এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • অবশিষ্ট বৃষ্টি 

    Swarup Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৮ জুলাই ২০২৬ | ১১২ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • বোলপুরের ওয়েদার যে আজ এতটা খারাপ হতে পারে ভোরবেলা মালদায় ট্রেন ধরার সময় সেটা বোঝেনি অতনু। একটা ঠান্ডা বাতাস বইছিল ঠিকই কিন্তু বৃষ্টির কোনো আভাস ছিল না। কলেজের তৃতীয় সেমিস্টারের ছাত্র অতনু। পড়াশুনায় মন্দ নয়, তবে খুব ভালোও নয়। বিজ্ঞানের সব সমীকরণ তার মাথায় ঢোকে না। মাধ্যমিকে ভালো ফল করায় মামার জোরাজুরিতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই সায়েন্স নেয় সে। উচ্চমাধ্যমিকটাও ভালোভাবেই উৎরে যায়। সমস্যা বাঁধলো কলেজে উঠে। এখন পড়াশুনায় তার মন একেবারেই বসতে চায় না। প্রথম সেমিস্টারে সাপ্লি পেয়ে মামার বাড়ি ছাড়লো বাপ-মা মরা অতনু। পড়াশুনা টেনেটুনে চালিয়ে গেলেও তার মাথায় এখন চেপে বসেছে লেখালিখির ভূত। আর সেই নেশাতেই সে মাঝেমধ্যে ছুটে আসে শান্তিনিকেতনে। সোনাঝুড়ির ইউক্যালিপটাস ঘেরা বনের একটা নিরিবিলি প্রান্তরে বসে সারাদিন সে লোকের আনাগোনা দেখে আর নিজের লেখার প্লট খুঁজে বেড়ায়। তবে এবার সে এসেছে অন্য এক কারণে। গতবার যখন সে এসেছিল তখন একটা বাঁধানো ডায়েরি তার বেশ পছন্দ হয়েছিল কিন্তু টাকার অভাবে কেনা হয়ে ওঠেনি। এই মাসের টিউশনের বেতনটা পেয়েই তাই সে ছুটে এসেছে। কিন্তু এখানে নেমে থেকেই সে দেখছে আকাশের মুখ ভার, তবে বৃষ্টি নামে নি। অবশেষে যখন সে হাটে পৌঁছালো ততক্ষনে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সব দোকানই প্রায় বন্ধের পথে। কয়েকটা দোকান শুধু তখনো ব্যবসা করে চলেছে। কিন্তু কোথাওই অতনু আগের দিনের দেখা সেই ডায়েরিটা দেখতে পেল না। বিষন্ন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে এমন সময় তার চোখ পড়লো হালকা সবুজ রঙের সালোয়ার পরা এক মেয়ের উপর। খুব সাধারণ সাজ। গায়ের রং শ্যামবর্ণ। কপালে ছোট্ট কালো টিপ আর খোলা চুলে বড্ড স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে মেয়েটিকে। কিন্তু অতনুর চোখ আটকে রয়েছে মেয়েটির হাতের ওপর। ছুটে এসে দাঁড়ালো মেয়েটির পাশে। সামান্য সৌজন্য বিনিময়টুকুও না করে মেয়েটিকে সরাসরিই সে জিজ্ঞাসা করলো, 'এই ডায়েরি আপনি পেলেন কোথায়?' মেয়েটি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর না দিয়ে সামনের দিকের একটি দোকান আঙুলের ইশারায় দেখিয়ে দিলো। অতনু আবারও ধন্যবাদ দিতে ভুলে গেল, ছুটে গেল ইশারায় দেখানো সেই দোকানটির দিকে। কিন্তু অতনুকে খালি হাতেই ফিরতে হলো। শুকনো মুখে অতনু কিছু একটা বিড়বিড় করতে করতে ফিরে যাচ্ছিল। মেয়েটি এতক্ষন অতনুর কান্ডকারখানা দেখছিল। হঠাৎই বলে উঠলো, 'আমার নাম নীরা।' অতনু বেশ চমকে উঠলো। যেন সে তাকে দেখেই নি। অতনুও নিজের নাম বলে এগোনোর চেষ্টা করতেই নীরা এগিয়ে এসে বললো, 'এত তাড়া কিসের ?' অতনু একটা বিষন্নতা মেশানো বিরক্তির সুর নিয়ে বললো,
    —'যে কাজে এসেছিলাম সেটাই যখন হলো না তখন আর দাঁড়িয়ে লাভ কী!'
    —কাজ মানে? ও.., সেই ডায়েরি কেনা! আজ হলো না অন্য কোনো দিন নিয়ে নেবেন।
    — রোজ রোজ আসার মতো সামর্থ্য নেই আমার। কাল টিউশনের টাকাটা পেয়ে শুধুমাত্র ডায়েরিটা কিনতেই এতদূর ছুটে এলাম। আমার কপালটাই খারাপ!
    — চা খাবেন?
    অতনু না করতে যাচ্ছিল দেখেই নীরা বললো, 'চলুন না আমিই খাওয়াচ্ছি আর তাছাড়াও এখন তো আপনার ফেরার কোনো ট্রেনও নেই। চলুন কিছুক্ষণ গল্প করা যাবে। '
    চায়ের দোকানে পৌঁছাতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। অনেকটা সময় ওরা দুজন চায়ের দোকানে বসে রইলো। কথা সেভাবে কেউই বললো না। দুজনেই বৃষ্টি দেখছিল। সকাল থেকে যেই ওয়েদারটাকে দুজনেই গালমন্দ করছিল এখন তার থেকেই ওদের চোখ সরতে চায় না। বৃষ্টি কমে এলে নীরাই নীরবতা ভেঙে জিজ্ঞেস করলো, ' খাওয়াদাওয়া করবেন তো কিছু?' অতনু শুধু ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানিয়ে নীরাকে অনুসরণ করে ছোট্ট একটা রেস্তোরাঁয় ঢুকলো। খেতে খেতে এত অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনেই যেন দুজনকে নিজেদের জীবনের অনেকটা বলে ফেলেছে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। এবার ফেরার পালা। হাঁটতে হাঁটতে নীরা হঠাৎই নিজের ব্যাগ খুলে অতনুর হাতে সেই ডায়েরিটা দেয়। নীরার সাথে সারাদিন কাটিয়ে অতনু ডায়েরির কথাটা ভুলেই গেছিল। সে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল আর তখনই নীরার ফোনটা বেজে উঠলো। কথা বলতে বলতেই নীরা হাত নেড়ে অতনুকে শেষ বিদায় জানিয়ে টোটোতে উঠে পড়লো। অতনু কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থেকে প্রসন্ন মুখে হাঁটতে শুরু করলো।
     
    ট্রেন ছুটে চলেছে। কনকনে ঠান্ডা বাতাসে অতনুর হাড় কেঁপে যাচ্ছে। কিন্তু কোনো এক দৈব আদেশে যেন সে উঠে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করতে পারছে না। প্রথম দিকে ট্রেনের অস্বাভাবিক ভিড়ে বসার জায়গা পায় নি সে, তবে কয়েকটা স্টেশন পেরোতেই ট্রেনটা বেশ ফাঁকা হয়ে আসে। হাট থেকে ফেরার পর থেকেই সে বেশ অন্যমনস্ক। শুধুই ভেবে চলেছে সারাদিনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর কথা। হঠাৎ ব্রেক কষার ঝটকাই সম্বিৎ ফিরল তার। সে আপনমনে নিজের ব্যাগ খুলে ডায়েরিটা বের করলো। বেশ কিছুক্ষণ ডায়েরিটার উপর হাত বুলাতে থাকলো, তারপর আলতো করে ডায়েরির সুতোটায় টান দিয়ে ডায়েরিটা খুলতেই অতনুর মনে হলো প্রথম পাতায় কিছু একটা যেন লেখা আছে। বেশ সন্তর্পনে ডায়েরির পাতা ওল্টালো অতনু। অত্যন্ত সুন্দর একটা মেয়েলি হাতের লেখায় লেখা—
    "তোমার সাথে আবার যদি দেখা হয় কোনো বৃষ্টিমুখর দিনে,
    আমাকে নিভৃতে বাঁধিও তুমি নীরব বাঁধনে।"
     
    ট্রেন ছুটে চলল অন্ধকারের দিকে, অতনুর মনে প্রথমবারের মতো বৃষ্টিটাকে আর খারাপ লাগল না।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Aditya Chowdhury | ০৮ জুলাই ২০২৬ ২৩:৩৪741659
  • সুন্দর হয়েছে।
  • Srimallar | ০৯ জুলাই ২০২৬ ০০:০২741660
  • ভাল লেখা। চেষ্টা আছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন