এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ময়ূরঝর্ণা - পর্ব ১০ 

    বিতনু চট্টোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ৩২৫ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ১২-০১-১৯৯৯, বাঁশলাটা চাকাডোবা

    প্রচণ্ড ঠান্ডা পড়েছে আজ বেলপাহাড়িতে। দু’দিন আগে বলা-কওয়া নেই, হঠাৎ কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টি, তারপর থেকেই শীত জাঁকিয়ে বসেছে। গরম পোশাক থাক না থাক, ঠান্ডার সঙ্গে তাও যুঝতে পারে এখানকার মানুষ, কিন্তু বেলপাহাড়ি, বাঁশপাহাড়ির গরিব পরিবারগুলোর কাছে দু’দিন আগের বৃষ্টি এক সর্বনাশ ডেকে আনে। এই সময়টা কিছু কিছু জমিতে আলু বীজ ফেলে গরিব মানুষ। পরশুর বৃষ্টিতে সব আলু মাঠেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ডিসেম্বরের গোড়ায় বৃষ্টি হলে শহরের মানুষ যখন আজ দারুণ ওয়েদার বলে শীতের পোশাক নামায়, তখন একই রাজ্যে এই একই বৃষ্টি বর্ধমানের মেমারি থেকে ময়ূরঝর্ণায় আলু চাষির চোখে জল নিয়ে আসে। বাড়ির পিছনে ফাঁকা জায়গাটায় একটু আলু বীজ পুঁতেছিল সুবল, শূন্য দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে সেদিকে! ওদিকে সকাল থেকে বসার সময় নেই যমুনার, দু’দিন বাদে সংক্রান্তি। কাঁচা শালপাতা কুড়োতে বেরিয়ে যায় খুব ভোরে। শালপাতা দিয়ে সংক্রান্তিতে পিঠে হবে। শালপাতা বাড়িতে রেখেই জঙ্গলে যেতে হবে কাঠ কুড়োতে।
    এই সময়টা সাত-আট’দিন স্কুলে যায় না সিংরাই। সক্কাল সক্কাল মাকে নিয়ে সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে পড়ে হাঁড়ি, তাওয়া, সরা বিক্রি করতে। সংক্রান্তিতে এখন সরা, তাওয়ার চাহিদা খুব। এক-এক দিন তো কুড়ি-বাইশটা তাওয়া, সরাও বিক্রি হয়ে যায়। তবে আজ সিংরাইকে স্কুলে যেতে হবে, কারণ যত সরা, তাওয়া বানানো ছিল সবই কাল বিক্রি হয়ে গিয়েছে। যেগুলো বানানো আছে সেগুলোও ভালো করে শুকোয়নি দু’দিন আগের বৃষ্টির জন্য।
     
    স্কুলে ছুটির ঘণ্টা পড়তেই আর এক মিনিটও দেরি করল না সিংরাই। স্কুল থেকে বেরিয়েই প্রায় ছুটতে শুরু করে সে। সকালে বেরনোর সময় বাবা বলে দিয়েছিল তাড়াতাড়ি ফিরতে। বিকেলে বাবার সঙ্গে যেতে হবে বাঁশলাটা গ্রামে। ঠিক কী কারণে যাওয়া তা বাবা বলেনি, শুধু বলেছে সহদেব কাকার বাড়িতে মিটিং আছে। সহদেবের ছেলে অনিল স্কুলে সিংরাইয়ের সঙ্গে এক ক্লাসে পড়ে। সিংরাই আর অনিল রোজ স্কুল থেকে বেরিয়ে একসঙ্গেই ফেরে জঙ্গলের রাস্তা ধরে। তারপর অনিল চলে যায় বাঁশলাটা, সিংরাই চলে আসে বাড়ি। আজ স্কুলে ঢুকেই সিংরাই অনিলকে বলে রেখেছিল বিকেলে ওদের বাড়ি যাবে, তাই তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে। সাধারণভাবে প্রায় এক ঘণ্টার রাস্তা কখনও দৌড়ে, কখনও জোরে হেঁটে সিংরাই যখন বাড়ি পৌঁছল, তখন তিনটে বাজে। বাবা ঘরের পিছনে ফাঁকা জায়গাটায় বসে সরা বানিয়ে চলেছে। ধর্মার এখনও তেমন বয়স হয়নি বাবাকে সাহায্য করার মতো। বোন তো আরও ছোট। সেই সকাল থেকে একাই কাজে বসেছে সুবল। টানা বসে কাজ করতে করতে তার পিঠ, ঘাড় টনটন করে ব্যথায়। সিংরাই জানে বাবার পিঠে ব্যথার কথা। আজ স্কুলে না গেলেই ভালো হত, বাবাকে সাহায্য করা যেত। কিন্তু বাবাই জোর করল স্কুলে যেতে। যদিও স্কুলে যেতে একেবারেই ভালো লাগে না সিংরাইয়ের। ছেলেকে ফিরতে দেখে ঘুরে বসল সুবল মান্ডি। ‘খেয়ে নাও, মা কাঠ নিয়ে ফিরলেই আমরা বেরব।’ বাবার কথার কোনও জবাব না দিয়ে ঘরে ঢুকল সিংরাই। সেই সকালে আগের রাতের জলে ভেজানো ভাত খেয়ে বেরিয়েছিল। খিধে পেয়েছে খুব, তবে বছরের এই সময়টা ঘরে মোটামুটি খাবার থাকে। ঘরে ঢুকে স্কুলের ব্যাগটা এক কোণায় রেখে পুকুরে গিয়ে হাত, পা ধুয়ে নিল সিংরাই, তারপর বসল এক বাটি মুড়ি নিয়ে।
    বেলপাহাড়িতে এই সময়টা বিকেল পাঁচটার আগেই অন্ধকার নেমে আসে। তারপর কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায় চারদিক। কোনও কোনও দিন তো দু’হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। সেই সঙ্গে জাঁকিয়ে ঠান্ডা। স্কুল থেকে ফেরার সময় দৌড়নোর জন্য কিছুক্ষণ আগেই ঘাম হচ্ছিল, এখন শীতটা আবার ফিরে আসছে। ঘরে ঢুকে ফুল সোয়েটার পরে নিল সিংরাই। একটাই ফুল সোয়েটার ওর। আজকের মতো সুবলের কাজ শেষ। শুকনো হাঁড়ি, কলসি, সরাগুলো উঠোন থেকে তুলে ঘরে রেখে পুকুরে হাত, পা ধুতে যায়। সিংরাইকে বলে যায় তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নিতে। বোনকে নিয়ে কাঠ কুড়োতে গিয়েছিল মা। যমুনাও ফিরে আসে ঘরে। শুধু ধর্মাটা এখনও খেলে ফেরেনি।
     
    ময়ূরঝর্ণা গ্রামে সুবল মান্ডিদের বাড়ি থেকে সহদেব সিংহ সর্দারের বাঁশলাটা গ্রাম খুব বেশি রাস্তা না, কিন্তু পিঠে ব্যথার জন্য সুবল টানা সাইকেল চালাতে পারে না। সেই কারণেই সিংরাইকে নিয়ে যাওয়া। বাবাকে সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে বসিয়ে সিংরাই যখন রওনা দিল, তখনও দিনের আলো অল্প আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই নেমে এল অন্ধকার। যদিও এই অন্ধকারে অসুবিধে হয় না স্থানীয় মানুষের। শক্ত হাতে হ্যান্ডেল ধরে প্যাডেলে চাপ দিল সিংরাই।
    বাঁশলাটা খুব বড় গ্রাম নয়। গ্রামে ঢোকার রাস্তা ধরে কিছুটা এগোলেই একটা বড় পুকুর, তার ঠিক আগে খেজুর গাছ বরাবর মাটির রাস্তা চলে গিয়েছে উত্তর দিকে। সেই রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়েই পরপর তিনটে ঘর, তারপর সহদেবের বাড়ি। সহদেবদের এখন শুধু বাস্তু জমিটুকুই আছে। দুটো ঘরের ছোট মাটির বাড়ি, বাড়ির সামনে সামান্য উঠোন, এক কোণে তুলসি গাছ। মাটির বারান্দার একদিকে গর্ত করে উনুন বানানো। সুবল আর সিংরাই যখন গিয়ে পৌঁছল তখন গাঢ় অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছে চারদিক। যাদের আসার কথা সহদেবের বাড়িতে তার মধ্যে অনেকেই পৌঁছে গিয়েছে। চার-পাঁচজনের পৌঁছনো বাকি। ঘরের সামনে উঠোনে একটা বড় শতরঞ্চি পেতে বসার ব্যবস্থা করেছে সহদেব। তার ওপর বসে আছে চুরকু হাঁসদা, অর্জুন মান্ডি, নিত্যানন্দ রায়, কালো বেসরা, বাবলু সিংহ, নিত্যলাল হেমব্রম। সবাই গোল হয়ে বসেছে, মাঝখানে রাখা একটা হ্যারিকেন। সুবল গিয়ে বসল কালো বেসরার পাশে। সিংরাইয়ের জন্যই অপেক্ষা করছিল অনিল। সাইকেলটাকে একটা গাছে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে সিংরাই আর অনিল একসঙ্গে এগোল বাড়ির পিছনে মাঠটার দিকে। দুই বন্ধু গিয়ে বসল মাঠের এক ধারে।
    ওদিকে সহদেবের বাড়িতে ততক্ষণে হাজির হয়েছে চুরকু হাঁসদার দাদা কার্তিক এবং আরও তিন-চারজন। কিন্তু কেন এই দশ-বারোজন এই শীতের সন্ধ্যায় হঠাৎ হাজির হয়েছে সহদেব সিংহ সর্দারের বাঁশলাটার বাড়িতে, কী নিয়ে তাদের আলোচনা, তা জানতে হলে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে ঠিক এক মাস আগের এক ঘটনায়। সেটা ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ।
     
    জুজারধরার চুরকু হাঁসদা, কার্তিক হাঁসদা, ময়ূরঝর্ণার সুবল মান্ডি, পচাপানি গ্রামের অর্জুন মান্ডি, গিরুলিয়ার বাবলু সিংহ, নিত্যলাল হেমব্রম, চাকাডোবার নিত্যানন্দ রায়, কালো বেসরা, সকলেই গরিব দিনমজুর। কারোরই এক ডেসিমেল জমি-জায়গাও নেই, কখনও অন্যের জমিতে চাষ, কখনও পাথর ভাঙা, জোতদারদের চাষের জমি তৈরি করা, সারা বছর নানা কাজ করে কোনওভাবে সংসার চলে গরিব মানুষগুলোর। যার বাড়িতে আজ এই মানুষগুলো জড়ো হয়েছে সেই সহদেব সিংহ সর্দারের জমি ছিল কিছু। দু’বছর আগে বউয়ের শরীর খারাপের জন্য চিকিৎসা করাতে চাকাডোবারই জোতদার অমিয় মন্ডলের থেকে তিন দফায় এক বছরের জন্য চার হাজার টাকা ধার করেছিল। ভেবেছিল জমিতে চাষ করে ধার শোধ করে দেবে। কিন্তু সেই ধার আর শোধ করতে পারল না সহদেব। তার বদলে জমিটাই চলে গেল অমিয় মন্ডলের দখলে। পড়ালেখা না জানা সহদেব বুঝতেই পারেনি কত টাকা করে মাসে সুদ দিতে হবে অমিয় মন্ডলকে। অমিয় মন্ডল মুখে বলেছিল এক, কাগজে লিখিয়ে নিয়েছিল আর এক। টানা এক বছর ধরে সুদ দেওয়ার পর আগের বছর ধান বেচে সহদেব আসল টাকা ফেরত দিতে গিয়েছিল অমিয় মন্ডলকে। তখন জানতে পারে, যা টাকা ফেরত দিয়েছে তার চারগুণ সুদ আর সঙ্গে আসল মিলে আরও দশ হাজার টাকা দিতে হবে দুদিনের মধ্যে। একদিনে অত টাকা জোগাড় করতে পারেনি সহদেব। একদিন বাদেই অমিয় মন্ডলের লোকজন পুলিশ নিয়ে এসে দখল নিল সহদেবের জমির। নিজের জমিতেই এবার চাষ করেছে সহদেব, কিন্তু এখন এই জমির মালিকানা চাকাডোবার জোতদার অমিয় মন্ডলের। তাও মুখ বুজে মেনে নিয়েছিল সহদেব। কিন্তু মাস’তিনেক আগের এক ঝড়-বৃষ্টির রাত তছনছ করে দিল সহদেব এবং আজ তার বাড়িতে উপস্থিত গরিব মানুষগুলোর জীবন।
    সুবল মান্ডি অনেকদিন ধরেই ভাবছিল ঘরটা একটু সারাবে। এক ঘরের মাটির বাড়ি। টালির এক জায়গা দিয়ে বর্ষায় জল পড়ছিল বলে তার ওপর পলিথিন দিয়ে চালাচ্ছিল। মা, বউ, তিন ছেলে-মেয়ে নিয়ে সুবল মান্ডির সংসার। ঘরে জায়গার অভাবে অনেক দিন ধরেই সুবল আর সিংরাই ঘরের বাইরে মাটির বারান্দায় শোয়। একই অবস্থা চুরকু হাঁসদা এবং অন্যদেরও। সবারই সংসারে লোক বেড়েছে। কিন্তু বাস্তু জমিটুকু ছাড়া অন্য জায়গা নেই, সেই সঙ্গে টাকার অভাবে কেউই ঘর বাড়াতে পারছিল না। তিন মাস আগের প্রচণ্ড ঝড়ে সবারই বাড়ির কম-বেশি ক্ষতি হয়। তখনই এই দশ-বারোটা পরিবার একদিন ঠিক করে, বর্ষাটা কমলে জঙ্গলে ঢুকে একটু বড় বাড়ি বানিয়ে নেবে। জঙ্গলে অনেক জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। জঙ্গলে বাড়ি বানানোর প্রস্তাব প্রথম দিয়েছিল বাবলু সিংহ। ‘আমরা তো আগে জঙ্গলেই থাকতাম। এখন জঙ্গলের সেই অবস্থাও নেই, অনেক কমে গেছে। আমাদের সবার বাড়ির যা অবস্থা, আমরা যদি রাস্তা থেকে জঙ্গলে একটু ঢুকে ফাঁকা জায়গাটায় ঘর বানিয়ে নিই কেমন হয়?’ বাবলুর কথায় সবাই সায় দেয়। যেমন ভাবনা তেমন কাজ, পুজোর পর ধান কাটার মরশুমে সবার হাতেই টাকা ছিল কিছু। তা দিয়ে দশ-বারোটা পরিবার জঙ্গলের একটা ফাঁকা জায়গা বেছে নেয়। তারপর বাঁশ, খড় কিনে কুড়ি-পঁচিশজন একসঙ্গে হাত লাগাল বাড়ি বানাতে। দিন দশেক এক করে কিছুটা ছাড়া ছাড়া বানিয়েও ফেলল বাড়ি। কেউ দুটো, কেউ বা তিনটে ঘরের বাড়ি বানাল। বাঁশ দিয়ে পোক্ত করে চালা বেঁধে খড় বিছিয়ে মাটি লেপে ঘর বানিয়ে ফেলল আদিবাসী পরিবারগুলো। তারপর সবকটা পরিবার প্রায় একই সঙ্গে নিজেদের পুরনো ঘর ছেড়ে উঠে এল জঙ্গলে তৈরি করা নতুন বাড়িতে।
     
    জঙ্গলে নতুন বাড়িতে গুছিয়ে বসল পরিবারগুলো, দেখতে দেখতে কেটেও গেল এক মাস। সেদিনও আজকের মতো ঠান্ডা পড়েছিল খুব। সকাল সকাল সুবল, নিত্যলাল, সহদেবরা যে যার মতো কাজে বেরিয়ে গেল। ধান কাটার মরশুম শেষ হয়েছে সবে, এখন কোনও দিন কাজ থাকে, কোনও দিন কাজ নেই। দুপুর সাড়ে এগারোটা-বারোটা হবে, হঠাৎই জঙ্গলের ধারে এসে থামল ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের একটা গাড়ি। তার পিছনে পুলিশের গাড়ি, সঙ্গে একটা বড় কালো ভ্যান। প্রথমেই কালো বড় ভ্যানটা থেকে চার-পাঁচজন পুলিশ লাফ দিয়ে নামল রাস্তায়। ফরেস্ট ডিপার্টমেণ্টের আর পুলিশের ছোট গাড়ি দুটো রাস্তা থেকে একটু ঢুকল জঙ্গলের ভেতর। দেড়শো মিটার এগিয়ে গাড়ি দুটো থামল একটা ফাঁকা জায়গায়, সেখান থেকে এক মাস আগে তৈরি হওয়া বাড়িগুলোর দূরত্ব আড়াইশো-তিনশো মিটার। এই দুপুরে গ্রামের গরিব পরিবারের বাড়িগুলোতে কিছু বাচ্চা আর বয়স্ক মানুষ ছাড়া কেউই থাকে না। পুরুষ, মহিলা সবাই কোনও না কোনও কাজে বেরিয়ে যায়। পাঁচ-ছ’জন বয়স্ক মানুষ আর আট-দশটা বাচ্চা সেই সময় ছিল বাড়িগুলোতে। কোনও এক কারণে সেদিন স্কুলে যায়নি সিংরাই, আর শরীর খারাপের জন্য কাজে যায়নি চুরকু। চুরকু ঘরের বাইরে উঠোনে বসে মাছ ধরার জাল বুনছিল।
    ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট এবং পুলিশের একজন করে অফিসার গাড়ি দুটো থেকে নামল, সঙ্গে তাদের দেহরক্ষীরা। কালো ভ্যান থেকে নামা পুলিশের লোকগুলোও ততক্ষণে দৌড়ে চলে এসেছে সামনে। ঘরের বাইরে বসেছিল সিংরাই। তার পাশেই ছিল বোন টগর, ধর্মা স্কুলে গিয়েছে। কী হচ্ছে, কেন এই লোকগুলো এসেছে, কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিংরাই দেখল, পুলিশের কালো ভ্যানটা যেখানে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, তার পাশে এসে থামল দুটো ম্যাটাডোর। ম্যাটাডোর দুটো থেকে ঝপঝপ করে নামল কুড়ি-বাইশটা ছেলে। সিংরাইদের ঘরের ঠিক মুখোমুখি চুরকু হাঁসদার ঘর। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা পুলিশ কাঁধ থেকে বড় রাইফেল নামিয়ে সোজা তাক করল চুরকুর মাথায়। জাল বোনা থামিয়ে হতভম্বের মতো বসে থাকল চুরকু। কেউই বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে। একবার চুরকুর দিকে, একবার পুলিশটার দিকে তাকাচ্ছে সিংরাই, অজান্তেই শক্ত করে ধরল বোনের হাত। দশ হাত দূরে পুলিশ মাথায় তাক করে রেখেছে রাইফেল, কিন্তু চুরকু হাঁসদার চোখে যত না মৃত্যুভয়, তার চেয়ে বেশি বিস্ময়! পুলিশের অফিসারটা গালাগালি করতে করতে এগিয়ে গেল চুরকুর দিকে, তারপর ফুল সোয়েটার আর লুঙ্গি পরা চুরকু হাঁসদাকে খালি পায়ে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে তুলল পুলিশ ভ্যানে। এই ঘটনা যখন ঘটছে তখন সিংরাইয়ের ঠাকুমা, নিত্যলালের বাবা, কার্তিক হাঁসদার বাবা এবং আরও কয়েকজন বয়স্ক লোক জড়ো হয়ে গেল। ‘সবাই সরে যাও এখান থেকে। ফরেস্টের জমি দখল করে বাড়ি বানানো,’ গর্জন করে উঠল পুলিশ অফিসার। বয়স্ক এবং বাচ্চাদের গলা দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না। ইতিমধ্যেই ম্যাটাডোর থেকে নামা ছেলেগুলো জড়ো হয়ে গেছে। এরপর যা ঘটতে শুরু করল তা কারও কল্পনাতেও ছিল না। ম্যাটাডোর থেকে নামা কুড়ি-পঁচিশটা ছেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রায় এক মাস ধরে তৈরি করা বাড়িগুলোর ওপর। লাথি মেরে ভাঙতে শুরু করল মাটির দেওয়াল। বাড়ির মাথায় উঠে ছুড়ে ছুড়ে ফেলতে শুরু করল টালি। বাড়িগুলোর মাটির দেওয়াল ভেঙে, টালি তছনছ করে বাঁশ খোলার কাজে হাত দিল তারা। এক একটা ঘরে ঢুকে যা সামান্য  জিনিস ছিল তা বাইরে ফেলতে শুরু করল।
     
    বাচ্চা আর বয়স্ক মানুষগুলো চোখের সামনে দেখতে থাকল, সমস্ত জমানো টাকা খরচ করে এক মাস ধরে তৈরি ঘরগুলো ধসে পড়ছে চোখের সামনে। কিন্তু একটা লোকও এগোতে পারল না, প্রতিবাদ করতে পারল না, জিজ্ঞেস করতে পারল না কী তাদের অপরাধ। এমনকী কারও মুখ দিয়ে কোনও শব্দও বেরোল না! একেই কি বলে শোকে পাথর হয়ে যাওয়া! একমাত্র সিংরাই, তেরো বছরের সিংরাই মান্ডি বোনের হাতটা শক্ত করে ধরে একবার বলল, ‘কী করছ?’ কিন্তু তার গলার আওয়াজ পৌঁছল না পুলিশগুলো পর্যন্ত। টগরের হাত ছেড়ে সিংরাই দৌড়ে গেল ওদের ঘরের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে দুটো পুলিশ এগিয়ে এসে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিল তাকে। তারপর সিংরাইয়ের দিকে তাকালও না পুলিশ বা ফরেস্ট ডিপার্টমেণ্টের কেউ। তাকালে দেখতে পেত, বাচ্চা ছেলেটার চোখে শোক নেই, অবাক হওয়া নেই, রাগও নেই, যা আছে তাকে বলে ঘৃণা। যা তার জীবনকে কোন খাতে বইয়ে নিয়ে যাবে তা সেদিন জানা ছিল না কারও। সিংরাইয়েরও না!
    বারো-তেরোটা ঘরের মাটির দেওয়াল, টালি ভাঙতে বা খড়গুলোকে তছনছ করতে সময় লাগল না বেশি। কিন্তু কুড়ি-পঁচিশটা ছেলে হাঁফিয়ে উঠল বাঁশের কাঠামো খুলতে। শেষে ম্যাটাডোর থেকে করাত, ছুরি এনে দড়ি কেটে বাঁশগুলো খুলে ম্যাটাডোরে তুলতে শুরু করল তারা। পুরো ঘটনাটা ঘটল দু’-আড়াই ঘণ্টা ধরে। দুপুর তিনটের মধ্যে সবকটা বাড়ি মাটিতে মিশিয়ে ম্যাটাডোর নিয়ে চলে গেল ছেলেগুলো। বড় কালো ভ্যানে একা চুরকুকে বসিয়ে থানার দিকে রওনা দিল পুলিশ। ঘণ্টা’তিনেকের অভিযানে ফরেস্ট আইন ভাঙার অভিযোগে গ্রেফতার এক, বাজেয়াপ্ত কিছু বাঁশ। তারপরও মিনিট দশেক সেখানে থাকল ফরেস্ট আর পুলিশের দুই অফিসার। লোকগুলো কোনও বাধা না দেওয়ায় এবং নির্বিঘ্নে পুরো অপারেশন শেষ হওয়ায় কিছুটা অবাকই হল দুই অফিসার। তারা ভেবেছিল আদিবাসীদের উচ্ছেদ করতে গেলে বাধা আসবে, তাই বাড়তি ফোর্স, সঙ্গে কিছু ছেলে নিয়ে এসেছিল। কিন্তু সব কিছু তাড়াতাড়ি মিটে যাওয়ায় তাদের মধ্যে ধারণা জন্মাল, আদিবাসী এলাকায় ল অ্যান্ড অর্ডার ডিউটি করা কঠিন কিছু না। তারা বুঝতেও পারল না সব নীরবতা সম্মতির লক্ষণ নয়!   
     
    সবকটা গাড়ি চলে যাওয়ার পর আস্তে আস্তে যেন অসাড় ভাব কাটল আদিবাসী মানুষগুলোর। যে যার বাড়ির দিকে এগিয়ে গেল, সব ভেঙে তছনছ করে চলে গিয়েছে লোকগুলো। স্টিলের, অ্যালুমিনিয়মের বাসনগুলো ছাড়া একটা জিনিসও প্রায় নেই যা আবার কাজে লাগতে পারে। সিংরাই দৌড়ে গেল ঘরের ভেতর। উল্টে পড়েছিল কেরোসিন তেলের জারটা। সেটাকে সোজা করে দেখল এখনও কিছুটা তেল আছে, পুরোটা পড়েনি মাটিতে। সিংরাইয়ের ঠাকুমা গোছাতে লাগল বাসনকোসন, সামান্য জামা-কাপড়, পলিথিনের প্যাকেটে রাখা সামান্য কিছু জিনিস। মাটিতে এক কোণে পড়ে থাকা স্কুল ব্যাগটা তুলে সিংরাই পিঠে নিয়ে নিল, তারপর ঠাকুমার সঙ্গে হাত লাগাল বাকি জিনিস গোছাতে। কোনও দিনই স্কুলে যেতে ভালো লাগে না সিংরাইয়ের, পড়তে তো ইচ্ছে করে না আরও, তবু কেন যে স্কুল ব্যাগটা যত্ন করে পিঠে নিল তা ভাবার মতো সময় তখন ছিল না সিংরাইয়ের।
    বিভিন্ন কাজে বেরনো মানুষগুলো বেলা সাড়ে তিনটে নাগাদ ফিরতে শুরু করল বাড়িতে। প্রথমেই ফিরল কালো বেসরা। তারপর একে একে ফিরল সিংরাইয়ের মা যমুনা, কার্তিক হাঁসদা, নিত্যানন্দ, বাবলু, সহদেব। স্কুল থেকে ফিরল অনিল, ধর্মারা। এত কষ্ট, পরিশ্রম করে তৈরি করা বাড়িগুলো চোখের সামনে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে থাকতে দেখে কেউ কোনও কথাও বলতে পারে না। কেন ফরেস্টের লোক পুলিশ সঙ্গে করে এনে তাদের বাড়ি ভেঙে দিয়ে গেল কোনও সতর্কবার্তা ছাড়াই, তা বুঝতে পারল না কেউ। এই আদিবাসী মানুষগুলো জানতো না কবে দেশের সরকার আইন করেছে, জঙ্গলের জমিতে কেউ কোনও কাঠামো তৈরি করতে পারবে না! পুরুষের পর পুরুষ জলে, জঙ্গলে বড় হওয়া আদিবাসী মানুষগুলো আন্দাজও করতে পারেনি, জঙ্গলে একটা ঘর বানিয়ে থাকার অপরাধে পুলিশ কাউকে গ্রেফতারও করতে পারবে, এমন আইন পাশ হয়েছে দেশে।
     
    এদিকে শীতের বেলা ছোট হয়ে আসছে, আর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার নেমে আসবে। তারপর জাঁকিয়ে পড়বে ঠান্ডা। বেলপাহাড়িতে ডিসেম্বরের ঠান্ডায় সারা রাত বাচ্চা, বুড়ো নিয়ে খোলা আকাশের নীচে বসে থাকা সম্ভব নয়, তা বুঝতে বেশি সময় লাগল না কাজ সেরে ঘরে ফেরা মানুষগুলোর। সবাই মিলে আলোচনা করে ঠিক করল, আজকের রাতটা সুবল মান্ডির ময়ূরঝর্ণার বাড়িতেই থাকবে সবাই। কারণ, জঙ্গলের এই জায়গাটা থেকে ময়ূরঝর্ণা সবথেকে কাছের গ্রাম। এমনিতেই এই বাড়িগুলোতে দুপুরের খাবার হয় একটু দেরিতে, আজ তো রান্নাই হয়নি কোনও ঘরে। সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিকে, জঙ্গলে এমনিতেও রোদ ঢোকে না সব জায়গায়, যে কোনও মুহূর্তে সন্ধে নেমে আসবে। তেরোটা পরিবারের প্রায় ষাটজন মানুষ হাতে, মাথায় বাসন, কাপড়, মশারি, বালতি, মগ নিয়ে, বেশিরভাগ জিনিস সাইকেলে বেঁধে লাইন দিয়ে হাঁটতে শুরু করে ময়ূরঝর্ণা গ্রামের দিকে। দূর থেকে যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখগুলো দেখা যায় না, দেখা যায় শুধু কিছু ছায়ামূর্তি ক্লান্ত শরীরগুলোকে টেনে নিয়ে চলেছে আর এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে, যদিও এই দৃশ্য দেখার সাক্ষী নেই কেউ।
    সবাই যখন ময়ূরঝর্ণা গ্রামে সুবল মান্ডির বাড়ির উঠোনে জড়ো হল তখন বেলপাহাড়ি ফরেস্ট অফিসের বারান্দায় শূন্য দৃষ্টিতে বসে চুরকু হাঁসদা। তাকে নিয়ে কী করা হবে তখনও ঠিক করতে পারেনি ফরেস্টের অফিসার। শেষমেশ ঠিক হল, লোকটাকে গ্রেফতারই করা হবে। ফরেস্ট এলাকায় অবৈধ কিছু নির্মাণ হয়েছিল এবং তা ভেঙে ফেলা হয়েছে, এমন একটা কেস করতে হবে তো! তাই একটা লোককে অন্তত গ্রেফতার দেখানো দরকার। নয়তো আদালত আবার নানা প্রশ্ন তুলতে পারে। ফরেস্ট অফিসাররা নিজেদের মধ্যে কথা বলে আফশোস করল, আরও দু-তিন’জনকে গ্রেফতার করতে পারলে ভালো হত। ঠিক হল, পরদিনই লোকটাকে কোর্টে তুলে জেলে পাঠিয়ে দিতে হবে। যদিও চুরকুকে যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে তা তখনও জানতে পারেনি তার দাদা কার্তিক হাঁসদা বা অন্যরা।
     
    সন্ধে নেমে গিয়েছে বেলপাহাড়িতে। সুবল মান্ডির বাড়ির উঠোনে পাতা হয়েছে বড় কয়েকটা পলিথিন। তিনদিকে পুঁতে ফেলা হয়েছে বাঁশ। তারপর একদিকে গাছের ডালে, অন্য তিনদিকে বাঁশের সঙ্গে আটকানো হয়েছে আরও কয়েকটা পলিথিন। রাতের কুয়াশা থেকে মাথা বাঁচানোর ব্যবস্থা করার পর কয়েকটা শাড়ি দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় জায়গাটা। ওদিকে এতগুলো লোকের জন্য একসঙ্গে ভাত করা মুশকিল, তাই ইট দিয়ে বানানো হয় কয়েকটা উনুন। সেখানে কয়েকটা হাঁড়িতে চাল আর আলু ফুটিয়ে নেওয়া হয়। এরপর সন্ধে সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ বাচ্চা, বুড়ো এবং বাকিরা মিলে প্রায় ষাটজন খাওয়া সেরে নেয় কোনওভাবে। তারপর মাথার ওপরে পলিথিন, চারদিকে শাড়ি দিয়ে ঘেরা জায়গাটায় শুয়ে পড়ে তাড়াতাড়ি। কাল ভোর ভোর উঠে আবার নতুন করে যার যার নিজের গ্রামে ফিরে ঘর বানানোর কাজ শুরু করতে হবে।
    এরপর প্রায় এক মাস ধরে এই পরিবারগুলো কীভাবে আবার নিজেদের ঘর মেরামত করল, এই শীতের দিনে কীভাবে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরল সেই ঘটনা পুরো জানতে গেলে আজ কিছুক্ষণ আগে সহদেব সিংহ সর্দারের বাড়িতে যে মিটিং শুরু হয়েছে তা শেষ হয়ে যাবে। তাই এক মাস আগের ঘটনা ছেড়ে এবার আমাদের দ্রুত ফিরতে হবে বাঁশলাটা গ্রামে। এক মাসের পথ পেরোতে হবে এক নিমেষে। কারণ, এই মিটিংয়ে কী সিদ্ধান্ত হল তা জানা না গেলে বোঝা যাবে না ঠিক কবে, কীভাবে চাকাডোবার এই শান্ত আদিবাসী গ্রামে পা ফেলল মাওয়িস্ট কমিউনিস্ট সেন্টার বা এমসিসি।
     
    ‘শোন, তোমরা আর কত দিন ধৈর্য দেখিয়ে থাকবে, তোমরা ঠিক কর। আমি ঠিক করে নিয়েছি, ওদের সঙ্গে একবার কথা বলব,’ দৃঢ়তার সঙ্গে বলল সহদেব। প্রায় এক ঘণ্টা হয়ে গেলে ওদের আলোচনা চলছে। সহদেবই প্রথম প্রস্তাব দিয়েছিল, ‘এবার একটা হেস্তনেস্ত করতে হবে।’ আঠাশ দিন জেল খেটে একদিন আগেই ছাড়া পেয়েছে চুরকু হাঁসদা। সহদেবের কথায় চুরকু পাল্টা বলে, ‘হেস্তনেস্ত কী করবে শুনি?’ কালো বেসরা বলে, ‘আমরা দিন আনি, দিন খাই, আমরা হেস্তনেস্ত করার কে?’
    ‘তোমাদের তো শুধু বাড়ি ভাঙা গেছে, আমার জমিটাই দখল করে নিয়েছে অমিয় মন্ডল। এই যে সবার বাড়ি গেল, তোমরা বিচার চাও না?’ আবার বলে সহদেব।
    ‘আমরা বিচার চাওয়ার কে? আমাদের কী মুরোদ?’
    ‘ঠিক আছে, তোমরা যখন কেউ রাজি নও, আমি আমারটা একাই বুঝে নেব। আমি কথা বলব ওদের সঙ্গে,’ বেপরোয়া হয়ে ওঠে সহদেব।
    ‘বিচার তো আমরা চাই, কিন্তু বনপার্টিকে খবর দিলে যদি জানাজানি হয়ে যায়? সিপিএম, পুলিশ আমাদের ছাড়বে?’ ভয় কাটে না গরিব আদিবাসী মানুষগুলোর। বিচার তো সবাই চায়, কিন্তু ওরা কেউই কোনও দিন দেখেনি বনপার্টির কাউকে। কখনও কখনও কানাঘুঁষো শুনেছে ওদের কথা।
    সহদেব ফের বলে ওঠে, ‘সবাই যদি রাজি থাক তো বল। আমার শ্বশুরবাড়ির পাড়ায় ওরা মাঝে মাঝে আসে। রাতে থাকে। আমি একবার শ্বশুরবাড়ি গেছিলাম কয়েক মাস আগে, ওদের কথা শুনেছি। লোকগুলো কথা ঠিকই বলে। আমাদের মনের কথাই বলে। সবাই রাজি থাকলে আমি শ্বশুরবাড়ি যাই একবার। ওদের খবর দিই। আমার বাড়িতেই আসতে বলি। সেদিন না হয় তোমরা আমার বাড়িতে আসবে। শুনবে ওরা কী বলছে।’
    সহদেবের এই কথাটা অনেকেরই মনে ধরে। এই ভালো। সহদেব যদি নিজের বাড়িতে ডাকতে চায় তাতে অসুবিধের কিছু নেই। যদি ওরা এসে কোনও সাহায্য করতে পারে ভালোই তো। এই ভাবনা থেকেই সহদেবের কথায় সায় দেয় সুবল, কালো, নিত্যানন্দ, চুরকুরা। দু’চারজনের মনে একটু কিন্তু ভাব ছিল জানাজানির ভয়ে, তারাও নিমরাজি হয়ে যায় সহদেবের প্রস্তাবে।
    ‘ঠিক আছে, আমি তবে কালই যাচ্ছি শ্বশুরবাড়ি। ওরা কবে আসতে পারবে জানতে পারলেই তোমাদের খবর দেব,’ সবাইকে রাজি করাতে পারার আনন্দে যেন আর তর সয় না সহদেবের।
    ‘কাল বাদে পরশু সংক্রান্তি, আর এখন বাড়ি ছেড়ে তুমি যাবে ওদের খবর দিতে।’ এতক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথায় মশগুল ছিল সবাই, কেউ খেয়ালই করেনি কখন অন্ধকারে সহদেবের বউ নমিতা মাটির বারান্দায় এসে বসেছে।
     
    শেষ পর্যন্ত ঠিক হয় সংক্রান্তি কেটে গেলে তিন দিন পর সহদেব তার শ্বশুরবাড়ি যাবে। যাদের বাড়িতে ওরা এসে থাকে তাদের সঙ্গে কথা বলবে। জানাবে চাকাডোবার মানুষের সমস্যার কথা। আজকের মতো এখানেই আলোচনা শেষ করে ওরা, সবাইকে বাড়ি ফিরতে হবে। অনেক রাত হয়ে গেছে। এক এক করে উঠে পড়ে সবাই।
    আজকের আলোচনায় একটা কথা উঠল না, তা হল সহদেব সিংহ সর্দারের শ্বশুরবাড়িটা ঠিক কোথায়! উঠল না কারণ, বাকিরা সবাই তা জানে। কিন্তু কোনও পাঠক হয়তো মনে করতে পারেন, চাকাডোবার সহদেবের শ্বশুরবাড়ি এমন কোন গোপন বা অজানা জায়গায় যেখানে এমসিসির লোকজন মিটিং করতে আসছে মাঝেমাঝেই! না, জায়গাটা অজানা নয়, গোপনও নয়। আসলে জঙ্গলমহলের গরিব মানুষের মনের কথা খোঁজ করার চেষ্টা সরকার বা শাসক দল সেভাবে করেনি বলে জানতে পারেনি পাশেরই বাঁকুড়া জেলার খাতরা মহকুমার পরিস্থিতি ঠিক কী! সহদেব সিংহ সর্দারের শ্বশুরবাড়ি বাঁকুড়ার অরলো নামক এক ছোট্ট গ্রামে। এই যে আজকের মিটিংয়ে এমসিসি নেতা বনমালী দেশোয়ালিকে চাকাডোবায় ডাকার সিদ্ধান্ত হল, তার প্রায় ছ’মাস বাদে অনিরুদ্ধ জয়েন করবে ঝাড়গ্রামের এসডিপিও পদে। জয়েন করার দু’মাসের মধ্যেই এক রাতে চাকাডোবায় বনমালীর মুখোমুখিও হবে অনিরুদ্ধ।

    ক্রমশ।.. 
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ | ৩২৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ ১৪:৩৬527769
  • জনজাতিদের জল জমি জঙ্গলের অধিকার দিনেএ দিনে আরো সংকুচিত হচ্ছে। আর চলছে জঙ্গল কেটে বেচে দেওয়া।
    ময়ুরঝর্ণার  কাছাকাছিই  কোথাও  আমঝর্ণা গ্রাম। সেখানে হোমস্টে তৈরী হয়েছে। জনজাতিরা ট্যুরিজমের অঙ্গ হয়েছেন কিনা জানি না। হয়ে থাকলে ভাল। 
     
    একটু হয়ত অপ্রাসঙ্গিক হল তবু আপনার এই পর্ব পড়ে মনেহল এগুলো। ধারাবাহিক তো খুবই ভাল হচ্ছে।
  • বিতনু চট্টোপাধ্যায় | 150.242.151.178 | ১৯ জানুয়ারি ২০২৪ ১৫:০২527770
  • শহরের মানুষ যতদিন ঝাড়গ্রামকে ট্যুরিস্ট স্পট হিসেবে দেখবে ততদিন হোম স্টে হোক বা হোটেল, স্থানীয় গরিব মানুষের বিশেষ উপকার হবে না।   
    অনেক ধন্যবাদ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন