• বুলবুলভাজা  খবর  টুকরো খবর

  • ঝড় জল লকডাউন - সুন্দরবনের হাল হকিকত

    সৌরভ ভট্টাচার্য লেখকের গ্রাহক হোন
    খবর | টুকরো খবর | ০১ জুন ২০২০ | ৩২৩ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • আমরা গড়িয়া স্টেশন সংলগ্ন তেঁতুলবেড়িয়া অঞ্চলের একটা ছোট স্বেচ্ছাসেবী গোষ্ঠী। নাম প্রয়াস। লকডাউনের সময় স্থানীয় মানুষকে সাহায্য করব বলে শুরু করি, তারপর কাজের পরিধি বেড়ে যায়।

    আমরা গত শনিবার গোসাবার কাছে সাতজেলিয়া গ্রামে গিয়েছিলাম ৩০০ লোকের জন্যে ত্রাণসামগ্রী নিয়ে। যোগাযোগ হয়েছিল আর এক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের সূত্রে।
    যাওয়ার একটা উদ্দেশ্য ছিল আম্ফানের দরুণ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে পরবর্তী কাজের দিশা নির্ণয় করা। অনেকগুলো প্রশ্ন মাথায় ছিল, এখনও আছে। লকডাউনের সময়ে একটা বিশেষ প্রয়োজন ছিল হঠাৎ আয়হীন হয়ে পড়া মানুষদের কিছু ত্রাণ দিয়ে সময়টুকু পার হতে সাহায্য করা। আম্ফানের পর ফান্ড তোলার কাজে ভাল সাড়া পাওয়া গেছে। কিন্তু ঠিক কি ধরণের কাজ করলে দুর্গত মানুষের সবচেয়ে বেশী উপকার হয়, সেটা আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।
    হয়ত প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা নিজের লুকানো বায়াস দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু ত্রাণ নিতে আসা মানুষের সঙ্গে কথা বলে মনে হল যে আম্ফানের চেয়ে লকডাউন নিয়েই তাঁদের দুঃস্বপ্নের রাত কাটছে।

    গোসাবা ব্লকের সাতজেলিয়া গ্রাম মোটামুটি আসল সুন্দরবনের শুরু। গ্রামে বা আশেপাশের লোকালয়গুলিতে প্রায় কিছুই নেই। একটা পঞ্চায়েত অফিস, বাজার চত্বর আর কিছু আধভাঙ্গা বাড়ি। বড় গাছ এমনিতেই কম, যা ছিল ভেঙ্গে পড়েছে। পঞ্চায়েত অফিসের ছাদে সোলার প্যানেল বেঁকে গেছে। কিন্তু কংক্রিটের রাস্তা আছে। স্থানীয় লোকজন সেসব গাছ কেটে রাস্তা পরিস্কার করে রেখেছেন। বাজারের আশেপাশে অনেক বাড়িতেই দেখলাম নতুন বাঁশ পড়েছে। রাস্তার দুধারে ফাঁকা জমি। জমি পেরিয়ে দূরের লোকালয়গুলি হতদরিদ্র। সেখান থেকেই মানুষ এসেছেন রিলিফ নিতে। অধিকাংশই মহিলা।

    ওনারা কিন্তু প্রায় একযোগে বললেন, ঝড়ের চেয়ে অনেক বেশী ভাবিত অন্নসংস্থান নিয়ে। ওনাদের ভাষায়, ঝড়ের থেকে জলকে ভয় বেশী। আয়লার সময় সব ভেসে গিয়েছিল। এবার নদীর মাটির বাঁধ কোথাও কোথাও ভেঙ্গেছে, কিন্তু জল ঢোকেনি গ্রামে। অঞ্চলে বারো আনা বাড়ি মাটির। ঝড়ে চাল উড়ে গেছে - কিন্তু সারাতে বেশী অসুবিধা হয় নি। খড় বাড়িতে থাকে। খরচা বলতে দুদিনের মজুরি ৬০০। ঝড়ের দুদিনের মধ্যে বিদ্যুৎ চলে এসেছে। টিউব ওয়েল আছে, যদিও দূরে দূরে। তবু পানীয় জলের অসুবিধা নেই।
    সবাই বললেন, মূল সমস্যা লকডাউন। অধিকাংশের ছেলেরা কলকাতা বা শহরতলীতে কাজ করেন। তাঁদের দুমাস কোন আয় নেই, শহরে আটকে আছেন। করোনা এখনো আসেনি, কিন্তু সরকারের আদেশে অরথনৈতিক জীবনে এসেছে সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা। দোকানপাট বন্ধ, এখন সকালে অল্প সময়ের জন্য খোলে। দোকান যাঁরা চালান, তাঁদেরও হাতে কিছু নেই। স্কুল অনেকদিন বন্ধ। বাড়িতে পড়ানোর কেউ নেই। গ্রামে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, অসুখ হলে গোসাবা যেতে হয়। লকডাউনে গোসাবা যেতে আসতে দুশো টাকা। মে মাসে অবশেষে রেশনের চাল পেয়েছেন ৫ কিলো করে - কিন্তু শুধুই চাল। ভাতের সঙ্গে অন্য কিছু কিনে খাবার পয়সা নেই। তাই আধঘন্টা হেঁটে রিলিফ নিতে এসেছেন। এই রিলিফে তিনচারদিন চলবে, কিন্তু তারপর কি হবে কেউ জানেন না।



    যা দেখেছি, তার থেকে সিদ্ধান্ত অনেকরকম হতে পারে। হয়ত সুন্দরবনের এই অঞ্চলে ঝড়ের তান্ডব তেমন প্রবল হয়নি, সাগরদ্বীপ বা নামখানার দিকে যতটা হয়েছে। অথবা হয়ত, ঝড়ের যে ধ্বংসলীলার কথা আমরা বলছি বা ভাবছি, সেটা মূলতঃ অর্থনৈতিক কাঠামোর ক্ষতি – যাদের হারানোর কিছুই নেই, ঝড় তাদের থেকে আর কি কেড়ে নেবে? হয়তবা, এবারের ঝড়ের প্রভাব অপেক্ষাকৃত ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে অনেক বেশী।

    এইগুলি সবই অনুমান। যাঁরা সুন্দরবনে বা দঃ চব্বিশ পরগণার অন্যান্য অঞ্চলে আগে থেকে কাজ করছেন, তাঁরা এই বিষয়ে আরও বিশদ বলতে পারবেন। কিন্তু আমাদের সাতজেলিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে মনে হচ্ছে, এই মুহূর্তে অন্নসংস্থানের চিন্তা আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাই তাঁদের মূল সমস্যা। সেক্ষেত্রে আপাততঃ রণকৌশল হিসেবে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করার মূল্য কিন্তু অপরিসীম। আর মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনা হিসেবে আমাদের ভাবা উচিৎ সুন্দরবন অঞ্চলের মানুষের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার কথা, যাতে কলকাতার উপর নির্ভরতা কমে। লকডাউন উঠলেও কলকাতার অর্থনীতি ঝিম মেরে থাকবে, আর চলাচলের নানান আসুবিধা থাকবে। দুর্গত মানুষ নিজেরা সবচেয়ে ভাল বোঝেন সমস্যাগুলি ঠিক কোথায়, এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ণ হলে তাঁদের নিজেদের সমস্যা নিজেরাই অন্ততঃ খানিকটা হলেও মিটিয়ে নিতে পারবেন।

  • বিভাগ : খবর | ০১ জুন ২০২০ | ৩২৩ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • একলহমা | ০১ জুন ২০২০ ০৪:০৭93860
  • সেই, "যাদের কিছুই নেই, ঝড় তাদের থেকে আর কি কেড়ে নেবে?" 

  • মো. রেজাউল করিম | ০৫ জুন ২০২০ ০১:০২94007
  • বারবার সুন্দরবন পূবের মানুষগলোকে বাঁচানোর জন্য ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মানুষগুলো, তাদের নেতৃত্ব সেটি বুঝল না।

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত