• হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • ইরানে - নীলাঞ্জন হাজরা

    Bishan Basu লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৩ জানুয়ারি ২০২০ | ৮০১ বার পঠিত | ৪.৩/৫ ( ৩ জন) জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • "যে দেশে এক্কেবারে চলতি ভাষাতেই টুরিস্টকে বলা হয় ‘মুসাফির’ তার রোদ্দুর তো আলাদা হবেই।"

    আর যে বইয়ের শুরু এমন আশ্চর্য বাক্য দিয়ে, তার কাছে পাঠকের প্রত্যাশা ভিন্ন হতে বাধ্য। এই বাক্য অতিক্রম করে, ফয়েজ-এর অসামান্য কটি পংক্তি পার হয়ে আমরা পৌঁছোই এক তরুণী কবির মৃত্যুতে - দুর্ঘটনায় মৃত্যু - যে কবির কবিতা লেখক আবিষ্কার করেন খাস ওয়াশিংটন ডিসি-তে বসে - মার্কিন দেশ ও ইরান!!!

    হ্যাঁ, নীলাঞ্জন হাজরার "ইরানে" একটি ভ্রমণকাহিনী - ভ্রমণের গল্প - এক আশ্চর্য জার্নিরও গল্প - এক প্রাচীন দেশ, সুপ্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস-সংস্কৃতির অনবদ্য বয়ান।

    লেখক ইরানে গিয়েছেন, থেকেছেন সেদেশের বাসিন্দাদের সাথে, তাঁদের বাড়িতে, সম্পৃক্ত হয়েছেন তাঁদের রোজকার জীবনে - আর নিজস্ব বিবিধ ভ্রমণ-অভিজ্ঞতার সাথে মিশিয়ে ইরান দেখার নির্যাস তুলে এনেছেন এমন অনায়াসে, যার তুলনা মেলা ভার।

    "সে পেস্তা স্তূপীকৃত বিক্রি হয় তেহরান ত্যাবরিজ়, ইসফাহান, শিরাজ়ের বিপুল বাজারে বাজারে, তেমন বিপুল বাজার আমি আর কোথাও দেখিনি। দিল্লির শাহজাহানাবাদের চাঁদনি চক, হায়দরাবাদের চারমিনারের চুড়ি বাজার, লাহোরের আনারকলি বাজার, এথেন্স-এর মোনাস্তিরাকি মার্কেট, বুদাপেস্টের বুদায় নাজ-ভাসারচারনোক, ভেনিসের রিয়ালতো মের্কেতো, আমাদের কলকাতার হগ সাহেবের নিউ মার্কেট, এমনি যে কয়েকটি ডাকসাইটে বাজারের শব্দে-গন্ধে-বর্ণে নাক-চোখ-কান সব একসঙ্গে ধাঁধিয়েছে, একমাত্র ইস্তানবুলের কাপালি চারশি গ্র্যান্ড বাজার ছাড়া তাদের কোনোটিকে তেহরান, ত্যাবরিজ়, ইসফাহান, শিরাজ়ে যে বাজার দেখেছি তার ধারে-কাছে বলেও মনে হয়নি।"

    আর সেই বাজার থেকে লেখক পৌঁছে গিয়েছেন অতীত, সুদূর অতীতে - মহেঞ্জোদারো, মেসোপটেমিয়া, সিল্ক রুট - আবার মুহূর্তেই এসে দাঁড়িয়েছেন বর্তমানে - যে দক্ষতা, ভারতীয় রাগসঙ্গীতে ওস্তাদ সঙ্গতকারের তেহাই-সহযোগে সমে এসে দাঁড়ানোর সাথে, সম্ভবত, তুলনীয়।

    "সে সিল্ক আসত ইরান মারফত। এইভাবেই তৈরি হয়ে গেল দুনিয়ার বহু সভ্যতার গতিমুখ বদলে দেওয়া বাণিজ্য পথ— silk route। রেশমপথ। পরের দেড় হাজার বছর ধরে বেড়ে চলল এই পথের সংখ্যা। আর সেই সব পথ ধরে চলতে লাগল হরেক রকমের পণ্যের আদান-প্রদান, সংস্কৃতির আদান-প্রদান, আচার-ব্যবহারের আদান-প্রদান, ভাষার আদান-প্রদান। কোনো সংস্কৃতিই আর আগমার্কা খাঁটি রইল না। হিচককের ‘সাইকো’ ছবির সেই ছেলেটির মৃত মাকে আঁকড়ে থাকার মতো মাথার মধ্যে যে দুনিয়াটাকে আঁকড়ে বসে আছে হরেক কিসিমের মৌলবাদী, সে দুনিয়াটা সেদিনই মরে গিয়েছিল। এ হেন এক রেশমপথ চলে গিয়েছিল ইরানের র‍্যায়ি জনপদের ওপর দিয়ে। যে জনপদের পত্তন আনুমানিক ৩০০০ থেকে ২০০০ পূর্বসাধারণাব্দের মধ্যে, অর্থাৎ অন্তত চার হাজার বছর আগে। সে জনপদ আজ তেহরান পুরসভার মধ্যে পড়ে। উলিয়াম শেফার্ডের মধ্যযুগীয় বাণিজ্যপথের অ্যাটলাস খুললেই দেখা যাবে চিনের পিকিং (বেইজিং) থেকে বিভিন্ন রেশমপথ—কোনোটা গোবি মরুভূমি টপকে, কোনোটা কুনলুন পর্বতমালা পেরিয়ে—কাশগর, সেখান থেকে উজবেকিস্তানের সমরকন্দ ছুঁয়ে তুর্কমেনিস্তানের মার্ভ হয়ে ইরানের মশহদ, নিশাবুর তারপর র‍্যায়ি। এই র‍্যায়ি থেকে পথ দুটি। একটা চলে যেত সোজা ত্যাবরিজ়, সেখান থেকে তুরস্কের এরজ়ুরম হয়ে কৃষ্ণসাগরের উপকূলে ত্রেবিজোন্দে। আর অন্যটা র‍্যায়ি থেকে ইসফাহান, শিরাজ় হয়ে হেরমুজ় প্রণালী। সে পথের একটা ফ্যাকড়া আবার যেত ইয়জ়্‌দ হয়ে কেরমান। আর তৃতীয়টি যেত র‍্যায়ি থেকে ইরাকের বাগদাদ হয়ে মক্কা ছুঁয়ে লোহিত সাগরের উপকূলে আজকের সৌদি আরবের জেড্ডা। আর পাঁচটা সিল্ক রোডের মতোই হাজার হাজার মাইলের এইসব রেশমপথও ছিল বহু সভ্যতার মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া চনমনে সচল রক্তে ভরপুর সব ধমনি। দুর্গম গিরিখাত, মরুভূমি, ধু-ধু প্রান্তর পার করে চলেছে শত শত, কখনো কখনো হাজারে হাজারে ঘোড়া, উট, খচ্চরের পাল। পিঠ বোঝাই পণ্য। সঙ্গে সওদাগরদের দল। এক বিশাল চলমান বাজার। এর কোনো এক-শব্দের বাংলা নেই। কারণ বাঙালি চাঁদ সদাগরের ডিঙার সারি দেখেছে, কিন্তু এ দৃশ্য কখনো দেখেইনি। ফারসিতে আছে, কারণ এইসব চলমান মহাবাজারের পথের পাশেই গড়ে উঠেছে ইরানের বাঘা বাঘা শহর হাজার হাজার বছর ধরে। ফারসিতে এর নাম— কারোয়াঁ। যা অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে ঢুকে পড়ে হয়ে গেছে caravan। কিন্তু এই সুদীর্ঘ পথ তো আর কেউ একনাগাড়ে চলতে পারে না। থামতে হয়। ক্লান্তিতে, তৃষ্ণায়, খিদেয়, গভীর রাতে দস্যুর ভয়ে। শুধু এই বিপুল চলমান বাজারের কারোয়াঁর জিরোনোর জন্যেই এ পথের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে সরাই, কারোয়াঁসরাই, ইংরেজিতে caravanserai। কারোয়াঁসরাই হতে পারে ঠাঠা মরুর মাঝের মরূদ্যানে, পাহাড়ের বিপজ্জনক খাঁজে, ভয়ংকর ঊষর প্রান্তরের মাঝখানে আবার কোনো জনপদের মধ্যেও। আর জনপদের মধ্যে যখন তা এসে পৌঁছোয়। একের পর এক কারোয়াঁ রাত কাটায়, দিন কাটায় তাদের তাজ্জব সব ভিনদেশি পণ্য নিয়ে, সেখানেই যে শুরু হয়ে যাবে নানা কারবার, তাতে আর অবাক হওয়ার কী আছে? তৈরি হতে থাকে পাকাপোক্ত ‘বাজ়ার’। তাই ইরানের প্রত্যেকটি বাজারে আর পাঁচটা জিনিসের মধ্যে থাকতেই হবে ক্যারাভনসেরাই! সেই কারোয়াঁসরাইকে ঘিরে গড়ে ওঠে শুধু সেই শহরেরই নয়, আশেপাশের সমস্ত এলাকার বাণিজ্যিক প্রাণকেন্দ্র, অর্থনীতির মৌচাক। আর সেই বাজারের মুনাফার মধু খেয়ে খেয়ে যতই ফুলেফেঁপে উঠতে থাকে রাজনৈতিক শ্রেণি, বাড়তে থাকে বাজারের হর্তাকর্তা বড়ো বড়ো বাণিজ্যের মালিকদের প্রভাব-প্রতিপত্তি। ফারসিতে এঁদেরই বলা হয়— ‘বাজ়ারি’। এ কথা খুব গোপন নয় যে, তেহরান বাজ়ার-ই বোজ়োর্গ-এর বাজ়ারিদের হাতে শত শত বছর ধরে, এমনকী আজও অনেকাংশে রয়েছে দেশের ভবিষ্যতের লাগাম। ১৯৭৯-র সেই যুগান্তকারী ইনকিলাব-ই-ইসলামিতে ভীষণ জরুরি ছিল এই বাজ়ারিদের সক্রিয় সাহায্য।"

    দীর্ঘ উদ্ধৃতি আপনার বিরক্তি উৎপাদন করল কিনা জানি না, কিন্তু, এক শহরের বাজারে দাঁড়িয়ে এমন অনায়াসে অতীত-বর্তমান মিলিয়ে, এমন করে সাম্প্রতিক রাজনীতির মোচড়কে ধরা - উদ্ধৃতির সংক্ষেপ করা সম্ভব হল না।

    ইরান, বাজার, সেখান থেকে পার্শিয়ান কার্পেট।

    "সবই দেখতে অপরূপ, কিন্তু একটার থেকে অন্যটার হতে পারে আকাশ-পাতাল তফাত। কার্পেটের বাজারে একটা ইংরেজি কথা খুব ঘোরে মুখে মুখে KPSI-Knots per square inch! কার্পেটের দাম নির্ভর করতে পারে অনেক কিছুর ওপরেই। তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ এই KPSI, মানে প্রতি বর্গইঞ্চিতে রয়েছে ক-টা গিঁট। যত বেশি গিঁট ততই ঠাস বুনোট, আর ততই মূল্যবান। ইরানের একটি মূল্যবান কার্পেটে থাকবে প্রতি বর্গইঞ্চিতে গড়ে অন্তত ৩৩০টি গিঁট। সেই হিসেবের একটি ৯ ফুট বাই ১২ ফুটের কার্পেট বুনতে একজন শিল্পীর সময় লাগে দু-বছর! তেমন তেমন দুর্লভ কার্পেটে গিঁটের সংখ্যা হতে পারে এক বর্গইঞ্চিতে ১০৬৬টি পর্যন্ত। আর সেইজন্যেই হাতে বোনা আর মেশিনে বোনা কার্পেটের দামের এমন আকাশ-পাতাল তফাত। তফাত অবশ্য তার সৌন্দর্যে আর মজবুতিতেও। মেশিনের কার্পেটের চেহারা বছর কুড়ির পর থেকেই খাবলা খাবলা লোম ওঠা কুকুরের মতো হতে শুরু করে। আর হাতে বোনা ফর্শে্‌র দাম জাত ওয়াইনের মতোই বাড়তে থাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।"

    কার্পেট থেকে খাবার। খাবারের কথা উঠলেই লেখক কিঞ্চিৎ দুর্বল হয়ে পড়েন - ইরানের রুটি, চা, কাবার, খাদ্যাভ্যাস, খাওয়ার ধরন - বিরিয়ানি - সবই আছে। আর কথায় বলে, স্নান-খাওয়া। কাজেই, স্নান - হামাম - তারও সরস বর্ণনা।

    স্নান-খাওয়ার পাশাপাশি বেড়ানোও। অপরূপ সব অলঙ্করণমাখা স্থাপত্যে ভরা দেশ ইরান - সূক্ষ্ম কারুকাজের সে বর্ণনা এতই জীবন্ত, যে ছবির মতোই দৃশ্যমান - আর, হ্যাঁ,,আগাগোড়া রঙীন কাগজে ছাপা এই বইয়ের পরতে পরতে দুর্দান্ত সব ফটোগ্রাফ। পার্সেপলিস, রঙীন নক্সাকাটা মসজিদ কিম্বা ছোট শহর বা বালিয়াড়ি - লেখা আর ছবি মিলিয়েমিশিয়ে আপনাকে নিয়ে যেতে পারে অকুস্থলে, অনায়াসে।

    আর সুফি পীঠস্থানের কথা। এদেশের ঘিঞ্জি ধর্মস্থান আর ভিড়ভাট্টা-নিষেধের পরিবেশের ওপিঠে শামস-এ-তাবরিজের সমাধিস্থল -

    "ঝকঝকে তকতকে একটা ছোট্টো খোলা পার্ক। ঢোকার মুখেই শাম্‌স-এর একটা সুন্দর আবক্ষ মূর্তি। পার্কের মাঝামাঝি সম্পূর্ণ নিরাভরণ, কোনো কারুকার্যহীন সমাধি-পাথর। পিছনে একটা প্রাচীন মিনার, যার সঙ্গে আসলে এ সমাধির কোনো যোগাযোগ নেই। কোনো দরগা নেই। কাওয়ালি, প্রদীপ, ধূপ, ধুনো, মানতের সুতো কিচ্ছু নেই। অথচ সুফি দুনিয়ার অন্যতম পবিত্র পীঠস্থান! আমার মুখ দিয়ে কথা সরে না। বহুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি। ধীরে ধীরে মনের মধ্যে একটা খুব পরিচিত গানের লাইন ভেসে ওঠে। শাম্‌স-এর জীবন, তাঁর শিক্ষার সঙ্গে এটাই তো মানানসই। ফুলের মালা, দীপের আলো, ধূপের ধোঁয়া থেকেই তো সারাজীবন পালিয়ে বেড়িয়েছেন তিনি। তাঁর যে ‘মকালাত', যার আংশিক অনুবাদ সেই ‘Me & Rumi’, তার ছত্রে ছত্রে তো সেই শিক্ষাই। সে সমাধিতে যেমন নেই ভক্তির উদ্‌যাপনের কোনো আয়োজন, তেমনিই নেই যাতায়াতের ওপর কোনো নিষেধ। মহিলাদের ওপর, বা কারও ওপরেই।"

    আর নিষেধাজ্ঞা না থাকার ওপাশে? এই একবিংশ শতকের দুনিয়াতে কেমন থাকেন ইরানের মেয়েরা? লেখক ইরানেরই এক মেয়েকে জিজ্ঞেস করেন -

    "আমি যে-দেশ থেকে আসছি সেখানে মেয়েদের মাথা ঢাকতে হয় না, তারা বাইক চড়তে পারে, যেকোনো রকমের খেলাধুলো করতে পারে, মঞ্চে উঠে নেচে কুঁদে গানবাজনা করতে পারে। তোমরা পারো না। সরকারের ‘মোরাল পুলিশ’ ধরে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমার দেশে ৩৫ শতাংশ নারী সই পর্যন্ত করতে পারেন না, সম্পূর্ণ নিরক্ষর, স্কুল-কলেজের পড়াশুনা তো ছেড়েই দিলাম। আর তোমার দেশে ১৫ থেকে ২৪ বছরের মেয়েদের ৯৮.৫ শতাংশ সাক্ষর। বিশ্বব্যাঙ্কের ২০১৪-র রিপোর্ট বলছে তোমার দেশে মহিলাদের ৫৬.৫০ শতাংশ কোনো-না-কোনো মাইনে পাওয়া চাকরিতে নিযুক্ত। আমার দেশে সেই হারটা ১৪.৫ শতাংশ।…আমি নিজে ঘুরে ঘুরে দেখেছি ইরানের শহরগুলিতে আপিসে আপিসে চাকুরিরতা মেয়েদের ছড়াছড়ি। এবার তুমি বলো, শিমা, মেয়ে হিসেবে বড়ো হওয়ার সময় তোমায় যদি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হত তুমি কোন দেশ বেছে নিতে? ইরান না হিন্দ? অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে তার বড়ো বড়ো চোখ দুটো সোজা আমার চোখে রেখে শিমা বলেছিল— হিন্দ।

    তর্ক বাড়াইনি। কারণ আমার বরাবরই মনে হয়েছে পরিসংখ্যানের দুনিয়াটা আসলে ভীষণ পুরুষতান্ত্রিক, মেয়েদের দুনিয়াটাকে, এবং তাদের পছন্দের বিকল্পগুলোকেও, নিখাদ পরিসংখ্যান দিয়ে বুঝে ফেলা অসম্ভব।"

    অতীত আর বর্তমান, বাস্তব আর পরাবাস্তবের অনবদ্য মিশেল এই বইয়ের পাতায় পাতায় - হয়ত, ইরানেই। তবু, শেষমেশ দেশ দেখা বলতে মানুষ দেখা - তাই না?

    "ইরানে দ্রষ্টব্য এতই যে বুড়িছোঁয়া করে দেখলেই তার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণগুলি দেখতে কয়েক বছর লেগে যাবে। কিন্তু আমার মনে হয়েছে যার আকর্ষণ সারাজীবন কাটিয়ে দিলেও ফুরোবে না, তা হল ইরানিদের দিলখোলা বন্ধুত্ব। মুসাফিরের সঙ্গেও। প্রথম দেখার মুহূর্তটি থেকে।"

    ইতিহাসের এক বিশেষ মুহূর্তে যেদেশে গুলিয়ে দেওয়া হয় দেশ শব্দের দ্যোতনা - না, দেশ বলতে সীমানা-আদালত-কাঁটাতার-উর্দিপরা প্রহরী নয়, দেশ অর্থাৎ দেশের মানুষ - সেই দেশে বসে পাণ্ডিত্য-মেধা আর অসামান্য দেখার চোখ-এর যুগলবন্দীতে লেখা এই ভ্রমণকাহিনী অবশ্যপাঠ্য।

    হ্যাঁ, একটুও অতিকথন হবে না, যদি বলি, বাংলাভাষায় দেশেবিদেশে-র পর ঠিক এই ধাঁচে এমন ভ্রমণকাহিনী লেখা হয়নি।

    কাহিনীর শুরু এক ইরানি মহিলাকবি দিয়ে - ফরুঘ ফরুঘজাদ - শেষ সেই কবির কবরে দাঁড়িয়ে - ব্যস্ত শহরের মাঝে যে কবরের পাশে বসে কজন মহিলা কবিতা পড়ছেন -

    "আটচল্লিশ বছর আগে প্রয়াত এক কবি। জীবনকালে কোনো পুরস্কারে নাম রটেনি তাঁর। মারা গিয়েছেন মাত্র ১২৭টি কবিতা রেখে। সেদিন যতটা ধিকৃত ছিলেন সমাজের হর্তাকর্তাদের মহলে, আজ তার থেকে বেশি বই কম নন। অথচ কী আশ্চর্য! এক অত্যাধুনিক মহাব্যস্ত কোটিখানেক মানুষের শহরের এক জীর্ণ কবরখানায় একদল তরুণী জড়ো হয়েছে তার গোরে, মোমবাতি আর কবিতার বই হাতে। বিনা অজুহাতে। এই আমার কাছে ইরান। এই তো সভ্যতা। হাজার হাজার বছরের পুরুষতান্ত্রিক, ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয়, ধনতন্ত্রীয় ভোগবাদী দাপটে ফাটল ধরিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে কবিতা ঘাসের মতোই অপরাজেয়। প্রাণ আমার, মুসাফির আমার সেই মুহূর্তের সাক্ষী। ইরানে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে থাকি। অনেকক্ষণ পরে তহমিনেহ্‌ আমার পিঠে হাত রাখে। এবার যেতে হবে।"

    এ এক অসামান্য বই। আগাগোড়া রঙীন - হিরণ মিত্র-র অসামান্য প্রচ্ছদ, অনবদ্য অলঙ্করণ, ফরুঘের পোর্ট্রেটখানা তো অতুলনীয় - আর দারুণ সব ফটোগ্রাফ।

    প্রিয় পাঠিকা, বইটা পড়ুন - হ্যাঁ, চাপাচাপিই করছি - পড়ে দেখুন, প্লীজ।

    ইরানে
    নীলাঞ্জন হাজরা
    প্রকাশক - গুরুচণ্ডা৯, দাম সাড়ে চারশ টাকা।
  • বিভাগ : আলোচনা | ২৩ জানুয়ারি ২০২০ | ৮০১ বার পঠিত | ৪.৩/৫ ( ৩ জন) | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | ২৪ জানুয়ারি ২০২০ ২২:৪৫90834
  • অবশ্যই কিনবো এই বই, "উজান" এ বুকিং দেওয়া হয়ে গেছে!  লেখককে অভিনন্দন

  • Nilanjan | 172.69.22.139 | ২৫ জানুয়ারি ২০২০ ০৬:১৮90836
  • রিভিউ পড়ে বইটি পড়তে ইচ্ছে হয়
  • বিপ্লব রহমান | ২৫ জানুয়ারি ২০২০ ২১:৩২90843
  • পুনশ্চঃ একটি দ্বিধাসহ লেখক/ প্রকাশকের  প্রশ্ন, এই দুর্দিনে বইয়ের দাম (ভারতীয় মূদ্রায়) সাড়ে চারশো টাকা! মানে বাংলাদেশী টাকায় প্রায় হাজার টাকা (কাম সারছে)!! 

    তবে এটি কী গুরুচণ্ডালী চটি সিরিজ নয়? ইহা হয় একটি গুরুচণ্ডালী ঢাউস সিরিজ?

  • রৌহিন | ২৬ জানুয়ারি ২০২০ ২১:১০90861
  • এটা মাস্ট। অবশ্যপাঠ্য।

    @বিপ্লব - এটা সেই অর্থে হয়তো চটি বলা যাবে না ঠিকই। কিন্তু বইটার পাতা, ছবি, অলঙ্করণ দেখলে বুঝবে দামের কারণ। আফ হ্যাঁ, এই সব এবং কন্টেন্ট ধরলে বইটার যে দাম হতে পারত, সেই তুলনা করলে এটাকে চটিও বলাই যায়।

  • | 162.158.167.143 | ২৬ জানুয়ারি ২০২০ ২১:১৭90862
  • এই লেখাটা এই সমিয় পত্রিকায় বেরোত। তার থেকে কিভহু বেড়েছে আশা করি।

    এই লেখকের সাথে একবার গুরু নিয়েই আলাপ হয়েছিল, গুরুর শিশুকালে। তিনি তখন আমায় আম্রিকান সেন্টারে নেমন্ত করেছিলেন আড্ডা মারার জন্য। ☺
  • | 172.69.134.14 | ২৬ জানুয়ারি ২০২০ ২১:১৮90863
  • 'এই সময়'
  • syandi | 162.158.91.226 | ২৭ জানুয়ারি ২০২০ ০১:৩৬90864
  • ISBN টা একটু দেবেন?

  • বিপ্লব রহমান | ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ০৬:১৬90878
  • @ রৌহিন দা,  আচ্ছা, এইবার বুঝেছি। ভ্রমণ কাহিনিতে ছবি তো চাই-ই।  শুভ         

  • ডা রুমী আলম [email protected] | 162.158.166.22 | ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০ ১১:৪৩90887
  • ঢাকায় বইটি কিভাবে পাওয়া যাবে?
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত