• হরিদাস পাল  গপ্পো

  • একটি ভাদ্রের গপ্পো

    Rumela Saha লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৯ আগস্ট ২০২০ | ৩৮৬ বার পঠিত
  • জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • তখন আমি চাকরিতে ঢুকেছি বছর খানেক। একটি খবরের কাগজের অফিসে চাকরি করি। চাকরি সূত্রে পুরুলিয়াতে যেতে হল। সে সময় পুরুলিয়া মানে কিষেণজি। আমাদের যাওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে বাঘমুন্ডির দু'জন স্কুল শিক্ষককে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। সে ঘটনায় তখন সারা পশ্চিমবঙ্গ উত্তাল। তা আমি আর মধুদি (সিনিয়র সাংবাদিক) পুরুলিয়ায় গিয়েছিলাম।
    আমাদের পুরুলিয়ার করেসপন্ডেন্টের
    ওপর আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল। যা কাজকর্ম প্রথম দুদিন হল। তৃতীয় দিন আমরা ফিরবো। দুপুর তিনটের রূপসী বাংলা।
    তখন পুরুলিয়া বিশেষ করে অযোধ্যা পাহাড় ও সংলগ্ন এলাকায় বাইরের জগতের প্রবেশ একদম নিষিদ্ধ ছিল। সেসময়ের অযোধ্যা এখনকার মত ন্যাড়া নয়। সে গভীর অরণ্য। সূর্যের আলো মাটি স্পর্শ করে না এমন নিবিড় সে। যাক সে গল্প পরে আরেকদিন করা যাবে। এ গল্পে আসি।
    করেসপন্ডেন্ট অরূপদা, আগে থেকে বলে রেখেছিল যে আমাদের একটা জায়গায় নিয়ে যাবে। একজনের সাথে আলাপ করাবে। আমরা খুব একটা পাত্তা দিইনি বিষয়টা। ঠিক আছে । কতজনের সাথেই তো আলাপ করতে হয়।
    সেদিন আমরা সাঁওতালডিহি গেছি।
    সাঁওতাল ডিহি মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকা। ওখানকার মাটি একদম রুক্ষ। কোন ফসল ফলে না। আর সাঁওতালডিহি হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খণ্ডের বর্ডার অঞ্চল। ওখানে অজস্র ছোট ছোট টিলা আছে। সেই টিলা গুলোকে ডিনামাইট দিয়ে ফাটিয়ে, পাথরগুলোকে ছোট ছোট stone chips এ পরিণত করা হয়। আবার সেগুলো থেকে সিমেন্ট তৈরি হয়। মূলত stone Mafia দের বড্ডো রমরমা ওখানে। আর বেশিরভাগ আদিবাসীরা এসব পাথরের খাদানে কাজ করে।
    দারিদ্র্য যে কত নগ্ন হতে পারে, কি বীভৎস হতে পারে আমি জীবনে প্রথমবার সেটা ওখানেই দেখেছি। এবং এই যে পাহাড় গুলোকে নির্বিচারে ফাটানো হয়, সেগুলো সব প্রশাসনের নাকের ডগায়। ওখানে দিনে-দুপুরে পাহাড় চুরি হয়। কেউ বলার নেই।
    অরূপদা হঠাৎ বলে, "চলো তোমাদের দেখা করিয়ে নিয়ে আসি ... সঙ্গে"। নামটা আমার এখন মনে নেই। ওখান থেকে এক জায়গায় আমরা গাড়ি চেঞ্জ করে অন্য একটা গাড়িতে উঠলাম। গাড়ির মধ্যে আমরা তিনজন ছাড়াও আরো তিনজন। তাদের সিনেমায় দেখানো দক্ষিণ ভারতীয় খলনায়কদের মতন চেহারা। তো যাই হোক, গাড়ি চলেছে তো চলেছে। আমরা পশ্চিমবঙ্গের বর্ডার ক্রস করে ঝাড়খণ্ডের ঘোরতর জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেলাম। পুরুলিয়ার রাস্তা যতটা খারাপ, ঝাড়খণ্ডের রাস্তা ততটা ভালো।
    মধুদি অরূপদা কে জিজ্ঞেস করলো, আমরা কোথায় যাচ্ছি। আমাদের ট্রেনের টিকিট কাটা আছে আমরা ফেরত যাবো। অরূপদা দেখি আর কোন কথা বলে না চুপচাপ পুতুলের মত বসে আছে।
    এদিকে ঘোরতর জঙ্গলের মধ্যে আমাদের পথ আর শেষ হয় না। ওই জঙ্গলের মধ্যে একটা ত্রিপল দিয়ে আটকানো ভাঙাচোরা বাড়ির বাইরে গাড়িটা দাঁড়ালো।
    লোকগুলো আমাদেরকে ভেতরে একটা অদ্ভুত রকমের দামি আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো ছেঁড়াফাটা তাঁবুর ভেতর বসতে বললো। আমরা তো বসলাম। এদিকে বুক দুর দুর করছে কি জানি কি হবে।
    তখন অরূপদা বললো, যিনি আসছেন তিনি দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত মাফিয়া...। তার বহু দিনের ইচ্ছে কলকাতা সাংবাদিকদের সাথে দেখা করবে। তাই অরূপদা দয়া করে আমাদের ওনার সাথে আলাপ করাতে নিয়ে এসেছে।
    কি বলে, মাফিয়া !!! আমাদের সাথে দেখা করবে? আমাদের সাথে দেখা করবে কেন? অরূপদার নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
    কিছুক্ষণ পর মাফিয়া ভদ্রলোক আসলেন। আমি তো দেখে অবাক। একেবারে ফিটফাট খেলোয়াড়দের মতন চেহারা। সুন্দর পারফিউমের গন্ধ। শুধু কোমরে একটা পিস্তল গোজা আছে তার পেছনটা টি-শার্টের নিচ থেকে কিছুটা বেরিয়ে আছে। ওটাতেই যা অস্বস্তি। বাকি মাফিয়া সুলভ কোন কিছু চেহারাতে নেই।
    ভদ্রলোক বসলেন। এবং অত্যন্ত অমায়িক ভদ্রভাবে আমাদের সাথে কথা বললেন। কথায় কথায় জানা গেল উনি রাহুল দ্রাবিড়ের ব্যাচমেট ছিলেন। ছোটবেলায় একসাথে ক্রিকেট খেলেছেন ।
    তারপর বললেন আমাদেরকে একটা জায়গায় নিয়ে যেতে চান, একটা জিনিস একটু দেখাবেন। যদিও এটা উনি অনুরোধই করলেন। তখন ওনার বন্দুকটা কোমর থেকে বের করে সেন্টার টেবিলের ওপর রাখা ছিল, কাজেই আমাদের না করার উপায় ছিল না। আবার গাড়িতে উঠলাম। তবে এবার অন্য গাড়ি। এ গাড়িতে আমি, মধুদি, আর মাফিয়া ভদ্রলোক। উনি নিজেই ড্রাইভ করলেন। অরূপদা অন্য গাড়িতে।
    আমাদের তখন মনের অবস্থা কাহিল।কিডন্যাপ হতে চলেছি না ইতিমধ্যে কিডন্যাপ হয়ে গেছি বুঝতে পারছি না।
    বাঘমুন্ডির সেই দুজন শিক্ষকের কথা বারবার মনে আসছে। কি নৃশংস ভাবে দুজনেরই গলা কাটা হয়েছিল।
    মধুদি আমাকে বিড়বিড় করে জিজ্ঞেস করল,
    "আমরা মহিলা, আমাদের ও কি অত কষ্ট দেবে ?" আমি আশ্বস্ত করলাম, "বন্দুকটা দেখলে না! আমাদের হয়তো গুলি করবে। গুলি করলে অতটা লাগে না।" এমনভাবে বললাম যেন জীবনে বহুবার গুলি খেয়েছি। আর মধুদিও কেমন মেনে নিল।
    ভারি তাজ্জব !!!
    আসলে তখন মাথা খারাপ হয়ে গেছে। ভদ্রলোক সুন্দর জলের বোতল দিলেন জল খাওয়ার জন্য, আমরা বিগলিত হয়ে অস্বীকার করলাম। বুক ফেটে যাচ্ছে তেষ্টায়। কি জানি বাবা, জলে যদি বিষ বা ঘুমের ওষুধ থাকে।
    চলেছি তো চলেছি। জঙ্গল ছাড়িয়ে একটা ছোট জনপদে ঢুকলাম। চিৎকার করলে রাস্তার লোকজন বাঁচাতে পারবে কিনা ভাবছি এমন সময় গাড়ি দাঁড়ালো।
    একটা ৪/৫ তলা নির্মীয়মান বাড়ির সামনে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। মাফিয়া ভদ্রলোক অত্যন্ত উৎসাহে আমাদের ভেতরে নিয়ে গেল। একটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন অফিসের মতন ঘরে বসালো। তারপর সাবলীল হিন্দিতে বলল," আমার জীবনের একটা সময় আমি এখানে কয়েক বছর ছিলাম। আমার স্ত্রীর যখন প্রথমবার বাচ্চা হয় তখন আশেপাশে কোন হাসপাতাল ছিল না। সারারাত আমার স্ত্রী কষ্ট পেয়েছে। আমার কিছু করার ছিল না। আমি শুধু আমার স্ত্রীর চিৎকার আর যন্ত্রণা দেখছিলাম। আমার মেয়ে হয়। সেদিন মনে হয়েছিল, স্ত্রীকে যে কষ্ট পেতে হয়েছে, আমার মেয়েকেও যেন একদিন সেই কষ্ট পেতে না হয়।"
    " এখানে তো সব আদিবাসী, তাই আদিবাসী মেয়েরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের সন্তান প্রসব করতে পারে আমি সেই চেষ্টায় এই হাসপাতাল তৈরি করছি। এখানে বিনামূল্যে সমস্ত রকম চিকিৎসা হবে। সরকার তো এদের কথা ভাবে না। তাই নিজেই করে ফেললাম। আপনারা শহরের সাংবাদিক। এদের নিয়ে একটু লিখুন। এদের কেউ মানুষ হিসেবে ভাবে না।"

    .... কিছুক্ষণ স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। এদিকে গলা শুকিয়ে কাঠ। ওনার কাছে জল চেয়ে খেলাম। দু'জন লোক আমাদের পুরো জায়গাটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখালো। অত্যাধুনিক জিনিসপত্র দিয়ে তৈরি হচ্ছিল সেই হাসপাতাল। তারপর যথা সময়ে আমাদের ওরাই গাড়ি করে স্টেশনে পৌঁছে দিয়েছিল ‌।
    বাড়ি ফিরতে কোন অসুবিধা হয়নি।
    ওখান থেকে যখন গাড়িতে ফিরছিলাম, দূর থেকে মাফিয়া ভদ্রলোককে হাতজোড় করে নমস্কার করেছিলাম। উনিও হেসে নমস্কার করেছিলেন।
    আর তখনই উপলব্ধি করেছিলাম সেই বুড়ো লোকটার কথাটা, যেটা বারবার পড়েছি কিন্তু মানেটা তার আগে বুঝতে পারিনি,
    "মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ"।
  • বিভাগ : গপ্পো | ১৯ আগস্ট ২০২০ | ৩৮৬ বার পঠিত
আরও পড়ুন
রুটি - Rumela Saha
আরও পড়ুন
কাঠাম - Rumela Saha
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
আরও পড়ুন
বিভাব - Avi Samaddar
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • মৌলিক মজুমদার | 2409:4066:16:c9c8::190b:d8a5 | ২০ আগস্ট ২০২০ ০১:১৯96434
  • অসাধারণ 

আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন