এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • আফিয়া সিদ্দিকি কে?

    পিনাকী মিত্র লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৫ ডিসেম্বর ২০০৯ | ১৫০৮ বার পঠিত
  • ডা: আফিয়া সিদ্দিকির প্রকৃত পরিচয় কী? তিনি কি আল কায়দার "মাতাহারি'? ৯/১১-র ষড়যন্ত্রকারীদের একজন? নাকি বাগরামের কুখ্যাত কারাগারে আমেরিকার অত্যাচারের শিকার হওয়া এক সাধারণ পাকিস্তানি নারী? এরকম হাজারো চাঞ্চল্যকর প্রশ্নের সমাধানসূত্র হয়তো মিলতে পারে আগামী জানুয়ারি মাস থেকে ম্যানহাটনের একটি আদালতে শুরু হতে চলা একটি মামলায়। যে মামলায় আফিয়া আফগানিস্তানের একটি পুলিশ চৌকিতে এক মার্কিন সেনা অফিসারকে লক্ষ্য করে গুলি চালনার দায়ে অভিযুক্ত।

    ঘটনাটি ২০০৮ সালের। কাবুল থেকে ৫০ মাইল দূরের গজনী শহরের এক পুলিশ চৌকিতে আফিয়া এবং তাঁর ১১ বছরের ছেলেকে জেরা করতে যান দুই মার্কিন সেনা অফিসার এবং দুজন এফ বি আই এজেন্ট। মার্কিন সেনার বয়ান অনুযায়ী তার ঠিক আগের দিন আফগান পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন আফিয়া। কারণ নাকি তাঁর কাছে পাওয়া গিয়েছিল আমেরিকার স্ট্যাচু অফ লিবার্টির মত জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটানোর প্ল্যান এবং কিছু রাসায়নিক জেল জাতীয় বস্তু। এর পরের ঘটনা যেকোনও হিন্দী সিনেমাকেও হার মানায়। জেরার ঘরটিতে একজন পুলিশ অফিসার নাকি তাঁর বন্দুকটি অসাবধানবশত: পায়ের কাছে নামিয়ে রেখেছিলেন। আফিয়া নাকি সেটি তুলে নিয়ে অফিসারের মাথায় ধরেন এবং "আল্লাহ আকবর' বলে চীৎকার করতে থাকেন। ধ্বস্তাধস্তি শুরু হয় এবং আফিয়ার চালানো গুলিতে কোনও সেনা আহত না হলেও আফিয়া বুলেটবিদ্ধ হন।

    এই অব্দি পড়ে এটাকে মার্কিন সেনার বানানো গল্প মনে হওয়াটা খুব একটা অস্বাভাবিক নয়। কেনই বা আফিয়া স্ট্যাচু অফ লিবার্টিতে বিস্ফোরণের প্ল্যান এবং রাসায়নিক সঙ্গে নিয়ে ঘুরবেন, কেনই বা মার্কিন সেনা তার বন্দুক নামিয়ে পায়ের কাছে রাখবে, আর দুবলা পাতলা আফিয়া সেটা তুলে নিয়ে আত্মঘাতী বীরত্ব দেখাতে যাবেন - এরকম অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন মনে না জেগে পারে না। কিন্তু পিকচার আভি ভি বাকী হ্যায়। আফিয়ার অতীতও মোটেই সাদামাটা নয়। এই থিলারধর্মী চিত্রনাট্যটিকে আরও বর্ণময় করে তোলার সব উপাদানই আফিয়ার পূর্ব জীবনে উপস্থিত। ১৯৯০ তে তিনি আমেরিকায় আসেন। প্রথমে এম আই টি এবং পরবর্তীতে ব্র্যান্ডিস ইউনিভার্সিটি থেকে কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সে স্নাতক হন। ১৯৯৫ সালে বিয়ে করেন করাচীর এক ডাক্তারকে, যাঁর নাম আমজাদ খান। বস্টনে থাকাকালীনই আফিয়া ছিলেন পরিচিত মুসলিম অ্যাকটিভিস্ট। আফগানিস্তান, বসনিয়া ও চেচনিয়ার জন্যে প্রচার এবং ফান্ড জোগাড় করায় তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। কিন্তু যে সংস্থাগুলির হয়ে তিনি টাকা তুলতেন, ১৯৯৮ সালে তাদের মধ্যে একটির সাথে পূর্ব আফ্রিকার মার্কিন দূতাবাসে বিস্ফোরণের যোগাযোগ আবিষ্কৃত হয়। আরও তিনটি এরকম সংস্থা পরে ব্যান হয়ে যায় তাদের আল কায়দার সাথে যোগাযোগের কারণে। এরপর ২০০২ সালে আফিয়ার স্বামীকে একবার এফ বি আই এর জেরার মুখে পড়তে হয়। কারণ? ইন্টারনেটের মাধ্যমে তিনি কিনেছিলেন ১০০০০ ডলার মূল্যের নাইট ভিশন গগলস, এছাড়াও বডি আর্মার এবং ৪৫ টি মিলিটারি ধর্মী বই। জেরায় অবশ্য তিনি বলেন শিকার করার জন্য নাকি ওসব কিনেছেন। ঐ বছরের আগস্ট মাসে যদিও তাঁরা দেশে ফিরে যান এবং তাঁদের ডিভোর্স হয়। ২০০২-এর ই ডিসেম্বরে আফিয়া আবার ইউ এস এ তে আসেন ১০ দিনের জন্য এবং ঐ ১০ দিনের মধ্যে তিনি মজিদ খান নামক এক ব্যক্তির নামে একটি পোস্ট বক্স খোলেন, যে মজিদ খান পরবর্তীতে বাল্টিমোরের একটি পেট্রল পাম্প ওড়ানোয় অভিযুক্ত হবেন। ডিভোর্সের ৬ মাসের মাথায় অফিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন। এই ভদ্রলোকের নাম আম্মার আল-বালুচি, যিনি কিনা আবার ৯/১১-এর এক অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী খালিদ শেখ মহম্মদ এর ভাইপো।

    সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্বটি এরপর শুরু হবে। ২০০৩ এর মার্চে এফ বি আই "গ্লোবাল অ্যালার্ট' জারি করবে আফিয়া ও তাঁর প্রাক্তন স্বামী আমজাদ খানের নামে। আর এই অ্যালার্ট জারির কয়েক সপ্তাহের মধ্যে জাস্ট কর্পূরের মত উবে যাবেন আফিয়া। না, কয়েক দিন বা কয়েক মাসের জন্য নয়। পুরো পাঁচ বছরের জন্য। মার্কিন সেনার বয়ানে যাঁর পুনরাবির্ভাব হবে ২০০৮-এ ঐ গজনীর পুলিশ চৌকিতে।

    কোথায় ছিলেন আফিয়া এই পাঁচ পাঁচটি বছর? দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ডেকলান ওয়ালশের করাচিতে গিয়ে করা জিজ্ঞাসাবাদ থেকে উঠে এসেছে অনেক চমকপ্রদ এবং একই সাথে বিভ্রান্তিকর তথ্য। সাংবাদিক ওয়ালশ কথা বলেছেন অনেকের সাথে। একটি মহলের মতে এই পাঁচটি বছর আফিয়া ছিলেন বাগরামের কারাগারে, সি আই এর হাতে গোপনে বন্দী। বন্দীদশায় জুটেছে অকথ্য অত্যাচার। এই অংশটির কাছে আফিয়া হলেন আমেরিকার কোভার্ট মিলিটারি অপারেশনের শিকার মানুষদের এক জ্বলন্ত নিদর্শন। এবং এই মহলটিতে আছেন কেবলমাত্র আফিয়ার বোন ফাওজিয়াই নন, অনেক নামকরা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও, যেমন ইমরান খান। আফিয়ার বোন ফাওজিয়া এই নিউ ইয়র্কে হতে চলা মামলাটিকে "নাটক' বলে অভিহিত করেন। নির্দিষ্ট তথ্যের বদলে তিনি কিছু রহস্যময় বাক্যবন্ধের সাহায্য নেন সাংবাদিকের সাথে কথা বলার সময়। এবং বিশেষ কিছু বলতে না চাওয়ার কারণ হিসেবে কোনও এক রহস্যময় "নেটওয়ার্ক' এর সাথে এরকম মুখ না খোলার চুক্তি হয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

    ঠিক এর বিপরীত তথ্য এই সাংবাদিক পান আফিয়ার প্রাক্তন স্বামী আমজাদ খানের কাছ থেকে, যিনি দাবী করেন এই পাঁচ বছরের মধ্যে আফিয়াকে তিনি স্বচক্ষে একাধিকবার দেখেছেন। তাঁর মতে আফিয়া এই পাঁচ বছর তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন এবং আই এস আই তাঁর গতিবিধির উপর নজর রাখছিল। এমনকি তিনি এও বলেন যে আফিজার অতিরিক্ত "জিহাদ' প্রীতি নিয়েই নাকি তাঁদের মধ্যে বহুবার অশান্তি হয়েছে। আফিয়ার অন্তর্ধান নিয়ে এই সম্পূর্ন বিপরীতধর্মী থিওরি বাজারে ছাড়ায় তাঁর নামে মানহানির মামলা করেছেন আফিয়ার বোন ফাওজিয়া। আবার এই দুই এক্সট্রিমের মাঝামাঝি একটা বক্তব্য পাওয়া গেছে অন্য এক আত্মীয়ের বয়ানে। আফিয়ার কাকা শামস-উল হাসান ফারুকি। যিনি দাবী করেছেন আফিয়া তাঁর কাছে এসেছিলেন ২০০৮ এর জানুয়ারিতে। অর্থাৎ আফগানিস্তানে গুলি চালনার ঘটনাটির আট মাস আগে। তাঁর বক্তব্য আফিয়া নাকি তাঁকে বলেছেন তিনি বন্দী ছিলেন দীর্ঘদিন। পাকিস্তান এবং আমেরিকার হাতে। কিন্তু কোথায় ছিলেন তা আফিয়া বুঝতে পারেন নি। এবং ফারুকির সাথে দেখা হওয়ার সময় তিনি নাকি উভয় ইন্টেলিজেন্সের কড়া নজরদারির মধ্যে রয়েছেন এবং তারা নাকি আফিয়াকে তাদের চর হয়ে আল কায়দার মধ্যে ঢোকার কাজ দিয়েছে। ফারুকি আরও জানান যে আফিয়া এই কাজ করতে চান না এবং তিনি ভয় পাচ্ছেন। যদিও ফারুকির কাছে যাওয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে তালিবানদের কাছে যদি তিনি কোনোভাবে আফিয়াকে পৌঁছে দিতে পারেন, কারণ তালিবানদের কাছেই আফিয়া নিজেকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছিলেন।

    কিন্তু আফিয়া নিজে এ ব্যাপারে কি বলছেন? হয়তো জানা যাবে জানুয়ারী থেকে শুরু হতে চলা মামলার সময়েই। হয়তো আদৌ জানা যাবে না। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ আর আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী যুদ্ধ - এই দুয়ের এস্পায়োনেজের চক্করে "প্রকৃত সত্য'র মৃত্যু হয়েছে বহুকাল আগেই। এখন যেটুকু আমার আপনার জন্যে পড়ে আছে - তা হল একটি জমজমাট হলিউডি থিলারের প্লট।

    ৬ই ডিসেম্বর, ২০০৯
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০৫ ডিসেম্বর ২০০৯ | ১৫০৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল প্রতিক্রিয়া দিন