বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • ভ্যারাইটি স্টোর্স

    Sunetra Sadhu লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৯ জুলাই ২০২২ | ৯৮৯ বার পঠিত
  • বেহিসেবি গরম পড়েছে, সরকার বাবুর শরীরের ভাবগতিক  অনেকটা প্যাঁচ ভাঙা করপোরেশনের কলের মতো, গল গল করে ঘাম বেরিয়েই যাচ্ছে।দু'মিনিট আগেই লোকাল ট্রেনটা গন্ডা খানেক মফস্বলী অফিস যাত্রীকে উগরে দিয়ে বেরিয়ে গেল।যাদের বাড়ির আর নাড়ির টান আছে তারা দুদ্দাড়িয়ে ছুটল।যাদের নেই তারা একহাতে চায়ের ভাঁড় অন্য হাতে একটা লেড়ো বিস্কুট নিয়ে সুড়ুত সুড়ুত চুমুক মারল।সবে লেড়ো বিস্কুটে একটা কামড় দিয়েছেন অমনি বিজ্ঞাপনটা সরকার বাবুর নজরে পড়ে গেল। ‘কানাই ভ্যারাইটি স্টোর্স’ রাগে দাঁত কিড়মিড় করে মনে মনে বললেন , এইখানেও! এই ‘কানাই’ কোথাও এতটুকু শান্তি দেবেনা! 

    আজকাল ‘ভ্যারাইটি’ শব্দটার উপরে সরকার বাবুর ঘেন্না ধরে গিয়েছে ।শহরে মফস্বলে পথে ঘাটে যেখানেই ভ্যারাইটি স্টোর্স দ্যাখেন রাগে গা পিত্তি জ্বলে যায়।এসব দোকান হল গিয়ে একখানা ব্ল্যাক হোল।যত পয়সাই ঢালো না কেন ঠিক শুষে নেবে। তারপর মহাকাশের মতো খালি মানিব্যাগ নিয়ে ঘুরে বেরানোই ভবিতব্য। অথচ কিছুদিন আগেও জীবনটা এতটা ঝাঁ-চকচকে ছিল না।সরকারবাবুদের মফস্বলী পাড়ায় ‘কনক ভান্ডার’ বেশ রমরমিয়েই চলত।স্বল্প স্টক, বাঁধা প্রয়োজন, ফলে মাসের শেষেও মানিব্যাগটা বেশ পুরুষ্টই থাকত।দিন দ্রুত বদলাচ্ছে,তাদের মফস্বলের গায়ে এখন শহরের গন্ধ।ভুঁইফোড় ফ্ল্যাটের কল্যাণে আকাশটা ছোট আর মানুষের প্রয়োজনের বহরটা বেড়ে গেল।সেই সুযোগটাই নিল ওই ধান্ধাবাজ কানাই।সরকার বাবুর বাড়ি থেকে দুপা দূরেই বড়-সড় ‘ভ্যারাইটি স্টোর্স’ ফেঁদে বসল।কয়েক মাস যেতে না যেতেই সে ব্যবসা পাঁউরুটির মতো ভসভসিয়ে ফুলেও উঠল।সরকার বাবুর জীবন এখন ‘কানাই’ময়। রান্নাঘরে কানাই,ঠাকুরঘরে কানাই,শোবারঘরে কানাই এমনকি বাথরুমে পর্যন্ত কানাই ঢুকে বসে থাকে।বগলে সাবান ঘষতে ঘষতে কতবার সাবানের গলাটা টিপে দিতে ইচ্ছে করেছে সরকার বাবুর, পারেন নি। সাবান রূপি কানাই মায়া মৃগের মতো পিছলে পিছলে পালিয়ে গিয়েছে। অথচ সাবান তো আর নিজে হেঁটে বাথরুমে আসেনি। তিনি নিজে কানাইয়ের দোকান গিয়ে কিনে নিয়ে এসেছেন।

    কানাইটা এমন ঝানু ব্যাবসাদার যেন মার্কেটিং স্ট্র্যাটিজি গুলে খেয়েছে। সরকার বাবু মন দিয়ে লক্ষ্য করেছেন লোকটা দুটো চালে খেলে। এক; সে জানে খদ্দের লক্ষ্মী।  ঠিক কোন বুলিতে কোন খদ্দের কাৎ হয় সেটা নখদর্পনে। আর দুই হল গিয়ে ভ্যারাইটি। দোকানে কি না নেই! আলপিন থেকে উড়োজাহাজ সবই মেলে । উড়োজাহাজটা একটু বাড়াবাড়ি হল ঠিকই তবে প্রায় উড়োজাহাজের সাইজের অ্যালুমিনিয়ামের ট্রাঙ্ক সত্যি পাওয়া যায়। চাইলে সেই ট্রাঙ্কে পুরো সংসার এঁটে যায়। মেয়ের বিয়ে। বাপ এসেছে যৌতুকের জিনিস কিনতে। একখানা একহাত বাই দু হাত সাইজের ট্রাঙ্ক হলেই কাজ চলে যায়। সেই মেয়ের বাপকে জাম্বো সাইজের ট্রাঙ্ক গছিয়ে দেওয়া কানাইয়ের বাঁয়ে হাত কা খেল। শুরুটা অনেকটা এইরকম হয় “আপনার চাকুরে জামাই; বদলির চাকরি,আজ এখানে কাল ওখানে, সংসারে মালপত্র  কি কম!দেখবেন এই ট্রাঙ্কখানা কেমন কাজে লাগে।”  মেয়ের বাপও মন্ত্র মুগ্ধের মতো ট্রাঙ্ক কিনে বাড়ি রওনা দেয়। আদৌ জামাইয়ের বদলির চাকরি কিনা তাও জানা হয়নি হয়তো। তবে জামাই চাকুরে না হয়ে ব্যবসাদার হলেও ওই ট্রাঙ্ক মেয়ের শ্বশুর বাড়ি যেতই…. 

    সরকার বাবুর রাগটা সেইখানেই। এতবছর মার্কেটিং কোম্পানির জোয়াল টেনেও লাভের লাভ কিছুই হল না।সেদিনের ছোকরাদের স্যার বলে ডাকতে হয়, অথচ একটা এইট পাশ ছেলে তার নাকের ঢগায় রোজ বিজনেস স্ট্র্যাটেজির বল নিয়ে জাগলিং দেখাচ্ছে! ঘেন্না ধরে গেল জীবনে।গিন্নির কাছে আক্ষেপ করলে গিন্নি শুনিয়েছে “গাধাকে কখনো ঘোড়া হতে দেখেছ?”  এই নিয়ে প্রতিবাদ চলে না, চললেও সরকার বাবু করতেন না। মৌনি সাধুর মতো মুখ বুজে থাকা  অভ্যাস হয়ে গেছে। আসলে তাদের পরিবারে সব কথা ওই গিন্নিই বলে, আর কাউকে লাগে না।বোবার কোনো শত্রু নেই এই আপ্ত বাক্য সরকার বাবুর জীবনের মূল মন্ত্র।কে বলেছে ওনার রাগ নেই? আলবাৎ আছে।অন্তঃসলিলা নদীর মতো প্রবাহিত হয় বলে চোখে পড়ে না। ওই নদীতে কানাইকে তিনি দুবেলা ডুবিয়ে মারেন।অথচ কানাই ভ্যারাইটি স্টোর্সের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। যেন দোকান নয় , যন্তর মন্তর ঘর।আর উনি কানাইয়ের হাতের পুতুল…

    বাড়ি ঢুকে ব্যাগটা নামিয়েই বাথরুমে ঢুকবেন,গিন্নির হুকুম যাও কানাইয়ের দোকান থেকে দুটো পেন্সিল ব্যাটারি নিয়ে এসো।অমান্য করবেন এত ক্ষমতা সরকার বাবুর নেই।এককালে বাপ মায়ের বহু কথা অমান্য করেছেন। সেই অভিশাপেই বোধহয় এমন একপিস বৌ কপালে জুটেছে…

    সরকার বাবু  পেন্সিল ব্যাটারি কিনব বলে দোকানে গেলেন ঠিকই কিন্তু ফিরলেন এক শিশি বাদামের শরবত আর এক প্যাকেট নাম না জানা কোম্পানির ডিটারজেন্ট নিয়ে। নেবার সময় “মাসের শেষ”, “এই কোম্পানির ডিটারজেন্ট ব্যবহার করিনা” , “শরবত কে খাবে” এই জাতীয় অনেক কথাই তুলেছিলেন  কিন্তু শেষ পর্যন্ত নানা মিষ্টি কথায় ভুলিয়ে জিনিস দুটো কানাই গছিয়েই ছাড়ল । শেষ অস্ত্র ছিল টাকা।  সরকার বাবু সেকথা  তুলতেই  কানাই বলে উঠল “চেয়েছি কখনো?”
     
    তা সত্যি। টাকার তাড়া কক্ষনও দেয় না কানাই। কিন্তু যেতে আসতে এতবার “দাদা ভালো আছেন তো?”  বলে যে দিন দুয়েকের মধ্যে টাকাটা না দিতে পারলে শান্তি হয় না। দিয়ে দিলে কুশল জিজ্ঞসা প্যারাসিটামল খাওয়া জ্বরের মতো দুম করে কমে যায়। আজ ডিটারজেন্ট আর বাদাম শরবতের সঙ্গে একটা গোলাপ-গন্ধী সাবানও গছালো,  বলল “বৌদি গোলাপের গন্ধ খুব ভালবাসে। নিয়ে যান।”

    সরকার বাবুর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, বৌদি গোলাপের গন্ধ ভালবাসে তুই কি করে জানলি রে হতচ্ছাড়া? কথাটা মনে এলেও মুখে বলা হল না। বললেন “না থাক সাবান আছে।”
     
    “আরে আপনি নিয়ে যান , পছন্দ না হলে আমি তো আছিই,  ফেরত দিয়ে যাবেন।” কানাই  বোঝে ওই সাবান হল আসন্ন দাম্পত্য কলহের ঢাল। বৌদির মনটা একমাত্র সাবান দেখেই নরম হতে পারে। নইলে গছানো দুটো জিনিসই ফেরত আসার প্রবল সম্ভাবনা। 

    বাড়ির দরজায় কড়া নেড়েই সরকার বাবুর মনে হল এই যাঃ! ব্যাটারিটাই তো আনা হয়নি। আবার দোকানে ফিরবেন ভাবতেই দরজাটা খুলে গেল। অন্যদিন বেল বাজিয়ে পাক্কা পাঁচটা মিনিট অপেক্ষা করতে হয়। অত বড় শরীরটা নিয়ে গিন্নি গদাইলস্করি চালে থপথপ করতে করতে এসে দরজা খোলে । এই নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছ কি মরেছ। আগ্নেয়গিরির মতো গলগলিয়ে গালাগাল বেরিয়ে আসবে। “এতটুকু তর সই না মিনষের! যেন পয়সা দিয়ে দারোয়ান পুষেছে। ঘন্টি বাজালে নাচতে নাচতে খুলতে হবে। আমি কি উড়ে আসব? হাঁটার সময়টুকু দেবে না? ঘরে কি এমন রাজকাজ্জ আছে শুনি!” 

    আজকাল তাই মুখ বুজে থাকেন সরকার বাবু। তার অবস্থাটা বিরিয়ানির আলুর মতো। না থাকলে পাতটা খালি খালি লাগে আবার থাকলে খুব কম লোকে সে আলু ভালোবেসে খায়। ওই পাতে গড়াগড়ি খাওয়াই ভবিতব্য।  আজ সঙ্গে সঙ্গে দরজা খুলল।  “কই দাও।” বলে গিন্নি হাত পাতল। 

    ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সরকার বাবু বলে ফেললেন “কি দেব?”
     
    “আ মোলো যা,  ঘোড়ারোগ হল নাকি? ব্যাটারিটা দাও। এই এক হাড়জ্বালান টিভি হয়েছে রিমোট ছাড়া চালু হয় না। রিমোটটাও তেমনি অগস্ত্য মুনির মতো শুধু ব্যাটারি শুষেই চলেছে ওদিকে আজ ললিতার বিয়ে। ওর বজ্জাত কাকীমাটা বিয়ে ভন্ডুল করে দিল কিনা কে জানে!”

    সবসময় মুখ খুলতে নেই জেনেও সরকার বাবু জিজ্ঞেস করে ফেললেন “কে ললিতা? তোমার মাসতুতো বোন?” 

     ব্যাস, হিরোশিমায় পরমাণু বিস্ফোরণে এতটা আওয়াজ হয়েছিল কিনা জানা নেই প্রচন্ড চিৎকার করে সরকার গিন্নি বলে উঠল “তুমি ঘরে ঢোকো তোমার হচ্ছে। মিটমিটে শয়তান, এমন ভাব করে যেন মেয়েদের দিকে মুখ তুলে চাইতে পারে না। এদিকে আমার মাসতুতো বোনকে এখনো মনে আছে! আরো তো বোন আছে আমার, মামাতো,  খুড়তুতো কই তাদের তো মনে নেই!  সেই বিশ বছর আগে দেখেছে! ডাগরডোগর শালিকে এখনো ভোলেনি! আমি বলছি অগ্নিপরীক্ষা সিরিয়ালের ললিতার কথা আর উনি কিনা…..

    “কই ব্যাটারি দাও।”

    “ব্যাটারি তো আনিনি।”

    “মানে! গেলে তো তাই আনতে। হাতে এসব কি?” 

    “কানাই গছিয়েছে, বলল বাজারের এক নম্বর বাদাম শরবত আর এই হল গিয়ে নতুন ডিটারজেন্ট, এক চামচে এক গামলা কাপড় কাচা যায়।” 

    “তোমাকে ভাতের বদলে গেলাস গেলাস বাদাম শরবত গেলাব। তারপর  গামলায় ডুবিয়ে  আছাড় মেরে মেরে কাচব। কানাই যা গছাবে তোমাকে আনতে হবে! যাও ফেরত দিয়ে এসো। না পারলে বলো আমি গিয়ে জিনিস কটা ওর মুখে ছুঁড়ে দিয়ে আসি। এই যে, ওইটা? ওইটা কি?  লুকোচ্ছো? ”

    সাবানটা বার করার সাহস হয়নি, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লুকিয়ে রাখতে পারলেন না। দেখে কি বলবে কে জানে! কাঁপা কাঁপা হাতে জিনিসটা বার করে বললেন, 
    “সাবান, কানাই দিল। বলল বৌদি গোলাপের গন্ধ পছন্দ করে। বাজারে নতুন এসেছে।”
    জিনিসটা  দেখে ঝুপ করে শান্ত হয়ে গেল সরকার গিন্নি, যেন সাবান নয় পীর বাবার মন্ত্রপূত তাবিজ। একবার শুঁকে বলল “যাও দুটো ব্যাটারি নিয়ে এসো। আজকাল বড্ড ভুলো মন হয়েছে, মন কোথায় থাকে কে জানে!” কথা গুলো বলল ঠিকই তবে বোতল খুলে রাখা কোল্ড ড্রিঙ্কসের মতো ঝাঁঝহীন মিষ্টি  শোনালো। 

    আজকের মতো ফাঁড়া কেটে গেছে।সরকার বাবু আবার কানাইয়ের দোকানে ফিরলেন, বললেন “ব্যাটারিটা?”

    হাতখালি সরকার বাবুকে দেখে নিশ্চিন্ত হল কানাই, যাক জিনিস কটা ফেরত আসেনি। এইবার পরের চাল খেলল। দুখানা ব্যাটারি হাতে দিয়েই বলল, “আপনি আবার সাত তাড়াতাড়ি টাকা দিতে এলেন! বললাম না তাড়া নেই, সময় বুঝে দেবেন। কি যে করেন না। আপনাকে নিয়ে আর পারা যায় না।”
     
    এই কথার পরে টাকা না দিয়ে থাকবেন এতটা নির্লজ্জ সরকার বাবু এখনো হতে পারেন নি। মাসের  শেষ,  কিনতে এসেছিলেন বারো টাকার ব্যাটারি অকারণেই চারশো বাইশ টাকা বেরিয়ে গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত সৈনিকের মতো বাড়ি ফিরে ধপাস্‌ করে সোফায় বসলেন।ললিতার বিয়ে আটকায় নি, সবাই খুব উলু দিচ্ছে।গিন্নির মুখটা হাসি হাসি যেন ললিতার নয় ওরই বিয়ে হচ্ছে।ললিতার বরটাকে দেখে বেজায় হিংসে হল সরকার বাবুর।নিজের রুটি আর ঢেঁড়শ ভাজা খাওয়া চেহারাটাকে চিতেয় তুলে দিতে ইচ্ছে হল। এদিকে ললিতার কাকীমাটা থেমে নেই, প্যাঁচ কষছে। গিন্নীর মুখটা থমথমে।কাকীমাটাকে হাতে পেলে দু চড়ে জব্দ করে দেবে।এই থমথমে পরিবেশেও সরকার বাবুর নাকে  গোলাপের গন্ধ এসে ঝাপটা মারল। দেখলেন সেন্টার টেবলে পড়ে থাকা সাবানটা  তার দিকে জুল্‌ জুল্‌ করে তাকিয়ে আছে।খুব ইচ্ছে করছে ওইটা দিয়ে ঘষে ঘষে চান করেন, কিন্তু ইচ্ছে করলেই তো হল না, মার্গো ছাড়া অন্য সাবান ব্যবহার করার হুকুম নেই।গোলাপ গন্ধে মেয়েদের অধিকার যেন একচেটিয়া,অথচ সরকার বাবু পুরুষের গোলাপ প্রীতির অসংখ্য উহাহরণ দিতে পারেন।ইতিহাস বইয়ের সমস্ত ছবিতে শাজাহানকে গোলাপ হাতে বসে থাকতে দেখেছেন।নেহেরুর কোটের পকেটে লাল গোলাপ থাকত না? মনে মনে যুক্তি সাজাতে সাজাতে বাথরুমে ঢুকলেন। 

    স্নান সেরে বেশ ফ্রেস লাগছে।ঘাড়ে বগলে বেশ করে পাউডার থুপছিলেন ,দেখে গিন্নি বলল “খুব তো দুবেলা বগলে পাউডার থুপছ, কাকে শোঁকাও?” 

    “তুমিও তো তিনবেলা থোপো ,তুমি কাকে শোঁকাও?”  সরকার বাবুর ঠোঁট দুটো নড়ল ঠিকই ,আওয়াজ বেরোলো না। খাবার টেবিলে বসে ভাবলেন গিন্নির সঙ্গে কথা হয়না একটু গল্প করা যাক।রুটি আর ঢেড়শ ভাজা মুখে চালান করে বললেন “কাকীমাটা হেব্বি ধান্দা বাজ।”

    “কি! তুমি আমার কাকীমাকে ধান্দাবাজ বললে? তার মানে বাথরুমে ঢুকেও এদিকে কান দিয়ে বসে থাক? যেই শুনেছ কাকীমা ফোন করেছে, ভাই আজ রাতে আসছে অমনি কাকীমা ধান্দাবাজ হয়ে গেল?”  

    “আমি তো ললিতার কাকীমার কথা…”

    “একদম চুপ , ওই চিমড়ে চেহারা দেখলে কে বুঝবে তোমার পেটে পেটে এত শয়তানি?” 
    ঝগড়া চলছে। সরকার বাবু খুব মনোযোগ দিয়ে গিন্নির স্বর যন্ত্রের কারিকুরি লক্ষ্য করছেন।এককালে তিনিও ডোভার লেনে বসে ঢুলেছেন এবং নিরবচ্ছিন্ন আ আ  যখন অ্যা অ্যা  হয়েছে তখন চমকে  উঠেও বসেছেন। গিন্নি এই ধ্রুপদী প্রলাপের কায়দা কোথা থেকে শিখল কে জানে!  মুখ খোলা উচিত ছিল না কিন্তু কৌতুহল চাপতে না পেরে সরকার বাবু ঝপ্‌ করে জিজ্ঞেস করে ফেললেন “তোমাদের বংশে কেউ খেয়াল গাইত? ডোভার লেনে যেত?” 
    ব্যাস, হটপটের ঢাকনাটা উড়ন্ত চাকীর মতো সরকার বাবুর দিকে উড়ে এল। এককালে ভালো ফ্লাইং ডিশ ক্যাচ করতে পারতেন, ঢাকনাটা ধরে ফেললেন। বললেন দুহাত লোফালুফি হয়ে যাক! বাড়িতে বাজ পড়ত কিন্তু কলিং বেলটা বেজে ওঠায় ফলস ফ্ল্যাশ হল। ভাই এসেছে, জ্বালামুখী মহিলা নিমেষে কাদা। শালার কি মহিমা! ভাইটাকে দুচক্ষে দেখতে পারেন না সরকার বাবু, ডেঁপো ছোকরা! রাত দুপুরে  কেন এল, জানার জন্য অনেকক্ষণ ধরেই ছুঁক ছুঁক করছিলেন, খোলসা হল অনেক রাতে।ওই শালা কানাইয়ের মতো ভ্যারাইটি স্টোর্স খুলতে চায়। বুদ্ধিটা অবশ্য গিন্নিরই, কিছু টাক-পয়সা দিতে হবে। শুনে চেক-বুকটা ঝপাত্‌ করে টেবিলে ফেলে দিয়ে সরকার বাবু ঘুমোতে গেলেন।কালই সন্ন্যাস নেবেন। মনে মনে ঝোলাটা গুছিয়ে নিচ্ছিলেন।খান চারেক কৌপিন, একটা গামছা, একটা কম্বল,টুথব্রাশ -সবই নিলেন, শুধু একটা বোরোলীন লাগবে। হিমালয়ে যা ঠান্ডা মুখটা চড় চড় করবে না? কিন্তু বোরোলীন তো ঘরে নেই, সেই কানাইয়ের দোকানেই…

     
  • গপ্পো | ১৯ জুলাই ২০২২ | ৯৮৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নাইটো - একক
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Rajasri | 203.125.74.62 | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৩:১৮510028
  • মুচমুচে লেখা।  দারুণ লাগলো। 
  • Sunetra Sadhu | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৩:২২510029
  • খাস্তা থাকতে থাকতেই পড়েছেন, তার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। 
  • Surasree Ghosh Saha | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৪:১৪510031
  • ভালো লাগলো, গো। খুব মজা পেলুম।
     
  • Nirmalya Sengupta | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৪:২২510032
  • গোলাপ গন্ধে মেয়েদের অধিকার যেন একচেটিয়া,অথচ সরকার বাবু পুরুষের গোলাপ প্রীতির অসংখ্য উহাহরণ দিতে পারেন।ইতিহাস বইয়ের সমস্ত ছবিতে শাজাহানকে গোলাপ হাতে বসে থাকতে দেখেছেন।নেহেরুর কোটের পকেটে লাল গোলাপ থাকত না? মনে মনে যুক্তি সাজাতে সাজাতে বাথরুমে ঢুকলেন।
     
    অসাধারণ। এখনও হাসছি। laugh
  • ঋ ফ ন | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৪:২৫510033
  • দুরন্ত চনমনে লেখা। পড়ে তৃপ্তি পেলাম।
  • Kunal Ghosh | 49.37.35.138 | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৪:২৮510034
  • খুব মজা পেলাম খুব হাসলাম উপভোগ করলাম 
  • Sunetra Sadhu | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৪:৩৫510035
  • অসংখ্য ধন্যবাদ। 
  • মৌসুমী ভট্টাচার্য্য | 51.159.154.35 | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৫:০৩510036
  • বেশ লাগল
  • মন্দিরা | 2401:4900:1c5c:a30a:40fb:66d1:2307:e24e | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৫:২০510037
  • সরকার বাবুর বোরোলিন কিনতে গিয়ে আরো কি মনে পড়ল জানিও। লেখার জগতে তোমার লম্বা ইনিংসের এই তো শুরু। 
  • Sunetra Sadhu | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৫:২৩510038
  • জানাবো
  • প্রতিভা | 115.96.134.93 | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৫:৩৬510039
  • খুবই গাঢ় হাস্যরসে জ্বাল দেওয়া গল্প। সুগৃহিনীর মতোই পরিবেশনা। উপরি পাওনা গল্পের গতি আর ঝরঝরে ভাষা।
  • Sunetra Sadhu | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৫:৪৬510040
  • প্রতিভা'দি তুমি পড়লে এ আমার পরম প্রাপ্তি। 
     
  • উমা ব্যানার্জী | 2405:201:8000:20ab:ecbd:5957:f9b:e7c1 | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৬:১৬510041
  • অসাধারণ লাগলো। বাড়ি থেকে বলি বেড়োনো হয় না। বেড়োলেই সরকার বাবুর মতো যা আনতে চাই,তাই না এনে অন্য কিছু। তেমন আজ‌ই দুটো ক্যাপসিকাম কিনতে গিয়ে ৫ টা গাছ। ছেলেটা বললো "কাকীমা..বলাগড় থেকে এসেছি। খুব ফুল ফুটবে" 
    অবশ্য বাড়িতে পৌঁছে দিল। পাশের বাড়ির পুত্রসম ছেলেটি আবার বলছে.... কাকীমা ভালো কাতান বেনারসি এনেছি। এছাড়া তোমার মতন ও শাড়ি আছে। কি নাজেহাল হয়ে ঘেঁটে ঘ
  • Bhaskar Dey | 2405:201:8002:c881:8411:444d:8011:78ff | ১৯ জুলাই ২০২২ ১৭:২৮510042
  • দারুণ লেখা। 'বোতল খুলে রাখা কোল্ড ড্রিঙ্কসের মতো ঝাঁঝহীন মিষ্টি  শোনালো' । কি বর্ণনা! খুব ভালো লেখা।
  • ঊর্ণনাভ তন্তু ঘোষ | 2409:4061:4e18:efad::72ca:cd0b | ১৯ জুলাই ২০২২ ২২:০৮510051
  • অসাধারণ! এ এক্কেবারে অন্যরকম লেখা হল। খুব ভালো লাগল। 
  • | ১৯ জুলাই ২০২২ ২২:৩০510053
  • ভাল লাগল।
  • যোষিতা | ১৯ জুলাই ২০২২ ২২:৩৭510054
  • লেখার স্টাইল ভাল। বেশ ভাল। তবে গল্পটায় মেয়েদের কেমন যেন দেখানো হয়েছে। অবশ্যই এটা আমার নিজস্ব মনে হওয়া।
  • Sunetra Sadhu | ১৯ জুলাই ২০২২ ২৩:০৫510055
  • সকলকে ধন্যবাদ জানাই। আপনারা পড়লেন খুব ভাল লাগল।
  • Ranjan Roy | ২০ জুলাই ২০২২ ১৬:৫৬510076
  • আমাদের সবার মধ্যে একজন করে সরকার বাবু আছেন, ছোট আর বড়।  সবার জন্যে একজন কানাই হাসিমুখে দোকান সাজিয়ে বসে আছে। 
     
    গরমের মধ্যে এক পশলা বৃষ্টির মত লেখা। 
  • Sunetra Sadhu | ২০ জুলাই ২০২২ ১৭:০৮510077
  • @Ranjan Roy
    অসংখ্য ধন্যবাদ। 
  • শম্পা শুচিস্মিতা | 2409:4060:e9c:3620:c80e:76a7:d870:12c1 | ২০ জুলাই ২০২২ ২১:৩৪510082
  • একেবারে চানাচুরের মত জমাটি। টক ঝাল মিষ্টি।
  • Mousumi Banerjee | ২১ জুলাই ২০২২ ১৫:৪০510091
  • খুব ভালো লাগল।
  • সর্বানী ঘোষ | 2409:4060:2d97:6e1b::344a:5104 | ২২ জুলাই ২০২২ ২৩:৪১510169
  • দারুন লাগলো। আমার বাড়ির উল্টো দিকে এমন এক কানাই দার দোকান আছে, যাকে ছাড়া এলাকায় আমরা সত্যিই কানা... ই।
  • Amit | 193.116.69.148 | ২৩ জুলাই ২০২২ ০১:৫৩510171
  • সুন্দর মন ভালো করে দেওয়া গল্প। আর কি বলবো-এক্কেরে ঘরেরই গল্প। দোকানে গেলে যেটা দরকার সেটা ভুলে উল্টোপাল্টা কিনে এনে তাপ্পর ঝাড় খাওয়া প্রায় রোজকার ব্যাপার। :) :)
  • Sunetra Sadhu | ২৩ জুলাই ২০২২ ০৮:৩৪510177
  • ধন্যবাদ সকলকে...
  • তানিম দত্ত | 115.66.119.102 | ২৩ জুলাই ২০২২ ১৪:২৫510187
  • দারুণ লাগলো 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লড়াকু মতামত দিন