• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • অনবদমিত যৌনভাষ্য : বাংলার মেয়েদের কবিতা

    Yashodhara Ray Chaudhuri
    ব্লগ | ০১ মে ২০১৪ | ১৬০ বার পঠিত

  • বিষয় , অথবা বিষয়ী ?

    অথবা

    অনবদমনের অসম্পূর্ণ আকাশ

    ‘কবিতা মানে আমার কাছে এই । নিজেকে রক্তাক্ত হতে দেখা ও একইসঙ্গে সেই রক্ত পান করা। নারী কবিতায় বস্তুত এ ছাড়া আর কিছু আছে কি? হ্যাঁ আছে প্রেম আছে বাৎসল্য, আরো আছে একসঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটে যাওয়া । শেষ পরযন্ত বেঁচে থাকাও, বেঁচে থাকাই।
    ... একথা জেনেও যে, নারীকবিতা আজও একটি মার্জিনাল অবস্থানে রয়েছে। কত কী-ই যে লিখতে দেওয়া হয়নি মেয়েদের – সাফো বা অ্যাড্রিয়েন রিচ সত্ত্বেও নারী সমকামিতা কি জায়গা পেয়েছে তেমন করে কবিতায় ? কোথায় অন্তেবাসীর উচ্চারণ? কালো মেয়েদের ব্লুজ গানের সঙ্গে আমাদের ছাদপেটানো মেয়েদের গানকে কি তুল্যমূল্য করা হয়েছে? নারীর যৌনতা, পুরুষশরীরের প্রতি নারীর মুগ্ধতা কবিতায় কতটুকু? ‘

    সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, আমার কবিতা ভাবনা, কবিতা প্রতিমাসে, জুন ২০০৭

    এই লেখায় আমরা লক্ষ্য করতে চেষ্টা করব পঞ্চাশ পরবর্তী বাংলা কবিতায় প্রকট বা প্রচ্ছন্ন শারীরিক উল্লেখ, যা হয়ত শুরু হয়েছিল পঞ্চাশের দশকে কৃত্তিবাস পর্বের আত্মজৈবনিক বা স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার ধাক্কায়, এবং সেই ধারাবাহিকতা ও পরম্পরাকে মেনে যা পরবর্তী সময়ের বাংলা কবিতাতেও প্রবাহিত হয়েছে । এই লেখায় আমরা লক্ষ্য করতে চেষ্টা করব সেই ধারার ভেতরের একটি বেগবতী স্রোতকে, যে স্রোত মেয়েদের কলম থেকে উচ্ছসিত । আসলে বৃত্তটাকে যথাসম্ভব ছোট করে আনতে চাইছি এখানে । মেয়েদের লেখালেখিতে নিজস্ব শরীর বোধকে প্রকাশের চেষ্টা এবং পুরুষকে একটি মেয়ের চোখ দিয়ে দেখবার চেষ্টা কী ভাবে রূপবদল করে চলেছে বিগত কয়েকটি দশকে, এটুকুই হবে এ লেখার উদ্দিষ্ট বিষয়।

    এই বিষয়টা বেছে নেবার পেছনেও একটা যুক্তি আছে । সে যুক্তিকে স্পষ্ট না করলে এ কাজেরও মানে থাকে না কোন ।

    মানবী বিদ্যাচর্চার ধারাবাহিকতা আমাদের এই সময়ের প্রাপ্তি । নারীকে নিয়ে নতুন করে ভাবনার ‘নতুনত্ব’ এখন কতটা তা নিয়ে সংশয় থাকতে পারে, কিন্তু সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে মেয়েদের দিকে নতুন করে তাকানোর একটা সর্বজনগ্রাহ্যতা বোধহয় নতুন সংযোজন। বাঁধাধরা পড়াশুনোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে সাহিত্য শিল্পে নারী ও পুরুষের প্রতিনিধিত্ব বা রিপ্রেজেন্টেশনকে দেখে নেবার চল অধুনার । সাম্প্রতিক ঘটনা এ-ও যে , যে দ্বৈতবাদ থেকে নারী বনাম পুরুষ, প্রকৃতি বনাম সংস্কৃতি, বা জ্ঞাতা বনাম জ্ঞেয়র ধারনাগুলো আসে, সেই দ্বৈতবাদই এখন প্রশ্নের মুখোমুখি সারা বিশ্বের সব জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রেই । পুরুষ বিষয়ী , নারী বিষয়, পুরুষ জ্ঞাতা , নারী জ্ঞেয় (“ স্ত্রিয়াশ্চরিত্রাঃ /দেবা ন জানন্তি কুতো মনুষ্যাঃ” এই অতি জনপ্রিয় কথনের মূলেও সে ধারণা) , পুরুষ কর্ষণকারী , নারী প্রকৃতির মত, বসুন্ধরার মত, মৃত্তিকার মত ভোগ্যা ও কর্ষণযোগ্যা । এই প্রাচীন দ্বৈততা ভেঙে , অর্থাৎ এর ভেতরের ক্ষমতাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলারই প্রচেষ্টা নারীকে বিষয়ী করে তোলার মধ্যে ।

    অথচ গোড়ার দিকে দ্বৈতবাদকে মেনে নিয়েই নারীবাদের প্রথম প্রণেতারা ভেবেছিলেন , নারীকে হতে হবে পুরুষের সমান ও সমকক্ষ । সেই হয়ে ওঠার তাগিদে এমনকি নিজের নারীত্বকে বিসর্জনও দিতে হতে পারে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় তরঙ্গের নারীবাদীদের কাছে চিন্তাটা পাল্টেছে বলেই, নারীবাদী এখন আর নারীকে নির্‌যাতিত , পুরুষের শাসনের বলি হিসেবেই শুধু দেখাননা, বরঞ্চ নির্মাণ করতে চান নারীর নিজস্ব বিশ্ব । আর সেখানেই এসে পড়ে নারীকে বিষয়ী করে তোলার প্রচেষ্টা ।

    বিষয় হিসেবেই কিন্তু নারীকে দেখতে অভ্যস্ত আমরা। জনপ্রিয় সাহিত্য শিল্পের কাছে সেটাই প্রশ্নচিহ্নহীন ধরে নেওয়া। উপভোক্তা নারী পুরুষ যে-ই হোন, তাঁকে আমোদ দেবে, বিনোদন দেবে নারীর এই বিষয়-মূর্তিই। এটাই পুরুষ শাসিত সমাজের সহজ ছক। নারী পুরুষের মিউজ, তার প্রেরণা, তার আকাংক্ষার বিষয় , সম্ভোগের বস্তু, হাসিল করার পণ্য । সে একাধারে দেবী ও দানবী, অথবা হয় দেবী নয় দানবী। এই ব্যাপারের প্রতিফলন অবধারিতভাবে ঘটেছে কবিতাতেও।

    ‘নারীর কবিতা বিষয়ে ভাবতে গিয়ে তাই আগে বুঝে নিতে চাই নারীর সেই প্রতিমা, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় যা প্রতিফলিত। সে প্রতিমা পুরুষেরই কল্পনা ... উর্বশী আর লক্ষ্মী, পুরুষী কবিতার পরম্পরায় নারীর এই দুই স্টিরিওটাইপই সবচেয়ে প্রবল, পশ্চিমী আলোচনার ভাষায় যাকে বলা যেতে পারে অ্যাঞ্জেল হোর ডিকটমি। ...পুরুষতন্ত্রের সেই পরম্পরার মধ্যে থেকেই মেয়েরা লেখেন। ...’(সুতপা ভট্টাচার্‌য, ‘কবিতায় নারী, নারীর কবিতা’, মেয়েলি পাঠ, পৃ ৪৪-৪৮)

    ঠিক এই একই ব্যাখ্যায় উপনীত হয়েছিলেন সিনেমা চর্চার ক্ষেত্রে লরা মালভে, তাঁর ‘ভিজুয়াল অ্যান্ড আদার প্লেজারস ‘ প্রবন্ধে, ১৯৭৩ সালে। যা থেকে উঠে এসেছিল নতুন এক তত্ত্ব । লাকাঁ ও ফ্রয়েডের ধারা থেকেই জন্ম নিয়েছিল জনপ্রিয় ছায়াছবির নারীবাদী বিশ্লেষণের নতুন ধারণাটি, ‘ মেল গেজ ‘ বা ব পুং দৃষ্টির তত্ব । সে তত্ত্বও বলছে একই কথা । মূলস্রোত ছায়াছবি , হলিউডের বিখ্যাত ছবিগুলিই ধরা যাক, নারীকে দেখায় বিষয় হিসেবে। দুভাবে বিষয় করা হয় নারীকে। হয় ভয়ারিস্টিক বিষয়। সে পুরুষচোখে নারী লালসাময় বেশ্যা । নতুবা ফেতিশিস্টিক বিষয় । সে পুরুষচোখে , পুরুষচাহনিতে নারী দেবী, ম্যাডোনা, মা। রিরংসা থেকে পবিত্রতা । সুতপা ভট্টাচার্যের ভাষায় ‘উর্বশী-ছবি” আর ‘লক্ষ্মী-ছবি’। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে” থেকে শঙ্খ ঘোষের “পায়ে শুধু পড়ে থাক স্তব্ধ এলোচুল “ অব্দি।

    এই প্রেক্ষিতটুকু না থাকলে আজকের আলোচনারও মানে থাকছে না কোন । কেননা, বারে বারেই নারীর এই ‘বিষয়’- মডেল যেহেতু সামনে, নারী যেহেতু পুরুষের শৈল্পিক আত্মপ্রকাশের এক বিশিষ্ট কেন্দ্রস্থল , নারী নিজে সৃষ্টিক্ষেত্রে এলেই তাঁকে এই প্রেক্ষিতটার সঙ্গে লড়াই করতে হয়। বুঝে নিতে হয় কে কোথায় দাঁড়িয়ে। সুতপা ভট্টাচার্‌য মনে করিয়ে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ থেকে শক্তি চট্টোপাধ্যায় পর্্‌যন্ত কীভাবে জানিয়েছেন, মেয়েরা আদৌ কবিতা লিখতে পারে কিনা তা নিয়ে নিজেদের সংশয়ের কথা, আর নিজেই দিয়েছেন তাঁর উত্তর : “সত্যিই তো মেয়েরা কল্পনা করতে পারেই না। কবিতা লিখতে চায় যদি কোনো মেয়ে, তবে হয়তো তার বালিকা বয়সেই সে অনুভব করে নিজের কল্পনাশক্তির সীমা...। কিন্তু এমনটাই তো হবার কথা । কল্পনা যে করে সেই বিষয়ীকে নিজের মধ্যে চিনে নেওয়া মেয়েদের পক্ষে কি সহজ? যে ভাষা দিয়ে সে কল্পনা করবে, যে ছবি দিয়ে সে কল্পনা করবে , সেই ভাষা সেই ছবি পুরুশ –পেষিত সমাজের, তার সাহিত্যের। সে ভাষা সে ছবি মেয়েদের শেখায় পুরুষ নির্দেশিত এক ভুল ঐকাত্ম্য । সাহিত্যের পরম্পরা থেকে মেয়েরা সাধারণত সেই ভুল ঐকাত্ম্য গ্রহণ করে এবং প্রতিফলিত করে। নিজেকে বিষয়ী হিসেবে জানতে গেলে কোনো মেয়েকে ঘুরে দাঁড়াতে হয় সেই পরম্পরার বিপরীত মুখে। (সুতপা ভট্টাচার্‌য, ‘কবিতায় নারী, নারীর কবিতা’, মেয়েলি পাঠ, পৃ ৪৪)

    আজকের এই নিবন্ধে বারে বারে আমরা ফিরব সে প্রশ্নের কাছেই, কীভাবে মেয়েরা ঘুরিয়ে দিতে পারেন সেই ভুল ঐকাত্ম্য, কীভাবে তাঁরা রচনা করেন তাঁদের নতুন দৃষ্টিকোণ , যা পুরুষের দৃষ্টিকোণ থেকে ঠিক ১৮০ ডিগ্রি দূরে অবস্থিত, আদৌ কি তাঁরা পেরেছেন রচনা করতে এই নতুন, ফিমেল গেজ বা নারী-চাহনি?


    ‘অশ্লীলতা বলে কিছু নেই – এটাই শেষ কথা। যদি থাকেও তথাকথিত অশ্লীলতা, সেটা তো আমাদের বিষয় নয়, পৃথিবীর কোন লেখকই আর ওসব লেখার কথা ভাবে না, আমরাও কোন রকম অশ্লীললেখা চাই না, ওসব মনেই পড়ে না সত্যি বলতে কি। আগেও বলেছি, আবার বলি, পাহাড় , সমুদ্র, আকাশ , শস্যক্ষেত্র, অরণ্য, নারীর ও পুরুষের শরীর – আমরা সমচোখে দেখি, এদের সম্বন্ধে আমাদের সত্য অনুভূতি ( বাস্তব নয়) প্রকাশের চেষ্টা করতে আমরা সকলেই বিনীতভাবে বাধ্য । ‘

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ‘অশ্লীল’, কৃত্তিবাস পঞ্চাশ বছর নির্বাচিত সংকলন, পৃ ২৪৫।

    বাঙালির রচিসংস্কৃতির অবদমিত যৌনবোধের প্রকাশ যখন কবিতার মানক, জীবনানন্দীয় কুয়াশায় যখন তরুণ কবিরা আচ্ছন্ন, তখনি কৃত্তিবাস আন্দোলন আনল ভাংচুরের পালা। মেধার সরণি ছেড়ে আত্মজৈবনিকের , স্বীকারোক্তির নতুন দিগন্ত খুললেন এই আন্দোলনের পুরোধা প্রধান পুরুষ কবিরা । সুনীল-শরৎ-শক্তি-তারাপদ... পাশাপাশি তুষার রায়, বেলাল চৌধুরী তন্ময় দত্তরা। সেই মুহূর্তের অ-প্রাতিষ্ঠানিকতার শেষ কথা এই কবিদের হাত থেকে বেরিয়ে আসা তাজা স্বতঃস্ফূর্ত কবিতাগুলি। বাংলা সাহিত্যে দীর্ঘস্থায়ী এক প্রভাব। কবিতায় মেয়েদের পদচারণা তখন যথেষ্ট সীমিত।

    রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক, ব্যক্তিগত সব স্তরকে ছুঁয়ে গেছে স্বীকারোক্তি । অবধারিতভাবে এসে পড়েছে যৌন স্বীকারোক্তি। এবং সচেতনভাবে । সচেতন, কেননা, কলকাতায় এসে গেছেন গিন্সবার্গ। কৃত্তিবাসের ষোল নম্বর সংকলন সম্বন্ধে শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন, ‘ষোল নম্বর সংকলনে কৃত্তিবাস ফেটে বেরুল। তারিখ ১৩৬৯ চৈত্র। ...কবিত্বের খোলস ছেড়ে একদল অতৃপ্ত যুবকের অকস্মাৎ বেরিয়ে পড়ার জন্যে যে প্রচন্ড অস্বস্তি ও বেগে-এর প্রয়োজন ছিল। অ্যালেনদের সাহচর্য তা জুগিয়েছিল আমাদের । সংখ্যাটি কলকাতা পুলিশের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল অশ্লীলতা সম্পর্কে। ...ঘামে নুন, যোনিদেশে চুল( পৃঃ ৫), দেখেছি সঙ্গম ঢের সোজা, এমনকি বেশ্যারও হৃদয়ে পথ আছে ( পৃঃ ২২) , যোনির ঝিনুকে রাখা পোকাগুলি মুক্তা হয়ে গিয়েছে বিস্ময়ে ( পৃঃ ৪৫)...আসলে যে কান্ড ঘটেছিল সব কবিদের বুকের মধ্যে তা হল প্রচন্ড বিরক্তি থেকে উদ্ভুত ধ্বংস করার ইচ্ছে – সৃষ্টির নামান্তর – যা কিছু পুরনো পচা, ভালমন্দ সোনারুপোর খনি, এমনকি নিজেদের শরীর ও অস্তিত্ব – সর্বস্বের সর্বনাশ। “ ( শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় , কৃত্তিবাসের রামায়ণ, কৃত্তিবাস পঞ্চবিংশ সংকলন, ১৯৬৮)।

    মাটির তলায় চাপা পড়া উপাদানের রাসায়নিক পরিবর্তনের মতই, বাংলা কবিতার কর্ষণভূমি এর পরে আর কোনদিন পূর্ববৎ রইল না, থাকার কথাও নয়। পুরুষী কবিতার ট্র্যাডিশনে প্রোথিত ও প্রতিষ্ঠিত হল যৌনতাবিষয়ক অনবদমিত স্বীকারোক্তি। নতুন রক্তসঞ্চালন হতে শুরু করেছে বাংলা কবিতার ভাষা ও ভাবনায়। “গুল্মলতা উদ্ভিদ অরণ্যঘন পর্ণমোচী বৃক্ষের সারি পাহাড় পর্বত সান্নুদেশে ... আমি এক সুচতুর ব্যাধ নির্ভুল লক্ষ্যভেদে গাঁথি প্রভুর অসীম কৃপায় অলৌকিক আমার বর্শাফলকে তরল লাভাস্রোতে তাম্রখন্ডে বিম্বিত অতলান্ত গহবর তাক করে ।“ ( বেলাল চৌধুরী, ‘লক্ষ্যভেদ’।) লক্ষ্য করব, এক বা একাধিক ইমেজের সহায়তায়, অথবা সরাসরি, এক সচেতন যৌন ইশতেহার রচনার তীব্র ইচ্ছা এইসব লেখা তাঁদের দিয়ে লেখাচ্ছিল। ‘আমি ড্রামে কাঠি দেওয়ামাত্র ওর শরীর ওঠে দুলে / ড্রি রৃ ড্রাও স্ট্রোকেতে দেখি বন্যা জাগে চুলে/ তিন নম্বর স্ট্রোকের সঙ্গে নিতম্বেতে ঢেউ ... আমি তখন ড্রাম বাজিয়ে নাচাই ওকে, মারি এবং বাঁচাই ওকে/ ড্রামের কাঠির স্ট্রোকে / যেন গালাই এবং ঢালাই করি - “ ( তুষার রায় , ‘খুলে যায় তালা’) ।

    একটি স্পষ্ট কর্মসূচী নিয়েই এই কবিরা এসেছেন শরীরের অনুভবকে সাদা কাগজের বুকে বদলি করতে। “কিছুক্ষন ডুবেছিল যোনির ভিতরে জিভ লবণের স্বাদ ছাড়া আর/ কিছুই আনেনি তবু অসম্ভব ভালবাসাবাসি হল অসম্ভব / এই নিয়ে তোমাকে আমার/ একুশটা পুনর্জন্ম দেওয়া হল এত মৃত্যু মানুষেরও জানা ছিল ।“ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস চৈত্র ১৩৬৯ –এর “কয়েক মুহূর্তে” শীর্ষক বিস্ফোরক কবিতাটির মধ্য দিয়ে এভাবেই প্রথাসিদ্ধ ও স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ওঠে কবিতায় যৌনতার ব্যবহার।

    অর্থৎ, এখানে প্রতিষ্ঠা দিতে চাইছি একটিই কথাকে, ১৯৫০ পরবর্তীতে যৌনতার সরাসরি উল্লেখ এবং যৌনক্রিয়ার বিবরণী একটি স্বাভাবিক ভাববস্তুতে পরিণত হল বাংলা কবিতায়। কিন্তু সেই লেখা মূলত পুরুষ কবিদের কলম থেকে। “শরীর ছাড়া শরীর যায় না চেনা... শরীর ছেনে শরীর দিয়েই অন্ধকারের/ নিবিড় শরীর গভীর করে দাঁতে কাটি/বুকে পিষি ঘামের শরীর – আঁষটে গন্ধ” ( বেলাল চৌধুরী , ‘শরীর দিয়েই শরীর”) এর নতুনত্ব সেই সময়ে যতটাই থাক, পরে শরীরের আঁষটে গন্ধ বাঙ্গালির রান্নার মাছের মতই অনিবার্য হয়ে উঠবে বাংলা কবিতায় । ভুরু তুলে কানে হাত দিয়ে “আ ছি ছি” বলে ওঠার মত আর থাকবে না পুরুষের লেখায় “স্তন” “যোনি” “লিঙ্গ” এমনকি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বহুকথিত “নুংকুটি নতমুখ”এর মত প্রয়োগগুলিও।

    পুরুষের কবিতায় এরপর কিছুদিন কেবলি শরীরী উদযাপন। শরীরকে একটা আলাদা মর্যাদার জায়গায় স্থাপন করেছে এতদিনে এই সব কবিতা। যদিও কল্লোল যুগেও চেষ্টা হয়েছিল, বুদ্ধদেব বসুর কিছু গদ্য যেভাবে কবিতায় ব্যবহৃত শরীরী সংকেত বহনকারী শব্দদের পক্ষ নিয়ে লেখা হয়েছিল । তবু, আমাদের আলোচনার প্রেক্ষিত হিসেবে কৃত্তিবাসপরবর্তী ধারাটিই জরুরি, কেননা মেয়েদের কবিতায় শরীরী উদযাপনের শুরুও ঠিক তখনই, কবিতা সিংহ দেবারতি মিত্র রাজলক্ষ্মী দেবীদের হাত ধরে।

    কিন্তু মেয়েরা কি সত্যি সেই “কিউ” নিয়ে এগিয়ে এলেন তাঁদের কবিতাতেও পুরুষের শরীরের বর্ণনা করতে ? স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেও কি তাঁরা লিখলেন একটি মেয়ের আকর্ষণের কথা একটি পুরুষের প্রতি ? জোর করে চাপিয়ে দেওয়া কোন প্রতিশোধের প্রেক্ষিত থেকেই মেয়েরা পুরুষ-প্রেমের কবিতা লিখলে তো সেটা হয়ে দাঁড়াত পরশুরামের কাহিনির সেই জিগিষা দেবীর উদ্দাম লিবিডোর কাঁচা সংস্করণ, হাস্যকর দাঁড়াত তা। আদৌ যে সেরকম কিছুই ঘটেনি, তার প্রমাণ আজ অব্দি মেয়েদের লেখালেখির এই বিশিষ্ট এলাকা নিয়ে প্রায় কোন আলোচনাই হয় নি, হলেও তা নিতান্ত হাতে গোণা। এখনো অনেক ভুরু একসঙ্গে উঠে যায় যদি কেউ শোনেন, মেয়েদের কবিতা নিয়ে কোন আলাদা স্টাডি করছেন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ( বা ছাত্রী) । “মেয়েরা গত পঞ্চাশ বছরে এমন কিছু লিখেছেন নাকি, যা দিয়ে একটা পেপার হয়ে যায় ?”


    ‘...একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে তসলিমা নাসরিনকে নিয়ে তর্ক বেধে ছিল। ক্লাসের শিক্ষক সহ বন্ধুরা বলতে চেয়েছে তসলিমা যা লেখে তার কোন গুরুত্ব নাই। সেখানে যা লেখা থাকে সব উল্টাপাল্টা কথা। আমি বলেছিলাম তসলিমা যা লেখে তা ১০০% সঠিক তা আমি বলব না। কিন্তু এই দুনিয়ায় যত লেখক আছে তারা বেশীর ভাগ পুরুষ, তারা নানা সময় তাদের লেখায় নারী মনের অনুভুতির কথা লিখেছেন। নারীর কাছ থেকে নারীর অনুভুতি তেমন একটা জানাই যায় না। তসলিমার লেখায় সেটা আছে। আমি তো ইউরোপ আমেরিকায় বড় হই নি বড় হয়েছি এই দেশে। এতগুলো বছর নারীর সঙ্গে পাশাপাশি বেড়ে উঠেছি কিন্ত তার মনে যে এমন অনেক দুঃখ যা আমি জানি না, জেনেছি তসলিমার লেখা পড়ে।...তর্কটা তসলিমার লেখা নিয়ে হয়েছিল তাই তার কথাই বলেছি, বেগম রোকেয়া, সেলিনা হোসেন (আরও আছে কয়েকজন তাদের নাম মনে করতে পারছিনা এখন) এদের লেখা থেকেও জেনেছি। এদেশের মেয়েদের বেশীর ভাগেরই তো বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। তাই তাদের মনের বেদনা জানা জন্য এই লেখারাই ভরসা।‘ - সাদ্দাম হোসেন , ফেসবুক কমেন্ট , নভেরা হোসেন নেলির লেখার উপরে।

    যে সময় থেকে পুরুষের লেখায় সরাসরি যৌনতার প্রসঙ্গ আসছে, মাঠ আকাশ চাঁদ পাখির মতই অবলীলায়, সেই সময় থেকেই কি মেয়েদের লেখাও প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠেছে ? নাকি মেয়েদের মুখ চাপা থাকে সমাজের হাতে, মেয়েরা বড় হয়েও থেকে যান খুকি, যেমন বলেছিলেন জার্মেন গ্রিয়ার , তাঁর “মেয়ে খোজা” গ্রন্থে , অথবা যখন তিনি বলেন, “শি ইজ নট অ্যালাউড টু গ্রো আপ “ ? অথবা তাঁরা লড়েন একটা লড়াই, শুধু নিজেদের বাচন খুঁজে পাবার লড়াই?

    না, কৃত্তিবাসীদের যদি প্রয়োজন হয়ে থেকে থাকে একজন অ্যালেন গিন্সবার্গ, নিজেদের বিরক্তিকে বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যেতে , আলাদা করে বাংলার মেয়ে কবিতা লেখকদের কিন্তু কোন রোলমডেল পাব না। যদিও বিদেশ থেকে আমদানি করা নারীবাদী তত্ব বা ইংরিজি ভাষার কবি/লেখক এমিলি ডিকিনসন, সিলভিয়া প্লাথ , অ্যাড্রিয়েন রিচ, পাঠের অভিজ্ঞতার কথা আশির দশকের নব্বই দশকের কন্যাদের মুখে শুনে ফেলব কখনো বা, কিন্তু এটা ঠিক যে শুধু মহিলা কবিদের কোন সংগঠিত, সচেতন, সুসংহত আন্দোলন খুঁজে পাব না ইতিহাসের পাতা উলটে পালটে অথবা ছিঁড়ে কুটি কুটি করলেও, যতই কেন চাই না।

    মেয়ে কবিরা সচরাচর অত্যন্ত বিভক্ত, বিচ্ছিন্ন এবং প্রত্যেকেই নিজের নিজের বিশ্বে একা থেকে গেছেন। তবু, ৫০ থেকে ২০১১ এই এতগুলো বছরের মেয়েদের কবিতাকে আতশকাঁচের তলায় যে আজ নিয়ে আসতে পারছি তা থেকেই স্পষ্ট যে কোথায় একটা ঐক্যও থেকে গেছে। যদ্যপি এই সব কবি, যাঁরা হয়ত বা সচেতনে বা অসচেতনেই নির্মাণ করেছেন নারীকবিতার ভাষাবিশ্ব, নির্মাণ করে ফেলেছেন মেয়েদের দিক থেকে মেয়েদের কথাকে লেখার, এবং , তারই ফল হিসেবে , কখনো কখনো, মেয়েদের দিক থেকেই যৌনতাকে লেখার পরিসর। অথচ সচেতনে তাঁরা কেউ কেউ স্বীকারই করেন না যে মেয়েদের কবিতা হিসেবে আলাদা করে কিছু বিচার্য থাকতে পারে।

    উদাহরণ চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের এই লেখাটি : মেয়েদের লেখা এই ব্যাপারটাকে মানতেই আমার আপত্তি। আপত্তি, কারণ এতে করে আপনি/আমি, আমরা, আমরাই স্বেচ্ছায় একটা ঘেরাটোপ বানিয়ে নিচ্ছি, চিড়িয়াখানার জিরাফ বা জেব্রার খাঁচার মতো, যার বেড়ার ধারে উৎসাহী বাচ্চার ( পাঠকের ) ভিড় জমবে । “মেয়েদের লেখালেখি” কথাটার পাশাপাশি তাহলে তো একটা “ছেলেদের লেখালিখি” বলেও ক্যাটাগরি বানাতে হতো । নয়কি? কিন্তু তা তো হয় না বানানো। বরং আমরা উৎসাহ নিয়ে একটা দাগা বুলনোর কাজই করে চলি। ক্ষমতার ভাষার উচ্চারণবিধিকে মেনে নিয়ে, ঘাড় কাত করে ।
    ( চৈতালী চট্টোপাধ্যায় , কবিতা : নিম্নবর্গের কিম্বা মেয়েদের লেখালেখি, বৃষ্টিদিন পত্রিকা, ১৪১১)

    এর পরেও কিন্তু কথা থেকে যায়। যেহেতু লেখালেখি জিনিশটিকে আমরা যতটা ভাবতে পছন্দ করি ততটাই সরল কোন প্রক্রিয়া নয়, যেহেতু প্রতিটি লেখার পেছনে থেকে যায় পশ্চাৎপট । আর আমরা জেনেই গেছি যে মেয়েদের লেখার প্রেক্ষিতে থেকেই যাচ্ছে এযাবৎকার কবিতা পরম্পরা, যা নাকি প্রধানত পুরুষের সৃষ্ট । সুতরাং ভেবে বা না ভেবে, সচেতনে অসচেতনে কিন্তু পুরুষ-কবিতার নির্মিত যৌনতার আদলটি কিন্তু থেকেই যায় নারীর লেখাটি লেখার সময়ে। ‘কবির লিঙ্গ নেই” কথাটির ভাববস্তু যতখানিই হোক, আর্থসামাজিকরাজনৈতিক অবস্থান থেকেই যাবে প্রতি কবির। সম্পূর্ণ রাজনীতিহীন লেখালেখি যেমন হয়না, অবস্থান থাকতে বাধ্য প্রতিটি লেখকের, তারই ভেতরে লিঙ্গ রাজনীতিও থাকবে। নারীত্বের সচেতনতা বাদ দিয়ে লেখালেখিও অসম্ভব।

    এক্ষেত্রে বোধহয় আমরা বরঞ্চ ধার নিতে চাইব নবনীতা দেবসেনের কথা :
    “যা-ই লিখি না কেন, একটি নারীই তো কলমটা ধরে আছে ? লেখকের নারী পুরুষ নেই এ কথাটা ঠিক নয়, অতি অবশ্যই আছে। ... নরনারী একই সমাজে বাস করি বটে কিন্তু জীবনযাপনের পার্থক্যে নারীর অভিজ্ঞতা, নারীর দৃষ্টি, নারীর অনুভব, পুরুহশের চেয়ে অনেক আলাদা, অনেক সময়েই আমাদের পৃথিবীর নাগাল পায় না পুরুষের চোখ। কিন্তু আরেকবার বলি, লিঙ্গ বিভাজিত দৃষ্টিই শিল্পীর শেষ কথা নয়, লিঙ্গ নিরপেক্ষ দৃষ্টির সন্ধান করাও শিল্পীর পক্ষে জরুরি । ...এতকাল তো নারী পুরুষ উভয়েই পুরুষের দৃষ্টি দিয়ে জীবনকে দেখেছেন, তারই নাম দিয়েছেন নিরপেক্ষ চোখ, সার্বজনীন দৃষ্টি। অনেক লেখিকাকে দেখি নারীর চোখ দিয়ে জীবনকে দেখে লেখাকে একটু ছোট নজরে দেখেন, সংকীর্ণ দৃষ্টি মনে করেন, আর পুরুষের চোখে দেখাটিকে মনে করেন উদার। এইসব বিভ্রান্তি অবশ্যই এখন ঘুচে যাওয়ার সময় হয়েছে... যুদ্ধং দেহি নারীবাদের দিন সমাপ্ত হয়েছে, কিন্তু আত্মনিয়ন্ত্রিত প্রতিবাদের দিন এখনো সমাপ্ত হয়নি। “ ( সাক্ষাৎকার-এর অংশ , বিম্ববতীর আরশি, কবিতা প্রতিমাসে, জুন ২০০৭) ।

    এখন এই বিতর্কটির অস্তিত্ব স্বীকার করেই বলি, এই বিতর্কে না ঢুকেও আমার এই লেখায় সহজেই আলোচনা করে উঠতে পারি ঐ ছোট বৃত্তটিকে। পোস্ট মডার্ন বা অধুনান্তিক তত্ত্ব থেকে একটা কথা ধার নেব এখানে। অন্যভাবে দেখানোর ফলে দেখার সুবিধে করে দেবে বলে। প্রবাল দাশগুপ্তের “অধুনান্তিক এলাকা” প্রবন্ধ থেকে পাচ্ছিঃ “জীবের সঙ্গে জীব মিলে মিশে যে ডাঙায় জীবনের যৌথতা চালায় সেই চলাচলের ক্ষেত্রই ‘অঞ্চল’। আলাদা এক খন্ড ভিটেমাটি বলে সে ডাঙাকে যদি চাক্ষুষ চেনা না যায়, তাহলেও। যে কোন অঞ্চলেরই ন্যূনতম একটা আত্মশক্তি চিহ্নিত সার্বভৌমতার দরকার থাকে।
    যেমন ধরুন নারীবাদ যে সম্ভব হচ্ছে তার কারণ, মেয়েরা এই অর্থে একটা অঞ্চল। তাঁরা যে আলাদা কোনো ভূখন্ডে থাকেন না, পুরুষদের সঙ্গে এক বারিতে এক পাড়ায় এক দেশেই থাকেন, সেটা নারী অঞ্চলের সং হতির অন্তরায় নয়। নারী অঞ্চলের স্বাতন্ত্র্য চাওয়া মানে ছেলেদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ভূমিতে থাকতে চাওয়ার অলীক কল্পনা নয়। মেয়েদের স্বাভাবিক স্বপ্নের পুরোন দাবিরই পরিস্ফুট রূপ। যে পরিস্ফুটনের ধরণটা অধুনান্তিক পর্বের আঞ্চলিকতার লক্ষণে চিহ্নিত। “
    আমার মতে, মেয়েরা যখন লেখেন, তাঁর কাছে সমস্ত কবিতাই আসলে মানুষেরি কবিতা, একইসঙ্গে সেই কবিতার একেবারে ভেতরে থেকে যায় , হঠাত হঠাত জেগে ওঠে এমন এমন সব মেয়েমানুষের কথা, মেয়ে শরীরের কথা, মানুষ হিসেবে অস্বীকৃত হয়ে অপমানিত বিক্ষুব্ধ মেয়ের মনের কথা, এমন সব সত্য হঠাৎ করে ভেসে ওঠে কবিতার মধ্যে, যে আমরা স্তম্ভিত হই, স্পৃষ্ট হই, ঋদ্ধ হই। ঠিক যেভাবে এক পুরুষ কবির কলম অনবরতই লিখে চলে পুরুষজমিন, এক নারী লেখেন নারী অঞ্চলের কথাই, সে অঞ্চল বাত্যাবিক্ষুব্ধ হোক বা শান্ত, সেই ভূগোলটার খবর আমরা পেতে পারি তাঁর লেখায়, নিরবচ্ছিন্নভাবে, যদি না তিনি সচেতনে অন্য লিঙ্গের বাচনে কিছু বলতে চান।

    অর্থাৎ, মেনে নেব, সচেতনে হোক অবচেতনে হোক, নারীরা তাঁদের লেখায় এনেছেন পৃথক এক দৃষ্টিভঙ্গি, একটি ফিমেল গেজ। নারীর দৃষ্টিকোণ ব্যাপারটা এইসব লেখালেখির ক্ষেত্রে ঠিক কি ? কী কী লক্ষণ দিয়ে চিনে নেব তাকে?

    যে যে ক্ষেত্রে যৌনতার প্রসংগ আনছেন একজন নারী, বুঝে নিতে চাইব, সেখানে নারীকে ঠিক কী ভঙ্গিমায় উপস্থাপিত করছেন তিনি? সে উপস্থাপনায় নারী কি পুরুষের আকাংক্ষার বিষয় অথবা উৎপীড়নের, নাকি একইসঙ্গে তার নিজস্ব রুচিপছন্দ এবং সক্রিয় নিয়ন্ত্রণেরও একটি ছবি ফুটে উঠবে। যেহেতু পুরুষকেন্দ্রিক বিশ্বধারণায় নারী চালিত হয় পুরুষের ভোগেচ্ছায়, পুরুষের খেলুড়ে, নিয়ন্ত্রক, সক্রিয় ভূমিকাটিই সমাজ সমর্থিত ধারণা। পুরুষের ফ্যান্টাসি, স্বপ্নকল্পনার উপকরণে নারী, যাকে অধিকার করতে হয়, ভোগ করতে হয়। উল্টোদিকে নারীর ফ্যান্টাসি বা স্বপ্নকল্পনাতেও কি পুরুষের ভোগ্যা হবার আশা আকাংক্ষা প্রকাশিত । নাকি, এর মধ্য দিয়ে সূক্ষ্ম ফাঁক সৃষ্টি করে কখনো কখনো কি মেয়েরা তাঁদের লেখায় পালাতে পেরেছেন তাঁদের নিজেদের বিপরীত মুদ্রায়, যেখানে নিয়ন্ত্রণের রশি তাঁর নিজের হাতে, অথবা পুরুষের প্রতি আকর্ষণটি সজীব ও সক্রিয়?

    মেয়েরা যে মুহূর্তে কলম হাতে নেন সেই মুহূর্তে এই সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য সিদ্ধান্ত নিয়ে নিতে হয় তাঁদের । এটা একটা রাজনৈতিক প্রশ্ন। সমস্ত লেখালেখির পরম্পরায় আমরা যে যৌনতাকে দেখি তা আমাদের প্রার্থিত কিনা, প্রেয় কিনা। হয়ত আবার ফিরে যাব ইংরেজ নারীবাদী জার্মেন গ্রিয়ারের একটি বক্তব্যেই, যেখানে তিনি ওই পরম্পরাগত যৌনতায় মেয়েদের অবস্থান নিয়েই বলেন, “this is not what our sexuality is . Our sexuality is like everybody else’s. It’s questing, it’s investigative, it’s desirous, it’s looking for novelty, excitement and passion, and intensity, and all that stuff. “ ( Hard talk )

    এই কথাটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখে নেব একটি কবিতা, সামান্য এক উদাহরণ হিসেবে, এর পরে যা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলব আমরা :

    তোমার নরম ভারি শরীরের নীচে শুয়ে
    ফিরে আসছে আমারও পুরনো
    খেলা ও খেলুড়িপনা, পুরুষ ছোঁয়ার মজা
    শঙখ লাগা অমৃত ছোবল
    তুমিও কী অপরূপ শিখে নিচ্ছ ভাঙাগড়া
    ঠোঁটে কামড়ে বুকে পিষে ফেলে
    বলেছ রোয়াব নিয়ে, আমিই শাসন করব
    কিছুই বোঝ না, বাচ্চা ছেলে।

    এই চাহনিটিকেই আমি বলতে চাইছি নারীর চাহনি, আর এখানেই আমরা খুঁজে পাচ্ছি গ্রিয়ার কথিত “কোয়েস্ট” বা খোঁজ, পাচ্ছি “ডিজায়ার” বা কামনা, পাচ্ছি নতুনত্ব, উত্তেজনা ও প্যাশনের খোঁজ।

    কবিতাটির কবি সুতপা সেনগুপ্ত। সম্ভবত পুরুষের সঙ্গে ভুল ঐকাত্ম্যকে ভেঙে ফেলার , উলটে ফেলার প্রয়াস হিসেবে ইদানীংকার অনন্য ঝকঝকে এক উদাহরণ।



    They shut me up in Prose –
    As when a little Girl
    They put me in the Closet –
    Because they liked me "still" –
    Still! Could themself have peeped –
    And seen my Brain – go round –
    They might as wise have lodged a Bird
    For Treason – in the Pound –

    Emily Dickinson

    কবিতা সিংহ (১৯৩১- ১৯৯৮) একবার লিখেছিলেন মেয়েদের মাথার বাইরের দিকটা নিয়ে সকলের আগ্রহের কথা, বলেছিলেন মেয়েদের মাথার ভিতরের দিকটাকে নিয়ে কারুর মাথাব্যথা নেই। সেটা ৫০ দশক , আজ থেকে ষাট বছর আগের কথা । সেজন্যেই কথাটি আলাদা করে ভাবায়। এই সময়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে বাবা মায়েরা , অন্তত বাঙালি বাবা মায়েরা , ছেলে হোক বা মেয়ে, অংকে ৮০-৯০ না পাওয়াকে অপরাধ ভাবেন, সেখানে কথাগুলির ধার সামান্য কমে এসেছে বলে মনে হয়? কিন্তু কবিতায় কবিতা সিং হের বিস্ফোরণ ক্ষমতা এখনো অম্লান।

    কবিতায় প্রথম কবিতা সিং হই আমাদের জানান যে অশ্রু আর মূত্র একই উপাদানে গঠিত কিন্তু “বিভিন্ন পাইপে যায় চক্ষু আর শিশ্ন অভিমুখে”। ( ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা হলে)। নিজস্ব স্ত্রীলিঙ্গ নির্মাণের কথাটি কবিতা সিংহ অন্য অভিধায় বলেছিলেন, যখন তিনি বলেন :আমিই প্রথম/বুঝেছিলাম/দুঃখে সুখে/পুণ্যে পাপে/জীবন যাপন/ অসাধারণ... স্বর্গ নির্বাসিত প্রথম পাপ –জানা ইভের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘ভেঙেছিলাম/ হইনি তোমার/হাতের সুতোয়/নাচের পুতুল/ যেমন ছিল/অধম আদম/আমিই প্রথম বিদ্রোহিণী/ তোমার ধরায়/আমিই প্রথম।/...আমিই প্রথম/ ব্রাত্যনারী/স্বর্গচ্যুত/নির্বাসিত/জেনেছিলাম/স্বর্গেতর/স্বর্গেতর/ মানব জীবন/ জেনেছিলাম/আমিই প্রথম।

    অথচ এই ইভের সত্তার ভেতরে বহিষ্কৃত ছিল না আদম, কারণ ‘আমিই প্রথম /নর্ম সুখের/ দেহের বোঁটায় /দুঃখ ছেনে/... তোমার পুতুল/ বানানো যায়/ জেনেছিলাম...’ এই কাহিনিতে বহিরাগত নয় প্রেম ও যৌনতা সুতরাং। কাহিনিটি এক্সক্লুসিভ নয়, ইনক্লুসিভ, আজকের ভাষায়। যা অনেক নারীবাদী আগে বা পরে স্বীকার করেননি। পুরুষ বিদ্বেষের সঙ্গে অভিন্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে নারীবাদ, পাঠকের চোখে।

    কবিতা সিংহ তাঁর জীবনদর্শনে এক লপ্তে ঢুকিয়ে নেন পুরুষকে, লেখার ভেতরে পুরুষের কাছ থেকে যা চাহিদা তা-ও জানাতে ভোলেন না, অর্থাৎ এক ইউটোপিক বা আদর্শ পুরুষ ছবি রচনার প্রয়াসও তিনি নেন। তিনি নির্মাণ করেন এক “বিকল্প পুরুষ” । ‘স্বয়ংক্রিয়’ কবিতাটিতে তাঁর বলা, সেকেন্ড হ্যান্ড বাজার থেকে “দারুণ সস্তায়” কিনতে পারা যাবে এমন এক বিকল্প পুরুষ-এর কল্পবৈজ্ঞানিক মডেল। যা “বাতিল স্বয়ংক্রিয়” এবং যাতে “একশো চুম্বন পাবে এই লাল সুইচ জ্বালালে/ চারশত তোষামোদ, কবিতার উদ্ধৃতিসমেত/ আলিঙ্গন / যৌনক্রিয়া/মুগ্ধচোখে চেয়ে থাকা খয়েরি গোলাপি নীল এইসব বিবিধ বোতামে” পাওয়া যাবে “বারো ঘন্টা নাগাড়ে সমানে/ মাত্র এক লিটারের পবিত্র ডিজেল বিনিময়ে।

    ১৯৬৩ সালে লিখিত এই ‘স্বয়ংক্রিয়’ কবিতাটি । ভুললে চলবে না তার সামান্য কয়েকদিন আগেই কৃত্তিবাস পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে আমাদের পূর্বেই উল্লিখিত সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘কয়েক মুহূর্তে’ নামের সেই বিখ্যাত কবিতাটি, ২০০৭ সালেও নবনীতা দেবসেন যার উল্লেখ করতে ভোলেন না যৌন প্রসঙ্গের কবিতা হিসেবে , এবং মন্তব্য করেন “অত্যন্ত শক্তিশালী কবিতা, ভাষায় অথবা ভাবনায় অশ্লীল কবিতা নয়” ।

    জানতে ইচ্ছে করে, কবিতা সিংহ সে সময় কবিতা লিখে “অশ্লীল” অভিধা পেয়েছিলেন কিনা। নিজেদের ইচ্ছে, কল্পনা আর চাহিদার কথা লিখলে সচরাচর যেটা মেয়েদের প্রাপ্য। প্রশ্ন আর প্রশ্ন, নিজেকে প্রশ্নে প্রশ্নে বিক্ষত করে তার পথ চলা। কবিতা সিংহ এর পর লেখেন,

    কিছু কি আলাদা রাখো ?
    শমীবৃক্ষে, রমণী হে একা?
    সত্যকার এলোচুল, সত্যকার রমণীনয়ন
    সত্যকার স্তন ?
    খুলে রাখো নিজস্ব ত্রিকোণ ?
    তারপর চলে যাও বিরাট রাজার ঘরে –
    আহা যেন স্মৃতিভ্রষ্ট অজ্ঞাতবাসিনী
    খুলে রেখে চলে যাও সত্যকার শ্রোণী...
    শমীবৃক্ষে অস্ত্র খুলে রাখো
    খুলে রাখো রমণী ধরম
    কিম্পুরুষের সঙ্গে ঘটে যায় পৃথিবীর
    সমস্ত অফলা সঙ্গম। ( পৃথিবী দেখে না )

    লক্ষ্য করব, এখানে মহাভারতের চরিত্র ও ঘটনার সূক্ষ্ম ব্যবহার । কবিতা সিংহ উল্টিয়ে জামা পরার মত মহাভারতের বিখ্যাত অজ্ঞাতবাস পর্বের কাহিনিটিকে উলটো করে দেখান, ভেতরদিককে বাইরে আনেন, অর্জুনের কিম্পুরুষ বৃহন্নলার ছদ্মবেশধারণের কাহিনি থেকে ধার নেন নারীর নিজ সত্তা হারানো ও খুঁজে পাওয়ার কোয়েস্টকে । পুরুষ অর্জুনের সঙ্গে নারীর তফাত হল, সে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছে, নিজের সমস্ত সবলতার স্থানকে শমীবৃক্ষে লুকিয়ে রেখে এসে । নিজের যৌনতাকে ফিরে পেতে তাকে যুগ যুগান্ত বাহিত নারীবিষয়ক অপপ্রচারের অজ্ঞাতবাস ঝেড়ে ফেলে নতুন করে সক্ষম করে তুলতে হয় নিজেকে।

    এখানে লক্ষ্য করব মীথ পুরানের পুনর্ব্যবহারের নৈপুণ্য, আসলে মহাকাব্যের, পুরাণকথার, রূপকথার পুনর্নির্মাণে, বিনির্মাণে বাংলার মেয়েদের কবিতা ক্রমাগতই নতুন নতুন মাইলফলক স্পর্শ করে চলেছে গত পঞ্চাশ বছর ধরে।

    কবিতা সিংহের কবিতা কপটতা, আলতো প্রশস্তি, কুসুমপ্রস্তাব বিবর্জিত। “সারা দেহ ফালাফালা, ঢুকে গেছে জলের সোয়াদ/ টিনের তোবড়ানো মগে, কলকাতার কলঘরে/ উদোম সাগরে/ জলের নিকট হতে এ দেহের নিস্তার হল না/ জলে খালি দেহ মনে পড়ে (পর্নোগ্রাফি) দেহবোধের এই অনাড়ম্বর গভীর উচ্চারণ কবিতা সিং হের নিজস্ব।

    বয়সে বড় কবিতা সিংহের চেয়ে, রাজলক্ষ্মী দেবী (১৯২৭-২০০২) জীবনে ও লেখায় ছিলেন একইরকম আপোশহীন, আর নিজস্ব নারীসত্ত্বার নির্মিতিতে স্বয়ম্ভূ। সরাসরি যৌনতার কোন উল্লেখ অনেক নারীর মতই তারঁ লেখাতে আসেনি, নারীর কলমে অদৃশ্য পুরুষতন্ত্র অথবা নীতিবোধ রুচিবোধের চাপ থেকেই গেছে বরাবরের মত। কিন্তু প্রতীকে রূপকে তিনি বৈপ্লবিক, তাঁর সময়ের নিরিখে । তিনি অবশ্য-উল্লেখ্য , আমরা তাঁকে ভুললে খুব বড় ভুল করব। একটি একটি কবিতায় যে বিরাট বিস্ফোরণ তিনি রেখে গেছেন, সেটুকুর উদ্ধৃতিই যথেষ্ট তাঁর মননকে বোঝবার জন্য । হয়ত ফ্রয়েড পড়া শিক্ষিত মনন তাঁর , হয়ত বা আত্মদীপ হয়ে নিজেকে বুঝে নিতে পারার অলোকসামান্যতা তাঁর ছিল। তবু, ‘ঘোরানো সিঁড়ি’-র মত জটিল মনস্তাত্বিক কবিতা তার স্পষ্টতা নিয়ে আজো আমাদের স্তম্ভিত করে :

    মনের পেছন দিকে ঘোরানো সিঁড়ির খোঁজ কাউকে দেবো না।
    সেই সিঁড়ি বেয়ে শুধু রাতের কুটুম্বগুলি করে আনাগোনা।
    মনের পশ্চিম কোণে চোর কুঠুরির খোঁজ পেয়ে গেছে তারা,
    আর কেউ জানবে না, আর কেউ দেখবে না । সদরে পাহারা। ...

    মনের পেছনদিকে ঘোরানো সিঁড়িটা নামে কাণাগলি ঘেঁষে
    রাতের কুটুম্বগুলি চুপি চুপি উঠে আসে কত ছদ্মবেশে –
    নিয়ে যায় সোনাদানা, একদা যা-কিছু ছিলো মোটামুটি দামি।
    আনন্দে অস্থির হয়ে রোমাঞ্চিত অন্ধকারে জেগে থাকি আমি ।

    বাকি সখাদের প্রতি কবিতার মাঝামাঝি রাজলক্ষ্মীর উক্তি : “তোমরা রাত্রের এক বিশিষ্ট প্রহর এলে স্ব স্ব গৃহে যাবে,/ এবং যে যার দ্বারে হুড়কো এঁটে শুয়ে পড়বে সতর্ক স্বভাবে ।“

    পুরুষ আর নারীর সম্পর্কজটিলতার এই আশ্চর্‌য অভিজ্ঞান এসেছে এমন এক কবির কবিতায়, যিনি বেঁচে থাকলে বয়স হত ৮৪ !

    এর কিছু পর পরই দেবারতি মিত্রের আবির্ভাব। যৌনতার নারীকেন্দ্রিক বয়ান নির্মাণে এই মগ্ন ও অন্যথায় লিঙ্গ-নির্বিশেষ ও প্রশমিত শব্দব্যবহারের কবি অদ্ভুত এক স্বতঃস্ফূর্ততা রেখেছিলেন। যাকে অশ্লীল বলা চলবে না। চিত্রকল্পের আশ্চর্‌য কৃতিতে তাঁর রচনায় রতিক্রিয়া একটি দিব্যবিভা প্রাপ্ত হয়। ‘প্রিয়তম পুরুষটি এক পা একটুখানি উঁচু করে’ ...দিয়ে শুরু হয় কবিতা, এবং কিছু পরে ’ সুকুমার ডৌলভরা মাংসল ব্রন্‌জের উরু’ ‘ হঠাৎ সচল হয়ে ডাকে তরুণীকে’ – এই বর্ণনা আমাদের স্তম্ভিত করে , এবং মনে হয় পৃথিবী যেন পুনরাবিষ্কৃত হল। এর পরেও আর কোন লেখায় সম্ভব হল না এমন বর্ণনা : যেখানে মেয়েটি “অসম্ভব অনুরক্তা শিশুসুলভতা নিয়ে/ অচেনা আশ্চর্‌য এক লালচে কিসমিসরঙা/ ফুলের কোরক মুখে টপ করে পোরে, / মাতৃদুধের মত স্বাদু রস টানে/ ক্রমে তার মুখে আসে/ ঈষদচ্ছ অনতিশীতোষ্ণ গলা মোম/ টুপটাপ মুখের গহবরে ঝরে পড়ে/ পেলিকান পাখিদের সদ্যোজাত ডিম ভেঙে জমাট কুসুম নয়/ একটু আঁষটে নোনতা স্বচ্ছ সাদা জেলি “ ( পৃথিবীর সৌন্দর্য একাকী তারা দুজন)

    এই চিত্ররূপময় বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে কেন, বিশ্ব সাহিত্যেই দুর্লভ বলে মনে হয়। অথবা যদি দেখি আর একটি কবিতাতে :
    আমার দারুণ লোভ হয়েছে/ তুমি আমার খুব ভিতরে চলে আসো/ নিবিড় গোপন ভ্রূণ আমার জরায়ুতে বাড়ো/ আমি তোমায় লালন করি/... আমার প্রতি রোমকূপের স্নেহ তোমায় ভিজিয়ে রাখুক। (স্তব, আদর, পাগলামি কিংবা যাহোক কিছু)

    এমন তন্নিষ্ঠ ডিটেলিং কবিতাকে ব্যক্তির স্তর থেকে শিল্পের স্তরে নিয়ে গেছে। আর , আমার মতে, এর ফলেই বাংলা কবিতায় নারীকেন্দ্রিক যৌন কবিতার একটি স্পষ্ট পরিসর তৈরি হয়। এ নিয়ে কথা বলার পরিসর তৈরি হয়। আমাদের কাছে একটি বিষয় আসে। মেল গেজ ফিমেল গেজ-এর ধারণাকে তখন কেবল বিদেশ থেকে ধার করে আনা একটি থিম বা বিষয় , বা আমাদের চিন্তাপ্রক্রিয়ার উপরে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ব্যাপার বলে কোন কুযুক্তি মাথা তুলতে পারে না।


    “ইচ্ছে হয় বিষ খেয়ে মরে যাই । একেবারে মরে যাই। এই জগৎ বড় নিষ্ঠুর , এই জগতে মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়ার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভাল। বড় ইচ্ছে করে আমার, হঠাৎ একদিন ঘুম থেকে উঠে দেখতে পাব ছেলে হয়ে গেছি। কোন বেঢপ মাংস পিন্ড নেই বুকে । ফিনফিনে শার্ট পরে যেমন ইচ্ছে ঘুরে বেড়াব। টৈ টৈ করে শহর ঘুরে সিনেমা দেখে বিড়ি ফুঁকে বাড়ি ফিরব রাতে। মাছের সবচেয়ে বড় টুকরোটি মা তুলে দেবেন পাতে, আমি ছেলে বলে, বংশের বাতি বলে। “ – তসলিমা নাসরিন, আমার মেয়েবেলা।

    নারীবাদের সবচেয়ে প্রচলিত মুখটিকে বাঙালি পাঠকের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা তসলিমা নাসরিনের কাছে ঋণী। ১৯৯০ –এর দশকটির শুরুর দিকে এই লেখাগুলি পাঠকের কাছে নারীবাদকে নতুন করে জনপ্রিয় করে তুলেছিল। অবধারিত ভাবে উঠে এসেছে, নারীবাদ সম্বন্ধে প্রশ্ন, ধর্ম দেশ কাল জাতি শ্রেণি নিরপেক্ষ এমন কোন নির্যাসিত নারীত্বের খোঁজ পাওয়া কি সম্ভব, যার সঙ্গে জগতের প্রতিটি নারীই একাত্ম হতে পারেন?

    নারীবাদের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখব, সময় ও কালের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টেছে নারীর সত্য। ষাটের দশকের উদারপন্থী আমেরিকায় পরিবারের সীমায় নারীবাদের কথা বলেছিলেন বেটি ফ্রিডান। তার আগেই সিমোন দ্য বভোয়ার জানিয়েছিলেন, আমর মেয়ে হয়ে জন্মাই না, মেয়ে হয়ে উঠি। সমাজ আমাদের মেয়ে বানায়। কেট মিলেট, শুলামিথ ফায়ারস্টোন, জার্মেন গ্রিয়ার, রবিন মর্গানদের মত অতিনারীবাদী বা র্যা ডিকালদের বক্তব্য আরো তীব্র। তাঁরা বলেন যৌন স্বাধীনতার কথা। বিভাহ সম্পর্ক এক শিকল, এবং অবরুদ্ধ শরীরকে মুক্তি দেওয়ার জন্য নারীকেও হতে হবে যৌনভাবে সক্রিয়। রবিন মর্গান প্রথম সৃষ্টি করেন প্রথাগত পুরুষকেন্দ্রিক “হিস্ট্রি” শব্দটিকে পাল্লা দেবার নতুন শব্দ, “হারস্টোরি”। নতুন করে বলা হয় সিস্টারহুডের কথা, বলা হয় মিস্টারের বিকল্পে মিস ও মিসেস এর বাইরে MS এর প্রয়োজনের কথা।

    ৬০ ও ৭০ দশকে যে বিষয়গুলি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়ে গেছে , ৮০ র দশকে আমাদের এই উচ্চাকাঙ্খী উদারনৈতিক বঙ্গসমাজে সেসব এসে পৌঁছয় মার্কিন মুলুকের ( বা কনটিনেন্টও হতে পারত) থেকে পারফিউম, সসেজ সালামি ও নানারকম চিজের সঙ্গে আমাদের ডায়াসপোরিক বোনেদের হাত ধরে। এসেছিল কিছু লেখাপত্র, পূর্বেকার সমস্ত দেশজ নারী আন্দোলন ও মূল সম্পৃক্ত নারীতত্ত্বায়নের বাইরে একটা নতুন হাওয়ায় সওয়ার হয়ে। সেই নব্য, সংবাদ বা দৃশ্যমাধ্যম সহায়িত সেলিব্রিটি নারীবাদের মুখ তসলিমা নাসরিন নতুন নারীবাদের মোড়কে উপস্থাপিত করলেন ইতিমধ্যেই পাশ্চাত্যে প্রচলিত নারীবাদের চকোলেট। “ছেলেবেলা” কে “মেয়েবেলা” দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা, পুরুষ “রক্ষিত” বা “পতিত”আবিষ্কারের আমূল কৃতিত্ব তাই তাঁকে দেওয়া যায়না। তবু অনস্বীকার্য যে “মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে অপিয়াম খেয়ে মরে যেতে” এমন নাটকীয় ভঙ্গিতে নাসরিনের প্রথম কলাম পুস্তিকা “যাবো না কেন, যাবো!” আত্মঘোষণা ১৯৯২ সালে আমাদের উত্তেজিত করেছিল। বাংলাদেশে প্রকাশিত বইটির পাতায় পাতায় “বিস্ফোরণ”।

    পাতায় পাতায় নির্লজ্জ আত্মকথন। “আমি মরে গেলে আমার নিন্দুকেরা নিতম্বে তালি বাজিয়ে হাসবে। আমার শুভার্থীরা কদিনা র একলা দুপুরে ভাল না লাগায় ভুগবে? বেশিদিন নয়।“
    “আমি আজ খুব স্বার্থপরের মতো আমার কথা বলছি। আমি কারো কাঁধে ভর দিই না বলে প্রশস্ত এবং অপ্রশস্ত দুরকম কাঁধওয়ালা পুরুষই কম দুশ্চিন্তা, কম অপমান এবং কম লাঞ্ছনায় ভোগে না।“
    “আমি এ কথা খুব স্পষ্ট করেই জানি যে, এই শহরে আমার যোগ্য একটি পুরুষও নেই। যে পুরুষের দিকে আমি তাকাই, কোনও না কোনও দিক থেকেই তারা আমার তুলনায় তুচ্ছ, অপ্রকৃষ্ট। ... এই শহরে আমার প্রতিভা ধারণ করার যোগ্যতা কোনও পুরুষেরই নেই। আমার মেধা ও মননের অগাধ সৌন্দর্য গ্রহণ করার শক্তি নেই কারও। “ উচ্চকিত অতিকথন সত্ত্বেও তসলিমা এক ইতিহাসের মুখপাত্রী। ১৯৯২ তে কলকাতায় প্রকাশিত হয় “নির্বাচিত কলাম”।

    এর পর বইটি আনন্দ পুরস্কার পায়। পুরস্কারের প্রতিভাষণে তসলিমা বলেছিলেন, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থাও আসলে পুরুষেরই তৈরি, তার যোগ্য অঙ্কশায়িনী তৈরি জন্য।

    ঠিক ভুল বিচারের বাইরে, একটি ঘটনা ঘটে গেল। তসলিমা প্রমাণ করলেন, ভাষার কাজ কেবল যুক্তি সংগঠন নয়, ভাষা আবেগেরও বাহন। লজ্জা ভেঙে বেরোবার জন্যেও ভাষা ব্যবহৃত হয়।

    আমাদের এ লেখার বৃত্ত অবশ্য ছোট, অপ্রাসঙ্গিক নয় বলেই এতগুলি কথা বলতে হল। আমরা এখন কথা বলছি বাংলা কবিতা নিয়ে। এই নতুন মোড়কের নারীবাদ অনেকগুলি পুরনো ইস্যু বা চাপা পড়ে যাওয়া কর্মসূচীকে সামনে আনলেও যেটা এর ফলে ঘটল তা হচ্ছে নারী পুরুষ সম্পর্কের একটি মাত্র দিকের উপরেই আলোকপাত ঘটল বেশ কিছুদিন ধরে।

    কবিতায় এই ভাষা শানিত ও তীক্ষ্ণ, কখনো বা রাজনৈতিকভাবে সঠিক নয়। কিন্তু উচ্চকিত এই কন্ঠ সহজেই নজর কাড়ে। তাঁর কবিতায় পুরুষ কেবলি অত্যাচারীর ভুমিকায়। প্রেমিকের ভূমিকা তাকে দেওয়া হয়নি।
    ‘মানুষ দেখো, মানুষ শোন চতুর্দিকে ঘিরে/ ওরা আমার সুডোল বাহু, কবজি কেটে নেবে/ ওরা আমার জিহবা কেটে উদর ফেঁড়ে উপড়ে নেবে চোখ/ কন্ঠনালী চেপে আমার শিরায় দেবে বিষ .../ বন্য মোষ, সাপ ও শার্দুলের ভয়ে নয়/ মানুষ হয়ে মানুষ ভয়ে দৌড়ে ফিরি ঘর ।‘ ( শাসন)

    ‘তাকে লাল রঙ জামা পরানো হয়/ কারণ লাল একটি চড়া রঙ, সহজে চোখে পড়ে। /... তার কান ছিদ্র করা হয় , একই সঙ্গে নাকও ।/ সেই নাক ও কানে পরানো হয় ধাতব পদার্থ/ নিজস্ব দ্যুতি কম বলে ধাতু অথবা পাথরের দ্যুতি যেন তাকে আলোকিত করে।/ তার হাতে চুড়ি পরানো হয়/ অনেকটা হাতবেড়ি, অনেকটা শিকলের মতো এর আকার।/ ... তার মুখে রঙ লাগান হয়/ যেন কোন জড়বস্তুর উপর রং।/...একটি মানুষকে এভাবেই পণ্য করা হয়। ‘( চক্র)

    একটি ছদ্ম নির্মাণপদ্ধতি বলার ছলে তীব্র শ্লেষের জন্ম দিয়ে কবিতাটি সফল নারীবাদী কবিতা। এই তীব্র অভিঘাত সৃষ্টিকারী বাচনের ফলেই ষাটের দশক পরবর্তী নতুন জোয়ারের নারীবাদের মার্কিনি মোড়কে মজে থাকা বাঙালি পাঠক ( পড়ুন পাঠিকা ) তসলিমাকে গ্রহণ করেছিলেন দু হাত বাড়িয়ে। সময়ের প্রয়োজনেই এই আমদানি। তাঁদের ততদিনে পড়া হয়েছিল সিমোন দ্য বভোয়ারের সেকেন্ড সেক্সের কয়েকপাতা , অথবা রবিন মর্গ্যানের পার্সোনাল ইজ পলিটিক্যাল স্লোগান। কিন্তু তাঁরা ভুলে গেছিলেন কবিতা সিঙ্ঘের কবিতা, সাধনা মুখোপাধ্যায়, বিজয়া মুখোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবীর জোরালো অভিভাষণ। তাঁদের কিন্তু কখনো
    খুঁটিয়ে পড়া হয়নি বেগম রোকেয়া বা অশোকা গুপ্তা রমা চৌধুরীর লেখা। জানা হয়নি সওগাত পত্রিকার দীর্ঘ পরিক্রমার কথা।
    অথবা জয়শ্রী , মন্দিরা, স্বাধীনতা, ঘরে বাইরে পত্রিকাগুলির ইতিবৃত্ত। স্বাধীনতাপূর্ব অবিভক্ত ভারতের যে সব নারীর রচনা আমাদের অলক্ষ্যে, আমাদেরই বিচরণভূমিটিকে কন্টকশূন্য করে তোলার নীরব চেষ্টায় ছিল। ধারাবাহিকতা কোনদিনই আমাদের প্রিয় অভ্যাস নয়। চিরদিন জনমানস তুবড়ির রোশনাইয়ে মেতেছে, কখনো দেখতে চায়নি সব চোখের অন্তরালে সলতে পাকাবার কাজটুকু।
    কাজেই নারীবাদকে এক নতুন হাউইয়ের মত করে ফেটে যেতে যখন আমরা দেখছি নব্বই পরবর্তী আমাদের “গ্লোবালাইজড” মুক্তবাজার অর্থনীতির আকাশে, তার বহু আগে থেকেই জমি প্রস্তুতির ইতিহাসটুকু আমরা ভুলে যেতেই পারি।

    তসলিমার নারীবাদের ঘরানায় একভাবে, লক্ষ্য করছি, আছে পুরুষদৃষ্টির ঘেরাটোপ। ভুল ঐকাত্ম্যকে ঘুরিয়ে দেবার কোন প্রয়াস নেই সেখানে। ঘরানায় যে ভঙ্গিটি জোর পায় তা দোষারোপ, প্রতিবাদ, পুরুষতান্ত্রিক সমাজের অন্যায় অত্যাচার লাঞ্ছনার জন্য ব্যক্তিপুরুষকে দায়ী করা, চীৎকৃত বিরুদ্ধাচরণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে বিষয়ী করতে পারে না, সচরাচর বিষয় হিসেবেই মেয়েরা দৃষ্ট হয় : পুরুষের পণ্যায়ন, ভোগ, ধর্ষণ, অত্যাচারের বিষয়। অর্থাৎ আবার ঘটনার রাশ চলে যায় পুরুষের হাতে, নিয়ন্ত্রণের রশিটি থাকে পুরুষের জিম্মায়।

    এখানে আমরা আলোচনা করছি না, বাস্তবে কী পরিস্থিতিতে মেয়েরা নিজেকে দেখতে পান , কত শতাংশ ক্ষেত্রে মেয়েদের হাতে জীবনের রাশ থাকে , কত শতাংশ ক্ষেত্রে পুরুষের হাতে, সেই সংখ্যাতত্বটি। আমরা আলোচনা করছি বাংলা কবিতায় মেয়েরা নিজেদের কী ভাষাশব্দে প্রতিষ্ঠা দেন সেই “রূপায়ণ” বা “প্রতিনিধিত্ব” নিয়ে। লক্ষ্য করব, এখানে বাংলা কবিতার একটি বেগবতী ধারা বহু আলোচিত হয়েই সজোরে নিজেদের অস্তিত্ব বিস্তার করেছে। কৃষ্ণা বসু বা মল্লিকা সেনগুপ্ত সত্তরের শেষ থেকে আশির দশকের শুরুতেই এই কাজটি শুরু করে দিয়েছিলেন এবং এখনো নিষ্ঠাভরে করে চলেছেন । ব্যঙ্গ , তির্যকতা, শ্লেষ, বঙ্কিমতা সবকিছুর আধারে প্রতিবাদ ক্রমাগতই নারীর বিষয় মডেলকে নিয়ে প্রশ্ন তুলে চলেছে।

    “নারীর জরায়ুজমি লাঙল চাইছে
    যদি অসমর্থ হই, ভাড়া করে, নিয়োজিত করে
    অথবা যে কোনভাবে বীজ এনে দেব “

    ছদ্ম পুরুষকথনে সীতায়ন-এর লেখক অন্যতম বলিষ্ঠ কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের এই “পান্ডুর পুত্রাকাংক্ষা” তীব্র শ্লেষের সঙ্গে পুরুষতন্ত্রের বয়ানটিকে স্পষ্ট করেছিল, একইসঙ্গে আমাদের সামনে এসেছিল সমাজতত্বের অধ্যাপিকা মল্লিকার সুসং হত পাঠ অভ্যাসের প্রমাণও। তাঁর মার্ক্স সাহেবকে উদ্দিষ্ট কবিতা, পামেলা বর্ডেসের সঙ্গে পুরাণের বেশ্যাদের একীকৃত করা কবিতাটি, বা “ছেলেকে হিস্ট্রি পড়াতে গিয়ে “ কবিতায় “তাহলে হিজড়ে ছিল ইতিহাসবিদ ? “ অসামান্য কাজ।

    কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে একটা জিনিশ আমাদের অজান্তে ঘটে যায়। মেয়েকেন্দ্রিক যৌনতা নির্মাণের থেকে সরে গিয়ে আমরা মেয়েদের আবার দেখি পুরুষের অধিকৃত ও বিষয়ীভূত হতে। নিন্দাচ্ছলেও বার বার দাগা বুলনো হয় পুরুষের প্রাধান্যের উপরেই । আমরা পুনর্বার বঞ্চিত খন্ডিত ও বিষয়ীভূত বোধ করি। মেয়েরা হারায় নিজের পায়ের তলের মাটি। হয়ত তা আবার তাকে অধিকার করবার ছলেই...

    “মশারি গুঁজে দিয়ে যেই সে শোয় তার
    স্বামীর কালো হাত হাতড়ে খুঁজে নিল
    দেহের সাপব্যাং, লাগছে ছাড় দেখি
    ক্রোধে সে কালো হাত মুচড়ে দিল বুক
    বলল, শোন শ্বেতা, ঢলানি করবে না...”(স্বামীর কালো হাত)

    এই চিত্র বাস্তবোচিত, বলা যেতে পারে অতি রূঢ় বাস্তব, ফিল গুড নয়। । তবু, আক্ষেপ একটাই, কবিতাটি স্বপ্ন কল্পনার কাছে নিজেকে সঁপে দেয় না , একইসঙ্গে, এ কবিতা নারীকে ক্ষমতায়িতও দেখতে চায়না। লিঙ্গরাজনীতির ভেতরেই প্রোথিত রাখে, কোন উত্তরণ দেয় না।

    তবু, অবধারিতভাবে লিঙ্গরাজনীতি মূল বিভাজক তো শরীর। পুরুষ নারীর ভেতরের যাবতীয় বৈষম্যের শেষ নির্ধারক যেহেতু শরীর, তাই বৈষম্যের কথা বলতে গেলে শরীরের কথা তো বলতেই হবে। আর সেটা বলবে কে? যে এই বৈষম্যের রিসিভিং এন্ড এ , সেই নারীই তো? অতএব, নারী লেখক বা কবিকে, অন্তত একবারের জন্য, পুরুষের আধিপত্য ও অধিকারের ক্ষেত্র হয়ে ওঠা এই শরীরের উল্লেখ করতেই হয়। ফলত তাঁর ব্যক্তিগতের অকাতর উচ্চারণ। তাঁর যৌনতার অনবদমিত আত্মপ্রকাশ।

    যৌনতার অবধারিত আত্মপ্রকাশ হিসেবে যদি ধরি নারীর মাতৃত্ব সক্ষমতার , এবং মাতৃত্ব অনুভূতির প্রসঙ্গটি, যদি ধরি, তাহলে মল্লিকা সেনগুপ্তের অসামান্য কিছু কবিতা রয়েছে কাচিজাতক সিরিজে, সন্তান জন্ম বিষয়ে এত অথেনটিক, সহজ এত গভীর অনুভূতির কবিতা বাংলা সাহিত্যে আগে আসেনি। সেই লেখাগুলির জন্য আমরা আলাদা করে তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকি, যদিও এই লেখার মনোযোগের বিষয় সেটি নয়। আজ পর্‌যন্ত লিখিত মেয়েদের কবিতায় মাতৃত্বের রূপের নানান মননঋদ্ধ প্রকাশ নিয়ে আলাদা করে একটি আলোচনার দাবি রাখাই যেতে পারে। আমরা এই নিবন্ধে এখনো পর্‌যন্ত দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখেছি কবিতায় নারীর আত্মনির্মাণে শরীর ও যৌনতার অনবদমিত প্রকাশ বিষয়ে। সেখানেই থাকতে চাইছি।

    তসলিমা তাঁর সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন তিনি আজও কবিতায় নারীর নিজের যৌনবাসনার কথা লেখেননি – সেটা হয়ত ভবিষ্যতে কখনো লিখবেন। প্রতিবাদী নারীবাদের চরিত্র বড় একপেশে আর খন্ডিত বলেই মাঝে মাঝে পুরনো পুরুষকেন্দ্রিক বিশ্বধারণাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেয় তা, কোন বিকল্প সুষমাময় সামঞ্জস্যপূর্ণ জগতের কথা শোনায় না... সমকামিতার মডেল বাদ দিয়ে বিষমকামিতা বা হেটেরো সেক্সুয়াল রুচিপছন্দের জন্য আশাপ্রদ কিছুই থাকে না তার হাতে।



    কাটাকুটি খেলতে গিয়ে বরাবর ভুল ঘরে ভুল গোল্লাগুলি
    বসিয়েছ । দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেয়েছ নিজের দুই ঠোঁট।
    জ্যান্ত শুক্রবীজগুলি মুখে শুষে নাও আজ আর থুৎকারে
    থুৎকারে ছুঁড়ে ফেলে দাও প্রাণহীন মরা –কুকুরের মতো।
    সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, শুক্রস্থান

    উল্টোদিকে কিন্তু এই একই কালখন্ডে বেশ কিছু মেয়ে রচনা করে চলেছিলেন তাঁদের নতুন প্রকল্পিত সমাজ সংসার। যেখানে পুরুষের বঞ্চনাভার ছিল, কিন্তু তা থেকে মুক্ত এক মুক্তাঞ্চলও ছিল, স্বপ্নে, কল্পনায়, বাস্তবে, পরাবাস্তবে।

    চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতায় প্রতিবাদ থাকলেও , বিকল্প পৃথিবী গড়ে দেওয়ার চেষ্টাও ছিল। যেমন ছিল সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ে। নিজস্ব যৌনতাকে শমীবৃক্ষের মাথা থেকে পেড়ে এনে এঁরা আবার অঙ্গে পরেছেন। পেরেছেন পুরনো নিজস্ব খন্ডিত আইডেন্টিটিকে ফিরে পাওয়ার খেলাটা। এঁরা নিজের ঘর খুঁজে নিয়েছেন লেখবার... একটা আস্ত ঘর না হলেও একটা আস্ত লেখার টেবিল হাশিল করেছেন। ভার্জিনিয়া উলফ কথিত রুম অফ ওয়ান’স ওন এঁদের সুশিক্ষিত মগজে গেঁথে গিয়েছিল বলেই হয়ত বা।

    যার কোন উত্থানপতন নেই, আমি সেই
    ছাতাপড়া অঙ্গটিকে গড় না করতেই পারি
    যদ্যপি সে আমার স্বামীর।
    শেষ জলবিন্দুটিকে, নিঃশেষ, না পাই, তো
    যাঞচা করতে পারি অন্য মেঘ
    যদি অহল্যাও হই, ইন্দ্রের কাছে যাব, বার বার
    পাষাণ হব না । ( চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, একটি শারীরিক কবিতা)

    লক্ষ্য করব এই বাচন অপেক্ষাকৃত অনুচ্চকিত, এবং বিকল্পের খোঁজে তৎপর। বিষয়ের খোলশ ছেড়ে নারীর বিষয়ী হয়ে ওঠার প্রক্রিয়ায়, সক্রিয় নারীকেন্দ্রিক যৌনতার ছবির আর একটি দেখি :

    এ মুহূর্তে মেয়েটি নিজেকে ভুবনেশ্বরী বলে বোধ করে।
    কেননা নিজেকে সেই এইমাত্র একটি পুরুষকেন্দ্রে স্থাপন করেছে।
    নাসাপথে ধূম ও আগুন, ললাটে স্বেদবিন্দু
    ... এইবার সব তার নিয়ন্ত্রণমত। ( চৈতালী চট্টোপাধ্যায়, ভুবনেশ্বরী )

    চৈতালীর লেখায় পুরুষের সদর্থক ভূমিকা থেকে থেকেই ঘুরে গেছে অত্যাচারী , বিষয়ী ভূমিকায়। দ্রুত পাশ বদল ঘটেছে। একইসঙ্গে লেখায় আড়াল রেখে ক্রমাগত মেয়ের দিক থেকে মেয়ের ভেতরকার বদল তিনি আঁকেন, ‘হাসপাতালের দিকে’ কবিতায় যেমন “সিটি দিত ছেলেরা। কাঁদতাম আর পানপাতায় মুখ ঢেকে চুল্লিতে উঠতাম শুধু।‘ এই পর্‌যায় থেকে মেয়েটি এসে পৌঁছয় “আমি ডাইনি হয়ে উঠলুম”-এ... আর শেষ পর্যন্ত “হাসপাতাল এখন আমার বুকের ভেতরে” । অথবা “আর সে মেয়েটিও ভিড়ের চেয়ে ভিড়ে একলা জেগেছিল দেড় বছর/ ফরসা রোগা-মুখ ছেলেটি তাকে খুব কুয়াশা দিয়েছিল দেয়নি ঘর/কী হল তারপর? মেয়েটি ধীরে ধীরে শামুক হয়ে গেল ভিজে মাটির...”(অতি ব্যক্তিগত) বিষয় হয়েই এখানে থাকে মেয়েটি, হয়ত আঘাত পেতে পেতেই বিষয়ী হয়ে উঠতে চেষ্টা করে, আর সেই লড়াইয়ের পথটিই লেখেন কবি।

    কবিচারিত্র্যে বেশ পৃথক হলেও , নারীর নিজস্ব বিশ্ব নির্মাণে অনলস সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিড়ালী- এই রূপকে এনেছেন পুরুষ শিকারের খেলাকে :
    আমিষ আহার ছাড়া কিছু ভাল লাগে না জীবনে।
    আঁশগন্ধ জড়িয়েছে পক্ষ্ম, ভুরু, যৌনকেশগুলি।
    তোমাকে দুহাতে ধরি, আর মনে হয়
    মাছ যেন খেলা করছে আঁজলার জলে। (সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিড়ালী)

    সংযুক্তা কিন্তু বেশি দুরূহ, রূপকপ্রিয়, দার্শনিক , অনেকটাই মিথপুরাণ নির্ভর। পুরুষকে তিনি মহাথের, ডন , স্থবির ও রাতের রাজা বলে একইসঙ্গে বর্ণনা করতে পারেন। বর্ণনা করেন নখদাগ ও দংশন, বলেন, মেরেছ লাথি, হারাইনি তো বাবুর শ্রীচরণ ( কুট্টিনীবিলাস)।

    যৌনতার প্রশ্নটিকে নানাভাবে তিরবিদ্ধ করে করে অনেক পথ অতিক্রম করেছিলেন সুতপা সেনগুপ্ত । শুরু থেকে কখনো কেবল অত্যাচারিত নারীর মূর্তি তাঁকে টানেনি। ‘বাংলার ফেয়ারনেস’ কবিতাটিতে যদ্যপি নারীবাদীদের পরিচিত এক শ্লেষাত্মক মূর্তি আমরা পাচ্ছি,
    পৃথিবীতে আর কোন কালো মেয়ে থাকবে না কখনও/গৌরী সেন ক্রিম মেখে প্রত্যেকেই তুখোড় গোলাপি/যেসব পুরুষ খোঁড়া, বংশে খুঁতো,/যেসব উন্মাদ,কিংবা ডিভোর্সি, অথবা দোজবরে/...এমন পাত্রের জন্য কালো কালো মেয়ে/কীভাবে সাপ্লাই দেবে আমার সমাজ?

    এইধরণের কবিতার পাশেই কিন্তু পুনর্নির্মাণের একটি কর্মসূচী তিনি আপন হাতে নিয়ে ফেলেছেন। যেমন ‘কৃষি’ কবিতায় বলেছেন, প্রচলিত যৌনতাধারণাকে প্রশ্ন করেঃ

    প্রয়োগকালের কথা ভুলে গিয়ে এসেছি মাটিতে
    লাঙল ও ফলার আভায়
    দেখেছি শ্রাবণ এক পরিশ্রমশরীরের তলে
    নেচে নেচে উঠেছে মাদলে
    যেন হরিদ্রার ক্ষেতে লেগেছে আগুন তার
    অনির্বাণ প্লাবনের স্রোতে...

    শেষ পর্যন্ত সুতপা সেনগুপ্ত তাঁর “ছোকরা ছোকরা শ্যামরায় বাই” বইটিতে এসে পৌঁছলেন, আগেই বলেছি, নারীর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া দৃষ্টির এক চূড়ান্ত শীর্ষে : খেলা ও খেলুড়িপনার মজা , যার ভেতরে শ্লেষ কম, আমোদ কম, আহ্লাদ বেশি। যা সোজা ও সরল যতটাই , ততটাই চিত্রকল্প বিধুর। তার ভেতরে অত্যাচারী পুরুষকে আর খুঁজেই পাওয়া যাবে না কোথাও।
    ‘কতদিন পরে আমি আবার বরাত পেয়ে শেখাচ্ছি সমস্ত সূক্ষ্ম কাজ/ হাঁটু গেড়ে বসে , ফের/দাঁড়াচ্ছ খাপখোলা উঠে/ধাঁধালাগা শান/ গলে যাচ্ছি ডাঁটো হচ্ছ ধারালো ফলার মত এস্‌পার ওস্‌পার/ দুমড়ে ফেলছি টেনে তুলছি কত কষ্টে কী কষ্টে যে তৈরি করছি পুরুষ শ্যাম রায়। ‘

    এই বাচন আমাদের অপরিচিত, এই বাচন পুরুষকেন্দ্রিক পৃথিবীর পক্ষে বিপজ্জনক ও সাংঘাতিক। পংক্তিগুলি খেলাকে ঘুরিয়ে দিতে চায় বলে সাংঘাতিক, মেয়েটিকে এখানে পুরুষের “শাসন”-এর বাইরে বের করে আনে বলে সাংঘাতিক, প্রচলিত যৌনতার ধারণাকে তুচ্ছ করে বলে সাংঘাতিক। আমরা এখানে শব্দ ও ভাষার মাধ্যমে একটি ভাঙচুরকে প্রত্যক্ষ করি, যে ভাঙচুর চিন্তার সুতোয় আগুন ধরিয়ে দিতে সক্ষম। জীবন ও জীবিতের ক্ষেত্রে পুরুষের কৃত নারীর প্রতি লক্ষটি ধর্ষণ , লক্ষটি দুর্ব্যবহারকে মিথ্যা করে দিতে, অর্থহীন করে দিতে সক্ষম। এটি একটি অ্যাটিচ্যুড , যা কবিতার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত এবং প্রতিবাদের চাইতে অনেক বেশি সদর্থক ও কার্যকরী। কারণ তা নারীকে প্রতিষ্ঠা দিতে চায় , আবার , সেই বিষয়ীর ভূমিকায়, তাকে ক্ষমতাময়ী করে তোলে।



    পুরুষ তোমার বুক পাষাণের মতো
    শুতে দাও শুতে ইচ্ছে করে।
    পাষাণে ঘষেছি মুখ, কী ভীষণ ক্ষত
    ওষ্ঠাধরে !

    মন্দাক্রান্তা সেন , পাষাণ

    প্রথম প্রতিক্রিয়া যদি হয় ইচ্ছা বা বাসনার, দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়া অবশ্যই হতাশা ও ব্যথা। এভাবেই কি বার বার নারীদৃষ্টি পুরুষের সঙ্গে সমঝোতা করছে? দোলাচলের ভেতরে দাঁড়াচ্ছে এসে? কিছুতেই মনস্থির করতে পারছে না, চাওয়া আর পাওয়ার ভেতরে বিস্তর ফারাক থেকে যাচ্ছে ক্রমাগতই?

    হয়ত। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এই অনিবারয সংলাপটি আরো আগ্রহোদ্দীপক হয়ে ওঠে, কারুর কারুর চোখে আরো বেশি যৌনক্ষুৎকাতরও, হয়ত বা বেশি পণ্যায়িত, পণ্যমুখীই। হয়ত এখন আমরা সকলেই অল্পবিস্তর ক্রেতা বলে, নারীপুরুষ নির্বিশেষে প্রেমকে একরকমের সহজপ্রাপ্য পণ্য হিসেবে দেখা সম্ভব হয়েছে। বিদ্বেষের জায়গা নিয়েছে কৌতুক, অথবা বঞ্চনাবোধের জায়গায় পড়ে আছে কিমিতির বোধ।

    ‘যেই তুই তোর কপালে লাগালি শ্রীযোনি/তৃতীয় নয়নে আলো জ্বলে ওঠে তখনি/ আলো ? না আগুন? পুড়ে হলি তুই ভস্ম / দেবী কেড়ে খায় ভক্তের সর্বস্ব !’ ( মন্দাক্রান্তা সেন, প্রেম)

    এখানেও খেলা উলটে দিতে চাওয়া মেয়েটির । এখানেই ইচ্ছার প্রাধান্য, এখানেই ইচ্ছার জয়। অবাধ্য মেয়ে হিসেবে যে হৃদয়কে দেখে সেই কবিই পারে বলতে, ‘লজ্জা ঘেন্না ভয় ছেড়ে জড়িয়েছি ইচ্ছে ইচ্ছে ওম/ সে ইচ্ছে আমরি , কিন্তু আজও তাকে পুরোটা চিনিনি।‘ (মন্দাক্রান্তা সেন, অসৈরণ ) পুরুষতান্ত্রিকতা থেকে ঘুরে যেতে বিপরীতমুদ্রায় তার অগাধ বিশ্বাস, আত্মবিশ্বাসও। সেজন্যই লেখা হয় এমন কবিতা : ‘মধ্যরাত্রি, আমি দুরন্ত অশ্বারোহিণী/ অশ্ব আমায় ধারণ করেছে একটি শর্তে। পথে নয় , তাকে চালনা করব ঘূর্ণাবর্তে/স্পর্শমাত্র কাঁপছে শরীর তীব্র হ্রেষায়/মহাবেগে তাকে ছুটিয়ে দিয়েছি কী অন্বেষায়! /ছুটতে ছুটতে খসে গেল তার ছিন্ন লাগাম/ কেশর ধরেছি আঁকড়ে, কেশরে অজস্র ঘাম/অশ্ব আমার বাধ্য অথচ নিজের ইচ্ছে-/মতোন আমাকে মারছে আবার বাঁচিয়ে দিচ্ছে/ অশ্ব নিজেও মরছে বাঁচছে আমার সঙ্গে/ উঠছে পড়ছে জীবন মৃত্যু শ্বাসতরঙ্গে/ গতি উদ্দাম, গতিতে ক্রমশ আগ্নেয় ধার/ কী নিঃশব্দে কাটছি দু’পাশে কঠিন আঁধার !” এই কল্পকাহিনির ছত্রে ছত্রে লেখা আছে যৌনতা, অথচ অশ্লীলতা থেকে বহুদূরে কবিতার দেশে যাত্রা করেছে এ কবিতা , নিঃসন্দেহে। প্রতীকের নিপুণতায় বৃত্তটি সম্পূর্ণ করে দেয় কবিতাটি শেষ পংক্তিতে এসেঃ ‘আহ্‌ কী মৃত্যু... কী আরাম এই ধ্বংস হওয়ার -/ অশ্ব আমাকে বলেছিল : তুই দারুণ সওয়ার ! ‘ মন্দাক্রান্তাকে বসিয়ে দেয় “কয়েক মুহূর্তে” কবিতার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পাশে।

    মিতুল দত্তর কবিতাতেও শরীর, শরীর, শরীরের উপস্থিতির অনিবারযতা, কিন্তু এই প্রতিনিধিত্ব গভীর জটিল, পুরাণময়।

    চলো এই অন্ধকারে মেধার ফলন হোক
    বদ্ধ আমাদের, চলো, অজ্ঞতা গোপন করি
    জ্ঞানের গভীরে রাখি মধু ও মদের চক্রদোষ
    চলো আজ পুরুষাঙ্গ হাতে নিই, নারীর শালীন
    শাড়ির আড়াল থেকে খুলে নিই তোমাকে গোপন...
    ( মিতুল দত্ত, নষ্ট জন্ম, নষ্ট প্রেম)

    কিছুটা জটিলতা থাকলেও মিতুলের কাব্যশরীরের পরিণতি এত বেশি যে তা আমাদের সম্মোহিত করে রাখে। “যে সমুদ্রে যাবে তুমি সেখানেই জাহাজের লাশ/ ভেসে উঠবে, ডুবে যাবে ... ছেঁড়া ন্যাকড়ার মত দ্বীপ/ ...যথেষ্ট ভয়ের কথা সে মাছ শুধুই হাড় খায়/ মানুষ না, জাহাজের অনর্গল লোহাময় হাড়/ ...কী সাহস তোমার তুমি ভেঙে দিতে পারবে তার দাঁত ? কী বুদ্ধি তোমার তুমি আয়ুধের ব্যবহার জানো! কোথায় খাপ খুললে বাবা ! বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলের কাছে ...”( মিতুল দত্ত, বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল) এই কবিতায় রূপকের ভেতরে হাসি মজা ও ভয়াবহতার পাশাপাশি বসবাস, সঙ্গে আছে ওই একই, উলটে দেবার নিবিড় খোঁজ। আর আছে “ছেঁড়া ন্যাকড়া”র মত এক অনিবারয মেয়েলি শব্দবন্ধ, যা কোন পুরুষকবির হাত থেকে বেরিয়ে আসা এক দুরূহ আশা।

    শরীর নিয়ে , শরীরের বাসনা নিয়ে শিল্পিত এক প্রতিস্থাপন, প্রতিনিধিত্ব পেলাম আমরা এইসব লেখায়। যেমন পেয়েছি শ্বেতা চক্রবর্তীর কবিতাতেও। যেখানে কিমিতিবোধের ভূমিকা শ্লেষের চেয়ে বেশি, ভালো লাগার উদযাপনেও তিক্তকটু স্বাদ ছেয়ে গেছে, জুগুপ্সা ও আকর্ষণ জায়গা বদল করেছে। “সমস্ত পুরুষ ঘেঁটে যদি একজন প্রেমিক পেতাম। যত বিষই থাক তার/ দুধকলা দিয়ে পুষতাম ! “ মাঝে মাঝে শ্বেতার লেখা একরকমের অবসেশন আক্রান্ত, যৌনতার অবসেশন। অথচ লেখায় তা বদভ্যাস নয়, ম্যানারিজম নয়, বরং নতুনত্বের অজস্র দরজা খুলে দেয় এই চোখ । যৌনতায় মাখামাখি, বিশ্বময় ছড়ানো নানা যৌন প্রিঅকুপেশনের তিক্ততাময়, সরস অথচ বিষণ্ণ উপলব্ধি ।

    এই নজর কিন্তু ঠিক ফিমেল গেজ নয়। অন্তত নিজের দিকে চাওয়া বা প্রেমিকের দিকে চাওয়া মেয়ের চোখ নয়। আবার পুরুষেরও নয়। এ এক মেটা ল্যাংগুয়েজ, যৌনতার কোয়েস্টের এক ধারাবিবরণী। নারীর এক দ্বৈত সত্ত্বা যা কেবলি খুঁড়ে চলে কয়েকটি নারীর মডেল, অতিবিবাহিতাদের, স্বৈরিণীদের, কামুক নারীদের মনস্তত্ত্বকে পাশে দাঁড়িয়ে দেখে , একাত্ম না হয়ে দেখে। বিধ্বংসী সামান্যীকরণের মত একটা ব্যাপারও চলে এই কাহিনিবয়নে । ‘অনেকদিন অপেক্ষার পর সে হয়তো আসে,/ এসে খুব তাড়া দেয়... ছুটেই সে চলে যায় – প্রেম : / হেমবর্ণ তার দেহ, ধূসর হবার জন্য তার/ কিছুটা সময় লাগবে/ ততদিন আমারো তো রোগে শোকে আনন্দ অপার !’ ( শ্বেতা চক্রবর্তী, প্রেম) বলেছিলাম না, প্রেমকে ক্ষণিক এবং পলায়নপর বলে চিনে নিতে এখন আর ভুল হয়না নারী বা পুরুষ কারোরই। সময়টা যে বিশ্বায়ন পরবর্তী নব্বই।

    কবি বুঁদ হয়ে আছে আনন্দে, কিন্তু একই সঙ্গে রক্ত ক্লেদ বসায়। চটচটে জীবনে। ক্লেদাক্ত বলে যাকে ছোট করা যায় না আর। রৌদ্রে উড়ে যাওয়া মাছি ফের এসে বসবে সেই রক্ত ক্লেদেই, সেটাই তার পূর্বনির্ধারিত নিয়তি, বা আত্ম-চয়িত জীবন। ‘সে আমাকে নিয়ে আনন্দ পায়নি, তাই ছেড়ে চলে গেছে/ তুমিও আমাকে নিয়ে আনন্দ পাবে না, তাই ছেড়ে চলে যাবে/ তারপর এরকম কত কতবার। ‘ ( শ্বেতা চক্রবর্তী, আনন্দী) এই ছোট কবিতাটি শেষ হয় এক মারাত্মক সামান্যীকরণে, “আজন্ম প্রেমিকা আমি, আমৃত্যু আনন্দে অধিকার “। তুলনীয় আর এক সামান্যীকরণ, ভয়াবহ, “আমার আনন্দজাল ছিন্ন করতে পারবে না কেউ” ( মাকড়শা) একইরকম আত্মপ্রত্যয় , যা ব্ল্যাক উইডো মাকড়শার কথা মনে পড়ায়, স্বামীদের রক্ত শোষণ করে যে নারী মাকড়শারা।

    পথে দাঁড়ানো বেশ্যাদের সঙ্গে একাত্মীকৃত হয়ে তাকে টেনে নিয়ে যান শ্বেতা ঈশ্বরীর পাদপীঠে...”খারাপ হলেই আমি একা অন্ধকারে বিস্তীর্ন এ আকাশের নীচে/ দাঁড়াতে পারব/ আর সারাটা সকাল ঘুমোব দারুণ ঘুম/ দিদিমণি, বিকেলে সাজার পরে/ সন্ধেবেলায় আমি দাঁড়াব ঈশান কোণে/ এক ঈশ্বরীর মতো/ মানুষের অপেক্ষায় “ । এই বোধ তিক্ত কষায় , কিন্তু এটি কোন রিপোর্টাজ নয়, কোন প্রতিবাদও নয়, এখানে সমাজের বেড়ি-বাঁধনময় তাঁবু ফুটো করে হাউই হয়ে আকাশে উঠে যেতে চাওয়া নারীর আকাংক্ষা। মনে রাখব সমাজবিরোধীরাই কারো কারো মতে সমাজকাঠামোকে প্রশ্ন করে প্রথমে। সেই প্রান্তিকের দৃষ্টি শ্বেতা অনায়াসে চারিয়ে দেন তাঁর কবিতায়।

    পুরুষের লাম্পট্যকেও ব্যাজনিন্দায় শ্বেতা বানিয়ে তোলেন জরুরিঃ

    করুণ মধুর ওরা, যদিও লম্পট সর্দার
    সে লাম্পট্য কীভাবে যে সহ্য হয়েছে বারবার...
    ঈশ্বর, দিও না শাস্তি, জটিল সমাজ কাঠামোয়
    ওরাই আমার
    সম্ভব করেছে বহু বিয়ে । ( অতিবিবাহিত)

    অজ্ঞানের অতল থেকে প্রাণভোমরা তুলে আনার কাজটি ঘটেছে এইসব কবিতায়, একাধারে সচেতন ও অবচেতনের বুনন ঘটেছে, এবং হয়ে উঠেছে সার্থক কবিতা। কথনের ভেতরে জীবনকে এনে ফেলা এবং জীবনকে বেঁকিয়ে চুরিয়ে দিতে চাওয়া , গোটা ব্যাপারে এখানেই নারীকে জিতিয়ে দিতে চাওয়ার রোখ ও জেদ দেখিয়েছি আমরা , নব্বইয়ের কবিরা।

    নয়ের দশকে লিখতে এসেছিলাম আমিও। প্রাসঙ্গিক বলেই এই পাঠবস্তুকেও বাদ দিতে চাইনা । যদিচ অনেক কবির অনেক পংক্তিই হয়ত অনবধানে বাদ চলে গেল। শরীরবোধের জটিলকঠিন খেলাটি শিখেছি আমি সেই সময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যখন সন্ধেবেলা দু বিনুনি বেঁধে হারমোনিয়াম বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার দিন গিয়েছে, কিন্তু বয়ফ্রেন্ডের বাইকে চেপে ভ্যালেন্টাইন্স পার্টিতে যাওয়ার চল হয়নি। শিবরাত্রি করিনা আমরা তখন আর, আবার স্মোকিং ড্রাগ ক্যাজুয়াল সেক্স তখনো ছি ছি! আমরা এক চৌমাথার মোড়ে দাঁরিয়েছিলাম বিভ্রান্তির ভেতরে আদিগন্ত ডুবে গিয়ে। আমি আমার শৈশব কৈশোর কাটিয়েছি অবদমনে, বেদনায় এবং কলকাতায় । এক পুরনো পাড়ায়, সেখানে মেয়েরা দেরি করে বাড়ি ফিরলে জানালার খড়খড়ি ফাঁক করে পাড়ার পড়োশিরা দেখে নিতেন তাদের, আবার ওদিকে কম্পিউটার ক্লাসের ছোট ছোট ঘরে জমা হত অনেক মেয়ের মুখ।

    আমার লেখাতেও এসে পড়েছে সেই স্ববিরোধিতা, প্রেমকে পুনর্নির্মাণ করার প্রবল চেষ্টা আর আক্ষেপ। ‘না, শরীর নিয়ে কিছু লিখব না/তুই এলে শুধু খুলে দেব পালানোর রাস্তা, .../আমাকে এখনই নিয়ে যাবি, দরজা খুলে দিচ্ছি, ভাই/একা একা ভাল্লাগে না, শাড়িসহ পালাব কী করে/ খুলে আসব? খুলে আসছি। পায়ের আলতাও খুলে আসি/আংটায় টাঙিয়ে আসি বাঁকা ভুরু, নাভি ও ব্লাউজ/ আর কাদা, তাল তাল কাদা , তবে স্তনও খুলে আসি/ না , শরীর নিয়ে আমি তোর সঙ্গে পালাব না। ‘( দূর)

    সমাজ নির্দিষ্ট নারী প্রতিমাকে বার বার বিসর্জন দিতে চেয়েছি আমরা। কবিতা সিংহ থেকে সে যাত্রার শুরু... তারপর থামেনি যাত্রাটি। সেভাবেই প্রেমকে নতুন করে আবিষ্কার করতে চেয়েছি, পরাতে চেয়েছি নতুন সাজ ... তাকে মাতৃত্বের সঙ্গে জুড়েছি, ভেঙে ফেলেছি ধর্ষণের সঙ্গে তার জোড় , যুক্তি আর বিযুক্তিতে তার ভেতরের সব রস নিষ্কাষণ করতে চেয়েছি । এই পুনরাবিষ্কারের কাজ আমরা চালিয়ে যেতে চাই।

    “আজ তুমি স্তন থেকে কামড়ে শুষে নাও সব স্তন/ আমার তো ভালো করে স্তন্যধারা হয়নি কখনো/ সন্তান, তোমাকে পেলাম, এই , পরিপূর্ণ করে গর্ভে ঢোকো/ গর্ভে এসে বাস করো, নেমন্তন্ন, নিমন্ত্রণ, জানো/ এসো, এই আনন্দমথন, স্বপ্ন, তোমাকে নিয়েই , সঙ্গে করে/ পৃথিবীতে প্রথম মা, প্রথম সন্তান/ কীভাবে জন্মেছে, জেনে গেছি ...” ( প্রথম জন্মের ব্যাখ্যা) প্রেমকে এভাবেই দেখতে চেয়েছিলাম আমি, আমরা। একটা অবিচ্ছিন্ন ধারাবাহিকতার ভেতরে। বিচ্ছিন্নতাবোধ থেকে দূরে । হয়ত খুঁজে পেয়েছি, হয়ত পাইনি।



    “এক যদি বলো নারী হিসেবে বাংলাভাষার যথেচ্ছ ব্যবহারের স্বাধীনতার কথা, সেখানে আমি বলব হ্যাঁ, অসুবিধে হয়েছে। শুধু ভাষা নিয়ে নয়, ভাষায় প্রকাশিতব্য বিষয়বস্তু নিয়েও নিজের মনের মধ্যেই বাধা পেয়েছি। বাইরে থেকে নয়। আমি যখন লিখতে শুরু করি, আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে, তখন একটি পুরুষের পক্ষে ছাপার হরফে যে কোন বিষয়ে কবিতা রচনার, যে কোনও শব্দ ব্যবহারের স্বাধীনতা ছিল, নারী হিসেবে আমার সেভাবে কলম ধরার স্বাধীনতা ছিল না । ...নারী বলে আমি মুখে যে শব্দ উচ্চারণ করতে সংকোচ বোধ করি, কবিতাতে সেই শব্দ লিখি না। কিন্তু আমি না পারলেও, আজকাল অনেক অল্পবয়সি নারীকেই তো দেখি, কবিসম্মেলনে শুনিও, অনেক অসুন্দর শব্দ অসংকোচে কবিতায় ব্যবহার করছেন। জানি না তাঁরা সামাজিক কথোপকথনেও ওই ধরণের শব্দ সহজভাবে ব্যবহার করেন কিনা, ব্যবহারের প্রয়োজন বোধ করেন কিনা। অনেক সময় বাহাদুরির জন্য পুরুষ –কবিরা পঞ্চাশে ও ষাটে ( যেমন, হাংরি জেনারেশনের কবিতায়) ভদ্রসমাজে নিন্দনীয় বহু শব্দ ব্যবহার করেছেন, আজও নব্বইয়ের অনেক কবির মধ্যে স্মার্ট কবিতার নামে এই লক্ষণ দেখি । প্রথা ভাঙাই উদ্দেশ্য, ধাক্কা দেওয়াই উদ্দেশ্য। আজকের নারী –কবিরা যদি একই উদ্দেশ্যে একই কাজ করেন আমি বলব এতে কোন বাহাদুরি আর নেই, নতুনত্ব নেই, নেহাৎ অর্ধ শতাব্দী ধরে ধার করা জিনিস । শুধু সাহসই যথেষ্ট নয়, শিল্পে রুচিরও প্রশ্ন ওঠে। পুরুষের অপসংস্কৃতি আমাদের কেন ধার নিতে হবে? “ - নবনীতা দেবসেন ( সাক্ষাৎকার-এর অংশ , বিম্ববতীর আরশি, কবিতা প্রতিমাসে, জুন ২০০৭) ।

    প্রতিটি মুহূর্তে পরিবর্তনশীল আমাদের সময় সমাজ। শেষ কথা বলে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। রুচিবোধ আসলে একটি অতিনশ্বর বস্তু, বার বার এ কথার প্রমাণ আমরা পেয়েছি। নারীর নিজেকে প্রতিষ্ঠা দিতে আদৌ সাহিত্যে শরীরকে আনার প্রয়োজন কিনা এই প্রশ্নটি আগেও উঠেছিল, এখনো ওঠে । যৌনতা নিয়ে লেখা মানেই নারী নিজেকেই পণ্যায়িত করেন কিনা এ প্রশ্নও তোলা যায়। কোন নারী যখন যৌনতা লেখেন, তিনি তা লেখেন পুরুষের এজেন্ট হিসেবে, শত্রুর দলে ভিড়ে গিয়ে, এমন যুক্তি দেবেন রবিন মর্গ্যানের মত নারীবাদী তাত্ত্বিকরা । আমাদের লেখাতেও আমরা বার বার দেখিয়েছি নারীকে বিষয় রেখেই নারীর লিখে চলার ইতিবৃত্ত । কখনো বা লঘু বাজারি উপন্যাসে পাতার পর পাতা রতিক্রিয়ার বিবরণীতে নারীর কলমে আমরা পেয়েছি পুরুষ দৃষ্টিরই সেই পুরাতন পুনরাবৃত্তি। কবিতার ক্ষেত্র থেকে বেরিয়ে যাবার ঝুঁকি নিয়েও উদ্ধৃতি দিতে লোভ হয় পুরুষ দৃষ্টির তাম্বুল করংক বাহিনী এইসব লেখা থেকে :

    ‘রুণুর আত্মপুরুষও জেগে উঠেছে সেই ধাক্কায় । সে সঙ্গে সঙ্গে টেনে নিয়ে জাপটে ধরছে রাত্রিকে। কটিদেশ ধরছে মুঠোয়। রুণু নিজের মুখ ভরে দিচ্ছে রাত্রির মুখে, চুম্বনরত অবস্থায় সে স্তনে হাত রাখছে। থাবায় ধরছে স্তন। ...সে শাড়ি খুলে আনছে হাতে। ... তার দৃঢ় পুরুষাঙ্গের দিকে তাকিয়ে প্রায় তখনই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছে মেয়েটা এবং সমস্ত শরীর ছেড়ে দিচ্ছে রুণুর হাতে। ...এ ঢলে পড়া আসলে তীব্র নিষ্পেষণের আনন্দে ঘটছে বলে বুঝতে পারছে রুণু । সে আরো আদর ঢালছে তখন রাত্রির শরীরে – দাঁতে কেটে ধরছে বেলকুঁড়ির মত স্তনবৃন্ত । শুইয়ে দিচ্ছে খাটে।‘

    এটি দস্তুরমত কপিবুক চরিত্রের পুরুষ দৃষ্টি। পুরুষের ফ্যান্টাসি যা পুনরায় প্রবাহিত নারীর কলমে। প্রকৃত মেইনস্ট্রিম এভাবেই চলতি দৃষ্টিভঙ্গিকেই জারি রাখে, পুনঃপ্রতিষ্ঠা দেয়। এখানে রতিকালে পুরুষের সমানুপাতী সঙ্গিনী নয় নারী। এখানে পুরুষই সব কাজ সক্রিয়ভাবে করছে মহান দায়িত্বসহকারে ( শাড়ি খুলে আনছে, আদর ঢালছে, শুইয়ে দিচ্ছে ) , নারী শুধু সক্রিয়তাবর্জিত মাংসপুত্তলীর মত ইচ্ছা বিবর্জিত, সঁপে দিচ্ছে নিজেকে ( সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছে, ঢলে পড়ছে) ।

    এর বিপরীতে ইচ্ছাময়ী কিছু কিছু কবিতাও আমাদের হাতে আসছে :

    ডিম-পাঁউরুটির মত জীবনে, তুমি এলে
    একটি হলুদ রঙের কলা...
    নিটোল আকার দেখে, বিশ্বাস করো,
    ভারি খিদে পায়...

    পাকা কদলী, তোমার লাবণ্যে
    ফিদা হয়ে গেছি যারা
    তারা লালসুতোর বিড়ি কাউন্টারে খাই
    পিতৃপুরুষ হতাশ হবেন জেনে
    আমরা ফুটপাতে হিসি করি, বেশি পাপী মনে হলে
    খিস্তি দিই বাপ-মাকে!
    ( রাজশ্রী চক্রবর্তী, ডিম-পাঁউরুটির কবিতা-২)

    অথবা,

    তোর পিঠের তিলগুলো দিয়ে নতুন রেসিপি বানিয়েছি। আজকে আমার সাথে লাঞ্চ
    কর। আমাদের গন্ধ মিলেমিশে ভরে আছে ডাইনিং রুম । তোর হাতের নিচের দিকটা
    খেতে খেতে মনে হয় বাঁ পা-টা একটু টেস্ট করি । নোনতা বুড়ো আঙুলের মাথাটা
    জিভে নিই। ছ’ ঘন্টা ম্যারিনেট করা তুই গলে যাস আমার মুখের মধ্যে । ডানদিকের
    বুকে এসে কিছুক্ষণ দম নিই । আর ওটা? ওটা রেখে দিই সবার শেষে খাব বলে ।

    (স্বাগতা দাশগুপ্ত ,আ লা কার্টে)

    আমাদের গা চুঁইয়ে যেসব আদর পড়ে গেছিল ফোর্ট রায়চকের পাঁচতলার ঘরটায়
    ওই ওদের জন্যই , বিশ্বাস কর, আমি লিখতে বসেছি। তোর ঊরুর খাঁজে শুয়ে থাকা
    আঁচিলগুলো যখন এক এক করে উঠে আসছিল আমার ডিনার প্লেটে, তুই বৃথাই
    রুম সার্ভিসে ফোন করছিলি। পর্ক সিজলারের চেয়ে অনেক বেশি ধোঁয়া ছাড়ছিল

    আমাদের গরম গরম শরীরদুটো ...

    (স্বাগতা দাশগুপ্ত , ফোর্ট রায়চক)

    নানাভাবে যুক্তি দেওয়া চলে। কেউ বা বলবেন, ভাল , কেউ বলবেন মন্দ। কেউ বলবেন, এ তো পর্নোগ্রাফি, এ পুরুষের লেখা “অসুন্দর”-এর আর এক পিঠ। আবার কেউ বলবেন, পর্নোগ্রাফি পুরুষের সৃষ্টি, নারীর নিজের লেখালেখিতে যৌনতার বাচন আসলে পর্নো নয়, তা ইরোটিকা, এবং তা লিবারেটিং... অর্থাৎ নারীকে স্বাধীন , স্বয়ম্ভূ করে তোলার পথমাত্র।

    সুতরাং কোন মূল্যায়নে না গিয়েই আমি তুলে ধরলাম দু হাজার পরবর্তী কবিতা, সাহসী ( নাকি ততটা সাহসী নয়? ) মেয়েকবির কবিতা। পাঠক নিজের মত করে তাকে নিরীক্ষণ করুন আমার এযাবতের কথার প্রেক্ষিতে। তবে, লঘুচটুল হিন্দি ছবির রিলিজের দ্রুততায় বদলে যাওয়া বাঙালি রুচিবোধের নিরিখে, একটা কথাই বলতে ইচ্ছে করে, কাহানি আভি বাকি হ্যায় ...
  • বিভাগ : ব্লগ | ০১ মে ২০১৪ | ১৬০ বার পঠিত
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • | 24.97.118.116 (*) | ০১ মে ২০১৪ ০৫:২৭73025
  • বেশ বড়সড় লেখা, মানে ব্লগ আন্দাজে একটু বড়ই। যাই হোক প্রথম পাঠে মনে হল এই বিষয়ে দেবারতি মিত্র ও মল্লিকা সেনগুপ্ত'র সম্পর্কে আরেকটু বেশী আলোচনা থাকা বোধহয় দরকার ছিল।
  • সিকি | 131.241.127.1 (*) | ০১ মে ২০১৪ ০৫:৫৮73026
  • লেখাটা খুবই বড়সড়, একদমে পড়ে উঠতে গেলেও মাঝে মাঝে মনোযোগের চ্যুতি ঘটছে। তবু যতটুকু পড়লাম, ভালো লাগল। বাকিটা পড়ে উঠি।
  • Abhirup Ganguly | 24.99.80.104 (*) | ০১ মে ২০১৪ ০৭:৩০73027
  • বেশ ভালো লাগলো
  • b | 135.20.82.164 (*) | ০১ মে ২০১৪ ০৭:৫৬73028
  • খুব ভালো লাগলো। তবে একটু বড়, এই আর কি। রয়ে সয়ে পড়তে হবে।

    মুদ্দুপালনি-র (তাঞ্জোরের মারাঠি রাজা-র অধীনে থাকা দেবদাসী) কন্নড়ে লেখা রাধিকাসান্তনম, যা কিনা গীতগোবিন্দর থীম নিয়ে লেখা গীতিকাব্য, নিয়ে সে যুগের সমাজ বেশ উত্তোলিত হয়েছিলো। বইটি ব্রিটিশ আমলে ব্যান করে দেওয়া হয় অশ্লীলতার অভিযোগে।
  • Yashodhara Ray Chaudhuri | 69.97.148.188 (*) | ০১ মে ২০১৪ ০৯:০৩73029
  • মুদ্দুপালানির রাধিকা সন্ত্বনম কেনার জন্য লিঙ্ক খুঁজছি। ধন্যবাদ। সম্প্রতি একটি কাজ করছি, রাধার ফিমেল গেজ নিয়ে। বৈষ্ণব পদাবলীতে রাধার কৃষ্ণকে দেখার ব্যাপারটা ( তা রাধাভাববাহিত বৈষ্ণব পুরুষকবিদের লিখিত হলেও) আমার বিস্ময়কর লেগেছে। দৃষ্টি সম্ভোগের সেলিব্রেশন আছে পদাবলীতে, কৃষ্ণ ইটার্নাল অবজেক্ট এখানে... অথচ পুরুষ কৃষ্ণ কতভাবে রাধাকে উৎপীড়ন ও ভোগ করেছে সেই ভার্শান এই সময়ে বেশ চালু।
  • এমেম | 127.194.251.80 (*) | ০১ মে ২০১৪ ১১:০১73030
  • চমৎকার লেখা। দ্বিতীয়বার পড়লাম।
  • শিবাংশু | 127.248.128.31 (*) | ০১ মে ২০১৪ ১১:৩৮73031
  • দীর্ঘ, সমৃদ্ধ লেখা ।

    আরো দুয়েকবার পড়তে হবে পুরো ব্যাপারটা বুঝতে। তবে নারীর শারীর ও অতি-শারীর যৌনতাবোধের ব্যপ্তি ও স্তরভেদ কয়েকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গের নামপদের প্রতীকে ধরে ফেলার যে প্রয়াস কবিতা সিংহের সময় থেকে দেখেছি, সেটার থেকে একটু অন্যরকমভাবেও এগিয়ে যাওয়া যায়। যৌনতা মস্তিষ্কের খেলা, কোনও প্রত্যঙ্গের নয় । এক সময় প্রকাশ্যে কয়েকটি শব্দের ব্যবহার করতে পারাটাই 'দুঃসাহসী' আখ্যা পেতো । চিরকালই ভেবেছি দুঃসাহস কি সাহসকে এড়িয়ে যাবার একটি পদ্ধতি মাত্র। সারা ভারতবর্ষে 'কৃষ্ণ' নামক ধারণা বা প্রতীকটির বিবর্তনের অন্তহীন মাত্রা রয়েছে । কৃষ্ণ বা রাধা, দুটি চরিত্রেরই কোনও নির্দিষ্ট মানক নেই । সামন্ততন্ত্রে, শহুরে মধ্যবিত্ত যাপনে বা ইতরবর্গীয় যুদ্ধে নারীর যৌনবোধির মাত্রা ভিন্ন । 'ফিমেল গেজ' বলে যে পরিভাষাটি ব্যবহার করা হচ্ছে, তার কি কোনও নির্বিশেষ স্বীকৃত মানক এখনও তৈরি হয়েছে ? নারীযৌনতার ধারাভাষ্যটি কি এখনও পশ্চিমি ধাঁচের সরলরৈখিক প্রমাণ-অপ্রমাণের রীতিসাপেক্ষ ? নারীযৌনতার জটিলতা, স্ববিরোধ বা অভিঘাতকে ধরতে গেলে কি কিছু স্টক পরিস্থিতি বা বহুব্যবহৃত শারীর অঙ্গের মুহুর্মুহু উল্লেখই যথেষ্ট ? পুরুষের ন্যারেটিভ আর নারীর 'দুঃসাহস' কোথায় মেলে আর কোথায় পরস্পর থেকে দূরে চলে যায়, তারও কোনও সহজ ব্যাকরণ নেই । তন্ত্র বা বিভিন্ন লোকযানী প্রেক্ষিতে নারীযৌনতার যে স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশপথ দেখা যায়, পশ্চিমি দৃষ্টিকোণটি সে তুলনায় অবদমিত দাবি প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদী প্রতিক্রিয়া বোধ হয়েছে ।

    যাকগে, বিষয়টি আমার প্রিয়, কিছু চর্চিত এবং অতি বিস্তৃত ক্যানভাস। আরো মনোসংযোগ করে পড়তে হবে ; তারপর হয়তো কোথাও পৌঁছোতে পারবো । তবু প্রথম পাঠের সূত্রে লেখিকাকে যথোচিত সম্মান জানিয়ে রাখলুম।
  • Yashodhara Ray Chaudhuri | 69.97.148.170 (*) | ০২ মে ২০১৪ ০৭:৩৩73032
  • শিবাংশু বাবুকে অনেক ধন্যবাদ। খুব জরুরি বিষয় উঠে আসছে। সমৃদ্ধ হচ্ছি। রাধা বিষয়ে আর একটি লেখা দিচ্ছি। একটু লঘু চালে লেখা, এই লেখাটার মত ভারি নয়। পড়লে খুশি হব খুব।
  • কল্লোল | 125.242.140.76 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১০:৫৭73033
  • একবার পড়া হলো। আবারও পড়তে হবে। তার মাঝে কিছু অপ্রাসঙ্গিক স্মৃতিচারণ।
    ব্যাঙ্গালোরে কোন একটা কবিতা পাঠের আসরে জনাকয় তামিল নারীবাদী কবির কবিতা পড়া হয়েছিলো প্রায় ৫/৬ বছর আগে। ঐ নারীরা আমার দেখা প্রথম নারীবাদী যারা ইংরাজি বোঝেন না। ওঁদের সাথে দোভাষীর মাধ্যমে কথা হচ্ছিলো। কবিতাও ওঁরা তামিলে পড়ছিলেন, তারও ইংরাজি তর্জমা পড়া হচ্ছিলো।
    কিছু কবিতা......................
  • কল্লোল | 125.242.140.76 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১১:০২73034
  • কুট্টি রেবতী।

    Angels we are not

    When the snow-body, molten
    In the heat of breath,
    Met the eye,
    Life’s fount opened its lips and gushed forth
    In the evening, summoned by another time,
    The body wore (and wore again) those garlands
    Of fire; and was gutted
    In the morning which greeted and spun you around
    In the zones of breath, love itself
    Was Death’s scented pollen
    In the hard rain which lops your head neatly
    And flings it on the ground,
    Like wheels turning within a wheel,
    Life’s eye shrinks to its essence
    =============================
    Angels we are not

    As seedlings, several centuries ago,
    Breasts sprouted in her body’s black soil
    She forgets them sometimes, as they quiver
    Amid the crush of bodies straining

    As the sun goes down, they boom like conches --
    Very close to her heart

    A thread of rain enters her and unravels, and
    Lust’s fangs rise all over her body

    If those conches were to open their mouths,
    They might speak of her body’s travails
  • কল্লোল | 125.242.140.76 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১১:০৬73035
  • কুট্টি রেবতী

    Breasts

    Breasts are bubbles, rising
    In wet marshy land

    I watched in awe - and guarded -
    Their gradual swell and blooming
    At the edges of my youth’s season

    Saying nothing to anyone else,
    They sing along
    With me alone, always:
    Of Love,
    Rapture,
    Heartbreak

    To the nurseries of my turning seasons,
    They never once forgot or failed
    To bring arousal

    During penance, they swell, as if straining
    To break free; and in the fierce tug of lust,
    They soar, recalling the ecstasy of music

    From the crush of embrace, they distill
    The essence of love; and in the shock
    Of childbirth, milk from coursing blood

    Like two teardrops from an unfulfilled love
    That cannot ever be wiped away,
    They well up, as if in grief, and spill over
    =============================
  • কল্লোল | 125.242.140.76 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১১:১১73036
  • মালথি মৈত্রী।

    Slaughterhouse

    After closing the doors,
    She draws the curtains
    Across the window;
    Removes her skirt with her back to me

    A white lady past her sixties
    When I saw the olive-green panther
    On her right buttock, poised
    For a leap, with its forepaws raised,
    I hung back a few seconds without pulling up
    The jeans, yearning to touch
    The tattooed figure with my fingers

    The jeans fit her perfectly
    Now our seamstresses were bound
    To stitch and stack this model
    For a whole month—even in their sleep:
    “Spicy shorts”

    In the trial room,
    She stands in front of multiple mirrors,
    Admiring again and again
    How well the garment sculpts
    The buttock’s lower curve
    Into a crescent, and grips the thigh
    There is hope for high growth
    In sales, she says, and offers praise

    Ordering us to design
    A top for the jeans,
    She removes her vest
    To aid measurement:
    She wants it high,
    Level with the lower ribs

    A webbed brassiere,
    Prettily embroidered with lace,
    Holds up her sagging breasts
    The tail of an animal,
    Crouching on her left breast,
    Snakes up below her neck

    I stand there, waiting,
    Measuring tape in hand
    Tongues jutting out,
    Leather jackets suspended on hooks
    Throw us their fixed stares
    Like cattle hanged to death
    The room’s heat keeps rising

    What can I do?
    When I pulled the too-tight jeans off her legs,
    Her bum, the skin dry and flecked
    With minute cracks, was scratched
    And bruised by my fingernails

    The wound resembled
    A panther’s claw marks,
    Says the autopsy report
    ===============================
    Large as the world

    By some turn, obscure, of the season,
    Each part of my body turned
    Into an animal or bird; and began
    To wander away from my side

    A few returned on their own
    Oftentimes, they were tracked
    And brought home like lost sheep
    Then they left again, as if on pilgrimage
    When all this turned routine, they began
    To roam in all of Time’s expanse

    Now, it is a long time since
    They went their several ways
    In search of water and land
    I am unable to know
    Or guess which part
    Might now be traipsing
    Down which way
    On their return home, laden with the scents
    And voices of different lands,
    They graze all over my body,
    Shuffling and rearranging my identity

    Some girls who went to gather
    Firewood in the jungle
    Returned to say that they had sighted
    My vagina as a butterfly,
    Flitting about among the hills

    (Original: Viswaroopam from the collection
  • কল্লোল | 125.242.140.76 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১১:১৪73037
  • সুকির্থনী।

    Gigantic Trees

    Gifted with the cycle
    Of seasons, my body
    Ripens and gathers into a heap
    Like a mushroom

    Secret organs are carefully woven
    Onto its front and back
    The smoky aroma of clarified lust
    Rises from skin that crawls
    With gooseflesh all over

    My body is etched with
    Lukewarm cheeks, plump
    Around the yielding waist,
    And cowries of desire, arranged
    Like an upturned triangle

    Arriving now in a misty haze,
    A street artiste performing without make-up,
    You unclasp the front strap of my bodice
    Savouring breasts that nourished you once,
    You are ashamed even to utter their name

    I brandish the fork of my breasts
    As a lethal weapon in combat
    From this day on, you must
    Serenade aloud from under the seed
    Those firm, unyielding breasts
    Which hold aloft the banner
    Of this territory under my reign

    It is ages now
    Since breasts have morphed
    Into gigantic trees

    Translated from the Tamil poem, “Virutshangal” by Sukirtharani
  • কল্লোল | 125.242.140.76 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১১:২৬73038
  • কবিতাগুলো অনুবাদ করেছেন কল্যান সুন্দর। ইনি পুরুষ।

    ওঁদের সাথে কিছু কথা হচ্ছিলো।

    প্রঃ আপনারা শুধু নারী শরীর নিয়ে লেখেন কেন? আরও তো কতো বিষয় আছে।
    উঃ অন্য সব বিষয় মানে প্রকৃতি, রাজনীতি, বঞ্চনা, বিদ্রোহ এই তো? সে সব নিয়ে লেখার বহু মানুষ আছে। আমাদের শরীর নিয়ে আমরা ছাড়া আর কেই বা লিখবে। তাই.............
    প্রঃ ভাষা এখন যেমন, সেও তো পুরুষের ভাষা। আপনারা কি অন্য কোন ভাষা তৈরী করতে পেরেছেন?
    উঃ আমাদের তো মনে হয় আমরা ভিন্ন ভাষায় লিখি।
    প্রঃ কি করে সেটা বুঝলেন?
    উঃ এই দেখুন না আমাদের কবিতাকে অশ্লীল বলা হয়। কেন? কারন ওরা আমাদের ভাষা বুঝতে পারেন না। ভিন্ন ভাষা তো। তাই ভয় পেয়ে অশ্লীল বলেন। যেমন অশ্লীল বলেন সমকামী সম্পর্ককে - বুঝতে পারেন না, তাই..............
  • i | 212.159.159.159 (*) | ০২ মে ২০১৪ ১২:১৬73039
  • এ লেখায় মতামত দেবার অধিকারী হয়তো আমি নই। যশোধরা খুব পরিষ্কার জানিয়েছেন এ লেখার উদ্দেশ্য । যথাযথ উদাহরণে, উপস্থাপনে সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ। সুন্দর লেখা।তবু মাঝে মাঝে কিছু কথা গুন গুন করে পাক খায় না? পাক খেতেই থাকে.. যতক্ষণ বলা না হয়-সে জলের কাছেই হোক কি গাছের কাছে-বলা হয়ে গেলে হালকা লাগে। কেউ হয়তো শুনবে না। তবুও।
    বিমল করের 'অসময়' মনে করছিলাম।। অবিনের মা পুণ্যবালা-তাঁর লেখা একটি ক্ষুদ্র কবিতা পুরোনো মাসিকপত্রে হিন্দুধর্মের উপর সাতগজী প্রবন্ধের তলায় স্থান পেয়েছিল।শ্রীমতী পুণ্যবালার পদ্যের নাম-আমি থাকি নিজ মনে।তো, এই পুণ্যবালা নদীতে পড়ে মারা গিয়েছিলেন। পুরু শ্যাওলার তলায় সর্বাঙ্গ ডোবানো ছিল, কিছু ভিজে চুল লেপ্টে ছিল গালে কপালে। 'দৃশ্যটি বড় আশ্চর্যরকম শান্ত, স্তব্ধ ও নিবিড়।অনাবিল জ্যোত্স্না মাথার ওপর, চারপাশ নিঃশব্দ, নির্জন; রাশি রাশি জোনাকি উড়ছে ঝোপের মধ্যে, আর আমার মা পুরু শ্যাওলার তলায় ডুবে শুয়ে আছে, যেন এতকাল মা যে শয্যায় শুয়ে এসেছে সেত মা-র নিজের মনোমতন হয় নি, এই শ্যাওলার শয্যা, জলজ লতাপাতার আবরণ, ... মনোমত হওয়াতে মা অকাতরে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাথরের ওপর রাখা মার ছোট্ট মাথাটি এক আশ্চর্য জলপদ্মের মতন ফুটে ছিল'।
    মেয়েদের কবিতা, মেয়েদের স্বর, নারীর নিজস্ব ভুবন শুনলীই সব মনে পড়ে। আজও পড়ল। তাই খানিক গুনগুন-জলের কাছেই...

    যেহেতু লেখার কেন্দ্রে কবিতা এবং কবিতাই, সেজন্যই হয়তো এই ধরণের স্পষ্ট উদ্দেশ্য এবং গোটা লেখাটিতে সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে কবিতার উদাহরণ তুলে আনা কোথাও যেন কষ্ট দেয়। মনে হয় , মনে হচ্ছে যা বলা হয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশি বলার ছিল।
    একটু না হয় নড়েই যেত লেখার ফোকাস ।

    যেমন মনে হয়, আমার মনে হয়,এ লেখায় দেবারতি মিত্র আসবেনই অথচ দেবারতির ভাষ্যকে ঠিক এভাবে হয়ত ধরা যাবে না। অবশ্যই এই লেখার উদ্দেশ্য তা নয় -জানি।
    আসলে, দেবারতি নিজেই লিখেছেন,' প্রেরণা ছাড়া , মনে হয়, কবিতায় একটি শব্দও আসতে পরে না। প্রেরণা কি দৈব? যদি অতটাও না বলি তবু সম্পূর্ণ হাতের বাইরে এক স্বতঃস্ফূর্ত চেতনার ঝরনাধারা তকে বলতেই হবে। তবে লেখবার পর সচেতন প্রয়াসে তাকেএকটা অনায়াস শিল্পমাত্রায় উতরে দিতে চাই। কিন্তু কবিতার যে প্রাথমিক আদল তা একেবারেই অপৌরুষেয় বা অনারীসম্ভূত।
    নারী হিসেবে আমার বিশেষ কিছু কি বলার অ্ছে? আমি তো নারী হিসেবে কবিতা লিখি না, দেবারতি হিসেবেই লিখি, এভাবেই ওরা আসে-আমার চিন্তা , অভিজ্ঞতা, জীবনযাপন বা স্বপ্নের বাইরে অন্যরকম কিছু চাইলেও আমি লিখতে পারি না। কবিতায় নারীর নিজস্ব দৃষ্টি কোণের কথা কখনও ভাবি নি।
    ।।। যৌনতা ও প্রেম আমার কাছে আলাদা নয়। প্রেম আসল, প্রেমই আগে আসে, যৌনতা তার পরে। হয়তো সেই জন্যই আমার কবিতায় পুরুষ ও তার শরীরের প্রতি এত মমতা, আদর ও মুগ্ধতা।'

    আবার ধরুন, কবিতা সিংহের লেখাতেও-'ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা হলে' র পাশাপশি যদি রাখা যায় এই কবিতাঃ

    'কার সঙ্গে কথা বলো? আমি তো কবেই চলে গেছি!
    যে ভাবে নারীরা যায় শব্দহীন চালচিত্র ছিঁড়ে
    দেহ থেকে খসায়ে শিঞ্জিনী, ধ্বনিমায়া
    হাট করে চলে যায় ভ্রূমধ্য টিপের লাল খিড়কি দরোজা
    যে ভাবে নারীরা যায় অদ্ভূত হীনতা থেকে চরিত্রের দিকে।'

    বা

    '... ঠোঁট থেকে খসে যায়
    যা কিছু নয়ন নয় দৃষ্টি নয় যা-কিছু অসার-
    ঠোঁট থেকে খসে যায়, যা কিছু বলার মতো নয়
    কথা নয়, শব্দ নয়, চুমু নয়,মনের আসল
    বুক থেকে খসে যায়, যা-কিছু নিজের নয়
    প্রেম নয়, শান্তি নয়, নিজের আপন কিছু নয়।।'

    তখন 'অনাড়ম্বর দেহ বোধের উচ্চারণের' বাইরেও আরো কিছু ছিল, বলা হল না-মনে হয় না এরকম?

    বা রাজলক্ষ্মী দেবীর ' ঘোরানো সিঁড়ির' পাশে রাখি যদি তাঁরই এই লাইনগুলি-
    'এবয়সে ভালোবাসা পেতে সাধ যায়। আশকারা
    সামান্য আহ্লাদ। সব খুঁটিনাটি সুচ, শখ ছাড়া
    এ বয়সে চলে যায়। পোষায় না বেশি পরিশ্রম।
    সারারাত একা ঘরে জ্বরের পালায়
    ঐটুকু ভালোবাসা কাঁথা মুড়ি দিতে সাধ যায়।'

    আবারও কি মনে হয় না, অনেক বলা হলেও আরও বলা বাকি থেকেই যায়? আমি থাকি নিজমনের কবিকে অত সহজে ধরা যায় না?

    হয়ত এত কথা এল-এতোল বেতোল কথা-কবিতা বলেই এল।দেবারতি যাকে বলেন,' কবিতা কী? সে কি শুধুমাত্র সামান্য রসাত্মক বাক্য, না আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব চূর্ণ করা বিস্ময়, যেখানে শেষ তৃণটুকু পর্যন্ত ভেসে যায়।'
  • arindam | 69.93.241.125 (*) | ০৩ মে ২০১৪ ০২:১৬73040
  • হোক না মতামত। তবুও এযেন একটা সম্পূর্ণ লেখা। যশোধরা যতটুকু এগিয়েছেন তারপর কিছুটা...
    ভাল। খুবই ভাল।
  • b | 24.139.196.6 (*) | ০৩ মে ২০১৪ ০৩:৫৬73041
  • i এর মন্তব্যটি লেখার গুণে ভালো লাগলো। তবে দেবারতি বা কবিতা সিংহের সমগ্র কবিসত্তাকে নিয়ে আলো্চনা করাতে হলে এই নির্দিষ্ট লেখাটির পরিমিতি ও ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতো। সেক্ষেত্রে অন্য একটি লেখাই বাঞ্ছনীয়।
  • শিবাংশু | 127.197.255.250 (*) | ০৩ মে ২০১৪ ০৪:১২73042
  • ইন্দ্রাণী,
    আরো একটু এগিয়ে যাও, সেই সব মানুষের কাছে । যাদের শরীরে নারীলক্ষণগুলো নিজের মতন থাকে, কিন্তু তারা সে সব নিয়ে বিশেষ ব্যতিব্যস্ত নয়,

    চমকে দেবার জিমন্যাস্টিক কবিতায় ভার হয়ে যায় । তার কোনও পৌরুষ নেই, নারীত্ব নেই, শুধু বিজ্ঞাপন আছে। মুখ ঢেকে দেওয়া....
  • একক | 24.96.39.210 (*) | ০৩ মে ২০১৪ ০৪:৫২73043
  • লেখাটি সম্ভাবনাময় । মোটের ওপর গোছানো । ৩ বার পড়লুম । তবে যৌনতা কিছু পেলুম না । উতেরফিলিয়া বা ফ্যালোফিলিয়া তো যৌনতা নয় । সেক্স অবশ্যই । একদিকে ভারসাম্যসর্বস্ব চিহ্ন প্রকৃতির নির্মাণ অপরদিকে মেষপালকদের পালের গোদা , এই একঘেয়ে কেন্দ্র সংঘর্ষের বাইরেও কিছু বলার ছিল যা ভারতের নিজস্ব । সেই টেকনিকালারিটি টা মিসিং । টান টান ধনুকের ছিলায় নিশ্চিন্ত বসা ফড়িঙ্গের চোখে যা । বা সেই চোখ কম্পাসকাঁটা দিয়ে খুবলে নিয়ে ব্লেডে চিরে স্লাইডের তলায় ফেলে তাকিয়ে থাকায় যা । আসলে কবির লেখা বলে আশা বেশি থাকে আর কী । এই সময়ের একটা জনার এর ডকুমেন্টেশন হিসেবে দিব্য হয়েছে ।
  • i | 134.171.20.255 (*) | ০৪ মে ২০১৪ ০৩:২৪73044
  • বি,
    দেবারতি মিত্র বা কবিতা সিংহের সমগ্র কবিসত্ত্বা নিয়ে লেখার কথা বলছিলাম না। সে সব এই লেখার প্রতিপাদ্যই নয়। কবিতা , দেবারতি, রাজলক্ষ্মী এই লেখায় এসেছেন, তাই এঁদেরই অন্য কিছু কবিতার উল্লেখ করেছিলাম কারণ আমার মনে হয়, ' আমি থাকি নিজমনে'- ও পরম্পরার বিপরীত মুখ। যশোধরা বৃত্তকে ছোটো করে আনার কথা গোড়াতেই বলেছেন, এবং তা করেওছেন, অসম্ভব ফোকাসড লেখা। কতকটা অধ্যাপকের ভাষণসুলভ, যা আমি রেফার করতে পারি কিন্তু বারে বারে তার কাছে ফিরে যেতে চাই না। ফোকাসটা সামান্য নড়লে হয়ত তা ঘটত। অবশ্য এ আমার একান্ত মত বা জলের কাছে গুনগুন।

    শিবাংশু দা,
    আরও এগিয়ে কিছু লেখার অধিকারী নই, তদুপরি হাতের কাছে বইপত্রও সব সময় পাই না। যেটুকু উদাহরণ ইত্যাদি দিতে পেরেছি এক্ষেত্রে, সেসবই আপনাদের ' দ' এর এক শীতের উপহারের কল্যাণে।দেবারতি মিত্রর 'জীবনের অন্যান্য ও কবিতা'। বিমল কর অবশ্য সঙ্গেই থাকেন সর্বদা।
  • Ranjan Roy | 24.96.62.138 (*) | ০৪ মে ২০১৪ ০৫:৩৪73045
  • পড়ছি। বেশ কয়েকবার। মূল লেখা। শিবাংশু ও ইন্দ্রাণীর বক্তব্য। কল্লোলের তামিল মহিলা কবিদের। এককের তোলা প্রশ্ন।
    নারীর নিজস্ব ভুবনডাঙা? বড় কৌতূহল। বড় জরুরী।
    কিন্তু আমি কি পাবো সেই প্রবেশাধিকার? জানি না।
  • Ranjan Roy | 24.96.62.138 (*) | ০৪ মে ২০১৪ ০৫:৪৬73046
  • স্ত্রীর দু'কাঁধ ধরে ঝাঁকালাম।
    -- কেন? কেন এমনি হবে? কেন তোমাদের বুঝতে পারছি না! কেন বুঝতে দাও না?
    উনি আস্তে করে হাতটা নামিয়ে দিয়ে বললেন-- কবেই বা বোঝার চেষ্টা করেছিলে? এই যে 'বুঝতে পারছি না- বুঝতে চাই' সিনড্রোম, এটাও একটা ভান, তোমাদের অহংকার। এই খবরটা পেয়ে গেছ যে আমাদের একটা নিজস্ব দুনিয়া আছে যার চাবিকাঠি তোমাদের চাই, তুলে দিতেই হবে? ঠিক যেমন করে বল-- খাওন দাও বা আরেকটা মাছ ভাজা দাও? এত সহজ়
  • pi | 24.139.221.129 (*) | ০৭ ডিসেম্বর ২০১৭ ০৪:৪৯73047
  • তুললাম।
  • Anonymous | 55.250.57.34 (*) | ২৮ মার্চ ২০১৮ ০৫:৩৪73048
  • ফেসবুক-এ অর্ক দেব এর ওয়ালে নিচের আলোচনাটি হয়েছিল। পাবলিক পোস্ট আর তাতেই সকলে কমেন্ট করেছেন। কদিন পরেই তো অন্যান্য ফীডের তলায় হারিয়ে যাবে। এখানে কপি করে রাখলাম। আশা করি সকলের অনুমতি নেওয়ার দরকার ছিল না।

    Arka Deb March 21 at 4:07pm •
    একটি সমস্যা উল্লেখ করছি। কেউ চ্যালেঞ্জ করলে খুশি হব।
    বাংলা কবিতায় পুরুষের প্রস্বর, পুরুষের আড়েঠাড়ে দৃষ্টি, পুরুষতন্ত্রের দ্বারা সিগনিফায়েড শব্দ, ফ্রেম যেভাবে এসেছে, মেয়েদের স্বর সেভাবে আসেনি, এমনকি মেয়েরাও নিজেদের চিনতে পারেনি, নিজেদের স্বতন্ত্র্য আইডেন্টিটির বয়ান লিখতে পারেনি। নিজেদের ঝাল খেয়েছে পুরুষের মুখে। লাঁকা জুঁয়েসেন্স বলে একটা টার্মিনলজি নতুন করে নিয়ে এসেছিলেন। রতির চূড়ান্ত তৃপ্তি / অচেতনে থাকা দুঃখের অবসান হল জুঁয়েসেন্স। লাঁকার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন ইরিগরি। ওরা দুজনেই বলছে পুরুষ আসলে কিছু লিঙ্গচিহ্ন বহন করে, ওগুলোই তার যৌনানুভূতির দ্যোতক, অনুভূতি লাভের জন্য নির্ভরশীল। অন্যদিকে একজন নারী ক্লিটোরাসের উপস্থিতির কারণে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তাছাড়া সারা শরীরে সে তার যৌনতাকে উপলব্ধি করতে পারে। প্রসঙ্গত যাহা কিছু সংকুচিত এবং প্রসারিত হয় তাই লাঁকার যুক্তিতে পেনিস, নারীরও নিজস্ব পেনিস আাছে (ক্লিটোরাস), তা মেহনসুখের জন্য পরনির্ভর নয়। এই নিজস্ব অনুভব অনুভূতি চিনতে পারলে বিষয়টি সে লিখে ফেলতে পারলে পেন ইকুয়ালসটু পেনিস এর রাজনীতির দিকে একটি নতুন টেক্সট, যাকে সেক্সট বলা চলে, তা ছুড়ে দেওয়া যেত। বাংলা কবিতায় তা হয়নি।
    আমার প্রিয় কবি দেবারতি মিত্র পুরুষের দর্শনে কবিতা লেখেন না, মেয়েদের অচেনা জগত, গোপন ইর্ষা, রিরাংসা ক্ষোভ অভিমান ক্ষমা তার কবিতায় ফিরে ফিরে আসে, আর আসে অতিলোকের ইশারা। মা থাকো, সতীন, জঙ্গলে কাটুল এসব মনে পড়ছে।
    সুতপা সেনগুপ্তর কবিতা পড়তে ভালো লাগে, "তুমি কী আসছো তুমি আসছো না তবে, এত কোন বৈভবে, সহ্য করেছো আমার অদর্শন"-অতুলনীয়। প্রতর্কের কিন্তুটা রয়েই যায়। যশোধরা রায়চৌধুরীর প্রথমদিকের কয়েকটি কবিতাও খুব প্রিয়।
    ঘোষিত নারীবাদী যেমন তাসলিমার কবিতা যেন ম্যানিফেস্টেশান বই কিছু নয়। তাছাড়া যে নারীবাদ স্বতন্ত্র স্বকীয় এবং অন্তঃসলীলা নয়, বরং পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমাত্র, ব্যক্তিগত ঝামেলার প্রতিকার, তা অসম্পূর্ণ, নিজেই নিজের ঘাতক।
    সম্প্রতি সংযুক্তা বন্দোপাধ্যায়ের উভচরী নামের একটি কবিতার বই বেরিয়েছে। আমি পড়িনি। আশাবাদী।
    এই পর্যন্ত জানি, বাংলা ভাষায় মেয়েরা সেক্সট লিখতে পারেন নি, বা এ যাবৎ চেষ্টা করেননি, বা সে চেষ্টা জনসমক্ষে আসেনি।
    বিরুদ্ধমত স্বাগত, আজ বললাম দিবস ফিবসে বেশি লোকের দৃষ্টি আকর্ষন করা যায় তাই।
    Kakali Sengupta দেখা হলে কথা হবে। শুধু এটুকুই নয়। এসব নিয়ে অনেক কিছু।
    Sadique Hossain স্বাগতা দাশগুপ্তর 'ওড টু মাই মাদারস জগালো'। অবশ্যই কবিতা সিংহ।
    Arka Deb স্বাগতা দাশগুপ্ত পড়ব। কবিতা সিংহ নিয়ে কিন্তু রইল। ওর অষ্টাদশ অশ্বারোহী ইত্যাদি কাজের ভক্ত আমি, ওর কবিতা সেক্সট বলছো তুমি? আমি আবার পড়ব।
    Prasun Mazumdar স্বাগতা লিখছে 'আমার মাসিক-রক্ত গড়িয়ে যায় তোমার বালিশের দিকে' -- স্মৃতি থেকে লিখলাম,তবু ব্যাপারটা এইরকমই।এটাকে কি সেক্সট বলা যাবে?
    Sudipto Ray একেবারেই অর্ক'র পোস্ট টা পরে স্বাগতা দাশগুপ্ত নামখানিই মনে এলো ... কুক্কুরী ও তাহার প্রেমিক পড়ে দেখতে পারো অর্ক আর সাদিক বাবুর উল্লিখিত বইখানিও অথবা আপনার আপনার :)
    Arka Deb Prasun Mazumdar এই যুক্তিটাই দিতে চাইছি।
    Anirban Lahiri না। এটা সেক্সট না। এটা কীরকম মেল গেজ। বেশিরভাগ মেয়েই বলেছে পিরিয়ড ব্যাপারটা তাদের মোটেই পছন্দ না। যৌন sensation আর তা নিয়ে আবেগের জায়গাটাও আদপেই টেকেনা তাহলে। ওটা পুরুষের hallu বা hal যাকে বলে। সেই ব্যাপারটা এক মেয়ের লেখা কবিতায় ফুটে বেরচ্ছে।
    Ballari Sen প্রশ্ন স্বাগত৷ মূলত বিষয়টি গবেষণাসাপেক্ষে বলতে পারি যে,চন্দ্রাবতীর কবিতা থেকেই শৃঙ্গারচিহ্ন নানা মাত্রা নির্মাণ করেছে ৷ কবিতা সিংহ তে বহুল প্রমাণ, দেবারতির পাশে বিজয়া মুখোপাধ্যায়, রমা ঘোষ ৷ সত্তরে রেভলিউশন এল নারীবীক্ষায়৷ ভাষ্য ও রতি বয়ান কেবল নয়, কৌণিক দৃষ্টি বিতর্ক তৈরি করেছে
    Arka Deb শৃঙ্গারচিহ্ন তো এই পোস্টের বিষয় নয়!
    Ballari Sen এটা নিয়ে হয়ত পৃথক লেখা জরুরি
    Arka Deb আপনি লিখুন, আমিও চেষ্টা করব দশক ধরে একটি আলোচনা তৈরি করার।
    Ballari Sen এটাই আমার গবেষণার বড় অংশ, বই হল এবার
    Anirban Lahiri আমি পড়বো।
    Arka Deb পড়ব।
    Arka Deb Ballari Sen পারলে আপনি দুতিনটি সেক্সটের উদাহরণ দিন। তাহলে সবচেয়ে পরিস্কার হয়।
    Anirban Lahiri অনেকদিন ঠিক করে কবিতা পড়িনি। তবে গত একবছর ধরে খুব নিবিড়ভাবে যৌনতার dynamism চর্চা করছি। তুমি যা বললে তাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর কোন কারণ নেই। তবে সুতপা সেনগুপ্ত আর যশোধরা রায়চৌধুরীর কবিতায় কী যেন বড়ো খামতি আছে।ধরে ধরে বলতে হবে। আর বাংলায় মেয়েদের থেকে সেক্সট ঠিক আসেনি। কিন্তু, এবার আসবে।
    Ballari Sen আসলে মেয়েদের কবিতার বয়ান সে ভাবে গবেষক পড়েননি
    Anirban Lahiri ঠিক। কখনো কখনো guided reading দরকার। গবেষক আর লেখক মিলেমিশে না গেলেও এই সমস্যাটা হয়।
    Ballari Sen চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার অংশকে এই ভাবে পড়তে পারি

    Arka Deb এটি কি বিষয়ানুগত হল?
    Rajarshi Das Bhowmik আশির পর থেকেই বাঙালি কবিদের মধ্যে পুরুষ ও নারী কবির অনুপাত প্রায় পঞ্চাশ পঞ্চাশ।একজন নারী কবি নারীদের কবিতা লেখেন না যেভাবে একজন পুরুষ কবি পুরুষদের কবিতা লেখেন না, তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের লেখাটি লেখেন। আপনি যে বিষয়টা উল্লেখ করেছেন, আমার ধারনা ছিল, বাংলা কবিতার আঙিনায় তা ইতিপূর্বেই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। 'মেয়েদের জগত' জানতে আর আমরা নারী কবিদের পড়ি না, আমরা আরেকটি বিশুদ্ধ স্বর খুঁজি,একজন মানুষের আত্মানুসন্ধান খুঁজি
    Arka Deb রাজর্ষি আপনি আমার প্রতর্কটি সম্ভবত ধরতে পারেন নি। যে যার নিজের লেখাটি লেখে, একমত। সোশাল সাইন্সের জায়গা থেকে পড়তে বসলে তার মধ্যে থেকেই গেজটি ধরা যায়। ধরুন জয়ের মালতীবালা.. সুবীর মন্ডল তার কাউন্টারে লিখেছে উতোর। পাঠমুক্তিতে মনে হয় দুটিই পুরুষের ভাষা, পুরুষের রেটোরিক, পুরুষের ফ্রেম। সারা পৃথিবীতেই তো সেক্সট একটি জঁর হিসেবে স্বীকৃত, অস্বীকার করব কেন।সেক্সট কিন্তু মেয়েদের জগৎ সংক্রান্ত মেয়েলি সন্দর্ভ নয়। একটি সেক্সট একটি বিশুদ্ধ স্বর হয়ে উঠতেই পারে। আমি তাকে বিশুদ্ধ কবিতাও বলব, সেক্সটও বলব।
    Rajarshi Das Bhowmik জানিনা এর কী উত্তর হয়, কারণ আপনার বক্তব্যে তত্ত্বের ভার যত বেশি, তাকে খাড়া করবার মত তথ্যগুলি মামুলি ও সীমিত। হয়ত, একাডেমিক পরিসরে এই ধরনের কাজ এখনও বেঁচে আছে, তাই জানতে পারিনি, কবি ও কবিতাপাঠকের প্রত্যাশা ও অভিজ্ঞতা থেকে অনেকটাই মুছে গেছে এটুকু বলতে পারি। 'কলোনি মোড়' এর শূন্য দশকের আর্কাইভে এখনও পর্যন্ত আমরা চারজন 'মহিলা' কবির বইয়ের সম্পূর্ন পিডিএফ আপলোড করেছি, পড়তে পারেন!
    Arka Deb অবশ্যই পড়ব। মেসেঞ্জারে লিঙ্ক দিলে খুব সুবিধে হয়। আমি নীচে গীতা চট্টোপাধ্যায়ের একটি কবিতা রেখেছি, একবার সময়মতো পড়ে দেখবেন।
    Ballari Sen দেবীপক্ষে লেখা কবিতা,প্রেমের কবিতা ২,চৈতালী চট্টোপাধ্যায়ের,

    Abhishek Jha এটা কোনোভাবেই সেক্সট নয়, মানে 'সেক্সট' নয়।
    Ballari Sen Abhishek Jha ধন্যবাদ
    Arka Deb Ballari Sen সম্ভবত আমি আমার বক্তব্য বোঝাতে পারিনি।
    অর্জুন রায়চৌধুরী Arka দা, কবিতা সিংহ'র কবিতা পড়ে দ্যাখো। অনুরাধা মহাপাত্র, মল্লিকা সেনগুপ্ত দ্যাখো। ইংরেজীর ক্ষেত্রে এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং দেখতে পার।
    Arka Deb ইংরেজি কবিতার কথা অপ্রাসঙ্গিক। যাদের কবিতার কথা বলছিস, তাদের কবিতার সাথে আমি পরিচিত নই এমনটা নয়। দু একটা সেক্সটের নমুনা দে।
    Ballari Sen অর্চনা আচার্য চৌধুরী, সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়,গীতা চট্টোপাধ্যায়, সুভদ্রা ভট্টাচার্য, ঊর্মীলা চক্রবর্তী, দেবাঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, অনুরাধা মহাপাত্র,সমালোচনার বই, মেয়েলি পাঠ/ সুতপা ভট্টাচার্য, শর্মিলা বসু দত্ত
    Abhishek Jha রতি বয়ান, শৃঙ্গার চিহ্ন বহন করলেই কি তাকে সেক্সট বলা যায়? আর একটি কথা প্রসঙ্গকে পাশ কাটিয়ে জানতে চাই, পুরুষের পক্ষে তো সেক্সট লেখা সম্ভব নয়, তবু যৌনতার ভাষ্য নির্মাণের সময় বিনয় মজুমদার ছাড়া আর কোন ১৯৫০ পরবর্তী পুরুষ কবি রয়েছেন যিনি ইউরোপীয় ডিসকোর্সের বাইরে গিয়ে কবিতায় যৌনতা ভাষ্য এনেছেন?
    Ballari Sen রমেন্দ্রকুমার,কেদার ভাদুড়ি,সংযম পাল, শামসের আনোয়ার, এরা নন?
    Arka Deb Samsher Anoyar varotio Pragadhunik , Non European mode e sorir k upsthapon korechen emon udahoron paini.Janle valo lagbe.
    Arka Deb Abhishek Jha Manindra Gupta er Sibstotro1,2 o Shibbij bopon koraemon onnano kobitaguli pore dekh. amar mone hoy uni loukik Shiber moddhe die asole varotio poragadhunik purus k dhorte chichen.
    Arka Deb অভিষেক হঠাৎ মনে পড়ল, অরুন বসু, ভুবন ও কামপোকা, মনে কর পড়েছিলাম একসাথে।
    অর্জুন রায়চৌধুরী প্রাচীন গ্রিক কবি সাফো'র কবিতা দেখতে পার।
    Arka Deb স্যাফো এখানে আসছে কীভাবে!
    Sumita Sen Kobita shingho ...mone pore jae.
    More gele shesh bashona
    E mukhe agun dio.
    Tobe he holka theke
    Konchati shamle nio.
    Arka Deb খুব ভালো কবিতা। আপনিই বলুন এটা কি একটা সেক্সট?
    Sumita Sen Janina arka ...
    Tomar kotha shunbo bole aaj, shunbo bole rakhinee kono kaaj.
    Tumi bolo...
    Aniruddha Dhar অর্ক
    আমার মনে হয় সেক্সট বলতে তুই যা বুঝছিস সেটা অনেকেই ধরতে পারেন নি, গুলিয়ে ফেলেছেন। ফলে অযথা বিবিধ মহিলা কবির নাম আসছে।
    আলোচনাটা মনোজ্ঞ হয়ে উঠত যদি তুই সেক্স টেক্সট -এর খান কয়েক উদাহরণ দিয়ে রাখতিস।
    Arka Deb একদম ঠিক অনিরুদ্ধ দা, আমি একটু অবসর পেলেই নমুনা দিচ্ছি।
    Shanta Bhattacharya "না আমি হবো না মোম
    আমাকে জ্বালিয়ে ঘরে তুমি লিখবে না।
    হবো না শিমুল শস্য সোনালী নরম
    বালিশের কবোষ্ণ গরম।
    কবিতা লেখার পরে বুকে শুয়ে ঘুমোতে দেব না।
    আমার কবন্ধ দেহ ভোগ করে তুমি তৃপ্ত মুখ;
    জানলে না কাটামুন্ডে ঘোরে এক বাসন্তী অসুখ "
    কিংবা
    'আমার অহংকারে আমি একা'কিংবাগোপনে সবাই বিফলতা ভয় করে
    সে সব পাথুরে পথে গেলামই না!
    নিজে বিদ্ধ হবে বলে তুমি ছাড়া কে আর ঈশ্বর।
    বধ্যভূমে আপনার ক্রশখানি বহে নিয়ে গেল,
    হা ঈশ্বর, হা ঈশ্বর! কাকে তুমি বিফলতা বলো?
    সফলতা গুলি বিফলতা?কবিতা সিংহ। এমনই এক জন কবি।
    অনেক আগে আরেকজনের কবিতা পড়েছিলাম। কাবেরী রায়চৌধুরী 'গর্ভাধান কাব্যকথা।' পড়তে পারেন।
    Arka Deb Shanta Bhattacharya প্রথম কবিতাটির জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।একটি তর্ককূট ফাঁদছি, আপনি একটু ভাববেন।ধরুন ক আর খ এর কোনো সম্পর্ক নেই। একো বলছেন এই নেইটাও একটা সম্পর্ক, একটা ট্রুথফুল প্রোপোজিশান। কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করে ভেবেছে ইন্ডিয়া, তার কাছে এইটাই সত্য। এই যুক্তিতে নাস্তি আস্তি হয়ে যাচ্ছে ওই কবিতায়। একজন নারী একজন পুরুষকে অস্বীকারের আছিলায় স্বীকার করছেন। যেন ভাষাহীন কোনো ক্রোধ রয়ে গেছে। যাকে ধরে তর্ক, বাহাস, সেই লাঁকাই বলেছে অপ্রকাশ্যই 'রিয়েল' । তাহলে কি তা আর এই কবিতা সেক্সট থাকছে? জানিনা বোঝাতে পারলাম কিনা।
    Shanta Bhattacharya যদিও তর্ককূট-এ নিষ্পত্তি হয় না। ভাবনা টুকু রাখার সুযোগ থাকে অবশ্যই। তবুও আমি কিছুটা না হয় মানলাম। পুরোটা না। এই কবিতা টা ধরে এগোলে কিছুটা আপনার মতের সাথে মিলবো ঠিকই কিন্তু আমি যদি আপনাকে 'ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা হলে' কবিতা টি শোনাতে পারতাম...' সহাবস্থানে থাকে অশ্রু এবং মূত্র তোমার শরীরে
    নাকি শুধু মূত্রই সম্বল!
    বিভিন্ন পাইপে যায় চক্ষু এবং শিশ্ন অভিমুখে।
    নারী হলে অভিধান অনর্গল খেউড় ছোটাত
    কিন্তু পুরুষ দেখো-- অসতী ' নামক শব্দ পুংলিঙ্গ হীন
    এবং 'বেশ্যা 'শব্দ এবং 'ছিনাল'!
    এভাবে চামড়া রাখো, দেহের চোখের।.... তোমার শিরায় থাকে ক্লেদ রক্ত সহাবস্থানে
    কাম ঘৃণা কাঁধে কাঁধ, ধাবমান থাকে ধমণীতে।
    তুমি কি জানবে কোন রসায়নে নারীর শরীর
    দুধ জল চিরে যায়, পরমাহংসীর শুদ্ধতায়!
    ....কবিতাটি দীর্ঘ। কবিতাসিংহ যে সময়ে ফসল রেখে গেছেন সেটি শক্তি, সুনীল, বিনয়, হাংরিআন্দোলন সর্বোপরি কবিতার ব্রহ্মান্ডে এক বিস্ফোরনের সময় যেন।সে জায়গায় দঁাড়িয়ে কবি হিসেবে সর্বোপরি নিজস্ব একটা ভাষা এবং অনুনকরণীয় এক অনুভবের জন্ম বড় নির্বেদ ভাবে রেখে গেছেন।
    সে ফসল উই এ কেটেছে শুধু।
    যেমন মান্টো র সম সাময়িক আরেক লেখিকা ইসমত চুঘতাই! ( সরি একটু অন্যদিকে মোড় নিল আলোচনা)।তবে 'সেক্সট' এই বিষয়টি একটা অ্যপ্রোচ হিসেবে ভাবছেন নিশ্চয়।
    সেদিক হতে বলবো কবিতা সিংহ এর কবিতার উপযুক্ত মূল্যায়ন হয় নি আজ পর্যন্ত। Arka Deb
    Ballari Sen দুঃখিত ভুল আমার,প্রথম অংশে এরকম পাঠ ভেবে জানিয়েছি,বিব্রত করায় ক্ষমাপ্রার্থী
    Arka Deb সেকী কী বলছেন! এতো স্বাস্থ্যকর তর্ক! এখানে দুঃখ পাওয়ার বা ক্ষমা প্রার্থনার কারণ নেই তো! আমি এখানে দুতিনজনকে জানি যারা নিয়মিত তর্ক করি, আড্ডা আরকি, যেমন অনির্বান লাহিড়ী। অভিষেক ঝা এত সাথে তো কাকচিল না বসা তর্ক হয়। আমরা দুঃখ পাই না, ক্ষমাও চাইনা, সমৃদ্ধ হই। আপনার রেফারেন্সে তো সমৃদ্ধই হলাম।
    Somnath Das Gupta মন্দাক্রান্তা-র নাম এলো না?
    Arka Deb মন্দাক্রান্তা এক ধরণের নারীবাদী প্রোপোজিশানে বিশ্বাস করেছেন,তাতে লিবারেশানের আকুতি আছে (শহীদমিনারে....
    ইন্দ্রকাকু ...), নারীর নিজস্ব জুঁইসেন্স আছে? দু একটা নমুনা দিন না, খুব ভালো লাগবে।
    Shanta Bhattacharya 'হৃদয় অবাধ্য মেয়ে'... মন্দাক্রান্তা কে চিনতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু একদা আবিষ্কার করলাম সেই যে মেয়েটা 'থুতু দিয়ে মুছে দেবে ' সব দলাপাকানো নির্মিতি এবং ফেটে পড়তে পড়তে কোথাও যেন হারিয়ে গেল।শব্দ কটা এলোমেলো ভেসে রইলো শুধু। আর খুঁজে পেলাম না তারপর মন্দাক্রান্তা কে।
    সুনন্দা সু কেউ মন্দাক্রান্তার 'পিতৃগমন' কবিতাটা দিতে পারেন?
    Somnath Das Gupta Arka বাংলা ভাষায় যে বস্তুটি আপনি খুঁজছেন সেটা অন্য কোনো ভাষায় পেয়ে থাকলে তার উদাহরণ দিলে পালটা নমুনার কথা ভাবা যায়। কিন্তু কি খুঁজছেন সেটা আন্দাজ করে তার উদাহরণ দিতে বসলে সেই অনন্ত সম্ভাবনার একটা একটা করে নেগেট করতে থাকা ছাড়া কিছু হবে বলে মনে হয় না। তাই প্রথম কয়েকটি উদাহরণ আপনার কাছেই বরং চাইব, অন্য ভাষায় কোন বস্তুটি পেয়েছেন যা বাংলা ভাষায় নেই বলে আপনার মনে হয়েছে? মন্দাক্রান্তার নাম এইজন্যে এলো যে, বেশ কিছু নারীদের কবিতার কথা উঠে আসছে এই আলোচনায় যাঁরা তাঁদের নারীত্বকে কবিতার বৈশিষ্ট্য হিসেবে, স্বকীয়তা হিসেবে ব্যবহার করেছেন উদযাপন করেছেন। লিঙ্গরাজনীতির প্রতি তাঁদের মনোযোগ ও সচেতনতা কবিতায় চিনে নেওয়া গেছে। অন্তত কবিতা পড়ে রচয়িতা যে নারী এটা প্রকট বা বলা ভালো নির্মম / অনিবার্য ভাবে সামনে এসেছে। কবিতার বিষয় যৌনতা বা আত্মরতি হলে বা না হলেও। এখন সবার রচনা সমগ্র পড়ে আলোচনা শুরু করা তো আর সম্ভব নয়।
    Abhishek Jha The Armadillo
    BY ELIZABETH BISHOP
    for Robert Lowell
    This is the time of year
    when almost every night
    the frail, illegal fire balloons appear.
    Climbing the mountain height,rising toward a saint
    still honored in these parts,
    the paper chambers flush and fill with light
    that comes and goes, like hearts.Once up against the sky it's hard
    to tell them from the stars—
    planets, that is—the tinted ones:
    Venus going down, or Mars,or the pale green one. With a wind,
    they flare and falter, wobble and toss;
    but if it's still they steer between
    the kite sticks of the Southern Cross,receding, dwindling, solemnly
    and steadily forsaking us,
    or, in the downdraft from a peak,
    suddenly turning dangerous.Last night another big one fell.
    It splattered like an egg of fire
    against the cliff behind the house.
    The flame ran down. We saw the pairof owls who nest there flying up
    and up, their whirling black-and-white
    stained bright pink underneath, until
    they shrieked up out of sight.The ancient owls' nest must have burned.
    Hastily, all alone,
    a glistening armadillo left the scene,
    rose-flecked, head down, tail down,and then a baby rabbit jumped out,
    short-eared, to our surprise.
    So soft!—a handful of intangible ash
    with fixed, ignited eyes.Too pretty, dreamlike mimicry!
    O falling fire and piercing cry
    and panic, and a weak mailed fist
    clenched ignorant against the sky!
    Abhishek Jha একটি উদাহরণ দিলাম।
    Abhishek Jha The Operation
    BY ANNE SEXTON
    1.After the sweet promise,
    the summer’s mild retreat
    from mother’s cancer, the winter months of her death,
    I come to this white office, its sterile sheet,
    its hard tablet, its stirrups, to hold my breath
    while I, who must, allow the glove its oily rape,
    to hear the almost mighty doctor over me equate
    my ills with hers
    and decide to operate.It grew in her
    as simply as a child would grow,
    as simply as she housed me once, fat and female.
    Always my most gentle house before that embryo
    of evil spread in her shelter and she grew frail.
    Frail, we say, remembering fear, that face we wear
    in the room of the special smells of dying, fear
    where the snoring mouth gapes
    and is not dear.There was snow everywhere.
    Each day I grueled through
    its sloppy peak, its blue-struck days, my boots
    slapping into the hospital halls, past the retinue
    of nurses at the desk, to murmur in cahoots
    with hers outside her door, to enter with the outside
    air stuck on my skin, to enter smelling her pride,
    her upkeep, and to lie
    as all who love have lied.No reason to be afraid,
    my almost mighty doctor reasons.
    I nod, thinking that woman’s dying
    must come in seasons,
    thinking that living is worth buying.
    I walk out, scuffing a raw leaf,
    kicking the clumps of dead straw
    that were this summer’s lawn.
    Automatically I get in my car,
    knowing the historic thief
    is loose in my house
    and must be set upon.2.Clean of the body’s hair,
    I lie smooth from breast to leg.
    All that was special, all that was rare
    is common here. Fact: death too is in the egg.
    Fact: the body is dumb, the body is meat.
    And tomorrow the O.R. Only the summer was sweet.The rooms down the hall are calling
    all night long, while the night outside
    sucks at the trees. I hear limbs falling
    and see yellow eyes flick in the rain. Wide eyed
    and still whole I turn in my bin like a shorn lamb.
    A nurse’s flashlight blinds me to see who I am.The walls color in a wash
    of daylight until the room takes its objects
    into itself again. I smoke furtively and squash
    the butt and hide it with my watch and other effects.
    The halls bustle with legs. I smile at the nurse
    who smiles for the morning shift. Day is worse.Scheduled late, I cannot drink
    or eat, except for yellow pills
    and a jigger of water. I wait and think
    until she brings two mysterious needles: the skills
    she knows she knows, promising, soon you’ll be out.
    But nothing is sure. No one. I wait in doubt.I wait like a kennel of dogs
    jumping against their fence. At ten
    she returns, laughs and catalogues
    my resistance to drugs. On the stretcher, citizen
    and boss of my own body still, I glide down the halls
    and rise in the iron cage toward science and pitfalls.The great green people stand
    over me; I roll on the table
    under a terrible sun, following their command
    to curl, head touching knee if I am able.
    Next, I am hung up like a saddle and they begin.
    Pale as an angel I float out over my own skin.I soar in hostile air
    over the pure women in labor,
    over the crowning heads of babies being born.
    I plunge down the backstair
    calling mother at the dying door,
    to rush back to my own skin, tied where it was torn.
    Its nerves pull like wires
    snapping from the leg to the rib.
    Strangers, their faces rolling lilke hoops, require
    my arm. I am lifted into my aluminum crib.3.Skull flat, here in my harness,
    thick with shock, I call mother
    to help myself, call toe to frog,
    that woolly bat, that tongue of dog;
    call God help and all the rest.
    The soul that swam the furious water
    sinks now in flies and the brain
    flops like a docked fish and the eyes
    are flat boat decks riding out the pain.My nurses, those starchy ghosts,
    hover over me for my lame hours
    and my lame days. The mechanics
    of the body pump for their tricks.
    I rest on their needles, am dosed
    and snoring amid the orange flowers
    and the eyes of visitors. I wear,
    like some senile woman, a scarlet
    candy package ribbon in my hair.Four days from home I lurk on my
    mechanical parapet with two pillows
    at my elbows, as soft as praying cushions.
    My knees work with the bed that runs
    on power. I grumble to forget the lie
    I ought to hear, but don't. God knows
    I thought I’d die—but here I am,
    recalling mother, the sound of her
    good morning, the odor of orange and jam.All’s well, they say. They say I’m better.
    I lounge in frills or, picturesque,
    I wear bunny pink slippers in the hall.
    I read a new book and shuffle past the desk
    to mail the author my first fan letter.
    Time now to pack this humpty-dumpty
    back the frightened way she came
    and run along, Anne, and run along now,
    my stomach laced like a football
    for the game.
    Abhishek Jha আরেকটি।
    Somnath Das Gupta Abhishek Jha The Armadillo
    BY ELIZABETH BISHOP
    for Robert Lowell - এটা কিসের উদাহরণ? সেক্সট? নারীর নিজস্ব জুঁইসেন্স?
    Abhishek Jha Robert Lowell ke utsorgo'r sathe sext er kono birodh achhe naki?
    Somnath Das Gupta নামটা কপি করলাম, কিন্তু সেটা পড়ে কোথাওই সেক্সট মনে হল না তো!
    Abhishek Jha কেন? যদি জানান...
    Somnath Das Gupta যুদ্ধবিরোধী বক্তব্য মনে হল। না জানলে নারীস্বরও চেনা দুষ্কর। আপনার কোথায় একে সেক্সট মনে হল? কোন চিহ্নে বা লক্ষণে? এ সম্পর্কে যা পড়লাম তাতেও কোথাও শরীর বা লিঙ্গরাজনীতির উল্লেখ পেলাম না।
    Abhishek Jha apni kobita'r shoreer'e na giye criticism'e chole gechhen!!! kobita'r shoreer'er ulki chinho'gulo ektu kheyal korun...
    Somnath Das Gupta ২-৩ টি এমন উল্কি ধরিয়ে দিন। আমার পাঠে একটাও ধরা দিল না যে। এ কবিতা একজন পুরুষ লিখতে পারতেন না এমন একটিও লক্ষণ আছে কি? তার আগে অবশ্য জানা দরকার @Arka ও কি এটিকে সেক্সট বলবেন?
    Agnidip Mukhopadhyay প্রথমে ভাবছিলাম খুব জটিল পোস্ট, লাইক দিতেও ভয় লাগছিল, মন দিয়ে পড়ে দেখলাম, তত্ত্ববহুলতার আড়ালে যেটা তুমি বলতে চাইছ তা হল, বাংলা কবিতায় ফিমেল গেজ। লাকার অংশ-টা অহেতুক বিষয়টাকে জটিল করেছে।এখন, কথা হল 'ঘোষিত নারীবাদী যেমন তাসলিমার কবিতা যেন ম্যানিফেস্টেশান'- বই কিছু নয়, এটা কে ঠিক করল? তার চেয়েও বড় কথা এটা কীভাবে ঠিক হল! আমার তোমার মত পুরুষরা এরকম হাকিমি মন্তব্য করতেই পারি, কিন্তু তার মধ্যে মধ্যে দিয়ে যেটা বেড়িয়ে আসে সেটা হল পুরুষতন্ত্র- প্রণীত নারীবাদের সুস্পষ্ট ঊচ্চারণ। দেবারতি মিত্রের কবিতায় মেয়েদের 'অচেনা জগত'টা কার কাছে অচেনা? দেবারতি মিত্রের কাছে? না পুরুষ-পাঠকের কাছে? ধরে নিচ্ছি দ্বিতীয়টা। পুরুষ পাঠকের কাছে নারীর অচেনা জগত তুলে ধরা - এটা যদি তুমি ফিমেল গেজ বলে মনে কর, তাহলে আমার কিছু বলার নেই। ব্যপারটা যেন এরকম, আপনি 'নারীকবি' আপনি এক্সক্লুসিভ কিছু দিন। তসলিমার মত, পপুলার (পড়তে হবে মেল ডোমেনে আলোচিতব্য ও নির্ধারিতব্য) বিষয়ে কিছু বলবেন না। একজন নারীকে কেন সচেতন থাকতে হবে কবিতা লেখার সময়? 'ব্যক্তিগত ঝামেলার প্রতিকার'-এও একজন নারী কবিতা লিখতেই পারেন, সুবোধ সরকার তো সৌরভ গাঙ্গুলির ছয় মারা নিয়েও কবিতা লেখেন। আমরা বলতে পারি এই কবিতাটা পড়ে আমার কী মনে হয়েছে, এই কবিতার রাজনীতির সাথে আমি কনফ্রন্ট করতে পারছি কি পারছি না।গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে বর্জনযোগ্য মনে হচ্ছে। কিন্তু তোমার লেখায় ব্যপারটা দাড়াচ্ছে এমন যে তোমার লেখা সংবিধানে সই করলে, তবে তা রাজনীতি বলে স্বীকৃত হবে, তারপর তার গ্রহণ-বর্জন ভাবা হবে।'পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ'-এর সাথে 'মাত্র' জুড়ে দেওয়াটা একটা অপরাধ। একজন পুরুষ যদি যুদ্ধবিরোধী কবিতা লেখেন, তুমি কি বলবে এই কবিতা যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমাত্র? শান্তির অন্তঃসলিলা বানী নয়। আর সমস্ত কবিতা গূঢ় হতে হবে কেন? কিছু কবিতা সময়ের প্রয়োজনে লেখা হয়। সেই কবিতার সমস্ত মর্মার্থ তার গায়েই লেগে থাকে। খোসা ছাড়াতে হয় না।আর, 'স্বতন্ত্র স্বকীয়' নারীবাদ বলে কিছু হয়না। সোনার পাথরবাটি। নারীবাদের মান্য স্ট্রাকচার আছে, যা যেকোন অবদমিত নারী এডপ্ট করতে পারেন। এবং পারেন বলেই নারীবাদ একটি বাদ।হ্যা, সেই 'বাদ'কে আরো ধারালো অবশ্যই করা যেতে পারে। আমার কথাগুলো আক্রমণাত্মক শোনালে নিজগুণে ক্কক্ষমা করে দিও, কিন্তু তসলিমা নাসরিনকে তুমি যেভাবে বুঝেছ, তা নিন্দার্হ বলে মনে করছি। এবং পুরুষতন্ত্রের এক্সপ্লিসিট প্রকাশ হিসেবেই দেখছি।
    Arka Deb এই আক্রমণ তো আমিও তোমাকে করে থাকি প্রায়শ, বা পেয়েও থাকি। তর্ক স্বাগত। প্রথমেই তর্কটা খারিজ হয়ে যায় কারণ তুমি বোঝোনি আমার প্রোপোজিশান। এটা একটা লাক্রিয়ান - ইরিগারি যুক্তিই। ফিমেল গেজের কথা বলাই হয়নি। তাসলিমার কথায় দেখবে একটা 'যেন' আছে, ওটা সংশয়ের চিহ্ন, অর্থাৎ আমার খটকা। দেবারতি মিত্র আমার তোমার কাছে নয় বাংলা কবিতার বিষয়ের নিরিখে নতুন। ফিমেল গেজ এমন দাবি করিনা। আর হ্যাঁ যে যার মত যা খুশি বিষয়ে কবিতা লিখবে। আমার রাজনীতি দিয়ে তাকে কবিতা কম প্যামফ্লেট বেশি ভাববে। এটা তো আমার ভাবনা। মাত্র শব্দটিকে তুমি ভুল রিড করছো, এটি অনন্ত সম্ভাবনাকেই চিহ্নিত করে। কবিতা গূঢ় হবে না আখের গুড় হবে সেটা কবির অভিপ্রায়ের ওপর নির্ভর করে। আমরা বড়জোর পছন্দ অপছন্দ ভাবনা চিন্তা শেয়ার করতে পারি। আপাতত এইই, প্রতর্কের মূল জায়গাটার বিষয়ে আবার লিখব বা দেখা হলে কথা বলব।
    Ballari Sen আমি আপনার বক্তব্যে একমত
    Agnidip Mukhopadhyay Arka Deb আচ্ছা। 'তাছাড়া যে নারীবাদ স্বতন্ত্র স্বকীয় এবং অন্তঃসলীলা নয়, বরং পুরুষতন্ত্রের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমাত্র, ব্যক্তিগত ঝামেলার প্রতিকার, তা অসম্পূর্ণ, নিজেই নিজের ঘাতক।' এখানে কোন যেন নেই। তোমার লাক্রিয়ান-ইরিগারি যুক্তিটা যুক্তিই হয়ে আছে। 'আমার প্রিয় কবি দেবারতি মিত্র...আমি পড়িনি। আশাবাদী।' -এই অংশের সাথে তোমার 'যুক্তি' অংশের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এই অংশটির বক্তব্য পরিষ্কার, সেই বক্তব্য অনেকদিন ধরেই অনেক লোকে বলে আসছেন, 'মেয়েদের নিজেদের লেখা' কোথায় ইত্যাদি প্রভৃতি। যাই হোক, আমি আরো দু'চারবার পড়ে ভেবে দেখব।
    Sanhita Dasgupta Agnidip Mukhopadhyay bhalo ebong thik bolechis...
    Anirban Lahiri অর্ক,আরো একটা সমস্যা আছে। দেরিদা, সিসু এঁরা সেই কবে দেখিয়েছিলেন যে ভাষা (যে কোন ভাষা, বা ভাষার universal paradigm (ঠিক Chomsky-র অর্থে নয়। Chomsky-র Universal grammar বা syntax, কোথাও কোথাও diction-য়ের ধারণা কে চ্যালেঞ্জ জানানো যায় তা John Maynard Smith আর Steven Pinker দেখিয়েছেন। তবে তা অন্য বিষয়)) phallic, logocentric। পুরুষতান্ত্রিক কেন্দ্রায়ণের বাইরে বেরলে তা আর ভাষা থাকেনা, gibberish হয়ে যায়। তাই নারী কখনোই তার নিজস্ব ভাষায় কথা বলতে পারবেনা, কিন্তু তার যে ভাষা আলাদা (এ নিয়েও তর্ক আছে। কিন্তু, তোমার এই আলোচনার বিষয়ের সাথে এটার যোগ ঘনিষ্ঠ) তা নিয়ে সংশয় নেই। সেই আলাদা ভাষার ছোঁয়া সে (বা কোন পুরুষও হয়তো) দিতে পারবে ভাষার paradigm-কে প্রশ্ন করে।এখন, পুরুষ যে ভাবে নারীর লেখাকে পড়ছে, বা নারী পুরুষের সাথে communicate করার জন্য লিখছে কিনা, বা নারী অন্য নারীর সাথে কথা বলছে লেখার মধ্যে দিয়ে - এই সব জায়গায় পুরুষের ভাষাই ব্যবহৃত হচ্ছে। কারণ অন্য কোন ভাষা নেই।সেক্ষেত্রে নারীর নিজের কাছে নিজের লেখার যে চিহ্নন, connotation-ও বলতে পারি এখানে, তা পুরুষের কাছে অধরা থেকে যায়, এই ব্যাপারটা পুরো যুক্তিসংগত নাও হতে পারে। আর এখানে ধরে নেয়া হচ্ছে নারী একটা homogeneous সত্তা। (ঠিক racism-য়ের যুক্তি। এই যুক্তি Stephen Jay Gould তাঁর Mismeasure of Man বইয়ে খণ্ডন করেছিলেন।) এটাও তর্কের বিষয়।এটা হতেই পারে কোন নারীর খুব ব্যক্তিগত জৈবিক-আন্তরিক expression একজন পুরুষ ঠিক সেই নারীর মতো করে যতটা বুঝল, অন্য কোন নারী বোঝার ব্যাপারে তার ধারে কাছেও এলনা।এবং, এর পরেও, নারীর নিজস্ব ভাষা নেই এই ধারণাটা feminism-য়ের কিছু school মেনে নেয়না। অন্তত এভাবে নেয়না।
    Somnath Das Gupta ইন জেনারেল নারীর ভাষা বিষয়ে বললেন? কিন্তু অর্ক বলছেন অন্য ভাষায় এটা পেয়েছেন, বাংলাতে পান নি।
    মহাবোধি চক্রবর্তী অন্য ভাষা থেকে হলে, আমি একটা উদাহরণ দিই? এটা আসলে গ্রিক ভাষায় লেখা, আমি ইংরিজি অনুবাদে পড়েছি। ওপরে স্যাফোর উল্লেখ করেছেন একজন। এই কবিতাংশটাকে স্যাফো ৩১ বলা হয়।
    মহাবোধি চক্রবর্তী একটা মরমিয়া রিডিং প্রয়োজন। আমার হাতের কাছে এই অনুবাদটা আছে, গুগল করলে হয়ত বার্নার্ডের অনুবাদটাও পাব। মনে হয় না সেটা খুব একটা আলাদা হবে। লক্ষ্যমীয় 'দেবপ্রতিম' পুরুষটিকে দেখে কবিপার্সোনার শরীরে যে আলোরণ হচ্ছে, কোন রেটরিকে স্যাফো সেটাকে ধরেছেন। তুঙ্গ মুহূর্তের অনুভূতি শব্দে ধরা পড়ছে, পুরুষ শরীর বায়োলজিকালি এই অনুভূতিধারণে অক্ষম।

    মহাবোধি চক্রবর্তী জিভ, ত্বক, ঘাম, শরীরের অনুষঙ্গে স্যাফো কী বলছেন, কীভাবে বলছেন দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। একটা ভীষণ ভাল প্রবন্ধ আছে, ডলোরা ও'হিগিনসের, স্যাফোস স্প্লিন্টারড টাং বলে। দুটো কবিতাকে একসঙ্গে ধরে বীভৎস কিন্তু অসামান্য কাটাছেঁড়া। ক্লাসিক কবিতা সমালোচনার ক্ষেত্রে অন্তত, আমি এই প্রবন্ধটার সমতুল্য কিছু এখনও পড়িনি। চাইলে লেখাটা মেল করতে পারি। যাইহোক, আমি নিশ্চিত নই, এই কবিতাটার মত দু'একটা হয়ত বাংলা ভাষাতেও আছে। কিন্তু Arka'র পোস্ট অনুযায়ী এটুকু নিঃসন্দেহে স্পষ্ট যে চোখে পড়ার মত উপস্থিতি তার নেই। যেকারণে জ্যুয়েসাঁর সোশিয়লজিটা বিচার্য। আধুনিকতা, সভ্যতা আর রাষ্ট্র এদের একত্র সমাহারে জ্যুয়েসাঁর অস্তিত্ব বা পূর্ণত্ব থ্রেটনিং। স্বাভাবিকভাবেই নারীস্বর ভাষা পায় না। স্যাফোকেই কি কম ঝামেলা পোয়াতে হয়েছিল নাকি! স্যাফোর লেখাকে ম্যাসকুলিনাইজও করা হয়েছে কত ক্ষেত্রে অনুবাদের সুযোগ নিয়ে।
    Anirban Lahiri মহাবোধি চক্রবর্তী পুরুষ শরীর biologically এই অনভূতিধারণে অক্ষম, না culturally?
    Anirban Lahiri biology নিয়ে তো এ বিষয়ে বেশি কাজ হয়নি। ইমোশনাল নিউরোলজি ইমোশনাল শরীর নিয়ে hard science-এ প্রচুর কাজ হচ্ছে এখন। কিন্তু, এই কাজগুলোও খুব বেশিদিন আগে শুরু হয়নি।লাকানিয়ান সাইকোলজি, বস্তুত যে কোন সাইকোলজি, এবং সাইকয়াট্রি প্রচণ্ড subjective এবং symptomatic। নিপুণ causality-র নিরিখে তার থেকে বেরিয়ে কাজ তেমন হয়নি এখনো।
    মহাবোধি চক্রবর্তী একেবারেই বায়োলজিকালি অক্ষম। সেক্স আর জেন্ডার আলাদা বলেই বলছি। মেয়েসত্তাটা সোশ্যাল-কালচারাল কনস্ট্রাক্ট। শরীরটা নয়। অ্যারাউজালের সময়ে বিপি, সোয়েটিং ইত্যাদি শরীরবৃত্তীয় ক্রিয়া আলাদা হারে হয়। অ্যারাউজালের ঘনঘনত্ব, তাৎক্ষণিকতা আলাদা হয়, শ্যালো সিডাকটিভে পুংশরীর বেশি উত্তেজনাপ্রবণ। এরকম অনেক তফাৎ, যেগুলো বায়োলজিকালিই ডিটারমাইন্ড হয়।
    শেষ বাক্যদুটো ভীষণই ঠিক বলেছেন। সম্পূর্ণ সহমত। এবং অনেকক্ষেত্রে ইন্ডাকটিভ ফ্যালাসিতে ধরা পড়ে যায় পুরো সাইকোঅ্যানালিসিসের প্রক্রিয়া। সাইকোলজিকেও একইভাবে প্রশ্ন করা যায় নিশ্চয়ই। কিন্তু সেটা আমার বিষয় না।
    Somnath Das Gupta স্যাফোর কবিতাটা পড়ে অবধি এই দুটোর কথা মাথায় আসছিল বারবার। একটি অবদমনের আরেকটি লুকোনো উদযাপনের, কিন্তু দুটোই কি চূড়ান্তভাবে মেয়েলি অনুভূতির উচ্চারণ যা ছেলেদের পক্ষে অননুভবসম্ভব।

    Barun Chattopadhyay শীর্ষসুখের সমকক্ষতায় আনন্দরাগ শব্দের প্রয়োগ দেখেছিলাম সুতপা ভট্টাচার্যের কোনো লেখায়।
    Sumita Sen E pake padma ele
    Dekho jeno tule boshona
    Aha ki darun gile
    Babu jeno bhaj porena...
    Niontrito, kintu sex er eengit bahok bhasha / sex er bodole maithun shobdo byabohar kore text likhle ki aajker din e sextext bola jabe?
    Amar mote jai....
    Nognotake ektukro kapor porale jemon aslil hoe jai na, athocho aneker kache uddipok matra pae .
    Hoeto bahu munir bahumot.
    Abar joto mot toto poth !
  • অকবি | 127.194.201.35 (*) | ৩১ মার্চ ২০১৮ ০৬:৫৯73050
  • বন্ধুনির রাগটা একটু অকারণ মনে হল। এখানে খোঁজটা একটু স্পেসিফিক। যেমন কেউ যদি খুঁজতে বসে রান্নাঘরের রেফারেন্স ছেলেদের কবিতা লেখায় কিভাবে এসেছে - এই ধারণার ভিত্তিতে যে - বাংলায় মেয়েরা যেভাবে অ্যাকটিভ রান্নাঘর ইউজ করেন, পুরুষরা সেভাবে নয়, পুরুষদের লেখায় বড়জোর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা গন্ধ বা করে আনা রান্নার উল্লেখ থাকবে। কিন্তু নিজে রান্না করা আর তার নানা অনুষঙ্গের উল্লেখ এমনকি উপমা রূপক হিসেবেও পুরুষদের কবিতায় মোটেই সহজলভ্য নয় - তার মানে কি এটা বলা যে পুরুষদের লেখালেখি রান্না করা আর খাওয়া দাওয়ার বাইরে বেরোয় না বলা হল? সামাজিকভাবেই মেল গেজ জিনিসটা যখন ভীষন বাস্তব, যৌনতা বা যৌন এক্সপ্রেশন জিনিসটার একটা পুরুষতান্ত্রিক ডেফিনেশন, অ্যাপ্রোচ, দৃষ্টিভঙ্গি সর্বজনগ্রাহ্য এবং অবশ্যমান্য হয়ে উঠছে, তখন এই বিষয়গুলোর যে একটা সমান্তরাল বা বিপরীত বা একেবারে অনন্য ফিমেল গেজ বা ভয়েস ছিল, রয়েছে, কবিতায় কখনো ধরা পড়েছে- এই খোঁজটা অমূলক হতে যাবে কেন? এই খোঁজের মানে মেয়েরা শুধু শরীরগন্ধী লেখে, সেরিব্রাল কবিতা লেখেনা সেটাই বা হতে যাবে কেন?
  • Arunima Mandal Das | 52.110.137.50 (*) | ৩১ মার্চ ২০১৮ ১২:২৬73051
  • Good
  • Atoz | 161.141.85.8 (*) | ৩১ মার্চ ২০১৮ ১২:৪৪73049
  • এক বন্ধুনি এই তক্ক শুনে চরম রেগেছে। বলল, "হ্যাঁ, তা আর নয়? যত ধ্যানমগ্ন দার্শনিকতা, যত উচ্চমার্গের আত্মানুসন্ধান, যত আত্মানং বিদ্ধি, যত গাণিতিক উন্মাদনা, যত ঋদ্ধি সিদ্ধি পরমার্থ , যত দৃশ্যত সুনীল প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ ---এইসব উচ্চকোটির ব্যাপার তো সব পুরুষ কবিদের জিনিস। আর মহিলা কবি? তেনারা তো আরশোলা! যাদের সাধ হয় লোকে বলুক পাখি! তেনাদের দৌড় যত জুঁইসেন্স নুইসেন্স সেক্সট মেকস্ট ইত্যাদি পর্যন্ত। মাথা কই ওদের? শরীরটুকু ছাড়া আছেই বা কী ঐ গর্দভীদের?---এইভাবে আলাদা করে আলোচনা জিনিসটাই তো পিতৃতন্ত্রের দ্বারা মেয়েদের দিয়ে বাঁদরী-নাচ নাচানো। নইলে কবি কথাটাই তো জেন্ডার-নিরপেক্ষ হওয়া উচিত। আত্মায় তো লিঙ্গভেদ নেই ! আর যদি ভাগই করা হয়, তাহলে পুরুষ কবিদের অবদমিত যৌনভাষ্য, ইত্যাদি নিয়েও সমান্তরাল আলোচনা চলতো। কিন্তু তাহলে তো মহিলা-কবি জাতীয় ঐ হাঁসজারুটি তোলা যায় না। ধরেই যেন নেওয়া হয়েছে কবিমাত্রেই পুরুষ, যেসব মহিলা জোরজার করে কবিতা লিখছেন তাঁরা ঐ জুইঁসেন্স টাইপ। "
  • অর্জুন অভিষেক | 55.124.6.209 (*) | ০১ এপ্রিল ২০১৮ ০৪:৩৮73052
  • অসাধারণ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি লেখা। খুব বড় লেখা তাই পড়তে সময় লাগল।

    এই লেখাগুলোয় সমৃদ্ধ হওয়া যায়।

    এখানে একটি ছোট ফ্যাকচ্যুয়াল এরোর আছে।

    রাজলক্ষ্মী দেবীর ২০০২ নয়, ২০০৫ এ প্রয়াত হন। প্রবাসিনী লেখিকা। পুনেতে পড়ার সময় তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম।
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত