• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • ধানাই পানাই ১৩

    রূপঙ্কর সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১২ | ৩৭৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ | ১৯ | ২০

     

    মরণের পারে

    এমন একটা সময় ছিল, যখন কাউকে যদি জিজ্ঞেস করা যেত, হ্যাঁ হে, ‘বিষবৃক্ষ’ পড়েছ? সে হয়তো বলল, বিষ – বৃ-ক্ষ? ও, হ্যাঁ, নীহাররঞ্জন গুপ্তর সেই রহস্য উপন্যাস তো? আবার যদি কাউকে বলা হত, আচ্ছা ‘শেষের কবিতা’ সম্বন্ধে আপনি কি বলেন? সে হয়তো বলল, হ্যাঁ সুভাষ মুখোপাধ্যায় কবি হিসেবে সত্যিই অনবদ্য। কিন্তু এঁরা দুজন সমেত, বঙ্গভূমির আপামর জনসাধারণ পড়া টড়ার ব্যাপারে এক জায়গায় এক নৌকোয়। তা হল, স্বামী অভেদানন্দের ‘মরণের পারে’। আমাদের সময়ে, এ বই পড়েনি এমন লোক আমি অন্ততঃ দেখিনি। সবচেয়ে বড় কথা, কেউ এটা লাইব্রেরী থেকে নিয়ে (তখন হানেশাই হত, গ্যাঁড়ানোও চলত সমানে) পড়েনি। সবার বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী থাকুক না থাকুক, দুটো বই মাস্ট। রামকৃষ্ণ কথামৃত আর মরণের পারে। মানে, লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলি, আমার বাড়িতেও দুটোই আছে। অবশ্য রবীন্দ্র রচনাবলীও আছে।

    স্বামীজি বইটা লিখেছেন। তা বেশ করেছেন,  তবে ছবিগুলো না দিলেই পারতেন,  তাও খানিক বিশ্বাসযোগ্য হত। অবশ্য বেশ কিছু পাবলিক তাতেও গোল খেয়েছে। তখনকার লোকজন বড় সরল ছিল। একজন আমায় তেড়েফুঁড়ে বলল, ছবিগুলো দেখেছিস? এর চেয়ে বড় অকাট্য প্রমাণ আর কী হতে পারে। আমি বললাম, ভাইটি, আমার নিজের একটা ফোটো ল্যাব আছে জানিস তো? কত সুপারইম্‌পোজ, মাল্টিপ্‌ল এক্সপোজার করলাম, তুই আমাকেও ছবির গপ্পো শোনাবি? তখন অবশ্য ‘মরফিং’ শব্দটা শুনিনি, টেকনোলজিও অনেক পেছনে। তবু ছবিগুলো দেখে ভাবতাম, কেন উনি এগুলো দিলেন। একে তো সবই বিদেশি ছবি, তাও আদ্যিকালের। মানে, তখনকার লোক যত বোকা, আরও আগের লোক আরও বোকা ছিল, এগুলোও গিলত। কিন্তু ওদিকে, লার্জ ফরম্যাট ক্যামেরায় সরাসরি ফিল্মের ওপরই সুপারইম্‌পোজ করা যেত। ল্যাব অবধি যাবার দরকার পড়তনা। প্রথম কথা ভূত বলে কি কিছু আছে? দ্বিতীয় কথা, যদি থাকে। তাদের কি ছবি তোলা যায়?

    সত্তরের দশকের প্রথম দিক। একদিন বুলবুলদা বলল, চল তোকে এক জায়গায় নিয়ে যাই, খুব ভাল লাগবে দেখিস। যে জায়গাটায় গেলাম, সেখানে এখন কেউ গেলে ধারণাও করতে পারবেনা কেমন ছিল সেই জায়গা।

    জায়গাটা সন্তোষপুরে, মানে আক্রার সন্তোষপুর, যাদবপুরের পাশেরটা নয়। একেবারে গঙ্গার ধারে, অনেকটা জমির ওপর একটা কাঠ, টিন ইত্যাদি দিয়ে বানানো দোতলা বাংলো। স্থলভাগের অংশটা ছোট গাছের ‘হেজ’, কাঠের বেড়া, এইসব দিয়ে ঘেরা থাকলেও নদীর দিকটা উন্মুক্ত। একটা ঘাট এবং কয়েক ধাপ সিঁড়ি, যেটি সংস্কারের অভাবে খানিক ভগ্ন, সোজা নেমে গেছে গঙ্গার বুকে। বাড়িটি প্রথম দর্শনেই ইঙ্গিত দেয়, যে  সম্ভবতঃ কোনও বিলেতী সাহেব এটি এর বর্তমান মালিককে বিক্রী করে চলে গেছেন।

    সে বাড়িটা নিশ্চয় এখন নেই, থাকা সম্ভব নয়। ওই অঞ্চলে অতবড় প্রপার্টি নিয়ে কোনও বিশেষ নৃগোষ্টির লোক সেখানে এখন বাস করছেন, তা ভাবাও অন্যায়। যাক, সে সময় ছিল অন্যরকম। আমি গিয়ে অবধি চারিদিকের পরিবেশ দেখে মুগ্ধ হয়ে ভাবছিলাম, কত সৌভাগ্য থাকলে এমন বাড়িতে লোকে থাকতে পায়।

    যিনি থাকতেন, তিনি অবশ্য খুব একটা ভাগ্যবান বলে মনে হলনা। তিনি বৃদ্ধ, সাথে তাঁর বৃদ্ধা স্ত্রীও আছেন। কাজের লোক থাকলেও শুধু দিনের বেলাটুকু থাকে, কারণটা সহজেই অনুমেয়, ওই রকম নির্জন জায়গায় রাত্রে বাইরের লোককে থাকতে দেয়াটা সেই সময়েও কিছুটা বিপজ্জনক বলে গণ্য হত।

    বাড়ির মালিক বুলবুলদার কাকা। তিনি গোঁড়া ব্রাহ্ম, বাড়ির সাজসজ্জা, আসবাব ও সার্বিক পরিবেশে তার ছাপ স্পষ্ট। এই ধণের ব্রাহ্ম পরিবার তখন অনেকই দেখতাম, আমার সহপাঠীও ছিল বেশ ক’জন। ছেলেবেলায় যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, তার মালকিনই ছিলেন কট্টর ব্রাহ্ম। এখন বোধকরি ‘প্রসারিত’ এবং লিবারাল হিন্দু ধর্ম এঁদের গিলে খেয়েছে।

    কাকীমা, পুরোন বাংলা ছবিতে যে রকম ব্রাহ্ম মহিলা দেখতাম, সেরকমই। ফুলহাতা ফ্রিল দেয়া ব্লাউজ, শাড়ি পরাটাও যেন একটু অন্যরকম। বাঙালি ক্যাথলিক ক্রিশ্চানদের সঙ্গে ভীষন মিল চেহারায়। অসম্ভব ভাল রান্না করেন, তবে রান্নাগুলোও ঠিক আমাদের বাড়ির মত নয়, ক্রিশ্চান বাড়ির সঙ্গে স্বাদেও খুব মিল। বড় অদ্ভুত লেগেছিল কাকিমার ভাঁড়ার ঘরে ঢুকে। তাকের ওপর সারি দিয়ে বিশাল বিশাল চিনে মাটির বয়ামে ভর্তি নানা রকমের আচার আর মোরব্বা। কোনও আচারের দোকানেও অত রকম এবং ঐ পরিমাণে আচার দেখিনি। এগুলোকে ঐ ভারি ভারি বয়াম শুদ্ধু রোদে দেয়া, তোলা ইত্যাদি কী করে করা হয়, সেটাতেই শুধু অবাক হইনি, ভাবছিলাম এত আচার খায় কে?



     

     

    আচার ও মোরব্বা কয়েকটা চেখে দেখলাম, অপূর্ব বললেও খুব কমই বলা হবে। লজ্জার মাথা খেয়ে জিজ্ঞেসই করে ফেললাম, কিন্তু কাকীমা, এত আচার আপনারা দুজনে – বুক খালি করা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল দুজনেরই। শুধু আচার? এই এত বড় সম্পত্তি, এই বাড়ি, বাগান, কার জন্য রেখে যাব? জানা গেল, উত্তরাধিকারীরা সকলেই বিলেতে। কারোর ফেরার কোনও ইচ্ছে নেই। দু চার বছরে একবার এসে দেখাটাও করেন না। কাকা বললেন, পাড়ার লোকেদের বলেছি, আমি মরলে যেন বাড়ির বাগানেই সৎকার করা হয়। জায়গাটাও উনি বেছে রেখেছেন। আমাকে নিয়ে গিয়ে দেখালেনও সেটা। গঙ্গার একেবারে ধারেই, একটা ছোট বাঁকা মত গাছের নীচে একটু বেদীর আকারে চৌকো একটা জায়গা। আমি বললাম, তখন কাকীমার কী হবে? কাকা শক্ত করে বাহুপ্রান্ত চেপে ধরলেন, খুব জোর তাঁর হাতে। সেই জন্যেই তো যেতে পারছিনা, বুঝলেনা?

    বুড়ো মানুষরা নতুন লোক পেলে মহা উৎসাহে অনেক গল্প করেন, অনেক কিছু দেখাতে চান, নিজেকে দিয়ে তা এখন খুব ভাল বুঝি। হয়তো অল্প বয়সীরা সে সব দ্রষ্টব্যে এবং বক্তব্যে খুব একটা উৎসাহ পায় না। তারা সেটা গোপনও করেনা। বুড়ো মানুষগুলো দুঃখ পায়, আহত হয়। আমি কিন্তু একটুও দুঃখ দিইনি কাকাকে। খুব আগ্রহ ভরে শুনেছি সব কথা। না, জোর করে নয়, আমার শুনতে ভাল লাগছিল। নানান জিনিষ দেখাতে দেখাতে কাকা বললেন, দাঁড়াও একটা অদ্ভুত জিনিষ দেখাই তোমাকে।

    খুব সন্তর্পনে উনি একটা ব্রাউন পেপারের বড় খাম নিয়ে এলেন। সাবধানে আস্তে আস্তে তার থেকে বেরোল একটা কাঁচের ফোটোগ্রাফিক প্লেট। এখন এই প্লেট ব্যাপারটা একটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। এখন তো ডিজিটাল ক্যামেরায় ছবিটবি তোলা হয়, আমাদের কালের ক্যামেরাকে এখন নাকি বলে অ্যানালগ ক্যামেরা। যাই হোক, সেই অ্যানালগেও ভিউ ফাইন্ডারে চোখ লাগিয়ে দেখতে হত। তার আগে লার্জ ফরম্যাট ক্যামেরা ছিল। সেটা কোলের কাছে ধরে, ওপর থেকে ছবির ফ্রেম ঠিক করতে হত। এবার তারও আগে ছিল এই প্লেটওয়ালা ক্যামেরা।

    এতে শাটার থাকতনা। একটা মস্ত বড় ট্রাইপড বা তিনঠ্যাঙা স্ট্যান্ডের ওপর ক্যামেরা বিশাল বড় কালো কাপড় দিয়ে ঢাকা। ছবি তোলার আগে চিত্রগ্রাহক সেই কালো কাপড়ের মধ্যে ঢুকে পড়তেন। শুধু লেন্সের মুখটা বাইরে, তার ওপর একটা ঢাকনা। ছবি তোলার মুহূর্তে তিনি, রেডি, ওয়ান...টু...থ্রী বলে বোঁ করে হাত বাড়িয়ে ঢাকনাটা খুলে আবার ধাঁ করে লাগিয়ে দিতেন। কতক্ষণ এক্সপোজার দেবেন, পুরোটাই আন্দাজ। ফ্ল্যাশ বলে কিছু ছিলনা। রাত্রে তুলতে হলে ফোটোগ্রাফারের একজন অ্যাসিট্যান্ট পাশে দাঁড়িয়ে একটা টিনের প্লেটের ওপর গন্ধক জাতীয় কিছু ছড়িয়ে তাতে আগুন দিত। ফস্‌ করে তা জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেই ঢাকনা খোলা আর পরানো করতে হবে। একটু এদিক ওদিক হলেই গেল। মোদ্দা কথা হচ্ছে, ফোটো তোলায় মেলাই হ্যাপা ছিল সে সময়ে। হ্যাঁ, ভাল কথা, সেই সব ক্যামেরায় ফিল্ম বলে কিছু থাকত না। একটা ইমালশন লাগানো কাঁচের প্লেটের ওপর উঠত ছবি। সেটাই নেগেটিভ, তাই থেকেই প্রিন্ট হত।

    কাকা খুব সাবধানে খামটা থেকে একটা কাঁচের প্লেট বার করলেন। প্লেটটা আড়াআড়িভাবে ফাটা। বললেন, এই কিছুদিন আগে, অসাবধানতায় আমার হাত থেকে পড়ে ফাটলো। কিন্তু তাতে কিছু অসুবিধে নেই, যা দেখার তা দিব্যি দেখা যাচ্ছে। এটা একটা প্লেট। তোমরা যাকে নেগেটিভ বলো, তারই আগের সংস্করণ। আমার কাছে এই ছবির প্রিন্টটাও ছিল, বেশ কিছুদিন হল খুঁজে পাচ্ছিনা। ভাল করে দেখ তো, কী দেখতে পাচ্ছ ।

    আমি বললাম, এটা তো একটা গ্রুপ ছবি মনে হচ্ছে, কোনও বাড়ির মধ্যে তোলা, ভাইবোনদের গ্রুপ। কাকা বললেন, ভাইদের গ্রুপ, কোনও বোন নেই। আমি বললাম, তাহলে এই মেয়েটি কে? কাকা বললেন, সেটা আমারও প্রশ্ন, এই মেয়েটি কে? আমি বললাম, ও, তার মানে আপনি এই বাচ্চা ছেলেগুলোর সবাইকে চেনেন, কিন্তু মেয়েটিকে চেনেন না? কাকা বললেন, ওই বাচ্চা ছেলেগুলো আমরা ক’ভাই। আমাদের ঢাকার বাড়িতে তোলা ছবি। ওর মধ্যে আমিও আছি, এই তো, এইটা। কিন্তু মেয়েটিকে আমরা কেউ চিনিনা, আমাদের বাড়ির, পাড়ার, আশেপাশের কেউ চেনে না।



    আমি বললাম, সে কী, আপনারা কেউ চেনেননা, অথচ সে আপনাদের মধ্যে দিব্যি দাঁড়িয়ে ছবি তুলে বেরিয়ে গেল আর আপনারা কেউ কিচ্ছুটি বললেননা? কাকা বললেন, আমরা যখন ছবিটা তোলাই, তখন ওখানে আমরা ক’ভাইই ছিলাম। বড়রা তফাতে দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। আমাদের মধ্যে ওরকম কোনও মেয়ে থাকার কোনও সম্ভাবনা ছিলনা।  আরে আমরা তো জানি আমরা কজন ছিলাম। তাছাড়া প্লেটটা ভাল করে দেখ, আরও কিছু বুঝতে পারবে।

    প্লেটটার ওপর ঝুঁকে পড়ে, ভাল করে দেখলাম। অবশ্য তার দরকার ছিলনা, দূর থেকেই দিব্যি দেখা যাচ্ছিল, মেয়েটির অবয়ব স্পষ্ট হলেও, বাকিদের ছবি থেকে সামান্য হালকা, আবছা ধরণের। ছবিটা একটা বাড়ির ভেতরে তোলা। বড়লোকদের বাড়িতে যেমন বসবার ঘরের মাঝখান দিয়েই সিঁড়ি উঠে যায়, ঠিক তেমনি। ফোটোগ্রাফার নীচে দাঁড়িয়ে তুলেছেন। সিঁড়ির ওপরের তাক গুলোয় ওঁরা ক’ভাই বসে। সবাই ধুতি আর পিরেন পরা, ওঁদের ঠিক মাঝখানে এই বালিকা, বয়স আন্দাজ সাত আট বছর, মাথায় কদমছাঁট চুল, গায়ে একটা ডুরে শাড়ি, কোলে একটা বেড়াল। দ্রষ্টব্য জিনিষটা হচ্ছে এই, যে দেখে মনে হচ্ছে, তাকে মাঝখানে দাঁড়ানোর জায়গা করে দেয়া হয়েছে। কোনও রকমেই তার সামান্য আবছা চেহারাটা অন্য কারোর ওপর ওভারল্যাপ করছেনা। মেয়েটি বাকিদের মতই ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে ‘পোজ’ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

    আমি বললাম, তাহলে মেয়েটি আপনাদের পরিচিত নয়। আচ্ছা ডাব্‌ল এক্সপোজার হতে পারে কি? কাকা বললেন, প্রথমে তো সবারই তাই মনে হয়েছিল। তোমাদের এখনকার ক্যামেরায় তো শুনেছি রিওয়াইন্ড করে ফিল্ম না এগোলে শাটারই পড়েনা। তা বড় ফরম্যাটে বোধহয় – আমি বললাম, হ্যাঁ ঠিক বলেছেন, বড় ফরম্যাটে ফিল্ম না ঘুরিয়েও একের ঘাড়ে আর এক ছবি তোলা যেত। আমার নিজের অন্নপ্রাশনের ছবি আমার সেজকাকার পোট্রেটের ঘাড়ে চেপে বসেছিল। কিন্তু কাঁচের প্লেটেও কি –

    কাকা বললেন। কাঁচের প্লেট তো ছবি তুলেই গিয়ে প্রোসেস করা হয়, ক্যামেরার ভেতর প্লেট থেকে যাওয়ার সুযোগ কম, তবে টেক্‌নিকালি অসম্ভব নয়। কিন্তু ফোটোগ্রাফার তো বলছেন তিনি নিজেও এই মেয়েকে জন্মে দেখেননি। কথার কথায় ধরে নিচ্ছি, তিনি নিজেই ইচ্ছে করে এই দুষ্কম্মোটি করলেন, কিন্তু তাতে লাভ? মাঝখান থেকে তো এই ছবিটার পয়সাও পেলেননা।

    এর পরের কথাটা শোনো। ধরে নিচ্ছি, সেকথাও মিথ্যে। উনি একটা চমক বা ভয় দেখানোর চেষ্টা করছিলেন। ভয় অবশ্য আমাদের বাড়ির কেউই পায়নি। আসল কথাটা কিন্তু কেউ ভাবছিনা। ছবিটা সিঁড়ির মাথায় তোলা। তাহলে, দুবার এক্সপোজার নিতে গেলে, আগের থেকে মেয়েটাকে ওই রকম একটা উঁচু জায়গায় দাঁড় করিয়ে ছবি তুলে প্লেট ভেতরেই রেখে দিতে হয়। সেই উঁচু জায়গা একেবারে মাপে মাপে আমাদের বাড়ির সিঁড়ির ওপরের ধাপটার সঙ্গে মিলে গেছে বলছ? আর আমদের কোনও ভাইয়ের অবস্থান তার সঙ্গে ক্ল্যাশ করলনা, ওভারল্যাপও হলনা? তাছাড়া মেয়েটা কি শুন্যে ভাসছিল? তার আসেপাশের কোনও জিনিষের ছাপই তো নেই। বাপু, আমাদের ছোটবেলায় লোকজন বড় কম ছিল পৃথিবীতে। আমরা তো আমাদের এলাকার প্রায় সবাইকেই চিনতাম। ঢাকা শহরের যত লোককে জিজ্ঞেস করা হয়েছে, কেউ তো ছবি দেখে মেয়েটাকে চিনতেই পারেনি।

    আমি বললাম, তবে? কাকা বললেন, আমাদের বুদ্ধিতে তো কুলোয়নি। তাই তো এত বছর বয়ে বেড়াচ্ছি জিনিষটাকে। কেউ যদি

    কোনও এক্সপ্ল্যানেশন দিতে পারে। বাড়িতে যে আসে, তাকেই জিজ্ঞেস করি, বলতে পার, এমন কী করে হয়?



    পাগল

    সত্তরের দশকের গোড়ায় কোলকাতায় দুটো নতুন জিনিষ আমদানি হল। প্রথমটা কনজাংটিভাইটিস, যেটা পূর্ব পাকিস্তানের মুক্তি যুদ্ধের সমকালীন বলে নাম দেয়া হল জয় বাংলা আর দ্বিতীয়টি পাওয়ার কাট, যাকে সঙ্গত বা অশুদ্ধভাবে বলা হত, লোডশেডিং। সেই লোডশেডিংএর সময়ে একদিন অন্ধকারে দেখলাম দুটো জ্বলজ্বলে চোখ।

    চাকরি জীবনের একদম প্রথম দিকে যেখানে ছিলাম সেটা নিউ আলিপুর অঞ্চলের একটা বাড়ি। বিখ্যাতা গায়িকা অল্‌কা ইয়াগ্‌নিক তখন ইস্কুলে পড়ে, থাকত আমাদের ওপরতলায়। সিঁড়ি দিয়ে উঠতে নামতে, কিরে এবার কোন ক্লাস হল? এবার সরস্বতী পূজোয় আমাদের অফিসে গাইছিস তো? এই সব এখন অবিশ্বাস্য কথাবার্তা হত। বাড়িটায় ঢুকতে হত একটা গ্যারেজের মধ্যে দিয়ে। কোলকাতায় লোডশেডিং নিয়মিতভাবে শুরু হওয়ায় সব অফিস দপ্তরে জেনারেটরের প্রয়োজন হয়ে পড়ল। কিন্তু কেউ তো জানতনা এমনটি হবে, তাই এখন যেমন জেনারেটর বসানোর এবং ধোঁয়া নির্গমনের পরিকাঠামো তৈরী হয়েই থাকে, তখন তা ছিলনা। আমাদের অফিসের জেনারেটর বসল সেই গ্যারাজে।

    সেখানেও গোলমাল। জেনারেটর জিনিষটা তখন নতুন। কতখানি ক্ষমতাবান হলে সে কতক্ষণ নিষ্প্রদীপের মোকাবিলায় সক্ষম, তা জানা ছিলনা বলে, কিছুক্ষণ চালানোর পর, গরম হয়ে যাচ্ছে, এই অজুহাতে, বা ন্যায্য কারণেই সেটি বন্ধ করে দেয়া হত। সেদিন সেইভাবে বন্ধ করার পর, ঘুটঘুটে অন্ধকার, রাতও প্রায় ন’টা। কাজ করা সম্ভব নয়, তাই ভাবলাম রাস্তায় বেরিয়ে একটু হাওয়া খাই। গ্যারাজের ভেতর দিতেই বেরোতে হবে। বেরিয়ে যাচ্ছিলামও। কেন হঠাৎ পেছনে তাকালাম, সে যুক্তি আমি দিতে পারবনা, তবে তাকিয়ে দেখলাম অন্ধকারে দুটো চোখ জ্বলছে।

    যে সব জন্তু অন্ধকারে শিকার ধরে অথবা নিজেরাই শিকার হয়, তাদের অন্ধকারে চোখ জ্বলে। বাঘ, বেড়াল, এদের যেমন জ্বলে, গরু, হরিণ, এদেরও জ্বলে, মানে আমি জ্বলতে দেখেছি। অন্ধকার আসলে পুরোপুরি সাধারণতঃ হয়না, খুব অল্প আলো, যাতে আমরা মানুষরা দেখতে অসমর্থ, তাকেই আমরা অন্ধকার বলি। সেই অন্ধকারেই কিছু প্রাণীর চোখ জ্বলে। এই প্রাণীটা বেড়াল টেড়াল নয়, উচ্চতা কিছু বেশি। বাঘও নয় সম্ভবতঃ, নিউ আলিপুরে আঠারশ একাত্তরে বাঘ ছিল হয়তো, উনিশশো একাত্তরে নেই। তবে কী ওটা?

    ফিরে গেলাম অফিসে। বাহাদুরদের কাছে পাঁচ সেলের মস্তবড় টর্চ থাকে, একটা চেয়ে নিয়ে এলাম। জ্বেলে দেখলাম, এ জন্তুটা মানুষের মত দেখতে। গায়ে কোনও জামাকাপড় নেই, উবু হয়ে বসা, চামড়ার ওপর আধ ইঞ্চি পুরু মাটি জমে আছে। লিঙ্গ অনুসারে পুরুষ, বয়স সতের আঠার কিন্তু সে যা করছে, তা ভাবতেও কষ্ট হচ্ছে। জেনারেটর চলাকালীন পোড়া লুব্রিক্যান্ট, যাকে আমরা অনেক সময় ‘মবিল’ বলি, চুঁইয়ে চুঁইয়ে মাটিতে পড়েছে। ও সেই কালো চটচটে পোড়া তেল পরম যত্নে হাতে তুলে চেটে চেটে খাচ্ছে। মানুষের চোখ অন্ধকারে জ্বলার কথা নয়, কেন জ্বলছিল, তা আমার বোধবুদ্ধির বাইরে।