• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • দেবীপক্ষ / পর্ব - ৫

    শুভংকর ঘোষ রায় চৌধুরী লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৪ অক্টোবর ২০২১ | ৫৮৩ বার পঠিত
  •  
    দুর্গানবমীর প্রায় সব শব্দই বিয়োগান্তক। যে শব্দগুলো এতদিন উল্লাসের বাতাসে ভর করে আসছিল, এখন তারাই বিষাদের বাহন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে দিকে দিকে। আজ দুপুরে নিয়োগী বাড়িতে মহাভোজ; সে উপলক্ষে সকাল থেকেই ঠাকুরদের কড়ায় ছ্যাঁকছোঁক – মাছের কালিয়া আর পাবদা-সর্ষে নামিয়ে বাড়ন্ত বেলায় বেগুনি আর ঝুরি আলুভাজার তোড়জোড়, খাবারের পাতে গরম গরম দেওয়া হবে। আরেকটা বড় কড়ায় মাছের মাথা দিয়ে মুগের ডাল সাঁতলানো, আর পাশের বড় ডেকচিতে কিছুটা কম গুরুত্ব পাওয়া ফুলকপির তরকারি। মশলার গন্ধে ঢেকে যাচ্ছে বাড়ি, পাড়া। তবু সেই সব গন্ধ, শব্দ, রঙ আজ যেন ফুরানের আগের উজ্জ্বলতা নিয়ে আসছে। তাতে আনন্দের চেয়ে বিষাদের ভার বেশি। সমর নিয়োগীর রান্নাবান্নার তদারকি করতে করতে মনে পড়ে, ছোটবেলায় – বয়স তখন নয় বা দশ হবে – বাবা প্রথম এই কাজের ভার দিয়েছিলেন তাকে। সঙ্গে অবশ্যই মেজদা ছিলেন। আজ বড়দা’র ভূমিকা যা, সে সময়ে তার জায়গায় থাকতেন বাবা, আর আজকের মেজদা’র ভূমিকায় বড়দা। সমরের স্পষ্ট মনে পড়ে এই সবকিছু; বরং যত নিকটের অতীতে আসেন তিনি, স্মৃতিগুলো কেমন লাইব্রেরির তাকের অগোছালো বইয়ের মতো লাগে। সবই আছে, কিন্তু ঠিক সাজানো নেই। কোন বছর প্রতিমার মুখ কেমন, কোন রান্নাটা খুব সুনাম কুড়িয়েছিল, ঠাকুরদের চার্জ বছর-বছর কেমন বাড়ছে, এইসব আর অতো ঠাহর হয় না। মনেও রাখতে চান না সমর। এক এক সময় এই তেল-হাতা-খুন্তির আলোড়ন সামলাতে সামলাতে খুব একা লাগে তার। হঠাৎ হঠাৎ মনে হয়, কোনোদিন যদি বাড়ির পুজো থেমে যায়? আর না হয়? তখনও যদি তিনি থাকেন? কী করবেন এই সময়টা? তিনি আগে যাবেন বরং... পুজো থামার যদি হয়, তার আগে চলে যাওয়া ভালো।
       
     অবিবাহিত সমরের চিন্তায় হেমন্তের মেঘ এক একবার ভিড় করে, আবার কেটে যায়, আবার আসে। নিচের ছোটো ছাদে রঙ্গিত আর অস্মিতা দাঁড়িয়ে কথা বলছে। সমর এমন কারুর সঙ্গে কথা বলেছিলেন কি কখনও? অনেকদিন আগে, কলেজ, বা কলেজের ঠিক পরে পরে ... মুখ মনে পড়ে না সমরের। যে মুখ ভাসে, সে দিয়ে এ বয়সে আর যোগাযোগ করতে পারেন না সেই মানুষটিকে। হয়তো এখন তার কাঁচাপাকা চুল, বা পুরোটাই পাকা? নাকি রঙ করে? কলকাতায় থাকে? না বাইরে? না পাশের পাড়াতেই? সমর তার একার শরীরে আরও একা হয়ে মনে করার চেষ্টা করেন। একটি নারীর অবয়ব আসে শুধু। এটুকুই। 
        
    দোতলার টানাবারান্দার রেলিঙের মাঝে মাঝে যে লম্বাটে থামগুলো, জমাট বাঁধা ঘোলাটে রোদের মাঝে মাঝে ওরা ছায়া তৈরি করেছে। দুপুরের ভোজপর্ব শেষে এখন বিকেল গড়াতে খানিক দেরি। নিচে, মণ্ডপে মায়ের দ্বিপ্রাহরিক শয়ন চলছে; নবমীর তুলনায় সবই যেন অস্বাভাবিক শুনশান। দূরে, পাশের পাড়ার পুজোর ঢাক বাজছে – একটানা, এক তালে। ঘুঘুর ডাকে যেমন ঘুম পায়, এই ঢাকের তালেও তেমনই। বড় বড় দুটো থামের ছায়ায় বসে আছে ঋক আর পিউ। মাসতুতো ভাই-বোন ওরা, রঙ্গিতের চেয়ে বয়সে বেশ কিছুটা বড়। ঋক থাকে ব্যাঙ্গালোরে, পুজোর সময়ে এসেছে এই বছর। অনেকবার তাও পারে না। এবার ওর আসার মূল কারণ অবশ্য পিউয়ের সঙ্গে দেখা করা। ছোটো থেকে এই বাড়িতে পুজো, আরও হাজারো অনুষ্ঠান ঘিরে ওদের বড় হয়ে ওঠা। বয়সে পিঠোপিঠি, তাই স্মৃতির বন্দরে দুজনের জাহাজই কিছুটা এক রঙের, এক স্বভাবের। এবারের পুজোর শেষে, কালীপুজোর আগেই পিউ চলে যাচ্ছে লন্ডনে, রিসার্চের সুযোগ পেয়ে। পরের বছর আসার সম্ভাবনা কম, একপ্রকার ধরেই রাখা যায়। 
       
    “তুই তো অনেকদিন ধরেই চাইছিলি এরকম একটা ব্রেক ...”
    “হুঁ, গত বছরের শুরু থেকেই চেষ্টা করছিলাম। অবশেষে!”
    “প্রপার লন্ডনেই তো তোর ইউনিভার্সিটি?”
    “হ্যাঁ হ্যাঁ, অলমোস্ট মিডল অফ দ্য সিটি বলতে পারিস।”
  • “গ্রেট। সামনের বছর তাহলে তোর নো দেখা-পাওয়া?”
    অল্প হাসে পিউ। “দেখি, যদি কোনোভাবে ...”
    “থাক! আমাকে আর গুল খাওয়াস না! আমি নিজে ব্যাঙ্গালোর থেকে বছরে দু’বার আসতে পারি কি পারি না, আর তুই লন্ডন থেকে আসবি এক বছরের মধ্যে! থাক না একটা বছর বাইরে, দ্যাখ না কেমন লাগে!”
    “ভালো লাগছে না রে ...”
    হেসে ওঠে ঋক। “ও কী! এর মধ্যেই ফুস? এই দেড় বছরের চেষ্টা এক নবমীতেই এসে মনকেমনে ঠেকে গেল?”
    “তুই তো শেষ ক’ বছর ব্যাঙ্গালোরে আছিস। তোর এই সময়টায় অসুবিধা হয় না, আসতে না পারলে?”
    “হয় তো ... অপেক্ষা করছিলাম, তুই এটা বোঝার জায়গায় যাবি, তবে বলবো।”
    “It’s easier said than done, ঋক দা। To leave this city ... and to even think that I won’t be around next time ...”
    পিউয়ের অস্থির মুখ ছায়া থেকে রোদে আসে, আবার ছায়ায় ফিরে যায়। ঋক স্থির হয়ে বোনকে দেখে। হয়তো তেমন কিছুই নয়, এই দুপুরটাও হারাবে অন্য সব দিনের মতোই, তবু শহর ছাড়া দুই ভাইবোন নিজেদের শৈশবের স্মৃতির কাছে নতজানু হয়ে বারবার আওড়ে নিচ্ছে, হাজার হোক, ঘরই কাছের, পর নয় – এ কী সবার জীবনে আসে?
       
    নবমীর সন্ধেও এসে যায় গুটি গুটি পায়ে। চাতালের ঝাড়বাতির আলোয় ঝলমলিয়ে ওঠে মায়ের মুখ, জ্বলতে থাকে শানিয়ে নেওয়া অস্ত্রের অলঙ্কার। পুরুতমশাই পুজো শেষে সন্ধ্যারতির তোড়জোড় করেন, পাশে বসে থাকেন সুদর্শন নিয়োগী। মায়ের মুখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন সুদর্শন। সোনা গলে পড়ছে সে অবয়ব থেকে। কাল দশমীর দুপুরে নিরঞ্জন হবে যখন, এই মুখই মলিন লাগবে আবার, জল যেন ম্লান করে দেবে মায়ের রূপ। বাপের বাড়ি ছেড়ে যাওয়া মেয়ের মন শোভা পাবে মৃন্ময়ী মূর্তির মুখে। দোতলায় নিজের ছোট্ট ঠাকুরের বেদিতে রাত বাড়লে গোপালকে শয়ন দেন সারদা। তিনিও এক মা; তাঁর তিন ছেলে পুজো সামলাচ্ছে, আর এই চতুর্থ ছেলে যেন ঘরে থেকেই সব দেখছে, সব শুনছে। সারদার মনে হয়। হিমপড়া রাতে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়ান বুড়িমা। আকাশের দিকে দেখেন; চোখও স্পষ্ট নয়, আকাশও। তারার আভাস পাওয়া যায় কেবল। বিষাদ লেখা সেখানে। সদরের আধ-নেভা আলোয় বিষাদ। এই নীরবতায় বিষাদ। দশমী আসছে। যৌবনের মতোই অসহায় লাগে তাঁর। হু-হু করে বুকে এসে ভিড় করে ছাতিমের গন্ধ।
       
       
    (আগামীকাল সমাপ্য)

  • বিভাগ : গপ্পো | ১৪ অক্টোবর ২০২১ | ৫৮৩ বার পঠিত
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:

কুমুদি পুরস্কার   গুরুভারআমার গুরুবন্ধুদের জানান


  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যুদ্ধ চেয়ে মতামত দিন