• বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা

  • ধানাই পানাই ২০

    রূপঙ্কর সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ০৭ জানুয়ারি ২০১৩ | ৪৩৯ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • | | | | | | | | | ১০ | ১১ | ১২ | ১৩ | ১৪ | ১৫ | ১৬ | ১৭ | ১৮ | ১৯ | ২০

    ঝিলমিল ঝিলমিল
     
    ছেলেটা বলল, মামা, হোয়াই ডিড দি ওল্ড গাই টেল ইউ, গুঠে পোরে আর গোবর হাসে? হোয়ট ডাস দিস মীন? ফানি ওল্ড ম্যান এইন্ট হি?
     
    ইঁদুরদেব পেডেস্টাল থেকে সব শুনেছেন, বললেন, খাইসে, এ যে দেহি মায়রে মামা কয়, মামারে কি কয় তাইলে, মাসি? অবইশ্য মাসির গুপ হইলে তারে নাকি মামা কওন যায় হুনছিলাম। তা হ্যার মায়ের তো গুপ টুপ নাই?
     
    মা বললেন, নট গুঠে ডার্লিং, ইট’স ঘুঁটে, কেক্‌স মেড অফ কাউডাং। ছেলে বলল, কেক্‌স? ও শ্‌শ্‌শিট্‌। মা বললেন, ইয়া ডার্লিং, শিট্‌ বাট ক্যাট্‌ল শিট্‌। ছেলে বলল, বাট মামা, হোয়ট ডু দে ডু উইথ ক্যাট্‌ল শিট্‌? মা বললেন দে বার্ন ইট হানি, ফর কুকিং। ছেলে বলল, বাট মামা হোয়াই ডু দে – আস্তে আস্তে শব্দটা হালকা হতে হতে মিলিয়ে যাচ্ছে, ওরা হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে যাচ্ছে কার পার্কিং-এর দিকে, ওদিকে অবশ্য কোনও পার্কিং নেই কিন্তু কোলকাতায় নাকি নেই বলতে নেই, সব বাড়ন্ত। মাসিক বন্দোবস্ত করলে গাড়ি কেন, হাতিও পার্ক করা যাবে।
     
    ইঁদুরদেব বললেন হ্যারে, ইয়ারা কি তগো পচ্চিম বইঙ্গের, নাকি আমাগো – বললাম, মনে তো হচ্ছে তোমাদের ‘দ্যাশের’।
    পশ্চিমবঙ্গবাসী এখনো একটু আধটু বাংলা টাংলা বলে। মাউস গড বললেন, তরা বোঝবি না, এইডা হইল ওভিমান, দ্যাশই যখন নাই ভাষাডা আর খাম্‌খা বইয়া বেরাই ক্যান। তয় এইডা কিন্তুন আমারে বুঝাইতে পারলিনা, পোলাডা মায়রে মামা ডাকে ক্যান?
     
    আমি বললাম, দেখ, সেটা প্রশ্ন নয়, প্রশ্ন হল, ছেলেটা ‘ঘুঁটে পোড়ে আর গোবর হাসে’ শুনে কিচ্ছু বোঝেনি। ঘুঁটে জিনিষটা সে জীবনে দেখেনি, ভবিষ্যতেও দেখার আশা নেই। শহরে তো নয়ই, কিছুদিন পর গ্রামেও। এর পর যদি এই প্রবচনটা শোনে, ‘যার শিল যার নোড়া, তারই ভাঙি দাঁতের গোড়া’, তাহলে আরও ঘাবড়ে যাবে কিনা বল তুমি?

    আমাদের কনস্ট্যানশিয়া বিল্ডিং এর পাfশেই নামকরা ইংরিজি মাধ্যমের ইস্কুল। বিত্তবান মানুষদের ছেলেপিলেরা পড়ে। তারা দুধরণের ইংরিজি শেখে, একরকম লেখার জন্যে, আর এক রকম বলার জন্যে। বেশ কিছু কড়া টাইপের ইংরিজি মাধ্যম ইস্কুল আছে, যেখানে ছাত্রদের নিজেদের মধ্যেও কোনও ভারতীয় ভাষায় কথা বলা নিষেধ। আর তারা যাতে সহজেই কথোপকথনটা বজায় রাখতে পারে, তাই তাদের বাবা মা-ও সেই ভাষাতেই তাদের সঙ্গে কথা চালান। তবে সেজ পিসির ছেলে ইউ কে থেকে বেড়াতে এলে ভীষণ মুশকিল। মামা, রিভুদাদা স্পীক্‌স আ ডিফ্রেন্ট টাইপ অফ ইংলিশ না?
     
    তবে যে সব ইংরিজি মাধ্যম ইস্কুল ততটা কড়া নয়, বা যে বাচ্চাদের মায়েদের একটানা কিছুক্ষণ অমন বিচিত্র বাক্যালাপে দখল নেই, তাদের আবার অন্য এক ধরণের কথা শোনা যায়। সেদিন অটোরিক্সাতে শুনলাম, ওকি, ওয়াটার বট্‌লটা ঠিক করে হোল্ড করো, যদি ড্রপ করো, তাহলে ডার্টি হয়ে যাবে।
     
    আমি বললাম, আচ্ছা মূঠা,- মাউস গড খচে গেলেন, কী, তর এত্ত বরো আস্পদ্দা, আমারে মোটা বইল্যা গালি দ্যাস? আমার মালিকরে মোটা কইলে তাও – আমি বললাম, আহা রাগ করো কেন, তোমায় মোটা কখন বললাম, জাননা আজকাল অ্যাক্রোনিমের যুগ, আমি তো ‘মূঠা’ বললাম। বড় করে বললে, মূষিক ঠাকুর। তোমাকে গালি দেব এমন সাহস আছে আমার? ইঁদুরদেব খুশি হয়ে বললেন, আইচ্ছা, বোঝলাম। ক অহন, কি কইতেয়াসিলি।
     
    আমি বললাম, দেখ, জীবন থেকে বেশ কিছু জিনিষ হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন ঘুঁটে আর শিলনোড়ার কথা তো বললাম। কিন্তু প্রবচনগুলো তো এখনও চালু। এই নিয়েই মহা মুশকিল, সময়মত মুখে তো এসে যাবেই। ধরা যাক, ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো। এবার ছেলে বলবে মামা, হোয়ট ইজ আ কুলো? মা বলবেন, ইট্‌স্‌ আ –আ- সর্ট অফ ট্রে ইউ নো, ইউজড টু সেপারেট হাস্ক অ্যান্ড গ্র্যাভেল ফ্রম রাইস। ছেলে বলবে, বাট মামা, হোয়াই শুড দেয়ার বি গ্র্যাভেল ইন রাইস? মা রেগে গিয়ে বলবেন, বিকজ ইউ লিভ ইন ইন্ডিয়া স্টুপিড। নাউ শাট আপ।
     
    ইঁদুর ঠাকুর, তাও তো এখনও সেইটা বলিনি, সেই যে, ‘ ফোঁস করবার মুরোদ নেই কুলোপানা চক্কর’। এটা শুনলে মামা আর ভাগ্নে, থুড়ি ছেলে আরও বিপদে পড়ত, বল? হারিয়ে যাচ্ছে, জান, বেশ কিছু জিনিষ সংসার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে, জীবন থেকেও হারিয়ে যাচ্ছে, শুধু প্রবচনে টিকে থাকছে। আচ্ছা, তুমি এই প্রবচনটা শুনেছ? ‘সফরি ফরফরায়তে’? জিনিষটা একটু স্যাংস্কৃটাইজড করা হয়েছে, আসলে সমোস্‌ক্রিতো নয়, পাতি বাংলা। মানেটা কি বলতো? পুঁটি মাছ বেশি ছটফট করে। পুঁটি মাছ মানে, চুণোপুঁটি। চুণোপুঁটি নিয়ে একটা গপ্পো বলি শোন। আমাদের বাড়ির একটা বাড়ি পরেই একটা বিশাল ঝিল ছিল। তার একটা দিক রাস্তার প্রায় ধার থেকে শুরু আর ওদিকটা দেখাই যেতনা। মনে হত সমুদ্র। দূরে তপনকাকাদের একমাত্র বাড়িটা রাস্তা থেকে দেখে মনে হত, ঠিক যেন একটা দ্বীপের মধ্যে বাড়িটা একলা দাঁড়িয়ে। ওদের বাড়ির কাছেই একটু কম জলে কয়েকটা তেরছা করে দাঁড় করানো পাথর থাকত। রাত দুটো থেকে ধোপারা এসে সেই পাথর গুলোর ওপর কাপড় কাচত, থপ্‌ থপ্‌ থপ্‌। আমি মাঝে মাঝে ছুটির দিনে রাস্তার ওপর ঝিলের পাড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম চুপটি করে। একটু হাওয়া দিলেইএকের পর এক ঢেউ এসে ছলাৎ ছলাৎ করে পায়ের কাছে আছড়ে পড়ছে। আমার বুকের মধ্যে না, শচীন কত্তার সেই গানটা গুনগুনিয়ে উঠত, ‘ঝিলমিল ঝিলমিল ঝিলের জলে ঢেউ খেলিয়া যায় রে, ঢেউ খেলিয়া যায়, ঝিলমল ঝিলমিল’-
     
    খারা খারা, অহন ওই পোলাডা যুদি তার মায়রে নাকি ওই মামারে ঝিল মানে জিগায়, হেও তো কইতে পারবনা। কইলকাতায় তো ঝিল বইল্যা অহন আর কিছু নাই। কইলকাতায় ক্যান, গেরামের দিকেও নাই। দুই চাইরডা পুষ্করিণী বাইচ্যা আসে, কিন্তুন তাগো আয়ুও তো বেশিদিন নয়। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম, কি জান ঠাকুর, এগুলো হবে, আটকানো যাবেনা। প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীতে কজন জন্মাচ্ছে জান? চার জন। ইঁদুরদেব বললেন, ওহ্‌, মুটে চাইর? তাইলে গাব্‌রাস ক্যান? আমি বললাম, দাঁড়াও, আরও আছে। প্রতি সেকেন্ডে পৃথিবীতে মারা যায় দুজন, তাহলে সারপ্লাস থাকছে দুই। সেকেন্ডে দুই, তাহলে মিনিটে দুই ইন্টু ষাট, মানে একশ’কুড়ি, ঘন্টায় সাত হাজার দুশো আর দিনের শেষে এক লক্ষ বাহাত্তর হাজার আটশ’ বাড়তি লোকের ভার সইছে পৃথিবী। এবার যুদ্ধ, নাশকতা, সুইসাইড বমিং, দুর্ভিক্ষ, অগ্নুৎপাত, সুনামি, ডেঙ্গু, এইডস, ক্যান্সার, শিশুমৃত্যু সব ছাপিয়েও এক লক্ষ বাহাত্তর হাজার করে লোক বাড়ছে । ঝিল কেন, এই ছেলের ছেলে, ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া’ প্রবচনটি শুনে তার মাকে জিজ্ঞেস করবে, মামা, হোয়ট’স ‘ঘাস’? মা বলবেন ডার্লিং, ওয়ান্স দেয়ার ওয়্যার লিট্‌ল স্ট্র্যান্ডস অফ গ্রীন – মূষিক দেব বললেন, থাম থাম, এইসব হুইন্যা আমারই ভয় করতেয়াসে, আমি বলে দেবের বাহন –
     
    আমি বললাম, থাক তাহলে, তোমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। তুমি বরং সেই পুঁটি মাছের গল্প শোনো। আমাদের বাড়ির পাশে ঝিল তো ছিলই, বাড়ির উল্টোদিকেও আর একটা ছিল। পুকুরও ছিল বেশ কয়েকটা বড় বড়। চক্কোত্তিবাবু বলে এক নিঃসন্তান ভদ্রলোক সেই পুকুরে ইজারা নিয়ে মাছ ধরাতেন। তিনি এবং তাঁর স্ত্রী আমাকে খুব স্নেহ করতেন। মাঝে মাঝেই বারান্দায় এসে, ও বৌদি, এটা খোকার জন্য, বলে একটা ধড়ফড়ে কাতলা ছুঁড়ে দিয়ে যেতেন। ভারী বর্ষায় এদিকে জল জমত ভালই। পুকুর ঝিলটিল সব ভেসে যেত। দোতলার বারান্দায় দাঁড়ালে আসেপাশের বাড়ির বাগানে এক হাঁটু জলে ইয়া বড় বড় শোল মাছকে ঘুরে বেড়াতে দেখা যেত। আমার পুরোন পাড়ার বন্ধুরা একদিন আমায় ধরল, অ্যাই তোদের ওদিকে নাকি ঝিল টিল আছে অনেক? চ’ না, একদিন রোববার দেখে মাছ ধরার প্রোগ্রাম বানাই। দেবু, বাচ্চু আর মোচা চলে এল ছিপ টিপ বাগিয়ে। আমি জীবনে মাছ ধরিনি, তবু আমিও একটা ছিপ আর গোটা কয়েক বঁড়শি কিনে ফেললাম। সারাদিন ঠায় বসে উঠল শুধু একগাদা চুণোপুঁটি। আমি অবশ্য একটাও ধরতে পারিনি।
     
     
    বন্ধুরা বিফল মনোরথে মুখ শুকনো করে বলল, যাঃ শালা, শুধু চুনো? আমাদের বাড়ি এসে মাকে বলল, মাসীমা, এই দেখুন, কত্ত মাছ। মা বলল, এগুলো কি হবে? দেবু বলল, ভাজা খাবেন, ডালের সঙ্গে, হেভি লাগে। ,মা বলল, পাগল? এই সব ভেজে তেল নষ্ট করি? তোমরা খাবে তো বল, ভেজে দিই। এক পেট সিঙাড়া খেয়ে ওরাও খেতে রাজি নয়, কি আর করি, কোনও জিনিষ নষ্ট হলে আমার বড় কষ্ট হয়। নিজেই গোটা চারেক খেলাম মুখ বেঁকিয়ে, বাকি সব বেড়াল কে ধরে দেয়া হল, সেও খুব একটা ইন্টারেস্ট দেখালনা।
     
    ধীরে ধীরে ঝিল ভর্তি হতে লাগল, পুকুরগুলোও। কি সব আইন টাইন নাকি আছে। আমাদের দেশে আইন লেখা হয়, এক নম্বর, শুধু লেখার  জন্যই, দুই নম্বর, সেটা ভাঙা হচ্ছে কিনা দেখার কথা যাদের, তাদের কিছু অর্থাগমের জন্য। আমাদের এলাকায় এসে কেউ যদি বাড়ি বানাতে চায়, তার জমিও লাগবেনা, অপরের বা সরকারি জমিতেই দিব্যি বাড়ি বানাতে পারবে। স্যাংশন করা প্ল্যানেরও দরকার নেই। তা যাকগে, সেই বিশাল ঝিল ভর্তি হতে হতে শুধু দেবাদের বাড়ির পাশে একটা কাঠা দেড়েক জায়গায় বেঁচে রইল কয়েক বছর। একটা মাছরাঙা পুরোন অভ্যাস বশে প্রতি বর্ষায় দেবাদের ছাদে বসে কির্‌র্‌র্‌র্‌- করে ডাক দিয়ে কাঁদতো। ওই দেড় কাঠা ভরে যাবার পরেও এসেছে বেশ কয়েক বছর।
     
    দেশে তখন সাম্যবাদ। শুধু আমাদের এলাকার ঝিল বা পুকুর ভরাট হবে, তা তো হয়না, চতুর্দিকেই হতে লাগল। একদিন বাজারে গিয়ে দেখি কলাপাতায় চুনোপুঁটি সাজিয়ে বিক্কিরি হচ্ছে। হো হো করে হেসেই ফেললাম, চুনোপুঁটি, তাও আবার বাজারে? আমাদের উঠোনেই তো ভর্তি হয়ে থাকে। তারপর বর্ষার জল শুকোলে রাশি রাশি রূপোর টাকার মত মাছগুলো কাদায় ছটফট করে। পাড়ার গরীব বাচ্চাগুলো আঁজলা করে তুলে নিয়ে যায়, আমরা কোনওদিন বারণও করিনি।
     
    দিনকাল পাল্টাচ্ছে, আমারও বয়স বাড়ছে। তবু নস্টালজিয়া তাড়া করে যে। বৃষ্টিতে জল জমলে আগে বারান্দায় দাঁড়িয়ে কত মাছকে ঘুরে বেড়াতে দেখতাম, এখন শুধু প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ ভেসে যায়। দীনেশকে জিজ্ঞেস করলাম, হ্যাঁরে, এলাকায় কি একটাও পুকুর আর নেই? রাস্তায় আজকাল মাছ দেখিনা? দীনেশ বলল, এখন তিরিশ লাখ টাকা কাঠা যাচ্ছে, পুকুর আর থাকে? আগে বাচ্চারা কাগজের নৌকো ছাড়ত, এখন তো অন্ধকার ঘরে ভিডিও গেম খেলছে, ওসব বোকা বোকা জিনিষে কার আগ্রহ? মনটা খারাপ লাগে। তা লাগুক, দেশ এগিয়ে চলেছে। সেদিন বাজারে গিয়ে আবার দেখি কলাপাতায় চুনোপুঁটি। নাঃ খাবার ইচ্ছে হয়নি, এমনি ঔৎসুক্য বশে জিজ্ঞেস করলাম, কত করে হে? মাছওয়ালা বলল, চল্লিশ করে দিয়েছি, কতটা দেব? আমি বললাম, বাপ্‌রে, চ-ল্লি-শ টাকা কিলো? চুনোপুঁটি? দিনকাল কি হল? মাছওয়ালা ঠোঁটে তর্জনী ঠকিয়ে বলল, আস্তে, আস্তে কাকু, কেউ শুনলে যা হাসবে না – আপনাকে আমি একশ’র দাম বলেছি, কিলো চারশ’ টাকা।
     
    হে মূষিক দেব, গল্পটা এইখানে শেষ করলে একটা বেশ মজাদার অথচ শকিং এন্ড হ’ত। ছোটগল্পে তাই হয়। কিন্তু আমি শেষ করতে পারলামনা। এই জন্যই আমার লেখক হওয়াও হলনা। তা না হোকগে, দুঃখ নেই। কিন্তু এই খানে শেষ করলে বিপদও ছিল। ধর আজ থেকে বছর পাঁচেক পর কেউ এটা পড়ল। সে তো মুখ ভেটকে বলবে, ফুঃ এ কবেকার লেখা গো, এখন তো বারোশ’ টাকা কিলো যাচ্ছে।
     
     গত বছরের আগের বছর, মানে দুহাজার দশ সালের এক বর্ষার জল জমা দিনে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম উদাস মনে। রাস্তায় মাছ দেখা যায়না আজ বহুকাল হ’ল। দেখা যাবার কোনও সম্ভাবনাই নেই, গত দশ পনের বছরের মধ্যে দেখা যায়নি। কেননা এই রাস্তার আসেপাশে বা চতুর্দিকে যতদূর দেখা যায়, কোনও ঝিল বা পুকুর নেই। শুধু বিকটদর্শন ফ্ল্যাটবাড়িগুলো দম বন্ধ করা আবহাওয়া মেখে দাঁড়িয়ে। কিন্তু অঘটন কি ঘটতে পারেনা? ঘটুক না একবার, মাত্র একবার?

    আমি মাঝে মাঝেই লিখি না, যা চাই তা সঙ্গে সঙ্গে হয়, কিভাবে তা বুঝিনা। হঠাৎ দেখি হরেরামের দাঁড় করানো ট্যাক্সিটার তলা থেকে কি একটা কালোমত বেরিয়ে একটু পাক খেয়েই আবার সাঁৎ করে ঢুকে গেল। কিরে বাবা, ব্যাং ট্যাং হবে বোধহয়, যখন ভাবছি, তখন আবার বেরোল। এবার ধীরে সুস্থে, লেজ টেজ নাড়িয়ে, চারদিকে চক্কর খেয়ে আমার কাছাকাছি এসে মুখ তুলে একটু বুড়বুড়ি কেটে আবার ট্যাক্সির তলায় চলে গেল।
     
    সম্ভব নয়, হতে পারেনা, কিন্তু হ’ল। চেয়েছি বলেই বোধহয়। আমার কেবল অযান্ত্রিক ছবিটার শেষদৃশ্যে সেই ভেঁপুটার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। ও ইঁদুর ঠাকুর, গল্প শেষ, দি এন্ড।