• হরিদাস পাল  অপার বাংলা

  • ঋত্বিকের গরীবরথ

    তামিমৌ ত্রমি লেখকের গ্রাহক হোন
    অপার বাংলা | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ২৯৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • ঋত্বিকের গরীবরথ


    অনেকের মুখে শুনেছি, রেলগাড়ির কথা শুনলেই সবচেয়ে আগে তাদের মনে পড়ে অপু দুর্গার রেলগাড়ি দেখার কথা। মৃণাল সেনের 'ভুবন সোম' এর এক্কেবারে গোড়ায় নাম দেখানোর সময়ে রেলগাড়ীর গতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে  ক্লাসিক্যাল গতায়াত নান্দনিকতা ও ধ্রুপদী ধারাকে মিশিয়ে এক সার্থক শিল্পসমুদ্রে অবগাহন- প্রচেষ্টা। 


    কিন্তু আমার কাছে রেলগাড়ী মানেই  ঋত্বিক কুমার ঘটকের 'কোমল গান্ধার'। দুজন সূর্যপুঁজমুখী। 


    অনসূয়া আর ভৃগু। 


    তারা। 


    তাদের প্রজন্ম। 


    যারা রেললাইনের শেষ নিঃশ্বাসের ওপর চেপে বসা  বিভাজিকার ওপরে হাত রেখে  এপার থেকে চোখ ভাসিয়ে ওপারে অর্থাৎ 'বিদেশে' নিজের বাড়ি খোঁজে। যে  রেললাইন একদিন ছিল যোগচিহ্ন,  তা বিয়োগান্তক হয়ে বিষণ্ণ এলিয়ে থাকে সরলরৈখিক,  আকাশের সমান্তরাল- যে আকাশের মেঘ - বিহঙ্গ এক পার থেকে অন্যপারে উড়ে যেতে পারে দ্বিধাহীন। ভৃগু'র বাবা মরার সময়ে বলেছিলেন, জীবনটা আরম্ভ করেছিলাম নির্মল ছন্দে,এভাবে শেষ হওয়া কি উচিৎ ছিল? 


    ভৃগুর বাবার প্রশ্ন 'এপার পদ্মা ওপার পদ্মা মধ্যে জাগনাচরকে' চুমু খেয়ে এক পাক প্রদক্ষিণ করে বাতাসে মিলিয়ে গেল। মানুষ কি ওই  জাগনাচরের মতো?  চৌত্রিশ দিকে থই থই  উবুর ডুবুর জল, তার মধ্যেও নাকানিচোবানি খেতে খেতে নিজের অস্তিত্বটুকু আকুলিবিকুলি জানান দেওয়ার চেষ্টা?  


    সবথেকে অন্তর মথিত দৃশ্য ছিল, যখন রেলগাড়ী খুনে ডোরাকাটার মতো প্রবল ও তীব্র প্রাখর্য্যে ছুটে ছুটে যেতে থাকে সেই পাথরের বিভাজিকার উদ্দেশ্যে, অতঃপর অন্ধকার।  ধাক্কার শব্দ। কিছু ফেটে যেন  চৌচির হয়ে গেল...


    মজার কথা, রেলগাড়ীটিকে দেখা গেল না একবারও,  যেমন দেশভাগের যন্ত্রণা দেখা যায় না, সতত সুখের স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে ভিখারির মতো না খেতে পেয়ে মরার অভিঘাতটা দেখা যায় না, তবু সেটা ধাক্কা মারে, বুকের ওপর দিয়ে যায়, তবু তা চৌচির করে। কি চৌচির করে- তা খুঁজতে খুঁজতে  ব্যথার মায়াপদ্মায় একটা জেলেডিঙ্গি নিয়ে বেরিয়ে পড়া, যার কোন শেষ নেই শুরু নেই শুধু চরাচরব্যাপ্ত একটা চিনচিনে ব্যথাবুক ছাড়া আর কিছু ঠাওর হয় না...সেই ডিঙ্গিতে যারা বসে থাকে, তারা ভৃগুর মতো রুক্ষ; অনসূয়ার মতো ক্লান্ত।


     এক জীবনে স্বদেশকে  বিদেশ হয়ে যেতে দেখে তিরিশে তাদের একশো তিরিশ বয়স হয়ে গেল।


    আর কতবড় জিনিয়াস হলে দর্শককে হাতের  পুতুলের মতো নাড়াচাড়া করা যায়!! তাদের ভূমিকাকে বদলে ফেলা যায়! 


    পরিচালক দ্রষ্টা। তিনি যা দেখবেন,  দর্শককে তাই দেখাবেন। পরিচালকের দেখাটা দর্শক দেখবে। এক্ষেত্রে একটি সার্থক দৃশ্যে দর্শক চরিত্রটির সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতেই পারেন। তিনি ভাবতেই পারেন, এ তো আমারই কথা, আমারই ভাব। কিন্তু এক লহমায় কীভাবে একজন দর্শক একটি দৃশ্যের অন্তরে বিঁধে রক্ত মাংস মজ্জা মেদ ধুকপুক হৃদপিণ্ড সমেত টগবগে একটি চরিত্র হয়ে যান, তা এই দৃশ্যটি না দেখলে বোঝা যায় না।


    সর্বগ্রাসী ট্রেনটা যখন বিভাজিকাকে উদ্দেশ্য করে  দুদ্দাড় করে ছুটে আসছে, তখন মনে হয়, ঐ বিভাজিকার জায়গায় আমিই দাঁড়িয়ে। ঐ ট্রেন আমাকেই আসছে গুঁড়িয়ে দিতে, আমাকেই সে ধাক্কা দিল, আমার বুকের ওপর দিয়ে চলে গেল,  তীব্র বিধ্বংসী অভিঘাতে আমিই সংজ্ঞা হারালুম, আমার সেই চোখেমুখে দেখামাখা অন্ধকারটাই স্ক্রিনে ফোটান হল- কালো রঙের একটা ব্ল্যাঙ্ক ভিডিও ক্লিপ..


    আমরা যারা দেশভাগের কথা কানে শুনেছি, বইয়ের পাতায় পড়ে পড়ে কাগজের নৌকো গড়ে ভাসিয়ে দিয়েছি অপারের বুকে, ঐ ট্রেনটা তাদেরও বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের  মনন আর টুঁটি ঝাঁকিয়ে দিয়ে যায়। ঠুঁটো জগন্নাথের মতো ইতিহাসের সাক্ষীগোপাল করে তোলে। আমরাও ইতিহাসের নকসীকাঁথার এফোঁড় ওফোঁড় বুনন হয়ে যাই।


    ঋত্বিক ঘটকের প্রয়াণ দিবস ছিল কাল। আমাদের নিদ্রিত সত্তাকে যিনি চৈতন্যের চাবুক মেরে জাগনাচরের মতো নিত্য জাগরুক ও দগ্ধদীপ্ত রাখেন, তাঁর হাতে যেন এমনভাবেই শাশ্বতখুন হতে পারি আর অনসূয়ার শাড়িরঙের গাঢ়কে আরও একটু নিগূঢ় দিতে পারি।


    তামিমৌ ত্রমি

  • বিভাগ : অপার বাংলা | ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ২৯৭ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন গ্রাহক পুনঃপ্রচার
  • কোনোরকম কর্পোরেট ফান্ডিং ছাড়া সম্পূর্ণরূপে জনতার শ্রম ও অর্থে পরিচালিত এই নন-প্রফিট এবং স্বাধীন উদ্যোগটিকে বাঁচিয়ে রাখতে
    গুরুচণ্ডা৯-র গ্রাহক হোন
    গুরুচণ্ডা৯তে প্রকাশিত লেখাগুলি হোয়াটসঅ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যুক্ত হোন। টেলিগ্রাম অ্যাপে পেতে চাইলে এখানে ক্লিক করে আমাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলটির গ্রাহক হোন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট প্রতিক্রিয়া দিন