• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দা #বেরসিক

    প্রলয় বসু
    আলোচনা : বিবিধ | ০৮ জুলাই ২০২০ | ৮০৭ বার পঠিত

  • বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দা
    #বেরসিক

    আমাদের বাড়িতে ছোটবেলায় ঠাকুমার এক বন্ধু, পাড়ারই এক বয়স্ক মহিলা, আসতেন। ঠাকুমা তাকে 'মেজদি' বলে ডাকতেন। আর আমরা সকলে, মানে ছোটরা, তাকে 'বিবিধ ভারতী' অথবা 'বিবিসি' বলতাম। সামনে না অবশ্য, পিছনেই। তিনি প্রায় প্রতিদিনই বিকেলবেলা, পাড়ার সকলের বাড়িতে যেতেন। প্রত্যেক বাড়ির জন্যেই তার বিকেল আর সন্ধ্যার খানিকটা সময় বরাদ্দ করে রাখতেন। আসতেন, চা খেতেন, গল্প করতেন, এক সময়ে চলে যেতেন। খালি হাতে ফিরতেন না। যাবার সময় তাঁর ঝুলিতে জমা পরতো একরাশ 'খবর'। যেমন চলে যাবার আগে দিয়ে যেতেন পাড়ার সব বাড়ির 'হাঁড়ির খবর'। পাড়ার কারো যদি অন্য কোন বাড়ির 'খবর' নেবার ইচ্ছে হতো, তাহলে মেজদির খোঁজ পরতো। 


    এখনকার ফ্ল্যাট কালচারের জন্যে পুরনো কলকাতার অনেক কিছুর সাথে সাথে, পাড়া কালচারটাও ধ্বংস হয়ে গেছে। হারিয়ে গেছেন 'মেজদি'রা। এখন আর কেউ কারো বাড়িতে চা খেতে বা গল্প করতে যায় না। 'ইনভাইট' করতে হয়, আমন্ত্রণ জানাতে হয়। আগে থেকে। সে যাক, এটা আসল কথা না। যা বলতে শুরু করেছিলাম।


    পুরনো পাড়ার এই 'মেজদি'রাই হলেন গোয়েন্দাদের 'আদি রূপ'। 'গোয়েন্দা' শব্দটা বাড়াবাড়ি মনে হলে 'গুপ্তচর' বলা যেতে পারে। 'ইনফরমেশন' বা 'তথ্য' জিনিসটা গোয়েন্দাদের জন্যে ভীষণ ভাবে জরুরী। তথ্য না থাকলে অনুসন্ধান (ইনভেস্টিগেশন) করতে অসুবিধা হয়, যদিও অনুসন্ধান করেও তথ্যের সন্ধান করতে হয়। আর যার কাছে তথ্য আছে, বিশ্লেষণ করতে পারলে গোয়েন্দা, নয়তো গুপ্তচর। এই গুপ্তচরের কাজ হলো, 'সঠিক জায়গায়' খবর (তথ্য) পৌছেঁ দেওয়া। এদেরকে অবশ্য পুলিশি ভাষায় 'খবরি' বা 'ইনফর্মার' বলা হয়। অন্ধকার জগতের খোঁজখবর নেওয়ার জন্যে পুলিশের নিজস্ব 'খবরি' বা 'ইনফর্মার' থাকে। তারাই সমস্ত চোরছ্যাচোরদের খোঁজ খবর এনে দেয় পুলিশকে। যার 'সোর্স' যত পাকাপোক্ত, নেটওয়ার্ক যত শক্তিশালী, সে তত সফল পুলিশ। 


    আদি অনন্ত কাল ধরে এরা, মানে 'মেজদি'রা বর্তমান। একটা গল্প দিয়েই শুরু করা যাক। আমি আবার গল্প শুরু করলে তাল থাকে না, বেপথে গেলেই থামিয়ে দেবেন কিন্তু। আগেই সাবধান করে দিলাম।

    অপরাধমূলক (ক্রাইম) গল্পের শুরু কবে থেকে হয়েছে, এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া বেশ কঠিন, তবে এইধরণের গল্পের ছায়া ঋগ্ বেদেও আছে। আর সেই গল্প আদতে ডাকাত অথবা চোরের হাতে গরু চুরির গল্প। এবং কুকুরের সাহায্যে চোরকে ধরার গল্প। এই গল্পে দুটো জিনিস লক্ষ করার মতো। 


    প্রথম, কুকুরকে গুপ্তচর হিসেবে ব্যবহার করা। বলা চলে কুকুরকে গোয়েন্দাকর্মে নিযুক্ত করা। যা আধুনিক কালের রীতি বলা চলে। গোয়েন্দা কুকুর বা স্নাইফার ডগের ব্যবহার করে বোমা খুঁজে বের করার ঘটনা খবরের কাগজে হামেশাই পড়ে থাকি।

    দ্বিতীয়, কুকুরের নাম। কুকুরটির নাম ছিল সরমা। কুকুরটিকে কেবলমাত্র প্রাণী হিসেবে না দেখে রূপকের আঙিনায় দেখলে আরো অবাক হতে হয়। সরমা অর্থাৎ একজন মহিলা ছিলেন প্রথম গোয়েন্দা। মাতাহারিদের খবরে চমকে ওঠার কিছু নেই। যুগে যুগে মাতাহারিদের দেখতে কি আমরা খুব অনভ্যস্ত ছিলাম? অবশ্য আমার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গোয়েন্দা মা। মায়েরা যেমন মুখ দেখেই সন্তানের মনের খবর পেয়ে যায়, তেমনটা আর কোন গোয়েন্দা পায় কি?

    দেখেছেন? সেই বেপথে পা বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। ভাগ্যিস ঠিক সময়ে থেমেছি। তা যা বলছিলাম, 'সরমা' নামেই বোঝা যায় মেয়ে। এখন কুকুরকে প্রতীকী ভাবলে, মহিলা। অর্থাৎ নারী গোয়েন্দা। বা নারী গুপ্তচর। ঠাকুমার 'মেজদি'। আমাদের 'বিবিসি'। অথচ এই 'সরমা'দের গোয়েন্দা গল্পে পেতে আমাদের সময় লেগেছে বহুদিন। গোয়েন্দা বললেই আমাদের চোখে ভাসে পুরুষের মুখ। তা সে ফেলু মিত্তির হোক বা ব্যোমকেশ। সবাই পুরুষ। পুরুষ গোয়েন্দা। কিন্তু নারী গোয়েন্দা কি নেই? আছে। চারপাশে তাকালেই আছে। গল্পে নেই, সাহিত্যে নেই। নেই না, অভাব আছে। অথচ সাহিত্য কে বলা হয় সমাজের দর্পণ। তাহলে? আছেন, রান্নাঘরে, ঘরের কোণে। সেখানে বসেই সমাধান করতে পারেন সমস্যার। তাই বোধহয় মিস জেন মার্পেল উল বুনতে বুনতে, অনায়াসে সমস্যার সমাধান করেন। পাহাড়-সমুদ্র দেখে ফেলি অথচ শিশির বিন্দু দেখে উঠতে পারি না, সেটাতো জানা কথা। দেশের মানুষের, বাঙালি নারী গোয়েন্দাদের কথা বলবো বলেই তো আড্ডা মারতে বসা। কিন্তু একবার যখন মিস মার্পেলের কথা যখন উঠলোই, তখন বিদেশি মহিলা গোয়েন্দাদের দিকে এক ঝলক দেখে আসি। 


    প্রথম নারী গোয়েন্দা লেখক কে? কিংবা কে প্রথম নারী গোয়েন্দা চরিত্র? তা নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। তবে একটা বিষয়ে কোন মতভেদ নেই। আর তা হল, মহিলা ঔপন্যাসিক অ্যানা ক্যাথরিন গ্রীন (Anna Catharine Green; ১৮৪৬-১৯৩৫) এর নাম উচ্চারণ করা। কেন? মহিলাদের সাধারণত গোয়েন্দা গল্পের 'ভিকটিম' (শিকার বা ক্ষতিগ্রস্ত) হিসেবে দেখানো হয়, সেটিই রীতি ছিল। প্রচলিত সেই রীতি ভাঙলেন গ্রীন। মহিলাদের, গোয়েন্দা হিসেবে প্রথম চরিত্রায়ন করলেন ক্যাথরিন গ্রীনই, সেটা ওনার সবচেয়ে বড় সাফল্য। একমাত্র নয়, সবচেয়ে বড়। উনিই প্রথম মহিলা গোয়েন্দার স্রষ্টা। তবে, কে প্রথম 'তুমি না আমি'-র মতো বিতর্ক আছে, এমিলিয়া বাটারওয়ার্থ আর ভায়োলেট স্ট্রেঞ্জের মধ্যে। কোন গবেষক এমিলিয়া বাটারওয়ার্থকে ভোট দিয়েছেন আবার কেউ স্ট্রেঞ্জের দিকে ঝুঁকছেন। বাটারওয়ার্থকে অনেকেই শুধুমাত্র সহকারী বলে মনে করেন। তবে এই বাটারওয়ার্থই যে মিস মার্পেলের অগ্রজ সে বিষয়ে প্রায় সকলেই নিশ্চিত। ক্যাথরিন গ্রীন গোয়েন্দা সাহিত্যকে দিয়েছেন অনেক। অনেক। কী দিয়েছেন আর?

    ১৮৭৮ সালে ওনার (ক্যাথরিন গ্রীন) প্রথম লেখা 'দ্যা লিভেনওয়ার্থ কেস'। সৃষ্টি করলেন গোয়েন্দা গ্রাইসকে (Mr Ebenezer Gryce)। স্বাভাবিক নিয়মেই তিনি এরপর বিভিন্ন গল্পের জন্যে বেশ কয়েকজন গোয়েন্দার সৃষ্টি করেছিলেন।

    তবে তাঁর প্রথম গোয়েন্দা, গ্রাইসকে তিনি ভুলে যাননি। এই গ্রাইসকে নিয়েই এরপর বেশ কয়েকটি ডিটেকটিভ গল্প লিখে, প্রথম 'সিরিজ' গোয়েন্দার সৃষ্টি করলেন। বলা চলে, গোয়েন্দা গল্পের 'ক্লাসিক ফর্মুলা'টি তৈরী করে দিলেন। শার্লক হোমস বিখ্যাত হবার আগে গ্রাইসই ছিলেন, সবচেয়ে বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র। গ্রাইসের প্রভাব পরবর্তী কালে কিছু কিছু গোয়েন্দার উপর পড়েছে বলেই মনে করেন গবেষকরা। মনে করা হয়, এমনকি খোদ পোয়ারোর উপরেও ওনার বিশেষ প্রভাব আছে। যদিও সবটাই ধারনা। তা 'সিরিজ' গোয়েন্দার বা বলা যায় গোয়েন্দাদের 'সিরিজ' এর ফর্মুলা তৈরি করলেন ক্যাথরিন গ্রীন। 


    যদিও ব্যপার এমন না, যে আগে কেউ একই গোয়েন্দাকে নিয়ে বারবার লেখেননি। তবে... আচ্ছা আরেকটু বলেই দেই বরং পরিষ্কার করে। তাহলে চলুন সুগন্ধির দেশ ফ্রান্সে যাই। এই ফ্রান্সের মানুষ এমিল গাবরিও (Émile Gaboriau; ১৮৩২-১৮৭৩)। গোয়েন্দা মঁসিয়ে লিকক্ (Monsieur Lecoq) কে নিয়ে সৃষ্টি করলেন 'লা অ্যাফেয়ার দ রুলা ভিজ' (L'Affaire Lerouge; ইংরেজিতে The Widow Lerouge)। প্যারিসের এক সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ১৮৬৬ সালে। অনেক গবেষকই মনে করেন, এই চরিত্রটিকে ভিদককে মাথায় রেখেই গড়ে তোলা হয়েছে। এখন আবার ভিদকের পরিচয় চাইতে বসবেন না, দয়া করে। সে এক বর্ণময় চরিত্র। কী করেননি তার জীবদ্দশায়, সেটাই ভাববার। আচ্ছা, বরং ভিদককে একটু ছুঁয়েই যাই, অল্প কথায়। 


    ইউজিন ভিদক (Eugène François Vidocq; ১৭৭৫-১৮৫৭) অল্প বয়সেই ফরাসী সেনাবাহিনীর সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধক্ষেত্রেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের পর নানান অপরাধের জন্যে বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন। এরপর সেনাবাহিনীর চর হিসেবে কাজ শুরু করেন ১৮০৯ সালে। ১৮১১ সালে ভিদক সাদা পোষাকের পুলিশ-বাহিনী গঠন করেন, 'ব্রিগেদে দে লা সুরেতে" বা 'সিকিউরিটি ব্রিগেড' নামে। ১৮১২ সালে এই পুলিশ বাহিনীকে ফ্রান্সের পুলিশ বিভাগ স্বীকৃতি দেয়। আর ভিদক এই বিভাগের কর্তা নিযুক্ত হন। ১৮২৭ অবধি চাকরি করে তারপর নানান প্রশ্নের মুখে ইস্তফা দেন চাকরি থেকে। ১৮৩৩ সালে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম, 'লে ব্যুরো দ্য রেঁনসেমেন্তস' (অফিস অফ ইনফরমেশন) নামে বেসরকারী গোয়েন্দা সংস্থা খোলেন। এদিকে, ১৮২৮ সালেই 'মেমোয়ার্স দ্য ভিদক' এর প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয়। ভিদকের জীবনী স্বরূপ। এরপর অবশ্য (১৮৩৬ থেকে ১৮৪৬) আরো তিনটি খন্ড 'মেমোয়ার্স দ্য ভিদক' প্রকাশিত হয়। যেখানে তার অভিজ্ঞতার নানা গল্পের কথা দেওয়া আছে। যদিও প্রায় সমস্ত বিশেষজ্ঞদের মতামত এই বইগুলো ভিদকের নিজের লেখা নয়, অন্য কোন এক বা একাধিক ব্যক্তির লেখা। তবু একটা কথা বলতে হয়। 'মহাভারত' এর রচয়িতা হিসেবে কিন্তু আমরা ব্যাসদেবেরই নাম করি, গনেশের নয়। তা এহেন ভিদককে মাথায় রেখেই সৃষ্টি হলো, মঁসিয়ে লিকক্ চরিত্রটি। চরিত্রের বর্ণনা করতে গিয়ে গাবরিও বলেছেন, "আগে স্বভাব অপরাধী হলেও, এখন আইন মেনেই চলে এবং নিজের কাজের ব্যপারে খুবই দক্ষ"। কেন ভিদকের কথা বলা হয়েছে বোঝাটা খুব কঠিন নয়। তবে, গাবরিওর সাফল্য অন্য জায়গায়। গাবরিওই প্রথম সুপার-স্ল্যুথ (Super-sleuth) এই ধারণার সৃষ্টি করেন। লিকক্ কে সাহায্য করার জন্যে নিয়ে আসেন পের ট্যাবারেটকে (Pere Tabaret), যিনি একজন বেসরকারি গোয়েন্দা। এইরকম সুপার-স্ল্যুথ হিসেবে এরপর শার্লক হোমসের দাদা মাইক্রফ্ট হোমসকে আমরা পেয়েছি। সেকথা থাক, এখন। না হলে আবার বেলাইন হয়ে যাব। গাবরিও প্রায় কুড়িটি মতো গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাস লিখেছিলেন ১৮৭৩ সাল অবধি। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য 'মঁসিও লফো' (১৮৬৯), 'ল্যা এক্লাভে দ্যা প্যারি' (১৮৬৯), 'লা ভি এফেরনান' (১৮৭০)। তবে গাবরিও বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি প্রতিটি গল্পে নতুন নতুন গোয়েন্দার সৃষ্টি করেন। অবশ্য তখনো পর্যন্ত কোন গোয়েন্দাকে নিয়ে 'সিরিজ' লেখার প্রবনতা তৈরী হয়নি। যদিও গবেষকেরা গাবরিওর বৈশিষ্ট্য বলতে, নির্দ্বিধায় প্রতি গল্পে ভিন্ন (আলাদা) গোয়েন্দার কথা বলেন, এটাই দেখেছি। কিন্তু গাবরিও অন্তত ছটি গল্প লিকক্ কে নিয়ে লিখেছিলেন। কিন্তু সেই লেখা সিরিজের মর্যাদা পায়নি। 


    এখানে 'ফেলুদা ফ্যান' হিসেবে একটা কথা বলতে পারি। আচ্ছা, 'ঘুরঘুটিয়ার ঘটনা' গল্পটার কথা মনে আছে? যেখানে টিয়া পাখির মুখ দিয়ে বেরিয়েছিল সেই বিখ্যাত 'ত্রিনয়ন ও ত্রিনয়ন, একটু জিরো', যা আসলে একটি সংকেত। সিন্দুকের সংকেত নম্বর। এই গল্পে, কালীকিঙ্কর মজুমদার... না, কালীকিঙ্কর মজুমদার নন, ছদ্মবেশী বিশ্বনাথ মজুমদার, ফেলুদাকে সংকেত নম্বর উদ্ধারের পরিবর্তে এই, এমিল গ্যাবেরিও-র (সত্যজিৎ রায় এই বানানটিই লিখেছিলেন), বই উপহার (ঘুষ?) দিতে চেয়েছিলেন। কী মনে নেই? আরেকবার পড়ে ফেলুন।

    এই প্রসঙ্গে 'সিরিজ' গোয়েন্দার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে কয়েকটা কথা শ্রদ্ধেয় সুকুমার সেন বলেছেন, তা নীচে তুলে দিলাম,

    "... কোন লেখক যদি একই ডিটেকটিভ নিয়ে কিছুকাল ধরে গল্প রচনা করতে থাকেন তবে কখনো কখনো তাঁর কাহিনী গুলোর মধ্যে দিয়ে ডিটেকটিভের জীবনসূত্রের কিছু কিছু টুকরা গাঁথা পড়ে যায়। এই ভগ্নাংশ গুলি থেকে ধারাবাহিক জীবনকাহিনী না পেলেও ডিটেকটিভের ব্যক্তি-পরিচয়, তাঁর আচার-ব্যবহার ও গৃহজীবনের ইঙ্গিত ইত্যাদি যা পাওয়া যায় ... একটু অতিরিক্ত ভাললাগার সঞ্চার হয় যার নাম দিতে পারি পরিচয়-রস। তাতে পাঠকের আগ্রহ বাড়ে।"

    আর ঠিক এখানেই গ্রাইস আর লিকক্ এর পার্থক্য। লিকক্ কে আলাদা করে কোন পরিচিতি দেননি, গাবরিও। কিন্তু ক্যাথরিন গ্রীন ১৮৭৮ থেকে ১৯১৭ অবধি গ্রাইসকে নিয়ে পরপর গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন, তাতে গ্রাইসের বিভিন্ন বয়সের এবং পরিস্থিতির সাথে পাঠকের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। আর সেই কারণেই গ্রাইকেই প্রথম 'সিরিজ' গোয়েন্দার মর্জাদা দেওয়া হয়। তাই একাধারে প্রথম নারী গোয়েন্দার সৃষ্টি আবার 'সিরিজ' গোয়েন্দার ফর্মুলা আবিষ্কার করেছিলেন ক্যাথরিন গ্রীন। সেই কারণেই আগাথা ক্রিস্টিকে যেমন 'গোয়েন্দা গল্পের সম্রাজ্ঞী' বলা হয়, তেমনই গ্রীনকে 'দ্যা মাদার অফ ডিটেকটিভ নোভেল' বলা হয়।

    মহিলা গোয়েন্দার কথাতে মাথায় এলো আরো একজনের নাম। ক্যাথরিন ক্রো। ওনার লেখা 'দ্যা অ্যাডভেঞ্চারস্ অফ সুজান হপ্লি অর সার্কামস্ট্যানশিয়াল এভিডেন্স'। প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৪১ সালে। এডগার অ্যালান পো-র 'মার্ডার ইন দ্যা রু মর্গ' (The Murders in the Rue Morgue) এর কয়েক মাস আগেই। প্রসঙ্গত, 'দ্যা মার্ডার ইন দ্যা রু মর্গ' ১৮৪১ সালের এপ্রিল মাসে, ফিলাডেলফিয়া থেকে গ্রাহামস ম্যাগাজিনে (Graham's Magazine), প্রকাশিত হয় এবং এই গল্পটিকেই পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা গল্পের মর্যাদা দেওয়া হয়। অর্থাৎ যথার্থ গোয়েন্দা গল্পের সূত্রপাত বলে ধরা হয়। পো নিজে ইংরেজ হলেও তাঁর গোয়েন্দা (ডিটেকটিভ; ডিটেকটিভ শব্দটি প্রথম অক্সফোর্ড ডিকশনারিতে স্থান পায় ১৮৪৩ সালে। ধরে নেওয়া যেতে পারে তার কিছুদিন আগে থেকেই এর মৌখিক ব্যবহার প্রচলিত ছিল, তারপর স্থান হয় ডিকশনারিতে।) ছিলেন, ফরাসী মঁসিয়ে চার্লস অগাস্ট দুপ্যাঁ (Charles Auguste Dupin)। সাহিত্যের গবেষকরা মনে করেন এর কারণ সম্ভবত, ভলটেয়ার অথবা ভিদকের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যেই। 


    তা, ক্যাথেরিন ক্রোর প্রধান চরিত্র সুজান হপ্লি একজন গৃহপরিচারিকা। বহু ভয়ংকর আর আধাভৌতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে শেষে সাহসিকতার সঙ্গেই সব সমস্যার সমাধান করতে পারে সে। এই গল্পের মধ্যেও রহস্য সমাধানের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। এক সময়ে এই নিয়ে বেশ বিতর্কও হয়েছিল। সামান্য হলেও টলে গিয়েছিলো পো এবং দ্যুঁপার (মঁসিয়ে আগস্টাস দ্যুঁপা, 'মার্ডার ইন দ্যা রু মর্গ' এর গোয়েন্দা, পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা) আসন। তাহলে কি ক্যাথরিন ক্রো কেবল প্রথম নারী গোয়েন্দা চরিত্রেরই স্রষ্টা নন, বরং প্রথম গোয়েন্দা কাহিনিরও রচয়িতা? 


    কিন্তু যেহেতু ক্রোর গল্প 'গোয়েন্দা গল্পের শর্ত' পালন করেনা, তাই সুজান হপ্লি প্রথম গোয়েন্দাও নন, আর ক্রো প্রথম গোয়েন্দা গল্পের রচয়িতা নন। ক্যাথরিন ক্রো যেমন প্রথম নন, ক্যাথরিন গ্রীনও কিন্তু প্রথম মহিলা গোয়েন্দা লেখক নন। প্রথম মহিলা গোয়েন্দা লেখক হলেন, মেট্টা ভিক্টোরিয়া ফুলার ভিক্টর (Metta Victoria Fuller Victor)। 'ডেড লেটার' (১৮৬৬) লেখাটি অবশ্য সিলি রেজেস্টার (Seeley Regester) ছদ্মনাম ব্যবহার করে লিখেছিলেন তিনি। এবার আরেকটু মাথা ঘুরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করি। 


    সুজান হপ্লিকে নিয়ে ক্যাথরিন ক্রো লিখেছিলেন ১৮৪১ সালে। যদি আরো সাতচল্লিশ বছর পিছিয়ে যাই তাহলে? অ্যান র‍্যাডক্লিফের লেখা 'দ্য মিস্ট্রিস অফ উডলফো' প্রকাশিত হলো ১৭৯৪ সালে। গল্পের নায়িকা এমিলি সেন্ট অবার্ট, অনেকটা হপ্লির মতোই বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রতিকূল অবস্থার মোকাবিলা করতে করতে সফল হন, নিজের লক্ষ্যে পৌঁছাতে। ফিরে পান নিজের প্রেমিককে। গোয়েন্দা সাহিত্যের অনেক বিশেষজ্ঞই মনে করেন এমিলির কাজেকর্মের মধ্যে 'গোয়েন্দা সুলভ' হাবভাব পাওয়া যায়। তবে সেই হপ্লির মতোই এখানেও 'অনুসন্ধান' এর অভাব আছে। অভাব আছে গল্পের মধ্যে 'গোয়েন্দা গল্পের শর্ত' মানার ক্ষেত্রেও, তাই গোয়েন্দা গল্পের ধারার মধ্যে ধরা হয় না। 


    এরপর, ১৮৬৪ সালে ইংল্যান্ডে দুজন নারী গোয়েন্দাকে নিয়ে বই প্রকাশিত হয়। অ্যান্ড্রু ফরেস্টার জুনিয়রের 'দ্য ফিমেল ডিটেকটিভ' আর ডব্লিউ এস হেওয়ার্ডের 'রিভিলেশনস অব আ লেডি ডিটেকটিভ'। 'দ্য ফিমেল ডিটেকটিভ' এর গোয়েন্দা মিসেস গ্ল্যাডেন। 'রিভিলেশনস অব আ লেডি ডিটেকটিভ'-এর গোয়েন্দা চল্লিশোর্ধ্ব এক বিধবা মিসেস পাশেল। এরা (গোয়েন্দারা) নারী আর লেখক 'আনাড়ী'। দুভাবেই। দুজন লেখকই পুরুষ। দুজনের লেখাই বড়ো দুর্বল। তবে, দুজন দুটি উপহার দিয়েছিলেন। মিসেস গ্ল্যাডেনের জুতোর ছাপ দেখে, বিশ্লেষণ করে অপরাধীকে শনাক্ত করা, যা শার্লক হোমস পরবর্তী সময়ে জনপ্রিয় করেন। আর মিসেস পাশেলের পথে চলেই সম্ভবত 'হার্ড বয়েল ডিটেকটিভ' ধারার সৃষ্টি হয় পরে। 


    জানিনা কেন এই দুজনকে বাদ দিয়ে ক্যাথরিন গ্রীনের এমিলিয়া বাটারওয়ার্থ আর ভায়োলেট স্ট্রেঞ্জের মধ্যে টানাটানি চলে, কে প্রথম মহিলা গোয়েন্দা বলে। তবে মহিলা লেখকের প্রথম মহিলা গোয়েন্দা এদের দুজনেরই একজন। 


    বাটারওয়ার্থ এসেছেন ১৮৯৭ সালে, আর স্ট্রেঞ্জ ১৮৯৯ সালে। কিন্তু সমস্যা হলো, গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। বাটারওয়ার্থ কে অনেকেই কেবল গ্রাইসের সাহায্যকারী (মতান্তরে সহকারী) ভাবেন। গোয়েন্দা সাহিত্যে চাকচিক্যহীন অথচ তীক্ষ্ণ বুদ্ধি আর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা সম্পন্ন, বয়স্ক এবং অবিবাহিত নারী গোয়েন্দা ধারার শুরু হয় এই মিস বাটারওয়ার্থের জন্যেই। যার পূর্ণতা পায় আগাথা ক্রিস্টির, মিস মার্পল আর প্যাট্রিশিয়া ওয়েন্টওয়ার্থের, মিস মড সিলভার চরিত্রের মধ্য দিয়ে। আবার অনেকেই ১৮৫৬ সালে উইকি কলিন্সের লেখা 'দ্য ডায়রি অব অ্যান রডওয়ে' উপন্যাসের নায়িকা অ্যান রডওয়েকে প্রথম নারী গোয়েন্দার তকমা দিতে চান। তবে বিদেশী মহিলা গোয়েন্দা নিয়ে বেশী কচকচানি না করে বাংলায় ফিরে আসবো। বিদেশে নানা ধরনের মহিলা গোয়েন্দাকে দেখতে পাওয়া যায়। 'সাধারণ' গোয়েন্দা, 'মিস মার্পেল' ধাচের, 'হার্ড বয়েল' গোয়েন্দা, সমকামী গোয়েন্দা, প্রতিবন্ধী গোয়েন্দা সব। বহু মহিলা লেখকেরও দেখা মেলে। অথচ বাংলাতে মহিলা গোয়েন্দা হাতে গোনা।

    বাংলাতে গোয়েন্দা গল্পের সূচনার প্রায় গোড়া থেকেই 'বাজার' প্রাইভেট ডিটেকটিভদের (বেসরকারি গোয়েন্দা) দখলে। আর এই প্রাইভেট ডিটেকটিভ যে শার্লক হোমসের জন্যেই এসেছে, সন্দেহ নেই। তেমনই মেয়েদের গোয়েন্দা গল্পের নায়ক (অথবা নায়িকা) হয়ে ওঠার পিছনেও অবদান যে মিস মার্পেলের তাতেও সন্দেহ নেই। যদিও এ নিয়ে একটু আধটু তর্ক চলতে পারে, তবে উনিই। সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়ের বিন্দিপিসি ('বিন্দিপিসির গোয়েন্দাগিরি') অথবা প্রতুলচন্দ্র গুপ্তের সদু ঠাকুমা ('ঠাকুমার গোয়েন্দাগিরি') যে মিস মার্পেলের আদলে গড়ে উঠেছে, তা দিব্বি

    বোঝা যায়। কারণ ওনার মতো করেই ঘরের এক কোণে বসে কাঁথা সেলাই করতে করতে কিংবা কীর্তনের আসরে বসেও অপরাধীকে চিনে নিতে এনাদের অসুবিধা হয়না। যদিও গল্পের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়নি। এই পিসি-ঠাকুমা, একান্ত ভাবেই বাঙালী, বাংলার। গ্রামের মানুষের চেনা গন্ধ এদের গাঁয়ে মিশে আছে। বাংলা ভাষার লেখাতে নারী গোয়েন্দার অভাব, অথচ এক নারী যদি না সাহায্য না করতেন তাহলে বাংলাতে গোয়েন্দা গল্প লেখার চর্চাটাই শুরু হতো না ভালো করে। কে? কেন? কিভাবে? এই প্রশ্ন গুলো স্বাভাবিক। আসুন, নীচে তারই উত্তর খুঁজি।

    স্বর্ণকুমারী দেবী তখন 'ভারতী' মাসিক সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদিকা। স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় দিদি। তিনিই এই 'ভারতী' পত্রিকার সম্পাদকের ভূমিকা পালন করতেন। গোয়েন্দা গল্পের বিস্তারের শুরুর দিকে, গোয়েন্দা গল্পকে যখন 'বটতলার বই' বলেই দেগে দেওয়াটাই রীতি ছিল, সেই সময়ে, স্বর্ণকুমারী দেবী ও তাঁর 'ভারতী' পত্রিকার অবদানের কথা স্বীকার না করাটা অত্যন্ত অনায্য হবে। তারই উৎসাহে ১৮৮৭ সালে প্রকাশিত হলো নগেন্দ্রনাথ গুপ্তর 'চুরি না বাহাদুরি'। বৈশাখ, ১২৯৪ সংখ্যায়। এই 'চুরি না বাহাদুরি' কেই বাংলা ভাষায় প্রথম গোয়েন্দা গল্প বলে ধরা হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, ঐতিহাসিক হরিসাধন মুখোপাধ্যায়ের 'হত্যাকারী কে?', বাংলা ভাষাতে লেখা প্রথম ধারাবাহিক উপন্যাস, ছাপা হয়েছিল এই 'ভারতী'তেই। দীনেন্দ্রকুমার রায়ের গোয়েন্দা গল্পের হাতেখড়ি হয়েছিল এই 'ভারতী'তেই। শুরুটা অন্য পত্রিকাতে হলেও, 'হেমেন্দ্রকুমার' এর জন্ম 'ভারতী'তেই। এরপর অনেকটা পথ চলতে হবে। আসুন।

    বাংলা গোয়েন্দা গল্পে নারীদের স্থান খুবই কম। নারী গোয়েন্দা লেখক বা নারী গোয়েন্দা শুধু নয়। চরিত্র হিসেবেও। গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র দীনেন্দ্রকুমার রায়ের পর, শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের

    'ব্যোমকেশ' ছাড়া আর সেভাবে কারো লেখায় গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র পাওয়া যায় না। সম্ভবত সেটা দেখেই, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার 'কলকাতার জঙ্গলে' গল্পের এক চরিত্র, দেবলীনা দত্তের মুখ দিয়ে প্রশ্ন করিয়েছিলেন, কাকাবাবুর দুঃসাহসিক অভিযানে কেন মেয়েদের দেখা যায় না? না সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, না কাকাবাবু কেউই উত্তর দেননি। দিতে পারেননি বলা যায়। কাকাবাবু বরং দেবলীনাকে সঙ্গী করেছেন, কয়েকবার, এরপরে তাঁর অ্যাডভেঞ্চারে।

    ১৩০৬ বঙ্গাব্দে (১৮৯৯ সাল) গোয়েন্দা গল্প লিখে, 'কুন্তলীন পুরস্কার' পেয়েছিলেন রজনীচন্দ্র দত্ত ('অদ্ভুত হত্যা', প্রথম পুরস্কার, ত্রিশ টাকা), দীনেন্দ্রকুমার রায় ('অদল বদল', দ্বিতীয় পুরস্কার, কুড়ি টাকা), জগদানন্দ রায় ('গহনার বাক্স', সপ্তম পুরস্কার) এবং সরলাবালা দাসী ('রেলে চুরি', অষ্টম পুরস্কার)। লক্ষণীয় এর প্রত্যেকটি গল্পই মৌলিক। একটিও বিদেশী গল্পের অবলম্বনে নয়। সরলাবালা দাসী সরকার (১৮৭৫-১৯৬১), অমৃত বাজার পত্রিকার কর্ণধার শিশির কুমার ঘোষের বোন এবং স্বনামধন্য গোয়েন্দা গল্পের লেখক শরচ্চন্দ্র সরকারের স্ত্রী, সম্ভবত বাংলাতে প্রথম মহিলা গোয়েন্দা গল্পের লেখিকা। পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা গল্প আর না লিখলেও কবিতা অনেক লিখেছিলেন। এনার গোয়েন্দা কিন্তু মহিলা নন, পুরুষ, পুলিশের গোয়েন্দা সুধাংশুশেখর বসু। বাঙালী লেখকের কলমে প্রথম মহিলা গোয়েন্দা এসেছে, আরো অনেক পরে। সেই গল্পেই আসছি। ১৮৯৯ সালের পর গোয়েন্দা গল্পের লেখিকা হিসেবে আর কাউকে আমাদের পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কিছু বছর।

    'এ যুগের দুঃশাসন' আর 'ব্যথার দিন' নামে দুটো গোয়েন্দা গল্প প্রহেলিকা সিরিজে লিখেছিলেন সুষমা সেন। তাঁর গোয়েন্দাও ছিলেন পুরুষ, শৈলেন চৌধুরী। এগারো বছরের ছোট্ট অন্তু আবার 'চুরির তদন্ত' করে গোয়েন্দা হয়ে উঠেছিল প্রতিভা বসুর কলমে। 'প্রাইভেট ডিটেকটিভ' বিমানবিহারীকে দিয়ে 'রহস্যভেদ' করেছিলেন আশালতা সিংহ। কাঞ্চনজঙ্ঘা সিরিজের জন্যে লেখা, 'জয়পতাকা' গল্পে, শৈলবালা ঘোষজায়ার (১৮৯৪-১৯৭৪) নায়ক ছিলো, কিশোর জিমূতবাহন। তবে এই গল্পের বিশেষত্ব, কিশোর 'গোয়েন্দা' নয়, বরং পুলিশকে অপরাধীর আসনে বসানোর মধ্যেই। স্বাধীনতার আগে ইংরেজ পুলিশি ব্যবস্থাকে তুলোধোনা করেছিলেন শৈলবালা ঘোষজায়া। তাঁর লেখা একটা রহস্য উপন্যাস ‘চৌকো চোয়াল’ এর কথা আমি শুনেছি, লেখাটা পড়িনি, প্রকাশিত হয়েছিল ‘বঙ্গশ্রী’ মাসিক পত্রিকায়। কামরুন্নেছা খাতুন ওরফে পান্না বেগম লিখেছিলেন 'গাঙ্গুলীমশায়ের সংসার'।

    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের থেকে দীনেন্দ্রকুমার রায় পর্যন্ত, নারী মানে হয় অত্যাচারিত বা ক্ষতিগ্রস্ত (ভিক্টিম)। অপরাধী হিসেবেও নারীকে ব্যবহার করা হয়েছে বহুবার। প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখায় তৈলোক্যতারিনীর কথা অনেকেই পড়েছেন। পাঁচকড়ি দের খলনায়িকা জুমেলিয়া অথবা দীনেন্দ্রকুমার রায়ের গল্পে মেয়ে দস্যু মিস ওলগা নাসমিথ, উপস্থিত। অথচ সদর্থক ভূমিকায় দেখা যায় না তেমন। নেই নেই করে লেখক হিসেবেও অনেকেই চলে এসেছেন গোয়েন্দা গল্পের দুনিয়ায়। কিন্তু 'তোমার দেখা নাই রে' বলে হাহুতাশ করতে হয়েছে আরো কিছুদিন। কার? নারী গোয়েন্দা। অথচ মেয়েদের মধ্যে সহজাত 'গোয়েন্দা' লুকিয়ে থাকে। মা-স্ত্রী-কণ্যা যে রূপেই আসুক না কেন, এক ঝলক মুখের দিকে তাকিয়ে মন পড়ে নেবার ক্ষমতা এদের মতো আর কারো নেই। আমি দেখিনি।

    ১৯৪০-৫০ এর দশকে 'প্রহেলিকা' সিরিজে জন্ম হলো গোয়েন্দা কৃষ্ণার, 'গুপ্তঘাতক' গল্পে। প্রভাবতী দেবী সরস্বতীর (১৯০৫-১৯৭২) কলমে। আর, এই কৃষ্ণাই ছিলেন সম্ভবত প্রথম বাঙালী মহিলা গোয়েন্দা। গোয়েন্দা হিসেবে গল্পে এক নারীর উপস্থিতি অবশ্যই অভিনবত্ব এনেছিলেন প্রভাবতী দেবী। যখন রান্নাঘরের বাইরে পা রাখলে, পাঁচ দিক থেকে ত্রিশটা প্রশ্ন ধেয়ে আসতো, তখন এক মহিলাকে গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে কল্পনা করা, অবশ্যই অভিনবত্বের দাবী রাখে। শুধু অভিনবত্ব বললে খুব ভুল হবে, বলা প্রয়োজন সাহস। সাহস লাগে। অবশ্য এতে করে, মহিলা পাঠকের সংখ্যাও বেড়ে গেছিল, মনে হয়। বিপদের সময় ঠান্ডা মাথা আর উপস্থিত বুদ্ধি, মেয়েদের যে কোনটারই অভাব নেই, সেইটাই প্রমাণ করে, কৃষ্ণা। প্রথমে 'প্রহেলিকা' সিরিজে, এরপর 'কাঞ্চনজঙ্ঘা' সিরিজে, 'গুপ্তঘাতক' আর 'হত্যার প্রতিশোধ' নামে দুটি গল্প লেখেন প্রভাবতী দেবী। তারপর পুরোদস্তুর একটি আস্ত সিরিজ (কৃষ্ণা সিরিজ) লিখে ফেলেন। আরো পাচটি গল্প লিখেছিলেন। কৃষ্ণা, দ্রৌপদীর আরেক নাম। যে দ্রৌপদী 'মহাভারত' এর সময় থেকে শৃঙ্খল ভেঙে দিতে উদ্বত হয়েছিল। আবার, স্বাধীনতা সংগ্রামের আঙ্গিনায় ছেলেদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যে মহিলারা লড়াই করেছিল, তাদের প্রতিও শ্রদ্ধার্ঘ্য বলা যেতে পারে। ভীষণ জনপ্রিয় হয়েছিল, এই কৃষ্ণা সিরিজের গল্প গুলো। নারী স্বাধীনতার সোচ্চার আহ্বান, মহিলাদের প্রতি সহমর্মিতা এই সিরিজের গল্পের প্রতি পাতায় পাতায় পাওয়া যায়। 

    অবশ্য গোয়েন্দা গল্পের চেয়ে বরং বেশী অ্যাডভেঞ্চারের গল্প বললেও অত্যুক্তি হয় না। তবে 'কৃষ্ণা' প্রথম মহিলা গোয়েন্দা হিসেবে বাংলার গোয়েন্দাদের ইতিহাসে সব সময় থেকে যাবে। কৃষ্ণা ছাড়াও, শিখা (অগ্নিশিখা রায়) নামে আরো একজন মহিলা গোয়েন্দা ছিল, প্রভাবতী দেবীর। যদিও ওটা পুরোদস্তুর অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। নামেই গোয়েন্দা। তা সেই সিরিজের নাম ছিল 'কুমারিকা'।

    এরপর ষাটের দশকে ছোটদের পাতে 'সন্দেশ' পড়তেই, নলিনী দাস 'গন্ডালু' নিয়ে হাজির হলেন। এখানে এক জন নয়, এক গন্ডা গোয়েন্দা'লু'। কালু (কাকলি চক্রবর্তী), মালু (মালবিকা মজুমদার), টুলু (টুলু বোস) আর বুলু (বুলবুলি সেন)। এরা সকলেই এক স্কুল বোর্ডিং এর বাসিন্দা। এনিড ব্লাইটনের ছাপ যেমন পান্ডব গোয়েন্দায় আছে, তেমনই গন্ডালুতেও আছে। সাংকেতিক ভাষার মাধ্যমে খবরের আদানপ্রদান অথবা গুপ্তধনের পিছনে ধাওয়া করা কিংবা নিরুদ্দিষ্ট মানুষকে আবার পরিবারের সাথে মিলিয়ে দেওয়া, ডানপিটেদের পছন্দ না করার কোন কারণ ছিল না।

    অদ্রীশ বর্ধনের 'নারায়ণী', আবার 'কঠোর ভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যে' লেখা। মাথা নয়, বুদ্ধি নয়, শরীরের জালে ফেলে, শরীরকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে, অ্যাডভেঞ্চারের গল্প। বলা যায়, বাংলা 'হার্ড বয়েল' নারী গোয়েন্দা। 


    অজিতকৃষ্ণ বসু নিয়ে এলেন 'বড়োলোক বাপের' মেয়ে নন্দিনী সোমকে, 'ডিটেকটিভ নন্দিনী সোম ও দানু মামা' গল্পে। সাইকোলজি নিয়ে পড়া নন্দিনী সোম কিন্তু নারায়ণীর থেকে ঠিক ১৮০° ঘুরে ব্যবহার করে নিজের বিচার বিবেচনা, বোধ-বুদ্ধি। একই রকম ভাবে আশাপূর্ণা দেবী যখন 'কাজের লোক' কাজল কে নিয়ে লেখেন মেয়ে গোয়েন্দার বাহাদুরি 'গল্পই কী অল্প', সেই কাজলও আস্থা রাখে নিজের বিচার বিবেচনার উপরেই। সামাজিক অথবা আর্থিক অবস্থান আলাদা হলেও নন্দিনী কিংবা কাজল, নিজেদের বুদ্ধি বিবেচনার ব্যবহার করে, একই মানসিক বিন্দুতে অবস্থান করে। শরীর নয়, ব্যবহার করার জন্যে মেয়েদের 'মাথা' আছে যথেষ্ট পরিমাণে। ছেলেদের মাথা ঘুরিয়ে দেবার জন্যে, শরীরের ব্যবহার করতে হয় না, মাথার ব্যবহার করেই করা যায়। আশাপূর্ণা দেবীর গল্পে পকেটমার ট্যাঁপা আর মদনা কেমন করে গোয়েন্দা হলো, সেটাও বলা আছে। মীরা বালসুব্রহ্মণ্যম এক দক্ষিণ ভারতীয় গোয়েন্দাকে নিয়ে এসেছিলেন, পুল্লা রেড্ডী নামে। এই বই আমার নিজের ছিলোনা। এক দাদার বইয়ের গাদা থেকে খুঁজে বের করেছিলাম। আমি একটাই পড়েছিলাম, আরো কয়েকটা থাকবে হয়তো। প্রদীপ্ত রায় নিয়ে এসেছিলেন জগা পিসিকে।

    'মাসিক রোমাঞ্চ'র জন্যে লেখা মনোজ সেনের, দময়ন্তী আবার একদম ঘরোয়া। ইতিহাসের শিক্ষিকা, স্বামী সংসার নিয়ে থাকা দময়ন্তী, ভীষণ ভাবেই মধ্যবিত্ত পরিবারের এক মহিলার প্রতিচ্ছবি। সংসার করতে করতে বুদ্ধিতে যার মোরচে পরে না, বরং ঝিলিক দিয়ে ওঠে। চল্লিশের কৃষ্ণা, ষাটের গন্ডালু কিংবা আশির দশকের দময়ন্তী বা তার পরের গার্গী, প্রজ্ঞাপারমিতার সকলেরই একটা জায়গায় কিন্তু ভীষণ মিল। ছেলে গোয়েন্দারা যেমন অধিকাংশই সংসার বিচ্ছিন্ন, মেয়েরা, মেয়ে গোয়েন্দারা ঠিক এর উল্টো। তাদের গল্পে সংসার ফিরে আসে বারে বারে।

    তপন বন্দ্যোপাধ্যায় গার্গীকে প্রথম নিয়ে আসেন 'ঈর্ষার সবুজ চোখ' গল্পে। তার বর্তমান স্বামী সায়নকে নির্দোষ প্রমাণ করলেন এই গল্পে। এর পর বহু গল্পই এসেছে গার্গীকে নিয়ে।

    সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মিতিন মাসি বা প্রজ্ঞাপারমিতা মুখার্জি পুরোদস্তুর গোয়েন্দা। নারী যে কেবল রান্না ঘরের জোয়াল টানতেই পারে না, তার সঙ্গে বাইরের কাজেও পারদর্শী, এক সাথে সব দিক সামলে যে সব নারীই 'দেবী' হয়ে ওঠে, তারই যেন প্রমাণ স্বরূপ তার গোয়েন্দা সংস্থার নাম, 'থার্ড আই'। কেবল স্বামী পার্থ না, ছেলে বুমবুম, দিদি, জামাইবাবু আর বোনঝি, সাকরেদ টুপুর, সকলকে নিয়েই এক বিশাল সংসার। সুচিত্রা ভট্টাচার্য অত্যন্ত সুলেখিকা ছিলেন, মিতিন মাসির গল্পের মধ্যে দিয়েই আমাদের পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছেন, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, আর্মেনিয়ান, চীনা অথবা ইহুদি সংস্কৃতির সাথে। 


    পারমিতা ঘোষ মজুমদারের রঞ্জাবতী মজুমদার, প্রথমে ছিলেন সাংবাদিক, তার পর বেছে নেন গোয়েন্দা বৃত্তি। তার 'টিম ট্রুথসিকার্স' এর বাকী সদস্যরা হলেন তার সহচর লাজবন্তি গঙ্গোপাধ্যায় আর তার ছেলে পোগো। অঞ্জন মান্নার গল্পের অঝোরঝরা বসু, আরেক নারী গোয়েন্দা। হিমাদ্রী কিশোর দাসগুপ্তর গল্পে এক মেয়ে গোয়েন্দার পরিচয় পাই। রাজেশ বসুর গল্পে দ্যুতি, দিয়ালা, রুদ্রানী তিন জন মহিলা গোয়েন্দা এসেছেন। স্বাতী ভট্টাচার্যের গল্পে মেধা বা মেধাবিনীকে গোয়েন্দা হিসেবে পাওয়া গেছে। অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর অনিলিখাও এই সময়েরই নারী গোয়েন্দা।

    এরা সকলেই নারী গোয়েন্দা বলতেই মিস মার্পেলের ভেসে ওঠা ছবিটা ভেঙে দিয়েছেন। নারী গোয়েন্দা বলতে ঘরের মধ্যেই এক কোণে বসে থাকা 'প্রোটোটাইপ' যে ছবিটা দেখতে আমরা অভ্যস্ত তা এখনকার মহিলা গোয়েন্দারা ভেঙেছেন। এনারা ঘরের বাইরে এসেছেন। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ঘরে বাইরে সবেতেই পারদর্শী। মেয়েরা স্বভাব গোয়েন্দা। অপরাধের গন্ধ তারা পুরুষের আগেই পেয়ে যান। তাই স্বাভাবিক নিয়মেই সফল।

    অবশ্য সকলেই সমান সৌভাগ্যবান নয়। গোয়েন্দা হয়েও, যেন ঠিক লাইমলাইটের আলোটা পড়েনি, বাচ্চু বিচ্ছুর উপর। 'পান্ডব গোয়েন্দা'র মূল গোয়েন্দা চরিত্র বাবলু আর বিলুর, ভাগ্যেই জুটেছে বেশির ভাগ প্রশস্তি। অবশ্য এছাড়াও আরো কয়েকজন আছেন। যদিও ভূমিকা মূলত সহকারীর। নারায়ণ সান্যালের 'কাঁটা সিরিজ'-এ ব্যারিস্টার পিকে বাসুর গল্পে 'সুকৌশলী'র পরিচয় পেয়েছি। 'সুকৌশলী'র 'সু' মানে সুজাতা বা 'ত্রয়ী সত্যসন্ধানী'র শেলী অথবা গৌরপ্রসাদ বসুর গোয়েন্দা কুশলের, এলা,  সহকারীর ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সরাসরি সহকারী না হয়েও, গোয়েন্দা অশোক ঠাকুরের বৌদি কাঞ্চনের কথা বাদ দেবো কেমন করে। গোয়েন্দা অশোক ঠাকুরকে, তার বৌদি কাঞ্চন মাঝে মাঝেই যুক্তির খেই ধরিয়ে দেয়, সমাধানের রাস্তা দেখিয়ে দেয়। একই রকম ভাবেই পরিমল গোস্বামীর গোয়েন্দা হরতনের স্ত্রী কুসুমিতা সাহায্য করে আর অদ্রীশ বর্ধনের ইন্দ্রনাথ রুদ্র এই ধরনের সহায়তা পেয়ে থাকে আবার মৃগাঙ্কর স্ত্রী কবিতার থেকে।

    বিদেশ মানে ইয়োরোপ আর আমেরিকায়, মহিলা লেখক অনেক, আর তাঁদের সৃষ্টি গোয়েন্দাদের অনেকেই নারী। নারী গোয়েন্দা। এবং তাদের সাফল্য বেশ ঈর্ষণীয়। সেটা নিউইয়র্ক টাইমসের বেস্ট সেলারের তালিকায় চোখ বোলালেই বোঝা যায়। তবে বাংলা ভাষায় নারী গোয়েন্দার সংখ্যা হতাশাজনকভাবেই কম। জানি না, কী করলে কী হবে? আর কী করেই বা মহিলা গোয়েন্দার সংখ্যা বৃদ্ধি করা যাবে? যদিও সংখ্যা বৃদ্ধির চেয়েও উৎকর্ষে বৃদ্ধি পাওয়া অনেক বেশী জরুরী। 


    কথায় বলে, বসতে দিলে শুতে চায়। আমিও দুটোই চাই, বেশী আর বেশী। পরিমানে আর মানে। 

  • বিভাগ : আলোচনা | ০৮ জুলাই ২০২০ | ৮০৭ বার পঠিত
আরও পড়ুন
#আমি - Jinat Rehena Islam
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • -- | 117.194.196.100 | ০৮ জুলাই ২০২০ ০২:২৯94988
  • আরে আমাদের আদেশা, মানে অধীশা সরকার যে নতুন গোয়েন্দাটিকে হাজির করলেন, বিবি অর্থাৎ বিদ্যুল্লতা বটব্যাল নামে, তার উল্লেখও নাহয় করতেনই।  বেইদিন নয়, এই বইমেলা ২০২০ তেই প্রকাশিত।

  • Proloy Basu | 2402:3a80:a2d:26f1:0:50:6265:3101 | ০৮ জুলাই ২০২০ ০২:৩১94989
  • জানা ছিল না। জানলাম। 

  • বিপ্লব রহমান | 119.30.39.39 | ০৮ জুলাই ২০২০ ০৭:২২94990
  • সম্ভবত বাস্তবে প্রাইভেট ডিডেকটিভের সংখ্যা না বাড়লে গোয়েন্দা গল্লের সংখ্যা বা মান কোনটাই বাড়বে না,  নারী গোয়েন্দা গল্পের ক্ষেত্রেও এ কথা সমান প্রযোজ্য। নইলে কল্পনার  ফানুস মিথ্যে আকাশে আর কতোটাই বা ওড়ে?      

    জটিল প্যাঁচের কূটবুদ্ধির কাহিনী না হলেও প্রাচীন সাধুভাষার "দারোগার  দপ্তর" কে এখনো বেশ লাগে,  হয়তো বাস্তবিক ঘটনার বিবরণ বলেই। 

    লেখাটি খুব তথ্য বহুল। আরও লিখুন                 

  • স্বাতী রায় | 117.194.33.250 | ০৮ জুলাই ২০২০ ১১:৩৪94993
  • তথ্য সমৃদ্ধ লেখা। কৃষ্ণার আগের একটা লেখাও পড়িনি। সেগুলোর প্রকাশকাল, প্রকাশস্থান ইত্যাদি পেলে তার পিছনে ধাওয়া করে যেত।

    তবে একটা কথা মনে হয়। আজকের বাংলায় যে সব গোয়েন্দা গল্প সেগুলো বিষয়ের জটিলতার বিচারে নেহাতই কিশোরপাঠ্য স্তরে থেকে যাচ্ছে। sara paretsky র লেখা পড়ি আর ভাবি এই ধরণের কমপ্লেক্স theme র উপর কবে এদেশে লেখা হবে!
  • -- | 115.114.47.197 | ০৮ জুলাই ২০২০ ১৬:৩৫94996
  • দেব সাহিত্য কুটির সমগ্র বের করেছে তো কৃষ্ঞার
  • প্রলয় বসু | 42.110.155.8 | ০৯ জুলাই ২০২০ ০১:০৭95000
  • বিপ্লববাবু, ঠিকই বলেছেন। তবে বাস্তবের 'প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর' দের ক্ষমতা ভীষণ সীমিত। 

    ধন্যবাদ। চেষ্টা করবো লেখার। 

  • প্রলয় বসু | 42.110.155.8 | ০৯ জুলাই ২০২০ ০১:০৯95001
  • স্বাতী দেবী, ঠিকই বাংলাতে গোয়েন্দা গল্প ছোটদের জন্যেই রয়ে গেছে। 'বড়ো' হলো না। 

  • অর্জুন | 223.223.148.221 | ১০ জুলাই ২০২০ ০১:৩৯95044
  • খুব সযত্ন তথ্যনিষ্ঠ লেখা । তবে পর পর সব তথ্য এসেছে বলে একটু তথ্যাক্রান্ত যে মনে হচ্ছেনা তা নয় ! 

    লেখার হেডিং 'বাংলা সাহিত্যে মহিলা গোয়েন্দা' । হয়ত দুই কি তিন পর্বে করা যেতে পারত, সব তথ্য সাজিয়ে দিয়ে  । 

    তবে অনেককিছু এক সঙ্গে জানতে পারলাম। এখানে একটা কথা বলতে চাই। বাংলায় কোনো লেখায় আন্তর্জাতিক  সাহিত্যের সঙ্গে তুলনামূলক চর্চা এলেই  প্রথমে ইংরেজি সাহিত্যের প্রসঙ্গ এসে পড়ে ।  শুধু তাই নয়। আর অন্য কোনো সাহিত্যের তুলনা আসেই না।   অন্যান্য ইউরোপীয় সাহিত্যের কথা বাদ পড়ে যায় । সেটা ভাবনার মধ্যেই আসেনা। আজকের ইনফরমেশন টেকোলজির যুগে ফরাসী, জার্মান, স্প্যানীয়, ইতালীয়, চেক, পোলিশ, হাঙ্গেরীয় এসবের উল্লেখ পাওয়া অনেক সহজ হলেও কেউ সেসবের উল্লেখ করেনা  । বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মাপকাঠি এখনো ইংরেজি বা সেটাই একমাত্র অ্যাভেলেবেল রিসোর্স !! 

    আমার বোন জন্মানোর পরে তাকে দেখাশোনা করতে এলো উমা পাত্র নামে এক মহিলা। আমার মা'র থেকে সামান্য ছোট । উমা'দির নানারকম ডাকাতির গল্প বলত আমাদের । সবই বাস্তব কাহিনী। ওঁর শ্বশুরবাড়ির পরিবার স্বর্ণকারের কাজ করে। বাড়িতে তাই সোনা, রূপা মজুত থাকত এবং অবশ্যম্ভাবী ডাকাতি হত। উমা'দির একটা প্যাটেন্ট ডায়লগ ছিল 'গো'ন্দা ছাড়া ডাকাতি হয়না...' । 'গো'ন্দা' অর্থাৎ গোয়েন্দা তো ক্রাইম সল্ভ করবে। আসলে ও বলতে চাইত 'গুপ্তচর' না থাকলে ডাকাতকে খবর দেবে কে? ডাকাতি'র গল্পগুলো সবকটাই বেশ লোমহর্ষক ছিল । 

    মহিলাদের মন পুরুষদের তুলনায় হয়ত বেশী voyeuristic । চিরকাল বহির্জগতে তাঁদের স্পেস কম বলে তাঁরা হয়ত এই গসিপের মধ্যে ঢাকা দিয়ে দেওয়া সমাজের 'আসল' খবরটার প্রতি সবিশেষ কৌতূহলী !! 

    তাই তো ঋতুপর্ণ ঘোষ তাঁর 'শুভ মহরৎ ' ছবির শুরুতে বলেন 'সেই সব মিস মারপেলদের উদ্দেশ্যে যারা পেট খারাপের ছুতো করে ছেলে স্কুলে যেতে না চাইলে, সব কিছু বুঝতে পেরেছেন কিন্তু কিছু বলেননি.......' 'সেই সব মিস মারপেলদের উদ্দেশ্যে যারা চিরদিন শ্বশুরবাড়ি থেকে মেয়ে চোখ লাল করে ফিরলে সব কিছু বুঝে চোখ লাল করে থেকেছেন কেবল.....' 

    বা 

    ‘চলো Let’s Go’ সিনেমার সেই দৃশ্যে । সকলে বন ফায়ারে পানাহার করছেন, তখন এক অভিনেত্রীর অবাক করা ‘ক্রিস্টি ছাড়াও গোয়েন্দা গল্প?’ প্রশ্নে চূর্ণী গাঙ্গুলীর উত্তর ‘অগাধ আছে, you can start with say’ পাশ থেকে অভিনেত্রী কনীনিকা বলে ওঠে ‘আশাপূর্ণা দেবী’। সবাই চমকে যায় । 

    মেয়েদের সব কাহিনীই হয়ত গোয়েন্দা কাহিনী....... ! 

       

  • প্রলয় বসু | 103.42.173.64 | ১০ জুলাই ২০২০ ১১:৫৬95051
  • অর্জুন বাবু, আপনি ঠিকই বলেছেন। এখনকার যুগে অন্যান্য বিদেশী সাহিত্যের কথা বলা উচিত। কিন্তু সেই ভাষাটা পড়তে না জানলে পড়তে হয়, অনুবাদ। তাও সেই ইংরেজিতেই। তবু অনুরোধ করবো, যদি আপনার এমন কোন লেখা জানা থাকে তাহলে আমাকে একটু জানাবেন। আমি জানতে চাই। 

  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত