• হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  ইতিহাস

  • ।। দেশবিদেশের অন্ত্যেষ্টি শিল্প || (অষ্টম পর্ব- ভারতবর্ষের বীরস্মৃতি)

    Sudipto Pal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | ইতিহাস | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২৬০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • পাথুরে প্রমাণ বলে একটা কথা আছে। কারণ পাথরে খোদাই করা তথ্যের স্থায়িত্ব বেশী হয়। সবচেয়ে পুরোনো ভারতীয় লেখা- রচনা নয়- লিপিবদ্ধ লেখা- যা এখনও টিকে রয়েছে- নাম বলতে বললে আমরা অনেকেই হয়তো অশোকের শিলালেখ বলব। কয়েক দশক আগেও এই উত্তরটাই সবার জানা ছিল। এমন নয় যে ভারতীয়রা তার আগে নিরক্ষর ছিল। কিন্তু এর চেয়ে পুরোনো লেখা থাকলেও তাদের টিকে থাকা মুশকিল। লেখার স্থায়িত্ব নির্ভর করে কোন মাধ্যমের উপর লেখা হচ্ছে তার উপর। অশোকের আগে পাথরের উপর এত কাজ কেউ করেনি। এত বড় সাম্রাজ্য বা এই মাপের বিনিয়োগ তার আগে বিশেষ ছিল না। এছাড়াও ধারণা ছিল অশোকের ব্রাহ্মী থেকেই তামিলব্রাহ্মীলিপির জন্ম। কিন্তু ২০০৬ সালের একটি আবিষ্কার সেই ধারণাটার ভিতটাকে নড়িয়ে দিল। পাথুরে প্রমাণ পাওয়া গেল- অশোকের থেকে কয়েকশ বছর আগের তামিলব্রাহ্মীলিপির। অবশ্য তার আগেও শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরায় আবিষ্কৃত কিছু তামিলব্রাহ্মী শিলালিপি পাওয়া গেছিল অশোক-পূর্ব যুগের, কিন্তু সেগুলোর কার্বন ডেটিং নিয়ে সংশয় ছিল। কী ছিল ২০০৬ সালের এই পাথুরে প্রমাণ? একটা শহীদ-স্মারক। কোন যুদ্ধের? না, এটা কোনও চোল-পাণ্ড্য রাজাদের যুদ্ধের স্মারক নয়। দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে গোধন নিয়ে হওয়া বিবাদে শহীদ হওয়া এক গ্রাম্য লড়াকু মানুষের স্মারক। অশোকের শিলালিপির মত ধর্ম ও প্রাশাসনিক বিষয়ের সুবিশাল নথী নয়, তামিল সঙ্গম সাহিত্য নয়- খুব সাধারণ গ্রাম্য বিষয়। গ্রামের মানুষের কাছে, তাদের অর্থনীতির কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয় নিয়ে লড়াই।

    এই ধরনের শহীদ-স্মারককে ইংরাজীতে নাম দেয়া হয়েছে হিরো স্টোন। তামিল ভাষায় নটুকল (নটু=স্থাপিত, কল=পাথর) আর কন্নড় ভাষায় বীরকল্লু (বীর=বীর, কল্লু=পাথর)। তেলুগু ভাষায় ছায়াস্তম্ভ। কর্ণাটক আর তামিলনাড়ুর ইতিহাসের একটি বড় সম্পদ হল এই হিরো স্টোনগুলি। ভারতে হিরো স্টোনের প্রচলন সবচেয়ে বেশী দেখা গিয়েছিল কর্ণাটকে, তারপরেই আসে তামিলনাড়ু। তামিলনাড়ুতে এই রীতি সেই সঙ্গম যুগ থেকে চলে আসছে। একটু আগে যে স্মারকটির কথা বললাম সেটি চতুর্থ পূর্বশতকের, অশোকের শ'দেড়েক বছর আগের, তেনি জেলার পুলিমানকোম্বই গ্রাম থেকে প্রাপ্ত। এই শ'দুয়েক বছর আগেও কর্ণাটক আর তামিলনাড়ুতে হিরো স্টোনের চল ছিল। একটা শিল্পরীতি টানা প্রায় আড়াই সহস্রাব্দ ধরে চলতে থাকা ভারতে বেশ বিরল। পুলিমানকোম্বইএর হিরো স্টোনে কোনও প্রতিকৃতি নেই, শুধু লেখা। পরের দিককার হিরো স্টোনে মানুষের মূর্তি খোদাই করা হত। কোনও কোনওটাতে অনেক ডিটেল সহকারে গোটা একটা যুদ্ধযাত্রার ছবিও উৎকীর্ণ করা হত। এগুলো অবশ্য অনেক পরের যুগের- সপ্তম শতক বা আরও পরের। কিছু কিছু হিরো স্টোনে খুব সূক্ষ্ম ভাস্কর্য করা হত, কিন্তু বেশীরভাগই হত সাধারণ গ্রাম্য প্রকৃতির। এগুলো রাজা-রাজড়াদের স্মারক নয়, সাধারণ যোদ্ধাদের- অনেক সময় তার গোষ্ঠীর বা গ্রামের লোকেরাই বানাতো।

    পুলিমানকোম্বইএর হিরো স্টোন কিন্তু সেই যুগের গ্রামীণ তামিলনাড়ুর মানুষের সাক্ষরতার ইঙ্গিত দেয়। আর সম্প্রতি মাদুরাইএর নিকটবর্তী কীড়াডির ষষ্ঠ পূর্বশতকের নগর-সংস্কৃতির উৎখনন থেকে পাওয়া গেছে পাশাপাশি আরও পুরোনো তামিলব্রাহ্মী লিপির নিদর্শন- প্রায় । উত্তর ভারতে এত পুরোনো লিপির নিদর্শন এখনও পাওয়া যায়নি। মোট কথা এই আবিষ্কারগুলো তামিলব্রাহ্মীর বয়স এবং সামগ্রিকভাবে ব্রাহ্মীলিপির বয়স আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আরামায়িক লিপি থেকে ব্রাহ্মীলিপির জন্মের কথা মোটামুটি সর্বজনস্বীকৃত, কিন্তু কবে-কোথায়-কখন-কীভাবে এই বিশদগুলি এখনও ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। হয়তো তামিলনাড়ুর এই আবিষ্কারগুলি অদূর ভবিষ্যতে এই রহস্যের সমাধান করবে, আর ব্রাহ্মীলিপির গতিপথ উত্তর থেকে দক্ষিণে নাকি দক্ষিণ থেকে উত্তরে ছিল সেটাও জানা যাবে।

    সাক্ষরতা ছাড়াও আরেকটা বিষয় লক্ষণীয় পুলিমানকোম্বইএর হিরো স্টোনে। সেটা হল এখানে কোনও পরলোক, দেবদেবী এসবের উল্লেখ নেই, যেগুলো আমরা পরবর্তী যুগের হিরো স্টোনে দেখতে পাই। যা লেখা ছিল তার ইংরাজী অনুবাদ হল: it has been put up in memory of Tiyan Antavan of pedu village, who died in a cattle raid at Kudalur।
    কর্ণাটকে অন্তত আড়াই হাজার হিরো স্টোন পাওয়া গেছে, এবং এখনও প্রতি বছর নূতন নূতন আবিষ্কার হয়। দাক্ষিণাত্যেই এদের বেশী পাওয়া যায়, তার দুটো কারণ আমি ব্যক্তিগতভাবে অনুমান করি- ১) দাক্ষিণাত্যের হিন্দুদের মধ্যে কবর দেয়ার প্রচলন উত্তর ভারতের থেকে অনেক বেশী। তবে এটা মাথায় রাখতে হবে দাহকৃত মানুষদেরও হিরো স্টোন হতে পারে, ২) পাথরের স্মারক বানানোর প্রথা দাক্ষিণাত্যে প্রাক্-নগরায়ণ যুগ থেকেই চলে আসছে। দাক্ষিণাত্যে নব্যপ্রস্তর যুগ (অর্থাৎ চাষবাসের যুগ) অনেক পরে শুরু হয়- এই ধরুন সিন্ধু উপত্যকায় ৩৩০০ পূর্বাব্দে যখন প্রত্নপ্রস্তর, নব্যপ্রস্তর, তাম্রযুগ পেরিয়ে ব্রোঞ্জ যুগ শুরু হয়ে গেছে তখনও দাক্ষিণাত্যে প্রত্নপ্রস্তর যুগ অর্থাৎ শিকার-জোগাড় করা মানুষের যুগ। যাই হোক ৩০০০ থেকে ১০০০ পূর্বাব্দে দাক্ষিণাত্যের নব্যপ্রস্তর যুগে পাথরের তৈরী বিশাল বিশাল সমাধি পাওয়া যায়। এগুলো শুধু সমাধি নয়, এদের সমাধি-স্মারকও বলা যায়। কেন? কারণ সমাধির উপরে আরও বাড়তি কিছু থাকত, স্তূপাকৃতি কবরের উপর পাথরের চাঁইয়ের টুপির মত থাকত। অনেক সময় পাথরের ছোটখাটো ঘরের মত (বা টেবিলের মত) বানানো হত একজোড়া উল্লম্ব পাথরের উপর একটি অনুভূমিক পাথরের আবরণ বসিয়ে- এদেরকে ডোল্মেন (dolmen) বলা হয়। এই বড় বড় পাথরের সমাধিগুলোর জন্য এই যুগটাকে দাক্ষিণাত্যের ইতিহাসে মেগালিথিক যুগও বলা হয়। যাই হোক, এই বাড়তি আড়ম্বর থেকে বোঝা যায় এগুলো শুধু সমাধিই নয় স্মারকেরও কাজ করত। দাক্ষিণাত্যে নব্যপ্রস্তর যুগ থেকে প্রায় সোজাসুজি লৌহযুগ শুরু হয়ে যায় ১০০০ পূর্বাব্দ নাগাদ, এবং এই প্রথা লৌহযুগেও দেখা যায় খুব সাম্প্রতিক কাল- প্রায় ২০০ পূর্বাব্দ অবধি। হয়তো এই প্রথারই ধারাবাহিকতা হিসাবে হিরো স্টোনের প্রচলন হয়।

    আগের সবকটা পর্বেই দেখিয়েছি যে সমাধিশিল্পগুলো ইতিহাসের তথ্যভাণ্ডার হিসাবে কাজ করে। হিরো স্টোনও তার ব্যতিক্রম নয়। তামিল-ব্রাহ্মীর পুরাতন নিদর্শনের কথা তো বললামই, এছাড়া পরবর্তী যুগের পাথরগুলোতে অনেক বাড়তি তথ্য থাকত। স্থানীয় রাজাদের নাম থাকত, গ্রামের নাম থাকত, যুদ্ধের কথাও থাকত। কোন সময়ে কোন রাজার কতদূর অবধি রাজ্যসীমা ছিল তার আভাস পাওয়া যায়, কোন শহরের অতীতে কী নাম ছিল জানা যায়- এরকম অনেক ছোটখাটো তথ্য এরা বহন করে। বেঙ্গালুরু শহরের নাম যে ৮৯০ সালেও বেঙ্গালুরু ছিল সেটা জানা যায় শহরের উপকণ্ঠে বেগুর থেকে পাওয়া একটি হিরো-স্টোন থেকে। বেগুর ইনস্ক্রিপশন নামে পরিচিত এই হিরো স্টোনে বেঙ্গালুরু যুদ্ধের কথা আছে। শৈব ধর্মাবলম্বী নোলম্ব রাজাদের হাতে জৈন গঙ্গ রাজাদের পরাজয়ের কথা। কর্ণাটকের সুবিশাল জৈন সংস্কৃতির ক্রমবিলোপের একটি অধ্যায় আমরা এখানে দেখতে পাই। এই হিরো স্টোনে এই যুদ্ধের চিত্রায়ণও সুন্দরভাবে খোদিত আছে।

    হিরো স্টোনগুলোতে যেহেতু মানুষের বা কখনও কখনও দেবদেবীদের প্রতিকৃতি থাকত, এদেরকে গ্রামের মানুষেরা অনেক সময় উপাস্য বস্তু হিসাবে ব্যবহার করে এসেছে- সিঁদুর-হলুদ ইত্যাদি লেপে। এমন নয় যে এর মাধ্যমে প্রয়াত যোদ্ধার উপাসনা করা হচ্ছে, বরং এগুলোকে নূতন দৈববস্তু হিসাবে মানুষ উপাসনা করে। এটা শিল্পকৃতির religious repurposing এর ভাল উদাহরণ। এর মাধ্যমে একদিকে এদের সংরক্ষণও হয়েছে, আবার এই মূহুর্তে এই পুজোপালিগুলো সংরক্ষণের পক্ষে চিন্তার বিষয়ও হয়ে দাঁড়িয়েছে।

    কর্ণাটকের হিরো স্টোনের সংগ্রহ ও নথিবদ্ধকরণে বিশেষ ভুমিকা আছে ইংরেজ শিক্ষাবিদ বেঞ্জামিন লুইস রাইসের। স্কুল ইন্সপেক্টর হিসাবে ঘুরে বেড়ানোর সময় কর্ণাটকের বিভিন্ন গ্রামে এই ধরনের পাথর দেখে ওনার আগ্রহ জাগে। উনি কর্ণাটকের গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন অনুবাদকের সাহায্য নিয়ে প্রায় ৯০০০ খানি হিরো স্টোন ও অন্যান্য শিলালেখর অনুবাদ করান। ১৮৮৬ সালে উনি ভারতের আর্কিওলোজি বিভাগের প্রধান হন, এবং এই সময় কর্ণাটকের শিলালেখ নিয়ে Epigraphia Carnatica নামে বারো খণ্ডের বই প্রকাশ করেন।

    যে কোনও শহীদ স্মারক নির্মাণের পিছনে শহীদ-স্মরণ করা ছাড়াও আরেকটা উদ্দেশ্য থাকে। মানুষকে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করা। ৭০০ সালে বাদামীতে এক যোদ্ধার উদ্যেশ্যে লিখিত একটি শিলালেখতে আমরা দেখতে পাই কন্নড় ও সংস্কৃতের মিশ্রণে লেখা কিছু কবিতা- কিছুটা এই উদ্দেশ্যেই লেখা। এই কবিতার মধ্যে দেখতে পাই কপ্পে অরভট্টন নামক এক চালুক্য সেনাবাহিনীর যোদ্ধার আত্মত্যাগের গরিমা বর্ণন। কন্নড় ভাষায় হলেও এতটাই সংস্কৃত ঘেঁষা যে বাঙালীদের পক্ষে এটি খুবই সহজপাঠ্য। এই কবিতাটির মাধ্যমে ১৩০০ বছর আগের কন্নড় ভাষার কাব্যসুষমাও আপনারা অনুভব করতে পারবেন-
    কপ্পে অরভট্টন শিষ্টজন প্রিয়ন
    কষ্টজনবর্জিতন কলিযুগবিপরীতনে।।
    [কপ্পে অরভট্টন শিষ্টজনের প্রিয়, কষ্টজনের (খারাপ লোক) দ্বারা বর্জিত কলিযুগের বিপরীত একজন মানুষ]
    বরণ তেজস্বিনো মৃত্যুর্ ন তু মানাবখণ্ডনম
    মৃত্যুস্ তাৎক্ষণিকো দুঃখম মানভঙ্গম দিনেদিনে।।
    [ভাল হল তেজস্বীর মত মৃত্যু, নয় মানের অবখণ্ডন- অর্থাৎ অবমাননার থেকে বীরের মত মৃত্যু ভাল]
    [মৃত্যুর (দুঃখ) তাৎক্ষণিক, মানভঙ্গের দুঃখ প্রতিদিন ভোগ করতে হয়]
    [উপরের দুটি লাইন শুদ্ধ সংস্কৃতেই লেখা]
    সাধুগে সাধু, মাধুর্যঙ্গে মাধুর্যম।
    বাধিপ্প কলিগে কলিযুগবিপরীতন।
    মাধবন ঈতন পেরন অল্ল।।
    [সাধুর প্রতি সাধু, মধুরের প্রতি মধুর। যে কলিযুগকে বাধ সাধে, কলিযুগের বিপরীত একজন মানুষ। হে মাধব, এই মানুষটির মত অন্য কেউ নেই।।]
    বাদামীতে প্রাপ্ত দশম শতকের হিরো স্টোনের কবিতায় কিন্তু অন্যভাবে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সেখানে মান-অপমানের কথা নেই-
    জিতেন লভ্যতে লক্ষ্মী, মৃতেনপি সুরাঙ্গনা।
    ক্ষণ বিশ্বংসিনী কায়ে, ক চিন্তা মরণে রণে।।
    [জিতলে লক্ষ্মীলাভ, মরলে সুরাঙ্গনা (লাভ)। কায়া ক্ষণস্থায়ী, তাহলে রণক্ষেত্রে মরণ হলে চিন্তা কীসের?]

    চালুক্যদের যুগে হিরো স্টোন আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে উঠতে থাকে। হোয়সল যুগের কর্ণাটকে, দ্বাদশ শতকে আড়ম্বরের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়। সেখানে প্রয়াত বীরের স্বর্গলাভের বিশদ চিত্রায়ণও দেখা যায়। এটাও মানুষকে আত্মত্যাগ এবং যুদ্ধে লড়াই করার অনুপ্রেরণা দেয়ার একটা কৌশল। আর স্বর্গারোহণের দৃশ্যগুলো সাধারণতঃ অপ্সরা পরিবৃত হয়েই হত।

    গোধন রক্ষার লড়াই দিয়ে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এখন আমরা দেখছি রাজারাজড়াদের যুদ্ধ। সাধারণ প্রশস্তি দিয়ে শুরু হয়েছিল, তারপর দেখলাম মানরক্ষার অনুপ্রেরণা, আর শেষে স্বর্গ ও সুরাঙ্গানার লোভ দেখানো।

    হিরো স্টোনে পুরুষ-যোদ্ধাদের একাধিপত্য থাকলেও কর্ণাটকের হোসাকোটেতে এবং তামিলনাড়ুর কৃষ্ণগিরিতে মহিলা যোদ্ধ্রীদের হিরো স্টোন পাওয়া গেছে। দ্বিতীয়টিতে অশ্বারোহিণী যোদ্ধ্রীদের দেখা যায়। কুকুরের নামে হিরো-স্টোন তৈরীর নিদর্শন আছে- গঙ্গ রাজাদের।

    এবার যাবো উত্তরে। উত্তর ভারতে হিরো-স্টোন কম পাওয়া যায়। গুজরাতের দিকে অবশ্য অনেক পাওয়া গেছে। মুসলিম শাসন শুরু হবার পর উত্তর ভারতের হিন্দু রাজাদের মধ্যে মুসলিম রাজাদের অনুকরণে স্মৃতিসৌধ বানানোর চল হয়। এগুলোকে ইংরাজীতে সেনোটাফ বলে- সমাধিবিহীন স্মৃতিসৌধ। হিন্দীতে ছত্রী (অর্থাৎ ছাতা) বলা হয়, ছাতার মত গম্বুজের জন্য। এরকম ছত্রীর উদাহরণ হল- বরাবাগ (জয়সলমের), চৌরসী খম্বোঁ কি ছত্রী (বুঁদি), ছত্তরদি (ভূজ) ইত্যাদি। এগুলো অনেক পরবর্তী যুগের- মুঘল বা ব্রিটিশ যুগের। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত সৈনিকের হিরো স্টোনের সাথে রাজাদের বৈভব-প্রদর্শনের জন্য বানানো স্মৃতিসৌধর অনেক তফাৎ আছে।

    হিরো স্টোন ছাড়াও হত সতী-স্মারক, সহমরণগতা সতীর স্মরণে বা জৌহরের স্মরণে। এগুলো রাজস্থান আর গুজরাতেই বেশী পাওয়া যায়। তবে দক্ষিণ ভারতে সংখ্যায় কম হলেও পাওয়া গেছে। বেশীরভাগ সতী-স্মারকেই শুধু একটি হাতের ছবি দেখা যায়। কোনও কোনওটায় সহমরণপ্রথাকে গৌরবাণ্বিত করার জন্য সতীর স্বর্গলাভের দৃশ্য দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ একই যুদ্ধে নারীর ও পুরুষের আত্মবলিদান যে দু'রকম ভাবে হত সেটাও এই হিরো স্টোনের পার্থক্য থেকে প্রকট হয়।

    উত্তর-পূর্ব ভারতে মেঘালয়ের খাসিয়া আর জয়ন্তিয়া পাহাড়েও হিরো-স্টোনের প্রচলন দেখা গেছে। শিলংএর নিকটবর্তী নারটিয়াংএ হিরো-স্টোনের একটি বিশাল সংগ্রহ পাওয়া যায়। পুরুষ-নারী সবার জন্যই এই সম্মান দেখা যায়। পুরুষদের স্মারকগুলি উল্লম্ব, মহিলাদেরগুলি আনুভূমিক। পুরুষের স্মারকগুলি উঁচু হলেও, নারীদের স্মারকগুলি অনেকটা জায়গা নিয়ে বিস্তৃতভাবে বানানো। ভারতবর্ষের একমাত্র এই অংশেই যেন নারী-পুরুষের বৈষম্য একটু কম।


    ছবি ১ : কর্ণাটকের হঙ্গলের তারকেশ্বর মন্দিরে প্রাপ্ত দ্বাদশ শতকের হিরো স্টোনে অপ্সরা পরিবৃত হয়ে স্বর্গারোহণের দৃশ্য। একদম নিচে যুদ্ধের দৃশ্য, আর উপরের দুটি প্যানেলে শিবলিঙ্গ ও অন্যান্য দেবতা দেখা যাচ্ছে।


    ছবি ২: কর্ণাটকের হঙ্গলের তারকেশ্বর মন্দিরে প্রাপ্ত দ্বাদশ শতকের হিরো স্টোনে অপ্সরাবাহিত পালকি চড়ে স্বর্গারোহণের দৃশ্য। নিচের প্যানেলে তিনটি যুদ্ধের দৃশ্য, আর উপরের প্যানেলে শিবলিঙ্গ ও অন্যান্য দেবতা দেখা যাচ্ছে।


    ছবি ৩: পুলিমনকোম্বইএর গো-বিবাদের স্মৃতি। চতুর্থ পূর্বশতক। প্রাচীনতম তামিলব্রাহ্মী তথা ব্রাহ্মলিপির নিদর্শনের একটি।


    ছবি ৪: গুজরাতের ভূজের ছত্তরদি। ছত্রাকার স্মারক। অষ্টাদশ শতক। © Sudipto Pal, copyright protected by author


    ছবি ৫: কেরালায় নব্যপ্রস্তর যুগের মেগালিথিক প্রস্তর-স্মারক।


    ছবি ৬: বেগুর হিরো স্টোনে বেঙ্গালুরু নামের প্রাচীনতম উল্লেখ। নবম শতক।


    ছবি ৭: তামিলনাড়ুর কৃষ্ণগিরিতে অশ্বারোহিণী যোদ্ধ্রীদের হিরো স্টোন।


    ছবি ৮: নারটিয়াংএর হিরো-স্টোনের সংগ্রহ

    (চলবে)

    তথ্যসূত্র:
    https://www.dtnext.in/News/TamilNadu/2017/04/03005110/1030460/Hero-stones-of-women-warriors-found-in-Krishnagiri.vpf
    https://rarebooksocietyofindia.org/book_archive/196174216674_10157046473391675.pdf
    https://karnatakaitihasaacademy.org/best-memorial-stones-of-karnataka/
    https://timesofindia.indiatimes.com/city/bengaluru/1000-year-old-inscription-stone-bears-earliest-reference-to-Bengaluru/articleshow/17446311.cms
    https://www.deccanherald.com/content/39953/here-lies-bengaluru-inscription.html
    https://kudohaalumni.wordpress.com/2018/03/14/hero-stones-in-medieval-karnataka-and-changing-perceptions-of-afterlife/
    https://en.wikipedia.org/wiki/Hero_stone
    https://books.google.co.in/books?id=H3lUIIYxWkEC&pg=PA2&source=gbs_toc_r&cad=3#v=snippet&q=%22hero%20stone%22&f=false
  • বিভাগ : ধারাবাহিক | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ২৬০ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • b | 14.139.196.11 | ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ০৭:৫০97229
  • আগে বলা হয় নি, এই সিরিজটা খুব ভালো হচ্ছে।
  • Sudipto Pal | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১১:৪২97338
  • ধন্যবাদ নিবেদিতা এবং বি। 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত