এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে – উত্তরপূর্বের টুকটাক

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ১১ জানুয়ারি ২০২৩ | ৩২৯ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • | | |
    নর্থইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলওয়েজের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে লাইনে বদরপুর আর গৌহাটির মধ্যে ১৮৯৯ সালে চালু হয় মিটার গেজ লাইন। পরে লামডিং থেকে আগরতলা অবধি মিটার গেজ প্রসারিত হয়। সম্পূর্ণ স্থলভূমি দিয়ে ঘেরা উত্তরপূর্বের মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা আর দক্ষিণ আসামের মধ্যে যোগাযোগের মূল উপায় ছিল এই রেল লাইন। মূলত চা, কয়লা আর কাঠ সহজে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে চালানের জন্যই  ব্রিটিশরা বানায় লামডিং বদরপুর লাইন, সময় লেগেছিল ১৬ বছর। সেই সময় গোটা যাত্রাপথে ৩৭টা টানেল পড়ত। ২০১৪-১৫ নাগাদ এই মিটার গেজ লাইন ব্রডগেজে রূপান্তরিত হয়,কালের প্রভাবে জনসংখ্যার চাপে  ঘন সন্নিবিষ্ট জঙ্গল কমে আসায় কমে এসেছে টানেলের সংখ্যাও।

    গৌহাটী থেকে হাফলং ভিস্তাডোম চালু হল এই ২০২১এর আগস্টে। মস্ত মস্ত কাচের ফলকওলা  জানলা, ছাদের দিকেও সরু সরু কাচের ফলক দেওয়া ভিস্তাডোম যে পর্যটক আকর্ষণ করবেই তাতে আর সন্দেহ কি! আমার শুধু একটাই ভয়, গাদা গাদা ট্যুরিস্ট যেতে শুরু করলেই সেই ডিজে, সেই জগঝম্প বাজনা মাইক, সেই প্রচন্ড কোলাহল আর সেই প্ল্যাস্টিকের পাহাড় নষ্ট করে দেবে এই শান্ত সুন্দর জঙ্গল উপত্যকাকেও। ২৪শে সকালে ০৫৮৮৮ গৌহাটী নিউ হাফলং ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস ছাড়ল একেবারে কাঁটায় কাঁটায় সকাল ৬.৪৫এ। স্টেশান এলাকা থেকে ট্রেন আস্তে ধীরে বেরিয়ে আসে মালিগাঁওএর তৈল শোধনাগারের ধোঁয়াশায় ঢাকা এলাকা পেরিয়ে।

    গতি বাড়ে আর সাথে সাথে দুইপাশে বেড়ে চলে অবাধ উন্মুক্ত মাঠ, ধানখেত, সরষে খেত। সুজ্জিমামাও ততক্ষণে লাল কোটখান খুলে রেখে সোনালীরঙা শার্ট পরে আকাশ বাইছেন। সবুজে সবুজ মাঠ খেত পেরিয়ে ক্রমশ দিগন্তে দেখা দেয় ছোট ছোট পাহাড়েরা। দ্রুত পেরিয়ে যায় ফাঁকা শুনশান ছোট ছোট স্টেশান, অতি পরিস্কার ঝকঝকে স্টেশান চত্বর দেখে চোখে ধাঁধা লেগে যায় যেন।সহযাত্রীরা কেউ কেউ ইতিমধ্যে চেয়ার ৯০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে জানলার মুখোমুখী হয়ে বসেছেন। কিন্তু ঘুরিয়ে নেবার পর পা রাখার জায়গা এতই কম যে আমার মত ৫ ফুটিয়া মানুষও স্বস্তিতে বসতে পারি না। ঘোরালে দুটো চেয়ারকেই ঘোরাতে হবে অতএব সহযাত্রিণীর সাথে পরামর্শক্রমে চেয়ার আবার যথাপূর্বম।
     
     

    বেলা এগারোটা নাগাদ জঙ্গল বেশ ঘন হয়ে উঠতে লাগল,পাহাড়েরা ঘনিয়ে এলো কাছে,আঁকাবাঁকা পথে ট্রেন ওঠে পাহাড় বেয়ে। এক রোগা পাতলা চিকমিকে নদী কখনো কাছে আসে কখনো বা খিলখিলিয়ে চলে যায় খানিক দূরে। নদীর নাম মাহুর। এখন দেখতে অমন রোগা পাতলা হলে কি হবে এই নদীই গত মে মাসে ভয়ঙকরী হয়ে উঠে ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল আর্ধেক রেললাইন। তার সাথে তাল দিতে পাহাড় বেয়ে নেমে এসেছিল কাদামাটির ধ্বস। হাফলঙ স্টেশানের সেই রেলের কামরা তুবড়ে দেওয়া  ধ্বংসলীলার ভিডিও হয়ত দেখেছেন অনেকেই, ট্রেন চালু হয়ে গেলেও রেললাইনের অনেক জায়গাতেই সারাইয়ের কাজ চলছে এখনো।



    এক এক জায়গায় শুধুই রেল লাইন আর অনেক নীচে নদীখাত,লাইনের একপাশে কোনোমতে দুজন দাঁড়াবার জায়গা করা, কোমরসমান রেলিং ঘেরা। তাতেই তিনজন কর্মী দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন ট্রেন চলে যাবার, আবার লাইণে কাজ শুরু করবেন। দেখে কিরকম গা ছমছম করে, মাথা ঘোরে। সিট ছেড়ে উঠে ইঞ্জিনের পেছনের ডেকে দাঁড়াই। এই জায়গা আরেকটু খোলামেলা, সামনেটা কাচ দেওয়া, অল্প কটা সীট জানলা ঘেঁষে বসানো। এসি কামরার বাইরে এটা মূলত দাঁড়িয়ে যাবার জায়গা। অপূর্ব লাগে। আহা কাচের জানলা যদি খোলা যেত তবে পাশের জঙ্গলের গন্ধও পাওয়া যেত। কেন যে খামোখা এসি লাগায় এমন কামরাগুলোয়?!



    আগের স্টেশান মাইবং থেকে হাফলং পৌঁছাতে সময় লাগে ২ ঘন্টার মত আর রাস্তার এই অংশটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। গোটা পাঁচেক সুড়ঙ্গে ঢোকে ট্রেন। এক একটা সুড়ঙ্গে ঢোকামাত্র কামরার আলো নিভিয়ে দেওয়া হয় পর্যটকদের গা ছমছমে অভিজ্ঞতার স্বাদ দেবার জন্য। ঘুটঘুট্টে অন্ধকারে নিজের হাত পাও দেখা যায় না, দ্বিতীয়বারে এক মহিলা এমনই জোরে চীৎকার দিলেন যে তৃতীয় সুড়ঙ্গ থেকে কামরার জরুরী আলো জ্বালিয়ে রেখেছিলেন রেলের লোকজন। প্রথম সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে ট্রেন ইংরিজি এস আকৃতির জিগজ্যাগ পথে নীচে নেমে আবার উপরে উঠে নিউ হাফলং স্টেশানে পৌঁছায়।
     


    তিনটে মাত্র ‘লাটফরম’ (প্ল্যাটফর্ম)নিয়ে চারিদিকে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা নিউ হাফলং স্টেশানে দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে মনে হয় পাহাড়ের ঠিক মাঝখানটায় কুয়ো খুঁড়ে কেউ যেন নিউ হাফলং স্টেশানটাকে টুপ্পুস করে বসিয়ে দিয়েছে। দুপুর ১টা নাগাদ ট্রেন ঢোকে হাফলং। আমি যাবো নশরিং  গেস্ট হাউসে। মালিক বলভদ্র সায়েব দুজন ট্যাক্সিওলার নম্বর দিয়েছিলেন, তাঁদেরই একজন গোপীনাথ ডিব্রগেড়ের সাথে কথাবার্তা বলে রেখেছিলাম আমাদের  একেবারে স্টেশান থেকে তুলে নেবার জন্য। সকাল আটটা নাগাদ গোপীনাথ ফোন করে যখন জানলেন আমি একাই আসছি, তখন ভারী চিন্তিত হয়ে পড়লেন ওঁর মারুতি ভ্যান, আমি একা অতবড় গাড়ি নিলে অনেক খরচ হয়ে যাবে যে!

    ট্রেন মাইবঙ ছাড়তে না ছাড়তেই গোপীনাথ আবার ফোন করে জানিয়েছিলেন আমার জন্য উনি একটি অল্টোর ব্যবস্থা করেছেন, তবে আমি স্টেশানে নেমে যেন তাঁকেই ফোন করি, তিনিই নিয়ে ওই গাড়িতে তুলে ড্রাইভারের সাথে কথা বলে  কত দিতে হবে ঠিক করে দেবেন। তা তাই করলাম। অল্টোর সারথির নাম শুবজিত। আমি শুভজিত বলায় আবার শুধরে দিলেন দুই তিনবার করে। নিউ হাফলং স্টেশান থেকে নশরিং গেস্ট হাউস ৭ কিলোমিটারের মত দূর, সময় লাগে ২০ থেকে ২৫ মিনিট মত। এই শুবজিত ছোকরা বেদম বকবক করে আর প্রচন্ড জোরে গান চালায়। গান তো নাহয় কমাতে বললাম, কিন্তু কথার স্রোত! বাপরে!

    গেস্ট হাউসটা বাইরে থেকে দেখতে বেশ। দোতলার ঝুলন্ত ডেকটা দেখেই কেমন বন্ধুদের নিয়ে হাত পা ছড়িয়ে বসে আড্ডা মারতে ইচ্ছে হয়। বলভদ্র সায়েব, এঁকে নভেম্বরেই জানিয়েছিলাম দুটো নয় একটাই ঘর লাগবে, তা সেটি ইনি কোন কারণে খেয়াল করেন নি। খুবই অবাক হলেন তবে সেদিন প্রচুর  পর্যটক আসাতে ঘন্টাখানেকের মধ্যেই ঘর ভরেও গেল। ঘর পেলাম একতলায়, মূল্য ১৪০০/-টাকা  প্রতিরাত। আমি যদিও ওঁকে ১৬০০/- টাকা প্রতিরাতএর ঘরই দিতে বলেছিলাম তাও এটা কেন দিলেন কে জানে! একাকী মহিলা দেখে ইনিও খরচ কমাতে সাহায্য করতে ছাইলেন কিনা কে জানে! কিন্তু না জানিয়ে কেন করলেন! এই ব্যপারটা বুঝলাম চেক আউটের সময়। ট্রিপ অ্যাডভাইজারের রিভিউতে লিখে দিয়েছি।



    পরিস্কার ঘর বিছানা বাথরুম পেয়ে ফুরফুরে মনে স্নান করা গেল, শুধু গিজার থেকে গরম জল বেরোল না কিছুতেই। মরুগগে বলে ঠান্ডা জলেই স্নান সেরে রুটি, দুই রকম তরকারি,  চিকেনকারি  ইত্যাদি খেয়েদেয়ে বেরোলাম হাফলং শহর ঘুরে দেখতে। সেসব গল্প আবার কাল।
     
    | | |
  • ভ্রমণ | ১১ জানুয়ারি ২০২৩ | ৩২৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সুদীপ্ত | ১১ জানুয়ারি ২০২৩ ২১:৪০515164
  • পড়ছি, নদীর ছবিগুলো বেশ হয়েছে! 
  • Nirmalya Nag | ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১২:৩৩515227
  • চলুক চলুক
  • | ১৩ জানুয়ারি ২০২৩ ১৮:৫৬515239
  • সুদীপ্ত, নির্মাল্য, 
    ধন্যবাদ। smiley
     
    দীপাঞ্জন,  হ্যাঁ ওটা তো পাখীহত্যার ছক। প্রতি বছরই হয়, এবারেও হয়েছিল। আমি জায়গাটার পাশ দিয়ে গেছি।  ছবি তোলার বা দাঁড়ানোর ইচ্ছে হয় নি। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন