ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  জাদু দুনিয়া

  • নামদাফা এবং – ৬

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | জাদু দুনিয়া | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৬৪৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • | | | | ৫  | | | |
    দিবাং ভ্যালী জাঙ্গল ক্যাম্প 
     
    দিবাং ভ্যালী জঙ্গল ক্যাম্প মুখোমুখী দুটো করে মোট চারটে বাংলো কিছু তাঁবু অর্থাৎ ক্যাম্পিং টেন্ট আর দুইদিকে টানা লম্বা বারান্দা দেওয়া কাঠ ও বাঁশের তৈরী চমৎকার  একটা  ব্রিটিশ আমলের বাংলোকে কিছু সাজিয়ে গুছিয়ে কিচেন কাম ডাইনিং হিসেবে ব্যবহার হয়। মস্ত বড় ডাইনিং রুমের পরের বারান্দা, যেটা থেকে সবচেয়ে ভাল  সূর্যাস্ত দেখা যায়, দিনের অন্যান্য সময়েও সেটা অপূর্ব সব দৃশ্য সাজিয়ে বসে থাকে। নীচে যতদূর চোখ যায় দিবাং উপত্যকা আর মাঝ মধ্যে দিয়ে  দিবাং নদীর অ্যাঁকাব্যাঁকা বেশ কয়েকটা ধারা কখনো নীল, কখনো রূপোলি হয়ে বয়ে চলেছে, পাহাড়ে থেকে ধাপে ধাপে নেমেছে কমলালেবু গাছের ঝোপ আর নানা রঙবেরঙের পাখি। কিন্তু এবারে লেবুর ফলন বেশ কম। আর শুনলাম বেশ কিছু গাছ কেটেও দেওয়া হয়েছে, আরো ঘর তৈরী হবে প্রচুর পর্যটক আসছে আজকাল এদিকে। ওদিকে জাঙ্গল ক্যাম্পের পোষ্য এক দুরন্ত কুকুরছানা কেবলই সবার পায়ে ওর সামনের দুই পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে কোলে চড়ার চেষ্টা করে চলেছে, জুতো মোজার  প্যান্ট পাজামার ফাঁকে একটু আধটু খোলা চামড়া পেলেই টুক করে চেটে দিচ্ছে ছোট্ট টুকটুকে জিভখান বের করে। কাল্লু, কালুয়া, ব্ল্যাকি, বাচ্চা ইত্যাদি বিবিধ নামের সেই বাচ্চা খেলতে চায় সবার সাথে সবসময়। 
     

    কাল্লু দ্য গ্রেট 
     
     
    কমলালেবু গাছের ফ্রেমে দিবাং উপত্যকা 
     
    এই জাঙ্গল ক্যাম্পে থাকা খাওয়ার যা দাম সেই আন্দাজে খাবার অতি সাধারণ, স্বাদেও মানেও। অথচ রোয়িং শহর দশ কিলোমিটারের মধ্যে এবং রোয়িং  জেলাসদর,  নর্থ ইস্টার্ন ফ্রন্টিয়ারের শেষ শহর হওয়ায় যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, ফলে খাবার দাবার, উপকরণ সহজলভ্যই। তবে প্রাতরাশে এদের বাগানের কমলালেবুর রসটা সত্যিই চমৎকার, একদম টাটকা, সুস্বাদু। আজকে প্রথমে আমরা যাবো মায়োদিয়া পাস, সেখান  থেকে ফিরে  অরুণাচল থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যাব ডিব্রু শোহাকিয়া। আজ সকলেই একটু ঢিলেঢালা, প্রাতরাশ সেরে কাল্লুর সাথে ফোটোসেশান করেটরে তারপর রওনা। খানিক এগোতেই রোদ্দুর মুছে গিয়ে মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ। গতকাল সন্ধ্যের পরেও আকাশ খানিক মেঘলাই ছিল, ফলে এখানে আর তারা টারা দেখা যায় নি তেমন। লোয়ার দিবাঙের জেলাসদর হওয়ায় রোয়িং বাজার  মোটামুটি জমজমাট এলাকা, চওড়া রাস্তার দুপাশে দোকান ফুটপাথও আছে। প্রস্তাবিত সুপার ফাস্ট ন্যাশনাল হাইওয়ে এই বাজারের ওপর দিয়েই যাবার কথা, একপাশে একটা বোর্ড লাগানো দেখলাম।  রোয়িঙের আদিবাসিন্দা মূলতঃ ‘আদি’ আর ‘মিশমি’ এই দুই জনজাতির মানুষ। সেই যে ‘মিশমিদের কবচ’, সেই মিশমি।  রোয়িং শহরটাই একদম মিশমি পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত।  
     

    দিবাং উপত্যকা - মায়োদিয়ার পথে যেতে 

    দেবানে বসে যতই আমরা মায়োদিয়া পাসে বরফ পড়ার কথায় ঠাট্টা করে থাকি না কেন, এখানে এসে জানলাম মোটামুটি নভেম্বর থেকে মার্চ অবধি মায়োদিয়া পাসে দফায় দফায় বরফ পড়ে, উচ্চতাও  আমাদের দার্জিলিং তো বটেই  লাভা’র চেয়েও বেশ খানিকটা উঁচু, ৮৭১১ ফিট। রোয়িং থেকে দূরত্ব ৫৬ কিলোমিটার হলেও উচ্চতা বাড়ে প্রায় সাড়ে সাতহাজার ফিট ফলে ঠান্ডাও বেশী সেখানে। পথে যেতে বেশ কয়েকটা পয়েন্ট থেকে অতি বিস্তৃত দিবাং উপত্যকার চমৎকার ভিউ পাওয়া যায়। মেঘলা আকাশ। ছবি তেমন ভাল আসে না তবু টুকটাক নেওয়া হয়। মায়োদিয়া পাসে পৌঁছাবার  ঠিক আগের বাঁক থেকে কোনও  একটা পাখি দেখে দুজন সহযাত্রী বেজায় উত্তেজিত,  গাড়ি থামতে না থামতেই হুড়মুড়িয়ে নেমে ধারে খাদের দিকে দৌড়ায় দুজনে। আমি দেখি একটা সাদায় কালোয় মেশান পাখি মাটির সামান্য কিছু উপর দিয়ে লাফিয়ে ভেসে যাচ্ছে এদিক ওদিক। যদিও পাখি টাখি আমি বিশেষ চিনি না কিন্তু এরকম নিছক সাদাকালো একটা পাখি দেখে এরা এত উত্তেজিত কেন রে বাবা! অন্য গাড়ি থেকে রূপমও দেখি হন্ত দন্ত হয়ে যাচ্ছেন। আমিও হাঁটা লাগাই। ইতিমধ্যে ওর জোড়াটাও এসে পাশে পাশে ভেসে যাচ্ছে। এত লোকজন, বাগানো ক্যামেরা দেখেই বোধহয় পাখিদুটো রাস্তার ধার থেকে উড়াল দিয়ে নীচের ঝোপে মিলিয়ে গেল, আর অমনি সামনেটা রঙে রঙে ঝলমলিয়ে ঝলকে উঠল। 

    রেনবো টেল ম্যাগপাই’এর ঠিকঠাক  ছবি নিতে না পেরে উপস্থিত  পাখিয়ালরা ভারী মুষড়ে পড়ে, আমি অবশ্য ওই এক ঝলকের উড়ান দেখেই বাকরুদ্ধ। আহা এর পরে আসলে বাইনকুলারখানা নিয়ে আসবো। সাদা কালো পাখিটা ডানা আর ল্যাজের অত রঙ  কেমন চুপটি করে লুকিয়ে রাখে দেখো দিকিনি। মায়োদিয়া পাস পেরিয়ে রাস্তা যায়  আনিনি পর্যন্ত, কিন্তু তার আলাদা পারমিট লাগে। পথে  সামান্য ঘুরে  যাওয়া যায় মেহাও অভয়ারণ্য, মেহাও লেক। সেসব জায়গা আমাদের তালিকায় ছিল না, আসতে হবে পরে। মেহাওতে নাকি রেড পান্ডা একেবারে  স্বাভাবিক পরিবেশে দেখার সম্ভাবনা যথেষ্ট।  মায়োদিয়া পাসের পৌঁছোবার পথ একেবারে সাধারণ পাহাড়ি  ঘাট যেমন হয়, যথেষ্ট ঘোরানো বটে কিন্তু হেয়ার পিন বেন্ট তেমন নেই। রত্নগিরি আর আম্বোলিঘাটে বছরে একবার দুবার করে যাতায়াত করা আমার পক্ষে মায়োদিয়ার রাস্তায় তেমন অসুবিধে হয় নি। কিন্তু  এক সহযাত্রীনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। যাবার সময়ে যদিও প্রায় হেলে শুয়ে গেলেন ফেরার সময় অবস্থা ঘোরালো হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় বার দুই তিন গাড়ি দাঁড় করাতে হয় ওঁর অসুস্থতার জন্য। আমাদের সঙ্গে অ্যভোমিন জাতীয় কোন অষুধ বা আদা লেবু নুনের জলও ছিল না। 
     


    মায়োদিয়া পাসে একটা ছোট্ট চা কফির দোকান আর একটা ঘোর অন্ধকার শৌচালয় আছে। বাইরে বড় ড্রামভরা জল, যে কোন পাহাড়ি রাস্তায়ই যেরকম ব্যবস্থা থাকে আর কি। এই কফির দোকানটা সম্পর্কে ট্রিপ অ্যাডভাইজারে বেশ ভীতিপ্রদ অভিজ্ঞতার উল্লেখ আছে বটে, আমরা কিন্তু ভারী অমায়িক ব্যবহার আর বেশ খাসা কফি পেলাম। খেয়েদেয়ে রওনা, কিন্তু আবারও সেই কালকের দুজন নাপাত্তা। এই জায়গাটা ছোট এবং খোলামেলা অতএব আমরা ফিরতি পথে রওনা হই। এবং গাড়ির চাকা পাঁচবার ঘুরেছে কি ঘোরেনি দেখি ওঁরা আসছেন। আবারও ঝড়ঝঞ্ঝা বজ্রপাত, কেউ নাকি  বলে নি সবাই মিলে কোথায় যাচ্ছে। এদিকে একটা সোজা রাস্তা, সেটা ছাড়া আর যাবার জায়গাই বা কই! কিন্তু সেসব শুনলে তো। ফেরার পথে অরুণাচল থেকে বেরোবার ঠিক আগে এক জায়গায় দাঁড়ানো হয়। যাঁরা মদ্যপায়ী তাঁরা নানান বোতল কিনে নেন, সাথে ক্যাশমেমোও। অরুণাচলে নাকি অন্যান্য জায়গার থেকে অনেক কম দাম তাই বাড়ি নিয়ে যাবার জন্য কেনেন।  এদিকে আমার পেয়েছে বেদম খিদে। করিমভাই তাড়া দিয়ে গাড়িতে তোলেন, নাকি খাবার জায়গায় আগে নিয়ে যাবেন। ওবাবা কোথায় কি! খানিক এগিয়ে একটা ইস্কুল বা  অফিস কিছু একটার  লম্বা বারান্দার সামনে গিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ে। 
     

    হাট বসেছে পথের ধারে 
     
    ছোট্ট একটা হাট বসেছে, বিক্রেতা অধিকাংশ মহিলা। সাথে কিছু পুরুষ আছে সহকারি হিসেবে।  প্ল্যাস্টিকের বয়ামে ভরা ঘিয়ে রঙের লম্বা লম্বা দন্ডের মত জিনিষগুলো দেখিয়ে জিগ্যেস করি কী ওটা? শুনি ‘বসটেঙ্গা বসটেঙ্গা বহুত আচ্ছা। লে যাও’। টেঙা বা টেঙ্গা ত টককে বলে জানি, বসটেঙ্গা কী বস্তু রে বাবা? আমার বিভ্রান্ত মুখ দেখে একটি অল্পবয়সী মেয়ে ফিক করে হাসে তারপর বলে ব্যাম্বুশ্যুট। ইতোমধ্যে করিমভাই এসে গেছেন পাশে, ব্যাখ্যা করে যা বলেন তাতে বুঝি বাঁশের অঙ্কুর দুই সপ্তাহ ধরে গাঁজিয়েছে, ফার্মেন্টেড ব্যাম্বুশ্যুটের নাকি খুব চাহিদা। সে বস্তু নিয়মিত  রান্না করে খেলে  পাঁচালির ভাষায় যাকে বলে অপুত্রকের পুত্র হয় নির্ধনের ধন। ৪০ টাকা করে এক একটা বয়াম। ভাস্বতীদিরা নেন একটা, আমাকেও বলেন কিন্তু আমি সাহস পাই না নিতে। আর বিক্রি হচ্ছে কমলালেবু। ছোট ছোট বাঁশের টুকরিতে দশটা করে লেবু। এমনিও দশটা দশটা করে গোছ করে রাখা আছে। সহযাত্রীরা মহোল্লাসে দরাদরি করেন। ঘুরে ঘুরে দেখি, স্থানীয় দু’একজন সাইকেল চালিয়ে এসে স্কোয়াশ, লঙ্কা, বেগুন ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য্য সবজি কিনে নিয়ে যান। শৈলেনদা এক টুকরি লেবু কেনেন, যত্ন করে টুকরির মুখের বেত শক্ত করে বাঁধেন যাতে লেবু গড়িয়ে না পড়ে যায়। 
     

    বসটেঙ্গা 
     
    রোয়িঙের সবচেয়ে কাছের ট্রেন স্টেশান হল আসামের তিনসুকিয়া। রোয়িং  আর তিনসুকিয়ার মধ্যে দিয়ে বয়ে গেছে মস্ত চওড়া ব্রহ্মপুত্র নদী। আরো নির্দিষ্ট করে বললে লোহিত নামক ব্রহ্মপুত্রের উপনদীটি।  এরপরে ডেব্রু শোহাকিয়ায় পৌঁছে লোহিত দিবাং ও সিয়াং মিলবে একসাথে। ২০১৭ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র পেরোতে হত নৌকোয় বা  লঞ্চে, আর বর্ষার ব্রহ্মপুত্র নৌকোয় পেরোন এক অভিজ্ঞতা বিশেষ। তিন থেকে সাড়ে চার ঘন্টা পর্যন্ত লেগে যেত এপার থেকে ওপারে যেতে। ২০১৭র মে মাসে খুলে যায় ভুপেন্দ্র হাজারিকা সেতু, অতি সহজ হয়ে যায় রোয়িং তিনসুকিয়া যাতায়াত। উত্তর আসাম আর পূর্ব অরুণাচলের মধ্যে এই প্রথম সড়কপথে যোগাযোগ শুরু, সেতুটা ঢোলা-সদিয়া সেতু নামেও পরিচিত। এই সদিয়া জায়গাটা আবার আসামের চুতিয়া রাজত্বের রাজধানী ছিল। আসাম আর অরুণাচলের এই অংশের  চুতিয়া রাজ্যের সাথে অহোম রাজের সংঘাত বাধে, ১৫২৩ নাগাদ চুতিয়া রাজের পতনের পরে অহোম রাজ দখল করে ঢোলা, সদিয়া অঞ্চল। সাড়ে নয় কিলোমিটার লম্বা এই ব্রীজ গাড়িতে পেরোতে সময় লাগে প্রায় সাত থেকে আট মিনিট। দুপুরের ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে নদীর জল অ্যালুমিনিয়াম পাতের মত বিছিয়ে থাকে, ঝলকায়। ডিসেম্বরের এই সময় জায়গায় জায়গায় চড়া। 

    ব্রীজ থেকে নেমে গাড়িদুটো অবশেষে গিয়ে দাঁড়ায় এক খাবার দোকানের সামনে, খেম ধাবা। পেটের মধ্যে ফুটবল খেলে খেলে ছুঁচোরাও ততক্ষণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রেস্টুরেন্টটা ভালই। বোরোলিয়া মাছ নিতে বলে আমাদের। উত্তরবঙ্গের পুঁচকে পুঁচকে বোরোলি মাছ এখানে বেশ লম্বা, প্রায় সরপুঁটির সাইজ এক একটা।  মাছভাজা আছে, ঝোল বা অন্য কোন প্রণালীতে রান্না কিছু নেই। এমন সাইজের বোরোলির কালোজিরে কাঁচালঙ্কা দিয়ে ঝোলও খাসা হত। যাক আমি ভাজাই নিই। দেবাশীস নেয় নেপুরা মাছ, স্থানীয় নাম নেপুরা। কেমন খেতে জিগ্যেস ক্রলে সুচিন্তিত মতামত দেয় ‘রুই, কাতলা মৃগেল কারো মত খেতে নয়। বাটা মাছের মতও নয়।‘ লাও ঠ্যালা! এবারে কি এক এক করে তাবৎ মাছের নাম জিগ্যেস করে নেতি নেতি করে পৌঁছাতে হবে?  পরে নেট ঘেঁটে দেখছি এর বৈজ্ঞানিক নাম Labio Dero,বাংলায় ‘গুড়া মাছ’। না বাপু আমি এ মাছ কখনো চেখে দেখি নি। এহ দেবাশীস অফার করেছিল, একটু খেয়ে দেখলে হত। বোরোলিয়া তো বটেই, অন্যান্য ডাল তরকারিও বেশ ভালই রান্না। রেস্টুরেন্টের ক্যাশ কাউন্টারের  লাগোয়া মনিহারি জিনিষ্পত্রের মধ্যে দেখি মুড়ি রাস্ক,  মুড়ি দিয়ে বানানো রাস্ক বিস্কুট। এখান থেকে বেরোতে বেরোতে সূর্য ঢলে গেছে। 

    ট্রিপের প্ল্যানে লেখা ছিল ডিব্রু  শোহাকিয়ায় বুনো ঘোড়া দেখার কথা। ভারতে একমাত্র এখানেই বুনো জংলি ঘোড়া পাওয়া যায়। যদিও এরা সবই এককালে ব্রিটিশ ও আমেরিকান মিলিটারির ফেলে  যাওয়া পোষা ঘোড়াদের বংশধর, খাদ্যের সন্ধানে ক্রমশ বুনো হয়ে গেছে। রূপমের কাছে শুনি এই শীতের দিনে বুনো ঘোড়া দেখা যায় না, ঘোর বর্ষায়  ব্রহ্মপুত্রের চরের জঙ্গলে দেখা যায় এবং তারা কামড়ায়, ফেরাল হর্স। দেখা না পাওয়াই ভাল। ঠিক হয়েছিল আজকের বাসস্থানে পৌঁছে আমরা লঞ্চে  করে  ব্রহ্মপুত্রে ঘুরব। সে অবশ্য হয় নি, কারণ পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় ছটা সোয়া ছটা বাজে, ঘোর অন্ধকার হয়ে যায়। পরেও হয় নি, কারণ কিছুদিন আগে এক মাজুলিগামী লঞ্চ ডুবে বহু প্রাণহানি হবার পর থেকে ব্রহ্মপুত্রে নৌকা বা লঞ্চ চলাচল বন্ধ আছে। মাজুলিদ্বীপ শুনলেই মনে পড়ে সঞ্জয় ঘোষ হত্যাকান্ড। আমাদের আজ আর কালকের  আস্তানা ব্রহ্মপুত্রের ধারে বনশ্রী ইকো ক্যাম্প। বনশ্রীর ঠিক আগের একটা বাজারে করিমভাই গাড়ি দাঁড় করিয়ে দেন, এখানে কোন দোকানে নাকি অব্যর্থ ব্যথানাশক তেল পাওয়া যায়। সমানে গাড়ি চালিয়ে চালিয়ে পায়ে এত ব্যথা হয় যে রাতে ঘুমোতে পারেন না। এই তেল আলতো করে পায়ে মেখে ঘুমিয়ে পড়লে ব্যাসস পরেরদিন সকালে ব্যথা ফ্যাথা উধাও। উৎসাহে বাকীরাও কেনেন। 

    যথারীতি কাঠ ও বাঁশের কুটির, ভেতরের আসবাবপত্রও বাঁশেরই, লাগোয়া ব্যালকনি, বাথরুম। নদীর ধার হলে কি হয় এই সন্ধ্যেবেলাটা হালকা গুমোট। উঠোনের মাঝখানে বাঁশের চালা করা, নীচে টেবল চেয়ার। একে একে সবাই প্রায় জমা হয়, আড্ডা জমে ওঠে। চায়ের সাথে পেঁয়াজি আর বোরোলি ভাজা আসে। শুনি  বনশ্রীর মালিক ‘বেণুদা’ আর বৌদি  আসছেন। আমি মনে মনে ভাবি ‘বেণুদা’ জঙ্গল ও প্রকৃতিপ্রেমী কিরকম চেনা লাগে যেন। পরে অবশ্য যিনি এলেন  তিনি দেখি পুরো ঘনাদা। সাড়ে সাতটা নাগাদ বেণুদা ও রিঙ্কুবৌদি  এসে যোগ দিলেন চালার আড্ডায়। অতঃপর আমরা জানতে থাকি বেণুদা কাল চোখ দেখাতে গৌহাটি যাবেন, যদিও উনি একসাথে সাতটা করে চশমা বানান, তবুও সাতখানাই কয়েক মাসের মধ্যে হারিয়ে ফেলেন। তা চশমা ছাড়া খুবই সমস্যা হচ্ছে। এই বনশ্রীতে তো প্রায়ই তরুণ গগৈ, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, এস এ বোবদে ছুটি কাটাতে আসে। হার্লেবেবী ওই এবড়ো খেবড়ো গেট দিয়ে হার্লে নিয়ে ঢুকে আসছে কল্পনা করেই ফ্যাক করে হেসে ফেলি আমি। ঘনাদা অদম্য,  বিভিন্ন দপ্তর ওঁকে নানা পুরস্কার দেন,  উনি আবার ফেরতও দিয়ে দেন  সেসব পুরস্কার। নামদাফায়  আর যান না এখন, জঙ্গল কেটে ফেলায় পাহাড়ের গায়ে টাক পড়ে গেছে কিনা, তাই।  

    রাত বাড়ে, বেশ ঠান্ডা লাগতে থাকে, আমরা খাবারঘরে ঢুকে জমিয়ে বসি।   ঘরের দেওয়ালে অজস্র পাখি আর প্রজাপতির ছবি। সবই এই আশেপাশে যা পাওয়া যায়, রিঙ্কু একটা কফিটেবল বই এগিয়ে দেন, ওঁদের ছেলের তোলা ছবি আর লেখা। ছেলে নাকি ছাত্র এখনো, তার মধ্যেই তাকে নাকি ইকো কনসার্ভেশান নিয়ে বক্তৃতা দিতে  ডাকে বিভিন্ন জায়গায়। আমি বইটা ভাল করে দেখতে থাকি। দাম ১৮০০ টাকা। কানের কাছে শৈলেনদা না দেবাশীস  কে যেন ফিসফিস করে ওরে ফাঁদ পাতছে পালিয়ে যা। ঘনাদা থুড়ি বেণুদা  তখন বলছেন রিঙ্কুর সাথে তাঁর প্রেমের গল্প। ‘বুzলেন আমি তো মুসলমান আর ও হিন্দু, তা রেজেস্ট্রি করেসি, হিন্দুমতে আর মুসলমান মতেও বিয়ে করেসি। তিনবার বিয়ে করেসি। তা হিন্দু বিয়ায় জিগ্যাস করে গোত্র কী? আমি বলে দিসি হিমু  গোত্র। পুরুতেও বিয়া পড়ায় দিসে।‘ এঁরা সিলেটের লোক। কবে এসেছেন সেটা অবশ্য বলেন না।  আমরা জিজ্ঞাসা করি বনশ্রী চালাতে আলফার ঝামেলা কখনো ফেস করেছেন কিনা? অতিরিক্ত জোরের সাথে বলেন নাহ কক্ষণো না, সবাই জানে উনি এলাকার উন্নতিকল্পে কিরকম কাজ করছেন, কোনও পার্টিই কখনো ঝামেলা করে নি। সহকারি ইজাজুল এসে জানায় খাবার রেডি। রান্না অতি চমৎকার। বোয়ালমাছের কালিয়া ছিল। শীতের তেলালো বোয়াল, ব্রহ্মপুত্র থেকে সেদিনই ধরা, আহা  হমীনস্ত হমীনস্ত।
      
    তারপর আর কি, পাতভরা মাছ, খাটভরা ঘুম। কাল আবার ডিহিং পাটকাই। তার আগে এক জায়গায় হুলক গিবনরা খেতে আসে সেখানে যাওয়া হবে যদি দেখা পাওয়া যায়। বেণুদা একজন গাইড দেবেন সঙ্গে, আমাদের  উল্লুক মুলুকে পৌঁছে দিয়ে সে ফেরত আসবে। 
     

    মায়োদিয়া পাস থেকে 
    | | | | ৫  | | | |
  • | রেটিং ৫ (২ জন) | বিভাগ : ভ্রমণ | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ | ৬৪৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • dc | 2401:4900:230a:d760:305d:74cd:61af:a88b | ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ২২:৩৭504162
  • এই সিরিজটা অসাধারন। আর কাল্লুমামাকেও ভালো লাগলো। 
  • স্বাতী রায় | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ১৮:১৪504172
  • এই খানে পড়ব বলে জমিয়ে রেখেছিলাম।  অপেক্ষা সার্থক। 
  • | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ২৩:২০504190
  • দুজনকেই থ্যাঙ্কু। 
     
    হ্যাঁ কাল্লু খুবই ফুর্তিবাজ। আবার এসে এসে মাচায় চড়ে কারো ঘরের বাইরে জুতো পেলে যত্ন কিরে নিয়ে বাগানে গিয়ে বসে চিবিয়ে ছিঁড়ে কুটি করার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তার।
  • kk | 2600:6c40:7b00:1231:e1f7:1ed0:987:1782 | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ২৩:৪১504191
  • হ্যাঁ, কাল্লুকে আমার ভীষণ ভালো লাগলো। এই নীল পাহাড়ের ছবিটাও খুব সুন্দর।
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০২:১৭504192
  • ছবি তা'লে আমিও এট্টু দিই। লোকেন্দ্র কি এখনো আছে?
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৩:১৭504195
  • ইন্দ্রাণী | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৩:২৬504197
  • এ লেখায় ছবির দায়িত্ব বেশি - সে-ই কথা বলছে মূলত , যোগ্য সঙ্গত করছে লেখা। নয়নাভিরাম, উপভোগ্য প্রতিটি পর্বই।
  • | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৮:২১504203
  • অভ্যুর ছবিগুলো এই ব্লগে সাঁটার উদ্দেশ্য বিধেয় কিস্যুই বুঝলাম না।
     
    কেকে, ইন্দ্রাণী, ধন্যবাদ।
  • Abhyu | 47.39.151.164 | ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০৮:৪৪504204
  • প্রথম চারটে দিবাং ভ্যালী জাঙ্গল ক্যাম্প আর পরেরটা মায়োদিয়া পাস থেকে। একই জায়গার ছবি অন্য সময়ে তোলা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন