এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • সান্দাকফু - পথ চলার গল্প - ৫

    সুদীপ্ত লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ২০ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • ঘুম ভাঙল রাত একটার দিকে। আর পা ভাঁজ করতে গিয়ে দেখলাম একেবারে অবিশ্বাস্যভাবে কোনো ব্যথা নেই, পা-ও বেশ সচল। ওই রাত একটা-তেই ঘরে হেঁটে দেখলাম, নাহ, কোনো অসুবিধে নেই। প্রার্থনাকেও জাগিয়ে দেখলাম, নাহ ওর-ও সব ঠিক। নিশ্চিন্ত হয়ে বাকি রাতটা ঘুমিয়ে নিলাম। সকাল সাড়ে ছটায় উঠে দেখি, আলো ফুটে গেছে বেশ, ঝলমল করছে চারিদিক, বাইরে বেরিয়ে দেখি সুন্দর রোদ উঠেছে, আমরা কফি খেয়ে ফেরৎ গেলাম কালিপোখরি লেকের কাছে।  নেপালি ভাষায় পোখরি মানে লেক আর জলের রঙ দেখে বোঝা যাচ্ছে কেন 'কালি'। কালিপোখরি প্রায় সাড়ে দশ হাজার ফুট উচ্চতায়। লেকের একটু উপরে এখান থেকে একদিকে তাকালে দূরে দেখা যাচ্ছে সান্দাকফু টপ, আর একদিকে কালিপোখরি লেক। ছবি তোলা চলল কিছুক্ষণ। ফিরে আসার আগে একবার তাকিয়ে দেখে নিলাম আমাদের সর্বশেষ গন্তব্য সান্দাকফু-কে মেঘের মায়াজালের ফাঁক দিয়ে, অপার্থিব দৃশ্য!একটা জিনিস মনে হল, গতকাল দুপুরের পর থেকে, ওই গৈরিবাস থেকেই গোটা রাস্তা ছিল মেঘ আর কুয়াশায় ঘেরা, সেটাও হয়্ত আমাদের চলাকে কিছুটা ক্লান্তিকর করে তুলেছিল; এ’রকম চনমনে রোদ থাকলে এতটা অসুবিধে না-ও হতে পারত।  
     
    কালিপোখরি লেক


    দূরে উপরে মেঘের মাঝে সান্দাকফু - কালিপোখরি থেকে


    আজকের হাঁটা ছয় কিলোমিটার, কিন্তু পুরোটাই খাড়াই রাস্তা আর দুর্গম। সুতরাং চটপট ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পড়লাম পথে। কালিপোখরি থেকে বিখেভঞ্জন – এই প্রথম দু-কিলোমিটার তুলনায় চড়াই কম, তবে দুর্গম, এখান থেকে পায়ে হাঁটা আর গাড়ি চলার রাস্তা একটাই। শুধু জানি না এই রাস্তায় গাড়িগুলো কিভাবে চলছে! সব-ই ল্যান্ড রোভার আর গাড়িগুলো যেভাবে চলছিল রীতিমত ভয়াবহ ব্যাপার ভেতরে বসে থাকা যাত্রীদের জন্যে। যে কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনা ঘটা সম্ভব! বিখেভঞ্জনে বেশ কিছু ছোটো চা-কফির দোকান। দুটো ট্রেকারদের দল এখানে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে। আমরা অপেক্ষা না করে উঠতে থাকলাম। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম, এতটা উপরে এসেও গাছপালার উপস্থিতি বেশ ভালো। নইলে দশ-বারো হাজার ফিটের উচ্চতায় লম্বা গাছ ধীরে ধীরে কমে আসে। বিখেভঞ্জন থেকে উপরে ওঠার বিশেষ কিছু উল্লেখযোগ্য নেই, রাস্তা খারাপ, খুব খারাপ এটুকুই, আরে মাঝে মাঝে ল্যান্ড রোভারের গর্জন আর গোটা রাস্তাকে ধুলো আর ডিজেলের গন্ধে ভরে দেওয়া। তবে গাড়ির সওয়ারীদের দুরবস্থা চোখমুখে ফুটে উঠেছে, শুধু দুরবস্থা নয়, আতঙ্ক-ও! বাকি পথ মোটামুটি সেই প্রথম দিনের চিত্রের মত চড়াই, কিন্তু চিত্রের রাস্তা ভালো ছিল, এখানে তো রাস্তাই নেই প্রায়!

    পথ-চলা শেষ করে আমরা যখন সান্দাকফু পৌঁছলাম, দুপুর প্রায় একটা। কাঞ্চনজঙ্ঘা আর তার চারিপাশে মেঘ একেবারে আঠার মত লেগে আছে। এভারেস্ট তো দূর-অস্ত। সান্দাকফু-র উচ্চতা প্রায় বারো হাজার ফুট আর এটি সিঙ্গালিলা জাতীয় উদ্যানের তথা পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ স্থান। লেপচা ভাষায় সান্দাকফু মানে বিষাক্ত উদ্ভিদের অঞ্চল। বহু বছর আগে নাকি এই অঞ্চলে বিষাক্ত গাছ/উদ্ভিদ/অর্কিডে ভরা ছিল,সেই থেকেই এই নাম। ট্রেকার্স হাট ছাড়াও চার-পাঁচটা প্রাইভেট হোটেল আর কটেজ চোখে পড়ল। সান্দাকফু ট্রেকার্স হাটে অনেকগুলো আলাদা হাট বা বাড়ি রয়েছে। প্রতিটা হাটেই তিন-চারটে করে ঘর, একটা কিচেন আর চারটে করে টয়লেট, যদিও দুটো করে টয়লেট এরা বন্ধ করে রাখে ট্যুরিস্ট বা ট্রেকার কম থাকলে। আর সবই ইন্ডিয়ান, ওয়েস্টার্ন টয়লেট অন্ততঃ সান্দাকফু ট্রেকার্স হাটে নেই।  স্নানের ব্যবস্থা তো নেই আর এই ভয়ানক ঠান্ডায় সে-প্রশ্ন-ই নেই! আমাদের দেওয়া হল তিন নম্বর হাটের সামনের দিকে দুটো ঘর, পর্দা খুললে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, যদি না মেঘ থাকে। আমাদের পাশে কোণের দিকের ঘরে চারজন বিদেশী এসে ঢুকলেন, ট্রেক করেই এসেছেন দেখলাম। পরে কথায় কথায় জানলাম ইতালীর, তবে ইংরাজী ভালোই বলতে পারেন দেখলাম, নিজেদের মধ্যে যদিও ইতালিয়ান-এই কথা বলছিলেন। এঁদের সঙ্গে গাইড যিনি এসেছেন, তিনি বেশ পোক্ত একজন শেরপা, কিছুদিন আগেই অন্নপূর্ণা সামিট করে এসেছেন, এভারেস্টেও উঠেছেন আগে। ব্যাগ-পত্র রেখে বাইরে এসে দেখি হাওয়া চলছে আর সামনের মেঘ আগের মত জমাট নেই, ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে উড়ে চলেছে, আর মাঝে মধ্যেই কাঞ্চঞ্জঙ্ঘার রেঞ্জ-টা এদিক সেদিক দিয়ে উঁকি মেরে যাচ্ছে!

    কাঞ্চনজঙ্ঘাকে এতদিন দূর থেকে দেখেছি, কালিম্পং-এর বা দার্জিলিং-এর বিভিন্ন গ্রাম থেকে অথবা সিকিমের বিভিন্ন জায়গা থেকে। এখানে এসে মেঘের ফাঁক দিয়ে যখন তাকে বেরিয়ে পড়তে দেখছি, তার সত্যিকারের বিশালত্ব অনুভব করলাম। সামনের মেঘের ঠিক পেছনে পুরো দিগন্ত জুড়ে বিরাজ করছে তার তুষারাচ্ছন্ন রূপ। সাদা মেঘের আড়াল থেকে বরফের সাদা যেন চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে মাঝে মাঝেই। হাটের বাইরে চেয়ার পেতে রোদে বসে সেই শোভা দেখছি আর হাতের কাছে ক্যামেরা রেখেছি, যদি হঠাৎ সব মেঘ সরে যায়! কিন্তু সে আর হচ্ছে না, কখনো এক ফালি কুম্ভকর্ণ, কখন কাব্রু, কখনো ওদিকে পান্ডিম। এমনকি একবার কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়াও এক-মুহূর্ত দৃশ্যমান হল, কিন্তু আবার যে কে সেই। ইতিমধ্যে লাঞ্চের ডাক পড়ল। এখনো পর্যন্ত সব জায়গাতেই মেনু মোটামুটি এক, ভাত-ডাল-স্কোয়াশের তরকারি-পাঁপড় বা আলুভাজা আর ওমলেট। দু-এক জায়গায় চিকেন মেলে বটে। খাওয়া-দাওয়া সেরে আমরা কাছেই একটা মন্দির হেঁটে দেখে এলাম, আধ-কিলোমিটার মত রাস্তা নীচের দিকে নেমে। এখানে এক জায়গায় হঠাৎ ভোদাফোনের টাওয়ার পাওয়া যেতে বাড়ির খবরাখবর নেওয়া গেল আর নিজেদের কথা জানানো গেল। এই ট্রেকের রাত্রিবাসের জায়গাগুলোতে এয়ারটেল আর জিও-র সার্ভিস রয়েছে দেখলাম। ভোদাফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না জেনেই এসেছিলাম, এখানে হঠাৎ লেগে গেল।

    ফেরার পথে ট্রেকার্স হাটের সামনেই ছোট একটা অবজারভেটরি দেখে উঠে গেলাম। ছোট একটা কাঁচের ঘর, সামনে একটা সরু গোল-মত চাতাল আর তার মাঝে একটা খানিক উঁচু পাথর। চাতালে একটি বাঙালী ছেলে দাঁড়িয়েছিল। সে-ও ট্রেক করে এসেছে গতকাল। আজ সকালে প্রায় সাড়ে সাতটা অবধি নাকি পরিষ্কার ছিল আকাশ, আমাদের ছবি দেখাল, কিছু মেঘ ছিল বটে, তবে মোটামুটি ভালো-ই দেখা গেছে, এমনকি এভারেস্টের ছবি-ও দেখলাম, তবে সেটা খুব পরিষ্কার নয়! এদিকে আমাদের কপালে কি আছে কে জানে। এত সুন্দর রোদ, আবহাওয়া, এদিকে তিনি একেবারে মেঘের ঘোমটা টেনে বসে আছেন এক-গলা! ইতিমধ্যে আর-ও দু’জন হাজির সেখানে, বাঙালী আর এরাও ট্রেক করে এসেছে আজ-ই আমাদের মত। মেঘ দেখে তারাও কিছুটা হতাশ, তবে পথে যা দেখে এসেছে তা নিয়ে সুখীও বটে। ফেরার আগে একটা জিনিস খেয়াল করলাম, অবজারভেটরি হলেও এখান থেকে ভিউ খুব পরিষ্কার নয়, সামনে বেশ কিছুটা অংশ গাছে ঢেকে গেছে। কাল ভোরবেলার জন্যে একটা ভালো জায়গা বেছে রাখতে হবে।

    বিকেলের দিকে ঠিক করলাম সূর্যাস্ত দেখতে যাব অ্যাল-এর দিকে। সান্দাকফু থেকে ফালুটের দিকে প্রায় এক কিলোমিটার যেতে হবে। সেইমত চারটের দিকে বেরিয়ে দেখি, কি হাওয়া! শন শন করে হাওয়া বইছে, হু হু করে এদিক ওদিক থেকে কুয়াশা আর মেঘ ছুটে আসছে, চলেও যাচ্ছে, কিন্তু হাওয়ার কমতি নেই। গোটা পথে মোটা জ্যাকেট সেভাবে লাগেনি, এখানে এসে জ্যাকেট আর গ্লাভস বের করতেই হল। সেসব পরে আবার চলা শুরু করলাম। হাট থেকে বেরিয়ে বাঁদিকের রাস্তাটা একটু পরেই একটা হোটেলের সামনে উঠে গেছে, হোটেল সানরাইজ। সান্দাকফুতে এই হোটেলটাই বলা যায় সবচেয়ে ভালো জায়গা দেখে বানানো, পরের দিন টের পেয়েছিলাম, হোটেলের একতলায় রেস্তোঁরা-র খাবার-ও ভালো। এর সামনে খানিকটা চাতাল মত। সেখানে দুটো বেঞ্চ-ও রাখা। এখান থেকে সামনে তাকিয়ে অব্যর্থ বুঝে গেলাম, এটাই হতে চলেছে আমাদের কাল ভোরবেলার অকুস্থল। এখান থেকে সামনে তাকালে কোনো বাধা নেই, পাহাড়ের পর পাহাড় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, উনি অবশ্য মেঘের আড়ালেই। আমরা অ্যালের দিকে হাঁটা শুরু করলাম বটে, তবে কিছুদূর গিয়ে বুঝলাম অসম্ভব, আর তার একমাত্র কারণ হাওয়া! একি ভয়ানক ঠান্ডা হাওয়া, আর চারিদিক খোলা পেয়ে বইছেও একেবারে ঝড়ের মত, চোখ খুলে রাখাই দায়। রোদ পড়ে এসেছে বলে সানগ্লাস আনিনি সঙ্গে, এদিকে হাওয়া নাকে, চোখে, মুখে যেন দোধার-ওয়ালা তলোয়ার হয়ে কোপ মারছে, কিছুদূর গিয়ে আমি হাল ছেড়ে দিলাম। ফিরে এসে সেই চাতালে বেঞ্চে বসলাম। মিনিট চারেক যেতে না যেতেই দেখি বাকিরাও ফিরে এল! সবার-ই ঠান্ডা হাওয়ায় হাল খারাপ। কিছুক্ষণ পরেই সেখান থেকেও নীচে নেমে যেতে হল, সাড়ে চারটের মধ্যে চারদিক ফাঁকা, সকলেই প্রায় ঘরে ঢুকে পড়েছে মনে হল। আমরাও ফিরে এলাম ঘরে। করবই বা কি, তাসের প্যাকেট আর গরম কফি, সঙ্গে রোহিতের আনা নিমকি আর কুচো গজা। প্রায় পনেরো-ষোল বছর পর তাসে হাত দিলাম বোধ হয়, নস্ট্যালজিক ব্যাপার-স্যাপার। ২৯ আর ব্রিজ চলল কিছুক্ষণ, তারপর খানিক গল্প, আগামীকালের প্ল্যান ইত্যাদি।

    কথায় কথায় বলা হয় নি, ইতিমধ্যে আমার ট্রেকিং পোলটি দেহ রেখেছে সান্দাকফু-র পথে। এটার দুটো সন্ধি ছিল, যার একটা থেকে ছোটো-বড় করার সময় একটু বেশী টানাটানির ফলে স্প্রিং (শক অ্যাবজর্বার) বেরিয়ে এসেছে। সোজা করলে দাঁড়াচ্ছে, কিন্তু ব্যালান্সটুকু ছাড়া, ভর দেওয়া যাচ্ছে না মোটেই। এই নিয়ে কাল দশ কিলোমিটার খাড়া নামতে হবে, ভাবনা যে হচ্ছে না তা নয়, দেখা যাক।  

    তাড়াতাড়ি রাতের খাওয়া শেষ করে যখন শুতে যাচ্ছি, তখনো বাইরে হাওয়ার উপদ্রব, ঝড়ের মত শোঁ শোঁ করে শব্দ উঠছে থেকে থেকে! ঘুম ভেঙে গেল রাত সাড়ে তিনটেয়, পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশ বেশ পরিষ্কার, পূর্ণিমার রাত চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে, কাঞ্চনজঙ্ঘা বাইরে আসছে ধীরে ধীরে, মেঘের স্তর নীচের দিকে নেমে গেছে। আমরা ঠিক চারটে পনেরোয় বেরবো ঠিক ছিল, সেইমত সবাই তৈরী হয়ে নিলাম, বাইরে বেরিয়ে এমনকি নাক পর্যন্ত ঢেকে নিতে হল। দু-তিন মিনিটের মধ্যেই আমাদের ঠিক করে রাখা জায়গায় এসে দাঁড়ালাম। চারদিক একেবারে জনশূন্য, নিস্তব্ধ, মাথার উপরে আকাশের ক্যানভাসে একরাশ তারা যেন আলোকসজ্জা সাজিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা করছে! আর সামনে! ঝকঝকে জ্যোৎস্নায় রাতের অন্ধকারেও দিগন্ত জুড়ে ঝলসে উঠছে তুষারাবৃত কাঞ্ছনজঙ্ঘা! মেঘের লেশমাত্র নেই! চাঁদ আর তারা দুয়ের আলোয় সামনে স্তরের পর স্তর পাহাড়ের সারি যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, আর তার ঠিক শেষ প্রান্ত থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে যেন রূপোর মুকুট! নাহ আবছা-ভাবে যা মনে হচ্ছিল, কাঞ্ছনজঙ্ঘার এই বিশালত্ব আর বিস্তার তাকেও ছাড়িয়ে গেছে যেন! সবাই সেই দৃশ্য নীরবে উপভোগ করলাম শুধু।

    গতদিনের মেঘ আর কুয়াশার পর এই দৃশ্য যে দেখব, আমরা কেউ-ই ভাবিনি, আনন্দে আত্মহারা হয়ে ক্যামেরা বের করতেও ভুলে গিয়েছিলাম প্রায়! ডানদিক থেকে আলোর একটা সরু রেখা হঠাৎ আকাশকে রাঙিয়ে দিতেই সম্বিৎ ফিরল! তখনো এভারেস্ট দেখার কথা ভাবিনি। তার জন্যে আমাদের আর-ও একটু বাঁদিকে সরে যেতে হবে ফালুটের রাস্তায়। এরপর শুরু হয়ে গেল আশ্চর্য অপার্থিব রঙের খেলা, একেবারে টুকটুকে লাল থেকে কমলা হয়ে উজ্জ্বল স্বর্ণাভ হয়ে ওঠার পালা, ডানদিক থেকে একে একে পান্ডিম, কাঞ্চনজঙ্ঘা, শিমোভো, গ্যেচা বা গ্যোচা, কাবরু ডোম, কাবরু উত্তর ও দক্ষিণ, রাথোং, আর সবশেষে কুম্ভকর্ণ ১ ও ২ – দিগন্তজোড়া তথাগত-শরীর, শায়িত এবং নিদ্রিত। ‘Sleeping Buddha’। সবচেয়ে আশ্চর্য হল, একটুকরো মেঘ ঠিক কাঞ্চনজঙ্ঘা শিখরের উপরে জমে রয়েছে যেন যুবরাজ সিদ্ধার্থের রাজছত্র হয়ে। আমরা এসে দাঁড়িয়েছি সেই রাজদরবারে, একেবারে যথার্থ রাজদর্শন বটে!
     
    নিদ্রিত তথাগত - সূর্যোদয়ের মুহূর্তে 


    দিনের আলোয় পরেও আবার কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাব, সেই ভরসায়, এবার আমরা প্রায় দৌড়োলাম একটু বাঁদিকে, ততক্ষণে চাতালের উপর ভিড় বেড়ে গেছে যথেষ্ট, কিন্তু বাঁদিকে পুরোই ফাঁকা। মনে হল, দেখতে পাবো তো? মেঘে ঢাকা বলেই কি ওদিকে ভিড় নেই! কিন্তু না, একটু এগিয়ে গাছের আড়াল পেরোতেই, প্রথম থ্রি সিস্টার্স, তারপরে একে একে দাঁড়িয়ে আছে চোমোলোঞ্জো, মাকালু, এভারেস্ট, লোৎসে, নুপৎসে, বারুনৎসে আর তারপর এক সমান্তরালে চামলাং-এর শিখরশ্রেণী। আশ্চর্যের কথা, তখনো এভারেস্টের গিরিশ্রেণী আলোর পরশ পায়নি, যদিও অবয়বগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এক-দু’মিনিটের মধ্যেই সেই অপার্থিব দৃশ্যের পুনরাবির্ভাব, প্রথম আলো লাগছে পর পর ডানদিক থেকে; মাকালু ঠিক যেন এক আরামকেদারা, কেদারার দু-পাশে হাতল!তার পেছনে উঁকি মারছে স্বমহিমায় এভারেস্ট আর তার পরেই লোৎসে। লোৎসের সাথে তার আগে নিকট-পরিচয় হয়েছে অভিযাত্রী দীপঙ্কর ঘোষের বই-এর মাধ্যমে। লোৎসের শিখর জয় করার পর সেখান থেকে অতুলনীয় বর্ণনা এভারেস্ট আর মাকালু-র! নিজের চোখকে যেন আমরা বিশ্বাস করতে পারছি না, যে দৃশ্য দেখছি, সত্যি দেখছি তো! এভারেস্টে সূর্যোদয়!

    ‘অগর ফিরদৌস বর রু-এ জমিন অস্ত্‌, হামিন অস্ত, হামিন অস্ত, হামিন অস্ত্‌’


    এভারেস্টে সূর্যোদয়ের মুহূর্তরা


    থ্রি সিস্টার্স 


    আর-ও খানিকটা বাঁদিকে সরে এসে দেখলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা, থ্রি সিস্টার্স আর এভারেস্ট, সব শিখরশ্রেণী একসাথে, সবার মাথায় যেন তুষার-কিরীট! হিমালয়ের রাজা-রাণীদের দরবারে আমরা যেন দর্শনপিপাসু প্রজা হয়ে এসে দাঁড়িয়েছি, যে প্রজারা রাজসকাশে এসে গতকাল রাতেও জানত না রাজ-দর্শন হবে কিনা! নগাধিরাজের অসীম করুণা। একটা গান অনেকক্ষণ ধরে মনে আসছিল, গুনগুন করছিলাম, ভাবছিলাম রবীন্দ্রনাথ কি এরকম-ই কোনো দৃশ্যের অবতারণা করেছেন এই গানে!

    “মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
    আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে, ভ্রমি বিস্ময়ে॥
    তুমি আছ, বিশ্বনাথ, অসীম রহস্যমাঝে
    নীরবে একাকী আপন মহিমানিলয়ে॥
    অনন্ত এ দেশকালে, অগণ্য এ দীপ্ত লোকে,
    তুমি আছ মোরে চাহি–আমি চাহি তোমা-পানে।
    স্তব্ধ সর্ব কোলাহল, শান্তিমগ্ন চরাচর–
    এক তুমি, তোমা-মাঝে আমি একা নির্ভয়ে॥“

    এপাশে একেবারে ভিড় নেই, আমরা পাঁচজন দাঁড়িয়ে চোখ, মন, প্রাণ ভরে নিচ্ছি এই নৈসর্গিক  দৃশ্য। হিমালয়ের দিকে চেয়ে আছি অপলকে, হিমালয়-ও হয়ত চেয়ে আছে; এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে এই পাহাড়, চারপাশের গাছেরা, আকাশ-বাতাস যেন কোনো মায়াবী স্পর্শে জীবন্ত! পাখিরাও জেগে উঠছে, তাদের কলকাকলি ছাড়া দ্বিতীয় শব্দ নেই। এই যদি স্বর্গ না হয়, কোথায় তবে!
     
    দিনের আলোয়


    মাউন্ট পান্ডিম আর শিমোভো বা শিম্ভো


    কুম্ভকর্ণ আর কুম্ভকর্ণ ইস্ট


    অনুপম দেখি আমাদের পেছনের একটা ছোটো টিলায় তরতরিয়ে উঠে গেছে। খানিক পরে নেমে আসতে গিয়ে বিপত্তি, উঠে গিয়েছিল পাথর বেয়ে, এদিকে বেচারি নামার সময় পা রাখার জায়গা পাচ্ছে না। কোনোমতে হাঁচোড়-পাঁচোড় করে নামল যদিও শেষ অবধি। ততক্ষণে আলো ফুটে গেছে, এভারেস্ট-কে দিনের আলোয় ভালো করে দেখে, মনের মণিকোঠায় স্থান দিয়ে আমরা আবার ধীর-পায়ে ফিরে এলাম আগের চাতালে। দিনের আলোয় কাঞ্চনজঙ্ঘা-কে আবার দেখলাম মন ভরে। এতক্ষণ টের পাই নি, হঠাৎ পাশের ক্যাফে থেকে কফির গন্ধে মনে হল পেটে প্রায় ছুঁচোয় ডন মারছে, ঘড়িতে দেখি সাড়ে সাতটা ছুঁই ছুঁই। ঢুকে পড়ে টেবিল দখল করলাম, টেবিলের পাশে কাঁচের জানলা জুড়ে সুবিশাল কাঞ্চনজঙ্ঘার অবয়ব, ধোঁয়া-ওঠা কফিতে চুমুক দিচ্ছি আর সেই দৃশ্য দেখছি। ক্যাফে থেকে বেরিয়ে নিজেদের কিছু ছবি তুলে এবার হাটে ফেরা, সেই রাস্তা থেকেও এভারেস্ট দেখে নিলাম আবার। কিন্তু আমাদের গাইড এসে গেছে, নামতে হবে এবার প্রায় দশ কিলোমিটার রাস্তা। নিত্যম তাড়া লাগালো, আমরাও ব্যাগ গুছিয়ে সান্দাকফু-কে বিদায় জানালাম। জানি না এই স্থানে আবার আসা হবে কিনা, এই দৃশ্য আবার কবে দেখব, আদৌ দেখবো কিনা, হিমালয় যেভাবে ডালি উপচে ভালোবাসা দিল আজ, কি-ই বা ফিরিয়ে দিই তাকে, সাধ্য কি ফিরিয়ে দেওয়ার -

    “ঘুরতে-ফিরতে তোমাকে বলে চলেছি কেবল একটাই কথা-
    মৃত্যু এসে ফিরে যাবে
    এত প্রেম দিওনা আমাকে।“ (পূর্ণেন্দু পত্রী)

    পরের গন্তব্য গুরদুম।
  • ভ্রমণ | ২০ জানুয়ারি ২০২৩ | ১৮৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ২২ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:৫৮515604
  • আহ এই দৃশ্য দেখতে একবার অন্তত যেতেই হবে।
    ছবিগুলো অপূর্ব হয়েছে রে।
  • সুদীপ্ত | ২৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৯:০২515668
  • হ্যাঁ ঘুরে এসো, নভেম্বরে দিওয়ালির পর যেও, কিছুটা ফাঁকা পাবে। যদি ট্রেক না করো, আর ল্যান্ড রোভার থেকে মুক্তি পেতে চাও, তাহলে ওই হোটেল প্রধানে কথা বললে স্করপিও বা বোলেরো ব্যবস্থা করলেও করতে পারে। সিট বেল্ট ঠিক আছে কিনা অবশ্যই দেখে নিও।  বাকি হাড়গোড়ের দায়িত্ব আরোহীর! 
     
    আমি বলব, ট্রেক করো, দরকার হলে পাঁচদিন টা সাত বা আটদিনে করো, মূল রাস্তার কাছাকাছি হোম স্টে বা ছোটো হোটেল পেয়ে যাবে রাত কাটাতে চার-পাঁচ কিলোমিটার অন্তর, যে জায়গাগুলোর কথা উল্লেখ করেছি। গ্রামের লোকরাই ব্যবস্থা করে দেয়। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি প্রতিক্রিয়া দিন