ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • বিদায় নয়, ফিরে আসা

    Mani Sankar Biswas লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ | ৫২২ বার পঠিত


  • "একজন সন্ন্যাসী নির্জনে ধ্যান করতে চাইলেন। মনাস্ট্রি থেকে দূরে একটা হ্রদের একদম মাঝখানে চলে গেলেন তিনি একটা নৌকা করে, যেখান থেকে উপকূল আর ভালো করে দেখাও যায় না। অতঃপর, এই নির্জন স্থানে ধ্যানস্থ হলেন সন্ন্যাসী।

    কয়েক ঘণ্টা শান্ত নিস্তরঙ্গ শান্তিপূর্ণ ধ্যানের পর, তিনি হঠাৎ একটা প্রবল ঝাঁকুনি অনুভব করলেন। বুঝতে পারলেন অন্য আরেকটা নৌকা ধাক্কা মেরেছে তাঁর নৌকায়। সন্ন্যাসী ভয়ানক ক্রুদ্ধ হলেন মনে মনে। তিনি যখন ধ্যানে বসেছেন, কে তাঁকে এভাবে ধাক্কা মারতে সাহস করে! নৌকাটির আরোহীকে চিৎকার করে ভর্ৎসনা করতে যাবেন, এইসময় চোখ মেলে দেখলেন, নৌকাটিতে কেউ নেই। চালকহীন নৌকাটি ভাসতে ভাসতে হ্রদের মাঝখানে এসে তাঁর নৌকাকে ধাক্কা মেরেছে।

    সেই মুহূর্তেই ওই সন্ন্যাসীর আত্মোপলব্ধি হল, "ক্রোধ বাইরে নয়, আমার ভিতরেই ছিল। দরকার ছিল বাইরে থেকে শুধু একটা আঘাতের, একটা উত্তেজনার!"

    এর পর থেকে যখনই কেউ তাকে বিরক্ত করত, উত্তেজিত করত, তিনি শুধু একটা কথাই নিজেকে বলতেন, "ক্রোধ রয়েছে আমার ভিতরে; সামনের মানুষটা শুধুই একটা চালকবিহীন নৌকা" [থিক নাট হান ]

    চলে গেলেন থিক নাট হান (Thích Nhất Hạnh)।

    চলে গেলেন কি? মনে হয় না।

    তাঁর নিজের কথাতেই: একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম একটা গাছের পাতাকে, তোমার ভয় করছে না?...এখন তো শরৎকাল, গাছের পাতারা সব পড়তে শুরু করেছে। পাতা বলল, না-তো। গত গ্রীষ্ম আর বসন্তে আমি সম্পূর্ণ বেঁচে ছিলাম, আমি ছিলাম পূর্ণ। আমি দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করেছি যাতে করে গাছ তার প্রয়োজনীয় সূর্যালোক পায়, পুষ্টি পায়। এভাবে আমার অনেকটা অংশ এখন গাছ হয়ে গাছের সঙ্গেই রয়েছে। আমি সীমাবদ্ধ নই আমার এই পাতার জীবনে। আমি পাতা, আবার গাছও। আবার যখন আমি মাটিতে পৌঁছব, তখনও আমি আমার সারাংশ গাছকে দিতে থাকব। তাই আমার মনে কোনো আশঙ্কা নেই। আমি যখন গাছ থেকে টুপ করে ঝরে যাব, তখনও হাসিমুখেই গাছকে বিদায় জানাব, বলব, "অবিলম্বে আমাদের দেখা হবে আবার।"

    আরেকবার হান বলছিলেন: একবার আমার এক ছাত্র বলল, "আপনি এই ইহলোক ত্যাগ করলে, আপনার স্মৃতির উদ্দেশ্যে আমরা একটা সমাধিমন্দির তৈরি করতে চাই। সেখানে সংরক্ষিত থাকবে আপনার দেহ-ভস্ম"। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ছাত্ররাও প্রস্তাব করল, দেহভস্ম যে পাত্রে রাখা থাকবে, তার গায়ে লেখা থাকবে, "এখানে শান্তিতে বিশ্রাম নিচ্ছেন আমাদের প্রিয়তম শিক্ষক।"
    আমি তাদেরকে বলেছিলাম, এভাবে মন্দিরের জায়গা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। তাছাড়া আমাকে এরকম একটা ছোট জায়গার ভিতর আটকে রাখারও কোনো মানে হয় না। তবু যদি আপনারা আমার স্মৃতিতে একটা স্তূপ তৈরি না করে ছাড়বেন না বলে ঠিক করে থাকেন, তাহলে আমি বলব, সেখানে লেখা থাকুক: 'তিনি এখানে নেই'। যাতে কেউ ভুল না বোঝেন, দ্বিতীয় আরেকটি লাইনও যোগ করা উচিত: 'ওখানেও না' (বাইরের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে)। তারপরও যাতে কেউ ভুল না বোঝেন, তৃতীয় বা শেষ লাইনে লেখা উচিত: 'তিনি আছেন আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসে অথবা চলার ভঙ্গিতে।' কেননা আমার দেহ পঞ্চভূতে লীন হয়ে যাবে, কিন্তু আমি প্রবাহিত হব আপনাদের ভিতরে।

    আমার প্রত্যেকদিনের কাজের ভিতর দিয়ে আমি সবসময়ই আমার পরিপার্শ্বে আমার প্রবহমানতা অনুশীলন করেছি। বস্তুত আমাদের কারোরই উচিত নয় প্রকৃতিতে লীন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা।

    আর আপনারা যদি মনে করেন, আমি শুধুই আমার এই শরীর (এবং এই শরীরের আধারে মন), তাহলে বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনারা আমাকে সম্পূর্ণ জানতে পারেননি।

    তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তিনি বলেছিলেন, "আমি জানি না, কেন তোমরা ভাবো আমার মৃত্যু হবে। আমি কিন্তু তোমাদের ভিতর আমাকে দেখতে পাই, তোমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ভিতরও। যখন আকাশে মেঘ থাকে না, তখনও কিন্তু মেঘ থাকে, বৃষ্টি বা তুষারপাত হয়ে। মেঘের যেমন কোনো মৃত্যু হয় না...একটা মেঘ, বৃষ্টি হতে পারে, তুষারপাত হতে পারে...কিন্তু কিছুই-না হওয়া তার পক্ষে অসম্ভব। প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের কোনো আরম্ভ নেই, সমাপ্তিও না। আমি মরব না। শুধু আমার শরীর মিশে যাবে, যেখান থেকে সে এসেছিল। কিন্তু আমি থাকব, সবসময়ই।

    হান শুধু বিশ্ববিখ্যাত বৌদ্ধ-শ্রমণই ছিলেন না, তিনি ছিলেন যুদ্ধ-ক্লান্ত, হিংসা-দীর্ণ আধুনিক বিশ্বের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। বিশেষত আমার মতন যারা, প্রচলিত ধর্মবিশ্বাস নেই, তাত্ত্বিক জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দুরূহ ও জটিল বিষয়ে পড়াশোনা এবং তা উপলব্ধি করবার মতো মেধা, কিছুই নেই, তাদের জন্য তিনি একটা জানালা খুলে দিয়েছিলেন। তার জন্য কোনো বিশেষ ধর্ম, ধর্মগ্রন্থ বা মতবাদে আস্থা জ্ঞাপন করতে হয়নি আমাদের, কারও শিষ্যত্বও গ্রহণ করতে হয়নি।

    পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম জ্ঞান, হান ব্যাখ্যা করেছেন মাত্র দু'তিনটি লাইনে: অনেকেই কুয়াশার উপর দিয়ে বা জলের উপর দিয়ে হাঁটাকে অলৌকিক ভাবে। কিন্তু আমার কাছে, বায়ুমণ্ডলে ভেসে থাকা বা জলের উপর দিয়ে হাঁটা নয়, সত্যিকারের অলৌকিকতা হল, মাটির পৃথিবীতে হাঁটতে পারা। প্রতিদিন আমরা যে কতরকম অলৌকিক কাণ্ডকারখানার সঙ্গে যুক্ত থাকি, ভেবেও তার কূলকিনারা করা যায় না। নীলাকাশ, শাদা মেঘ, গাছের সবুজ পাতা, শিশুর কালো জিজ্ঞাসু চোখ, এইসব প্রত্যক্ষ করা, এ সবই অলৌকিক।

    আপনাকে বিদায় জানানো সম্ভব নয় হান, জানি আপনি এখানেই আছেন, ফিরে এসেছেন আবার। এই লেখাটাও আপনিই।
  • | বিভাগ : ব্লগ | ২৫ জানুয়ারি ২০২২ | ৫২২ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    চিঠি - Shomita Banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • ঝর্না বিশ্বাস | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ১২:৫৫503116
  • সত্যিই বিদায় নয়। খুব ভালো লিখেছেন।.. 
  • জয় | 82.1.126.236 | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ১৪:৩৯503117
  • @মনিশঙ্করবাবু
    চমৎকার লেখা। অভিনন্দন।
     
    অনন্ত জীবন। আবার দেখা হবে "তাই" (Thay- শিক্ষক)!
     
    (তিক নট হনের নিজের ক্যালিগ্রাফি)
  • ?? | 2a06:e80:1:1:bad:babe:ca11:911 | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ১৪:৫৯503119
  • এটা কোত্থেকে টোকা? এ লোকটা সব ইংরিজি লেখা অনুবাদ করে ছেপে দেয়। ঋণফিণ স্বীকার করে না। কেউ অরিজিনালটা একটু দিন গো।
  • জয়  | 82.1.126.236 | ২৬ জানুয়ারি ২০২২ ১৫:৩১503121
  • তিক নট হনের অবিচুয়ারির এভাবে তাল কাটতে দেওয়া যায় না। হাত জড়ো করে অনুরোধ। 
  • Anirvan Chattopadhyay | ৩০ জানুয়ারি ২০২২ ০০:১৬503252
  • @জয় আমার আন্তরিক ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন। 
  • kk | 2600:6c40:7b00:1231:78f4:8fa7:512e:499 | ৩০ জানুয়ারি ২০২২ ০০:৫৩503261
  • The mind can go
    In a thousand directions
    But in this beautiful path
    I walk in peace.
    With each step
    A gentle wind blows,
    With each step
    A flower blooms.

    কঠিনতম সময় গুলোতে অনেক হাত ধরেছিলেন 'তাই' (Thay)। ভুলবোনা, কোনদিন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন