• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • ধানাই পানাই ১৮

    রূপঙ্কর সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২০ অক্টোবর ২০১২ | ৩৬৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ | ১৯ | ২০

    দীনবন্ধু
     
    আজ দু হাজার চার সালের মে মাসের কুড়ি তারিখ। ক’দিন আগে আমার ভীষণ জ্বর হয়েছিল বলে মা এবাড়িতে এসে আছে। অনেক রাত্তির পর্যন্ত লেখাপড়া করি বলে মা কে বলেই রেখেছি সকাল সাতটার আগে চা দেবেনা। আজ সাতটারও অনেক আগে দমাদম দরজায় ধাক্কা। ওপাশে মায়ের গলা, অ্যাই, খোকা, বাইরে কে যেন ডাকছে, ওঠ্‌না একটু –
     
     
    চোখ ডলতে ডলতে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি, ইয়াব্বড় গোঁফওয়ালা এক হাসি হাসি মুখ। -আমাকে চিনতে পারছেন? আমি দীনবন্ধু। চিনতে পারলেননা? আমি দীনবন্ধু – আমি বললাম, এন্ড্রুজ না মিত্তির? রসিকতাটা করেই ভাবলাম, না না, খুব অন্যায় হল। যিনি এসেছেন, ঐ দুটো নামের একটাও তাঁর জানার কথা নয়। সেই দীনবন্ধু তখনও হাসি হাসি মুখে বলে যাচ্ছে, - আমাকে চিনতে পারলেননা, আমি যে – আমি ভাবছি, সত্যি কি আমি কোনও দিন একে চিনতাম? একে কোনওদিন কোথাও দেখেছি বলে তো মনে পড়ছেনা। কিন্তু এতবার এই হাসিমুখ দেখেও কিছু মনে পড়বেনা, এও কি সম্ভব?
     
    সম্ভব না-ই বা কেন? মাত্র কয়েক বছর আগের কথা। গোরামামার এক ছেলের বিয়ে। গোরামামার ছেলেমেয়েরা সবাই উচ্চশিক্ষিত, ভালভাবে প্রতিষ্ঠিত। ওদের সবার বিয়েতেই গেছি। ও বাড়িতে আবার দু দিক দিয়ে সম্পর্ক। গোরামামার বৌ, অর্থাৎ মামী হচ্ছে আমার আপন পিসতুতো দিদি। গোরামামার মেয়েদের রিসেপশনগুলো হয়েছে পাঞ্জাব হাউসে। ছেলেরটাও সেখানেই হবে। তবে আমার নেমন্তন্ন আজকে একডালিয়ার পারিজাত অ্যাপার্টমেন্টে, এটা বরযাত্রী হিসেবে।
     
    আমার একদম যাবার ইচ্ছে ছিলনা। এরকম যোগাযোগ বর্জিত লোকজনের বাড়ি আমি একদমই যাইনা। কিন্তু মায়ের সেন্টিমেন্ট রাখতে যেতেই হয়েছে। ওরা নাকি বার বার করে যেতে বলেছে। কী বলেছে ঈশ্বরই জানেন, তখন তো আমি অফিসে। আমি কিছুক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করলাম, আরে বৌভাতে তো যাবই, আবার এখানে কেন, কাউকে তো চিনিনা, ধুর আমি যাবনা। সঙ্গে সঙ্গে সেন্টু, - আর কটা দিনই বা আছি, আমি না থাকলে তো এইসব আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কই থাকবেনা ( এখনই যেন কত আছে)।
    আর বেশি কিছু বললে এক্ষুণি ফ্যাঁচ ফোঁচ করে কান্না শুরু হয়ে যাবে। -তোর মামা-মামী বিশেষ করে বলে গেছে, ওরা যেন বরযাত্রী যায়। অগত্যা –
     
    বিয়েবাড়িটা বাড়ির কাছেই, এই একটা সুবিধে। ঘুরছি ফিরছি, কাউকে চিনছিনা, একটা অস্বস্তিকর পরিবেশ। প্রথম কথা, পাত্রী পক্ষের কাউকে চিনিনা, চেনার কথাও না। এদিকে যেহেতু তাদের অনুষ্ঠান, তাই তাদের লোকই বেশির ভাগ। পাত্র পক্ষেরই বা ক’জনকে চিনব। ছেলের বন্ধুবান্ধবদের তো চেনার সম্ভাবনা নেই, দূর সম্পর্কের আত্মীয় জনা দুই পেলাম। তারাও ‘ভাল আছো?’ বলে গল্প শেষ। এক্ষুণি একটা রেজোলিউশন নিতে হবে, আর জীবনে এমন অনুষ্ঠানে আসবনা, তা মা যতই সেন্টু দিক না কেন। হঠাৎ দেখি এক চেনামুখ। আহা হাতে যেন চাঁদ পেলাম।
     
    একগাল হাসি নিয়ে দীনবন্ধুর মত এগিয়ে গেলাম, ‘ – দি, আরে কতদিন পরে দেখা, চিনতে পারছ?’ যাঁকে বললাম, তিনি একজন প্রথিতযশা লেখিকা। তিনি অবশ্য খারাপ ব্যবহার মোটেই করেননি। হাসিমুখেই বললেন, - নাতো । আমি নিজের হাসিমুখ আরও চওড়া করলাম,
     
    -আমি রূপঙ্কর।
     
    - কে রূপঙ্কর?
     
    - আরে আমি রূপঙ্কর, কল্পনাদির ছেলে ।
     
    - কে কল্পনাদি? কোথায় থাকেন আপনারা?
     
    - আরে বাবা, নিজেদের বাড়ি ছেড়ে কোথায় যাব, সেই কসবায়, বেদিয়াডাঙায়। তুমি তো কতবার আমাদের বাড়ি গেছ। ( লেখিকা কিন্তু তখনও হাসছেন, যাতে আমি লোকের সামনে খুব একটা অপদস্থ না হয়ে যাই)
     
    - কিন্তু কসবায় আমার পরিচিত কেউ থাকেন বলে তো মনে করতে পারছিনা?
     
     
    - আরে বাবা, আমরা আগে থাকতাম কেয়াতলায়। সে বাড়িতে তো আপনি (আর তুমি বলা যাচ্ছেনা) বহুবার গেছেন। তারপর আমরা কসবায় বাড়ি করে উঠে এলাম। মনে নেই, এই কসবার বাড়িতেই তো আপনি শারদীয়া দেশ না আনন্দবাজার নিয়ে এসে বললেন, এই দ্যাখ্‌ এবারের উপন্যাসে তোর নামটা লাগিয়ে দিলাম, মুখ্য চরিত্রের নাম রূপঙ্কর, মনে নেই?
     
    - নাতো –
     
    - আরে আমি তখন কত ঝগড়া করলাম, এই রকম বিচ্ছিরি চরিত্রের নাম রূপঙ্কর? মুখ্য চরিত্র হলেই হল? তারপর আমার সবেধন নীলমণি নামটা যে বাজারে চাউর হয়ে যাবে? গন্ডায় গন্ডায় রূপঙ্কর বেরোবে, তার বেলা? তখন আপনি বলেছিলেন, ভালই তো, তোর কয়েকটা জুড়িদার হবে। মনে নেই? ‘- দি’ মুখের হাসি তেমনি ধরে রেখে বললেন, কিছু মনে করবেন না, আমিনা, এরকম কোনও কথাই মনে করতে পারছিনা।
     
    আমার তখন ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস পড়ছে, মুখের হাসি মিলিয়ে গেছে কেননা চার দিকের অনেক জোড়া ভুরু আমার দিকে কুঁচকে আছে। একটা শেষ চেষ্টা – আরে কল্পনাদিকে মনে নেই, কোলকাতা ইউনিভার্সিটির কল্পনাদি, সেই বাটানগরে পিকনিক, দ্বৈত সঙ্গীতকে দৈত্য-সঙ্গীত, কিচ্ছু মনে পড়ছেনা? আপনি তো সামান্য কারণেই কেঁদে ফেলতেন, অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে তবে – কিন্তু নতুন লেখা বেরোলেই মাকে দেখাতে চলে আসতেন আমাদের বাড়ি – কিচ্ছু মনে পড়ছেনা?
     
    – নাঃ সত্যি ভাই, এমন কোনও কথাই মনে পড়ছেনা।
     
    চওড়া গোঁফ আর আরও চওড়া হাসি নিয়ে দীনবন্ধু দাঁড়িয়ে আমার সামনে। - আমাকে চিনতে পারলেননা? আমি যে সেই একবার –
     
    আশির দশকের প্রথমভাগ। আমি তখন মধ্য কোলকাতায় আমাদের ব্যাঙ্কের একটা খুব বড় শাখায় কর্মরত। আমাদের ওখানে প্রতি বছরই নবীন অফিসারদের শিক্ষানবিশীর জন্য পাঠান হয়। সে বছর দুজন এল। তাদের নাম তো বলা যাবেনা, ধরা যাক এক নম্বর আর দুই নম্বর। দুই ছিল অনেকটা ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট ক্যাপ্টেন ক্লাইভ লয়েডের মত দেখতে। অত কম বয়সেই খুব গম্ভীর, রাশভারি আর কেমন যেন অহমিকা অহমিকা ভাব। সেই তুলনায় এক ছিল খুবই সহজ সরল, মিশুকে এবং আবেগপ্রবণ।
     
    এদের আগের ব্যাচের শিক্ষানবিশরা বলে গেছে, তোমরা কিছু অসুবিধেয় পড়লেই রূপঙ্করদার কাছে চলে যাবে। উনি মোটামুটি এখানকার মুশকিল-আসান। ব্যাপারটা খানিক বাড়িয়ে বলা হলেও কিছুটা সত্যি। একদিন দেখি দুজনে হনহনিয়ে আমার দিকেই আসছে। এক তো প্রায় কেঁদেই ফেলেছে। - আচ্ছা রূপঙ্করদা, আমরা কি কুকুর বেড়াল? চার তলায় একজন আমাকে বিনা কারনে এমন অপমান করলেন, বলে বোঝাতে পারবনা।
     
    কে অপমান করেছে? চল তো দেখি। গেলাম ওপরে। সেই ব্যক্তিকে ডাকলাম, প্রচন্ড দাবড়ানি দিলাম, ওদের কাছে ক্ষমা চাওয়ালাম, ওরা মোহিত হয়ে গেল। দুই একটু গম্ভীরপানা আগেই বলেছি কিন্তু এক নম্বর আমার ছায়া হয়ে গেল। দিন যায়, মাস যায়, আমি কোলকাতার বাইরে বদলি হয়ে গেলাম।
     
    বেশ ক’বছর পরের কথা। কোনও একটা কাজে কোলকাতা এসেছি, জি পি ও-র সামনে মোড়টা ঘুরতেই দেখি একটা লাল সোয়েটার ছুটতে ছুটতে আসছে। অনেক দূর থেকেই দুই হাত প্রসারিত, সত্তরের দশকের হিন্দী ছবিতে যেমন নায়িকারা সিমলা পাহাড়ের ঢাল থেকে নায়কের দিকে দু হাত বাড়িয়ে ছুটে আসত, ঠিক তেমনি। - ঠিক তেমনি ভাবে জাপটে ধরে,-আরে রূপঙ্করদা, কতদিন পর আপনাকে দেখলাম, কী আনন্দ যে হচ্ছে না, বলে বোঝাতে পারবনা।
     
    তার মাত্র বছর দুই পর। আমি তখন প্রশাসন মূলক কাজকর্ম দেখি। নতুন কোনও অফিসার এক নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়োজিত হলে, তাঁকে আমার সঙ্গে দেখা করে যেতে হয়। হঠাৎ দেখি দু নম্বর। সে এখন পদমর্যাদায় আমার ওপরে, তার ওপর গোড়া থেকেই গম্ভীর ও রাশভারি টাইপ। আমি কাজে মন দিলাম, উচ্ছ্বাস দেখানোর কোনও অর্থই নেই, তাও তার সঙ্গে দেখা এত বছর পরে।
     
    দু নম্বর বাজখাঁই গলায় চেঁচিয়ে উঠল, আরে রূপঙ্করদা, চিনতেই পারছেননা দেখি, বলি আছেন কেমন? আমি আমতা আমতা করি, না না, চিনবনা কেন, তোমারই কাগজ রেডি করছিলাম। মনে মনে অনুশোচনা, ছি ছি, কী লোককে কী ভাবছিলাম। দু নম্বর বলে, শুনেছেন তো, এক এসেছে হেড অফিসে। যান একদিন দেখা করে আসুন, আপনাকে দেখলে খুব খশি হবে।
     
    হেড অফিস দূর নয়, পায়ে হাঁটা পথ। গেলাম একদিন। ঢুকে দেখি কোণের টেবিলে বসা। গেলাম সামনে, হাসি চওড়া করে। কিরে বাবা, অন্য একজনের সঙ্গে কথা বলছে তো বলছেই, আমার দিকে দেখলও দু একবার আড় চোখে। মিনিট দশেক পর সে ভদ্রলোক সরে যেতে আমাকে বেশ হাসিমুখেই বলল, হ্যাঁ বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?
     
    মাঝে মাঝে হয়না, নিজের চোখ কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়না, এ সেরকম পরিস্থিতি। মাত্র দু বছর আগে জিপিও-র সামনে দুহাত বাড়িয়ে জাপটে ধরে - বললাম, আমি রূপঙ্করদা, রূপঙ্কর সরকার – সে একটু চিন্তা করার ভান করল, রূ–প–ন-ক – নাঃ ঠিক মনে পড়ছেনা, আসলে আমার কাছে বহু অফিসার সমস্যা নিয়ে আসেন তো, সবার নাম ঠিক খেয়াল থাকেনা। তা বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি? আমি বললাম, না, আমার কোনও সমস্যা নেই। আসলে আপনাকে অন্য একজনের মত দেখতে তো, তাই গুলিয়ে ফেলেছিলাম। বলে চলে এলাম।
     
    একদিন চার্টার্ড বাসে উঠে দেখি একটা সীটই খালি, তার পাশেরটায় তিনি বসে। পাশে বসতেই হল। সূর্য কখন ডুবে গেছে, তবু তিনি জানলা দিয়ে পাখি দেখতে দেখতে ঘাড়ে স্পন্ডেলোসিস বাধিয়ে ফেললেন। কী জ্বালা।
     
    দীনবন্ধু, তুমি আছতো? আমাকে একটু ভাবতে দাও। বুড়ো হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু ডিমেনশিয়ায় ধরবে এমন বয়স তো হয়নি, তুমি চা খাবে? কেন মনে করতে পারছিনা?
     
    আরও বেশ কবছর পরের কথা, মন্ডল সাহেবের বাগান বাড়িতে নেমন্তন্ন। অনেকটা পিকনিকের মেজাজ। লোকজন এদিক সেদিক ঘুরছে। সবেদা গাছগুলোর ছায়ার বেতের চেয়ারে কফি নিয়ে আমরা জনা পাঁচেক। আমার ঠিক উল্টোদিকে এক নম্বর। কিছুক্ষণ পর একজনের বাথরুম পেল, দুজন মাছধরা দেখতে গেলেন, রইল বাকি দুই, মুখোমুখি। উসখুস, গলা খাঁকারি,- মানে ইয়ে, আমি মনে হয় আপনার সঙ্গে কোথাও এক সঙ্গে কাজ করেছি। আমি গ্র্যানাইট পাথর, হবে হয়তো। আচ্ছা অমুক ব্র্যাঞ্চে আপনি একাশি বিরাশি সাল নাগাদ ছিলেননা? আমি বললাম, ছিলাম। - ও, হ্যাঁ মনে পড়েছে, ওখানেই তো আপনার সঙ্গে – আমি বললাম, হবে হয়তো, এত লোকের সঙ্গে কাজ করেছি, সবাইকে মনে রাখা সম্ভব? বাথরুম সেরে একজন ফিরলেন, মাছধরা দেখে বাকি দু জন, আলোচনা শেষ।
     
    তোমার নাম দীনবন্ধু? তোমার হাসিটা খুব আন্তরিক, কিন্তু কেন , কেন , কেন চিনতে পারছিনা? আমার স্মৃতিভ্রংশ হল নাকি? এতো বড় কঠিন শংকট। কী হবে এখন?
     
    তখন কলেজে পড়ি। অফ পিরিয়ডে বসুশ্রী হলের সামনে স্টিল ছবি দেখছি, তখন চলছিল অরূপ গুহঠাকুরতার ‘পঞ্চশর’।

    সুঠাম চেহারার এক যুবক দেখি আমার পাশে দাঁড়িয়ে। গায়ে একটা সাতটাকা দামের ভুটিয়া সোয়েটার আর প্যান্টটা পায়ের কাছে ছেঁড়া (অবশ্য এখন সেটা হলে ফ্যাশনের চূড়ান্ত)।

    প্রায় গা ঘেঁষেই দাঁড়ানো, বললাম, আচ্ছা আপনি শমিত ভঞ্জ না? সে একগাল হেসে বলে, আমায় কী করে চিনলেন? আমি বললাম, ঐ তো, বলাই সেনের কেদার রাজা ছবিতে পুলিশ অফিসারের রোল করেছিলেন না? সে আরো হাসে, ওহ্‌, ওটা তো কয়েক সেকেন্ডের রোল, তাই থেকেই আপনি আমার নাম খুঁজে বের করেছেন? দারুন তো ! আমি বললাম, ওই কয়েক সেকেন্ডেই জাত চেনা যায়। আপনি অনেক বড় হবেন। দুহাত জড়িয়ে বেশ কয়েক সেকেন্ড হ্যান্ডশেক করে সে বলে, আবার কোথাও দেখা হবে, চলি?