বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ভুল চরিত্র বেভুল চিত্রনাট্য।  পর্ব ১ - আগে যা ঘটেছে।  

    swagatam sen লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৩৪৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • বহুবছর পরে ওরা যখন চুক্তিমতো নিজেদের বই লিখবে - আত্মজীবনী নয় উপন্যাসও নয়; ইতিকথা বলাযায় - তিনজনের কাহিনীই অদ্ভুতভাবে শুরু হবে ২০০৭ এর শেষের দিকে। ইচ্ছাকৃতভাবে নয়; এর পিছনে কোনো যোগসাজশ নেই। বস্তুত গত এক দশকে ওদের মধ্যে কোনো যোগাযোগই নেই। 
     
    ওই ত ওদের বহুতল আপিসের টেরাসে দাঁড়িয়ে ওরা। শার্টের উপরের বোতামগুলো খোলাই থাকে এমন সন্ধেয়। ঘাম আর গালি। গালি আর ঘাম। এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া এসে সবাইকে ব্যোমকে দিয়ে আবার কোথায় কাট মেরেছে। শালা কি ওয়েদার। প্রবলেম ভাই প্রবলেম। বাড়িতে প্রবলেম আপিসে প্রবলেম। একটু অন্ধকার কোন খুঁজে দাঁড়ায় তিনজন। একজন আবার লাইন পেরিয়ে রেলিঙের ধারে গিয়ে ঝুঁকে পড়েছে। বাকিরা দাঁত ক্যালায়। একটা আবছা ধোঁয়ার চাদর ওদের ঘিরে রাখে। অবুঝ বাচ্চার মতো। শহরজোড়া অস্পষ্টতার অবৈধ সন্তান। 
     
    'বাঁড়া কি হচ্ছে বুঝতে পারছি না'। উৎপলটা কোনোকালেই কিস্যু  বোঝেনা। ওই ব্যাটা রেলিঙে ঝুঁকছিলো। এবারে একেবারে উল্টে পড়ার জোগাড়যন্তর করেছে শালা। কোনোদিনই কিস্যু বোঝে না আপদটা। নিজেকে হিরো ভেবে ঘুরলে ওই হয়। একটু ঘটে বুদ্ধি থাকলে হতো। 
     
    সমীরণ আকাশের দিকে তাকায়। 'এইরকম বালের বছর আর দেখিনি'। হুট্ করে টার্ন মারতে গিয়ে হুমড়ি খায় কিন্তু সামলে নেয়। আনতাবড়ি একটা দিকে তাকিয়ে কিছু ভাবার ভান করে। সবই বাঁড়া আনতাবড়ি। এই যে সব মাখোমাখো দোস্তি। সময়ের হুড়কো খেয়ে সব একত্র হয়েছে বই ত নয়। এইখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই বা কী গাড় মারানোর অনুষ্ঠান চলছে। কাল সব শালা ইতিউতি শান্টিং হয়ে যাবে। সমীরণ মাথা ঘুরিয়ে দেখে ধীরে ধীরে। 
     
     ওই ত কত জাহাজ বন্দরে এসে লাগিতেছে। স্তব্ধ জলে দুলিতেছে ইতস্তত। সুদূরে গোধূলির দিগন্ত ছুঁয়ে মৃদু আলোর সারি ও কি কোনও অশরীরী সেনার হাতের মশাল? নাকি সমুদ্রের আলোশ্যাওলা শহরের সীমা বাঁধিয়া দিতে চায়?  নাবিকেরা জড়ো হয় পানশালায়। সাতসমুদ্র অভিযানের গল্প, জাহাজডুবির গল্প, না-দেখা শঙ্খবেলার গল্প - একান ওকান হইয়া ছড়াইয়া পড়িতেছে বন্দরের অলিতে গলিতে। ডুবোপাহাড়ে আছড়াইয়া ভাঙিতেছে জীবন। ডুবিতেছে। আবার ভাঙা জাহাজের ভাসমান পাটাতন ধরিয়া ভাসিয়া উঠিতেছে। 
     
    মুহূর্তের চটকায় ঘোর কাটে। বন্দর-জাহাজ-নাবিক সব মিশে যায় ঢলে আসা বিকেলের গায়ে। সমীরণ দেখে সুবীর মুখটাকে গোল করে ধোঁয়ার রিং ছাড়ছে।গুমোট হাওয়ায় রিংগুলো বুঝতে পারে না কোনদিকে যাবে। শেষে সেন্ট্রাল পার্কের দিকে রওনা হয় কিন্তু আরেকটা হাওয়ার দমকা এসে উড়িয়ে নিয়ে যায়। 
     
    সুবীর আরো রিং ছাড়ে। কেউ বলে না কিন্তু সবাই জানে যে উৎপল প্রথম থেকেই টিমে ফিট করতে পারেনি। ওকে যেতেই হতো। কিন্তু প্রশ্ন হলো - এরপর কে? কেউ না কেউ ত শালা হবেই আউট। মাইরি এ কি বিকট রিসেশন। ডব্লিউ রিকভারি নাকি হতে পারে। তাহলেই কেস। টেরাসের অন্য প্রান্ত থেকে - আলো-ছায়ার বৃত্তের ওপার থেকে মৃতদেহের উপর সন্ধ্যামাছির কাড়াকাড়ি পেরিয়ে - কেউ যদি দেখে ত সুবীরকে স্তম্ভের মতো লাগবে নির্ঘাত। তালগাছ টাইপ লম্বা এবং এখন ভারী গম্ভীর। মুখ দেখে মনে কি চলছে বোঝা মুশকিল। উৎপল লাফ দিয়ে লাইনের এদিকে চলে আসে। ধড়ফড় করছে খলবল করছে। একবার টাকে হাত বোলাল এমন যেন শালা একমাথা চুলে বিলি কাটছে। এমন মায়ায় মায়ায় কেটে যাওয়া সন্ধে সচরাচর আসে না। 
     
    মায়া। হঠাৎ গতি বাড়াইয়া ওদের দিকে ধাবমান হয়। তারপর ধুপ করিয়া দূরে চলিয়া যায়। সেই ঐখানে একখানি পরিত্যক্ত মিনার সন্ধ্যার আকাশে একলা দাঁড়াইয়া আছে। তাকে চতুর্দিক থেকে ঘিরিয়া ফেলিয়া আক্রমণ শানাইয়াছে বিলবোর্ডের দল। মিনারের উপরে দাঁড়ানো সন্ন্যাসী নিচে তাকাইয়া দেখে শহরের সর্পিল রাস্তায় অদ্ভুত শকটের স্রোত। তার নীল চোখে হঠাৎই চোখ পড়ে সমীরণের। আর সব মুছিয়া যায়। মাঝের দূরত্ব সংকুচিত হইতে শুরু করে। 
     
    'ধুর বাঁড়াটা। সোজা হয়ে দাঁড়া না।' মৃদু ধমক। সুবীর। সমীরণ বেশ টিপসি। হ্যাঁ হ্যাঁ ওরা ত আপিস পার্টিতে এসেছিলো। তাহলে দুপুর-বিকেল হবে না। একটু রাতের দিকেই। এই ত আপিসের টেরাসে নয়। ওরা একটা ক্লাবহাউসের টেরাসে দাঁড়িয়ে। সমীরণ গভীর শ্বাস নেয়। উৎপল পান খাওয়া দাঁতগুলো বার করে কেলিয়ে দেয় আরাম করে। 
     
     নাঃ এই গান্ডুমি আর নেওয়া যায় না। শেষ তিন বছর জানপ্রাণ লাগিয়ে দিয়েছে সমীরণ এই চাকরির পিছনে। না-পাওয়া প্রোমোশনের পিছনে। মেক-বিলিভের জগৎ ছেড়ে সমীরণের কর্পোরেটে ঢোকার কারণই ছিল কিছু একটা সলিড ধরে নিজের ভাসমান জীবনকে ট্র্যাকে আনা। অনেকটা বাগান করার মতো। ছোট কিন্তু নিজের। চারদিকে বেড়া দেওয়া। আজ সেই বেড়া ভেঙে মাইরি চুরমার হয়ে গেলো টিম মিটিঙে ভিপি অনিলের ছোট্ট ঘোষণায়। টু দা পয়েন্ট। তারপর লেটস গো পার্টি। এখন ওরা এসেছে এই বালের পার্টিতে। 
     
    'চাপের বছর'। সুবীর এইভাবেই কথা বলে। জ্ঞানের ঢপ সব। চাপের বছর। সময় সব ঠিক করে দেবে। সিস্টেমে ভরসা রাখতে হবে। ঢপের চপ। 'সিস্টেম তোমায় কি দিয়েছে?' সমীরণ জিজ্ঞেস করেছিল এক শুক্কুরবারের মালপার্টিতে। সুবীর কিছুটা নৈঃশব্দ ওর দিকে পাঠিয়ে উৎপলকে ওল্ড মঙ্কের বোতল ধরিয়ে বলেছিলো 'আরেক রাউন্ড বানা'। সুবীর ওদের চেয়ে খানিকটা সিনিয়র যদিও এখনও কর্পোরেট সিঁড়ির নিচের ধাপেই আটকে আছে ওদের সাথে।  
           
    উৎপল সেদিন বেশ মৌতাতে ছিল। অবিশ্যি ব্যাটা সব সময়ই মৌতাতে থাকে। নিত্যনতুন গার্লফ্রেন্ড আইফোন ঝকঝকে নতুন গাড়ি। আজকাল আবার হুইস্কি ছাড়া খায় না। সেদিনও কিছু একটা আলটপকা বলেছিলো। 'গাঁড় মারাও সিস্টেমের'। অথবা 'শালা আমরা সিস্টেমের বাপ্'। আজ এই পনেরো বছর বাদে এইসব ফালতু গল্পের জট নিজের কলম থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে সমীরণের ঠিক মনে পড়ে না সঠিক শব্দবন্ধ। মনে পড়েই বা কি এমন হবে। 
     
    সময়। স্টেজের উপর আরেক কুশীলব। ধ্যানমগ্ন। কাউকে কিছু বলিতেছে না। দর্শকেরা এতক্ষণ তাকে দেখিয়াও দেখিতে পায় নাই। এতক্ষণ মনে হইতেছিল ইহা দ্বৈত নাটক। এইবার চোখ খুলিয়াছে। হে দর্শকবৃন্দ তোমরা কিসের নিমিত্ত এই সন্ধ্যায় জমায়েত হইয়াছ? রাজার তরবারি তোমাদের আনে নাই। সন্ন্যাসীর জ্ঞানও নয়। রাজা মঞ্চের সামনে থাকিতে চায়। সন্ন্যাসী পিছনে। রাজা সন্নিকটে। সন্ন্যাসী দূরে। তোমরা কাকে খুঁজিতে আসিয়াছ? 
     
    সবাই ঝমাঝম এগিয়ে চলে। ওরা তিনজন পিছনে ​​​​​​​পড়ে ​​​​​​​থাকে ​​​​​​​অচল ​​​​​​​পয়সার মত। 'আমাদেরও সময় আসবে'।  সুবীরের কমেন্টের টাইমিং অসাধারণ। কবে সেই সময় আসবে? কী হবে? কিছু কি হবে? ওরা সেই কবে থেকে ধর্ণা দিয়ে রয়েছে। সন্ন্যাসী কি রাজার আসনে বসতে পারবে? নাকি রাজার পেয়াদারা তাকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসে মিনারে বন্দি করবে? 
     
     ঝরে যাওয়া সাম্রাজ্যের এককে সময় বেচাকেনা হয়ে থাকে। ইন্দ্রপতনের মুহূর্ত গুনে গুনে। দুর্দম শাসকের কর্তিত মুন্ড সাজিয়ে বসে কালের পসরা। তারপরে পুরো দড়ি ধরে পড়ে টান। এইখানে সেইসব অস্থির দিনগুলির বর্ণনা করতে গিয়ে উৎপলের ইতিকথায় আমরা পাই - "চূড়ান্ত ট্র্যাজেডি। মনে পড়ছে যেদিন ভিক্টরিয়া জানতে পারলো তার শরীরে বাসা বেঁধে থাকা রোগের ব্যাপারে। ব্রেকআউট জোনে হঠাৎ দেখি জল থৈ থৈ। ​​​​​​​মাঝে ​​​​​​​মেঝেতে ​​​​​​​পিছলে পড়ে হাপুস ​​​​​​​কাঁদছে ​​​​​​​মহারাণী। কেউ ​​​​​​​কাছে ​​​​​​​গিয়ে ​​​​​​​যে ​​​​​​​দেখবে ​​​​​​​তার ​​​​​​​সাহস ​​​​​​​নেই। ​​​​​​​সবাই ​​​​​​​ভাবছে ​​​​​​​সঠিক ​​​​​​​প্রটোকল ​​​​​​​কি হওয়া ​​​​​​​উচিত। ​​​​​​​সম্ভ্রমের ​​​​​​​ফিতেয় ​​​​​​​ব্যারিকেড ​​​​​​​হয়ে ​​​​​​​গেছে ​​​​​​​ক্রাইম ​​​​​​​সিন্। ভিক্টরিয়া ​​​​​​​ফিরে ​​​​​​​যাবার ​​​​​​​মাসখানেক ​​​​​​​পরে অবধি মৃদু ​​​​​​​ফিসফাস ​​​​​​​শোনা ​​​​​​​যেত। ​​​​​​​নিজের তৈরী ​​​​​​​রাজ্য ​​​​​​​থেকে ​​​​​​​নিজেই ​​​​​​​নির্বাসিত। ​​​​​​​ধীরে ​​​​​​​ফিসফাস ​​​​​​​সরে ​​​​​​​গিয়ে ​​​​​​​নৈঃশব্দ ​​​​​​​আসে। ​​​​​​​তার ​​​​​​​পরে ​​​​​​​বিস্মৃতি।"
     
    'এর শালা সত্যি কোনও মানে নেই' সুবীরের থেকে কাউন্টার নিয়ে বলেছিলো উৎপল। সেই ২০০৭ এর টেরাসে। মানে যে আছে আর ভীষণ বেশিরকম আছে সেই অর্থনৈতিক কচকচিতে ঢুকতে ইচ্ছা করেনি সমীরণের। সুবীর আর উৎপল দুজনেই নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। কোডিং ছাড়া বিশেষ কিছু জানেনা। মাঝে মাঝে সমীরণের অসহ্য লাগে ওদেরকে। কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে বোঝায় যে এই দৈনন্দিনতা আর এই স্থিতিশীল জীবন সে নিজেই বেছে নিয়েছে। এই জীবনে এরাই তার সহনাবিক। নিদেনপক্ষে মাঝি-মাল্লা। 
     
    সুবীর উৎপলের পিঠে হাত রাখে। 'এটা মাথাগরমের সময় নয়'। উৎপল ঝট করে ওর হাত সরিয়ে নিতে গিয়ে টলে পড়ে যায়। 'কত ইজিলি বললে রাজামশাই' :সেই গতবছরের অফিস ফাংশনের নাটকের পর থেকেই উৎপল সুবীরকে রাজামশাই বলে ডাকে। কিছুটা ঈর্ষায় বলেই সমীরণের ধারণা। মানুষ কত পেটি হতে পারে। সমীরণ নিজেকে সরিয়ে নেয়। টেরাসের ধার ধরে ওর ছায়া দীর্ঘতর হয়। ঘেমো লোকজন। ভাটাচ্ছে। ঐখানে হাত নেড়ে কি বলছে। এই ত এক পরিচিত মুখ। লোকদেখানো হাসি। মনে হয় ঐখানে কেউ ব্যর্থতার ভার নিতে না পেরে ন্যুব্জ। তারপাশেই ফুলেফেঁপে উঠছে নতুন কোনো উচ্চাশী অন্ধকার। 
     
    এরা সবাই গুড টাইমসের কায়েমী শাসন থেকে পালিয়ে যেন এই টেরাসে আশ্রয় নিয়েছে। কেউ বিপ্লবী - কোনো নাটকীয় পটবদলের ছক কষছে। কারো বা অভিযান শেষের পথে - বৃদ্ধ সিংহের মত শ্বাস গুনছে। এই টেরাসকে নিরপেক্ষ জোন ঘোষণা করা উচিত - ভেবে হাসি পায় সমীরণের। নিরপেক্ষ অঞ্চল - যার আশেপাশে অনবরত চলেছে নাম পয়সা ভাগ্য ও উচ্চাশার জন্য প্রাণপণ লড়াই। সুকেশ আগরওয়াল এককোণে আরোকিছু উচ্চপদস্থ হোমরাচোমড়ার সাথে গুজগুজ ফুসফুস করছেন - চোরাগুপ্তির ছোরাছুরির লড়াই। দেবেশ কোছর স্মার্টলি ডান্স ফ্লোর থেকে ঘাম মুছতে মুছতে এদিকেই আসছে। তার চলার ছন্দে বহু পুরোনো বিস্মৃত যুদ্ধের দুন্দুভি এখনো মৃদু শোনা যায়। সঙ্গে দু-তিনটে ফ্রেশার মেয়ে। সমীরণ যেই ঘাপটি মারতে যাবে অমনি খপ করে এসে কাঁধ চেপে ধরে। সমীরণের মনেপড়ে যায় যে দেবেশ নাকি ছেলেবেলায় মাঠে লাঙল দিত। 
     
    দেবেশ - তুম লোগোকে সাথ আচ্ছা নেহি হুয়া 
    সমীরণ - আইসে হি চলতা হ্যায় স্যার। 
     
    কেন যে এমন একটা সুবীর মার্কা উক্তি ঝাড়লো সমীরণ সেটা ওর নিজেরও ট্যান হয়ে গেলো। লাইফ তোমাকে লোপ্পা বল দেবে আর তুমিও এগিয়ে এসে কপিবুক শট খেলবে। কর্পোরেট ট্রেনিং এ বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা যে মগজ ধোলাই টা হয়েছে এসব তারই কেরামতি। দেবেশ এতক্ষণে সমীরণের সামনে দুই পা ফাঁক করে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। মালটা প্রচুর টেনেছে। মুখ দিয়ে ঘাম গড়াতে দেখে মনে হবে যেন হাউ হাউ করে কাঁদছে। 'এক কাহানি শুন' -
     
    অনেক দিন আগে দেবেশ ছিল এক সামান্য সৈনিক অন্য কোনও রাজ্যে। তারপর একদিন সেনাপতি ব্যারাকে ওকে ধরে বললে 'জানো ত এখন শান্তির সময়। যুদ্ধফুদ্ধ শেষ।' দেবেশ ইনিয়েবিনিয়ে বলার চেষ্টা করেছিল যে তার বিশ্বস্ততার কি কোনও দাম নেই? তাতে সেনাপতি ঘুরে দাঁড়িয়ে পাঞ্চলাইন থ্রো করে - 'আমি তো ভাবলাম তুমি ভাড়াটে যোদ্ধা।' 
     
    শেষের কথাগুলো সমীরণের কানে বাজে দেবেশ পিঠে চাপড়চোপড় মেরে কেটে পড়ার বাদেও বেশ খানিকক্ষণ। 
     
    'কি বালের কথা বললে রাজামশাই'। ওর বন্ধুরা এখনো সেই ফাটা রেকর্ডেই আটকে আছে। 'তোমার ত আর চাকরি যায়নি! গাঁড় মারাও। আমাদের সঙ্গে এখানে তুমি ছিঁড়ছো টা কী?'
     
    এই এই প্রশ্নটাই এতক্ষণ ঘুরঘুর করছিলো হাওয়ায় হাওয়ায়। ভনভন করছিলো উড়ন্ত  আলোপোকার মতো। গুমোট সন্ধ্যার মেঘে মেঘে। ওরা এখানে কী ছিঁড়ছে? 
     
    সুবীর চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়। আড়মোড়া ভাঙে। লাইনের শেষে কলম লিক করে পড়া কালির দাগের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবে। কিন্তু চিন্তার খেই হারিয়ে গেছে। নাঃ অনেকক্ষণ লেখা হলো। একটু হেঁটে আসা যাক। সুবীর ওর টেবিলের পাশের জানলা খুলে দাঁড়ায়। সামনের বাগানের ঘাস এতো নিখুঁত করে ছাঁটা যে বাগানও কিছুটা লজ্জাবনত হয়ে তাকায়। স্কটিশ গ্রীষ্মের সুনীল আকাশে কোত্থেকে একটা পাতলা বাচ্চা মেঘ পথ ভুল করে চলে এসে ইতিউতি চাইছে। বাগান ঘুরে তাকায়; মেঘ তুলোর মতো ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে - কি করছো তুমি এখানে? 
     
    কি করছি? জানলা বন্ধ করতেই অগোচরে এক নিখুঁত নৈঃশব্দ ঘরে ঢুকে আরাম করে বসে। ঘুলঘুলি থেকে সেঁধিয়ে আসা একরত্তি আলো কি খুঁজতে এসেছিলো বেবাক ভুলে গিয়ে কান খাড়া করে। দেওয়ালজোড়া আলমারির বইগুলো তাদের পদাতিক আক্রমণের গঠন ভেঙে নতুন কোনো গল্পের গন্ধে 
    এগিয়ে আসে। ও কী করছে এখানে? ওরা গুটিগুটি লেখার টেবলের কাছে আসে। সুবীর যতক্ষণে দরজার কাছে পৌঁছয় ততক্ষনে মেঘ ভেঙে যায় জলে - আলো বেঁকে যায়। কিন্তু তারা কালির দাগ পেরিয়ে যেতে পারে না। কিছুতেই। দরজা বন্ধ করে হল পেরিয়ে সদর দরজার দিকে যেতে যেতে সুবীরের মনে হয় ওরা ওই ২০০৭ এর টেরাসে ছিল একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে যদিও তখন ওরা বুঝতে পারেনি। 'আমাদেরও সময় আসবে'। সবসময়ই আসে। ওর বন্ধুরা ওই নির্মম সময়ে ঐখানে ওই গুমোট ঘামের সন্ধেয়  ওকে ওদের থেকে আলাদা ভেবেছিলো। ওরা সিস্টেম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো কিন্তু সুবীর থেকে যাচ্ছে। কিন্তু কে জানে কতদিন? 
     
    বস্তুত সুবীর টিকে গিয়েছিলো আরো পাক্কা দশ দশটা বছর। 
     
    (ক্রমশঃ) 
  • ধারাবাহিক | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ | ৩৪৬ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    কখনও  - Indrajit Das
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ইন্দ্রাণী | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৩:৪৪512226
  • অনেকদিন পরে একটি অন্যরকম গদ্যের স্বাদ। পড়ছি।
  • হজবরল | 185.207.107.227 | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:৫৭512232
  • "নিজেকে হিরো আলম ভেবে ঘুরলে ওই হয়।"
    ২০০৭ সালে হিরো আলম কোথায় ?!
  • swagatam sen | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:০২512238
  • ঠিক বলেছেন।  ধন্যবাদ। 
  • swagatam sen | ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৮:২০512240
  • @ইন্দ্রানী 
     
    ধন্যবাদ। দয়া করে পড়তে থাকুন। আশা করি এরপরেও ভাল লাগবে। 
  • Tirtho Dasgupta | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৫:৪৫512249
  • অনবদ্য গদ্য । গদ্য-পদ্য মিলে মিশে মাখামাখি পুরো । কর্পোরেট জীবনের ক্লেদ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে লেখা থেকে । ফর্মটাও বেশ । অপেক্ষা পরের পর্বের জন্য ।
  • ইন্দ্রাণী | ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ ০৬:২৮512251
  • দয়া করে পড়ার ব্যাপারই নয়।
    লেখকের কলম এমন হবে যে ঘাড় ধরে পড়িয়ে নেবে পাঠককে -
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। দ্বিধা না করে মতামত দিন