• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • মুজতবা

    ন্যাড়া লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৩০৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আমার জীবনে, যে কোন কারণেই হোক, সেলিব্রিটি ক্যাংলাপনা অতি সীমিত। তিনজন তথাকথিত সেলিব্রিটি সংস্পর্শ করার বাসনা হয়েছিল। তখন অবশ্য আমরা সেলিব্রিটি শব্দটাই শুনিনি। বিখ্যাত লোক বলেই জানতাম। সে তিনজন হলেন সৈয়দ মুজতবা আলী, দেবব্রত বিশ্বাস আর সলিল চৌধুরী। মুজতবা যখন মারা গেছেন তখনও আমি ঘুন্সি পরি। দেবব্রতর মৃত্যুর সময়ে আমার বয়েস এগারো-বারো। কাজেই এনাদের মূল্য আমি বুঝেছি অনেক পরে। সলিল চৌধুরী অবশ্য আমার যৈবনকাল অব্দি জীবিত ছিলেন, কিন্তু শেষ অব্দি আর সাক্ষাৎ করে উঠতে পারিনি।

    এখন মনে হয় এনাদের কারুর সঙ্গেই সাক্ষাৎ না হয়ে ভালই হয়েছে। যে মানসছবি তৈরি হয়েছিল, তা ধূলিসাৎ হত সহজেই। বিশেষতঃ প্রথম দুজনের সম্বন্ধে যা তৃতীয় পক্ষের সাক্ষাৎ বর্ণনা পড়েছি।

    আমি ক্লাস ইলেভেন থেকে ছাত্র পড়িয়ে উপার্জন করি। আমার পড়ানোয় ছাত্রদের কোন সুরাহা হয়েছিল বলে শুনিনি, তবে আমার হাতখরচ উঠে আসত। সেই টাকায় সিগারেট, সেই টাকায় সিনেমা-থিয়েটার, সেই টাকা জমিয়েই গান কেনা, সেই টাকা জমিয়েই বই।

    দেশে-বিদেশে পড়েছি ক্লাস এইট বা নাইনে। পঞ্চতন্ত্রও। মনে আছে নাইন না টেনের পরীক্ষার খাতায় পাকামি করে 'ওয়াকিবহাল' শব্দকে 'ওয়াকিফহাল' লিখেছিলাম মুজতবার ইনফ্লুয়েন্সে। অলোকবাবু পত্রপাঠ সেটি কেটে 'ওয়াকিবহাল' করে দেন।

    ইলেভেন-টুয়েলভের বইমেলায় নিজের পয়সায় কিনেছিলাম 'মিত্র-ঘোষ'-এর মুজতবা রচনাবলী। এখনও মনে আছে কীরকম গোগ্রাসে গিলেছিলাম। ভ্রমণকাহিনী হিসেবে দেশে-বিদেশের কথা তো সবাই জানে, কিন্তু জলে-ডাঙায়-এর খুব অল্প লোকই বলে। কিম্বা মুজতবার 'শবনম' বা 'শহর-ইয়ার'-এর কথা যত চলে, উপন্যাস হিসেবে 'অবিশ্বাস্য' বা 'টুনি-মেম'-এর কথা তত চলে না। অনবদ্য একটা ঐতিহাসিক উপন্যাসও আছে, নাম ভুলে যাচ্ছি, কিন্তু শেষ গন্তব্যে পৌঁছনর আগেই খতম করে দিয়েছিলেন। সেটিও অনবদ্য।

    মুজতবার আলীর দৌলতেই নাম জেনেছি, ও সংগ্রহ করেছি, নানারকম আইকনিক বাংলা গ্রন্থাবলী। মুজতবার কাছে সুশীলকুমার দে'র 'বাংলা প্রবাদ' নামক আকরগ্রন্থের খোঁজ পাওয়ার আগে সুশীলকুমার দে স্রেফ বুদ্ধদেব বসুর আত্মজীবনীতে নাম হয়েই ছিলেন। মুজতবা পড়েই প্রথম সংগ্রহ করি উপেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের 'নির্বাসিতের আত্মকথা' এবং পড়ে ফ্ল্যাট হয়ে যাই। কান্তি ঘোষের 'রুবায়েৎ-ই-ওমর-খৈয়াম'-ও মুজতবার দান।

    পঞ্চতন্ত্রর পাশাপাশি 'ময়ূরকন্ঠী' বা 'ধূপছায়া'-র ছোট লেখাগুলো আমার ধারণা মুজতবার অন্যতম সেরা সৃষ্টি। মুথহানার গল্প বা কোন ভিনারের মা-র মতন কালজয়ী গল্প সব এখানেই। বা কাইরোর কাফেতে স্যুট তৈরি করানোর গল্প, যার শেষ লাইন ছিল 'এখনও সেই স্যুট পরে ফার্পোতে গেলে গুণীজন তারিফ করেন' (স্মৃতি থেকে উদ্ধৃত, কাজেই প্যারাফ্রেজড)।

    পঞ্চতন্ত্র কেতাবটি সম্বন্ধে সবাই মুক্তকচ্ছ। তবে আমাকে যদি জিগেস করেন, তাহলে আমি বলব দেশে-বিদেশের বাইরে আপনি যদি মুজতবার একটি বইও পড়েন, তাহলে পড়ুন 'দ্বন্দমধুর'। যে কটি ছোটগল্প আজও আমাকে হন্ট করে, তার একটির কথা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ও উল্লেখে করেছেন। পাঠশালায় স্কুলের ইন্সপেক্টর সাহেব ইনস্পেকশনে এসেছেন। সংস্কৃতর পন্ডিতমশাই হিসেব করে দেখালেন ইন্সপেকটকের কুকুরের একটি পায়ের জন্যে যা খরচ হয়, তা দিয়ে পন্ডিতমশাইকে পাঁচজনের সংসার চালাতে হয়। সারা ক্লাস নিশ্চুপ। মুজতবা লেখা শেষ করছেন এই বলে যে, "যে আহাম্মক লিখেছিল, 'নীরবতা হিরন্ময়' তাকে যেন মৃত্যুর আগে একলাএকলি পাই।"

    দ্বন্দমধুরের গল্পগুলো তিনটি গল্পের কথা আমি উল্লেখ করব। 'নোনাজল' 'নোনামিঠা' আর 'মণি'। প্রথম দুটোই চাটগাঁয়ের ভাগ্যসফরী নাবিকদের গল্প। প্রথম গল্পে এক প্রবাসী চাটগাঁইয়া আধপেটা খেয়ে দেশে ভাইদের টাকা পাঠায় মা-র বাড়ি বানানোর জন্যে। ভাইরা আশ্বস্ত করে যে বাড়ি দারুণ উঠছে, কিন্তু বাস্তবে সেই টাকা ফুর্তিতে উড়িয়ে দেয়। সমীরুদ্দী অনেকবছর পরে দেশে ফিরে দেখে, কোথায় কী! সব ফক্কা। সে আবার টাকা রোজগারের জন্যে বিদেশে ফিরে যায়। এবার আর টাকা দেশে পাঠাল না। নিজে জমাতে থাকে যাতে সেই টাকা নিয়ে দেশে ফিরে নিজে দাঁড়িয়ে ইমারত বানাতে পারে। আল্লার কী অসীম দয়া! বিদেশেই সমীরুদ্দীর মৃত্যু হল। জমানো টাকা গেল ভাইদের হাতে। তারা আবার উড়িয়ে-পুড়িয়ে শেষ করল। মুজতবা গল্প শেষ করেন এই বলে, "ইনসাফ কোথায়?"

    কিন্তু আমার হাতে তামাক খাবেন কেন? পড়ে ফেলুন বাকি দুটো গল্প। ফিরে আসুক মুজতবা-যুগ।
  • বিভাগ : ব্লগ | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৩০৪ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • বিপ্লব রহমান | 9001212.30.5634.161 (*) | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ০৩:৫৭62138
  • স্বীকার করি, আমার ই-বুকে আগ্রহ বাড়ছেই।

    এর একটি কারণ, মোবাইলেই অনেক বই সংরক্ষণ করা যায়, ব্যাগ ভাড়ি হয় না; আর আমার মত হাফ কানারা ১৬+ পয়েন্টেই পরিস্কারভাবে সব লেখা পড়তে পারেন!

    তো, ফাদার দ্যতিয়েনে আলী সাহেবকে নতুন করে আবিস্কার করে যার পরনাই প্রীত। সে কিসসা আরেকদিন। এখনো পড়ছি।

    * ওপরের মন্তব্যে আলী সাহেবের হাস্যগল্পের নাম "রসগোল্লা" হবে, টাইপো।
  • স্বাতী রায় | 781212.194.6745.46 (*) | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:০৬62136
  • শবনম আমারও আগে অত ভালো লাগত না, বেশ নেকু পুষু মুনু মনে হত - কিন্তু দ'র গাছন্যাকা শোনার পরে আজ আবার পড়লাম - হয় আমার জীবনে পঞ্চশীলের প্রভাব বেড়েছে না হলে মঙ্গলগ্রহে বৃষ্টি নেমেছে - বললে প্রেত্যয় যাবে না , তেমন একটা খারাপ লাগল না ( এখনো ভালো বলতে পারছি না অবশ্য ) - বেশ জন্মদিনের পায়েসের বাটির মত লাগল।

    আমি অবশ্য মুজতবা স্যারের অন্ধ ভক্ত - রণে বনে জলে জঙ্গলে তিনি আমাকে অনেক বার বিবিধ ভাবে বাঁচিয়েছেন - আর কেই বা সেই আমলে আমাকে কিয়ান্তির নাম শোনাবে !
  • সুকি | 348912.82.2323.192 (*) | ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ১২:৪০62137
  • লেখাটা খুবই ভালো লেগেছে।

    তবে শবনম কোন দিনই ভালো লাগে নি।
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাতা :
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন