এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • মীরজাফর

    PRABIRJIT SARKAR লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ এপ্রিল ২০২৪ | ১২০ বার পঠিত
  • (জনৈক সৌমেন জানা কিছুকাল আগে লিখেছিলেন। ইন্টারেস্টিং বলে দিলাম এখানে)

    সত্যাসত্য বিচার না করে মীর জাফরকে অপমান করা মানে স্বয়ং পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদকে অপমান করা !

    কথাটা শুনে যা ঝটকা খেয়েছিলাম ! কী বলি। হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ফোনের অপর প্রান্তের বক্তা আর কেউ নন, মীর জাফরের অষ্টম পুরুষ এস.এম. রেজা আলি খান।

    কর্মসূত্রে মুর্শিদাবাদ এসে শহরটা ক্রমশ জড়িয়ে পড়ে আমার জীবনের স্তরে স্তরে। আমার স্মৃতির পরতে পরতে। শত বছরের প্রাচীন বইয়ের কোনও ধূসর পাতার মতো এই শহর। ক্ষয়াটে বাড়ির ইঁট-পাঁজরের সোঁদা গন্ধে, শ্যাওলা ধরা উঠোনে, হাড় জিরজিরে ঘোড়ার গাড়িতে, ভাগীরথীর পাড়ের হিমেল হাওয়ায় যেন ঘুমিয়ে আছে এই শহর। অতীতের বেদনা-বিধুর কত-শত কাহিনি বুকে জমিয়ে সে আজও অভিমানী। মুর্শিদাবাদেরই বাঁকে বাঁকে, অলিতে গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুরনো গন্ধ। কোথাও চাপা পড়ে আছে 'বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব'-এর হার না মানার গল্প, কোথাও মাটিতে পড়ে আছে অবহেলিত কলোনিয়াল স্থাপত্যের টুকরো।সেগুলোর অব্যক্ত আহ্বান আমাকে টানত। এভাবেই একদিন পৌঁছে গেছিলাম 'নিমক হারাম দেউড়ি'-এর সামনে। সেখানে গিয়ে শুনলাম যে, মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে মহম্মদী বেগ নাকি বাংলার পরাজিত নবাব সিরাজকে নৃশংসভাবে খুন করে। গাইডের কথার নাট্য ভঙ্গিতে বুকটা মুচড়ে উঠেছিল। চেয়েছিলাম একবার নিমক হারাম দেউড়ির ভেতরে ঢুকে দেখবার। কিন্তু, সেখানে নাকি ঢোকা বারন !

    কৌতূহলের আশ মেটাতে না পেরে মন খারাপ হয়ে গেছিল। পরে সোস্যাল মিডিয়ায় এস.এম. রেজা আলি খান-এর সাথে পরিচয় হয়। তারপরে একদিন ফোন করে কথাবার্তা কিছুটা এগোতেই এমন তাজ্জব বাত ! বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করতে বললেন — আজ থেকে প্রায় তিনশ বছর আগের ঘটনা। দিল্লীর সিংহাসনে তখন বাদশাহ আওরঙ্গজেব আসীন। সেই সময় ইরাকের নজাফ থেকে আমাদের পূর্বপুরুষ হুসেন নজাফি ভাগ্যান্বেষণে দিল্লীর দরবারে আসেন। তিনি ছিলেন পয়গম্বরের জামাতা হযরত আলির বংশধর। তাঁর পূর্বপুরুষেরা ইরাকের নাজাফে হযরত আলির সমাধির দেখাশোনার দায়িত্বে ছিলেন। বংশকৌলিন্যের জোরে হুসেন নজাফিও আওরঙ্গজেবের সুনজরে পড়ে দরবারে জায়গা করে নেন। পারিবারিক কাগজপত্র থেকে জেনেছি,দারা শিকোহর অনাথ কন্যার সঙ্গে তাঁর পুত্র আহমেদ নজাফির বিবাহ হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর মরদেহ নৌকাযোগে যমুনা-গঙ্গা হয়ে বাংলাদেশে আনা হয়, এবং সেখান থেকে জাহাজে ইরাকের নজাফে নিয়ে গিয়ে কবর দেওয়া হয়। এই আহমেদ নজাফির পুত্রই হলেন 'মীর মহম্মদ জাফর আলি খান', ইতিহাসে যিনি মীর জাফর নামেই বেশি পরিচিত।

    আমি শুধু হাঁ করে ওনার কথা গিলে যাচ্ছি। তারই মাঝে অস্ফুটে বললাম — আপনার এই কথার কোন বিশ্বাসযোগ্য সূত্র আছে কি? 'বিশ্বাসযোগ্য' শব্দটা শুনে খানিক থমকে গেলেন। ফোনের ওপার থেকে যেন একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর বললেন — The Golden Book of India, a genealogical and biographical dictionary of the ruling princes, chiefs, nobies, and other personages, titled or decorated by the Indian Empire- by Sir Roger Lelhbridge K.C.I.E. (Macmillan,1893) বইয়ে মীর জাফরের বংশ পরিচয় উল্লেখ রয়েছে। শুধু তাই নয়, ১৯০২ সালে লাহোর থেকে প্রকাশিত 'বাগ-এ সাদাত' নামের একটি উর্দু জার্নালেও এ নিয়ে বিস্তারিত উল্লেখ আছে।

    সব শুনে অবাক হয়ে গেছিলাম। সিরাজকে কীভাবে মারা হয়েছিল, সেটা কেউ সিওর করে বলতে পারে না। যেগুলো আমরা শুনে আসছি, সেগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাই করার কোনও উপায় নেই। সিরাজের বিরুদ্ধে তার নিজের পরিচিত অনেকেই ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু, বিশ্বাসঘাতক হিসাবে চিহ্নিত হন শুধু মীর জাফর। আর এই 'বিশ্বাসঘাতক' তকমা শুধু মীর জাফরে আটকে থাকে না। ফরমায়েশি ইতিহাসের মাদকতায় ভবিষ্যত প্রজন্মের চিন্তাভাবনা স্পাইরাল মোশানের মতো কুন্ডলি পাকিয়ে আঙ্গুল তুলে নির্দেশ করে তাঁর বংশধরদের দিকেও।

    অথচ, যুগের পর যুগ ধরে রাজত্ব দখলের জন্য আপনজনেরাই গদির লড়াইয়ে আপনজনদের বিরুদ্ধে নেমেছেন। তার ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে, একটু ইতিহাস ঘাঁটলেই পাওয়া যাবে। এমনকি সিরাজের দাদু, আলীবর্দী খানও একই কাজ করেছিলেন। তাহলে একা মীর জাফর কেন বিশ্বাসঘাতক হবেন? ইংরেজরা প্রথমে সিরাজউদ্দৌলার জায়গায় নবাব হিসেবে ইয়ার লতিফ খানকে বসাবার মতলব করেছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা জগৎশেঠের মনোনীত প্রার্থী মীর জাফরের দিকে ঝুঁকল কারণ তারা জানত প্রথমত, জগৎশেঠদের সাহায্য ছাড়া বাংলায় কোনো রাজনৈতিক পালাবদল সম্ভব নয়। দ্বিতীয়ত, মীর জাফর উচ্চ বংশজাত হওয়ায তাঁকে নবাব হিসেবে দরবারের বাকি আমির-ওমরাহরাও মেনে নেবে।

    এই একই রকম সিনারিও আমরা বর্তমান সময়ের রাজনীতিতেও দেখতে পাই। তখনই একদল রাজনীতিক গায়ের ঝাল মেটাবার জন্য অপরপক্ষকে 'বিশ্বাসঘাতক মীর জাফর' বলে অভিহিত করে। অথচ তারা জানেন না যে মীর জাফর কোন বংশজাত ছিলেন? কী পরিস্থিতিতে তিনি বেঁকে বসেছিলেন?

    সার্বিক দিক দিয়ে দেখলে মীর জাফর প্রকৃতপক্ষে দাবার গুটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর কাছে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেয়ার মত সুযোগ ছিল, যা তিনি তাঁর ক্ষমতালিপ্সা, লোভ, নতজানুতা ইত্যাদির কারণে করতে সক্ষম হননি। এই কারণগুলো মিলিয়ে দেখলে ইতিহাসের পাতায় পাতায় এরকম অনেক 'বিশ্বাসঘাতক'-এর খোঁজ মিলবে। কিন্তু তারা এতটা বদনামের ভাগীদার হননি, যতটা মীর জাফর আর তাঁর বংশধরেরা হয়েছেন। আসলে, সিরাজকে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব এই সোনার পাথরবাটি মার্কা উপাধিটা দিয়েছিলেন গিরিশচন্দ্র ঘোষ তাঁর সিরাজউদ্দৌলা সম্পর্কিত নাটকে। উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি হিন্দু-মুসলিমকে একসাথে ইংরেজ বিরোধী করে তোলা। তাঁর নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর এত জনপ্রিয়তা পেয়েছিল যে, সেখানে দেখানো ঘটনাগুলোকে সবাই সত্যি বলে মেনে নিয়েছিল। বাঙালির মননে সেই রং চড়ানো ঘটনাগুলোর ছাপ আজও সমানভাবে রয়ে গেছে। রাজনীতির মারপ্যাচের মাঝে পড়ে আজ পয়গম্বরের বংশধরকে 'বিশ্বাসঘাতক' রূপে কালিমালিপ্ত করা হচ্ছে।

    এগুলো ভাবলেই বছর খানেক আগে প্রয়াত এস.এম. রেজা আলি খান-এর শেষ কথাগুলো এখনও কানে বাজে — ইতিহাসের চোখ দিয়ে নিরপেক্ষ বিচার করলে মীর জাফর কি একটুও সুবিচার পেতে পারেন না? একবার ভেবে দেখবেন প্লিজ।

    তথ্যসূত্র: The Musnud of Murshidabad (1704-1904) - Purna Ch. Majumdar
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন