• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • গল্পঃ নাগপঞ্চমী

    Sutapa Sen
    বিভাগ : আলোচনা | ২০ মার্চ ২০২০ | ৩৫৯ বার পঠিত
  • নাগপঞ্চমী
    সুতপা মুখোপাধ্যায়
    দ্যাখছ লাকি লবাব… মুখুজ্জা বাড়িতে মাইয়া এসচে কলকেতা থিকে! — তোমার এত কিগো কত্তা— যুবক উত্তর দেয়— পূজাপাঠ নিয়ে থাক, কে কোথায় এল গেল তোমার তাতে কি! — যজ্ঞেশ্বর শিবের শ্বেত লিঙ্গের পাদদেশে জমে থাকা ফুল-বেলপাতা সাফ করতে করতে শীতলঠাকুর উত্তর দেয়— গাঁয়ে কি হল না হল দেখা পুরুতেরই তো কামকাজ। তাই ভাবলুম লবাব যদি দ্যাখে। — যুবক ফিচেল হেসে বলে তোমার লবাব কিছু নবাবপুত্তুর নয় যে মাইয়া এলেই দৌড়তে হবে। তা হ্যাঁগো কত্তা নাগপঞ্চমীর নাগের উৎসব এবারে পরিবেশ বাঁচাও কমিটি নাকি বন্ধ করে দিচ্ছে— কেন গো, সেই কত বছরের উৎসব— বন্ধ কেন? শীতলঠাকুর ছোট্টো শ্বাস ফেলে বলল— এমনি করে কি পরিবেশ টিকে লবাব! মা ধরিত্তির সম্পদ সব সাবড়ে দিলে— এখন লাগপঞ্চমীর লাগ লিয়া খেলা বন্ধ করলেই কি সব ঠিক হয়ে যাবেক? ই তো সর্পসঙ্কুল জায়গায় আগেকার দিনে মা মনসাকে শান্ত করার জন্যি হত। সেই কবে থিকা চলে আসচে। আমার ঠাগমা যখন সতীর গঞ্জ থেকে ইখানে বউটি হয়ে এল তার ক’দিন পরেই লাগপঞ্চমীর উৎসব। সাজো সাজো রব গাঁয়ে। ঠাগমার বাপের ঘরের ক’জন লোক ফি বছরই আসত। তারা আসে জেনেই ঠাগমার আনন্দ। শহরবাজারে পরিবেশ করগে না— আদি থেকে চলা উৎসব— ক্যানে বাবা সিখানে হাত। ফিবছর হাতি এসে ধান খাবে। লোকের ঘরে রাখা কাঁঠাল খাবার জন্যে ঘরের দিয়াল ভাঙবে তুমি কিছু বলতি লারবে— উদিকে দ্যাখো কয়লা, লোহা সব বেচে দিচ্ছে— ই হ’ল পরিবেশ বাঁচাও।— যুবক হাসে— অনেক কিছু জানো গো কত্তা। সেই গানটা একবার গাও দিকি—
    আমার সাসুড়ি বড়ায়ি বড় খরতর।
    সবখন রাখে মোরে ঘরের ভিতর।।
    হাত বাঢ়য়িলেঁ কি চান্দের লাগ পাই…
    আমার চান্দের লাগ পাই।
    আষাঢ় শ্রাবণ মাসে নদী ভর ভর/মাতিয়া ছুটিয়া চলে ধারা খরতর।— কোথা থেকে যে হঠাৎ বাঁক নেওয়া নদীর মতো কবেকার পড়া কবিতার লাইন হুড়মুড় করে আগল ভেঙে দেয় মনের! মালিনী দোতলার বারান্দার রেলিংয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে। মূল দরজার মাথার উপরে থাকা আলো জ্বলা পদ্মের পাপড়িগুলোর দুটোর কোণা ভাঙা। বাড়িটা প্রকাণ্ড। মেরামত করে সারাই সুরুই করে টিকিয়ে যে রাখার অবস্থা আছে তাদের সেই অনেক। ১৯৫৫য় জমিদারি প্রথা অবলুপ্তির সময়ে একবার টাল খেয়েও সামলে নিয়েছিল তাদের পরিবার। সতীরগঞ্জ থেকে ঝিকিটিবাজার পর্যন্ত অনেক ধানজমি, শালবন ঘাসজমি করে নিয়েছিল সরকার। দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে বাঁচানো গেছিল অনেকটাই। মালিনীর দাদু খুব যত্ন করে লিখেছেন পারবারিক ইতিহাস। সে সবই জনশ্রুতি আর পুরনো কিছু পারিবারিক ডায়েরির উপর ভিত্তি করে লেখা। তবে বংশপরম্পরায় চলে আসা কাহিনীর গায়ে নানা রংয়ের প্রলেপ লাগলেও মূল অবয়ব একটা থেকেই যায়। রংগুলো একটু ফিকে করে দিলেই মাটির গন্ধলাগা কাঠামোটা বেরিয়ে আসে। রংগুলো থাকলেই বা কি— ভাবে মালিনী। গাছের পাতায় পাতায় সন্ধ্যে নামছে। আঁধার ঘনায় কেমন করে, টের পেতে ভালো লাগে বড়ো। প্রতিটি গাছের শাখায় যেন অন্ধকার তার ডানা ঝুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। কতক্ষণ ধরে সন্ধ্যে নামে। সাঁঝের আলো— আলগা লেগে থাকে বহুক্ষণ। সেই ক্ষণ, পল, অনুপল দু’হাতের পাতা দুটোকে পাশাপাশি রেখে অনুভব করতে থাকে মালিনী। তার মসৃণ ম্যানিকিউরড সাদা হাতের পাতায় সন্ধ্যে নামছে— ঘনিয়ে আসছে আঁধার— যেন একটু পরেই জন্ম হবে এক রূপকথার।
    ক্রিং ক্রিং করে সাইকেল নিয়ে এক মনুষ্য অবয়ব ঢুকে পড়ল মূল ফটক পেরিয়ে। জগবন্ধু এখনও আলো জ্বালায়নি আজ। আলো মানে আগুনের আলো। লো ভোল্টেজ-এর ফলে সন্ধ্যে থেকেই বিজলির আলো নিভু নিভু। ফটকের পদ্ম আলো জ্বলার প্রশ্নই নেই। দেওয়ালের গায়ে কাচের সৌখিন বাতি আছে কিছু। যেগুলো ভাঙেনি এখনও সেগুলোতে কেরোসিন দিয়ে জগবন্ধু জ্বালিয়ে দেয় সন্ধ্যে হলে। ঐ ফটক দিয়ে শেষ যে এসেছে সালঙ্কারা হয়ে এই বাড়িতে সে মালিনীর জেঠিমা। বেথুন কলেজে পড়া, ভারি সৌখিন। তারপর জেঠুমনির সঙ্গে সেই যে লন্ডন গেছে— কালেভদ্রে এসেছে এ বাড়িতে। বরং বাবাকে বহুবার আসতে দেখেছে মালিনী। তার মা শেষ কবে এসেছিল মনে পড়ে না। বাবার জন্যেই এখানের সঙ্গে তার যোগাযোগ। দাদু, ঠাম্মা, জগবন্ধু, নলিনীবালা, দুখুপিসি, খুদির মা, শ্যামলকাকু, লক্ষ্মণ, সন্ধ্যা— এখানে অনেক লোক। কলকাতার বাড়িও সবসময় গমগম করে। তবু মালিনী এক অদ্ভুত শীতল গা ছমছম নির্জনতা টের পায় সেখানে। দুটো ফ্ল্যাটকে জোড়া দিয়ে তাদের ফ্ল্যাট আক্ষরিক অর্থেই মস্ত। মায়ের নৃত্যদলের ছাত্র-ছাত্রীদের যাতায়াত, লেগেই আছে। প্রায় প্রতিদিনই রিহার্সালের ব্যস্ততা। এমনকি যখন বিদেশে অনুষ্ঠানে যায় মা তখনও কেমন মায়ের গমগমে উপস্থিতি টের পায় মালিনী। বাবা সেই সকাল সাড়ে সাতটায় বেরল তো ফেরা দশটার আগে নয়। সাবলীলতাহীন সেই রাত্রিকালীন উপস্থিতি মালিনীর জন্যে আরও নির্দয় নির্জনতা নিয়ে আসে। শুধু যতবার এখানে আসার জন্যে বাবার সঙ্গে বেরিয়েছে মালিনী ততবার মনের বন্ধ কপাট, জানলা সব হাট করে খুলে রোদবৃষ্টি ঢুকে গেছে। তারও যেমন, বাবারও তেমন— বোঝে মালিনী। কয়েক বছর আগে এক প্রাক্তন ক্রিকেটারকে জড়িয়ে মায়ের নামে পত্রিকার পাতায় সরস গল্প দেখেছে মালিনী। মা কাকে যেন হেসে হেসে ফোনে বলছিল— দ্যো ইটস নট ট্রু, স্টিল ইটস গুড ফর মাই পাবলিসিটি। বাবারও ফোন আসে একটা মাঝে মাঝে বেশি রাতে। ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে বাবা কথা বলেও বহুক্ষণ। দাঁড়িয়ে থাকে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে। স্টাডি থেকে দেখতে দেখতে বুঝতে পারে এ কোন পেশেন্ট বা মালিনীর পরিচিত বাবার বন্ধুবান্ধবদের ফোন নয়। একটা হাল্কা মোচড় বুকের ভেতরটা ছুঁয়ে দিয়ে যায় মালিনীর।
    আকাশে মেঘের ঘনঘটা। যুবকটি বলে— কাল তোমার অনুরোধে প্রসাদ পৌঁছে দিয়েছি মুখুজ্জ্যে বাড়িতে কত্তা। তা কবে আসবে তোমার রতনচাঁদ? বুড়ো হাড়ে ঝাঁটপাট, আবার পুজোপাঠ— এত কি পোষায়? শীতলঠাকুর না হাসলেও সামনের উঁচু হয়ে থাকা পাটি যেন দাঁতগুলোতে হাসি ছড়িয়ে রেখেছে। তোবড়ানো গাল কাঁপিয়ে বলে ওঠে— তা লবাব, দেখতে পেলেন নাকি মাইয়া কে? রাজকন্যে লয়! যুবক প্রায় অট্টহাস্য করে ওঠে— দেখেছি কত্তা। অন্ধকারে বারান্দায় দাঁড়ান সাদাপরী। জগবন্ধু বলছিল— হঠাৎ এসে গেছে দিদিমণি। নাগপঞ্চমীর উৎসব দেখতে চায়। সে তো আর হবার নয় মনে হচ্ছে। আধেক আয়োজন হয়ে সব পড়ে আছে। রাজকন্যের কী হবে বলেন তবে। শীতলঠাকুর চোখ কুঁচকে বলে— ইকি কাণ্ড বলেন দিকি। এ কি আজগের কথা। সেই জন্ম জন্মান্তরকাল থেকে লাগ-পঞ্চমীর উৎসব। মা মনসা তো লক্ষ্মী। তেনারে অসম্মান করলে ফসল হবেনি। লাগ হল উব্বর জমিনের সমান। চাষের জন্যিই তো মানুষের এত উৎসব। পরিবেশ কি আজগের? আগেও মানুষ ই নিয়ে ভাবনা করত বলেই না ইসব উৎসব। মেঘ আসচে। জল লামবে। লাগকে আদর করতে হবে নি! তেল সিঁদুরে বরণ করতে হবেনি? মাঠের ইঁদুর খাবে লাগ। লাগের ভয়ে কেউ ফসলের খেতে কোন খারাপ করতি ডরাবে। তবে না চাষির গোলা ভরবে। লাগ খেতিবাড়ি না গেলে ধানের বুকে দুধ আসবেনি। পদ্ম হাতে মা লক্ষ্মী লামবেই নি অন্ধকারে। হা দ্যাখ লবাব, উদিক পানে দ্যাখো। ওই বনঝোপটার পাশে উ কি— হরিপরি লামলো না কি। যুবক বলে— ন আর ল এ এত গুলিয়ে ফেলেন কেন কত্তা। আমি লেখার কাজে যত দিন এখানে আছি আপনাকে ঠিক করে দিয়ে যাব। শীতলঠাকুর উঁচু দাঁতের সারি মেলে তোবড়ানো গালে আমোদ নিয়ে বলে— আর ই বয়সে ঠিক বেঠিক যা বলবে সবই ঠিক, যজ্ঞেশ্বর শিব সব জানে। আমার কিছু শিখতে লাগবে নি। উদিক পানে দ্যাখো। — কি আর দেখবো কত্তা আপনার উদিক পানে। দ্যাখেন রাজকন্যে এদিকেই আসচে। — মুচকি হেসে বলে যুবক।
    এই ভাঙাচোরা মন্দিরটা যজ্ঞেশ্বর শিবের মন্দির জানে মালিনী। সন্ধ্যেবেলা এখান থেকে প্রসাদ যায় তাদের বাড়িতে। এটা কোনকালে গড়ের রাজা দুর্জনপ্রতাপ সিংহদেও বানিয়েছিলেন শিকার-যাত্রার পথে, স্বপ্নাদেশে। গড় তো এখান থেকে বেশ খানিকটা পথ। সেখানে দাদু একবার গাড়ি করে নিয়ে গিয়েছিল। ঝোপঝাড়ে ভর্তি জনশূন্য একটা পোড়ো বাড়ি। ঐ গড়ে নাকি বৈশাখের প্রথম দিনে কামান দাগা হত। আর পুরো এলাকায় শুরু হত শিকার উৎসব। তাদের পরিবারেও ছিল এই প্রথা। একটা শিকল দিয়ে বন্ধকরা ঘর আছে যার ওপারে লাখখানেক চামচিকির বাস। সেখানে শিকারে মারা পশুদের নিয়ে এসে মাংস বিলিয়ে দেওয়া হত গ্রামের লোকেদের মধ্যে। এই মন্দিরটা ভাঙাচোরা হলেও শ্বেতপাথরের চাতালটা বেশ পরিষ্কার। রোজই নিশ্চয় যত্ন করে ধোওয়া মোছা হয়। মালিনীকে দেখে বেরিয়ে এল শীতলঠাকুর— আসেন, আসেন। আপনে হলেন গাঁয়ের রাজকন্যে। যুবক হাতজোড় করে নমস্কার করল বসে বসেই— আমি অল্পবিস্তর লেখাজোখা করি। গাঁয়ে গাঁয়ে ঘুরে বেড়াই। মালিনী মৃদু হেসে বলল— আচ্ছা বলবেন, এ বারে কি নাগপঞ্চমীর উৎসব হবে না? আমি কোনদিন দেখিনি। ভাবলাম এবারে দেখে যাব। শীতলঠাকুর বলল— কুনো জন্মে তো ভাবি নাই যে ই উৎসব হবেনি। কি যে ঢং। পরিবেশের জন্যে কত পরান কাঁদে! গাঁগঞ্জে এত উস্তাদির কি আছে রে বাবা। ই বারে হবে নি মনে হয়। আর তো দু’দিন বাকি। জল হবে কি না কে জানে বাপু। মা মনসার যা রোষ। দোষ নিয়ো নি মাগো। আমরা মুখ্যু মানুষ। জল দিয়ো, ফসল দিয়ো।
    কলেজে লাবু বলেছিল— তোদের ঐ ভিলেজ-এর নাগপঞ্চমীতে আমি নেক্সট টাইম যাবই। এক তো রিজিওনাল হিস্ট্রিতে আমার ভীষণ ন্যাক। সেকেন্ডলি যা ঘ্যামা বাড়ি তোদের। ইটস আ কাইন্ড অফ অ্যাডভেঞ্চার টু স্পেন্ড আ নাইট দেয়ার।— কিন্তু এ তো বন্ধই হয়ে গেল। আকাশ ঘনঘটা হয়েও হঠাৎ যেন মেঘের বুক শুকিয়ে গেল। কী রোদ, কী রোদ। জগবন্ধুর চোখ ফাঁকি দিয়ে মালিনী এই খর দুপুরে বেরিয়ে পড়েছে। পদ্মদীঘি ছাড়িয়ে বাঁদিক ধরে গেলে যজ্ঞেশ্বর শিবের মন্দির। তারও বাঁদিকে অশ্বত্থপুকুর। পাড়ে একটা বুড়ো অশ্বত্থগাছ। হালকা ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে পাতায় পাতায়। শীতলছায়া বোধহয় একেই বলে। কী আরাম! মাটিতে বসে পড়ে মালিনী। বসে বসেই ঝিমোচ্ছিল নাকি— ও রাজকন্যে, কী করেন এখেনে, ও রাজকন্যে। চমকে তাকিয়ে দেখে তোবড়ানো গালে হাসি মেখে শীতলঠাকুর ছোটো পিতলের কলসি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। — ও আপনি, একটু লজ্জাই পায় মালিনী। — এই যে মা, জল লিতে আসি ইখেনে। ই-আশুথ আমার ঠাগমা যখন দেখেছিল তখন সে জোয়ানমদ্দ। এর ছায়াতে পরান জুড়োয়। যজ্ঞেশ্বর শিবও মাঝি মধ্যি সন্ধ্যেরাতে এখানে হাওয়া খেতি আসে।— তাই নাকি— হাসি চেপে বলে মালিনী। শীতলঠাকুর পিতলের কলসি এক পাশে রেখে ঘাটের ধারে বসে পড়ে। খানিকক্ষণ গালে হাত দিয়ে তাকিয়ে থাকে আকাশে। বলে ওঠে— ই বছর মা মনসার রোষ লাগবে। জল হবে নি। মানুষে জ্বলিপুড়ি মরবে। গরিব মানুষকে ছেলেপিলে নিয়ে পথি বসতি হবে। যজ্ঞেশ্বর শিবও বাঁচাতে পারবে নি উ রোষের আগুন থিকে।— চুপ করে থাকে মালিনী। শীতলঠাকুর ঘোরলাগা গলায় বলতে থাকেন— এমুন জীবনে শুনিনি। কার পরিবেশ, কে তার রাখনাই। জানেনি বুঝেনি, শুধু মোড়লি। সব জ্বলি যাবে। ই রোদ্দুর গিরস্তের ঘরে আগুন লিয়ে আসা রোদ্দুর। মেঘ সব শুকাই গেছে তার রোষে। ওগো ও রাজকন্যে, তুমি দেখো না গো যদি বাঁচাতে পার।— হাল্কা চমকে ওঠে মালিনী— বলে কি পুরোহিত। শীতলঠাকুর বলতেই থাকে— আজ মধ্যযাম, মধ্যযামেই তাঁর বন্দনা— তবে জল, তবে ফসল। আজ, আজগেই, আজ রাত্তিরে। লইলে মড়ক। গিরস্ত মরবে, মরবে পশু পক্ষি, গাছপালা। ও রাজকন্যে, তুমি আজ মধ্যযামে মন্দিরে এসো। কুমরী কন্যে, মুখুজ্জ্যার কন্যে। বামুন রক্ত, কুমারী। পবিত্র।— কী বলছেন কী— নিজের অজান্তেই কেঁপে ওঠে মালিনী। খপ করে ডান হাতটা ধরে শীতলঠাকুর। মধ্যযামে পঞ্চমী পড়ে যাবে। এ গাঁয়ের লোকেদের দায় তো তোমাদেরও দায়। তুমি বাঁচাও গো রাজকন্যে। এই রোদে কেমন জালিকা হচ্ছে দেখতে পাচ্চো? ই আগুনে রোদ। সব মরবে। মধ্যযামে— আমি তোমাকে আনতে লোক পাঠাব। রাজকন্যে বাঁচাও। গাঁ তো তোমারও। বাঁচাও গো রাজকন্যে।
    কোথায় গেছিলে বল দিকি? এই তুমাকে ভাত খেতে ডাকতে গিয়ে দুখু পিসি দেখে তুমি ঘরে নাই। কী করে বেরোলে— আমরা টেরটিও পেলুমনি। মাথার ভেতরটা দপদপ করছে মালিনীর। তার সঙ্গে জগবন্ধুর বাক্যবৃষ্টি শিরাগুলোতেই চাপ ফেলছে যেন। আজ একতলার পেল্লাই চৌবাচ্চাওলা চানঘরটায় ঢুকতে ইচ্ছা করল মালিনীর। হুড়ুমহুড়ুম করে ঠান্ডা জলে গায়ে ঢেলে ভারি আরাম হল। খাওয়ার সময় বকবক করতে থাকল লক্ষ্মণ— এবেরে জল হবেনি। সবাই বলচে। শীতলঠাকুর কাল বলচিল। ক্যানে বাবা এসবগুলান বন্ধ করার দরকার পড়ল। যত্ত কিছু বাবা। সন্ধ্যা বলল— তা বলে কী আর জল হবে নি। দেব্তা মানুষের কষ্ট বুঝবেন নি? লক্ষ্মণ মুখ ঝামটে উঠল— দেব্তাকে নিয়ে খেলা, তখুন মনে থাকেনি। — দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ল মালিনী তার অভ্যেসের বিরুদ্ধেই। ক্লান্ত লাগছিল। ঘুম যখন ভাঙল তখন বিকেল গড়িয়েছে। দুখুপিসি উঁকি দিয়ে বলল— কবার দেখে গেছি তুমাকে। চা নিয়ে আসচি। মুখে চোকে জল দাও। মালিনীর চোখ জ্বালা জ্বালা করছিল। মাথার ভেতরে দপদপানি টের পাচ্ছিল। জ্বর আসছে নাকি? দাদুর সঙ্গে এতাল বেতাল গল্প করে কাটল সন্ধ্যেটা। তবু মনের ভিতর থেকে পাথরের টুকরোটাকে নামাতে পারছে না কিছুতেই। শীতল ঠাকুরের হাত ছাড়িয়ে জলে ভরা চোখ দুটোকে পিছনে ফেলে চলে এসেছে মালিনী। কাল তার ফিরে যাওয়া। যতই ক্রিং ক্রিং ঘন্টি বাজানো লোক পাঠাক পুরোহিত, ঐসব গাঁজাখুরিতে মালিনী নেই। কোন কুমতলব যে নেই শীতলঠাকুরের তা বোঝে সে। তবু এত কুসংস্কার এই লোকগুলোর। কুমারী পুজো করে দেবীকে তুষ্ট করে নাকি বৃষ্টি আনছে। রাতের খাওয়া জোর করে অন্যদের চাপাচাপিতে একটু খেল মালিনী। মুখের ভেতরটা কেমন তেতো হয়ে গেছে।
    আয় ঘুম যায় ঘুম— ঘুমপাড়ানি মাসিপিসির আজ দেখা নেই। গ্র্যান্ডফাদার ক্লক বেশ কিছুক্ষণ আগে বারান্দায় এগারোটা ঘন্টা বাজিয়েছে। ঘুমিয়ে পড়তে চায় মালিনী। এত নিস্তব্ধ চারিদিক। পেঁচাটা ডাকল হুটু হুটু হুটু, পদ্মদীঘির ঘাটের পাশের আমগাছটায়। কিসের আওয়াজ!— ক্রিং ক্রিং। আবারও ক্রিং ক্রিং। মালিনী বালিশে কান চাপল। আবারও কৌতূহলে উৎকর্ণ হয়ে শুনল ঘন্টি।…কী নিকষ কালো আঁধার পদ্মদীঘির ঘাটে। বারান্দায় জগবন্ধু আর লক্ষ্মণ গভীর ঘুমে তলিয়ে ছিল। পিছনদিকের দরজাটায় চাবি দেয়না ফাঁকিবাজগুলো কেউ খেয়াল না করলে। বলে যেতে হবে কাল। মাথার ওপরে রাতচরা পাখি উড়ে যাচ্ছে। এই অন্ধকারে সাইকেল চালাচ্ছে কী করে ছেলেটা। রডে বসে নিজের হাতই সে দেখতে পাচ্ছে না।
    পরিপাটি ধোয়ামোছা শ্বেতপাথরের চাতাল। চাতাল পেরিয়ে ভাঙা মন্দিরের পাশে একটা দরজা দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে শীতলঠাকুর। মালিনী মাঝখানে। তার পিছনে যুবক। কী আশ্চর্য, এখানেও একটা সিমেন্টের চাতাল। সদ্য পরিষ্কার করা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। মাঝখানে একটা ছোট্টো বেদি। শীতলঠাকুর হাতের ইশারায় ওখানে বসতে বললেন তাকে। মালিনীর গা ছমছম করছে। ঐ ছেলেটা একেবারে কথা বলছে না। পুরোহিত না হয় মৌন থাকছে, তা বলে ছেলেটা চুপ কেন! মালিনী কিছু বলতে গেলে শীতলঠাকুর ঠোঁটের উপর আঙুল দিয়ে চুপ করতে বললেন। একাট ছোট্টো কুপি বেতের ধুচুনির মধ্যে রাখা। এ রকম অপার্থিব পরিবেশে কেন যে এল মালিনী; নিজের মনকে জিজ্ঞাসা করে দেখল মনও অসাড় এখন। একটা ঘটি থেকে জল ছিটিয়ে হাতের ভঙ্গিতে কয়েকটা মুদ্রা করে আকাশের দিকে তাকিয়ে দুর্বোধ্য শব্দ উচ্চারণ করতে থাকলেন শীতলঠাকুর। বেশ খানিকক্ষণ পরে মালিনীর মনে হল চারপাশে কারা চলাচল করছে। হালকা আলোয় শিউরে উঠল সে। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে সাপেদের উপস্থিতি। ঐ তো ফণা মেলে দাঁড়াল একটা বিরাট সাপ। ছেলেটা কই! শীতলঠাকুর বলছে— ও মহালাগিনী, মাগো, তুষ্ট হ, তুষ্ট হ। জল দে মা, ফসল দে।— মালিনীর দম বন্ধ হয়ে আসছে। এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া ভেসে এল কোথা থেকে। আকাশ চিরে বিদ্যুৎ ঝিলিক মারল একবার। মালিনী দেখল নাগেরা সব ফণা মেলে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে। তার মুখোমুখি মহানাগিনী। বিদ্যুতের ঝিলিক পর পর— আকাশে ঘনিয়ে আছে গর্ভিনী মেঘ। এক ফোঁটা দু’ফোঁটা জল গায়ে লাগল। মালিনী রক্তশূন্য হৃদয়ে টের পেল কাঁপুনি। বিদ্যুতের তীব্র আলোয় দেখতে পেল— আরে নাগ কই। এরা তো মেয়ে। মাথায় ফুল, হাতে অলক্তিকা, কোমরে রঙিন উড়নি বাঁধা। ঐ তো ঐখানে তার মুখোমুখি ফণা মেলে দাঁড়িয়েছিল মহানাগিনী। একি, এতো ভীষণ চেনা— এ কে, এ এ এ যে মা। ঐ তো নৃত্যদলের আশা ঝুনঝুনওয়ালা, টুসি বিশ্বাস, রেহানা খান— ঐ তো। ক’টা ছেলেও তো আছে— শিবরঞ্জন খুরানা, তার সঙ্গে একবার ভাব জমাবার চেষ্টা করেছিল। ঐ তো অর্কদেব ব্যানার্জ্জী। মালিনী কি স্বপ্ন দেখছে! আরে এই তো সেই ছেলেটা। কী বলছে মালিনীকে? কী— মালিনী শুনতে পাচ্ছে না। শীতলঠাকুর কই! তীব্র বিদ্যুৎ ঝলকে বেরবার পথ দেখতে পেল মালিনী। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বেরিয়ে এসে ছুটতে শুরু করল সে। বাড়ির রাস্তা সে জানে। বৃষ্টি নেমেছে তুমুল। এত বৃষ্টি— কত যুগ ধরে জমেছিল কে জানে আকাশের গায়ে। ছুটছে মালিনী— এত বৃষ্টিতেও। ঐ তো পদ্মদীঘির জল। এ কি, পেঁচার আমগাছটা কই; পদ্মআলোওলা ফটক। কই! অত প্রকাণ্ড বাড়িটা— ছুটছে মালিনী। বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝিলিক দিচ্ছে বিদ্যুৎ। মালিনী দু’হাত বাড়াল সামনে। তার শ্বেতলতার মতো হাত দুটো দেখতে পাচ্ছে না কেন! চরাচর ভেসে যাচ্ছে— মালিনী শুধু খুঁজে পেতে চাইছে নিজেকে।

    সুতপা মুখোপাধ্যায়
    [email protected]
  • বিভাগ : আলোচনা | ২০ মার্চ ২০২০ | ৩৫৯ বার পঠিত
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • একলহমা | 108.162.237.129 | ২১ মার্চ ২০২০ ০৭:৫৬91636
  • গল্পের ক্যানভাসটা খুব সুন্দর আঁকা হয়েছে। তবে গল্পটা আরো খানিকটা বিস্তারে পেলে ভাল লাগত।
  • বিপ্লব রহমান | 172.69.135.51 | ২১ মার্চ ২০২০ ১২:২২91644
  • "আমার সাসুড়ি বড়ায়ি বড় খরতর।
    সবখন রাখে মোরে ঘরের ভিতর।।
    হাত বাঢ়য়িলেঁ কি চান্দের লাগ পাই…
    আমার চান্দের লাগ পাই।"_________

    হারিয়ে যাওয়া পরানের গান যেন!

    এবারও খুব ঠাসাঠাসি চরিত্র, টুকরো গল্পের পাজল একটি যেন আরেকটির ঘাড়ে এসে পড়ছে, আরো বড়ো পরিসরে রয়েসয়ে লিখুন না, আয়েশ করে পড়ি, অনুরোধ রইলো।
  • করোনা ভাইরাস

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত