এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ময়ূরঝর্ণা - ১ ম পর্ব 

    বিতনু চট্টোপাধ্যায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ১৬ নভেম্বর ২০২৩ | ১৫৯১ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • এপার বাংলায় পশ্চিম প্রান্তের তিন জেলা মেদিনীপুর, বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে বেড়ে উঠেছিল এক রাজনৈতিক আন্দোলন। কিন্তু এই মাওবাদী আন্দোলন হঠাৎ একদিন আকাশ থেকে পড়েনি। কোন পরিস্থিতিতে, কোন প্রেক্ষাপটে জঙ্গলমহলের রুক্ষ মাটিতে এই আন্দোলনের বীজ বপন হয়েছিল, তা নিয়েই রাজনৈতিক উপন্যাস ময়ূরঝর্ণা।
    ময়ূরঝর্ণা শুধুমাত্র একটা গ্রামের নাম নয়, এক স্বপ্নেরও নাম!
    ২৩-০৬-১৯৯৯, বেলপাহাড়ি ঝাড়গ্রাম

    বেলপাহাড়িতে সন্ধে নামে কোনও প্রস্তুতি ছাড়াই, একেবারে ঝপ করে। সন্ধে নামার সময়টাকে ঠিক মতো খেয়াল না করলে বোঝা যায় না কখন ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছে চারদিক। এই আলো ছিল এই নেই, আর তখন এমন অন্ধকার, যা বেলপাহাড়িতে আসা নতুন কোনও লোকের মাথার ভেতরটা শূন্য করে দেয়। তার ঠোঁট, গলা শুকিয়ে আসে। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখা যায় না, বাজারে দাঁড়িয়েও নিজেকে একা লাগে। দিন পাঁচেক আগে ঠিক যেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিল অনিরুদ্ধর। অনিরুদ্ধ শহরের ছেলে, পদবী রায়, বয়স সাইত্রিশ। মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রাম মহকুমার নতুন সাব ডিভিশনাল পুলিশ অফিসার বা এসডিপিও। 
    আজ দ্বিতীয় দিন বেলপাহাড়িতে এল অনিরুদ্ধ। আগের সপ্তাহে প্রথম বেলপাহাড়ি থানা ভিজিটে এসেছিল। আর প্রথম দিনই বেলপাহাড়ি থানার ওসি প্রভাত সেনাপতিকে দেখে পছন্দ হয়েছিল অনিরুদ্ধর। ওরই মতো বয়স, কাজে উৎসাহ আছে। প্রভাতের যে জিনিসটা অনিরুদ্ধর সবচেয়ে ভালো লেগেছিল তা হল, একটা পিছিয়ে পড়া এলাকায় এই দুর্বল পরিকাঠামোর মধ্যে কাজ করা, থাকা, কিন্তু কোনও ব্যাপারে কোনও অভিযোগ নেই। তেরো বছর চাকরি হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। কয়েকটা জেলায় কাজ করে, গ্রামের মানুষের জীবনযাপন চোখের সামনে দেখে এখন অনিরুদ্ধর মনে হয়, যারা কথায় কথায় ছোটখাট জিনিস নিয়ে অভিযোগ করে তাদের জীবনে অন্তত একবার গ্রামে গিয়ে দেখা উচিত মানুষ কীভাবে বেঁচে আছে।
     
    অফিসে কিছু কাজ ছিল, তা শেষ করে ঝাড়গ্রাম থেকে দুপুরের খাবার সেরে আড়াইটা নাগাদ বেরিয়েছে, অনিরুদ্ধ বেলপাহাড়ি থানায় এসে পৌঁছল সাড়ে তিনটে নাগাদ। গাড়ি থেকে নেমে দুটো সিঁড়ি ভেঙে থানায় ঢুকতে গিয়ে অনিরুদ্ধর মনে হল ওসির ঘরে কয়েকজন আছে, একটু থমকে দাঁড়াল। তারপর নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে। আর সঙ্গে সঙ্গেই ঘর থেকে প্রায় দৌড়ে বেরিয়ে এল প্রভাত।
    ‘স্যর, আসুন। লোকাল লোক, এখনই চলে যাবে।’
    ‘কোনও অসুবিধে নেই, তুমি কথা বলে নাও। আমি বরং একটা সিগারেট খেয়ে নিই ততক্ষণে’, থানার সামনে ফাঁকা কম্পাউন্ডে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল অনিরুদ্ধ। ওয়েদারটা গুমোট হয়ে রয়েছে, মেঘ করে আছে অনেকক্ষণ। ওর মনে পড়ে গেল তিন সপ্তাহ আগের কথা। এসপি সাহেবের মান্থলি ক্রাইম কনফারেন্সে কৃষ্ণনগর গিয়েছিল অনিরুদ্ধ। মিটিং সেরে সন্ধ্যায় তেহট্টে ফিরে অনিরুদ্ধ সোজা  ঢুকেছিল অফিসে। কিছু কাগজ কোর্টে পাঠাতে হবে, ভাবল কাজটা সেরে একবারে কোয়ার্টারে ঢুকবে। লক্ষ্মণ চা দিয়ে গেল ঘরে, একটা চুমুক দিয়ে ফাইল খুলে বসেছিল। হঠাৎ বিপ শব্দ করে বেজে উঠল ফ্যাক্স মেশিন। চেয়ারটা একটু পিছিয়ে অনিরুদ্ধ দেখল লম্বা বদলির অর্ডার, চার নম্বরে তার নাম। অনিরুদ্ধ রায়, প্লেস অফ পোস্টিং এসডিপিও তেহট্ট, প্রজেন্ট প্লেস অফ পোস্টিং এসডিপিও ঝাড়গ্রাম। ঝাড়গ্রাম শব্দটা দেখেই এক অদ্ভুত অনুভূতি হল অনিরুদ্ধর। প্রথমেই ওর মনে এল সুবর্ণরেখার কথা। সুবর্ণরেখা নদী না, সিনেমা। চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অনিরুদ্ধ চোখ বন্ধ করল। মনে হল একটা যেন ঠান্ডা হাওয়া বয়ে গেল ঘরে, হাতের লোমগুলো খাঁড়া হয়ে গিয়েছে। হাত পিছনে নিয়ে দেখল জামার পিছনটা এখনও ঘামে ভেজা। সিনেমার দৃশ্যগুলো পরপর এসে ভিড় করছে মাথায়। অনিরুদ্ধ কোনও দিন ঝাড়গ্রাম যায়নি, কিন্তু বুঝতে পারল হঠাৎ এক অজানা উত্তেজনায় ওর নাড়ির গতি বেড়ে গিয়েছে। হঠাৎ ফোন বেজে উঠল শব্দ করে, আর তখনই অনিরুদ্ধ দেখল সামনে প্রভাত দাঁড়িয়ে।
    ‘স্যর চলে আসুন, ওরা চলে গিয়েছে।’
    ‘হ্যাঁ চল’, তেহট্টের অফিস থেকে বেলপাহাড়ি থানায় ফিরে এল অনিরুদ্ধ, মনে করতে পারল না একটু আগে ফোনের আওয়াজটা কোথায় হচ্ছিল। নদিয়ার তেহট্টে না মেদিনপুর জেলার প্রান্তিকতম থানা বেলপাহাড়িতে। 
    হাতে জ্বলতে থাকা সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে নিভিয়ে অনিরুদ্ধ ওসির ঘরে গিয়ে ঢুকল। আর ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই জোরে বৃষ্টি নামল। ঘরে ঢুকেই জানলাটা বন্ধ করে দিল প্রভাত। তারপর বসল চেয়ারে।
     
    ‘প্রভাত, আগের দিন তুমি যে ঘটনাটা বলছিলে সেটা কত দূরে থানা থেকে?’
    ‘বেশি দূরে নয় স্যর, গ্রামটার নাম জুজারধরা। থানা থেকে বেরিয়ে যে রাস্তাটা সোজা বাঁশপাহাড়ি যাচ্ছে সেই রাস্তায় চাকাডোবা মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরে কিছুটা। ছোট গ্রাম। ওই রাস্তাটাই সোজা কাঁকড়াঝোর চলে যাচ্ছে।’
    ‘তার মানে কাঁকড়াঝোর হয়ে ওই রাস্তা তো বিহার যাচ্ছে। বিহার বর্ডার থেকে ওই গ্রামটার ডিসট্যান্স কত হবে?’ সোজা হয়ে বসল অনিরুদ্ধ।
    ‘স্যর, বেশি না। ওদিকে সিংভূম জেলা। ইস্ট সিংভূম। জুজারধরা থেকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গেলে কাঁকড়াঝোর হয়ে বর্ডার চার-পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে।’
    ‘প্রভাত, তুমি আগের দিন যা বলছিলে ইন্ডিকেশনগুলো তো ভালো না, কিছু সন্দেহজনক লোকের মুভমেন্ট হচ্ছে তার মানে। তোমরা কখনও রেইড করনি? ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকজন তো জঙ্গলে যাতায়াত করে, ওরা কিছু বুঝতে পারেনি?’
    ‘ফরেস্টের লোকজন কয়েকবার বলেছে স্যর, জঙ্গলে কিছু সন্দেহজনক জিনিস ওরা দেখছে, অচেনা লোক ঘুরছে। একবার আমরা আর ফরেস্ট ডিপার্টমেণ্টের কয়েকজন জঙ্গলে গিয়েছিলাম। একটা বাচ্চা ছেলে ছাগল চরাচ্ছিল, বলল, কিছু লোক এসেছিল তারা অন্য কোনও ভাষায় কথা বলে। ঘটনাটা আমি বড় সাহেবকে বলেছিলাম। আমাদের বর্ডারিং এলাকায় বিহারে এমসিসি’র ভালো বেস আছে। তাই ব্যাপারটা একটু চিন্তারও। যদিও স্যর আমাদের এলাকায় এখনও কিছু ঘটেনি।’
    ‘বড় সাহেব কিছু বলেছিলেন তখন,’ বেলপাহাড়ির পরিস্থিতিটা ভালো করে বুঝে নিতে চাইছে অনিরুদ্ধ।
    ‘না স্যর। উনি কিছু বললেন না।’
    বিষয়টা নিয়ে আর এগোল না অনিরুদ্ধ। চাকরি জীবনে ও বারবারই দেখেছে কোনও নতুন পোস্টিংয়ে গিয়ে আগে কী হয়েছে, কী হয়নি তা নিয়ে কথা বলে কোনও লাভ হয় না। তাতে কাজের কাজ কিছুই হয় না, কিছু লোককে নিয়ে ফালতু আলোচনা হয় মাত্র। অনিরুদ্ধর মনে হল কিছু না ঘটলেও ব্যাপারটা সিরিয়াস। 
     
    ‘আচ্ছা, গ্রামে গ্রামে কি আমাদের কোনও নেটওয়ার্ক বা সোর্স আছে, যারা খবর দেবে?’ অনিরুদ্ধর প্রশ্নে চুপ করে থাকল বেলপাহাড়ি থানার ওসি প্রভাত সেনাপতি। দু’দিকে ঘাড় নাড়ল আস্তে করে। ‘দেখ, প্রভাত এটা করতে হবে। গ্রামে লোকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করতে হবে, নয়তো কোনও ইনফর্মেশন পাওয়া যাবে না। একটা কাজ করা যাক, কাল থেকেই গ্রামে ভিজিট শুরু করি আমরা। অসুবিধে হবে?’
    ‘না না স্যর। অসুবিধে কেন হবে?’ নতুন এসডিপিও সাহেবের কথায় উৎসাহ পেল প্রভাত। ‘কখন যাবেন স্যর’?
    ‘আমার তো মনে হয় ভোর ভোর যাওয়াই ভালো। সাড়ে চারটে-পাঁচটার মধ্যে থানা থেকে বেরিয়ে যাব, একদম ভোরে গ্রামে পৌঁছে যাব। এখানে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কাউকে পাওয়া যাবে এখন?’
    অনিরুদ্ধর প্রশ্ন শুনে চেয়ার থেকে উঠে পড়ল প্রভাত। ‘পরিমলবাবু বলে একজন আছেন বেলপাহাড়িতে ফরেস্ট বিট অফিসে, কাজের লোক। এক মিনিট বসুন স্যর, আমি কাউকে পাঠাচ্ছি ফরেস্ট অফিসে’, ঘর থেকে বেরোল প্রভাত।
     
    চেয়ার থেকে উঠল অনিরুদ্ধ। প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে দেশলাইটা নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল জানলার সামনে। বৃষ্টি কমেছে কিনা দেখতে জানলার ছিটকিনি খুলে পর্দা সরাতেই এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য দেখে থমকে গেল অনিরুদ্ধ। হাতে থেকে গেল সিগারেট, দেশলাই, এমন দৃশ্য অনিরুদ্ধ জীবনে দেখেনি। থানার পিছনে বিরাট একটা ফাঁকা জায়গা। বৃষ্টি কমে গিয়ে আকাশের একটা দিকে ঝলমল করছে সূর্যের আলো, বাকি অর্ধেক ঢেকেছে মেঘে। আর পুরো আকাশে যেন রং, তুলি নিয়ে বসেছে হাজার ছেলে-মেয়ের দল, যে যেমন পারছে রং লাগাচ্ছে আকাশে। সেই রঙে ঝলমল করছে দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ, মেঘের আড়াল থেকে ছিটকে পড়ছে পড়ন্ত বেলার সূর্যের আলো। সেই আলোর পিছনে অর্ধবৃত্ত তৈরি করেছে এক বিরাট রামধনু। এত বড় রামধনু কোনও দিন দেখেনি অনিরুদ্ধ। সবুজ মাঠের ওপর এমন মায়াবী আকাশ দেখে এক মুহূর্তের জন্য নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল অনিরুদ্ধর। সামান্য কয়েক সেকেন্ড, বড়জোর এক মিনিট, অনিরুদ্ধর মনে হল এভাবেই সে দাঁড়িয়ে আছে অনন্তকাল ধরে। সম্বিত ফিরল প্রভাতের গলার আওয়াজে।
    ‘স্যর, ওসমানকে পাঠালাম পরিমলবাবুকে ডেকে আনতে।’ ঘাড় ঘোরাল অনিরুদ্ধ। সিগারেটটা ধরাল, ‘যে জুজারধরা গ্রামটার কথা আগের দিন বলছিলে, কাল সকালে সেখান থেকেই শুরু করা যাক, নাকি?’ প্রশ্নটা করে আবার জানলার দিকে ঘুরল অনিরুদ্ধ। জানলা দিয়ে পোড়া দেশলাই কাঠিটা ছুঁড়ে ফেলল, আর তা করেই অনিরুদ্ধর মনে হল কাজটা ঠিক হল না। কাঠিটা এভাবে বাইরে না ফেললেই ভালো হত। কাঠিটা কোথায় পড়েছে দেখতে গিয়ে একটু নীচু হয়ে অনিরুদ্ধ দেখল মুহূর্তের মধ্যে বদলে গিয়েছে বাইরের দৃশ্য। রামধনুটার ওপর আরও এক পোঁচ রং পড়েছে, আকাশ এখন আরও পরিষ্কার। আর এই ঝলমলে আলোয় দৃশ্যটা চোখে পড়ল অনিরুদ্ধর, যুদ্ধের সিনেমায় লং শটে যেভাবে অশ্বারোহী বাহিনী বহু দূর থেকে ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসে, ঠিক সেভাবে হাজার-লক্ষ বৃষ্টির ফোঁটা ধেয়ে আসছে দূরের মাঠ থেকে। যে কোনও মুহূর্তে আছড়ে পড়বে থানার ওপর। সূর্যের ওপর থেকে মেঘ সরে আলোটা একটু বেড়েছে, আকাশের রং এখন আরও উজ্জ্বল, তারই মধ্যে যেন যুদ্ধে চলেছে বৃষ্টিসেনা। এমন দৃশ্যও হয়! ভাবতে ভাবতে যেন মাথা অবশ হয়ে এল অনিরুদ্ধর। বৃষ্টিটা যে কোনও সময় জানলায় আছড়ে পড়ে ঘরে ঢুকে আসবে তা মনেই এল না ওর। মনে হল এ দৃশ্য তো দেখেনি জীবনে কোনও দিন। আর ঠিক সেই মুহূর্তে লম্বা পা ফেলে সামনে চলে এল প্রভাত, ‘স্যর, সরে যান। ভিজে যাবেন। জানলাটা বন্ধ করে দিই।’ বলতে না বলতেই জলের প্রথম ছাঁট এসে লাগল অনিরুদ্ধর হাতে, মুখে। সিগারেটটা ভিজে গেল সামান্য। সরে এল অনিরুদ্ধ। জানলাটা বন্ধ করে পর্দা টেনে দিল প্রভাত।
     
    স্যর, মুড়ি, তেলে ভাজা খাবেন? অনেকক্ষণ বেরিয়েছেন।’
    ঠিকই বলেছে প্রভাত, খিধেটা যে পেয়েছে এতক্ষণ বুঝতে পারেনি অনিরুদ্ধ। ঝাড়গ্রাম থেকে বেলপাহাড়ি যা রাস্তা, আসতে আসতেই অর্ধেক খাবার হজম হয়ে গিয়েছে। ‘তা খেতে পারি, কিন্তু এই বৃষ্টিতে মুড়ি, তেলে ভাজা আনতে পারবে তোমার লোক?’                     
    ‘হ্যাঁ স্যর’, বলে আবার ওসমানকে ডাকল প্রভাত।
    ‘প্রভাত, বেলপাহাড়ি থানা এলাকার ডিটেইল ম্যাপ আছে?’
    ‘না স্যর, অনেকবার ভেবেছি গ্রাম ধরে ধরে একটা ম্যাপ থাকলে ভালো হত, কিন্তু এখানে কি কেউ করতে পারবে?’
    ‘আচ্ছা আমি দেখছি। একটা ডিটেইল ম্যাপের খুব দরকার। সত্যি যদি কিছু ঘটে যায় সমস্ত রাস্তা, জঙ্গলের লোকেশন জানা না থাকলে মুশকিল হবে।’ এমসিসি’র অ্যাক্টিভিটির যে খবরগুলো আসছে তার হয়তো নির্দিষ্ট কোনও প্রমাণ নেই, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা নিয়ে প্রভাতের সঙ্গে কথা বলল অনিরুদ্ধ। তার কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বাচ্চা ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ঘরে এসে ঢুকল ওসমান।
    ‘স্যর, পরিমলবাবু অফিসে নেই। বলে এসেছি, এলেই থানায় পাঠিয়ে দিতে।’ ওসমান বলার সময়ই বাচ্চা ছেলেটা মুড়ির আর চপের ঠোঙা রাখল টেবিলের ওপর।
    ‘তোর নাম কী রে?’
    সুভাষ।
    ‘স্কুলে যাস?’
    ‘না।’
    ‘যাস না কেন?’ অনিরুদ্ধ প্রশ্নে সুভাষ নামের দশ-বারো বছরের ছেলেটা যেভাবে তাকায় তার মানে আন্দাজ করতে পারে অনিরুদ্ধ। তাই প্রশ্নটা আবার করতে পারল না ছেলেটাকে। ঝাড়গ্রামের মতো জায়গায় বেলপাহাড়ির একটা বাচ্চা ছেলে কেন মুড়ি-তেলেভাজার দোকানে কাজ করে, এর জন্য কত টাকা পেতে পারে, তার মা-বাবা কী করতে পারে, কেন ছেলেটা স্কুলে যায় না তা বোঝার মতো বয়স, অভিজ্ঞতা সবই হয়েছে অনিরুদ্ধর। প্রশ্নটা করার জন্য ওর নিজের ওপরই রাগ হয়। মনে মনে ভাবে, এমন বাচাকে এই প্রশ্ন আর কোনও দিন করবে না সে। সে যদি বাচ্চাটার জীবনে কোনও উপকার করতে নাই পারে, তবে শুধু শুধু কেন স্কুলে যাস না জিজ্ঞেস করে ছেলেটাকে অস্বস্তিতে ফেলা বা স্কুলে যাওয়ার লোভ দেখানোর কোনও অধিকার নেই ওর। মনটা খারাপ হয়ে যায় অনিরুদ্ধর, সুভাষ এত কিছু বোঝে না। এই প্রশ্ন সে আগেও শুনেছে। এই প্রশ্ন শুনে বাকিদের সামনে যেমনভাবে দাঁড়িয়ে থাকে সেভাবেই কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে বেরিয়ে যায় ঘর থেকে।     

    ক্রমশ.. 

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৬ নভেম্বর ২০২৩ | ১৫৯১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Eman Bhasha | ১৭ নভেম্বর ২০২৩ ১৭:২৩526184
  • ভালো 
  • r2h | 165.1.200.97 | ১৭ নভেম্বর ২০২৩ ১৯:৫২526189
  • পড়ছি
  • kk | 2607:fb90:ea0c:cd31:fc71:213d:589b:7eca | ১৭ নভেম্বর ২০২৩ ২০:৪৮526190
  • প্রথম কিস্তি বেশ লাগলো। চলুক। পড়ছি।
  • Kishore Ghosal | ১৮ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:১৪526213
  • কৌতূহলী হলাম। অপেক্ষা করছি। 
  • অর্ক ভাদুড়ি | 92.40.96.5 | ১৯ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:৩৬526254
  • দুর্দান্ত লেখা! ভারী চমৎকার গদ্য! পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম। 
  • পৌলমী | 2401:4900:1c85:cbf1:5d40:ce90:9c49:38bb | ২০ নভেম্বর ২০২৩ ১০:৫৫526292
  • খুব ভাল 
  • বিতনু চট্টোপাধ্যায় | ২২ নভেম্বর ২০২৩ ১২:১৯526374
  • যাঁরা পড়েছেনএবং যাঁরা পড়ে মতামত দিয়েছেন, সবাইকে ধন্যবাদ। পরবর্তী পর্বেও জানাবেন লেখাটা আদৌ কিছু হচ্ছে কিনা।  
  • Pinky. | 2409:4060:31e:a048::f32:c8a5 | ২৪ নভেম্বর ২০২৩ ১৪:৪৪526448
  • শুরুতেই বেশ টানল লেখাটা..  অপেক্ষায় পরের কিস্তির 
  • AMITABHA HALDAR | ১৭ মার্চ ২০২৪ ১৮:৪১529509
  • রামধনুর দৃশ্য বর্ণনা অসামান্য। আমিও গাঁয়ের ছেলে। মাঝে মাঝে দেখেছি এই স্বর্গীয় দৃশ্য। দারুণ ডিটেইল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন