫৯92773
  • Galpota pore mon bhore gelo. Mone hoye jeno khub Chena ghatona. Besh laaglo. 

  • Ujjayini DasSarma | 162.158.198.157 | ২৯ এপ্রিল ২০২০ ১১:৫৬92803
  • Khub bhalo laglo

  • Kaushiki Deb | 2401:4900:2ee3:28f1:c626:1946:ae56:f9dd | ৩১ মে ২০২০ ১২:৫৩93843
  • Khub e sundor lekha... Moner moddhe onoboroto chhobi toiri kore.

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত