এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আগ্রাসী হিন্দুত্ব: অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ#পর্ব-৩

    Ashoke Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৫ মে ২০২৩ | ৪২০ বার পঠিত
  • || ৫. প্রসঙ্গ: মুসলিম শাসনকাল ||
     
    মুসলমান শাসকমাত্রই এই দেশকে লুঠ করেছে। মুসলিম শাসনে ব্যাপক সংখ্যায় হিন্দুদের জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়; মুসলমান শাসকরা অসংখ্য হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছে; মুসলমান শাসনে হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বিপন্ন ছিল; মুসলমান শাসনামলে লাগাতার এক হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ চলেছিল; ইত্যাদি। সঙ্ঘপরিবার খুব সযত্নে দৃঢ়ভাবে এদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের মনে এই সমস্ত কথা ঢুকিয়ে দেবার প্রাণপন চেষ্টা করে চলেছে।, অর্থাৎ এই সমস্ত কথা বারবার বলে বলে জনগণের মধ্যে একটা তীক্ষ্ণ ধর্মীয় বিভাজনের অপচেষ্টা তারা করে যাচ্ছে। মোদীর শাসন কালে এই চেষ্টায় তারা কিয়দংশে সফল হয়েছে বলা চলে।
     
    কিন্তু সত্যিই কি তাই?
     
    হ্যাঁ, একথা ঠিক সুলতান এবং মোঘল বংশীয়রা এদেশের রাজাদের ওপর আক্রমণ করেই ভারতের সিংহাসন দখল করেছিল, যুদ্ধের সময় নিশ্চয়ই লুঠপাট চালিয়েছিল, বিজিত সেনাদের উপর অত্যাচারও করেছিল, কিন্তু সেটা কি তারা ধর্মের ভিত্তিতে করেছিল? আসলে তো ধর্মীয় লড়াই ছিল না সেগুলো, সেগুলো তো ছিলো রাজ্যপাট ক্ষমতা দখলের লড়াই।
     
    যদি ওদের কথামতো এটাকে ধর্মের ভিত্তিতে লড়াই বলে ধরে নিই, তাহলে সম্রাট অশোক যে কলিঙ্গ যুদ্ধ করেছিলেন সেখানে যে দুই লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল, তারা কারা ছিল? তারা তো সবাই হিন্দু ছিল, তাহলে আমরা বলব যে সম্রাট অশোক হিন্দুবিরোধী রাজা ছিলেন! তিনি সেই যুদ্ধের পরে নাকি বৌদ্ধ হয়েছিলেন। তাহলে তাকেও কি হিন্দু বিরোধী রাজা বলা হবে?
     
    ১৫৭৬ সালের বিখ্যাত হলদিঘাটের যুদ্ধে, রানাপ্রতাপের সাথে আকবরের যুদ্ধে, রানা প্রতাপের সেনাপতির নাম ছিল মীর হাকিম, আর আকবরের প্রধান সেনাপতি ছিলেন মান সিংহ। তো তাঁদের মধ্যেই বা কোথায় ছিল হিন্দু মুসলিম যুদ্ধ?
     
    যে মারাঠা রাজ শিবাজীকে হিন্দু আইকন বানিয়ে রেখেছে সঙ্ঘীরা, তাঁর সেনাপতির নাম ছিল ইব্রাহিম খান, ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর নাম ছিল সিদ্দিকি ইব্রাহিম, অন্য দিকে মোগল সম্রাট অওরঙজেবের সৈন্যদলেও অনেক হিন্দু সেনা এবং সেনাপতি ছিল। তাহলে এর মধ্যে কোথা থেকে এল হিন্দু মুসলিম লড়াই?
     
    এদের সবটাই ছিল রাজ্যপাট দখলের লড়াই। বড় আর ছোট সামন্ত রাজাদের পারস্পরিক রাজ্য বিস্তার আর ধরে রাখার লড়াই। এর মধ্যে হিন্দু মুসলমান ভাগাভাগি করার কোনো অর্থই নেই।
     
    আর তাছাড়া মুসলিম শাসকরা শুধুই কি হিন্দু রাজাদের আক্রমণ করেছে? তাহলে শেরশাহ, হুমায়ুনের লড়াইটাকে আমরা কী বলব? ইতিহাস কি এতই সরল?
     
    আসল কথা হল, ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের একটা বড় অংশ এবং পরবর্তীকালে আরএসএস এই সমস্ত সাম্প্রদায়িক বিবৃতি বানিয়েছে ইংরেজদের পরিবেশিত মিথ্যা ইতিহাস পাঠ থেকে। প্রথম অংশ এগুলোকে বিনা বিচারে গ্রহণ করেছে, দ্বিতীয় দল একে ভিত্তি করেই তাদের মতাদর্শগত প্রচারের হাতিয়ারে শান দিয়েছে। 
     
    কর্ণাটকে আরএসএস-এর এক নম্বর শত্রু হলেন টিপু সুলতান, যাঁকে ওরা হিন্দুবিরোধী বলে প্রচারে সদা সচেষ্ট, এবং সম্প্রতি সেই রাজ্যের বিজেপি সরকার স্কুল পাঠ্য ইতিহাস বই থেকে টিপু সুলতানের উল্লেখ সম্পূর্ণ মুছে দিয়েছে। অথচ, সেই টিপু সুলতানের একজন সেনাপতির নাম ছিলো রঙ্গা, ধর্ম হিন্দু, তাঁর খাজাঞ্চির নাম ছিলো কৃষ্ণ রাও, আবারও ধর্মে হিন্দু, ইত্যাদি। কথিত আছে, প্রাতঃকালে শ্রীরঙ্গপতনম মন্দির থেকে একবার ঘুরে না এসে তিনি সকালে কিছু খেতেন না। ১৭৯১ সালে মারাঠারা শ্রীরঙ্গপতনম মন্দির একবার লুট করেছিল। ওই মন্দিরের তৎকালীন পুরোহিত শ্রীশংকরাচার্য টিপু সুলতানকে চিঠি লিখে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ জানান। টিপু সুলতান তৎক্ষণাৎ তাঁর সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে সেই মন্দিরকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করেন এবং ভাঙা মন্দির আবার আগের মতো করে সাজিয়ে দেন। তাহলে কি আমরা মারাঠাদেরকে মুসলমান আর টিপুকে হিন্দু বলব?
     
    প্রশ্ন করতে পারেন, টিপু এদের কাছে এত বড় শত্রু হলেন কেন?
     
    সহজ কারণ। টিপু সুলতান ইংরেজদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন এবং আমৃত্যু নিজের রাজ্যকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। পালিয়েও যাননি, ইংরেজদের কাছে বশ্যতাও স্বীকার করেননি। আর বিজেপি-র পিতৃসম জনসঙ্ঘ এবং আরএসএস-দের কাছে ইংরেজরা ছিল অত্যন্ত ভালো প্রভু এবং তারা নিজেরা ছিল খুব বিশ্বস্ত প্রভুভক্ত। ফলে প্রভুর বিরুদ্ধে একজন স্বাধীন চেতা মুসলমান রাজার এই যুদ্ধকে তারা কখনই মেনে নিতে পারেনি এবং আজও পারছে না।
     
    সঙ্ঘ পরিবারের হিসাব মতো মুসলিম রাজত্বে নাকি মোট ৬০০০০ মন্দির ভাঙা পড়েছে। তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, ১৭৫৭ সাল পর্যন্ত মোট এত মন্দির দেশে ছিলই না। আর যে অধিকাংশ বড় বড় ঐতিহ্যমণ্ডিত পুরনো মন্দিরগুলি (পুরী, তিরুপতি, ইত্যাদি) আজ অবধি টিকে আছে, সেগুলির প্রায় সবই মুসলমান আমলে তৈরি এবং/অথবা সেই আমল পার করে এসেছে। রিচার্ড ইটন একটা হিসাবে দেখিয়েছেন, ১১৯২ থেকে ১৭২৯ সালের মধ্যে ভারতে খুব বেশি হলে ৮০টির মতো মন্দির মুসলমান রাজাদের হাতে ভেঙেছে। [Eaton 2004, 37] আশিকে ষাট হাজার বানাতে হলে মিথ্যার পরিমাণ কত গুণ হয় পাঠকদের হিসাব করে দেখতে বলছি।
     
    যে তথাকথিত রামমন্দির ভাঙা নিয়ে গত চার দশক ধরে সঙ্ঘ পরিবার প্রচুর হইচই করল, বাবরি মসজিদ ভেঙে যার নামে বিজেপি সংসদে দুই থেকে তিনশ বিশ হল, আমরা দেখিয়েছি, সেই মন্দিরের অস্তিত্ব এবং তাকে ভাঙা সংক্রান্ত একটাও তথ্য নেই। সমস্তটাই বিজেপি আরএসএস-দের কল্পিত ও মনোরঞ্জিত। [মুখোপাধ্যায় ২০২০] মজার কথা হল, বিজেপি-র হাতে বাবরি মসজিদের জমিতে রাম মন্দির নির্মাণের স্বত্ব তুলে দিয়েও সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত তাদের হাজার পৃষ্ঠার রায়ে বলতে বাধ্য হয়েছে যে রাম মন্দিরের অস্তিত্বের সপক্ষে বিশ্বাস ছাড়া এবং বাবরের হাতে তার ভাঙার ব্যাপারে জনশ্রুতি ছাড়া একটাও—আক্ষরিক অর্থেই একটাও—নিরেট তথ্য নেই।
     
    পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক ক্ষিতিমোহন সেন যখন মধ্যযুগের ইতিহাস অধ্যয়ন করতে লাগলেন, তিনি দেখলেন, দ্বাদশ থেকে অষ্টাদশ শতাব্দ পর্যন্ত ভারতের কাব্য সাহিত্য নাটক সঙ্গীত স্থাপত্য ভাস্কর্য ইত্যাদি সমস্ত ক্ষেত্রে জড়িয়ে রয়েছে “হিন্দু মুসলমানের যুক্ত সাধনা”। বাংলা ভাষায় রামায়ণ মহাভারতে অনুবাদের কাজে অনুদান তথা রাজকীয় সাহায্যের প্রথম কৃতিত্বও মুসলমান বাদশাদের। ইংরেজদের তরফে জেমস মিল বা হেনরি ইলিয়ট প্রচারিত ইতিহাসের সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র মিল নেই। যদিও ভারতে ছাত্ররা শুধু আজ নয়, সমগ্র কংগ্রেস শাসন কালে রবীন্দ্রনাথ ক্ষিতিমোহন নয়, মিল-ইলিয়টের ইতিহাসই মুখস্থ করে এসেছে।
     
    সেখানে তারা শুনেছে, মুসলমান রাজা কত মন্দির ধ্বংস করেছে। মুসলমান রাজারাও যে অসংখ্য মন্দির স্থাপনের জন্য জমি দান করেছে, আর্থিক সাহায্য দিয়েছে, মন্দিরের জমিকে করমুক্ত রেখেছে—সেই সব ঘটনা খুব সতর্ক বাছাইয়ের মাধ্যমে উহ্য রাখা হয়েছে। এমনকি অওরঙজেবও যে মন্দিরের জন্য জমি অর্থ দান করেছেন, সেই কাহিনিও ছাত্রদের কাছে কখনও বলা হয়নি। হিন্দু ধর্মের ঠিকাদাররা যে জেনেশুনেই এই সব মিথ্যাকে লালন করেছে তাতে বোঝা যায়, তারা নিজেরা শুধু জ্ঞানের দিক থেকে অজ্ঞ তাই নয়, নৈতিক দিক থেকেও অত্যন্ত নিম্নগামী।
       
    || ৬. ঘৃণা বিদ্বেষের উৎস ||
     
    এটা ঠিক যে তিলক বা গান্ধীর মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ ছিল না। গান্ধী সেটা নিজের প্রাণের বিনিময়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেলেন। বা আরএসএস সাভারকরের বন্দুক বা নাথুরামের বন্দুকবাজির হাত দিয়ে সেটা প্রমাণও করে গিয়েছে। দলিতদের প্রতিও তাঁদের ঘৃণার মনোভাব ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু চিন্তায় চেতনায় ব্রাহ্মণ্যবাদকে ধারণ ও লালন করার ফলে এবং তার বিরুদ্ধে সচেতনভাবে কোনো মতাদর্শিক প্রক্রিয়া অবলম্বন না করার কারণে তাঁরা খুব সহজেই এমন সব কাজ করে যেতে পেরেছেন যার সঙ্গে সঙ্ঘ পরিবারের উদ্দেশ্য বিধেয়র সাযুজ্য স্থাপিত হয়ে গেছে। তিলকের গণপতি উৎসব শিবাজি উৎসব করে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করার ইচ্ছা যে আসলে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতিকেই ভারতীয় জাতীয় চেতনা বলে চালানো, কিংবা গান্ধীর রামরাজ্য স্থাপন রামধুন পরিবেশন ও গোরক্ষার পক্ষে প্রায় আজীবন প্রচার যে আরএসএস-এর অ্যাজেন্ডাকেই এগিয়ে নিয়ে গেছে—এসব বুঝতে বুঝতে তাঁদের জীবন কাল শেষ হয়ে গেছে। শিবাজি প্রসঙ্গ এলেই যে অওরঙজেবের কথা উঠবে, রামকে আদর্শ বললেই যে শম্বুকের কথাটারও মোকাবিলা করতে হবে—এ যেন তাঁরা আর কখনই ধরতে পারলেন না। সেই কারণেই গান্ধীর প্রদত্ত হরিজন শব্দ তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের পছন্দ হয়নি। তারা বরং দলিত শব্দেই স্বচ্ছন্দ বোধ করেছে এবং তাদের প্রকৃত সামাজিক অবস্থানের দ্যোতক বলে অনুভব করেছে।
     
    তবে একথাও সত্য যে সঙ্ঘীদের কার্যকলাপ দেখে দেখে ১৯৪০-এর পরে গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন, গোরক্ষা আন্দোলন একটি আদ্যন্ত সাম্প্রদায়িক মুদ্দা এবং একে লালন করা আর মুসলিম খ্রিস্টান আদিবাসী দলিতদের সুলভ ও পুষ্টিকর খাদ্যাভ্যাসের বিরোধিতা একই ব্যাপার। তিনি ধীরে ধীরে এই কার্যক্রম থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন এবং অন্যদেরও সরে আসতে পরামর্শ দেন। কিন্তু তাঁর শিষ্যরা তা মানবে কেন? ফলে সংবিধান পরিষদের আলোচনা চলাকালীন নতুন সংবিধানে যাতে গরু হত্যা নিবারণের ধারা যুক্ত হয় তার জন্য স্বাধীন ভারতের প্রথম (ভাবী) রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ অতি মাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন এবং কংগ্রেস কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে তাদের সংবিধান পরিষদের উদ্দেশে চিঠি লিখতে প্ররোচিত করেন। অর্থাৎ, গান্ধীর দীর্ঘ দিনের মতাদর্শগত প্রচারের ফলেই যে এরকম কাণ্ড ঘটতে পারল এবং অবশেষে সংবিধানের নির্দেশাত্মক ৪৮ নং ধারায় গোহত্যা নিবারণ যুক্ত হল, একথা আজকের দিনে অস্বীকার করা যায় না। অহিন্দু যে কেউ গোমাংস ভক্ষণ করলে যে তাকে সহজেই সংবিধান বিরোধী বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়, এই ভাবেই তার সূচনা হয়েছিল।
     
    একই প্রক্রিয়ায় জন্ম হয় এক দ্বিচারিতার।
     
    মহাভারতে প্রক্ষিপ্ত ভগবদ্গীতাকে গান্ধী মনে করতেন অহিংসার আদর্শ শিক্ষার এক পরম আধ্যাত্মিক পবিত্র গ্রন্থ। কী করে করতেন তা আমরা ভেবেই পাই না। দুই কৌরব গোষ্ঠীর (যুধিষ্ঠিররাও আসলে দুর্যোধনদের মতোই কুরুবংশ জাত) জ্ঞাতিকুটুম্বদের মধ্যে রাজ্যপাট নিয়ে এক ভয়ানক সশস্ত্র যুদ্ধের প্রেরণা প্রদানই গীতার মূল বক্তব্য। তাতে অহিংসা কোথায় আছে? যারা যুদ্ধে মরবে, তারা আসলে শ্রীকৃষ্ণের লীলায় আগেই মরে আছে, আত্মা জন্মায়ও না মরেও না, দেহটাই শুধু বদলায়—এর মধ্যেও অহিংসার কোনো বাণী নেই। নেই বলেই আবার সেই গীতার মধ্যেই ভারতে সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসীরা পেয়েছিলেন এক ন্যায়যুদ্ধের অনুপ্রেরণা। শত্রুকে বধ করার আধ্যাত্মিক সায়! তাঁরাও যে এর মধ্যে ন্যায়যুদ্ধ কোথায় দেখতে পেলেন, ভীষ্মবধ, কর্ণবধ, দ্রোণবধ, শল্যনিধন, দুর্যোধনবধ—ইত্যাকার সব কিছুর উপাখ্যানের মধ্যেই স্বয়ং ভগবানের অবতারের পরামর্শক্রমে ছলনা, কপটতা, প্রচলিত ক্ষাত্রধর্ম থেকে বিচ্যুতি তাঁরা অগ্রাহ্য করলেন কিসের ভিত্তিতে—আমাদের কাছে একেবারেই বোধগম্য নয়।
     
    আমাদের জাতীয় জীবনে যেহেতু গান্ধী এবং সেই সমস্ত বিপ্লবীদের আজ অবধি প্রায় সমান কদর, আমরা অনায়াসে এই দুই পরস্পর বিরুদ্ধ পাঠ আত্মসাৎ করে বসে আছি। এর ফলে কোনো পারস্পরিক অসম্ভাব্য থিসিসকেই এক সঙ্গে মেনে নিতে আমাদের অসুবিধা হয় না। হাতে সেল ফোন নিয়ে তিরুপতি মন্দিরে গিয়ে মানত করা চুল কেটে দান করে আসতে এবং তার ছবি হোয়াটসঅ্যাপ করে আত্মীয়বন্ধুদের জানাতে আমাদের বিবেকে বা চৈতন্যে সামান্য আঁচড়ও পড়ে না।
     
    এটা আরও শক্তি সঞ্চয় করেছে হিন্দুদের অতীত অর্থাৎ সনাতন তথা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একটা বিশেষত্ব থেকে। ধর্মীয় অর্থে বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্ট এবং ইসলাম ধর্মে যে নৈতিকতার—অত্যন্ত সংকীর্ণ পরিসরে হলেও—একটা দৃঢ় ভিত্তি আছে, বুদ্ধ, মহাবীর, যিশু (তিনটিই কাল্পনিক চরিত্র হলেও) এবং মহম্মদের জীবন সংগ্রামের মধ্যে সমসাময়িক কালের শিষ্যদের জন্য এক ধরনের নৈতিক আবেদন আছে। কিন্তু হিন্দু ঐতিহ্যে সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। এতে যাদেরকে মডেল চরিত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে—রাম, কৃষ্ণ, যুধিষ্ঠির, ভীষ্ম, প্রমুখ, এবং বাস্তবের শঙ্করাচার্য, তারা সকলেই এমনকি তাদের সমসময়েও, তাদের নিজেদেরই তৈরি মাপকাঠিতেও, ভিরু, কাপুরুষ, কপট, কৌশলী, জাতিবাদী, ইত্যাদি স্বরূপে চিত্রিত হয়েছে। ফলে তাদের থেকে পরবর্তী প্রজন্মে আর কোনো রকম নৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চারিত হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আর যে জাতিবাদী বৈষম্যের প্রকরণ হিন্দু ধর্মের একেবারে অন্তস্থিত বৈশিষ্ট্য হিসাবে গড়ে উঠেছে, তাও যে প্রকৃত ধর্মের চোখে একটা অনৈতিক ব্যবস্থা, তাও নিশ্চয়ই বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখে না।
     
    যে ভালোমন্দের বিচার নৈতিক মানদণ্ডের প্রধান সূচক, গীতায় বা মনুতে (উপরে উদ্ধৃত বাণী অনুযায়ী) তাকেই সম্পূর্ণ বর্জন করে চলতে উপদেশ দিয়েছে। যা সরাসরি নীতিবোধকে অস্বীকার করারই সামিল। 
     
    আর্থার ম্যাকডোনেল উনিশ শতকের শেষ দিকে সুবিশাল সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস রচনা করতে গিয়ে এটা খুব সুনির্দিষ্টভাবে লক্ষ করেছিলেন: “Collected in the ethico-didactic works which have been described in this chapter, and scattered throughout the rest of the literature, the notions held by the Brahmans in the sphere of moral philosophy have never received a methodical treatment, as in the Pali literature of Buddhism. In the orthodox systems of Hindu philosophy, to which we now turn, they find no place.” [Macdonnel 1900, 384]
     
    ১৯২২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ম সম্বন্ধীয় বিষয়ে আমন্ত্রিত ভাষণ দিতে এসে তিনি আবারও উল্লেখ করেন যে “morality does not come within the range of the six orthodox systems of Hindu philosophy” এবং শ্রোতাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে “the sphere of ethics had been neglected by Brahman thought, which was mainly directed to ritual and theosophical speculation.” [Macdonnel 1978, 70 and 75]     
     
    কোনো ভারতীয় বিদ্বান এই কথা স্বীকার করার সাহস দেখাতে পেরেছেন বলে আমার চোখে এপর্যন্ত পড়েনি। অন্য দিকে, এই অভাব কোনো ভারতীয় মনীষী, যিনি ধর্মীয় অবস্থান থেকে হিন্দুদের মধ্যে গিয়ে তাদের চেতনায় আলোড়ন তুলতে চেয়েছেন, অনুভবই করতে পারেননি, বুঝতে পারা তো দূরের কথা। ফলে হিন্দু ধর্মের আওতায় থেকে কারও পক্ষেই চরিত্রে আচরণে নৈতিক ভিত্তি অর্জন করা সম্ভব নয়। যাঁরা কম বা বেশি নৈতিক মূল্যবোধে বলীয়ান হয়ে সমাজের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছেন, তাঁরা সেই নৈতিকতা সংগ্রহ করেছেন অন্য উৎস থেকে—আধুনিক কালের গণতান্ত্রিক মানবতাবাদী জীবনাদর্শ থেকে। হিন্দুধর্ম থেকে নয়।
     
    এই কারণেই আজ যখন সঙ্ঘ পরিবারের নেতৃত্বে হিন্দুত্ববাদ এক অত্যন্ত আগ্রাসী ভূমিকা অবলম্বন করেছে, তার পক্ষে যে কোনো অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে কোনো সামান্যও বিবেক দংশন হয় না। এর ফল স্বরূপই তাদের কেউ দেব মন্দিরে বসে একজন আট বছরের মুসলিম শিশু কন্যাকে দিনের পর দিন ধর্ষণ করে যেতে পারে, সেই ধর্ষকদের পুলিশ বাধ্য হয়ে গ্রেপ্তার করলে তাদেরই অন্য কেউ সেই অপরাধীদের বীরের সংবর্ধনা দিতে দ্বিধা করে না; সেই তারাই যাবজ্জীবন সাজা প্রাপ্ত নৃশংস ধর্ষকদের জেল থেকে মুক্ত করে ফেলতে এতটুকু অস্বস্তি অনুভব করে না; ইত্যাদি। আবার তাদের পক্ষে স্টান স্বামীর মতো একজন বৃদ্ধ পার্কিনসন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিকে মিথ্যা সাজানো মামলায় গ্রেপ্তার করে জেলে আটকে রাখার সময় জল পানের ছোট একটা নল দিতে অস্বীকার করতে সঙ্কোচ বোধ হয় না—পুলিশ, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, কোনো স্তরেই। তাদের পক্ষেই সম্ভব হয় বিনা চিকিৎসায় এরকম একজন বন্দিকে মেরে ফেলার আয়োজনকে “সুচিকিৎসা” বলে চালানোতে এবং সংশ্লিষ্ট আদালতেরও মনে হয় না এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক আধিকারিককে প্রশ্ন করা দরকার। এই সর্বব্যাপক নৈতিকতার অভাবকে বুঝতে হলে ম্যাকডোনেলের পথনির্দেশ ধরে সেই হিন্দু শাস্ত্রসমূহে এবং তার দীর্ঘকালীন প্রভাবের অন্ধকার গুহা অবধিই যেতে হবে।
     
    এক কথায় বলতে গেলে, আমরা এই মুহূর্তে রাজনীতির কন্দরে যে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনির কথা আলোচনা করে থাকি, তারও জমি তৈরি করে দিচ্ছে হিন্দু ধর্মের এই সার্বিক অনৈতিকতার আভরণ।   

    || ৭. হিন্দুত্বের ভবিষ্যৎ ||
     
    এই কথাগুলি যদি আমরা সঠিক ভাবে বুঝতে পারি, অন্তর থেকে মেনে নিতে পারি, তাহলেই একমাত্র আগামী দিনে আমাদের দায়িত্ব আমরা নির্ধারণ করতে পারব। এক দিকে যুক্তি তর্ক করে, ইতিহাস আলোচনা করে, বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে, এর মতাদর্শগত অবস্থানকে দুর্বল ও পরাস্ত করতে হবে। অপর দিকে সত্যের প্রতি আকর্ষণ জাগিয়ে তুলতে হবে, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ইতিহাস পাঠ ও অনুশীলনের মানসিকতা তৈরি করে দিতে হবে। ধর্ম চর্চার ব্যক্তিগত অধিকারকে আমরা কখনই অস্বীকার করব না। পাশাপাশি আধুনিক সভ্য জীবনযাত্রার পরিপূরক নৈতিক আচরণ আমাদের আয়ত্ত করতে হবে। তার ভিত্তিতেই ধর্মকে সমাজ জীবনে তাকে টেনে এনে এই দুর্বিষহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে এবং চালিয়ে যেতে আমরা দেব না—এই হওয়া উচিত আজকের দিনের শুভবুদ্ধি সম্পন্ন যুক্তিবাদী গণতান্ত্রিক চেতনাপৃক্ত মানুষের শপথ।

    গ্রন্থসূত্র

    বাংলা
     
    শ্রীমদ্ভগবত গীতা, তৃতীয় অধ্যায়।
     
    অক্ষয়কুমার দত্ত (১৯৮৭), ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, ১ম খণ্ড; করুণা প্রকাশনী, কলকাতা।
     
    অক্ষয়কুমার দত্ত (১৯৯০), ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায়, ২য় খণ্ড; করুণা প্রকাশনী, কলকাতা।
     
    স্বামী বিবেকানন্দ (১৯৮৯), “স্বামী-শিষ্য-সংবাদ”, স্বামীজীর বাণী ও রচনা, ৯ম খণ্ড; উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা।
     
    মনুসংহিতা, দশম অধ্যায়।
     
    অশোক মুখোপাধ্যায় (২০২০), মন্দির মসজিদ বিসম্বাদ: প্রত্নতত্ত্ব ইতিহাস বনাম হিন্দুত্ববাদী মিথ্যাচার; বহুবচন প্রকাশনী, কলকাতা।
     
    ইংরাজি
     
    Richard Eaton (2004), Temple Desecration and Muslim States in Mediaval India; Hope India Publications, Gurgaon.
     
    J. S. Grewal (1970), Muslim Rule in India: The Assessment of British Historians; Oxford University Press, Kolkata.
     
    H. S. Hodivala (2018), Studies in Indo-Muslim History, Vols. I-II; Manohar Publishers, New Delhi.
     
    D. N. Jha (2018), Against the Grain; Manohar Publishers, New Delhi.
     
    Stephen Knapp (n. d.), “About the name Hindu”; Available on-line; visit: https://www.stephen-knapp.com/about_the_name_Hindu.htm
     
    Arthur Macdonnel (1900), A History of Sanskrit Literature; D. Appleton & Co., New York.
     
    Arthur Macdonnel (1978), Lectures on Comparative Religion; Bharatiya Publishing House, Varanasi.
     
    B. N. Pandey (1984), Islam and Indian Culture; Khudabox Memorial Trust, Patna.
     
    Will Sweetman (2003), Mapping Hinduism: Hinduism and the Study of Indian Religions 1600-1776; Franckesche Stiftungen, Halle.
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন