ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • একটা অ-সমাপ্ত গল্প (পর্ব: 36 - ??? )

    Kaushik Ghosh লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৩ মে ২০১৪ | ১৫৫১ বার পঠিত
  • ৩৬।

    একা থাকার অভ্যেসটা অনেক দিনের।ধীরে ধীরে, তিলে তিলে রপ্ত করা। অভ্যেসটা কবে থেকে রপ্ত করা শুরু করেছেন তা আর আজকে মনে পড়ে না। পাবনায় যাওয়ার পর থেকেই কি? না বোধহয়! কোলকাতার আলোক মালার বৃত্তের মাঝেই হয়ত শুরু হয়ে গেছিল এই একাকিত্বের যাত্রা; হয়ত সেটাকে চিহ্নিত করে উঠতে পারেননি তখন – এই যা! নাকি পেরেছিলেন ? শুধু নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য যেটুকু ব্যসন আসনের দরকার হয়, সে গুলির আড়ালটা ব্যবহার করেছিলেন মাত্র! আর তারো আগেকার, মানে কার্সিয়াঙের জীবনটাকে ধর্তব্যের মধ্যে আনা চলেনা। ঐ বালিকা বয়সে কেউ একা থাকে না। একা তো মানুষ হয় নিজের মনে।অতটুকু বয়সে মন একা থাকা শেখে না।

    মন যবে থেকে একা থাকা শিখল, শরিরটা তখন চলে এসেছে কলকাতায়। বাহ্যিক আড়ম্বরের
    আড়ালে আস্তে আস্তে যে একজন একা মানুষে পরিনত হচ্ছেন, সেটা তখন বুঝে উঠতে পারেননি ছবি। আজ আর তাই একা থাকতে কোন অসুবিধে হয় না। বরং বেশ স্বছন্দই লাগে।

    লাগে কি?

    ঝাপসা হয়ে যাওয়া চশমার কাঁচটাকে আঁচলে মুছে উঠে পড়লেন খাট থেকে।পায়ে পায়ে এসে দাঁড়ালেন খোকনের ঘরটার সামনে। এখানটায় আগে একটা চাঁপা গাছ ছিল, ঘরটা তৈরি হওয়ার সময় কাটা পড়েছে। খোকার বিয়ের আগে তৈরি হয়েছিল ঘরটা।
    ঘরের দরজায় আলগা শেকল তোলা। মনে হচ্ছে – বৌমা যেন কলঘরে গেছে। ফিরে এসে বলবে – একি মা! আপনি বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে এসে বসুন না!

    বুকের ভেতরে আটকে থাকা শ্বাসটা বেরিয়ে এল। কর্তার ঘরে চলে এলেন, ওখানটায় আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। কর্তা এখন স্কুলে। ফাঁকা ঘরের খাটটায় উঠে বসলেন ছবি। চোখ গেল কর্তার বইয়ের তাকটার দিকে। বেশ কিছু দিন হল মানুষটা সাহিত্যের দিকে ঝুঁকেছেন। আগেও যে সাহিত্য পাঠ করতেন না তেমনটা নয়, কিন্তু পঠিত বিষয়ের বেশির ভাগটাই জুড়ে থাকত দর্শন। সাহিত্যের মধ্যে তখন মূলত পড়তেন শেক্সপিয়র বা ওয়র্ডসওয়র্থ। একই পিস্ পড়তেন অনেক, অনেকবার করে। ইদানিং অবশ্য নতুন লেখকদের বইও পড়ছেন। এটা কি মানুষটার কোন মানসিক পরিবর্তনের দ্যোতক? হবে হয়ত!

    মানুষটাকে মনে মনে প্রনাম জানিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এলেন ছবি। ফাঁকা বাড়িটা যেন খোকার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে আরো বেশি করে। এত অবুঝ তো ছবি ছিলেন না কোন দিন! চাকরির নিয়ম অনুসারে খোকনকে যদি অন্য শহরে বাসা বাধতেই হয় তাতে এত বিচলিত হয়ে পরলে চলবে কেন! নিজের এই মানসিক কষ্টের জন্য কি উনি বৌমাকে দায়ি করছেন কোন ভাবে? ছি ছি, এ কেমন কথা, ওনার শোভার বয়সী একটা মেয়ে – তার প্রতি কোন রকম অসূয়া পুষে রাখা কি ছবি কে মানায় ?

    রেকর্ড প্লেয়ারটাকে তাক থেকে নামালেন ছবি। একমাত্র গানই পারে মনকে শান্ত করতে। পুরনো একটা রেকর্ড চাপালেন। বীণা চৌধুরীর গাওয়া “আমার কন্ঠ হতে গান কে নিল”। রেকর্ডের খোলের ওপরে সালটা লেখা। ১৯৪৬। মানে তখন ওনারা পাবনায়। কে পাঠিয়েছিল রেকর্ডটা? ছোটকাকা ? না বোধহয়। কাকা সাধারনত নিজের সুর দেওয়া গানের রেকর্ডই পাঠাতেন ছবিকে। আর তা না হলে ছবির পছন্দের ওয়েস্টার্ন রেকর্ড। হ্যারি জেমস, বেনি গুডম্যান, ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা। সে সব কিছুই আনা হয়নি এখানে। অল্প কিছু রেকর্ড কর্তার এক ভাগ্নে এক বার নিয়ে এসেছিল আরো কিছু টুকিটাকি জিনিসের সাথে। তা সে ও অনেক দিনের কথা। এখন তার পক্ষেও আসার অসুবিধে। একে তো যুদ্ধ হয়ে গেছে দু-দেশের মধ্যে, তার সাথে আছে ভিসার ঝামেলা। পুরনো গান গুলোই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শোনেন তাই কখনও সখনও।

    গানটা শেষ হয়ে গেছে। উল্টো পিঠে রয়েছে – আমার মল্লিকা বনে। ছবির অন্যতম প্রিয় গান গুলোর মধ্যে একটা। কিন্তু এখন শুনতে ইচ্ছে করছে না। আনমনে আরো দু- একটা রেকর্ড ঘাঁটলেন। মনঃপুত হচ্ছেনা কোনটাই। প্লেয়ারটাকে তুলে রাখলেন যথাস্থানে। বারন্দাটায় গিয়ে একবার দাঁড়ালে হয়। রোদ পড়েনি এখনও। মেয়েদের স্কুল থেকে আসতে দেরি আছে এখনও। লিপি অবশ্য বাড়িতেই আছে, তবে ওর থাকা না থাকা সমান। অঘোরে ঘুমচ্ছে।

    সুধাটা সকালের ট্রেনে চন্দননগরে গেছে বিটি তে ভর্তি হবে বলে। এম এ পড়বার বড় ইচ্ছে ছিল মেয়েটার। খোকা চাকরিটা পাওয়ার পরে সে সম্ভাবনাও ছিল, কিন্তু গোমোতে ট্রান্সফার হয়ে যাওয়ার ফলে সব কিছুই কেমন যেন পাল্টে গেল। ওখানকার সংসার চালিয়ে খোকনই বা বাড়িতে টাকা পাঠায় কি করে! ক-টাকাই বা মাইনে পায়!

    কথাটা মনে হতেই মনটা গ্লানিতে ভরে গেল। এ কোন জীবন কাটাচ্ছেন তিনি? শ্যামবাজারের রায় বাড়ির সন্তান ছবি। নিজের প্রতি করুণা নয় – লজ্জা হয় আজকাল। ছেলে মেয়েদের সর্বদা শিখিয়েছেন, অর্থ দিয়ে কোন মানুষের সম্মানের বিচার করা চলেনা। কিন্তু নিজে সর্বদা সে কথা মেনে চলতে পেরেছেন কি? পারবেনই যদি তবে আজকে কেন এই হীণমন্যতা বাসা বাঁধে মনের ভেতর? আর শুধু কি আজকে? নিজের বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন কি নিজের আজকের আর্থিক অবস্থার জন্য তিনি লজ্জিত নন? তা না হলে বড়দা ছাড়া গত জীবনের আর সব কটা সুতো কেন খুলে ফেললেন এক এক করে নিজের জীবন থেকে? নিজের বৃদ্ধ অশক্ত বাবা থাকেন ফুলিয়াতে। ক-ঘন্টারই বা পথ ? ক-বার গেছেন ছবি সেখানে? কর্তা আর ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে কর্তব্য সেরেছেন সত্যি, কিন্তু নিজের যে বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ইচ্ছে করে না – এ কথাও তো সত্যি!

    তীব্র অভিমান আঁকড়ে পড়ে থেকেছেন এত গুলো বছর – একি প্রতিশোধ স্পৃহা ? না না! বাবার বিরুদ্ধে ছবির কোন ক্ষোভ নেই।আজকের ছবিকে দেখলে বাবা কষ্ট ছাড়া আর কিছুই পাবেন না, তাই তো দুরে দুরেই থাকেন ছবি। ছবির আর্থিক অবস্থার কথা বাবা অবগত নন এমনটা নয়। কিন্তু আড়ালটা আছে বলেই হয়ত বাবা নিজেকে কিছুটা হলেও প্রবোধ দিতে পারেন। উটপাখির মতন।

    বিকেল নামছে ধিরে ধিরে। মেয়েরা স্কুল থেকে ফিরবে এবার। সুধার ও ফিরে আসার সময় হল। একা একা মেয়েটা চন্দননগর অবধি গেল। ছবি সাথে যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু কিছুতেই রাজি হয়নি সুধা। বড় অভিমানি মেয়েটা! এই সংসারের প্রতি অভিমান মেয়েটাকে পোড়াবে – এ কথা বেশ বোঝেন ছবি। কিন্তু বুঝেও কিছু করার নেই। এই দহনটাই হয়ত সুধার ভবিতব্য। কপাল মানুষ নিজের সাথে করেই নিয়ে আসে, অন্য কেউ খন্ডাতে পারেনা ললাটের লিখন।

    সুধার জন্য হঠাৎ খুব কষ্ট হল ছবির। নিজের অজান্তেই দুফোঁটা জল চোখ থেকে গড়িয়ে গালে এসে পড়ল। নাহ্, মনটাকে অন্যদিকে ঘোরাতে হবে। ওয়েস্টার্ন মিউজিকের রেকর্ডগুলো একটাও এখানে নেই। কিছু শ্যামবাজারেই রয়ে গেছে। ও বাড়ির সাথে তো আর কোন যোগাযোগ নেই। বাবা ফুলিয়ার বাড়িটায় নিরিবিলিতে থাকবেন বলে চলে এসেছেন অনেকদিন। বড়দা, ছবির গত জন্মের সাথে এ জন্মের সেতু, থাকেন আনন্দ পালিত রোডে। শ্যামবাজারের বাড়ির তিন তলার ঘরটায় ছিল ছবির রেকর্ডের কালেকশন। কে ব্যবহার করে এখন ঘরটা? মেজদার ছেলে মেয়েরা কেউ? ওরা কি কুড়ি পঁচিশ বছরের পুরনো গান শোনে? রেকর্ড গুলো ফেলাই গেছে বোধ হয়।

    পাবনায় অল্প কিছু রেকর্ড ছিল বটে। তাদের পরিনতি নিশ্চয়ই আরো শোচনীয় হয়েছে! পাবনার বাড়িটা আজকে স্কুলে পরিনত হয়েছে। জঞ্জালের সাথে হয়ত ওগুলো ফেলে দিয়েছে পদ্মার গর্ভে।

    পুরনো গান গুলোর লিরিক মনে করবার চেষ্টা করলেন ছবি।

    It seems to me I've heard that song before
    It's from an old familiar score
    I know it well, that melody
    It's funny how a theme recalls a favorite dream
    A dream that brought you so close to me…

    হ্যারি জেমস। সিনাত্রা ও গেয়েছিল একই গান ইয়ুথ অন প্যারেড সিনেমাটায়। সে বছরই বিয়ে হয়েছে ছবির। ছোটকাকা বাবা দুই দাদা এবং কর্তার সাথে গিয়ে দেখেছিলেন সিনেমাটা মেট্রোতে। কর্তার সাথে ওই প্রথম এবং শেষ সিনেমা দেখা ছবির।

    পরের লাইন গুলো কিছুতেই মনে আসছে না। বাড়ির সামনের বারন্দাটায় এসে বসলেন ছবি। মেয়েরা এবার একে একে ফিরবে স্কুল থেকে। রাস্তা দিয়ে লোকজনের চলাফেরা দেখলেও খানিকটা সময় কাটে।
    দু-মিনিট বসতে না বসতেই দেখলেন সুধা ফিরছে। একটা স্বস্তির নিঃস্বাশ বেড়িয়ে এল বুক থেকে।

    সুধাকে হাল্কা জলখাবার বানিয়ে দিলেন। সেই কোন সকালে খেয়ে বেড়িয়েছে! মাথা নিচু করে চুপচাপ খেয়ে নিচ্ছে মেয়েটা। ছবির প্রশ্নের উত্তর সারছে হুঁ হা করে। বিএডে ভর্তি হওয়ার জন্য কোন রকমের আনন্দ খেলা করছেনা ওর মুখে। নির্লিপ্ততার পর্দা দিয়ে যতই ঢাকতে চেষ্টা করুক, ছবি ওর মা। সুধার মুখের নির্লিপ্ততা ভেদ করে ওনার চোখে পড়ছে শুধু গ্লানি টুকুই।

    নিজের মুখে লেগে থাকা গ্লানিটা বাবাকে দেখাতে চান না বলেই ফুলিয়া তে যেতে চাননা ছবি। বাবা, তুমি কি বোঝো সে কথা?

    ৩৭।

    লাগছে না, লাগছে না, কিছুতেই আজ সুরটা ঠিক ঠাক লাগছে না! আহীর ভৈরব – বিশ্বনাথের প্রিয়তম রাগ – তাতে এভাবে ফেল মেরে যাচ্ছে ও বারে বারে?

    গুরুজী আজকাল খুব সকালে উঠতে পারেন না। বয়স হচ্ছে ওনার। অগ্রাহয়ণের শীতে ছাদের ঘরটাতে নিশ্চয়ই ওনার অসুবিধে হয়। নীচের কোন একটা ঘরে ওনাকে স্থানান্তারিত করবার কথা বিশ্বনাথের মাথায় আগেই এসেছিল, কিন্তু গুরুজী রাজি হননি কিছুতেই।

    বিশ্বনাথের ঘরটার ঠিক ওপরেই ওনার ঘর। ওনার বিশ্রামে ব্যাঘাত যাতে না হয় তার জন্য ঘরের দরজা জানলা সমস্ত বন্ধ করে দিয়ে রেওয়াজে বসেছে বিশ্বনাথ। বন্ধ ঘরের দেওয়ালে বেসুরো সুর গুলো ধাক্কা খেয়ে ফিরে এসে ঠাট্টা করছে যেন বিশ্বনাথকে।
    কোন শ্রোতা নেই, কিন্তু নিজের কানেই বড্ড লাগছে। আলাপেই এই অবস্থা। রেওয়াজে কোন খামতি রাখেনি বিশ্বনাথ। কোনো দিন রাখেও না, তবে এ কি হোলো!

    কি হয়েছে তা জানে বিশ্বনাথ। সকাল থেকেই তাই মনটা বিক্ষিপ্ত। সকাল নয়, গত কাল রাত থেকেই মন অশান্ত হয়ে রয়েছে। সারা রাত ঘুমও আসেনি ঠিকঠাক। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেছে; কখনো বা ছাদে উঠে গিয়ে পায়চারি করেছে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে – গুরুজীর ঘুম খুব পাতলা, ওনার বিশ্রামে ব্যাঘাত হোক চায়নি বিশ্বনাথ।

    গত কাল রাতে খাওয়ার পরে বাগানের দিকে যাচ্ছিল ও পায়চারি করতে; বরাবর যেমন করে। ঘরের বাইরে পা দেওয়ার আগেই বাবা ডেকেছিলেন – একবার আমার ঘরে এসো, কথা আছে।

    বাবার কথা বার্তা সবই প্রায় বিষয় সংক্রান্ত। তাই উনি কী কথা বলবেন – সে চিন্তা বিশ্বনাথের ওনার ঘরে ঢোকার আগে অবধি ছিল না। হয় নাদন ঘাটের জমি নয়ত পাটের আড়ত আর তা না হলে শেয়ার।

    হ্যাঁ, বাবা আজকাল শেয়ার বাজারেও টাকা খাটাচ্ছেন। কাকারা বারন করেছিলেন একবার হাল্কা ভাবে, কিন্তু ব্যবসাটা এখনো চলে বাবার ইচ্ছেনুসারেই।

    বাবার ঘর থেকে বেরোনোর পরেই অস্থিরতাটা মনের মধ্যে চেপে বসেছিল। কলকাতায় যেতে হবে বিশ্বনাথকে। শহুরে আবহাওয়া ওর কোনদিনই ভালো লাগেনা। তবু কয়েক বার গেছে বটে কলকাতায় কিন্তু এবারের যাওয়াটা অন্য রকমের।

    বাবা কলকাতার ব্যবসাটা বাড়াতে চান। বড় বাজারের গদিটা তাই আর কর্মচারিদের ভরসায় না রেখে সরাসরি নিজেদের তত্ত্বাবধানে আনতে চান। বিশ্বনাথকে এবার থেকে থাকতে হবে কলকাতাতেই। দেখা শুনো করতে হবে ব্যবসার।

    বাগানে আর যাওয়া হয়নি বিশ্বনাথের। সোজা চলে এসেছিল নিজের ঘরে। অস্থির পায়চারি করেছিল ঘরের মধ্যেই, কিন্তু মনকে শান্ত করতে পারেনি।
    শোভাকে ছেড়ে কি করে থাকবে ও কলকাতায়? প্রত্যেক সপ্তাহান্তে মাত্র একদিনের জন্য কলকাতা থেকে বাড়ি আসার ধকল ওর সহ্য হবে না। পূজো-পার্বণে বাড়ি আসতে হবে বেশ কটা দিন হাতে নিয়ে। তার মানে মাসের পর মাস ওকে থাকতে হবে কলকাতায় শোভার সাথে দেখা না করে।

    কিন্তু এখন একটা দিনও শোভার সাথে দেখা না হলে ওর মন উতলা হয়ে ওঠে। গান শেখার দিন গুলো বাদে ওরা আজকাল দেখা করে এদিকে ওদিকে, খানিকটা লুকিয়ে চুরিয়েই। কথা খুব একটা হয় না, কিন্তু একে অপরের চোখ থেকে পড়ে নিতে পারে আকুতি। বড় ভালো লাগে তখন বিশ্বনাথের।

    সিঁড়ির ধাপে শোভাকে সেই প্রথম করা চুম্বনের পরে আরো কয়েক বার ঘনিষ্ঠ হয়েছে ওরা। হয়েছে ঘনিষ্ঠতর। শোভার শরীর চঞ্চল করেছে ওকে।

    নারী শরীর সম্পর্কে এর আগে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল বিশ্বনাথ। এখনো যে পুরোপুরি জানে তেমনটা নয়। তবু আচমকা আড়াল আবডালে যেটুকু নতুন অভিজ্ঞতা, তা নেশা ধরিয়েছে ওর শরীরে। এ নেশা কাটিয়ে তাই কলকাতায় থাকার কথা কিছুতেই ভেবে উঠতে পারছেনা ও।

    বাবাকে নিরস্ত্র করতে বিশ্বনাথ বলেছিল ওর গানের ক্ষতি হবে কলকাতায় গেলে। সাথে সাথে সে সমস্যার সমাধান করে দিয়েছেন বাবা –তোমার গুরুজীও তোমার সাথে কলকাতায় যাবেন।
    সকালের দিকটায় যতক্ষণ খুশি রেওয়াজ করতে পারবে বিশ্বনাথ, তার পর গদিতে গিয়ে বসতে হবে ওকে। ওখানেই থাকতে হবে সন্ধ্যে পর্যন্ত।

    মনটাকে অন্য দিকে ঘোরাতে হবে। গান শুনতেও ইচ্ছে করছে না। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে কাছারির দিকে গেল বিশ্বনাথ। কাছারির একটা চাবি ওর কাছে আজকাল সর্বদা থাকে।

    দিনের বেলায় ঘরটায় ঢুকলে একটা আলগা কর্ম ব্যস্ততা টের পাওয়া যায় – সকলে মুখ বুঁজে কাজ করে গেলেও টের পাওয়া যায়। এরকম সময়ে এর আগে কখনো কাছারিতে আসেনি বিশ্বনাথ। অন্ধকার নিঃস্তব্ধ ঘরটায় খানিক ক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল ও।

    লম্বা টানা ঘর খানা। দড়জার ডান দিকটায় বাবার বসবার জায়গা। তার ঠিক পাশেই বসেন ম্যানেজার কাকা। বাঁ দিকটায় লাইন দিয়ে অপেক্ষাকৃত নিচু পদমর্যাদার কর্মচারিদের বসবার জায়গা। কড়িকাঠের কাছাকাছি থেকে টানা কাঠের তাক ঘরটার একটা দেওয়াল থেকে শুরু হয়ে চারটে দেওয়াল ঘুরে এসে শেষ হয়েছে নিজের শুরুর জায়গাটাতেই। বিভিন্ন বছরের হিসেবের খাতা থরে থরে সাজানো রয়েছে তাতে। বেশির ভাগই তামাদি, অপ্রয়োজনীয় আজকে; তবু রয়েছে।

    শীত করছে। কাঁধ থেকে খসে পড়া গায়ের চাদরটাকে ভালো করে জড়িয়ে নিল বিশ্বনাথ। বাবার ছোটো ডেস্কটার ওপর থেকে সকালের খবরের কাগজটা তুলে নিয় ঘরের দড়জায় তালা লাগিয়ে ফিরে এল নিজের ঘরে। বাসি খবরের কাগজটাই পড়বে ও এখন।

    খবরের কাগজে মূলত রাজনৈতিক খবরই পড়ে বিশ্বনাথ। সামনের বছর রাজ্যে বিধান সভা নির্বাচন। কংগ্রেসকে হারানোর জন্য হাঘরে গুলো জোট বেঁধেছে। তবে তাতেও বেটাদের মধ্যে কোন ঐক্য নেই। সিপিআই-এর একটা জোট, সিপিএমের আরেকটা! ভালো ভালো, এভাবে নিজেদের মধ্যে খেয়ো খেয়ি করে যা, কংগ্রেস থাকবে কংগ্রেসের মতই!

    নামের আবার বাহার আছে! সিপিএমের জোটটার নাম ইউনাইডেড লেফ্ট ফ্রন্ট। এমনই ইউনাইটেড যে সিপিআই-কে আরেকটা ফ্রন্ট খুলতে হচ্ছে - পিপলস্ ইউনাইডেড লেফ্ট ফ্রন্ট। হাস্যকর!

    এই সব ছোটো ছোটো দল গুলো কংগ্রেসের মতন মহীরুহকে উৎপাটিত করবার স্বপ্ন দেখে! একদিকে সিপিএম, সোস্যালিস্ট পার্টি, আরএসপি, এসইউসি, আরসিপিআই, মার্কসবাদি ফরওয়ার্ডব্লক, ওয়ার্কার্সপার্টি – অন্যদিকে সিপিআই, ফরওয়ার্ডব্লক, বলশেভিক পার্টি, বাংলা কংগ্রেস। ক্রস ভোটিঙে যে নিজেরাই ফর্সা হয়ে যাবে, সেটা বোঝবার মতন ঘিলুও নেই শালাদের মাথায়!

    সোভিয়েত রাশিয়ার পরমাণু বোমার পরিক্ষা, ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজ টেস্ট ম্যাচ, চালের কালো বাজারি ও আরো নানান খবরের অলিতে গলিতে ঘুরতে লাগল বিশ্বনাথ। খবরের কাগজের নেতিয়ে যাওয়া পাতা গুলো উজ্জীবিত করছে ওর স্নায়ু। মাথার থেকে অপসারিত হচ্ছে প্রেমের বুদবুদ। এখন আর অতটা অস্থির লাগছেনা বিশ্বনাথের।



    ৩৮।

    জানলাটা দিয়ে তাকালেই ফলসা গাছটা চোখে পড়ে। অনেকটা বড় হয়ে গেছে গাছটা। বিয়ে হয়ে এ বাড়িতে আসার পর পরই বোধহয় লাগানো হয়েছিল। ভাসুরপো নন্তুর পোঁতা। নন্তু তখন ওনার আর মেজদির খেলার সাথী, এখনকার মতন দেখা হলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেত না। গাছের চারাটা বাড়িতে নিয়ে এসেই হাঁক ডাক শুরু করেছিল – ও মেজো কাকিমা, ও সেজো কাকিমা, সব গেলেন কোথায়? শিগ্গির আসুন!

    ছেলে মেয়েরা কেউ তখনো হয়নি, ছন্দা আর মেজদির সারাটা দিন তখন কাটতো নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে আর মাঝে সাঝে বড়দির হাতে হাতে রান্না ঘরের জোগান দিয়ে। বড় জা ননীবালা ওনার আর মেজদির চাইতে বয়সে প্রায় পনের বছরের বড়। বিয়ে হওয়া ইস্তক শাশুড়িকে না দেখলেও বড় জা কেই ওনারা দুজনে শাশুড়ির আসনে বসিয়েছেন মনে মনে। রান্না ঘরের কাজ গুলো ওনার আর মেজদির মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে আজ অনেক দিন; তবু আজকেও বড়দির নির্দেশেই চলে সংসারের সমস্ত খুঁটি নাটি।

    নন্তুর ডাক শুনে দুই জায়ে উঠোনের লাগোয়া টানা বারন্দাটাতে এসে দেখেছিলেন হাতে একটা গাছের চারা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে নন্তু। মুখে দিগবিজয়ী হাসি।

    "ও কিসের চারা নন্তু?" জিজ্ঞেস করেছিলেন মেজদি।
    - ফলসা! গাছটা বড় হলে যা ফল হবেনা, দেখবেন তখন!
    "তা এত কিছু থাকতে শেষে কিনা ফলসার চারা নিয়ে এলে!" খানিকটা হয়ত আশাহত হয়েই বলেছিলেন ছন্দা। স্পষ্ট দেখেছিলেন নন্তুর মুখের হাসি নিমেষে মিলিয়ে যেতে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে সাথে সাথে অবশ্য শুধরেও নিয়েছিলেন নিজেকে, বলেছিলেন – তা অবশ্য ভালোই করেছো! এদেশে আসার পর থেকে তো আর খাওয়াই হয়না ফলসা, গাছটা বড় হলে পর কালো নুন দিয়ে বেশ ফলসা খাওয়া যাবে।
    এই সামান্য কথাটাতেই নন্তুর মুখে ফিরে এসেছিল স্বস্তির হাসি।
    মেজদিও ফুট কেটেছিলো - "হ্যাঁ হ্যাঁ, তুই গাছের ডালে বসে ফলসা খাবি আর আমরা নিচ থেকে বলব – এই হনুমান ফলসা খাবি! তাই না নন্তু?"

    অনেক গুলো বছর কেটে গেছে ইতি মধ্যে। গাছটা ফলনও দিতে শুরু করেছে অনেক দিন। বাড়ির ছেলেরা সব গাছটায় উঠে খেলতো। বিশেষত রতন। গাছ বাইতে খুব দড় ছিল ছোটোবেলায়! একবার তো গাছের ডাল ভেঙে মাটিতে পড়ে তিন দিন অজ্ঞানই হয়ে রইল! গাছটার দিকে তাকালে তাই ছেলেটার কথা খুব মনে পড়ে!

    আজকে অবশ্য ব্যাপারটা উল্টো হয়েছে। রতনের চিঠি এসেছে হস্টেল থেকে। চিঠিটা পড়ে শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে আপনা আপনিই চোখ চলে গেছিল গাছটার দিকে।

    ভালোই আছে ওখানে রতন। পড়াশুনোয় বরাবরই খুব মন ছেলেটার। ইজ্ঞিনিয়ারিং পড়বার ইচ্ছে অবশ্য একেবারেই ছিলো না ওর কিন্তু ছন্দার জোরাজুরিতেই পড়ছে। রতনের ইচ্ছে ছিল গবেষণা করার। অভাবের সংসারে সোমত্থ ছেলের অত দিন পড়াশুনো করা চলেনা যে! তাই তো জোর করতে হয়েছিল ছন্দাকে, করতে হয়েছে খানিক অভিনয়ও। মায়ের চোখের জলকে ফেলতে পারেনি ছেলেটা। আর সব সন্তানদের মধ্যে রতনই যে ওনাকে সব চাইতে বেশি ভালোবাসে তা খুব ভালো বোঝেন ছন্দা।

    রতনকে ইজ্ঞিনিয়ারিং পড়তে পাঠানো কি ভুল হয়েছে? ফিজিক্স না কি নিয়ে যেন পড়তে চেয়েছিলো রতন। মনের মতন বিষয় নিয়ে না পড়তে পারার জন্য কি ছন্দার ওপরে কোন ক্ষোভ জন্মাচ্ছে রতনের মনে? ছেলেটার ছিঠি গুলো পড়ে তো তা মনে হয় না! হস্টেলে যে বাড়ির চাইতে সুখে আছে, তা রতনের চিঠি গুলো পড়লেই বোঝা যায়। ইজ্ঞিনিয়ার হয়ে রতন ভালো চাকরি পেলে সংসারে যেমন সাচ্ছল্য আসবে তেমনি ওর নিজের ভবিষ্যৎও কি সুরক্ষিত হবে না!
    এই মূহুর্তে রতনের মনে যদি ওনার প্রতি কোনো রকম ক্ষোভ থেকেও থাকে তবে তা মুছে যাবে ভালো মাইনের চাকরি পেলে।

    চিঠিতে বাড়ির সকলের কথা জানতে চেয়েছে রতন। শুধু বাড়িরই নয়, পাড়ার সকলের কথাও জানতে চেয়েছে। জানতে চেয়েছে সকলে ভালো আছে কি না। পাগল ছেলে! ভেবেছে মায়ের চোখকে ফাঁকি দিতে পারবে! রতন যে কিরণের কথা জানতে চাইছে তা বুঝতে পারেন ছন্দা।কিন্তু সরাসরি এ নিয়ে ছেলের সাথে কথা বলা চলে না। একটু বুদ্ধি করে উত্তর দিতে হবে রতনের চিঠির, যাতে কিরণের খবরও দেওয়া যায় আর ছেলেটাও অপ্রস্তুতিতে না পড়ে।

    নিজের কাছে ধরা পরে গেলেন ছন্দা। ছেলের অপ্রস্তুত হওয়া নয় – এ ধরনের কথাবার্তা নিজের মনের মধ্যের লালিত সংস্কারটার বাধা ডিঙোতে পারছে না – এ সত্যটা নিজের কাছেই লুকেতে চাইছিলেন তিনি।
    ছেলে মেয়ের সাথে বাপ মা কি পারে এ সব নিয়ে কথা বলতে? তবু কিছু একটা করে কিরণের খবর পাঠাতেই হবে রতনকে।

    কিরনের কথা মনে আসতেই সেদিন সন্ধ্যের কথা মনে হল ছন্দার। এক বার পোড়ামা তলায় গেছিলেন ঠাকুরকে প্রনাম জানাতে। ফেরার পথে ঢপওয়ালির মোড়টার কাছে দেখেছিলেন কিরণের সেজো বোন শোভাকে, সাথে একটি ছেলে। রিক্সায় ছিলেন বলে এক ঝলকের বেশি দেখতে পাননি। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার যে দেখতে ইচ্ছে করছিলো না তেমনটা নয়, কিন্তু ব্যাপারটা অশোভন হবে বলে মনে হয়েছিলো ওনার।

    ছেলেটাকে এক পলক দেখে মনে হল সিংহী বাড়ির। শোভার গান শেখা হয়ে গেলে সন্ধ্যে বেলায় বাড়ি পৌঁছে দিতে আসে, তা অবশ্য ছন্দা দেখেছেন বেশ কয়েক বার। কিন্তু ঢপওয়ালি মোড়ের দিকে তো সিংহী বাড়ি নয়! ওখানে কি করছিলো তবে ওরা দুজন? মজুমদার গিন্নির সাথে কি একবার কথা বলবেন এই নিয়ে? ঠিক হবে কি সেটা? নিজেরই হাজার ঝামেলা, তার মধ্যে এ কথা বলতে গেলে অশান্তি হবে না তো? অবশ্য মজুমদার গিন্নি লোক সেরকম নন। প্রায় বিশ বছর হতে চললো ওনাদের এ পাড়ায়, কেউ কোন দিন ওনাকে গলা তুলে কথা পর্যন্ত বলতে শোনেনি। কত বড় বংশের মেয়ে! লেখাপড়া জানা। তাই হয়ত মনে মনে ওনাকে খানিকটা সমীহও করেন ছন্দা। কিন্তু গিন্নি বান্নি মানুষের এ কিরকম বিচার? ঘি আর আগুনকে এ ভাবে পাশাপাশি ছাড়া উচিৎ কখনও? ভগবান না করুন, কিছু একটা বিপদ হতে কতক্ষণ?

    হঠাৎই কিরণ-শোভাদের মায়ের ওপর ভীষণ রাগ হলো ছন্দার।

    চিঠিটাকে দেরাজে রেখে দিয়ে নিজের ঘর থেকে বেরোলেন ছন্দা। পাশেই মেজদির ঘর। ভেতরে বসে কিছু একটা করছে মেজদি। এক বার যাবেন কি মেজদির ঘরে? থাক, বাইরের রোয়াকটাতেই গিয়ে না হয় দাঁড়ানো যাক।

    রোয়াকটায় আসতে গেলে বড় বাইরের ঘরটা পেরিয়ে আসতে হয়। ঘরটা এখন নিঃঝুম। সন্ধ্যে হলেই পোড়োর দলের গলার আওয়াজে সরগরম হয়ে উঠবে। কিছু দিন আগেও রতন এখানটাতে বসে পড়াশুনো করতো।

    বেশ বড় রোয়াকটা। একসাথে অন্তত জনা দশেক বসে গল্প করতে পারবে। রাস্তার থেকে অনেকটা উঁচুতে। পাঁচ ধাপ সিঁড়ি নেমে গেছে রোয়াকটা থেকে রাস্তায়। সিঁড়ির মুখটায় এসে দাঁড়ালেন ছন্দা। উল্টো দিকের ছোটো জমিটায় পাড়ার বাচ্চা গুলো ছুটো ছুটি করে খেলছে। ওদের দিকে খানিক ক্ষন তাকিয়ে রইলেন আন মনে।

    বাইরের ঘর থেকে একটা মোড়া নিয়ে এল ভালো হত। আজকাল বেশি ক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলে হাঁটু দুটো বড্ড টনটন করে।

    মোড়াটায় বসে একটু আরাম লাগছে। কিরনদের বাড়িটার দিকে তাকালেন ছন্দা।কাউকে দেখা যাচ্ছেনা বাইরে। অন্য দিন ওদের বড় মেয়েটা এসে বসে ওদের বারন্দায়, আজকে তাকেও দেখা যাচ্ছেনা। বোসেদের বাড়ির সামনেটায় কটা ছেলে লাল পতাকা হাতে নিয়ে জটলা করছে। মাথার ঘোমটাটা সামনের দিকে আরেকটু টেনে নিলেন ছন্দা।

    বিয়ের আগে রাজনীতি সম্পর্কে কোন ধারনাই ছিলনা ছন্দার। বাবা-কাকাদের আলোচনা থেকে হিন্দু মহাসভা কংগ্রেস বা লীগের সম্পর্কে টুকটাক বক্তব্য ভেসে আসতো – ওই অবধিই। এ বাড়িতে আসার পর থেকে দেখলেন কর্তারা সকলে রাজনীতি নিয়ে বেশ গুরুত্ব সহকারে আলোচনা করেন। ছন্দার প্রথম ভোট দেওয়া এ বাড়িতে আসার পরেই। ছন্দা আর মেজদি - দুজনারই। বেশ মজা লেগেছিল প্রথম বার ভোট দিয়ে। বটঠাকুরের কড়া নির্দেশ ছিল, লাল ঝান্ডাদের ছাড়া আর কাউকে ভোট না দেওয়ার। সে নির্দেশ এখনো বলবৎ রয়েছে অবশ্য। অন্য কোনো দলকে তাই আজ অবধি ভোট দেওয়া হয়নি ছন্দার।

    শীত কালের বেলা, আলো কমে আসছে তাই। গায়ের আঁচলটা আরেকটু নিবিড় ভাবে জড়িয়ে নিলেন ছন্দা। এবার উঠতে হবে ধীরে ধীরে। রাতের রান্নার জোগাড় করতে হবে। পাড়ার মোড়টার দিকে একবার তাকালেন ঘাড় ঘুরিয়ে। বাদুড়তলার দিকের রাস্তাটা দিয়ে একটা রিক্সা বাঁক নিয়ে ওনাদের বাড়ির দিকেই এগিয়ে আসছে। রিক্সার আরোহীদের দিকে চোখ পড়তেই চমকে উঠলেন ছন্দা। কর্তা আর মেজ ঠাকুর। আজ তো সবে বুধবার!

    রিক্সা থেকে কর্তাকে ধরে ধরে নামালেন মেজ ঠাকুর। কি হয়েছে মানুষটার? রোয়াকের সিঁড়িটা দিয়ে কোনো মতে রাস্তায় নেমে এলেন ছন্দা।মেজ ঠাকুরের সামনে যে নিজের অজান্তেই মাথার কাপড়টা সরে গেছে সে খেয়াল রইল না।

    ৩৯।

    হঠাৎ করে এ কেকটা দিন কেমন যেন সুন্দর হয়ে যায়, না? কোনো পূর্বাভাষ ছাড়া এক পশলা বৃষ্টি যেমন গুমোট দিনের শেষে শান্তি ফিরিয়ে আনে, তেমনই রতনদার হঠাৎ করে কলকাতা থেকে আসাটা কিরনের মনে এনে দিয়েছে অপার আনন্দ! আর এক আধটা দিন নয়, রতনদা থাকবে পুরো সপ্তাহটাই।

    ভাবতেই ভীষন ভীষন আনন্দ হচ্ছে কিরনের।
    মনে মনেই একবার থমকালো কিরন। রতনদার এই সময় আসার কথা নয়।ওর বাবার শরীরটা হঠাৎ করে খারাপ হয়েছে, তাই খবর পেয়ে এসেছে কলেজ কামাই করে। এখন অবশ্য উনি খানিকটা ভালোই আছেন, কিন্তু ডাক্তার বিশ্রাম নিতে বলেছে; ওনার এখন কলকাতায় গিয়ে ব্যবসা পত্রের কাজ দেখা বারন। এমত অবস্থায় কিরনের কি এতটা খুশি হওয়া উচিৎ? নিজের মনকে প্রশ্নটা করলো কিরন।
    মন কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিলো না।

    সেদিনের কথাটা খুব মনে আছে কিরনের। সন্ধ্যে নামার মুখে ছন্দা কাকিমা ওনাদের রোয়াকে দাঁড়িয়েছিলেন। ঘরে বসে জানলা দিয়ে কিরন দেখতে পেয়েছিলো। ওর ইচ্ছে করছিলো কাকিমার সাথে দুটো কথা বলার। মনের জড়তা কাটিয়ে ঘরের বাইরে বেড়িয়েও এসেছিলো, কিন্তু প্রায় তক্ষুনিই রিক্সা থেকে গোরা কাকা, মানে রতনদার বাবাকে ধরে ধরে নামালেন ওনার মেজদা। ছন্দা কাকিমা দৌড়ে চলে গেছিলেন রিক্সার কাছে।কিরন ও বেশ ভয় পেয়ে গেছিলো, এক ছুটে বাড়িতে ঢুকে মাকে ডেকে এনেছিলো। তারপর ডাক্তার বদ্যি তো কম হলো না! একটাই আশার কথা, এখন বিপদ কেটে গেছে। তবে ডাক্তার বারে বারে বলে দিয়েছে – কোনো রকমের মানসিক উৎকণ্ঠায় না থাকতে। বলেছে এই বয়েসে স্ট্রোক হয়েছে, একটু চিন্তার ব্যপারতো বটেই।

    গোরা কাকার কপালটাও খারাপ! কিরনের বাবার মতই, সব ছিলো এক কালে আর আজ কিছুই নেই। বাবার ক্ষেত্রে না হয় দেশ ভাগের মতন একটা ব্যপার ঘটেছিলো, কিন্তু গোরা কাকাদের দেখো – সম্পত্তি এ দেশেই রইল, ব্যবসাতেও যে মার খেয়েছেন তেমন নয়, কিন্তু ব্যাঙ্ক ফেল করলো বলে মানুষটা আস্তে আস্তে ভেতরে ভেতরে ভাঙতে থাকলো। আর এক আধটা নয়, তিন তিনটে ব্যাঙ্ক ফেল। এ সব কথা মা বলছিলো সেদিন। বলছিলো, এই যে গোরা কাকার স্ট্রোক হয়েছে, এটা এক আধ দিনের দুঃশ্চিন্তার কারনে নয়। বহু দিনের মানসিক চাপ আর অবসাদ জমতে জমতে নাকি এরকমটা হতে পারে।

    ঘড়ির দিকে তাকালো কিরন।সাড়ে তিনটে বাজে। আর কিছুক্ষণ পরে রতনদার সাথে ও দেখা করতে যাবে। প্রথমে যাবে পোড়ামাতলায় – রতনদা আসবে ওখানে। তারপর ওখান থেকে যাবে গঙ্গার ঘাটে। গতকালও ওরা দেখা করেছে গঙ্গার ঘাটে।

    রতনদা কলকাতা থেকে এসেছে পরশুদিন। কিরনদের বাড়িতে সেদিনই এসেছিলো দেখা করতে। যাওয়ার সময় টুক করে কিরনের হাতে একটা চিরকুট চালান করে দিয়েছিলো। দুরু দুরু বুকে সবার অলক্ষ্যে চিরকুটটা খুলে কিরন দেখেছিলো তাতে একটাই লাইন লেখা – কালকে বিকেল চারটের সময় পোড়ামাতলায় এসো।

    পোড়ামাতলা শুনে প্রথমে একটু থমকেছিলো কিরন। রতনদার কি কলকাতায় গিয়ে ঠাকুর দেবতায় ভক্তি এলো নাকি? এলেই ভালো! এতদিন যা নাস্তিক ছিলো!

    কিন্তু পরের দিন মাকে মিথ্যে বলে পোড়ামাতলায় গিয়ে কিরন বুঝলো রতনদা আছে আগের মতই। পোড়ামাতলায় কিরনকে আসতে বলা কারন পাড়ার মধ্যে দিয়ে দুজনে একসাথে বেরুবে কি করে?
    কিরন তবু বলেছিলো, এত কাছে এসে পোড়ামাকে একবার প্রণাম করে যাবেন না? হাত দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতন করে রতনদা বলেছিলো, তোমার যেতে হয় তুমি যাও – আমার ওসব বুজরুকিতে বিশ্বাস নেই। ছিঃ, ছিঃ! এসব কথা শোনাও পাপ!

    নাস্তিকতা বাদ দিলে আর সব দিক দিয়ে রতনদা বদলেছে অনেকটাই। আগে যেমন সর্বদা গম্ভীর মুখে ঘুড়ে বেড়াতো, এখন আর সেরকমটি নেই একে বারেই! গঙ্গার ঘাটে বসে কত মজার মজার কথা যে বললো কালকে! অনেক ভাড়ি ভাড়ি কথাও শিখেছে আজকাল। তার কতক তো কিরন বুঝতেই পারলো না। লজ্জা ঢাকতে হুঁ হুঁ করে যাচ্ছিলো তাই। তবে খুব ভালো লাগছিলো রতনদার সাথে গঙ্গার পাড়ে বসে গল্প করতে।

    উঠে পড়লো কিরন। চোখে মুখে একটু জল দিয়ে পায়ে চটিটা গলাতে গলাতে - "মা, একটু আসছি" বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এল। বাড়ির সামনের জমিটা পেড়িয়ে যেই না রাস্তায় পা দিয়েছে, অমনি দেখলো রাস্তা জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে গণেশ আর অশোক। মনে মনে প্রমাদ গুনলো কিরন। এখন যদি ওরা ওদের সাথে আড্ডা মারতে বলে বা যদি জিজ্ঞেস করে কোথায় যাচ্ছিস – তবেই তো মুস্কিল! আর ভাবতে ভাবতেই গণেশটা দাঁত বার করে জিজ্ঞেস করেই বসল – কোথায় চললি রে কিরন?

    ভগবান! কি বলবে এখন কিরন? তবে ওকে কিছু বলতে হল না। অশোক বাঁচিয়ে দিলো এ যাত্রা। বললো, "এই গণেশ, ছাড়না ওকে। তুই যারে কিরন!" কোনো কথা না বলে পালিয়ে বাঁচলো কিরন।

    কিরনের দেহটা পাড়ার মোড়ের বাঁকে ঘুড়ে যেতেই হ্যা হ্যা করে হাসতে শুরু করলো গণেশ। "তুই শালা মজাটাই মাটি করে দিলি! যেই জিজ্ঞেস করেছি – কোথায় যাচ্ছিস – মুখটা দেখলি অশোক? ওহ্ যা হাসিটা পাচ্ছিলো না তখন, কোনো মতে সামলেছি। ভেবেছে আমরা কিছু জানিনা!"
    - গনেশ, চুপ কর। পাড়ায় বড়রা কেউ শুনে ফেলতে পারে।

    সাবধানি হয়ে গলা নামালো গণেশ।
    "সত্যি অশোক, তোর কথা মতো কালকে গঙ্গার ধারে বেড়াতে না গেলে এমন একটা খবর তো জানতেই পারতাম নারে! কিরে! ওহ্ ! শেষ পর্যন্ত কিনা দাদা প্রেম করছে! আচ্ছা একথা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতাম কোনো দিন, তুইই বল! এর চেয়ে যদি শুনতাম জার্নেল রিসিভ করতে গিয়ে বল গলিয়েছে, সেও বিশ্বাস করা সহজ ছিলো! দাঁড়া, আজ রাতে দাদাকে জিজ্ঞেস করবো, বিকেলে কোথায় গেছিলো – হেব্বি মজা হবে।"
    - দুর, ছাড়না। কেনো শুধু শুধু বিরক্ত করবি।
    - তুই শালা বুড়োটে মার্কা কথা বলিসনা তো!
    - গণেশ, আস্তে। কিরনের মা এদিকেই আসছেন।

    ছবিকে দেখে এগিয়ে গেল গণেশ।
    "কোথায় চললেন কাকিমা?"
    - এই তোমাদের বাড়িতেই একবার যাচ্ছি বাবা! কালকে একবার চন্দননগর যাবো তোমার সুধা দিদিকে নিয়ে। বি।টি।-র ক্লাস শুরু হয়ে যাবে পরশু থেকে। হস্টেলে ওকে থিতু করে একবার ফুলিয়া যাবো বাবার সাথে দেখা করতে। ফিরতে হয়ত দিন কত কলাগবে, তাই যাওয়ার আগে তোমার মায়ের সাথে একবার দেখা করে আসি।

    "চলুন কাকিমা, আপনাকে আমাদের বাড়ির উঠোনটা পার করিয়ে দিয়ে আসি তা হলে। মেজ জেঠিমা সাবান গুঁড়ো ছড়িয়েছেন, একটু অসাবধান হলে আর দেখতে হবে না।"
    - আমি ঠিক চলে যাবো। তোমরা গল্প করছিলে....
    - না না! আপনি আসুন আমার সাথে। এই অশোক, এক মিনিট দাঁড়া, আমি আসছি এক্ষুণি।

    গণেশ চলে গেলে পর রাস্তায় একা দাঁড়িয়ে অশোক কালকের বিকেলের কথা ভাবছিলো। গঙ্গার দিকে যাওয়ার কোনো পরিকল্পনাই ছিলো না। কোনোদিন ওদিকটায় ঘুরতেও যায়না ওরা। হঠাৎ কাল কি যে মনে হোলো! ঘাটের কাছের মিস্টির দোকান গুলোর কাছাকাছি যেতেই ওর চোখ পড়েছিলো একটু দুরে ডান দিকটায় দাঁড়িয়ে থাকা বড় বট গাছটার দিকে। উদ্দেশ্য – একটা বসবার জায়গা পাওয়া। গাছটার তলায় এক জোড়া মানব মানবিকে বসে থাকতে দেখেছিলো ওরা। দু পা এগোতেই স্পষ্ট হয়েছিলো তাদের মুখাবয়ব। কিরন আর রতনদা। গণেশটা গাঁক গাঁক করে ওদিকটাতেই যাচ্ছিলো, অশোক ওর হাত ধরে টেনে এনেছিলো অন্যদিকে।

    একা ঘরে শুয়ে কড়িকাঠের দিকে চেয়ে একটা ছবি প্রায়ই দেখে অশোক। একটা নদীর ধারে গাছের তলায় বসে বাঁশি বাজচ্ছে ও। ওর পাশে বসে রয়েছে ওরই বয়সী একটা মেয়ে। নদীর হাওয়ায় উড়ছে মেয়েটার চুল, আঁচল … কিন্তু কোনো দিন মেয়েটার মুখটাকে স্পষ্ট করে দেখতে পায়নি। অবশ্য দেখতে না পেলেও নিজের মনের গভীরে কোথাও মেয়েটার ছবি খুবই স্পষ্ট ছিলো ওর কাছে – ঘরের কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে যে মেয়েটাকে দেখতো অশোক, কালকে গণেশের সাথে গঙ্গার ঘাটে গিয়ে তাকেই যে দেখেছে ও!

    শুধু পাশে বসা মানুষটাই পাল্টে গেছে, সে মানুষ অশোক নয়।


    ৪০।

    সারাটা দিন বাড়িতে একা একা একদম ভালো লাগছে না। বাবা আর কিরন স্কুলে গেছে। মা আর মেজদি চন্দননগরে; মেজদিকে হস্টেলে স্থিতু করে দিয়ে ফিরবে মা। ফেরতা পথে অবশ্য ফুলিয়াতে দাদুর কাছে যাবে এক বার।

    বড়দি বাড়িতে থাকলে এতটা একা লাগতো না, কিন্তু শোভাই জোর করে বড়দিকে পাঠিয়েছিলো মায়ের সাথে - বলেছিলো, চন্দননগর থেকে মা একা ফুলিয়াতে যাবে কি করে? আর তার পর ফুলিয়া থেকে বাড়িও তো একাই ফিরতে হবে মাকে!

    মা অবশ্য বারে বারে বলছিলো, তোদের সকালে স্কুলে যেতে দেরি হয়ে যাবে। লিপি থাকলে সকালে ভাতটা তাড়াতাড়ি রেঁধে দিতে পারবে।
    শোনেনি শোভা। বলেছিলো - মা, বড়দি তো সারাটা দিন ঘরের মধ্যেই থাকে, যাকনা ও তোমার সাথে! ওর ভালো লাগবে।আমি আর কিরন ঠিক সামলে নেবো। কি রে কিরন, পারবো না?

    মাথা নেড়েছিলো কিরন।

    ধুর, আজকে স্কুলটা কামাই না করলেই হতো! আসলে সকালের দিকটায় কেমন যেন একটা আলস্য জড়িয়ে ধরেছিলো শোভাকে, কিছুতেই ইচ্ছে করলো না স্কুলে যেতে। মনে হচ্ছিলো হয়ত জ্বর আসবে, কিন্তু সে ব্যাটাও এলো না! ফাঁকা বাড়িতে এতটা একা লাগবে জানলে যে করেই হোক চলে যেতো স্কুলে। আজকে অবশ্য গান শিখতে যাওয়া আছে, কিন্তু বিকেল আসতে এখনো ঢের দেরি।

    বিশ্বনাথদার সাথে ওর সম্পর্কটা এখন অনেকটাই গাঢ় হয়েছে। শারীরিক নিবিড়তা বাড়ার সাথে সাথে বেড়েছে মানসিক নির্ভরতা। খানিকটা অধিকার বোধও জন্মেছে অপরের প্রতি। সত্যি, দিন গুলো যেন স্বপ্নের মতন কাটছে শোভার। বিশ্বনাথদার আলিঙ্গনে হারিয়ে যেতে যেতে ও অনুভব করে এক অদ্ভূত সুখ যা কখনও গলায়, কখনো বা পোড়ায়।

    ঘড়িটার দিকে তাকালো শোভা। সবে আড়াইটে বাজে। ভাত খাওয়া হয়ে গেছে আগেই। দুপুরে ও চাইলেও ঘুমোতে পারে না। অভ্যেসই নেই! খাটে শুয়ে এপাশ ওপাশ করা ছাড়া গতি নেই। আজকে গুরুজী ওকে গাইতে বলবেন। জানে শোভা। কিন্তু গান গাইতেও আজকাল আর তেমন ভালো লাগে না।গান শিখতে যাওয়ার একমাত্র কারন - বিশ্বনাথদা। আজকাল অবশ্য ওরা দুজনে অন্য সময়ও দেখা করে লুকিয়ে, কিন্তু সেই সময় গুলো ঠিক মতন উপভোগ করতে পারেনা শোভা। ওর পাশে থাকে বিশ্বনাথদা, ভালো লাগে ওর, কিন্তু রাস্তায় ঘাটে দাঁড়িয়ে গল্প করলে ওর মনের মধ্যে সর্বদা একটা চাপা উৎকণ্ঠা কাজ করতে থাকে। একথা ও বিশ্বনাথদা কে বলেনা কখনও। যদি বিশ্বনাথদার খারাপ লাগে!

    বই পড়তে ইচ্ছে করছে না। মায়ের গ্রামোফোনটা বের করে গান শোনা যায় বটে কিন্তু সাধারনত মায়ের জিনিসে না বলে হাত দেয়না শোভা। শুধু শোভা কেন, অন্য ভাই বোনেরাও দেয়না। মাকে কি ওরা সকলে ভয় পায়? ঠিক তা না হলেও, মায়ের প্রতি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সম্ভ্রমের চাইতেও বেশি একটা কোনো অনুভূতি যে ওদের সকলকে তাড়িত, চালিত করে - এটা বোঝে শোভা।

    এখন অবশ্য মা বাড়িতে নেই। আর তা ছাড়া গ্রামোফোনে শোভা গান শুনেছে জানলে মা যে অসন্তুষ্ট হবে, তেমনটাও নয় – তবু গ্রামোফোনটা বের করলো না শোভা।

    বারন্দাটায় রোদ এসে পড়েছে। শীতের রোদে একটু বসলে হয়। দড়জাটা খুলে রোদে পিঠ দিয়ে বসলো শোভা। আর দিন-দুয়েক স্কুল হবে ওদের। তার পরে শুরু হয়ে যাবে বার্ষিক পরীক্ষা। তারপর শীতের ছুটি কাটিয়ে জানুয়ারিতে নতুন ক্লাসে। ইলেভেন। আর সামনের বছর এই সময় ও প্রস্তুত হবে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষার জন্য।

    এ বারের বার্ষিক পরীক্ষাটার একটা মজা আছে – ক্লাস নাইন আর টেনের যৌথ সিলেবাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হবে প্রশ্নপত্র। গত বছর বার্ষিক পরীক্ষার আগে বড় দিদিমণি হঠাৎই একদিন ক্লাস নাইনের সব কটা সেক্সানকে স্কুলের হলঘরে ডাকলেন। বললেন, এবার তোমাদের কোনো বার্ষিক পরীক্ষা হবে না, সকল কেই ক্লাস টেনে প্রোমোশন দেওয়া হবে।

    বড়দির কথাটা শেষ হওয়া মাত্র সকলে যখন আনন্দে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে, তখন সকলকে ধমক দিয়ে থামিয়ে আবার বলতে শুরু করেছিলেন বড়দি – তোমরা জানো হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা ক্লাস নাইন, টেন, ইলেভেন – তিন বছরের মিলিত সিলেবাসের ওপর হয়। এত দিন তোমরা শুধু একটা বছরের সিলেবাসের ওপরেই পরীক্ষা দিয়ে এসেছো, আমরা তাই দেখতে চাই কম্বাইন্ড সিলেবাসে তোমাদের রেজাল্ট কেমন হয়। সামনের বার তাই বার্ষিক পরীক্ষা
    হবে নাইন আর টেনে-এর মিলিত সিলেবাস নিয়ে, সব বিষয়ের দুটো পেপার।একটা নাইনের সিলেবাস আরেকটা টেনের।ইলেভেনে প্রমোশান পেতে গেলে দুটো পেপারেই আলাদা ভাবে পাশ করতে হবে, বুঝতে পেরেছো?

    পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে শোভার কোনো দিনই চিন্তা নেই, তাই অন্য অনেকে ঘাবড়ালেও দু-বছরের পড়ার পরীক্ষা একবারে দিতে হবে বলে আলাদা কোনো উৎকন্ঠা ওর ভেতরে কাজ করেনি তখন। এখনো করছে না। আরে বাবা, হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় তো তিন বছরের সিলেবাস থাকবে - তখন? আর তাতেই বা ঘাবড়ানোর কি আছে? বছর বছর এতো এতো ছেলেমেয়ে পাশ তো করছে রে বাবা!

    বারন্দায় বসে আস পাশের বাড়ি গুলোর দিকে চোখ বোলালো শোভা, যদি কারোর বারন্দায় বা রোয়াকে কাউকে দেখা যায়। স-ব ঘুমোচ্ছে! বাবার ঘর থেকে সকালের খবরের কাগজটা নিয়ে এসে পড়তে শুরু করলো ও। হ্যানোইতে বোমা বর্ষনের প্রতিবাদে মিছিল বেড়িয়েছে কলকাতায়। সেদিন অশোকরাও একটা মিছিল করেছিলো বটে, একই কারনে হয়ত! বোম্বাইতে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট ম্যাচ চলছে। ক্লাইভ লয়েড বলে একজন তরুন খেলোয়াড়ের ভূয়সী প্রসংশা করেছে কাগজে – অভিষেক টেস্টে দুটো ইনিংসে রান করেছে ৮২ ও ৭৮। দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজীত। ভারতেরো একজন খেলোয়াড়ের অবশ্য অভিষেক হয়েছে এই টেস্টেই, কিন্তু সে তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি। অজিত ওয়াড়েকর। প্রথম ইনিংসে করেছে আট আর পরেরটায় চার - যা তা! চাঁদু বোড়দে অবশ্য সেঞ্চুরি করেছে। জুনিয়র পতৌদিও ভালো খেলেছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এগিয়ে গেছে ১-০।

    খবরের পাতা গুলোকে আরো কিছুক্ষন ঘাঁটাঘাঁটি করে ঘরে ঢুকে পড়লো শোভা। আর একটু পরেই কিরন চলে আসবে স্কুল থেকে। ওকে অল্প কিছু জলখাবার দিয়ে শোভা যাবে গান শিখতে। ততক্ষণ কিছুই করবার নেই। খাটের ওপরে গিয়ে বসলো ও।দেওয়ালে নোনা ধরেছে, এলো মেলো নক্সা দেখা দিয়েছে। একটা নক্সা দেখে ঠিক মনে হচ্ছে এক মাহুত হাতির শুঁড়টা ধরে আগে আগে চলেছে, বাধ্য ছেলের মতন পায়ে পায়ে তাকে অনুসরন করছে হাতি! দড়জায় কড়া নাড়ার শব্দ।কিরন এলো বোধহয়।

    দড়জাটা খুলতেই বুকের ভেতরে দমাদ্দম হাতুড়ি পিটতে লাগলো যেন কেউ – বিশ্বনাথদা দাঁড়িয়ে!
    "আপনি !"
    - মাসিমা আছেন?
    - বাড়িতে তো এখন কেউ নেই বিশ্বনাথদা! আপনি ভেতরে আসুন না!

    ঘরের ভেতরে চলে এল বিশ্বনাথ। সরাসরি শোভার দিকে তাকাচ্ছে না ও। শোভার মাথার পেছনের দেওয়ালটায় কোনো একটা বিন্দুতে চোখ রেখে বিশ্বনাথ বললো
    - আজকে আর গানের ক্লাস হবে না শোভা! আর শুধু আজকে কেনো, হয়তো কোনো দিনই আর হবে না।

    মনের ভেতরে কু ডেকে উঠলো শোভার
    -গুরুজী ঠিক আছেন তো?

    -হ্যাঁ, উনি ঠিক আছেন কিন্তু ব্যবসার কাজে কালকেই আমাকে কলকাতায় চলে যেতে হবে, মানে এখন থেকে আমাকে কলকাতাতেই থাকতে হবে শোভা! বাবার নির্দেশ।

    দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। দুরন্ত অভিমানের নাগপাশ জড়িয়ে ধরছে শোভাকে আষ্টে পৃষ্ঠে। গলার কাছে ঠেলে আসা কান্নার দলাটাকে গিলে নিয়ে শোভা জিজ্ঞেস করলো – আর আমি! আমি কি ভাবে থাকবো একবারো ভাবলেন না!

    দুটো সবল বাহু জড়িয়ে ধরলো শোভাকে। চুম্বনে চুম্বনে ভরিয়ে দিলো ওকে। বাহু দুটো এখন ওর সারা শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবেশে বুজে আসছে শোভার চোখ। গরম নিঃস্বাশ এসে পড়ছে ওর ঘাড়ে, গলায়। শরিরের ভার প্রেমিকের হাতে সঁপে দিতে দিতে শোভা শুনলো বিশ্বনাথদা বিড়বিড় করে বলছে -

    Doubt thou the stars are fire;
    Doubt that the sun doth move;
    Doubt truth to be a liar;
    But never doubt I love.

    কথা গুলো কেমন চেনা চেনা লাগছে। বন্ধ চোখ দুটো আচমকাই খুলে ফেললো শোভা। বাবার মুখে শুনেছে লাইন গুলো। হ্যামলেট বোধহয়। ধীরে ধীরে বিশ্বনাথদার বাহুপাশ থেকে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে।
    দড়জার দিকে এগোতে এগোতে বললো, আপনি এখন যান বিশ্বনাথদা। বাড়িতে কেউ নেই। কলকাতা থেকে ফিরে আমাদের সাথে দেখা করতে ভুলে যাবেন না তো?

    ৪১।

    অনেকদিন পরে শুনলেও বেশ লাগলো। সাহানা দেবীর গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীতের রেকর্ডটা এবার বাবার কাছ থেকে নিয়ে এসেছেন ছবি। "বাহিরে ভুল হানবে যখন।" ১৯১৭ সালের রেকর্ড, অর্ধ শতাব্দি হয়ে গেল! মনে মনে হিসাব করলেন ছবি। জায়গায় জায়গায় রেকর্ডের পিন তুলে শুনতে হচ্ছে, কিন্তু তবু শুনতে বেশ লাগছে। খুব বেশি গান হয়ত গাননি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানের সেরা শিল্পীদের তালিকায় ওনার নাম থাকবে অবশ্যই। সেই কবে থেকে পন্ডিচেরিতে অরবিন্দ আশ্রমে রয়েছেন। শ্রোতারা বঞ্চিত হলো নিঃসন্দেহে।

    অনেকদিন পরে গেলেন ফুলিয়ার বাড়িটাতে। অনেকদিন পরে দেখা হল বাবার সাথে। খোকনের বিয়ের সময় কর্তা গেছিলেন সাথে করে নিয়ে আসতে, কিন্তু অশক্ত শরীরে কিছুতেই আসতে চাননি বাবা। বলেছিলেন, কাজের বাড়িতে আমার শরীর খারাপ হলে তোমরা মুস্কিলে পড়বে। এ বয়সে আমাকে আর নাড়াচাড়া কোরোনা।

    একি রকম আছেন। দৃষ্টি শক্তি কমতে শুরু করেছিলো বহু আগেই, পরিনতিও জানা ছিলো সকলেরই - তবু এবার সম্পূর্ণ দৃষ্টিহীণ বাবাকে দেখে চোখের জল বাধ মানেনি। অনেক দিনের জমে থাকা কান্না বাঁধ ভাঙ্গা নদী হয়ে নেমেছিলো ছবির দু গাল বেয়ে। তবে বাবার কাছে কটা দিন কাটিয়ে এসে মনের ভেতরে জমে থাকা বহুদিনের গুমোট ভাবটা কেটেছে অনেকটাই।

    ফুলিয়ার ছোট্ট বাড়িটা কিন্তু একই রকম রয়েছে। বাগান ঘেরা একতলা বাড়িটায় প্রাণী বলতে তো শুধু বাবা আর একজন সহায়ক ভদ্রলোক। পাশের একটা গ্রাম থেকে এক মহিলা রোজ এসে দু-বেলার রান্না করে দিয়ে যান।

    ভদ্রলোকের নামটা জানা হলো না। ছি, ছি ! সারাটা দিন উনিই তো আগলে রাখেন বাবাকে! বাথরুমে নিয়ে যাওয়া থেকে বই-খবরের কাগজ পড়ে শোনানো - সব ভার ওনার। আর দৃষ্টিশক্তি চলে যাওয়ার পরে বাবার যেন পড়বার নেশাটা আরোও বেড়েছে! বাড়িতে বর্ধিত বইয়ের সংখ্যাটা তারই জানান দেয়। সকাল শুরু হয় খবরের কাগজ দিয়ে। তারপর এটা ওটা যা খুশি একটা বই ভদ্রলোককে পড়তে বলেন বাবা। মাঝে মাঝে পড়া থামিয়ে অল্প আলোচনা করে নেন ওনার সাথেই, আবার চলে ভদ্রলোকের পড়া আর বাবার শোনা। ভদ্রলোক পড়তে পড়তে হাঁফিয়ে পড়েন, কিন্তু বাবার শুনতে কোনো ক্লান্তি নেই।

    যে দুটো দিন ছবি ছিলেন, ভদ্রলোক খানিকটা হলেও নিষ্কৃতি পেতেন। ছবি বলতেন - বাবা রাখোতো তোমার পড়াশোনা! আমি দুটো দিন আছি, এসো জমিয়ে গল্প করি!
    খুব গল্পও করেছেন ওই দুদিন বাবার সাথে। সবই পুরোনো দিনের কথা। গল্প করতে করতে মনে হয়েছে ফিরে গেছেন পঁচিশ বছর আগের শ্যামবাজারের বাড়িতে। এক্ষুণি বুঝি দাদারা এসে বিরক্ত করবে নয়ত রবি কাকা নিজের সুর দেওয়া গান শোনার জন্য ডাকবে....। তবে এবার বাবাকে যে ভাবে পেলেন, সেভাবে আর কখনো পাননি ছবি। এবারের বাবা যেন অনেক বেশি কাছের মানুষ। কত গল্প যে হলো! মলিনতাহীণ নির্ভেজাল গল্প সব। সুধাকে চন্দননগরে স্থিতু করে ফেরার পথে ভাগ্গিস গেছিলেন বাবার কাছে! ওই দুটো দিনের মাধুরি যেন এক ধাক্কায় মনের ভেতরে জমে থাকা ক্লেদ, বেদনা, হীণমন্যতাকে দুর করে দিয়েছে অনেকটাই।

    আরেকটা রেকর্ড চাপাবেন কি? থাক, একটু রান্না ঘরের দিকে যাওয়া যাক। লিপির ভরসায় সমস্তটা ছাড়া চলে না। কিরন-শোভার পরিক্ষা হয়ে গেছে। বড়দিনের ছুটিটা শেষ হলেই নতুন ক্লাস। সামনের বছর শোভাটার হায়ার সেকেন্ডারি। শোভার কথা মনে হতে নিজের অজান্তেই কপালে হাল্কা ভাঁজ পড়লো ছবির। ফুলিয়া থেকে ফিরে এসে শুনলেন বিশ্বনাথ নাকি কলকাতায় চলে গেছে ব্যবসা সামলাতে। সাথে গুরুজী ও গেছেন। শোভার গান শেখার তাই আপাতত ইতি। মেয়েটা মুখে কিছু না বললেও সবই বুঝতে পারছেন ছবি। ওর মনের ভেতরে একটা যুদ্ধ চলছে সমানে। বিশ্বনাথকে ভালোবেসে ফেলেছিলো মেয়েটা। কাঁচা বয়স, খুবই স্বাভাবিক এমনটা হওয়া। কিন্তু বিশ্বনাথের চিন্তায় পরিক্ষাটা গোলমাল হয়ে যাবেনা তো মেয়েটার?

    কিন্তু শোভার দুঃখে দুঃখি হতে পারছেন না তো ছবি! বরং একটা স্বস্তিই কাজ করছে মনের ভেতরে। বিশ্বনাথ ছেলে মন্দ নয় কিন্তু ওর বাড়ির লোকে কি মেনে নিতো ওদের এই সম্পর্ক? তা ছাড়া এ বয়সে কোনো ভুল করে ফেললে তার মাসুল সারা জীবন ধরে দিতে হবে শোভাকে। মেয়েমানুষের ভুলের কোনো ক্ষমা হয় না রে মা! তার চাইতে এই ভালো হয়েছে। দুদিন কষ্ট পাবে, তার পরে ধীরে ধীরে সব ভুলে যাবে মেয়েটা।

    হায়রে! নিজেকে আর কত ঠকাবেন ছবি! ভোলা যে যায়না, তা আর ছবির চেয়ে ভালো জানে কে?

    আচ্ছা, এমন তো হতেই পারে - ছবি যা ভাবছেন তেমনটা অসলে নয়! শোভা আর বিশ্বনাথের মধ্যে হয়ত একটা স্বাভাবিক প্রীতির সম্পর্ক ছিল; তার বেশি কিছু নয়!
    এমনটা ভাবতে পারলে খুশিই হতেন ছবি। কিন্তু বিধাতা যে ওনাকে মায়ের চোখ দিয়েছেন। সে চোখে যে বারে বারে ধরা পড়ছে ওনার লড়াকু মেয়েটার কান্না চেপে লোককে ফাঁকি দিয়ে বেড়ানো মুখটা!

    ফুরফুরে মেজাজটা অল্প হলেও টাল খেল যেন। রেকর্ড প্লেয়ারটাকে তাকে তুলে রেখে ঢাকা চাপা দিয়ে দিলেন। সুধার হাতে বোনা কুরুশের কাজ। বড় গুনের মেয়েটা। হাতের কাজই হোক বা লেখাপড়া - খুব যত্ন নিয়ে করে। শোভার মতই লড়াকু কিন্তু খুব চাপা স্বভাব। লড়তে ওদের হবেই, তা জানেন ছবি। কিন্তু লিপির কথা মনে হলেই দুঃশ্চিন্তায় রাতের ঘুম চলে যায়। পড়াশুনো সকলের হয়না, কিন্তু সুগৃহিনী হতে গেলেও যে সমস্ত গুণ দরকার হয়, তাও লিপির আছে কি?
    ছবি জানেন তিনি নিজেও সুগৃহিণী নন। কিন্তু ভালো গৃহিণী না হওয়ার মাসুল দিতে গেলে যতটা মনের জোর দরকার হয় তাইই বা লিপির কোথায়!

    কর্তার ঘরে গিয়ে ঢুকলেন । শোভাটা চুপ করে বসে রয়েছে। বাবার ঘরে বসে থাকতে খুব ভালো বাসে মেয়েটা। মা কে দেখে মুখ তুলে একটু হাসার চেষ্টা করলো। বড় করুন লাগলো হাসিটা। মেয়েটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন - যদি একটু শান্তি পায়!

    মায়ের বুক আর পেটের মধ্যবর্তি অংশটায় নিজের একটা গাল রাখলো শোভা। শরীরটা যেন জুড়িয়ে গেল! চোখ বুঁজে ফেললো শোভা। পরম শান্তিতে দু চোখ দিয়ে নেমে এল নোনা জলের ধারা। মায়ের পেট, শাড়ি ভিজে যাচ্ছে ওর চোখের জলে। শরীরটা অল্প অল্প কেঁপে উঠছে ওর।

    শোভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন ছবি। কোনো শব্দ না করে ফুঁপিয়ে চলেছে মেয়েটা। যত পারে কেঁদে নিক এই বেলা। কাঁদলে মন হাল্কা হবে।

    নিজের মনের ভেতরে অপসৃত হওয়া ফুরফুরে ভাবটা আবার ফিরে আসছে ছবির।
    ধীরে ধীরে।

    ৪২।

    পোস্টার গুলো লাগানো হয়ে গেছে। ঘাড়টা অল্প বেঁকিয়ে লেখা গুলোর দিকে তাকিয়ে রইল অশোক। নিজের অজান্তেই ঠোঁট দুটো সরলরেখার থেকে পরিনত হয়ে গেল একটা কার্ভ-এ - মন্দ হয়নি গ্রাফিত্তিটা। সরাসরি দেওয়ালে লিখতে এখনো অল্প হাত কাঁপে। দেওয়াল লেখাতে আরেকটু হাত পাকাতে হবে। উল্টো দিকের বাড়ির দেওয়াল গুলোতে হুলো'দা তুলি বোলাচ্ছে। হুলোদা'র হাতের লেখা বেশ সুন্দর। পায়ে পায়ে হুলোদার পেছনে এসে দাঁড়ালো অশোক। এখনো সময় লাগবে কিছুক্ষণ। গাঙ্গুলিদের বাড়ির রোয়াকটায় গিয়ে একটু বসবে কি ও?

    -হুলোদা, তোমার কিছু লাগবে?
    -না। একটু বোস কোথাও, আমার হয়ে এসেছে।

    বাঁধানো রোয়াকটায় শরীর ঠেকতেই গায়ে অল্প কাঁটা দিয়ে উঠল। গায়ে হাফ হাতা সোয়েটার থাকলেও তলায় শুধু একটা পাজামা পড়েছে অশোক।
    মাঘের শীতে বাঘে পালায়। ঠান্ডা পড়েওছে এবার বেশ! তবে কাজ করার সময় তেমন টের পাওয়া যায় না। আর খুব বেশি ধরা চুড়ো পড়ে কাজও করা যায় না।

    ইলেকশনের আর এক মাসও বাকি নেই। এবার লোকসভা আর বিধান সভা নির্বাচন একই সাথে। দুটো ফ্রন্ট এককাট্টা হলে কংগ্রেসকে ধুয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু তা আর হল কই! আর হবেও না হয়ত কোনোদিন। পার্টি বোধহয় CPI-এর সাথে আর কোনোদিন হাত মেলাবে না।

    হুলোদার হয়ে এসেছে প্রায়। নবদ্বীপ বিধান সভাতে পার্টি এবার দাঁড় করিয়েছে কুন্ডু বাবুকে। জিতবে! অশোকরা এত খাটছে, তা কি এমনিই? কংগ্রেসের ওই নন্দীকে খুঁজে পাওয়া যাবে না ভোটের পর!

    বিধান সভায় এবার সিট বেড়ে ২৮০-টা হয়েছে। ক'টা জিতবে অশোকদের ফ্রন্ট? বাবা বলছিলো বটে ১০০-টা মতন, কিন্তু অশোকের তা মনে হয়না। গত বিধানসভাতে ২৫২-টা আসনে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি পেয়েছিলো মোটে ৫০টা আসন। আর এবার তো পার্টি ভেঙে গেছে। সবাই বলছে বাংলা কংগ্রেস নাকি বেশ কিছু আসন পাবে। কিন্তু ওরা তো CPI-এর ফ্রন্টে!

    বাড়ি ফিরে গণেশটার কাছে যেতে হবে একবার। ব্যাটা এখনও ছেলেমানুষই রয়ে গেল! এত অল্প অল্প কথায় রেগে যায় যে বলার নয়। সেদিন অশোককের রাস্তায় দাঁড়াতে বলে ও ছবি কাকিমাকে নিজেদের বাড়ি অবধি ছাড়তে গেছিল। অশোকের ওর জন্য অপেক্ষা করার কথা। কিন্তু সেদিন অশোকের মনটা একটু বিক্ষিপ্ত ছিল। তাই কখন যে অশোক অজান্তেই নিজের ঘরে চলে এসেছিলো, তা অশোক নিজেও জানেনা!

    আর সেই থেকেই বাবুর রাগ! আরে বাবা, রাস্তায় আমাকে না পেলি তো একবার বাড়িতে এসে খোঁজ নিবি না! নিদেন পক্ষে একবার গলা তুলে অশোকের নাম ধরে ডাকলেই তো শুনতে পেত অশোক! বাবু নাকি সেদিন অনেকক্ষণ ওর জন্য দাঁড়িয়ে থেকেছে রাস্তায় আর সেইটাই রাগের কারন। প্রথম কদিন তো বুঝতেই পারেনি অশোক, তারপর কদিন গণেশের দেখা না পেয়ে বিকেলে গেছিলো ওদের বাড়ি। ছন্দা কাকিমা বললেন, খেলতে গেছে। চটির মাঠে গিয়ে পাওয়া গেল বাবুকে। অপনেন্ট বক্সের সামনে পায়চারি করছিলো। সাইড লাইনের বাইরে থেকে একবার গলা তুলে ডেকেওছিলো অশোক। একবার তাকিয়ে চোখ ঘুড়িয়ে নিয়েছিলো গণেশ।

    খেলা শেষে না হওয়া অবধি অপেক্ষা করছিলো অশোক। তারপরেও বাবু কথা বলবেন না। অনেক চাপাচাপির পর যদিও বা কারনটা জানা গেল, কিন্তু গণেশ কিছুতেই কোনো কথা শুনলো না। অশোকও অবশ্য সেদিন বেশি কথা বাড়ায়নি - একে ম্যাচ হেরেছে, তার ওপর বেশি কথা বলতে গেলে আরো রেগে যাবে।

    প্রথম কদিন কিরনের ওপর একটু রাগই হয়েছিলো অশোকের। পরে নিজেই বুঝেছে, এ সব ছেলেমানুষি। এক ধরনের ভাববাদ-ই বলা চলে। ও সবের সময় কোথায় ওর! সামনে পার্টির এত বড় কাজ, আর ও কিনা এই সব তুচ্ছ ব্যাপারে নিজেকে জড়াতে যাচ্ছিলো! নিজেকে শাষণ করেছে অশোক। আর তা ছাড়া কিরনের জন্য রতনদা'র চাইতে ভালো কেউ হতেই পারে না! অশোক নিজেও না।

    রঙের বড় বালতিটা নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে হুলোদা।
    - ছোটো কৌটো আর তুলি গুলো নিয়ে নে। অন্ধকার হয়ে আসছে।

    সাথে আনা ঝোলাটায় জিনিস গুলো পুরে নিলো অশোক।

    সন্ধ্যে নেমে গেছে। পাশাপাশি হাঁটছে দুজনে।

    - বালতিটা একবার ধর তো!

    হাত বাড়িয়ে হুলোদা'র হাত থেকে বালতিটা নিল অশোক। পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা বিড়ি বার করে ধারালো হুলোদা। অশোকের হাত থেকে বালতিটা ফেরত নিয়ে আবার হাঁটতে শুরু করলো দুজনে।

    - একটা টান দিবি নাকি?

    মনে মনে চমকে উঠলো অশোক। বাবা জানতে পারলে বাজে ব্যাপার হবে। মুখে কিছু না বলে দু দিকে মাথা নাড়লো অশোক। হুলোদা হাসছে।

    - তোর বাবার খালি মুখেই বড় বড় কথা! মনের ভেতরে এই সব দেওয়াল থাকলে ডীক্লাসড হবি কি করে?

    - এর সাথে ডীক্লাসড হওয়ার কি সম্পর্ক হুলোদা! আর বাবার কথাই বা অসছে কেন? আমি বিড়ি খাইনা, তাই খাচ্ছি না। হয়ে গেল!

    - ডীক্লাসড হওয়া মানে কি শুধুই অর্থনৈতিক দিকটা? সামাজিক দিক কিছু নেই? তুই বলবি - এর মধ্যে সামাজিক এঙ্গেলটাই বা কি - তাই তো?

    - হ্যাঁ তাই বলছি!

    - তবে শোন - এই যে তোর একটা নিপাট ভালো ছেলে মার্কা ইমেজ আছে - এটা তোর সামাজিক পরিচয়ের একটা অংশ নয় বলতে চাস? ডীক্লাসড যদি সত্যি সত্যিই হতে চাস, তবে সেটাকেও ভাঙ্গা জরুরি।

    হাঁটা থামিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল অশোক। "বিড়ি না খেলে ডীক্লাসড হওয়া যাবে না!! কি বলছো বলো তো !"

    - বিড়িটা জরুরি নয় রে! জরুরি হল ইমেজের ধরা চুড়ো - যেটা আমরা দু-বেলা লোকের সামনে পরে ধ্যাষ্টামো করি - সেটাকে খুলে ফেলা।

    মনের মধ্যে একটা দোলাচল চলছে। হুলোদার কথা গুলোর কোনো প্রতিযুক্তি খুঁজে পাচ্ছে না ও। কিন্তু মেনেও নিতে পারছে না পুরোপুরি। খাবে একটা বিড়ি ? বিড়ি খাওয়ার কোনো ইচ্ছে কোনোদিনই অশোকের হয়নি - গন্ধটায় গা গুলিয়ে ওঠে - কিন্তু হুলোদার কাছে নিজের যে দুদুভাতু ইমেজটা তৈরি হয়েছে, সেটা ভাঙার অদম্য ইচ্ছে ওকে তাড়িত করছে।

    হাত বাড়িয়ে হুলোদার হাত থেকে জলন্ত বিড়িটা নিয়ে নিল অশোক। একটানে বুকের খাঁচায় অনেকটা ধোঁয়া ঢুকিয়ে ফেলেছে। অনভ্যস্ত শরীর বিদ্রোহ করে উঠলো। কাসির দমকে মাথার দুটো পাশ ঝন ঝন করছে। কাসতে কাসতে বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে ও। হুলোদা ওর পিঠে আলগা চাপড় মেরে ওকে ধাতস্থ করবার চেষ্ঠা করছে।

    - ওরে, অত তাড়াহুড়ো করে ডীক্লাসড হওয়া যায়না। খুব হয়েছে! তোর আর ইমেজ ভেঙ্গে কাজ নেই। দে ওটা।

    অশোকের হাত থেকে বিড়িটা টেনে নিয়ে ফেলে দিল হুলো। হো হো করে হাসছে এখন।

    - শালা, কিছু খেল দেখালি! ওফ্ফ্!! বাড়ি চ।

    একটু লজ্জা লজ্জাই লাগছে অশোকের।

    ধুর! না খেলেই হত বিড়িটা।

    ৪৩।

    বিকেলে রোদ্দুরটা মরে এলে একটু হাঁটতে বেড়োয় বিশ্বনাথ। খুব বেশি দুর কোথাও নয়, কাছে পিঠেই।কলকাতায় ওর আস্তানাটা হ্যারিসন রোড আর আমহার্স্ট স্ট্রীটের ক্রসিংটার কাছাকাছি।হাঁটতে হাঁটতে কোনো দিন কলেজ স্ট্রীটের দিকে যায়, কোনো দিন বা শিয়ালদা স্টেশনের দিকটায়। এছাড়া করারই বা কি আছে।গল্প গাছা করবার লোকও কেউ নেই।গুরুজীর সাথে গান শেখার সময়টুকু ছাড়া আর তেমন কথাও হয়না।ভীষন চুপচাপ হয়ে গেছেন আজকাল। সারাদিন একলা বসে ফ্ল্যাটের জানলাটা দিয়ে অগুনতি গাড়ি আর মানুষের চলে যাওয়া চলে আসা দেখেন।বা হয়ত কিছুই দেখেন না। ঠিক বুঝতে পারে না বিশ্বনাথ।গুরুজীর এখনকার ঘরটার দেওয়ালেও সেই দুটো ছবিই টাঙানো – কাশির মণিকর্নিকা ঘাট আর গহরজানের পোট্রেট।মানুষটা চিরকালই একটু আপনভোলা, কিন্তু ইদানিং বাইরের জগৎ সম্পর্কে যেন আরো বেশি উদাসীন হয়ে পড়েছেন।

    তিন মাস হয়ে গেল, এখনো শহরটাকে ভালো লাগিয়ে উঠতে পারলো না বিশ্বনাথ।বিচ্ছিরি একটা অনুভূতিতে সর্বদা নিমজ্জিত থাকে ওর মন। মানে, যতক্ষণ জেগে রয়েছে তার প্রায় প্রত্যেকটা পল একটা ক্লেদাক্ত অনুভব সাথে সাথে ফেরে ওর।সব কাজই করছে সময় মতন – সকালে উঠে রেওয়াজ করা, তারপর স্নান করে গদিতে বসা, বিকেলে বাড়ি ফিরে একটু এদিক ওদিক ঘুরতে যাওয়া – কিন্তু তিতকুটে ওই অনুভুতিটা ভাদ্র মাসের ঘামের মতন মনের গায়ে লেগে থাকে সব সময়।

    সারা শহরের রমকসকম এখনো জানা হয়ে উঠেনি ওর। জানার খুব একটা ইচ্ছেও নেই।হ্যারিসন রোডের ফ্ল্যাটের থেকে পোস্তার গদি – এই করেই দিনের বেশির ভাগ সময়টা কাটে। পৃথিবীতে নরক বলে যদি কিছু থাকে তবে তা হল পোস্তা। চারিদিকে হিন্দুস্থানি কুলিদের চিৎকার, গুঁতোগুঁতি আর প্যাচপ্যাচে কাদা! শীত কালেও এই এক গাদা কাদা ছিলো গদিতে ঢোকার গলীর মুখটায়।বর্ষায় কি হবে তা হলে?

    কলেজ স্ট্রীট, শিয়ালদা ছাড়া কখনও সখনও হয়ত বা হাতি বাগানের দিকটায় যায় – কিন্তু ওই উনিশ আর বিশ! সারা শহরটা যেন একটা মূর্তিমান আস্তাকুড়! সাথে রয়েছে ছোটোলোকেদের ভীড়। ফুটপাথের ভীড়ের ভেতর থেকে উঠে আসে ঘামের গন্ধ। বাসে চড়বার প্রশ্নই ওঠেনা।মাঝে সাঝে তাই ট্যাক্সি নিয়েই এদিক ওদিক যায় বিশ্বনাথ। নবদ্বীপে থাকতে মোটর গাড়িতে চড়তে অসহ্য লাগত ওর, আর এখানে যাতায়াতের জন্য ওটাই একমাত্র ভদ্রস্থ উপায়। রোজ সকালে তাই হেঁটেই গদিতে যায় ও। ঐ সময়টায় ভীড়টা একটু হলেও কম থাকে। ফেরার সময় একটু দেরি করে বেরোয় বিশ্বনাথ।কেরানিদের ঝাঁক বিকেলের দিকটায় হ্যারিসন রোড ধরে এগোয় হাওড়া স্টেশনের দিকে। ধীরে সুস্থে তাই হিসেব মিলিয়ে বিশ্বনাথ অপেক্ষা করে অফিস ফেরতা জনতার ভীড়টার পাতলা হওয়ার। বেশির ভাগ দিনই হেঁটে ফেরে, কখনো খুব ক্লান্ত লাগলে একটা ট্যাক্সি ধরে নেয়। রাস্তাটা খুব বেশি নয় বলে ট্যাক্সিতে চড়তে ততটা খারাপ লাগে না। তা না হলে মোটর গাড়িতে চড়ে খুব লম্বা রাস্তা পাড়ি দেওয়ার পক্ষপাতি নয় ও। আর এই ক্যাডিল্যাক ট্যাক্সি গুলো তো আরেক কাঠি সরেস! হুড খোলা যায় না। ওই ঘুপচির মধ্যে দম বন্ধ হয়ে আসে ওর।

    হ্যারিসন রোডের ফ্ল্যাটটাও বাসযোগ্য নয়।পায়রার খোপের মতন চারটে ঘর।কলকাতায় মানুষ থাকে কিসের টানে? এখানে এসে ব্যবস্থাপাতি দেখে প্রথম দিনই মাথাটা গরম হয়ে গেছিলো ওর। সঙ্গে আসা চাকরটার হাতে বাবাকে একটা চিঠি পাঠিয়ে দিয়েছিলো – এখানে থাকা বিশ্বনাথের পক্ষে সম্ভব নয়।

    পরের দিনই ফিরতি চিঠি নিয়ে হাজির হয়েছিলো চাকরটা। বাবা কড়া ভাষায় ভৎসনা করেছিলেন বিশ্বনাথ্কে। ছেলে বড় হলে বাপের সাহারা হয়।এভাবে নিজের দ্বায়ীত্ব এড়িয়ে নিরাপদ ঘেরাটোপে কত দিন বসে থাকবে বিশ্বনাথ? বিশয় সম্পত্তি বাড়ালেই তবে থাকে। ঘড়ার জল গড়িয়ে খেতে থাকলে একদিন রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
    চিঠির শেষে ছিলো স্পষ্ট সতর্ক বার্তা। বিশ্বনাথ যদি ওসব গান বাজনা ইত্যাদির মতন ব্যাপার নিয়ে থাকতে চায়, তাতে বাবার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু তাহলে বিশ্বনাথকে চলতে হবে বাবার নির্দেশানুসারেই। নতুবা...

    এর পরে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবাও যা, নিজের পায়ে কুড়ুল মারাও তাই।গান ছেড়ে থাকতে পারবে কি বিশ্বনাথ? তা ছাড়া, পারিবারিক ব্যবসা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে নিজের জীবন অতিবাহিত করার কথা কোনো দিন মনেও আসেনি ওর।আর আজ জেদের বসে নিজের গ্রাসাচ্ছাদনের একটা ব্যবস্থা যদিও বা করেও ফেলেও, পারবে কি নিজেকে সেই জীবন উপহার দিতে, যা এত দিন ও কাটিয়ে এসেছে?

    গান ছাড়া জীবন ভাবতে পারেনা বিশ্বনাথ। তার চাইতেও বেশি ভয় পায় বৈভবহীণ জীবনের কথা কল্পনা করে।
    ওর কলকাতায় থাকা নিয়ে বাবা এতটা জোর খাটাবেন, তা স্বপ্নেও ভাবেনি বিশ্বনাথ। ভাবার কথাও নয়। আসল কারনটা ও জানেও না। শোভার সাথে ওর সম্পর্কটা নিয়ে কানাঘুষো গেছে বাবার কানে, আর তাই ব্যবসার দোহাই দিয়ে ওকে সরিয়ে দেওয়া হল নবদ্বীপ থেকে। হায়রে! এ কথাটা কোনোদিন জানতেও পারবে না ও।

    শোভার জন্য প্রথম প্রথম খুব মন খারাপ লাগতো। রাতে অন্ধকার ঘরে শুয়ে শোভার অদেখা শরীর কল্পনা করে শক্ত হয়ে উঠতো বিশ্বনাথের শরীর। শোভার শরিরটাকে নিজের বুকের মধ্যে জড়িয়ে পিষে ফেলতে চাইতো মন। এখন অবশ্য প্রেমের সেই তীব্রতাটা আর অনুভব করে না, তবু সময়ে সময়ে শোভা নামের একটা শ্যামলা মেয়ের মুখ ঘুরে ফিরে কড়া নেড়ে যায় ওর মনের জানলায়।

    শোভার প্রতি ওর এই টান কি শুধুই শারীরিক? মা বলেন, কোনো কিছুর উত্তর না পেলে মনকে জিজ্ঞেস করবি, মন কখনো মিথ্যে বলে না। নিজের মনকে জিজ্ঞেস করে দেখেছে বিশ্বনাথ, কিন্তু তবু কোনো সদুত্তর পায়নি ও। আসলে মনের ভেতরে অনেক গুলো ধূসর প্রোকোষ্ঠ আছে, সেটা আজকাল বুঝতে পারে ও। কোনো প্রশ্নের উত্তর সেই প্রোকোষ্ঠ গুলোর একটাতে গিয়ে খুঁজে পেলে নিজে কে বড় অস্থির লাগে। "হ্যাঁ" না "না", সাদা না কালো – নির্দিষ্ট করে কিছুই বলা চলে না সেই প্রশ্নের উত্তরে। মনে হয় – উত্তর খুঁজে ফেরাটাই সার হল, কাজের কাজ কিছু হল না।

    শোভাকে নিয়ে মনের কাছে করা প্রশ্নের উত্তরটাও এমনই একটা প্রোকোষ্ঠের ভেতরে পড়ে রয়েছে।

    ক্রীক রো দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পুঁটিরামের খাবারের দোকানটায় এসে একটু বিশ্রাম নেবে বলে ঠিক করলো বিশ্বনাথ। মরুভূমিতে ওয়েসিসের মতন এই দোকানটা। সন্দেশটা বড় ভালো বানায় এরা। দোকানের বেঞ্চিটায় বসে কলেজ স্কোয়ারের সাঁতারুদের হুটোপাটি দেখে হাসি পাচ্ছিলো ওর। একটা বড় চৌবাচ্চায় কিছু দামড়ার দল হুটোপাটি করছে। তার জন্য মাথায় টুপি, চোখে কালো চশমা – কত কি! নবদ্বীপের গঙ্গা দেখলে তো মনে হয় এরা হেগে ফেলবে!

    সন্দেশটা উদরস্থ করে মেডিকেল কলেজের দিকটায় হাঁটা লাগালো ও। সন্ধ্যে হয়ে এসেছে তবু কিসের টানে যেন হেঁটে চলেছে বিশ্বনাথ। ওদেরগ দিতে মাল নিতে আসে পেট মোটা পারেখজী। একটু বন্ধুত্ব মতন হয়েছে আজকাল পারেখের সাথে বিশ্বনাথের। মানে একটু মস্করা, কিছু চটুল কথা আজকাল চলে ওদের মধ্যে। পারেখজী একদিন বলেছিলো, কিছু মনে করিবেন না ভিসওয়ানাথ বাবু, যদি কখনো থোড়া ফূর্তি উর্তি করিতে হোয়ে, তো হামাকে বলিবেন। আপনার এই বয়সে এনজয় না করিবেন তো করিবেন কবে?
    ইঙ্গিতটা পরিষ্কার। কিছু বলেনি বিশ্বনাথ। কারুর সাথে এতটা খোলাখুলি বাক্যালাপ ও কোনোদিনই করেনি। তবু পারেখজী একমাত্র ব্যক্তি যাকে নিজের এতটা কাছে আসতে দিয়েছে ও।

    ভুল। বিশ্বনাথ আসতে দেয়নি, পারেখই ধীরে ধীরে বিশ্বনাথের ওপরের কঠিন আবরনটা সরিয়ে উঁকি মারছে ওর ভেতরটায়।

    রাস্তার আলো গুলো সমস্ত জ্বলে গেছে। বহতা গাড়ির স্রোত পাশে ফেলে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে হাড়কাটা গলীর মুখটায় এসে পৌছল, তা ও নিজেই জানে না। পা দুটো থমকালো একটু। গলীর মুখটায় কিছু মেয়ে মুখে রঙ মেখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মেয়ে গুলোর মুখের দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল বিশ্বনাথ। পচা নালার ঢাকনাটা খুলে ভক করে একটা দুর্গন্ধ এসে নাকে লাগলো যেন।

    শরীরের ভেতরে গুঁড়ি মেরে বসে থাকা বাঘটাও পালাতে চাইছে ওই গন্ধটা থেকে।

    ৪৪।

    অফ সিজিনেও প্র্যাকটিসটা চালু রাখে গণেশ। শরীরটা ফিট থাকে তাতে। এমনিতে ওদের ক্লাবে পার্টি করে রোজ দিনই খেলায়, কিন্তু স্থানিয় লীগ ও অনান্য টুর্নামেন্ট গুলো এপ্রিল থেকে নভেম্বরের শুরু অবধিই চলে। তার পর প্রায় মাস পাঁচেক ক্রীকেট বাবুরা ঠুকুস ঠুকুস করে, চটির মাঠটা তাই পাওয়া যায়না ঐ সময় কালের জন্য।

    প্র্যাকটিসের জন্য অন্য মাঠ হলেও চলে, কিন্তু ম্যাচ খেলতে গেলে চটির মাঠ ছাড়া অন্য মাঠের কথা ভাবতেই পারেনা ও। কত বড় মাঠ! যত বড় মাঠ, গণেশের ততই ভালো। ছোটো মাঠে ড্রীবল করে মজা নেই। বুটের জঙ্গলের ভেতর থেকে গদাম করে শট মেরে গোল তো করাই যায়, কিন্তু তাতে মস্তানি কই! ফাঁকা জায়গা না পেলে কি সুন্দর ফুটবল হয়? দুজন ডিফেন্ডারকে নাচিয়ে, গোলকিপার কে সামনে টেনে মাথার ওপর দিয়ে আলতো টোকায় গোল - দর্শকেরাও মজা পায় আর ওরকম গোল করলে শরীরের রক্ত আপনা থেকেই ফুটতে থাকে।

    কবে যে ও কলকাতায় যাবে! প্রথমেই বড় ক্লাবে খেলার সুযোগ যে পাবেনা তা জানে গণেশ। কিন্তু যাওয়াটা হবে কবে? হায়ার সেকেন্ডারির আগে তো কোনোমতেই না - জ্যাঠা আস্ত রাখবেন না। তা ছাড়া হুট বলে কলকাতায় গেলেই কি হল? ওদের কোচ নগাই'দার কিছু চেনা জানা অবশ্য আছে কলকাতায়, কিন্তু নগাইদা বলেছে, এখনো ওর কলকাতা যাওয়ার সময় হয়নি, সময় হলে নগাইদা নিজেই নিয়ে যাবে। বলেছে, পুরো তৈরি হয়ে তবে কলকাতার দিকে পা বাড়াস। তরিঘড়ি কলকাতায় গিয়ে অনেক ছেলের সর্বনাশ হতে দেখেছি। তোর মধ্যে মাল আছে, কিন্তু এখনো সময় হয়নি। অপেক্ষা কর।
    কবে যে সেই সময়টা আসবে!

    তা ছাড়া কলকাতায় পৌঁছোলেই তো আর হল না, একটা থাকার জায়গা তো লাগবে! দাদাদের হস্টেলে থাকতে দেবে না? দিলে তো বেশ মজা। দাদার ফিফথ ইয়ার অবধি গণেশ ওই হস্টেলেই থেকে যাবে। তারপর কিছু একটা ভাবা যাবে না হয়।

    কিরনকে একদিন একটু চাপ দিতেই ভ্যাড় ভ্যাড় করে সব বলে দিয়েছে। আগে একা কিরনই চিঠি লিখতো, এখন নাকি দাদা অপুদা দের বাড়ির ঠিকানায় কিরনকে চিঠি লেখে। অপুদার বোন পড়ে কিরনদের ক্লাসেই, ওই এনে দেয় কিরনকে চিঠি গুলো।
    দাদার সাথে অবশ্য গণেশ এ সব নিয়ে কোনো কথা বলেনি। দাদার সাথে গণেশের বয়সের ফারাকটা বেশি না হলেও, দুজনের মধ্যে একটা দেওয়াল আছে। দেখা যায়না, কিন্তু আছে।
    আচ্ছা, কিরন আর দাদার যখন বিয়ে হবে তখন কি কিরনকে ও বৌদি বলে ডাকবে? তুমি তুমি করে কথা বলবে? ভাবলেই হাসি পায়।

    হাঁটতে হাঁটতে আগমেশ্বরি পাড়ায় ঢুকে পড়েছে। মার্চ মাস শেষ হতে চলল, কিন্তু এখনো বাতাসে শীতের হাল্কা কামড় রয়েছে। ছোটো বাজারের মুখটা দিয়ে একটা বিজয় মিছিল চলেছে। পা মেলাবে নাকি ওদের সাথে? থাক! খেলার পোশাক পড়ে মিছিলে হাঁটতে ইচ্ছে হলনা গণেশের।

    সত্যি, ভাবলে এখনো গায়ে কাঁটা দিচ্ছে! ঘোর কাটছেনা যেন। স্বাধীনতার পরে বাংলায় এই প্রথম বারের জন্য অ-কংগ্রেসী সরকার! জ্যোতি বসু উপ-মুখ্যমন্ত্রী! কেরলে ই এম এসের সরকার পথ দেখিয়েছিলো সত্যিই, কিন্তু বাংলায় সত্যি সত্যি কোনোদিন কংগ্রেসকে উৎখাত করা যাবে... নাহ্, গণেশ যে একেবারে ভাবেনি তেমনটা নয়, কিন্তু মনের কোনে কোথাও একটু সংশয় তো ছিলো অবশ্যই।

    অশোক তো আনন্দে আত্মহারা! কিন্তু তবু বলছে - পুরো আনন্দটা তোলা রইলো রে! যেদিন পার্টি একা নিজের দমে ক্ষমতায় আসবে, সেদিন দেখিস - রামসীতা পাড়া থেকে বড়াল ঘাট অবধি ডিগবাজি খেতে খেতে যাবো!

    মিছিলটার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে পাড়ার দিকে এগোচ্ছিল গণেশ। "খানকীর ছেলের দল!" শব্দ গুলোর আকস্মীকতায় পেছনে ঘুরে দাঁড়ালো ও। দুটো লোক নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
    "শালারা ভোটের আগেই ঠিক করে রেখেছিলো। শুধু লোক দেখানোর জন্য দুটো আলাদা ফ্রন্ট খুলেছিলো। আর এখন দেখ, আমে দুধে কেমন মিশেছে।"

    মাথায় চড়াক করে রক্ত উঠে গেল। কাঁধের কীট ব্যাগটা ফেলে দিয়ে দৌড়ে গিয়ে লাফিয়ে পড়লো লোক দুটোর ওপর। রাস্তায় ফেলে এলো পাথাড়ি লাথি চালাতে লাগলো লোক দুটোর গায়ে। আচমকা আক্রমণে লোক দুটো প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেও, সামলে উঠছে মূহুর্তেই। দুজনে মিলে চেপে বসেছে গণেশের বুকের ওপর। চার চারটে হাতের আঙুল গুলো ধীরে ধীরে চাপ বাড়াচ্ছে ওর গলার ওপরে। দু হাতে ওদের আটকানোর চেষ্টা করছে গণেশ। কিন্তু লোক দুটো ওর চাইতে বয়সে বড়, শক্তিও আছে গায়ে যথেষ্টই। এভাবে বেশিক্ষণ যুঝতে পারবেনা ও। ডান হাত দিয়ে একটা লোকের অণ্ডকোষটা চেপে ধরলো সর্বশক্তি দিয়ে। গলার চাপটা কমে গেল সাথে সাথেই। বাঁ হাতের তর্জনি ও মধ্যমাটা সোজা ঢুকিয়ে দিলো অন্য লোকটার দু চোখে।

    মিছিলটা বেশি দুর যায়নি। ছুটতে ছুটতে মিছিলটার দিকে চলেছে গণেশ। পেছনে বেশ কিছু লোক ধেয়ে আসছে। আর একটু ছুটলেই মিছিলটার ল্যাজটা ধরে ফেলবে ও। বাঁ কাঁধের ওপরে ধপ করে একটা আধলা ইঁট এসে আঘাত করলো। গতি কমালে চলবে না। মিছিলটাও থমকে দাঁড়িয়েছে পেছনের গোলমাল শুনে। মনোরঞ্জন কাকা না? ওই তো, অশোকও আছে সাথে! আর ভয় নেই!

    একটা খণ্ড যুদ্ধ বেঁধে গেল। তবে এক তরফা। মিছিলটায় লোক সংখ্যা নেহাত কম ছিলো না। গণেশের পেছনে যারা ধাওয়া করে এসেছিলো তারা সংখ্যায় তেমন বেশি কিছু নয়। সব চেয়ে বেশি মার খেল সেই লোক দুটো। নাক মুখ দিয়ে বেরোনো রক্তে জামা কাপড় একাকার হয়ে গে্ছে। রাস্তার ধারে লোক দুটোকে ফেলে রেখে অশোক আর মনোরঞ্জন কাকার সাথে বাড়ি ফিরে চললো গণেশ। বাকি মিছিলটা এগিয়ে গেল নিজের গন্তব্যের দিকে।

    লোক গুলো বাঁচবে তো! অপরাধি লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে - এটা তো গেমসম্যান শিপ নয়! এতজন মিলে আট দশ জনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া কে গেমসম্যান শিপ বলে না। ভোটের আগে যুযুধান পক্ষে থেকে, ভোটের ফলাফল দেখে হাত মিলিয়ে জোড়াতালির সরকার গড়াকেও গেমসম্যান শিপ বলে না।

    পাড়ায় ঢুকে মনোরঞ্জন কাকা জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছিলো ঠিকঠাক বল।
    গণেশের কাছে সব শুনে বললেন, তোকে এর ফল ভোগ করতে হবে। পার্টি তোকে কতটা প্রোটেকশন দিতে পারবে, জানি না। এবার থেকে তোর দ্বায়িত্ব তোর নিজের। অশোক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, হাত তুলে থামালেন মনোরঞ্জন কাকা।
    "একটা চিঠি লিখে দেবো। কলকাতার ঠিকানা। ক্রীক রো। আজ রাতে ট্রেন থাকলে ভালো হত। কাল ফার্স্ট ট্রেনে বেড়িয়ে যাবি। তোর জ্যাঠার সাথে আমি কথা বলে নেব। তোর আর নবদ্বীপে থাকা নিরাপদ নয়।"
  • | বিভাগ : ব্লগ | ১৩ মে ২০১৪ | ১৫৫১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    গল্প: - pradip kumar dey
    আরও পড়ুন
    গল্প: - pradip kumar dey
    আরও পড়ুন
    পরিশেষ - Katha Haldar
    আরও পড়ুন
    ছায়া - Rifon Sircar
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Biplob Rahman | 212.164.212.61 (*) | ১৪ মে ২০১৪ ০২:১৪72902
  • কি দারুন বিষন্নতা! চলুক
  • su | 86.118.6.148 (*) | ১৬ মে ২০১৪ ০২:৪৮72903
  • খুব অল্প হল এবারে। পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।
  • kaushik | 127.211.91.74 (*) | ১৬ মে ২০১৪ ০৯:২৫72904
  • আসছি শিগ্গিরি।
  • π | 24.139.209.3 (*) | ১৬ মে ২০১৪ ১০:৪৫72905
  • আপনি পরের পর্বগুলো এই লেখার তলাতেই অ্যাপেন্ড করতে পারেন।
  • Kaushik Ghosh | 126.202.64.162 (*) | ১৮ মে ২০১৪ ০১:৩৩72906
  • নতুন পর্ব append করলাম।
    প্রথম থেকেই এটা করলে ভালো হত - পুরো লেখাটা এক জায়গায় থাকতো। কি আর করা!
  • jhiki | 212.67.46.29 (*) | ২২ মে ২০১৪ ০৩:৪৮72907
  • পড়ছি....
  • nina | 78.37.233.36 (*) | ২৭ মে ২০১৪ ১২:৫৩72908
  • পুরোটা একসঙ্গে পড়ার খুব সাধ---সুন্দর হচ্ছে--পড়ছি--
  • Kaushik Ghosh | 125.113.187.3 (*) | ০১ জুন ২০১৪ ০৬:৩৯72909
  • দুটো নতুন পর্ব দিলাম। ৪০-৪১।
  • nina | 78.37.233.36 (*) | ০২ জুন ২০১৪ ০৯:৪১72910
  • সঙ্গে আছি----
  • Kaushik Ghosh | 125.113.187.3 (*) | ০৩ জুন ২০১৪ ০৪:০০72911
  • সাথে থাকার জন্য সকলকে অনেক ধন্যবাদ :))
  • jol | 134.125.50.16 (*) | ০৩ জুন ২০১৪ ০৯:৩৪72912
  • ভালো কৌশিক।

    তবে নিয়মিত লেখো। এতদিন পর পর দিচ্ছো বলেই লেখাটা মনে হচ্ছে আগের মত আঁটসাট হচ্ছে না।

    পর্ব্টা বড় তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন