• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • টোস্টার

    Biplob Rahman
    ব্লগ | ০১ মার্চ ২০১৪ | ৫৮ বার পঠিত

  • হাভাতে বুড়িটি ভাতের সন্ধানেই কোনো এক আত্নীয় সঙ্গে ঢাকায় এসেছিলেন। তার জন্ম উত্তরবঙ্গের বৃহত্তর রংপুরের মঙ্গা পীড়িত কোনো এক দূর্গম গ্রামে। তাই আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না, অনিবার্য এক অচিন ক্ষুধা আজন্ম চিটচিটে ঘামের মতো লেপ্টে থাকে তার জঠরে, গতরে এবং সর্বাঙ্গে। বুড়ির জীবনের গল্পটিও তাই মঙ্গা উপদ্রুত অন্চলের অন্যান্য বুড়ির মতো অতি সংক্ষিপ্ত এবং স্যাঁতসেঁতে টাইপের পুরনো। তাই আসুন, এই পর্বটুকু আমরা বরং এক বাক্যেই সেরে নেই :

    ১৫ বছর বয়সে এক ক্ষেতমজুরের সঙ্গে বিয়ে, বছর না ঘুরতেই বাচ্চা, পরের বছরগুলোতে আরো আরো আন্ডা-বাচ্চা, স্বামী আরেকটি বিয়ে করলে মেয়েটি পাঁচটি ছেলে-মেয়েকে একাই ক্ষেতমজুরী করে ও চেয়ে-চিন্তে বড় করে, মেয়ে-গুলোকে সাধ্যমত অন্যত্র বিয়ে দেয়, ছেলেরা বিয়ে করে মাকে ছেড়ে চলে যায়, এই শেষ বয়সে বুড়ির আর দিন চলে না, স্বামী খেদানো, ছেলেমেয়ে তাড়ানো বুড়ির এখন এক দফা এক দাবি– সামান্য এক মুঠো আহার।

    দুই.

    ঢাকায় বুড়ির নামমাত্র বেতন, তিন বেলা খাওয়া-পরার বিনিময়ে কাজ জুটে যায় আমার এক কর্পোরেট বন্ধুর বাসায়; আমরা ঘটনা বর্ণনার সুবিধার্থে বন্ধুটির নামে দেই বেলা বোস। বন্ধু বেলা বোসের অন্য দুই বোন বিয়ে করে আলাদা হয়েছেন, তারা স্বামীর সঙ্গে অন্যত্র থাকেন। বাড়িতে লোক বলতে মাত্র তিনজন, বেলা, বেলার বিধমা মা ও নানী। তার বাবা গত হয়েছেন দেড় যুগ আগে। তাই তাদের বাসায় আমাদের আলোচ্য মঙ্গাঞ্চলের বুড়ির ঝি’য়ের কাজকর্ম তেমন কিছু নেই।

    বুড়ির প্রধান কাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা কর্পোরেট চাকুরে টিপটপ বেলা বোসের ফুটফরমাশ খাটা, তার মেজাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খানিকটা অতিষ্ঠ হয়ে থাকা।

    বলতে নেই, তবু বলি, বেলা বোসের মন ভালো হলেও মেজাজ খুব চড়া। তাই আমাদের বুড়িটি একমাত্র এই আপাটিকে বেশ খানিকটা সমঝে চলতে হয়। সব সময় এক অজানা ভয় তাকে ঘিরে রাখে। কখন না জানি আবার পান থেকে চুন খসে পড়লে আপার তীক্ষ্ণ কথার ছুরিকাঘাতে তাকে বিদ্ধ হতে হয়! সে যে ক্ষুধার মতোই ক্ষুরধার ও বিষময়! সঙ্গে পাষাণপুরী এই ঢাকা মহানগরীর অচেনা জগত-ভীতিও বোধকরি বুড়িটিকে বেশ খানিকটা বিপর্যস্ত করে রাখে।…

    তিন.

    এক সকালে বন্ধুবরেষু বেলা বোস অফিস যাওয়ার জন্য ঝটপট তৈরি হচ্ছেন। তার চিল-চিৎকারে পুরো বাড়ি তখন মাথায় উঠেছে: বুয়া, আমার সালোয়ার-কামিজ দাও, এটা না, দেখো আলমিরার ওপরের তাকে আছে নীল রঙের বুটিক করা! বুয়া, আমার নীল চটিটা দেখো তো! আমার হেয়ার ক্লিপ? সানগ্লাসটা খুঁজে পাচ্ছি না, মাকে জিজ্ঞেস করো, সেটি কোথায়?

    এর পর বেলা বোস স্নান ও হালকা প্রসাধন সেরে তার শোবার ঘর থেকেই আবার হাক মারেন: বুয়া, রান্নাঘরে টোস্টারে দেখো রুটি টোস্ট করতে দিয়েছি, সেগুলোকে ডাইনিং টেবিলে রাখো, ফ্রিজ থেকে জ্যাম নিয়ে খাবার টেবিলে দাও! আর চট করে আমার জন্য একটা ডিম পোচ করে দাও! …

    খাবার টেবিলে বসে বেলার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙতে বসে। আমাদের বুড়ি ঝি কাম বেলা বোসের একান্ত কাজের বুয়া রান্না ঘর থেকে আসেনই না। বেলা বোস হাঁক ছাড়েন, বুয়া, কি হলো?…

    পরে তিনি নিজেই রান্না ঘরে গিয়ে যা দেখেন, তাতে তার মেজাজ ধরে রাখা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়ে। মেজাজের পারা চড় চড় করে সপ্তমে চড়তে থাকে, এরই মধ্যে বেলা বোস দ্রুত বুঝে যান, নাস্তা না খেয়েই আজ তাকে অফিসে দৌড়াতে হবে। সময় মতো অফিসেও হয়তো পৌঁছানো আর হলো না।

    ওই সকালে মেজার চড়া হওয়ার মতো দৃশ্যই বেলা বোস দেখেছিলেন বটে। রান্নাঘরের মেঝেতে সেই গ্রামের হাভাতে বুড়ি বুয়া তখন ভাঙা টোস্টারের কয়েকটি টুকরো হাতে ধরে বসে আছেন। তার মুখে তখন পাগলের মতো বুলি:

    কই? উটি কই? নাই! নাই তো! হেথা তো কুনু উটি নাই!…

    চার.

    বাড়ির সকলে বেলা বোসের ভয়ঙ্কর চিৎকার-চেঁচামেঁচিতে রান্নাঘরে এসে জড়ো হন। নানান রকম প্রশ্নবান ও পুলিশি জেরার মুখে আমাদের মঙ্গা-বুড়ি চোখের পানিতে তার অপরাধটুকু স্বীকার করেন।

    অকপট সরল স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, বটি দিয়ে তিনি নিজেই নতুন কেনা টোস্টারটি টুকরো করে দেখতে চেয়েছেন, প্রতিদিন এই ‘আজব কল’ থেকে গরমা-গরম ধোঁয়া ওঠা পাউরুটির পিস বের হয় কী করে? তার গোপন ইচ্ছে, বেতনের টাকা দিয়ে এইরকম একটি ‘আজব কল’ কিনে গ্রামের বাড়ি ফিরে যাওয়ার। তখন প্রতিদিন কল টিপলেই ভাপ ওঠা সুস্বাদু রুটির টুকরো…এই শেষ বয়সে এসে তখন বুড়িকে আর কাজের জন্য মানুষের দুয়ারে খাটাখাটনি করতে হবে না, মুখ ঝামটা খেতে হবে না। বুড়ির থাকবে না কোনো অন্নচিন্তা!…

    পাঁচ.

    গল্পের চেয়েও সত্যি আমাদের বুড়ি বুয়ার কথনটির একেবারে সমাপ্তি পর্বে জানাই, সেদিন যথারীতি সকালে নাস্তা না করেই বেলা বোস অফিসে যান এবং কম্পিউটারাইজড হাজিরা পদ্ধতির বোতাম টিপতে গিয়ে আভাষ পান– ৪৫ মিনিট বিলম্বে তিনি সেদিন অফিস পৌঁছেছেন।

    সে দিন লাঞ্চ আওয়ারে কি এক দরকারি কাজে বেলা বোসকে টেলিফোন করতেই তিনি নানা এলোমেলো কথার ফাঁকে আমাকে হরবর করে এই ঘটনাটি বলেন। আমার মনছবিতে পুরো ঘটনাটি স্লাইড শো’র মতো একে একে ভেসে আসে; আমার হাত থেকে টেলিফোন খসে পড়তে চায়।…

    সংযুক্ত: বৃহত্তর রংপুরের মঙ্গা বা নিরব দুর্ভিক্ষ কবলিত অঞ্চলের একটি প্রাচীন লোকছড়া:

    ভাত নেই তো তাড়াতাড়ি
    উটকানুতে পাকান দড়ি
    ভোকের জ্বালায় মাথায় হাত
    দড়ি বেইচা খাইবেন ভাত।।
  • বিভাগ : ব্লগ | ০১ মার্চ ২০১৪ | ৫৮ বার পঠিত
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
আরও পড়ুন
আয়না - ন্যাড়া
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • aranya | 154.160.5.25 (*) | ০২ মার্চ ২০১৪ ০১:২৫73769
  • দুঃখের গল্প
  • Biplob Rahman | 212.164.212.61 (*) | ০২ মার্চ ২০১৪ ০৯:৫৫73770
  • #aranya,

    সঙ্গে থাকার জন্য ধন্যবাদ। এটি কিন্তু জীবনেরই গল্প, একদম সত্যি ঘটনা।
  • kumu | 133.63.144.245 (*) | ০২ মার্চ ২০১৪ ১০:০০73771
  • সত্যি হলে বেলা বোসকে ধন্যবাদ।আজকাল বেলারা স্মার্ট কাজের লোক রাখেন, বুড়ীদের না।
  • aranya | 154.160.5.25 (*) | ০৩ মার্চ ২০১৪ ০৬:২৮73773
  • বিপ্লব ভাই, তা তো জানি, আপনার প্রায় সব লেখাই জীবন থেকে নেওয়া, ঈর্ষণীয় অভিজ্ঞতার ঝুলি
  • Biplob Rahman | 212.164.212.61 (*) | ০৩ মার্চ ২০১৪ ০৯:০৭73772
  • #kumu,

    তা তো ঠিকই। মানবিকতাকে অস্বীকার করি কি করে?
  • Biplob Rahman | 212.164.212.61 (*) | ০৪ মার্চ ২০১৪ ০১:৪৪73774
  • #aranya,

    তাই? ;)
  • Pubদা | 209.67.131.156 (*) | ০৪ মার্চ ২০১৪ ০৮:২৭73775
  • পড়তে পড়তে মৃনাল সেনের খারিজ সিনেমাটার দৃশ্য ভেসে উঠছিল ।
    জীবনের সত্যি গল্প এত অকপটে শোনাবার জন্যে অনেক ধন্যবাদ বিপ্লবদা ।
  • Biplob Rahman | 212.164.212.61 (*) | ০৭ মার্চ ২০১৪ ১১:৫২73776
  • #Pubদা,

    মৃনাল সেন!! :O
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত