• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • ধানাই পানাই ১৫

    রূপঙ্কর সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১২ | ৪৫৬ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ | ১৯ | ২০

    গরু

    'গরু একটি গৃহপালিত পশু। তাহার চারটি পা, একটি লেজ, দুইটি শিং ও পিঠের ওপর একটি কুঁজ থাকে' – সারাদিন যার কোনও কাজ নেই সে সঙ্গে সঙ্গে হাজির। বলল, কেন, নাক, চোখ, মুখ এই সব থাকে না? তারপর মোলার টীথ, ইনসিসর টীথ এরা কেমন বিশেষ রকম – আমি বললাম, শোনো, এটা বাংলা রচনা, ক্লাস থ্রি-র। বাংলা মাধ্যমের বাচ্চারা এই রকম শক্ত শক্ত ইংরিজি শব্দ শোনেনি। আর শুনে থাকলেও, খাতায় তা লিখলে, বেঁড়ে পাকা বলে মাস্টারমশায়েরা নম্বর কেটে নেবেন।

     
     
    খুড়ো বলল, আরও আছে। এইযে পিঠে কুঁজের কথা বললি, মানে মেয়ে গরুদের আরকি, পিঠে তো কুঁজ থাকেই না বলতে গেলে। ষাঁড় বা বলদ হলে অবশ্য – আমি বললাম খুড়ো, এই লিখেই ছেলেরা চিরকাল নম্বর পেয়ে এসেছে। এখন দুম করে কুঁজটা বাদ দিলে – বুঝতেই পারছ, ইস্কুলে পাঠানো হয় নম্বর পাওয়ার জন্যে, জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়। তাছাড়া, গরু বলতে তো এন্টায়ার স্পিসিসটা বোঝানো হচ্ছে, খালি মেয়ে গরু বা গাভী তো নয়। এর পরেরটা শুনলেই বুঝবে।
     
    হ্যাঁ, 'গরু অতি উপকারি প্রাণী। ইহার দ্বারা চাষবাস, গাড়ি টানা ইত্যাদি নানা কাজ হয়। গরুর দুধও খুবই উপকারী পানীয়। তা ছাড়া ইহার দুধ হইতে ছানা, দই, রাবড়ি ও নানা প্রকার মিষ্টান্ন প্রস্তুত হয়।' খুড়ো, তোমার উল্লসিত হওয়ার কোনও কারণ নেই। এর পর প্রসন্ন গোয়ালিনীর কোনও প্রসঙ্গ এই রচনায় আসবেনা। কান্তখুড়ো ব্যাজার মুখ করে বলল, - 'ও'।
     
    আচ্ছা খুড়ো, গরুর দুধ খুব উপকারী বলা হচ্ছে কিন্তু গরুর মাংসও খুব পুষ্টিকর এটা বলা হয় না কেন? আচ্ছা এমন তো বলা যেত, কোনও কোনও ধর্মের লোক – ঠিক আছে ধর্ম শব্দটা ডাইসি – কোনও কোনও সম্প্রদায়ের লোক এই মাংস খান, আবার  অন্য সম্প্রদায়ের লোক ভুলেও স্পর্শ করেননা, এমন তো বলা যেত।
     
    খুড়ো বলল, আমার সামনে ভুলেও এই প্রসঙ্গের অবতারণা করবি না। প্রসন্নর গরুগুলোকে কেউ খেয়ে ফেলছে ভাবলেই আমার কেমন – আমি বললাম, আচ্ছা মিস্টার চক্কোত্তি, গরু কারা খায় বলতো? খুড়ো বলল, মুসলমানরা। আমি বললাম, শুধু মুসলমানরা খায়? খৃষ্টানরা খায়না? নাগারা খায়না? চিনেরা খায়না? খুড়ো বলল, হুম্‌। আমি বললাম, হিন্দুরা খায়না? খুড়ো বলল, সে তো এখন নব্য শিক্ষিত যুবক যুবতীদের ধম্মো কম্মো না মানাটা একটা ফ্যাশান হয়েছে, আমি ইন জেনারাল হিন্দুদের কথা বলছি ।
     
    আমি বললাম, তাই? হায়দ্রাবাদে ষোলই এপ্রিল (২০১২) একটা ছোটখাট দাঙ্গা হয়েছে জান? কাদের মধ্যে বলত? পারলেনাতো, ওসমানিয়া ইউনিভার্সিটির দলিত ছাত্ররা বীফ্‌ বিরিয়ানি উৎসব করছিল, কেননা এটা নাকি তাদের ঐতিহ্য বা পরম্পরা। এবার অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের ছেলেরা এসে ইঁট পাটকেল নিয়ে হামলা চালায়। তাই নিয়ে ছোটখাট দাঙ্গা, একজন ছুরিকাহত। তা খুড়ো দুদলই তো হিন্দু। তাই না?
     
    কমলাকান্ত চক্রবর্তী বলিলেন, তবে তুই গরুখোরদের দলে? আমি বললাম, সব্বোনাশ, কক্ষনো না। রেড মীট মানেই টক্সিক, আর বিগার দি অ্যানিম্যাল, বিগার দি অ্যামাউন্ট অফ টক্সিসিটি। হাতি খেলে আরও টক্সিক।
     


    যাকগে খুড়ো, আমাদের রচনাটাই ভন্ডুল হয়ে যাচ্ছিল। - গরু আমাদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় খুবই প্রভাবশালী প্রাণী। এই জীবটিকে নিয়ে নানা রকম প্রবাদ-প্রবচনও তৈরী হয়েছিল, যেমন, বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানো। কিন্তু ইদানীং কালে বাঘ এবং গরুকে এক ঘাটে কিছুতেই হাজির করানো যাইতেছে না, গরু দেখিলেই বাঘ আতঙ্কে – কমলাকান্ত বলল, অ্যাই, অ্যাই, ছোঁড়ার মাথাটা এক্কেবারে খারাপ হয়ে গেল বোধ হয়। কি বলছিস তুই, গরু দেখিলেই বাঘ আতঙ্কে, না ব্যাপারটা উল্টো হবে?
     
    আমি বললাম, খুড়ো, যতই ছোঁড়া বল, বুড়ো বয়সে গরুর রচনা কি এমনি লিখতে বসেছি? তবে শোন, সালটা বোধকরি দু হাজার তিন কিংবা চার হবে। ইন্সপেক্‌শনে ভূবনেশ্বর গেছি। ট্রেনটা পৌঁছল রাত সাড়ে তিনটেয়। সকাল ন'টায় বেরোতে হবে, ঘুমোলে আর উঠতে পারবনা। কী করি এখন? কাগজও তো সাতটার আগে দেবেনা, অগত্যা টেলিভিশনটা খুলে বসলাম, জান খুড়ো, টি ভি আমি সচরাচর দেখি না। মাঝে মধ্যে খবর আর খেলার অংশবিশেষ ছাড়া। তা এ সময়ে খেলাও কিছু নেই, আর খবর তো বাসি। তাই অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট খুলে বসলাম। ওখানে একই প্রোগ্রাম দিনে রাতে বেশ কবার রিপীট করে। সেখানে দেখি এক সিংহ পরিবার একদল মোষকে তাড়া করেছে। তারা প্রাণভয়ে ছুটছে, পেছনে ছুটছে সিংহী্রা। তারাই শিকারটা ধরে। নবাবজাদা সিংহ মশাই পরে এসে গিন্নীদের তাড়িয়ে নিজের উদরপূর্তি করেন। গিন্নীরা আর বাচ্চারা পায় এঁটোকাঁটা যত।
     
    খুনোখুনি দেখতে ইচ্ছে করেনা খুড়ো, কিন্তু কি আর করা, বিবেকানন্দ বলেছিলেন, 'দা স্কীম অফ দা ইউনিভার্স ইজ ডেভিলিশ'।
     
    এখানে কেউ না কেউ কাউকে না কাউকে খেয়ে বেঁচে থাকে। কিচ্ছু করার নেই। বাঁচতে গেলে কাউকে খেতেই হবে।
     
    তা সিংহীরা তাড়া করে একটা তাগড়া মত মোষকে তো ধরে ফেলল। তবে সেও বিনা যুদ্ধে মেদিনী ছাড়বার পাত্র নয়। একটা সিংহী ঘাড় কামড়ে ধরেছে। একটা কোমর, একটা সামনের পা আর একটা পেছনের পা ধরেছে, ব্যাটা চার চারটে হিংস্র ঘাতকের সঙ্গে তাও লড়ে যাচ্ছে। একবার তো ওকে মাটিতে পেড়েও ফেলল। আমি ভাবলাম সব শেষ। ওমা, ব্যাটা চারটেকে নিয়েই উঠে দাঁড়াল।
     
    খুড়ো বলল, তারপর? আমি বললাম, যারা পালিয়ে গেছিল আর দূরে দাঁড়িয়েছিল, তাদের একজন ঘুরে দাঁড়াল। ভাবটা এই রকম, ওরে, ও তো একলা লড়ে যাচ্ছে, আমরা কি কাপুরুষ হয়েই থাকব? আর একজন গুটিগুটি এসে তার পাশে দাঁড়াল। আর একটা এল, আরো একটা, এই করে দশ বারোটা সারিবদ্ধ। হাল ছেড়োনা বন্ধু, শুধু শৃঙ্গ বাগাও জোরে। এবার তারা এগোতে লাগল। প্রথমে ধীরে, তারপর জোরে, তারপর আরও জোরে, মাথা নীচু করে, শিং বাগিয়ে। ওদের পেছনে উদ্বুদ্ধ হয়ে আরো আরো কয়েক লাইন বিশ, ত্রিশ, পঞ্চাশ –
     
    খুড়ো, সিংহীরা শিকার ছেড়ে পিছিয়ে দাঁড়াল, তারপর পালাতে লাগল প্রাণভয়ে। পশুরাজ সিংহ পালালো আরও জোরে, গিন্নীদের পেছনে ফেলে। বাস্তিল দূর্গের পতন দেখছি খুড়ো, কিংবা বলশেভিক রিভোলিউশন। আমার চোখের পলকগুলো ভিজে ভিজে ঠেকছিল খুড়ো, আত্মহারা হয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম, - মার শালাকে, মার মার – একটা বেল বয় ঘাবড়ে গিয়ে দরজা ঠেলে বলল, আপড়ঁ কিছি কহিলে আইগাঁ?
     
    মিস্টার চক্রবর্তী বললেন, উই ওয়্যার ডিস্‌কাসিং দি অ্যাফেয়ার্স অফ কাউস, নট বাফালোস।  একে মোষ, তাও আবার বুনো। শুধু তাই নয়, তারা আবার আফ্রিকান। ওরা একটু ভায়োলেন্ট টাইপ হতেই পারে, মহিষাসুরের কথা শুনিসনি? ওটা তো ষন্ডাসুর হতে পারত। আমি বললাম দেখ খুড়ো, মোষগুলো কালো বলে চিরকাল শিডিউল কাস্ট। ষাঁড় ব্যাটাচ্ছেলে শিবের বাহন বলে চিরকাল ফোকটে খাবার দাবার পায় আর রাস্তায় ট্র্যাফিক আটকে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু মোষকে দেখতে খারাপ বলে যমরাজের সঙ্গে ট্যাগ করে দিয়ে,- নাঃ ডিস্‌ক্রিমিনেশন সেই আদ্যিকাল থেকেই চলছে।
     
    - তাই বলে গরু – আমি বললাম, তুমি জিম করবেট ওমনিবাস পড়েছ? সেখানে একটা গল্পে আছে, ওই কালাঢুঙ্গির কাছে কিংবা রামনগরে, এক রাখাল গরু চলাচ্ছিল। হঠাৎ যমদূতের মত একটা বাঘ এসে তাকে ধরল। আসলে দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে রাখালের সঙ্গে গরুমোষদের একটা আত্মিক বন্ধন তৈরী হয়। মালিকের বিপদ দেখে দশ-বারোটা গরুমোষ একত্রে তেড়ে এসে বাঘটাকে ঢুঁসিয়ে দিল। বাঘ তখন রাখালকে ছেড়ে চম্পট।
     
    কান্তখুড়ো বলল, আরে ঐ দল তো মিশ্র, মানে, গরুর সঙ্গে মোষও ছিল। তাই অত সাহস। বাট উই ওয়্যার টকিং অ্যাবাউট কাউস ওনলি। গরু নিয়ে কথা হোক। ঐ যে ঘাটে গরু দেখে বাঘ আতঙ্কে না কি বললি, কথা ঘোরাস না।
     
    তাহলে খুড়ো, রচনাটা শেষই করি। গরু নিয়ে রচনা, শুধু গরু, নো মোষ, ঠিক আছে? 'পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, গরু মানুষের বিভিন্ন কার্যে ব্যবহৃত হয়। এখন দেশীয় গরুর শারীরিক এবং দুগ্ধোৎপাদন ক্ষমতাবৃদ্ধি ইত্যাদির উন্নতিকল্পে বিদেশি হলস্টীন, জার্সি, ইত্যাদি প্রজাতি আমদানী করা হইতেছে'।

    খুড়ো বাধা দিয়ে বলল, ক্লাস থ্রি-র বাচ্চাদের রচনা এই রকম? আমি বললাম, আঃ বাচ্চা চিরকাল বাচ্চা থাকবে নাকি? রচনা তো সেই কখন আরম্ভ হয়েছে। বাচ্চা এখন মাধ্যমিক দিল বলে ।
     
    হ্যাঁ যা বলছিলাম – দেশীয় গরুর উন্নতিসাধন কল্পে নানা বিদেশি প্রজাতি আমদানী হইতেছে কিন্তু তাহার কি সত্যই কোনও প্রয়োজন ছিল? আমাদের দেশেই খুবই উন্নত মানের বিভিন্ন প্রজাতির গরু পাওয়া যায়। তাহারা আকারেও বিশাল এবং অধিক দুধ উৎপাদনেও সক্ষম। ইহাদের মধ্যে আছে, গুজারাট, গির, ব্রাহ্মণ, চান্নি, গিট্টা, হরিয়ানা, পাটনাই, দক্ষিণ ভারতের কাঙ্গায়ম, নেলোর, ওঙ্গোলে ইত্যাদি। কিন্তু যতই তাহারা আকারে বিশাল হউক, তাহাদের শিং এর গঠন এমনই, যে আক্রান্ত হইলে তাহা আত্মরক্ষার্থে বিশেষ উপযোগী নয়। দক্ষিণ ভারতের গরুদের শিং বিশাল, কিন্তু তাহা পিছন দিকে বাঁকানো, প্রয়োজনের সময় কোনও কাজেই লাগিবে না।
     
    কমলাকান্ত বলল, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, এ লেখার বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য আছে, তা ধানাই পানাই না গেয়ে ঝেড়ে কাশ না বাবা – আমি বললাম, খুড়ো, আমাদের বাংলার গরুগুলো আকারে ছোট, কেমন মায়া মাখানো চোখদুটো, গ্রামবাংলার গরীব ঘরে প্রায় বাড়ির সদস্যের মত। সে দুধ হয়তো কম দেয়, কিন্তু এই শ্যামলী- ধবলী গাই গুলোর শিং দেখেছো? কেমন সামনের দিকে বাঁকানো না? প্রয়োজনে কাজে আসতে পারে, কী বল?  খুড়ো বলল, তার মানে?
     
    আমি বললাম, আমরা কিন্তু গরুর কথা বলছি, শুধু গরু, নো মোষ। গত আটাশে এপ্রিল দু হাজার বারো, শনিবার, টাইমস অফ ইন্ডিয়া কাগজের একেবারে প্রথম পাতায় একটা ছবি আছে। একটা গরু, দেশি গরু, আমাদের বাংলার গরুদের মতই দেখতে, কালচে রঙের। জায়গাটা দক্ষিণে, কোয়েম্বাতুরের কাছে, ওয়ালপারাই নামে পাহাড়ের কোলে একটা গ্রাম। সকালে গ্রামবাসীদের ঘুম ভাঙে একটা জান্তব গোঙানীর শব্দে। লোকে ভেবেছে কোনও লেপার্ড জাতীয় জন্তু বোধহয় গর্তে পড়ে টড়ে গেছে। তারা এসে দেখে ঐ গরুটার গোয়ালের এক কোনে একটা বিশাল বড় ডোরাকাটা বাঘ।


    বাঘটা কাতরাচ্ছিল, তার চলাফেরার ক্ষমতা নেই। সে গরুটাকে অ্যাট্যাক করার সঙ্গে সঙ্গেই গায়ে যত জোর ছিল সব একত্র করে গরুটা তাকে গুঁতিয়ে দেয়। তার কোমর এবং পেছনের পা মারাত্মক জখম। গরুটার কিন্তু সামান্য কটা মামুলি আঁচড় ছাড়া গায়ে কোনও ক্ষত নেই। ভেতরের পাতায় বাঘটারও ছবি ছিল খুড়ো। বাচ্চা টাচ্চা নয়, পূর্ণ বয়স্ক ইয়াব্বড় কেঁদো বাঘ। খুড়ো, এক ঘাটে জল খাওয়া নিয়ে কী যেন বলছিলে?
     
    হ্যাঁ ভাল কথা, যখন মিডিয়ার লোক ওখানে যায়, গরুটা বসে বসে বিন্দাস জাবর কাটছিল। কয়েক ফুট দূরে আস্ত বাঘের অবস্থানে তার কোনও হেলদোল নেই। গুন গুন করে নাকি গানও গাইছিল, বাংলা গান। তামিল ফোটোগ্রাফাররা ঠিক মানেটা বোঝেনি। খুড়ো বলল, বাংলা গান? কী গান? আমি বললাম, 'আর দেবো না আর দেবো না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ গো...হেই সামালো হেই সামালো...'