এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • অন্ধের কলকাতাদর্শন

    টিম
    আলোচনা | বিবিধ | ১১ জানুয়ারি ২০০৯ | ১০৭৯ বার পঠিত
  • সময়ের সাথে দূরত্ব সমানুপাতিক, উষ্ণতাও। এ সূত্র বিজ্ঞানীরা না মানলেও ভুক্তভোগী মানবেন। এই নিবন্ধ সেই উষ্ণতা মাপার চেষ্টা, দূরত্ব মাপার ভীত পদক্ষেপ। এক একটা বছরের সাথে ওঠানামা করে আমাদের সম্পর্কের তীব্রতা। সে আত্মীয়-অনাত্মীয় সবার্ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নিয়ম মেনে বাড়ে-কমে শহরের সাথে একাত্মতাও। ছিটকে বেরোতে গেলে টের পাওয়া যায় কেন্দ্রাভিমুখী টান। ফিরে আসতে গেলে বোঝা যায় বিকর্ষণ। এই দোটানা সম্বল করেই অন্ধের শহরদর্শনের অভিলাষ।

    আকাশ থেকে দেখা হয় সেই বিমানবন্দরের সাথে, যা নিয়ে মানুষের অগুন্তি অভিযোগের জবাবে জনৈক নেতা বলেছিলেন, "এয়ারপোর্ট প্লেন ওঠানামার জন্য, আপনি কি ওখানে ফ্ল্যাট বানাবেন?" সেই এয়ারপোর্টে সময়ের আগেই নেমে আসি। একেবারে স্বর্গ থেকেই যে নেমে এসেছি, এয়ারপোর্ট কর্মীদের ব্যবহারে সে ধারণা দৃঢ়তর হতে থাকে। আমার চোখে ধরা পড়েনা রানওয়েতে নতুন কোনো গর্ত। সবই আগের মত লাগে। শুধু বাড়ি ফেরার সময় মনে হয় মানুষের তাড়া আগের থেকে বেড়েছে। বাস, ট্যাক্সি ও ব্যক্তিগত যানবাহন, সবারই অটো-মোড। গাড়ীচালকরা পথচারীদের প্রাণ হাতে করে চলাফেরা করেন দেখেও কেন অবাক হলাম না, এইটা ভাবতে ভাবতেই দেখি, আগের মতই দিব্যি মানিয়ে নিয়েছি।

    বাড়ি ফেরার কয়েকদিনের মধ্যেই দেখা হয়ে যায় এখানকার "মোস্ট হ্যাপনিং প্লেস" গুলোর একটি। বাড়ির অদূরেই শপিং মল হয়েছে (একজন বাঙালিও এখন ম্যাল বলেন না, আগের মত)। ঝাঁ চকচকে মলে সবই বিদেশের মত, সেখানে গিয়ে গর্ব ও আনন্দে বুক ভরে উঠতে থাকে, রাশিকৃত পরিধেয় ও অ-পরিধেয়'র বিপণিমাঝে কিলবিল করা ক্রেতা-বিক্রেতা- মনেই থাকেনা আসার সময় রাস্তার মোড়ে হাঁটুতে লেপ্টে যাওয়া শিশুদের কথা। চল্লিশ টাকা দিয়ে এক বোতল জল বা একশো সত্তর টাকার কফি দেখে ভুলে যাই বাস থেকে কলার ছিঁড়ে নামিয়ে দেওয়া প্রৌঢ়ের কথা। ভালো লাগা, ভালো থাকার সুবাতাস বইতে থাকে। নতুন যুগের নওজওয়ানদের মত করে শুধুই "লাইফের পজিটিভ সাইড" গুলো খুঁটে খুঁটে দেখতে থাকি। অভ্যেস হয়ে যায়, তখন আর আম্রিকাপ্রতিম মলবিপণির দুর্ব্যবহার বা অস্বাস্থ্যকর বাথরুমের মত ছোটোখাটো ব্যাপার চোখেই পড়েনা।

    পুরোনো পরিচিতদের সাথে দেখা হলেই প্রাথমিক উচ্ছাসের যে ঢেউ ওঠে, সে সম্পর্কে প্রয়োজনীয় মনোবৈজ্ঞানিক পড়াশোনা নেই। নইলে বলতে পারতাম আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একেবারেই পাল্টে যাওয়া লোকটা, এবং তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আমূল পরিবর্তিত আমি, শুধুই অতীতের স্মৃতিনির্ভর একটা সাক্ষাৎকারে কেন এত আবিষ্ট লাগে নিজেদের। চিন্তার বাঁকগুলো ভাঙাচোরা অন্ধকার সরু গলি হয়ে এসেছে, মগজে পলি, তবুও হঠাৎ ঝিলিক খেলে যাওয়া চেনা সুর বাজে পুরোনো কথায়। কিছু কিছু জিনিস সময়ের সাথে এগোয়না। ভাগ্যিস!

    এরকমই না-পাল্টানো কলেজস্ট্রিটের বইপাড়ায় আসি। হয়ত বা পাল্টেছে কিছু, তবে আমার চোখে ধরা পড়েনা এত অল্প সময়ে। কফি হাউসকে আরো পাঁচটা খাবারের দোকান হয়ে উঠতে দেখে অনেকে অনুযোগ করে, আমার কিছুই মনে হয়না। বরং বই বিক্রেতাদের ব্যবসা কিছুটা স্বস্তি দেয়। বহুদিন পর ঝুলিভরে বই কিনে, কলকাতা আসার পর এই প্রথম, শুধু কলকাতা এসেছি বলে ভয়ানক খুশি হতে পারি। বইবোঝাই কাঁধটা যত টনটন করে ততই আরামে আনমনা হয়ে ভুলতে থাকি খারাপ লাগা গুলো, প্রশ্রয় বাসা বাঁধতে থাকে।

    প্রশ্রয়ের কথাই যখন উঠলো, তখন আরো দুয়েকটা কথা বলা যাক। নব নব রূপে ও মোড়কে উপস্থিত। দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। গণ টোকাটুকির পক্ষে ছাত্রের অভিভাবক গর্বভরে বলছেন, "আসলে ওরা এত স্মার্ট যে স্যারেরা কিছু করতেই পারেন না।" ঘুষ খেয়ে বেআইনি ছাত্রভর্তি করে বিপাকে পড়া কর্তাকে ভিসি বলছেন, "পার স্টুডেন্ট ২ লাখ দিন, সব লিগাল হয়ে যাবে"। এইরকম পারষ্পরিক পৃষ্ঠপোষকতার বাতাবরণে ভারি নিশ্‌চিন্ত লাগে। আরো ভালো লাগে যখন একজন বিচারকের মুখে শুনি, "মেয়েদের কোনো মিটিং অ্যাটেন্ড না করতে দিলেই ভালো হয়। ওরা বড়ো ঝামেলা করে।" কিংবা যখন দেখি সাত বছরের কোনো শিশুকন্যাকে যথেষ্ট অবস্থাপন্ন ঘরের বাবা-মা অর্ধনগ্ন অবস্থায় স্টেজে তুলে দিচ্ছেন, মাইকে বাজছে, "ক্রেজি কিয়া রে"। সদ্য আত্মঘাতী প্রেমিকের বাবা যখন বহুল প্রচারিত সংবাদপত্রে বিবৃতি দিয়ে জানান "মেয়েটি ছোটো জাত। ছেলেমেয়ে হলে কি পরিচয় দেব?" তখন রীতিমত রোমাঞ্চিত হই।

    স্নেহজর্জর শহরের আনাচে কানাচে এরকম অসংখ্য "প্রশ্রয়ের" কাহিনি পাওয়া যায়। বরং অনেক খুঁজে বছর কুড়ির সেই ছেলেটির দেখা পেলাম, মা মারা যাওয়ার দিন তিনেকের মধ্যেই যে অনায়াসে নিজের কর্তব্যে ফিরে যেতে পারে। অন্ধকার জীবনের গলিঘুঁজি ছাড়িয়ে রাজপথে উঠে আসা সেই মেয়েটির দেখা পেতেও কেটে গেল অনেক দিন, যে এখন কেমিস্ট্রি অনার্স পড়ছে। শহরের পথেঘাটে এরকম আরো অনেকে আছেন - ভেবে আশ্বস্ত হই।

    আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কলকাতা এখন আগের থেকেও ব্যস্ত। সবাই দৌড়োচ্ছে। যার কাজ নেই সে কাজ পাওয়ার আশায়, যার একটা কাজ আছে সে দ্বিতীয়টির দিকে এবং এইভাবে সবাই তাদের সময়ের ফাঁকফোকর ভরিয়ে ফেলেছে নানান পেশায়। লিমিটেড কম্পানীর দিন কবেই শেষ, এখন সবই "আনলিমিটেড"। মাইনে ও খরচা, ঝগড়া ও প্রেমালাপ,গান থেকে ফান, সব এই নিয়মে চলে এ শহরে।

    ফিরে আসি শহরের নিজের কথায়। শহরের রাস্তা ধরে হাঁটতে থাকি। প্রতি পদক্ষেপে একটু একটু করে নিজের অজান্তেই শুষে নিতে থাকি শহরের ভালোমন্দ। ভেতরে যে দৈত্য ও দেবতারা ঘুমিয়ে ছিলো, জল পেয়ে তারা আবার লকলক করে বাড়তে থাকে। এ শহরের স্বাভাবিক অহংবোধ, অ-স্বাভাবিক উন্নাসিকতা ও স্বভাবসিদ্ধ অবহেলা অতি ধীরে গ্রাস করে নিতে চায় আমায়। বহুদিন পরে শত ডেসিবেলের শব্দে ডুবে থাকতে এতটুকু অসুবিধে হয়না। প্রতিবেশীর লাউড স্পিকারে ঘুম ভাঙে, গাড়ির আওয়াজ থেমে গেলে ঘুম নামে চোখে, অনেকদিন পর ফিরে পাই নিত্যকার এই "অসুবিধা"দের, যেকোনো জীবন্ত শহরেই যাদের খুঁজে পাওয়া যায়। এই অসুবিধাগুলো নিয়ে বাঁচতে ভালো লাগছে দেখে ভরসা হয়।

    জানুয়ারী ১১, ২০০৯
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১১ জানুয়ারি ২০০৯ | ১০৭৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন