• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ‘আহ্বান আসিল মহোৎসবে’

    Jhuma Samadder লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৮ মার্চ ২০১৮ | ১৭৩ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপণে।'
    না, কেবল মুখই ঢাকে না। বুদ্ধিশুদ্ধিও ঢেকে যায়। কর্পোরেট জগৎ, বিজ্ঞাপণ জগৎ যখন যে ভাবে আমাদের ভাবাতে চায়, আমরাও সেভাবেই ভেবে চলি।
    কবছর আগে ধুঁয়ো তোলা হোলো, 'লেটস্ সেলিব্রেট ওমেনস্ ডে'। আমরাও নেচে উঠলুম।
    'চলো।'
    'লেটস... '।
    ‎ওমেনস্ ডে-র হদ্দমুদ্দ করে ছাড়লাম। পথে-ঘাটে নেমে, টেলিভিশনে, খবরের কাগজে জিগির তুলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুন জ্বেলে - সে কী রইরই ব্যপার! এমনকি, গয়নার মজুরীতে কিম্বা শাড়ীকাপড়ে ওই দিন 'বিশেষ ছাড়ে'র বন্দোবস্তও করা হল।
    আবার এবছর 'একটু অন্যরকম কিছু' করার তাড়নায় সুর উঠেছে , 'লেটস্ আনসেলিব্রেট ওমেনস্ ডে'। সেই একই জিগির, একটু ঘুরিয়ে বলা -
    'ই..ই..য়ার্কী! সম্বচ্ছরে মাত্তর একটা দিন!!' পেয়েছেটা কী? 'এভরি ডে শ্যুড বি ওমেনস্ ডে'...(আরে জ্বালা! বারণ'টা করল কে ?)
    বিজ্ঞাপণ আমাদের লড়াইয়ের ময়দানে খাড়া করে তুমুল লড়াই বাধিয়ে দিয়েছিল ক'বছর ধরে , 'ভোট দাও হে! তুমি নারীদিবসের পক্ষে নাকি বিপক্ষে? ' কেউ 'মেয়েদের বিশেষ সম্মান' করতে চান এদিন, তো কেউ রেগে লাল।
    সোশ্যাল মিডিয়ায় আমজনতার (বিশেষতঃ মহিলামহলের) রায়ে বোঝা গেল, তাঁরা ওই একটি দিনের 'বিশেষ ছাড়ে' তাঁরা বিশেষ খুশী হতে পারছেন না।
    অতএব, 'উল্টাসুর গাও, ভাই।' প্রচারও হল, আবার 'বিশেষ ছাড়'ও দিতে হল না।

    ‎এনারা আসলে বোধসম্পন্ন মানুষের মোদ্দা কথাটাই ধরতে পারেন নি। তাঁরা বলেছেন, 'সমান অধিকারে'র কথা। ওনারা কেবল 'অধিকার' নিয়ে লড়াই বাধাতে ব্যস্ত।
    ‎এই কানখুসকি দিয়ে খুঁচিয়ে তোলা ফেমিনিজম, যে আসলে স্বর্ণমুদ্রার ঝনঝনানিরই উসকানি, সে কথা বহু মানুষ ততদিনে বুঝে ফেলেছেন।
    ‎তাঁরা স্লিভলেস ব্লাউজ আর হাতে ধরা সিগারেট'কে ফেমিনিজমের ড্রেসকোড বলে মনেই করছেন না।
    ‎বরং, ফেমিনিজমের আইডিয়াল মানছেন, মালালা ইউসুফজাই, গৌরী লঙ্কেশ কিম্বা রামমোহন রায়,জ্যোতিবা ফুলে'কে, যাঁরা 'ফেমিনিজম' শব্দটার সঠিক অর্থটা বোঝেন।

    ‎তা শব্দের অর্থ যাই হোক, আসলে এই ফেমিনিজম ব্যাপারটা কিন্তু মাঝেসাঝেই খুঁচিয়ে তোলা হয় কেবলমাত্র অর্থনৈতিক স্বার্থেই ।
    ‎ হ্যাঁ, সোজা বাংলায় কথাটা হোলো, ইকনমিকস্ , অর্থব্যবস্থা। আর সমাজ এই অর্থব্যবস্থার ঈশারাতেই বদলেছে চিরটাকাল। সমাজ ফেমিনিজমকে এগিয়ে দেবে, কি দেবে না...সবই সেই পয়সাদেবীর খেলা।

    ‎ প্রস্তর যুগে, পুরুষ যখন বাইরে কাজ করতে যেতেন, স্ত্রীলোক ছিলেন 'ফুড গ্যাদারার'। দুজনের কাজই ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ ।
    ফলতঃ, কোনো 'হায়ারার্কি' ছিল না। আর্থিক সমানাধিকারের কারণেই স্ত্রী-পুরুষের সামাজিক সমানাধিকারও এমনিতেই ছিল।
    ‎তারপর, গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে এল মাতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। তবে,সেখানেও কোনো সামাজিক প্রভুত্ব ছিল না সেভাবে।

    ‎তারপর সমাজ তৈরী হোলো, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার এলো, এলো ভূখন্ডের সীমানা এবং তা রক্ষার জন্য পিছে পিছে এলো যুদ্ধ ।
    ‎যুদ্ধে প্রয়োজনীয় সেনা যোগান দেওয়ার জন্য প্রয়োজন হোলো 'পুত্র সন্তানে'র। এলো পলিগ্যামী। বহুবিবাহ। প্রচুর সৈনিক দরকার। সাম্রাজ্য বাঁচাতে হবে। স্ত্রী-দের হতে হোলো 'পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভার্যা' । সাম্রাজ্য বাঁচলে ইকোনমি বাঁচবে। দেশ এগোবে তরতরিয়ে।
    ‎ এইবার আসা যাক, ১৯২০ তে। ১৯২০ তে প্রথম 'ফেমিনিজম' শব্দটা শোনা গেল। 'আমেরিকান টোব্যাকো করপোরেশন' তাদের ব্যাবসা বাঁচাতে শব্দটার আমদানী করল। এডওয়ার্ড বার্ণিস, সিগারেট বিক্রির নতুন ধারনা নিয়ে এলেন, যাকে বলে, সাইকোলজিক্যাল ব্ল্যাকমেলিং...
    ‎"সিগারেট ইজ দ্য সিমবল অফ পাওয়ার...দিস ইজ দ্য সিমবল অফ মেল ডমিনেন্স"...অতএব, মহিলাদেরও সিগারেট খাওয়া খুবই দরকার।
    ‎মহিলাদের সিগারেট ধরানোর ছবি কাগজে ছেপে বেরোল, 'টর্চ অফ ফ্রিডম'...'স্বাধীনতার মশাল' জ্বেলে দিয়েছেন মহিলারা।
    ‎ ‎"রে ছোড়ি...মারে ছোড়িয়াঁ ছোড়ো সে কম হ্যায়, কা?"
    ‎তার প্রায় ২০ বছর পর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফের পুরুষ চললেন যুদ্ধে। এদিকে ইন্ডাস্ট্রি গুলিতে কাজ করে কে? ইকোনমি ধ্বসে যাওয়ার জোগাড়। চলো, আবার বেরোলো কানখুসকি। আবার ফেমিনিজমের দ্বারস্থ। "মেয়েরা কারও চেয়ে কম নয়। (না, মেয়েদের আর্থিক স্বাবলম্বী করার কথা ভেবে মোটেও নয়, দেশের ইকোনমি বাঁচাতে। ) তারা ঘরের বাইরে, ইন্ডাস্ট্রিতেও কাজ করতে পারে।" (যেন ঘরের কাজ, বাচ্চা প্রসব, ও আর এমন কী!)
    আসল কথাটা হোলো - ইকোনমি... অধিকাংশ ইজমের পিতৃপুরুষ। তাই বলে কী, 'সমানাধিকার' প্রতিষ্ঠা হোলো?
    যেই না যুদ্ধ থেমে গিয়েছে, প্রচুর যন্তরপাতি আবিষ্কার হয়ে গিয়েছে, কায়িক পরিশ্রমের কাজ কমে গিয়েছে, পুরুষ-মহিলা একযোগে কাজ করতে পারছেন, ঠিক তখনই বেতন কাঠামোয় ফারাক করে জিইয়ে রাখা হোলো 'ফেমিনিজমে'র বীজ। প্রয়োজন হলেই যা উসকে দেওয়া যায়।
    ‎যেমন, সিগারেটকে বলা হয়েছিল 'টর্চ অফ ফ্রিডম' ঠিক তেমনই, ইকোনমির প্রয়োজন হলেই মাঝে মাঝে ঝুলি থেকে বের করে আনা হয় বেড়াল, "হোয়াই স্যুড বয়েজ হ্যাভ অল দ্য ফান?"(কে জানে, ‘অল দ্য ফান’-এর সংজ্ঞাটা কী ?)
    ‎কিম্বা, আজকের 'আনসেলিব্রেটে'র জনক 'একে চন্দ্র'।
    ‎'এভরি ডে শ্যুড বি ওম্যান'স ডে।'
    ‎ ‎"রে ছোড়ি...মারে ছোড়িয়াঁ ছোড়ো সে কম হ্যায়, কা?"

    ‎আরে ভাই, '‎ফেমিনিজম' শব্দের মানে 'নারীবাদ' নয় । সঠিক মানেটা হোলো 'নারীর সমানাধিকার।'
    ‎আগে 'সমান' শব্দটা আসে, তারপর আসে 'অধিকার' শব্দটা।
    ওদিকে, ‘ছেলেদের কাঁদতে নেই’ থেকে আরম্ভ করে ‘মেনিমুখো পুরুষ’ কিম্বা ‘ছেলেদের বেশী শ্বশুর বাড়ি যেতে নেই’ থেকে ‘হোটেলের বিল ছেলেদেরই দিতে হয়’ - পর্যন্ত দাঁড়িপাল্লার দোদুল্যমান অবস্থাটা কিন্তু বাঁচিয়ে রাখা হয় সযত্নে।
    ভাববেন না। ‎এই 'সমান' শব্দটাকে এই সমাজব্যবস্থায় সত্যি সত্যি সমান করতে দেওয়া হবে না। এটি জিইয়ে রাখা হবে মাঝে মাঝে উসকে দেওয়ার জন্যেই ।
    ‎অতএব, 'লেটস্ সেলিব্রেট ওমেনস্ ডে! '
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৮ মার্চ ২০১৮ | ১৭৩ বার পঠিত
আরও পড়ুন
'The market...' - Jhuma Samadder
আরও পড়ুন
বিভাব - Avi Samaddar
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • স্বাতী রায় | 69.97.222.205 (*) | ০৮ মার্চ ২০১৮ ০৪:৪১64063
  • এমনকি যখন বেতন-কাঠামো এক হয়ে যায়, তখনও কাজের জায়গায় দ্বিতীয় শ্রেণীর হয়ে থাকতে হয় কোথাও কোথাও। মুখ খুললেই শুনতে হয়, এই জন্যেই মেয়েদের ছেলেদের সঙ্গে এক সিলেবাস পড়ান উচিত না । একই রকম অঙ্ক করেছ বলেই কি আমাদের সমান হয়ে গেলে!
  • ঝুমা সমাদ্দার | 212.142.77.185 (*) | ০৯ মার্চ ২০১৮ ১২:১৯64064
  • এই দুদিন ধরে চোখে পড়ল , অধিকাংশ বিজ্ঞাপণই নারীদিবসকে কেন্দ্র করে।আজকাল যত বিজ্ঞাপণ চোখে পড়ে , তার বেশীর ভাগেই দেখা যায় , মেয়েরা সর্বত্র বিজয়ী। মেয়েদের জয়জয়কার পাবলিকে খাচ্ছে আজকাল।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন