• বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • আমার নবারুণ সহজিয়া

    সোনালী সেনগুপ্ত লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | ১৩৫ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • আমি মোটেই এইসব লিখতে চাইনি। একটাই কথা আমার বলার ছিল, লেখার অনুরোধ পেয়ে প্রথম যে কথাটা লিখেছিলাম, সেটা হল ‘আমি নবারুণ সেভাবে পড়িনি।’

    এখন ব্যাপার হল ঐ যে সেভাবে পড়িনি কথাটাকে অনুরোধকর্তা পাত্তা দিলেন না। 

    অথচ এই ‘সেভাবে’ কথাটাই সব ও সত্য। আমি নবারুণের লেখার অতি অদীক্ষিত পাঠক। যেভাবে পড়লে নবারুণ যা লিখতে চেয়েছিলেন ঠিক সেইটা নিয়েই কথা বলা যায়, মতাদর্শ-সাহিত্যের যে দুর্লভ ট্রানজিশন সত্যিই তাঁর লেখায় সফল ভাবে এসেছে, তা নিয়ে সেমিনাল আলোচনা করা যায়; সেভাবে আমি নবারুণকে পড়িনি। তথ্য, কল্পনা, পরাবাস্তবের যে চতুর মিশেল তিনি তৈরি করেছেন তার মধ্যে যে রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে তা অনুধাবন করার মতো ব্যাকগ্রাউন্ড পড়াশুনো-ও আমার নেই। প্রথম পাঠে নবারুণ আমাকে তাঁর গদ্য পড়তে বাধ্য করেছেন তাঁর গদ্যের শাণিত স্মার্টনেস দিয়ে। বেশির ভাগ সময়েই নবারুণের গদ্যের কথকতা অসম্ভব সুচিন্তিত, যত্ন করে গড়া, পলিশড, বিভিন্ন সামাজিক রাজনৈতিক ঘটনার চিত্রকল্প তৈরি করা কিংবা একটি আখ্যানকে অন্য একটি আখ্যানে জুড়ে দেওয়া, খুবই আকর্ষণীয়, এক কথায় দারুণ স্ট্রীট স্মার্ট লেগেছে। (এই প্রতিক্রিয়া থেকে আমি কাঙাল মালসাট বা পুরো ফ্যাতাড়ু সিরিজকে বাদ রাখছি) ঠিক কি লিখতে চেয়েছিলেন নবারুণ তা তিনি বারংবার বিভিন্ন লেখায় ডিফাইন করেছেন, পাঠকের জন্য স্পেস কম রেখে, নিজেই তিনি বলেছেন, তাঁর গদ্যের উৎস শুধুই আনন্দ দেওয়া বা নেওয়া নয়। "আরও গভীরতম এক অ্যালকেমি যেখানে বিস্ফোরণের ঝুঁকি" রয়েছে, "রাস্তার কুকুরদের শীতকালের বরাদ্দ রোদ কেড়ে নেবে হাইরাইজ আর নিরাপদ সাহিত্যের ঢ্যামনামি করব"…"এটা হয় না"। এইখানে এসে নবারুণের গদ্যসাহিত্যের সঙ্গে পাঠক হিসাবে আমার রাস্তা ভাগ হয়ে যায়। যে সাহিত্য পূর্বনির্দিষ্ট পরিণতি নিয়ে গড়ে ওঠে তার সঙ্গে আমি-পাঠকের ঝগড়া আছে। মানে, ঠিক আছে, তুখোড় সব হিউমার, ঝকঝকে ভাষা, প্রতীক এবং পরাবাস্তবের সঙ্গে তথ্যের চমৎকার মিশেল, একটা ধাঁধা সমাধানের চ্যালেঞ্জ, সুচতুর গঠনে পাঠককে একটা ল্যাবিরিন্থ-এর মধ্যে দিয়ে হাঁটানোর তাগিদ নিজের টার্গেটে পৌঁছে দেওয়ার আগে, কিন্তু টার্গেটটা সুনিশ্চিত। একটা বিস্ফোরণ শেষ অব্দি ঘটবে। এই বিস্ফোরণটা নবারুণ ঘটান, সব লেখাতেই, কিন্তু বিস্ফোরণগুলোকে না আমি বিশ্বাস করতে পারি, না গোটা প্রসেসে নিজের জায়গাটা খুঁজে পাই। যে লোকগুলোকে তিনি ব্যবহার করেন তাদেরও আমি চিনতে পারি না শেষ পর্যন্ত। এই প্রি-প্ল্যানড লেখায় আমি, পাঠক হিসেবে যে সহজিয়াত্ব খুঁজি তা পাইনা। গদ্যের মধ্যে যে আত্মমগ্নতাও চাই, যে সততাও চাই, যাতে চরিত্রেরা নিজেরা গড়ে ওঠে, সেটা গাদ্যিক নবারুণ আমাকে ভীষণ অল্প অফার করেন। বেসিক্যালি সেই এক্স ফ্যাক্টরটা খুঁজে পাই না আমি প্রথম পাঠে। সেটার সাথে আমার মেয়ে হওয়ার কতোটা যোগাযোগ আছে বলতে পারি না। তাঁর গদ্যসাহিত্যে চরিত্র এবং পাঠকের উপর একটা প্যারালাল কন্ট্রোল এক্সারসাইজ করেন নবারুণ, করে মজা পান। আমি সেটা উপভোগ করিনি। 

    এই কন্ট্রোল সব চেয়ে কম রয়েছে হয়তো, আমার পড়া লেখাগুলির মধ্যে, হারবার্টে। এই একটি লেখায় নবারুণ তাঁর মায়াকে দৃষ্টিগোচর রেখেছেন। তাই আবার দ্বিতীয় পাঠে যখন হারবার্ট পড়ি, চোখে পড়ে প্রতি পরিচ্ছেদের মুখবন্ধ হিসেবে কালানুক্রমিক কবিতার ব্যবহার। চোখে পড়ে ‘হারবার্ট দেখতে পেত বিকেল ফুরিয়ে গেলে যখন ছায়া ছায়া হতে থাকে, একটা দুটো করে আলো জ্বলে, উনুনের ধোঁয়া নদীর মতো ভেসে যায়,তারও একটু পরে ঐ ছাদটাকে আর ফাঁকা বলে মনে হয় না’ বা শ্যাওলা পড়া ‘ব’ অক্ষরটা মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে। ‘কিছু যেন একটা বলার ছিল আর এই বাড়িতে ঐ চিলছাদটা নেই’ অথবা ‘দোহারা চেহারার একটি ছেলে এসেছিল একদিন। তার মা-র জন্যে। সদ্য বোধহয় কলেজে ঢুকেছে। যাওয়ার সময় বলে গেল-যা কিছু আপনি বলছেন সবই ভেগ। একটা কংক্রিট কথাও বলতে পারেননি। আসলে আমার আসাটাই উচিত হয়নি। ছেলেটি চলে যাবার পরে হারবার্ট কিছুক্ষণ চুপ করে করেছিল। 

    তারপর বলেছিল - আসাটাই উচিত হয়নি। বাপের বানচোৎ ছেলে। আমি আসতে বলেছিলুম?’ 

    এই যে অন্যতর দৃষ্টির ঝলক, এই বোধটা হারবার্টের কাছে কতটা প্রত্যাশিত? নবারুণ হারবার্টকে ঠেলে দ্যান তাঁর নিজস্ব বোধের ডুবজলে, সেখানে মাঝে মাঝেই সে ছটফট করে। অচেনা সেই লেয়ারগুলো, যেগুলো আমরা জানিনা ঠিক কোথায়, কিন্তু হারবার্টের সেগুলো আছে, আসলে প্রতি মানুষেরই আছে, শুধু সেগুলোকে ভাষায় সংহত করতে একজন কবির দরকার হয়। একেকটা ছোট্ট ঘুলঘুলি যেগুলো দিয়ে হঠাৎ আলো আসে। এসেই নিভে যায়। এই ধূসর স্পেসগুলো দেওয়ামাত্র একটা দ্বিতীয় লেয়ার তৈরি হয়, ওতপ্রোত একটা কবিতার স্রোত, এই ভাষা হারবার্টের নয়, লেখকের। এই ধোঁয়ার মধ্যে পাঠককে দাঁড়াবার এবং গল্পকে বদলে নেওয়ার সুযোগ ব্রেডক্রাম্বসের মতো ছেড়ে ছেড়ে যেতে থাকেন লেখক, আমার মতো কবিতাভিক্ষুর জন্য। যে আমি বিশ্বাস করিনা পৃথিবীতে প্রতি জীবনের মধ্যে স্ফুলিঙ্গ থাকে এবং একসময় ফেটে পড়বেই তারা, পৃথিবীকে বদলে দেবে, বদলের জন্য বিস্ফোরণ অনিবার্য, আমার মতো যারা জ্যাঠাইমার গান শুনতে পায় - সখি, কেমনে যমুনাজলে যাই, আর আর পাগল জ্যাঠামশাইয়ের চোখের মমতা যাদের কাছে খুব দামী মনে হয়, মায়ার টান চিলছাদ থেকে কাকের ডাক সবাইকে ছুঁয়ে যায়, সেইটুকু প্রতিবিপ্লবই যাদের কাছে যথেষ্ট, কারণ আমরা যারা জানি সকলের বিছানার নিচে বিনুর ভূত বিস্ফোরক হয়ে লুকিয়ে থাকে না, সেই আমাকে গল্পটা বদলে নেবার স্পেস দ্যান নবারুণ শেষপর্যন্ত। তিনি নিজে এই সুতোগুলো লুজ এন্ডের মতো ফেলে যান। আমি তা তুলে নিই। আমার পঠনের জায়গাটুকু খুঁজি। তো একে কেউ মেয়েলি পঠন বলতে পারেন, আমি আপত্তি করবো না। নবারুণের গদ্যের আখ্যানের সাথে আমার সখ্যতা হয় না, কিন্তু লেখক গদ্যের মুঠি আলগা করা মাত্র আমি টুকরো কবিতা খুঁজে পেতে থাকি, সহজিয়া নবারুণকে খুঁজে পেতে থাকি। সেই চোখে খুব মমতা। নবারুণ বলেন ‘আমার মনে হয় এদের কথা যদি কলমে তুলে না ধরি তা হলে জীবনটা একটা বেইমানের জীবন হয়ে যাবে’। কিন্তু ‘এদের’ কথা ঠিক কতটা লেখেন তিনি আর কতটা নিজের কথা, তা নিয়ে ধন্দ আমার থেকে যায়। যাই হোক, নবারুণ কি লিখবেন তা বলে দেওয়ার আমি কে? কিন্তু তিনি যে ঐ সুতোগুলো তুলে নিলেন না তার দুঃখ আমার যায় না। যে মুহূর্তগুলো জীবন হয়ে উঠতে পারত সেগুলো ছেড়ে অবলীলাক্রমে কোনো এক কমিটেড পরিণতি খুঁজতে যান তিনি, যা পরাবাস্তব হয়, কিন্তু জীবন হয় না।  

    আমি আমার নবারুণ পাঠের চিলছাদ খুঁজে নিয়েছি কবিতায়। হারবার্টের একটা চিলছাদ ছিল, সেই চিলছাদে সে হাতের শিরা কাটে না, কাউকে দোবেড়ের চ্যাং দেখাতে চায় না, ফেটে পড়ে না, বোকাসোকা একটা ছিটিয়াল মানুষ হয়ে সে বেঁচে থাকে। আমি তুমি নবারুণ প্রতিমা কিংবা সোমনাথ সবারই একটা চিলছাদ থাকে। মাঝে মাঝে সেই চিলছাদ আমাদের বাঁচায়, যখন আমরা চিত হয়ে শুয়ে একটা কেটে যাওয়া ঘুড়ির মৃত্যুদৃশ্য দেখি, সেই চিলছাদটা আমাদের আড়াল দেয় বিদ্যুৎগ্রস্ত তারের পাশে লুটিয়ে পড়া মাতৃদেহের বাস্তব থেকে, রেহাই দেয় তুমুল শিলাবৃষ্টির থেকে। ‘প্রত্যেকবার ভোটের দিন ও যখন কোথাও না গিয়ে চিলছাদে বসে থেকেছে। সেটা ওর কাছে বিনুর প্রতি ট্রিবিউট বলে মনে হয়েছে।’ ট্রিবিউট? এটি নবারুণেরই বোধ, হারবার্টের নয়, যা হারবার্টের মধ্যে ভুল করে ঢুকে পড়ে। গদ্যের সচেতন নির্মাণের মধ্যে এইরকম ছোট ছোট স্পেস উঁকি মারে, কবিতার চারা নিয়ে। আমার নবারুণ পড়া, অতঃপর, বদলে যায়। এবং বদলে গেলে সেইসব লুকোনো অবিশ্বাস্য পদ্যপংক্তি চমকে ওঠে:

    ‘চলে যাচ্ছি ট্রামলাইন
    চলে যাচ্ছি ফোয়ারা
    চলে যাচ্ছি জেব্রা ক্রসিং, বিকল হয়ে যাওয়া ট্রাফিকের আলো,
    বর্শা দিয়ে বানানো রেলিং
    চলে যাচ্ছি আকাশে কাটাকুটি খেলা কেবলের তার
    রোলের দোকানে, তাওয়ার এরিনাতে খণ্ড খণ্ড ক্লাউন মাংসের ওলট-পালট খাওয়া,
    চলে যাচ্ছি হতভম্ব জলের কল, ঝাঁঝরি, পিঁপড়েতে খেয়ে নেওয়া গাছের গুঁড়ি, দাঁত উপড়ে নেবার চেয়ার,
    চলে যাচ্ছি, চলে চলে যাচ্ছি দলে দলে’

    [লুব্ধক, নবারুণ ভট্টাচার্য]

     

    ‘জল কথা বলে। জল কথা না বললে গাছ, প্রাণী, মানুষ, ওরা কেউ থাকতে পারত না। 
    .....
    তুমি যখন জলকে স্পর্শ করো, তখন আরো কত কী যে তোমাদের স্পর্শ করে তোমরা ভাবতে পারবে না। 
    তোমরা কি মনে করো জল মৃত? তার প্রাণ নেই?
    .....
    জল বিষমুক্ত হতে চায়। নিজের চেষ্টাতেই সে বিষমুক্ত হয়
    মানুষ .....জলকে আহত করেছে, কিন্তু জল
    সবসময় 
    মানুষকে ক্ষমা করে এসেছে, জানো?’

    [খেলনানগর, নবারুণ ভট্টাচার্য]

     

    ‘কেনাকাটা। আমি শুধু ভাবি 
    মানুষ কত সাজে সাজতি চায়। এই দেকলাম মশানপীর মা কালী তো ঐ দ্যাখো 
    টঙ্গর বাশুলী মহাকাল, গোলকনাথ, রতিপতি কামদেব, 
    পঞ্চ বেতাল, ভুজঙ্গ জননী, পতরচণ্ডী, চামুণ্ডা, ভূতভবেশ্বরী সব ঘোরাফেরা করতিছেন
    উঃ ডাইনে ধবলদেবী তো বাঁয়ে আসে কালভৈরবী, 
    ওলাবিবি, মড়িবিবি,  ঝেঁটুনেবিবি, আজগৈবিবি, বাহড়বিবি, আসাবিবি তারপর তোমার গে 
    মানিকপীর, যাঁতাল, মাকাল, বিবিমা, খুকিমা সব দরশন হয়ে গেল -  
    এইবার ঘরে চলো মিতিলবাবু।’

    [ভোগী, নবারুণ ভট্টাচার্য]

    কবি নবারুণকে চেনা বেশি সোজা। তাঁর কাব্যের সঙ্গে আমার সখ্যতা হয়। 

    ‘খড়-কাঠের বাড়ি
    বাড়িটাতে ছিল
    একটাই ঘর
    রামধনু উঠত আকাশে
    যেন ভাঙা চুড়ি
    ও হ্যাঁ, ঐ ঘরটাতে থাকত
    একটা বুড়ো আর তার বউ
    একটা বুড়ি

    একদিন খড়-কাঠের বাড়ির দরজাটা
    উড়ে চলে গেল
    তারপর খড়-কাঠের ছাদটাও

    রাস্তা আর আকাশ
    যখন দখল করেই নিয়েছে
    কি আর করা
    সেই বুড়ো আর বুড়িটাও
    উড়তে উড়তে আকাশে চলে গেল।’

    [খড়-কাঠের বাড়ি]

     

    ‘আমি একটা লোক
    আমি একলা লোক
    আমার একটা নামও আছে

    কেউ কেউ নামটাও জানে
    আর সেইখানেই যত মুশকিল।’

    [আমি - দুই]

    কিম্বা

    ‘বুর্জোয়া বন্দরে
    সেধে ডিউটি-ফ্রি অবসাদ ক্রয় করি
    বিক্রি করি মৃত কবিতার মাংস
    ব্রয়লার কাহিনী বা কবন্ধ-আখ্যান
    লজ্জা বলে কিছু নেই
    গণিকানগরে’

    [আমি - এক]

    তো এই নবারুণকেই আমি পড়বো এবং মনে রাখবো, গদ্যে খুঁজে খুঁজে পড়বো এবং পদ্যে গদ্য এড়িয়ে পড়বো, কারণ নবারুণের বেশিরভাগ কবিতাই অকৃত্রিম। এবং দুঃখও কিছুটা থেকেই যাবে যে অদীক্ষিত ও অবিশ্বাসী পাঠক হওয়ায়, হয়তো আবেগ-জোবড়ানো পাঠক হওয়ায়, তাঁর গদ্যের প্রকৃত শক্তি আমি বুঝতে পারলাম না, ওদিকে গদ্যের শক্তিকে অনেকটা উপরে ঠাঁই দিতে গিয়ে কবি নবারুণ আমাকে তাঁর সবটা দিলেন না। আধ-লাগা শঙ্খ। কেন যে আমার মনে হয় ভোগী কিংবা হারবার্ট কিংবা লুব্ধক আসলেই একেকটা কবিতা হতেই পারত! আসলে কোথাও একটা প্রবল ফারাক ….. যে পিতা সন্তানের মৃতদেহ শনাক্ত করতে ভয় পায় নবারুণ তাকে ঘৃণা করেন। আমার যে ঘৃণা হয় না, কষ্ট হয়। ঘৃণা করতেও তো কেউ কেউ কষ্ট পায়। আমাকেও কবি নবারুণ পছন্দ করেন না - আর আমার খুঁজে নেওয়া কবিকেও তিনি অস্বীকারই করেন -

    ‘তোমাকে বোকা বললে
    পুরোটা বলা হল না
    ওয়েস্টপেপার বাস্কেটরাও
    চিৎকার করে বলছে - 
    তোমার কবিতা তারা নিতে চায় না’

    [ওহে কবি]

    কিন্তু তার পরেও সযত্নে সে সব কাগজ নিজেই ভরান  তিনি, যা বাজে কাগজের ঝুড়িতে যাওয়ার কথা ছিল। সে স্ববিরোধিতা থাকায় নবারুণকে একটু বেশি মানুষ মনে হয় -

    "কেন চেয়ে আছ গো মা
    চিত হয়ে শুয়ে টেবিলের ওপরে
    মাথায় রক্তমাখা, ব্যান্ডেজ না পতাকা
    কিছু কি দেখছ তুমি? ...... বলতে চাইছ কোনো কথা?
    না কি শব্দহীন মর্গে দৃশ্যমান ঠান্ডা নীরবতা।
    না-শোনাই ভালো ঐ ঘাতকের নির্লজ্জ দামামা
    ... ... 
    কৃষ্ণকের হলুদ, আকাশে বাটনার ছোপ,
    শিলাবর্ষণের ডগর
    সব তোমার
    শিশিরফোঁটার ছোটো-ছোটো হাত পা,
    চমকানো গঙ্গাফড়িং
    মেঘলোকে উড়ন্ত বিদ্যুৎ
    সব তোমার
    সমুদ্র-থেকে-উঠে-আসা শাঁখা,
    দুধ ও কাজলের দেয়ালা
    গঙ্গাপুজোর মেলার আলো
    সব তোমার
    রাতের উঠোনে উলু, হ্যাজাকে বিবাহপালা,
    মাদুরের দেহস্পর্শ
    সব তোমার
    সব তোমার সব তোমার সব তোমার সব তোমার"

    [অভাগীর স্বর্গ]

    এমনভাবে দুহাতের অঞ্জলি ভরে দেবার ক্ষমতা যাঁর করায়ত্ত তিনি কেন মুঠি কৃপণ করে রাখলেন? আর এও মনে হয়, যে জন্য রাখলেন, তা কি সফল হয়েছে কোথাও? তিনি যাঁদের হয়ে সওয়াল করে গেলেন, অ্যাকাডেমিক আলোচনার বাইরে তাঁদের কোনো কাজে কি আসবে নবারুণের লেখা?  কোনো কবি বা কোনো কবিতা তো শেষ কথা বলে না! কোনো প্রতিক্রিয়াও কি আনে? শেষ অব্দি আকাশের বোমারু বিমানকে পরম বিশ্বাসে পাখির ঝাঁক ভেবে নেওয়া মানুষরাই তো আমরা।

    (এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত পাঠপ্রতিক্রিয়া, আলোচনা-সমালোচনা নয়।আগেই বলে নিয়েছি, উপযুক্ত বিশ্লেষণী লেখার মতো জ্ঞানগম্যি আমার নেই। এই বিদেশ বিঁভুইয়ে কবিতার পাতা স্ক্যানিয়ে দেবার জন্য সোমনাথকে ধন্যবাদ। আরেকটি কথা: আমি গদ্যের মধ্যে থেকে কিছু অংশ উদ্ধৃত করে সেগুলি কবিতার মতো সাজিয়েছি, এইটুকু বলার জন্য যে এগুলো যেন এক একটি স্বতন্ত্র কবিতা। আশা করি তাতে কোনো কপিরাইট ভায়োলেশন হয়না।)

  • বিভাগ : আলোচনা | ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ | ১৩৫ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সহমত | 69.160.210.3 (*) | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৮:৪৮80286
  • এই পাঠ স্বতন্ত্র, প্রতিক্রিয়াও। কবিতার সাথে আত্মিক সম্পর্ক না থাকলে এই ভাবে খুঁজে নেওয়া যায় না।
  • h | 213.132.214.88 (*) | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০৮:৩৬80287
  • এই লেখাটা একটা নির্মাণ প্রচেষ্টা বলে মনে হয়েছে। সোনালি যে কবিতা ভালোবাসে সেটা তো পরিষ্কার, একটা বৈজ্ঞানিক হয়ে সিরিয়াসলি কবিতা ভালোবাসা সোজা কথাও না, যে বিচিত্র সিলেবাস আর পেপারের চাপের মধ্যে দিয়ে একটা বৈজ্ঞানিক কে যেতে হয়/তৈরী হতে হয় কিন্তু এই লেখাটা হয় নি। হয়তো সোনালী মানুষটা রাজনইতিক ব্যাপারে আগ্রহী না, সেটা অবশ্যই ভ্যালিড পজিশন, কিন্তু লেখাটা হয়তো ঐ জন্যেই জমে নি।

    মানে নবারুণ থেকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখা আর সোনালী কে বিজ্ঞান থেকে আলাদা করে দেখা, বা সোমনাথ দাশগুপ্ত কে আর্কাইভের আইডিয়া থেকে আলাদা করে দেখা, দমুকে ভাগাড়পাড় থেকে আলাদা করে দেখা, আত্রেয়ী কে নকু অ্যাসোসিয়েশন ইত্যাদি থেকে আলাদা করে দেখা, আমাকে রোগা হিসেবে দেখা ;-) বিশেষতঃ 'সসীম লিখিত পরিসরে' প্রায় অসম্ভব। ইয়ার্কি মেরে বলছি, কিন্তু এগুলো বন্ধুত্ত্বপূর্ণ হলেও সিরিয়াস। ধর বইজয়ন্ত চক্র্বর্তী, আমাদের বয়স ধরো তখন শ দেড়েক, আমাকে সোমনাথ দাশ্গুপ্ত তার জন্মদিনে একটা ইভ্যালুয়েশন লিখতে বল্লো, আমি কি তার নেট লেখার পর্যায় টা বাদ্দিয়ে বলবো? ইশানের কোন ইভ্যালুয়েশন সম্ভব, গুরুচন্ডালি ছাড়া? ডিডি দা বলে যে কেস টা, এটা কি নব্বই দশকে সম্ভব ছিল? আমি একটা কল্পিত/প্রায় ডিসটোপিয়ান ইমর্টালিটি ধরে নিয়ে মজা করে বলছি, কিন্তু ব্যাপারটা সিরিয়াস।

    মানে রবীন্দ্রনাথ থেকে ইউরোপীয় বিশেষতঃ জার্মান রোমান্টিক লিরিক /বাড়ির পড়াশুনোর জগত/আন্তর্জাতিকতা/উপনিষদ/শানিতিনিকেতন/শিক্ষা/সভ্যতার সংকট লেখার নানা বিধ প্রিসিপিটেশন ইত্যাদি বিষয় বাদ দিলে হয়তো ১৯০৫ এর স্বদেশ প্রেম পড়ে থাকে, সেটা নিয়ে লিগাসি নির্মাণ চলতে পারে, কিন্তু অনেকটাই বাদ যায়।

    রাজনইতিক ক্যাচাল , হার্ড অইডিয়োলোজিকাল পজিশনিং সোনালীর হয়তো খুব ই রিপালসিভ লাগে, তাই নবারুণের একটা মায়ার দিক আছে, নরম স্নেহের দিক আছে, সেটাকে আলাদা করতে চেয়েছে, মানছি, তার হয়তো একটা গুরুত্ত্ব আছে, কিন্তু উইদাউট হিজ কম্ব্যাট ফটিগ, হোয়াট ইজ হি? বিপ্লবীর জীবন এরকম ই হবে, জুলিয়াস ফুচিক বা চে যখন আদর করে বৌ কে মেয়েকে চিঠি পাঠান, তখন ও ফাঁসীর মঞ্চ আর বলিভিয়ার জংগল অপেক্ষা করে থাকে কি আর করা যাবে। এর তো কোন ডোমেস্টিকেশন সম্ভব না। সহজিয়া শব্ত টা খুব সুন্দর করে ব্যবহার করেছে, তবে সেটার তো অন্য কনোটেশন আছে, সেটা অবশ্য কিছুটা বোঝা যাছে, কিন্তু কি অর্থে ব্যবহার করেছে, সোনালী পরিষ্কার করলে ভালো হয়।

    এটা অয়্ডভাইস না, গায়ে পড়ে জ্ঞান ও না, খুব পার্সোনাল কোন অবসারভেশন ও না, একটা বড় বৈজ্ঞানিক লিখেছে, আমার মনে হচ্ছে তার বিষয়টা দেখার ধরণে গলতা আছে, আমার মনে হচ্চে হি ইজ স্ট্রীপ্ড অফ হিজ মোস্ট ইন্টারেস্টিং কোয়ালিটিজ।

    অবশ্য একটা কথা মেনে নিতে অসুবিধে নেই, কত রকম দিক নিয়ে একটা মানুষ তৈরী হয়, হয়তো সেটা ধরতে চেয়েছে। সেটা খুব ই মানবিক ইন্টেন্ট যদিও।
  • /\ | 69.160.210.3 (*) | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১০:০৭80288
  • আর আমার কাছে নবারুণারী করার অন্যতম প্রাপ্তি এই লেখাটা। একটা ছেলের কলমে নবারুণের লেখার এই দিকটাও পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল মনে হয়। এর আগে কারো লেখাতে পাইওনি। এইদিকটা'ও', কারণ কোনো একজন সম্পূর্ণ নবারুণের সমস্ত দিকগুলো তুলে ধরবেন বা ধরতে পারবেন, এমনটা আশা ছিলনা। কিন্তু খণ্ডচিত্রগুলো যতবেশি দিক, যতবেশি কোণ, যতবেশি রঙ ধরতে পারে ততই সামগ্রিক দেখা-তে সুবিধে হয়।
  • h | 213.132.214.86 (*) | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১০:২৯80289
  • এটা মানে খুব ই কন্ডিসেন্ডিং হয়ে গেল মাইরি সোমনাথ। এতে মানে নারীজাতি র কোন উপকার হল কিনা খুব ই সন্দেহের। মেয়েরা মায়ার দিকটা দেখবে, ছেলেরা বিপ্লব আর যৌবন ক্রোধ ইত্যাদি, এই ভাগ যদি করে থাকিশ, বাদ মে প্রচন্ড পছতায়েগা বলে দিলাম। এই সোনালী সেনগুপ্ত ই প্রচন্ড বকাবকি করে দেবে। গরীবের কথাই শুধু না, বুজ্জোয়ার কথাও মাঝে মাঝে ফলে থাকে ;-)

    এক দিক অন্য দিক নানা দিক সংক্রান্ত ওভার অল অবসারভেশন নিয়ে কিছু বলার নেই। নিজের দৃষ্টি ভঙ্গীর ব্যাপার। গদ্যকে পদ্য র মত করে পড়ার ব্যাপারটা বেশ ইন্টারেস্টিং।
  • /\ | 69.160.210.3 (*) | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ১১:১০80290
  • মেয়েরা মায়ার দিক শুধু দেখবে কেন? অপমানও দেখবে, সম্মানও দেখবে, বিপ্লবও দেখবে, ক্রোধও দেখবে, মানে, সবই দেখবে। কিন্তু কোনো ছেলের চোখে এই মায়ার দিকটা এখনো অবধি ধরা পড়েনি বলেই তো অবজারভেশন। শুধু মায়া বলে না, র‍্যাদার চিরন্তনত্বের উপাদান বলা বেটার। আরও অনেক কিছুই, যেগুলো শুধু ছেলে হয়ে জন্মানোর প্রিভিলেজ বা হ্যান্ডিক্যাপ-এর জন্যেই চট করে দেখা সম্ভব হয় না, সেগুলো সবই দেখার জন্যে অন্য দিকের থেকে একটা অঙ্গুলিনির্দেশ বা নজরটান প্রয়োজন থাকে। অন্যভাবে, অন্যদিকের পাঠাভ্যাসেও ফোকাস বা জেনেরাল রিপালসিভ/কমপালসিভ অবজারভেশনের সাথে একটা ডায়লগ তৈরির জায়গায় যাওয়া যায়।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত