• হরিদাস পাল  ব্লগ

  • মানসভ্রমণঃ ঘরে বসে করলেই ভালো, নইলে বড় হ্যাপা

    I লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৮ নভেম্বর ২০১৫ | ১১৩৭ বার পঠিত | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
  • স্ট্র্যান্ড রোডে স্ট্র্যান্ডেড
    ---------------------------

    কথা ছিল বড় ঘড়ির নিচে তিনটেয়। কেননা গাড়ি তিনটে চল্লিশে। বাপিকে জিগ্গেস করলাম-বাপি, ক'টায় বেরোনো যায়? বাপি মাছি তাড়ানোর মত করে বলল-কেন, দুটোর সময় বেরোবেন ! তেঘরিয়া থেকে হাওড়া স্টেশন যেতে আর কত সময় লাগবে ?
    যেন, এটা কোনো প্রশ্নই নয়।
    আমরা কিন্তু তাও সাড়ে বারোটা। বিশেষ করে রাত্রি। সাড়ে বারোটার কথা আমার মাথাতেই এসেছিল, পরে রাত্রি তাতে স্টিক করে যায়। আমি এদিকে যেমন ফলোয়ার চিরকালের, জবরদস্ত কথা শুনলেই মজে যাই, বাপিতে প্রভাবিত হয়ে গেলাম। শেষমেশ রফা হল- একটা। বেরোতে বেরোতে কিন্তু সেই দেড়টাই দাঁড়ালো।

    মজলো আমার প্রাণ ভ্রমরা এম জি রোডে এসে, কলেজ স্ট্রীট যেই পেরোলো। হাওড়া স্টেশনগামী সেই কুখ্যাত ট্রাফিক জ্যাম, যা শেষ কবে দেখেছি তা-ই মনে পড়ছে না বলে তাকে আজকাল মিথ ভাবতে শুরু করেছি, সে। সে-ই। আবার সে এসেছে ফিরিয়া। দশ মিনিট যায়, পনেরো মিনিট যায়; আধ ঘন্টা। গাড়ি এক-দু ইঞ্চি নড়ে কি নড়ে না। আমরা নিউ দিল্লী স্টেশন থেকে রাজধানী ফেল করা ঘরপোড়া গরু, আমরা তো দরদরিয়ে ঘামবোই। বিশেষ করে রাত্রি। "উঃ, কী ভয়ঙ্কর", "যাঃ, এবারেও মিস", "ওদের কি জানিয়ে দেবে, আমরা গাড়ি মিস করছি?" এবং এইসবের মাঝখানে -"তুমি এত টেনশন করছো কেন, টেনশন করো না,টেনশন করবার কী আছে?" ফেলুদা যেন কাকে বলেছিল-আমার মাথায় জল ঢালো, দেখবে বরফ হয়ে যাবে! ফেলুদা, তুমি রাত্রিকে বিয়ে করলে না কেন?

    এইসবের মাঝখানে বাপি বেশ নির্বিকার, খুউল, প্রবাদবন্দিত শশা। আমাদের দশা দেখে কিঞ্চিৎ যেন মজা পায়, খ্যাকখ্যাক করে হাসে। বলে-"ও, আসলে মনে ছিল না, এখন তো ধনতেরাস চলছে! মাড়োয়ারিদের ভিড়।" বস্তুতঃ, কারোরই কোনো ব্যস্ততা নেই। গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে আসা ট্যাক্সি চালক লাল কাপড় ঘুরিয়ে হাওয়া খাচ্ছেন; অবিচলিত ধর্মষাঁড় (পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাঁকে গো-পিতা বলে ডাকাই শ্রেয়, ছেলেপিলে নিয়ে ঘর করি) এর-ওর তার ঝাঁকায় মুখ দিয়ে ফুলকপি-টমেটো-পেয়ারা তুলে নিচ্ছেন, সরবত-বিক্রেতা মুসলিম বৃদ্ধ খরিদ্দারহীন, ছায়ায় সরিয়ে আনছেন তাঁর সরঞ্জাম, নির্বিকার।

    সবার ওপরে শুন্যে ঝুলে রয়েছেন এক প্রশান্ত পাগলিনী; যে কোনো দিন ভেঙ্গে পড়তে পারে এরকম একটি বাড়ি, বহুকাল আগে যার দরজায় "কনডেমড বিল্ডিং" নোটিশ লটকানোর কথা ছিল, কিন্তু সময় ক্রমেই পেরিয়ে যাচ্ছে,হারিয়ে যাচ্ছে-তার ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি উদাসীন মুখে দেখে যাচ্ছেন এই হঠাৎ থমকে-যাওয়া জনস্রোত, যেন ফ্রিজ শটে আটকা পড়া সমুদ্রের ঢেউ। ছায়া বেড়ে উঠছে, কেউ কি তাঁর জন্য চা বানাচ্ছে? উনি কি চা খান? ঐ বারান্দা, ভাঙা বারান্দা কি তাঁকে আটকে রাখার মত যথেষ্ট উঁচু? কে থাকে ওঁর সঙ্গে? ছায়া ঘন হচ্ছে, আর ওঁর সময় থমকে গেছে। আমরা, আমাদের গাড়ি, আমাদের মানস বেড়াতে যাবার ইচ্ছে, এই রাস্তা, ধর্মের গো-পিতা ও পিতামহকুল, এই ফ্রোজেন জনস্রোত-সমস্তকে উনি ওঁর থমকে থাকা সময়বারান্দার ভেতরে টেনে নিয়েছেন। ওঁর এই ঝুলবারান্দা কি মধুসূদন দাদার ভাঁড়, এত আঁটবে কিভাবে?

    আমরা এই মুহূর্তে মনোবিকাশ কেন্দ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। একটি অনন্ত মুহূর্তে।

    আপন বেগে আপনি মরি
    ---------------------------
    কিন্তু চিরকালই কি হরিপদ কেরানী বাঁশির করুণ সুর শুনে যাবে? শেক্সপীয়র পর্যন্ত চেষ্টা করলে মিলনান্তক নাটক লিখতে পারেন, আর আমরা একটা সামান্য অনন্তের ডিম পিটিয়ে-পাটিয়ে, খুঁচিয়ে-খুবলে ভাঙতে পারবো না? তাছাড়া এমন দিন তো আগে ছিল না! বছর দেড়েক ধরেই না হয় সমস্ত বুকিং কমপ্লিট হবার পরে ট্যুর ক্যান্সেল (মংলাজোরি), আমার গোড়ালি ভাঙা (জলদাপাড়া), রাত্তিরের গোড়ালি ভাঙা (পেরিয়ার), ট্রেন মিস (নৈনিতাল) ইত্যাদিপ্রভৃতি লাঙ্গুলগোবরীয় দ্বন্দ্বসমাসের প্রাদুর্ভাব, তার আগে কি সুন্দর দিন আমরাও কাটাইতাম না? ইদিকে এপারে দিদিভাই, ওপারে মোদিভাই, অচ্ছে দিন কি এখনো ইলিউসিভ রহিবে? স্বর্গ কি হবে না কেনা?

    হবে হবে সব হবে বলে কখন যেন জ্যাম খুলে যায় অভিমানী মেঘ-কুয়াশার মত। আর গাড়িও কেঁদে-ককিয়ে, নেচে-কুঁদে-গড়িয়ে স্ট্র্যান্ড রোড ছাড়িয়ে হাওড়া ব্রীজের ওপরে উঠে যায়। হাওড়া স্টেশনের বড় ঘড়ির নীচে আমরা যখন, তখন বাজে সওয়া তিনটে। ভুল বলা হল, গৌরবে বহুবচন। এই প্রথমবারের জন্য গাড়িসমেত গড়গড়িয়ে আমরা স্টেশনের মধ্যেই ঢুকে পড়েছি। বহুদিনের সাধ, সেই ছোটবেলা থেকে স্টেশনের সামনে গাড়ি থেকে হুড়মুড়িয়ে নেমে মাল বইতে বইতে স্টেশনে ঢোকা; আর টেরিয়ে টেরিয়ে দেখা , লায়েক বাবুবিবিরা কেমন গাড়ি চালিয়ে প্ল্যাটফর্মের পাশে এসে নামছেন। তো নিলাম এবার শখ পুরিয়ে, যদিও কড়কড়ে দুশোটি টাকা গাঁটগচ্ছা গেল তার জন্যে। তারপর ন'নম্বর প্ল্যাটফর্মে রাত্তির ও টুংকাইকে দাঁড় করিয়ে আমি একা বগল বাজাতে বাজাতে বড় ঘড়ির সামনে এসে দাঁড়ালেম। দেখা গেল, সব স্যাঙাত তখনো এসে পৌঁছন নি, হরি হে ! সেঁজুতি সপরিবারে হাজির, সেজুঁতির কলিগ শাঁওলি ও তার দুই বান্ধবী(এদের মধ্যে অনুলিপি'র সঙ্গে আগে আলাপ হয়েছিল, দীপান্বিতাকে চিনতাম না) সবার আগে উপস্থিত। কিন্তু আমাদের দলনেতা সৌমিত্রদা ও তাঁর তরুণ সহকারী ভাস্কর আর অন্যরা এখনো এসে পৌঁছন নি। তাঁরা এসে পৌঁছবেন গাড়ি ছাড়ার অল্পই আগে, আমাদের বেশ কিছু হার্ট বিট স্কিপ করিয়ে।
    ট্রেনের নাম সরাইঘাট সুপারফাস্ট এক্সপ্রেস , তা বেশ ভালোই দৌড়য়। বর্ধমান ছাড়বার পর তার দ্বিতীয় স্টপ বোলপুর, তৃতীয়টি রামপুরহাট। এই দুয়েরি মাঝে কখন, নাকি বোলপুরের আগে,গাড়িতে উঠে এসেছেন জ্যান্ত একজন বাউল। দোতারা ও খমক সহযোগে যে সব গান গেয়ে চলেছেন ইনি, সৌভাগ্যবশে তারা সব বাজারচলতি গোষ্ঠগোপাল কিম্বা চটকাতে চটকাতে ইয়ে হয়ে যাওয়া হৃদমাঝারে নয়। গাইতে গাইতে সরু করিডোরে দুয়েক পাক একটু নেচেও নিচ্ছেন ;ঝুমঝুমিয়ে বাজছে পায়ের ঘুঙুর। গাড়ি তখন সাঁঝের ঝোঁকে খুব ছুটেছে। সে যে আমার হবার কথা, আপন বেগে আপনি মরি।

    এরই মাঝখানে ঘুরে যাবে বিনা তেলের এই এত্তবড় সিঙ্গারা,স্যস সহযোগে, সঙ্গে কাঁচালঙ্কা গোঁজা ও একটু বীটনুন ছড়ানো-অজস্রবার যার ভ্রুপল্লবী ডাক ফিরিয়েও শেষে আমার অসহায় নিয়তিনিয়ন্ত্রিত আত্মসমর্পণ। আমার গৌড় এসে হৃদে বসে, কল্লে আমার মনচুরি। এর চেয়ে অনেক তুশ্চুতর লোভানি যথা মেনকা-উর্বশী-রম্ভাতে কত মহাতেজা মুনিঋষির কাপড়েচোপড়ে, থুড়ি, তপোভঙ্গ হয়ে যেত, আমি তো কোন ছার!

    তারপর আর কী? একটু বেশী রাত্তিরে সৌমিত্রদা আর ভাস্কর সবার হাতে হাতে এসে ধরিয়ে যাবেন জিরা-রাইস আর চিকেনের প্লেট। খেয়েদেয়ে জম্পেশ করে ট্রেনঘুম। যার হয়, তার হয়। আমার হয় না। দেবর্ষি বলল, ওরও হয় না। বলেই শুধু নাকটুকু বের করে রেখে বাকিটা চাদরমুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল; আবার ঘুম ভাঙবে নিউ বঙ্গাইগাঁও আসবার মিনিট কুড়ি আগে, অথাৎ কিনা সকাল সাতটায়।

    ভোর ভোর আমরা নিউ বঙ্গাইগাঁও এসে পৌঁছবো। বাংলা-আসাম সীমান্তের একটি শহর, এর ঠিক আগের স্টেশন ছিল আলিপুরদুয়ার। নিউ বঙ্গাইগাঁওতেও শুনলাম বাঙালীর আধিক্য বেশী। দূরে কখন সবুজ পাহাড় এসে জুটেছে, হাল্কা কুয়াশার চাদর জড়ানো না থাকলেও লাটফর্মে দাঁড়ানো জওয়ানের হাতের চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে, হাওয়ায় ঠান্ডার আমেজ আর লাটফরম থেকে নামলেই কলাগাছের দঙ্গল, আর ঘাসের গায়ে শিশির, প্যাঁকপেঁকে পাতিহাঁসের পেছনে খুকী দৌড়চ্ছে এবং টুংকাই ও রোদ্দুর পর্যবেক্ষণ করে নিশ্চিৎ হয়ে এসে জানালো এরা ব্ল্যাক সোয়ান না হয়ে যায় না। বাঙালী মুসলিম বৌটি একটি অল্পবয়সী মেয়েকে এসে মৃদু ভর্ত্সনা করে বললে- হাঁরে হাসিনা, তোর পেরানে কি ভয়ডর বলি কিসু নাই? বলেই ছোট চায়ের দোকানে গিয়ে চায়ের জল চাপালো ও মেয়েটি তার পেছন পেছন এসে পান সাজতে বসলো। আমাদের সব লাগেজ গাড়ির মাথায় তোলা হচ্ছে, আর মোবাইল ফোনটির সুইচ অফ করলাম এইমাত্র।কোথাও একটি কাঠঠোকরা ঠঠ্কর্র্র্ আওয়াজ করে কাঠ ঠুকরোচ্ছে। এই তো সগ্গ, আর কোথায় যাবে?

    "হেঁই ক্যামেরাম্যান, কাম! কাম !" কিম্বা পুনরায় আপন বেগে আপনি মরি
    --------------------------------------------

    এখানে একটু থেমে সৌমিত্রদা'র একটু পরিচয় দিয়ে দিই। সৌমিত্রদা একজন ট্র্যাভেল এজেন্ট, ইনি বিভিন্ন কলেজ থেকে দিদিমনি-মাস্টারমশাই ও ছাত্র-ছাত্রীদের জঙ্গল ভ্রমণে নিয়ে যান। কিন্তু শুধু ট্র্যাভেল এজেন্ট বললে সৌমিত্রদা'কে অপমান করা হয়। হ য ব র ল'র বেড়ালের কায়দায় ওঁকে ট্র্যাভেল এজেন্টও বলতে পারো, জঙ্গলপ্রেমিক/ পক্ষীপ্রেমিকও বলতে পারো, আবার ফ্রেন্ড-ফিলোজফার-গাইডও বলতে পারো। আবার খাইয়ে খাইয়ে যে মেরে ফেলতেও পারেন,এমন ষড়যন্ত্রী, সেও ওঁর নিষ্পাপ মুখ দেখে আগাম আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না। তবে সে হল অন্য গল্প, সে পরে হবে। আপাততঃ আমরা বরপেটা রোডের ওপর পানবাড়িতে এসে থেমেছি।

    পানবাড়িতে বিশাল বাজার, সেখানে আমাদের ব্রেকফাস্ট সারা হল; সৌমিত্রদা'রা গোটা ভ্রমণের রসদ কেনাকাটা করলেন এদিকসেদিক ঘুরে ঘুরে। সে এক যজ্ঞিবাড়ির কান্ড, নানাবিধ সব্জি-পাঁঠা-ডিম-তাজা মাছ-নারকেল ছাড়াও তাতে ইনক্লুডেড ক'টি জ্যান্ত মুরগী-টুংকাই ও রোদ্দুর তাদের দেখে সবিশেষ উত্তেজিত। এইসব বনজঙ্গলঘেঁষা পাহাড়তলীর বাজার বড়ই নয়নসুখ, রাশি রাশি রং ছড়ানো, কোথাও গাঁটি বাঁধা কুকুরকুন্ডলী ঢেঁকি শাক, কোথাও ছড়িয়ে রাখা রাশি রাশি শুঁটকি-নানাবিধ মাছের, হয়তো খুঁজলে হাঁসের মাংসও পাওয়া যাবে; এ সবই এক্সোটিক আমার রসনার পক্ষে, কোনোদিন চাখা হয় নি। মনে আসছে বোরোলি মাছ আর শিলবিলাতি আলু'র কথা , যদিও সেসবও কোনোদিন খাই নি। বুদ্ধদেব গুহ পড়ার ফল।

    মাঝের সিটে বসেছে তারা তিন বোন বা বন্ধু; নাকি ভারিক্কি শিক্ষিকা, যদিও দেখে সদ্য কলেজ-পেরোনো খুকী ছাড়া আর কিছু ভাবা কঠিন। থেকে থেকেই তাদের কলকলিয়ে হাসি আর হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়া দেখলে তো সেসব আরোই কেউ ভাববে না। এই হাসি নিয়ে কি করে গুন্ডা ছাত্র সামলানো হয়, পরে জিগ্গেস করাতে হেসে গড়িয়ে পড়ে অনুলিপি বলেছিল - আমি হাসতে হাসতেই বলি-জাস্ট গেট আউট অফ মাই ক্লাস !

    এরা সকলেই পাখপাখালি ভালো চেনে, অনুলিপি তো আরো এককাঠি দড়, সে প্রজাপতিও চেনে। অথচ এদের বাদ দিয়ে সেঁজুতি যে কেন আমায় পক্ষীবিশারদ ভেবে বসল, সে কথা বলা মুশকিল। দেখতে দেখতে আমরা আসাম বনদপ্তরের আপিসে এসে পৌঁছেছি, সেখানে আমাদের নামধাম লিপিবদ্ধ করাতে হবে, টাকা জমা করতে হবে, তবে মিলবে প্রবেশাধিকার। মানসে ঘর বুক করা দেখলাম বেশ সোজা, ফোনেই বুক করা যায়, অগ্রিম টাকাপয়সাও পাঠাতে হয় না। ফোনের ওপারে থাকেন বুবুলবাবু, বুবুল ব্রহ্ম, ওঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার কথা হয়েছে, এবার চাক্ষুস দেখলাম। বেশ অসমীয়া দেখতে, মাথা পরিষ্কার করে কামানো, বেশ ফর্সা ও অমায়িক। আসার আগে সৌমিত্রদা বলে রেখেছিলেন আলাদা আলাদা করে ঘর বুক করতে, যেন আমরা তিনটে আলাদা পার্টি। নইলে নাকি অনেক সময় ভিআইপি গেস্ট এলে একটা-আধটা ঘর ছেড়ে দিতে বলে; তিনটে আলাদা পার্টি হলে সে কথা বলবার উপায় থাকবে না। সাক্ষাতে কিন্তু সে জারিজুরি ফাঁস হয়ে গেল। আমি অগত্যা মরীয়া হয়ে বললাম-দেখুন, কোনো ভি আই পি আসবে না তো? উনি আশ্বস্ত করে বললেন, "না না , কোনো ভি আই পি নাই। এই সময়ে কোনো ভি আই পি নাই।" পাঠিকা, মন্তব্যটি নোট করে রাখুন।

    এখানে এসে দেখলাম বাংলাভাষা সকলেই দিব্য বোঝে। আমি কিছুটা বোধগম্যতার খাতিরে, কিছুটা অহমীয়াদের "বংগাল" বিদ্বেষজনিত (কল্পিত/সত্য) অস্বস্তি এড়াতে এতকাল আসামে এসে (এই নিয়ে তিনবার) হিন্দি অথবা ইংরেজিতে বাক্যালাপ করেছি। সেঁজুতি দেখলাম সেসবের ধারকাছ দিয়েও না গিয়ে ঝরঝরে বাংলায় বুবুলবাবুর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে দিল। এবং বাকিদের সঙ্গেও। সৌমিত্রদাও তাই। ওঁরাও দেখলাম বিন্দুমাত্র বিরক্ত না হয়ে,ইতস্ততঃ না করে অহমীয়াতে জবাব দিতে থাকলেন এবং এতে দুপক্ষের কারোর দিক থেকেই বোধগম্যতায় কোনো সমস্যা তৈরী হল না। আমিও অগত্যা মহজন যেন গতস্য পন্থা।

    পরের গন্তব্য বাঁশবাড়ি। এটি মানসের প্রবেশদ্বার। এখানে ফাইন্যাল এন্ট্রি নিতে হবে বন দপ্তরের বাঁশবাড়ি অফিস থেকে, বুবুল বাবুর ইস্যু করা রসিদ দেখিয়ে। বেলা বেশ গড়িয়েছে। অনেকেই ঘুমন্ত-আধাঘুমন্ত-প্রায়ঘুমন্ত। আমি বনদপ্তরের আপিস থেকে নেওয়া মানস ন্যাশন্যাল পার্কের বুকলেট পড়ছি আর সেঁজুতির দেওয়া পক্ষীবিশারদ শিরোপার মর্যাদা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টায় নানান পাখপাখালীর ঠিক-ভুল নানা সব নাম বলে যাচ্ছি। কমন গ্রীন ম্যাগপাইয়ের ছবি দেখে বলছি গ্রীন বিলড মালকোহা-এইসব আবোলতাবোল বকছি আর কি। শাঁওলিরা লজ্জার খাতিরে ভুল ধরতেও পারছে না।

    এদিকে জঙ্গলের কাছাকাছি যে এসে পড়েছি তা মালুম পাচ্ছি রাস্তার দুধারে জনবসতির বিরলতা আর সবুজের বাড়াবাড়ি দেখে। একসময় ডানদিকে শুরু হল চা বাগান। আর কিছুক্ষণ পরেই গাড়ি এসে থামল বড় বড় গাছের ছায়ায় ঢাকা বাঁশবাড়ি ফরেস্ট অফিসের সামনে। পুরো জায়গাটা একদম শান্ত, চুপচাপ। ডানে চা-বাগানের বেড়ার গায়ে নানা বাজেটের বেসরকারী লজের বিজ্ঞাপন বোর্ড টাঙ্গানো।দুটি ছাগলছানা ঘাস ছিঁড়ছে। অফিসের সামনের রাস্তার ওপারে ক'টি মুদি কাম স্টেশনারি দোকান, তাতে ঠান্ডা পানীয়, আলুভাজা, গুয়াপান এইসব পাওয়া যাচ্ছে। আপাততঃ সেখান থেকে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে স্থানীয় বোড়ো শিশু। আমরা ফরেস্ট আপিসে ঢুকলাম।

    আপিসে তখন বড় সায়েব নেই। এই নাকি এক্ষুনি এসে পড়বেন। মেজসায়েব রয়েছেন। তিনি হা হা করে এমন অভ্যর্থনা করলেন যেন আমরা সব রাজামশায়ের নাতবৌ-নাতজামাই। ইনি বেশ বকতে ভালোবাসেন। মনে হল যেন দীর্ঘদিন মনুষ্যমুখদর্শনসুখ থেকে বঞ্ছিত আছেন ও আমাদের দেখে হাতে চাঁদ পেলেন। আরে মশায়, কাগজপত্তর দেখা তো পরে হবে, সেসবের জন্য তো বিস্তর সময় পড়ে রয়েছে, বলতে গেলে সারাটা দিনই, হেঁ হেঁ, আগে চাট্টি গপ্পোগাছা হ'ক-এইরকম একটি ভাব নিয়ে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। নামধামকুশল জিগ্গেস করে সবেমাত্র মূল গপ্পে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় হড়মড়িয়ে রাত্তিরের প্রবেশ।

    রাত্তিরকে এরকম আলুথালু, আতঙ্কিত চেহারায় কমই দেখেছি। চোখমুখ শুকিয়ে গেছে, গা থেকে ঘাম ঝরছে, চুল খাড়া হয়ে উঠেছে- এক্ষুনি তো ঠিকঠাক ছিল, কয়েকমিনিটের মধ্যে কী এমন শরীর খারাপ হল? জিগ্গেস করতেও হল না, সে হাঁইমাঁই করে জানাল-তার প্রবল প্রকৃতির ডাক এসেছে,বড়। বাথরুম চাই, এক্ষুনি, শিগ্গির,আভ্‌ভি, রাইট নাউ ! মেজসায়েব অমনি দুদ্দাড়িয়ে উঠে একদৌড়ে উঠোন পেরিয়ে একটি বাংলো প্যাটার্নের বাড়ির একটি ঘরের তালা খুলে দিলেন। রাত্তির সাঁ করে তার ভেতরে ঢুকে গেল, আমি বাংলোর বাইরে পাহারায় রইলাম। কে জানে, গান-গাওয়া বাথরুম কিনা। মেজসায়েব আবার দুদ্দাড়িয়ে আপিসে ফিরে গেলেন, গপ্পের বেলা যায় বহে যায়। বেশ খানিকক্ষণ পরে সুখী রাত্তির হাসতে হাসতে বেরিয়ে এল এবং গাড়ি কিম্বা আপিস কোনো এক দিকে চলে গেল। আমিও আপনমনে ইদিক-উদিক পাখপাখালি খুঁজে বেড়াতে লাগলাম, যদি চাট্টি ছবি হয়, এই বাসনায়।

    এমন সময় দেখি গেট পেরিয়ে হনহন করে দেবর্ষি এদিকপানেই আসছে। সেই একই রকম আলুথালু চেহারা, চোখমুখ শুকিয়ে গেছে, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, চুল খাড়া খাড়া হয়ে উঠেছে। এবার তো এ সব সাইন -সিম্পটম আমার বিলক্ষণ চেনা হয়ে গেছে, আমি বিনাবাক্যব্যয়ে ওকে আঙুল দিয়ে বাথরুম দেখিয়ে দিলাম। সে-ও আর কথা না বাড়িয়ে সাঁ করে ঢুকে গেল। সে যে আমার হবার কথা, আপন বেগে আপনি মরি।

    এদিকে বুনো টগরগাছে লাল রংয়ের ফল ধরেছে। কিছু ফল ফেটে গিয়ে তার মধ্যেকার কমলা রংয়ের বীজ বেরিয়ে এসেছে। টগর গাছে কখনো ফল হতে দেখি নি, তাও এমন ব্রাইট লাল রংয়ের। ওধারে পচা কাঠের গায়ে কমলা-খয়েরী মাশরুম গজিয়েছে। ক্যামেরা তাক করে গুটিগুটি সেদিকে এগুচ্ছি, হঠাৎ শুনি দূর থেকে কে যেন ডাকছে-হেঁই ক্যামেরাম্যান, হেঁই ! কাম ! কাম ! রীতিমত ধমকানোর সুর।

    চেয়ে দেখি, মেজসায়েব। ঐ বাংলোপ্যাটার্নের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে চীৎকার কচ্ছেন; গপ্পগাছা মনে হয় ফুরিয়ে গেছে। কী আবার অপরাধ কল্লেম রে বাবা, এখেনে ক্যামেরা বের করা অপরাধ নাকি,কিম্বা কোনো অদেখা বাউন্ডারি পেরিয়ে গিয়ে ট্রেসপাসিংয়ের দায়ে ধরা পড়েছি -এইসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে গিয়ে দেখি একগাল হেসে মেজসায়েব বলছেন-ইউ ক্যামেরাম্যান? ওয়াইল্ডলাইফ ফোটোগ্রাফি? গো টু দ্যাট রুম। এ বিগ টাইগার, নাইস। গো ! সি !

    গিয়ে দেখি একটি রয়াল বেঙ্গল টাইগার স্টাফ করে রাখা। মানসের জঙ্গলে রয়াল বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতি ভালোই, এই মুহুর্তে নাকি গোটা পঁচিশেক রয়াল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে নদীর দুপার মিলিয়ে। দেখতে না দেখতে টুংকাইয়ের প্রবেশ। সেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে,তার হাজারো প্রশ্ন। দেখা শেষ না হতে হতেই তাকেও প্রকৃতি ডাকল। আবার বাথরুমের সামনে এসকর্ট আমি।

    এইসব প্রাকৃতিক পালপার্বণ সেরে এবার গাড়ির দিকে ফিরছি। সেঁজুতিদের শুনলাম মেজসায়েব গল্পে গল্পে বিধ্বস্ত করে দিয়েছেন-ও, আপনারা কলকাতার লোক, এখানে কলকাতার লোক প্রচুর আসে, অনেকে ছবি তোলে; অতনু পাল? ফোটোগ্রাফার? চেনেন নাকি তাকে? তার সঙ্গে আমার বিলক্ষণ আলাপ, এই দেখুন ওঁর ছবি, আমি এখানকার সব আনাচ-কানাচ চিনি, সবাই খুব ছেদ্দাভক্তি করে, ভুটানের লোকেরা খুব ভালোবাসে, ট্যুরিস্টরা ভুটানের জঙ্গলে গেলে আমায় নিয়ে যায়, আমায় দেখলেই ঢুকতে দেয়, আমায় খুব ভালোবাসে তো ....

    গাড়ির সামনে এসে দেখি সামনের সিটে রোদ্দুর খুব গম্ভীর মুখ করে বসে আছে। গাড়িতে ওঠার পর থেকে সদালাপী রোদ্দুর একটা কথাও বলে নি, টুংকাই কিছু বাক্যালাপের চেষ্টা চালালেও বিরক্ত হয়েছে, "জ্বালাতন করিস না" বলে ধমকে দিয়েছে, কেন কে জানে। এবার দেবর্ষি-"কি বাবা, টয়লেটফয়লেট কিছু করবি নাকি"-বলাতেই প্রায় ভ্যাঁ করবার উপক্রম। হ্যাঁ, সেই একইরকম শুকনো চোখমুখ, খাড়া খাড়া চুল, কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আপন বেগে আপনি মরি। এতক্ষণ নেহাত প্রকৃতির ডাক চেপে বসে ছিল।

    বিরিঞ্চিদা'র পিসেমশাই বলেছিলেন-"বাস্তবিক এতগুলো ধড়িবাজ একসঙ্গে একটা ফ্যামিলির মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না"।গুপি সে কথা যত্ন করে তার গুপ্তখাতায় টুকে রেখেছে। তবে কথা হল গিয়ে, একসঙ্গে এত "প্রকৃতিপ্রেমী" জনতাও কি একটা ট্যুরিস্ট্পার্টির মধ্যে কেউ দেখেছে? হ্যাঁ পিসেমশাই?


    মেরে অঙ্গনে মেঁ
    -------------------
    রেঞ্জ আপিস থেকে জঙ্গলের প্রবেশদ্বার হাঁটাপথের দূরত্ব। শাঁওলী-ভাস্কররা হাঁটতেও শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যে। ভিউফাইন্ডারে চোখ লাগিয়ে উর্দ্ধমুখ হয়ে মাঝেমধ্যে খচাৎ খচাৎ ছবিও তুলছে। কী পাখি? অচেনা কিছু? পরে জানা গেল, বসন্তবৌরি। ব্লু থ্রোটেড বারবেট। আমি তুলতে পারলাম না, হায়। ফেরার পথে অবশ্য আশ মিটিয়ে তুলেছি। এই যে সেই ছবি-

    https://www.facebook.com/photo.php?fbid=974218462638285&l=a7b098aab2

    করবেটে প্রথম পক্ষীদর্শন হয়েছিল একটি চেস্টনাট হেডেড বী-ইটার। না, ভুল বলা হল। রামনগর স্টেশনে যখন নেমেছিলাম, তখন তো ভোর রাত। কিন্তু আলো ফোটেনি। ঐ অন্ধকারের মধ্যে হি হি শীতে খোলা জিপসি গাড়িতে করে যাওয়া। জঙ্গল তখনো ভালো করে জাঁকিয়ে বসে নি, রাস্তার ওপরে হঠাৎ দেখি একটি লাল আলো বসে রয়েছে। নাইটজার! শীতে ও বিস্ময়ে জবুথবু আমরা গাড়ি থামাতে বলার আগেই গাড়ি হু হু করে অনেকদূর চলে গেল।

    আর এবার মানসের শুরুয়াত বসন্তবৌরি দিয়ে। যদিও দুই সুন্দরীর মধ্যে কক্ষনো তুলনা করতে নেই, আমার কিন্তু করবেট এখনো চোখে লেগে রয়েছে।

    জঙ্গলে ঢুকতেই রাস্তার হাল বদলে গেছে। এবরোখেবরো মেটে রাস্তার ওপর দিয়ে গাড়ি চলেছে লাফিয়ে লাফিয়ে। কিন্তু রাস্তায় একমাত্র আমরাই, অন্য গাড়ি চোখেটোখে পড়ছে না বিশেষ; ফলে অন্য বড় জঙ্গলের মত এখানে তেমন ধুলোর ঝড় নেই। বর্ষার পরে এসেছি। ঘাসের জঙ্গল খুব লম্বা, আন্ডারগ্রোথও বেশ বেড়ে উঠেছে। ছোটোখাটো জন্তু-জানোয়ার দেখবার আশা কম । অভিজ্ঞরা আগেই এই সময় মানসে আসতে বারণ করেছিল। কিন্তু ঐ পাকেচক্রে যা হয়।

    সৌমিত্রদা তাও বলেছেন দুদিকে চোখ রাখতে। জঙ্গল খুব আনপ্রেডিক্টেবল। সারাদিন হন্যে হয়ে ঘুরেও কিছু দেখতে না পেয়ে সাঁঝের ঝোঁকে ফেরার পথে হয়তো দারুণ কোনো সাইটিং হয়ে গেলো। কত লোকের হয়। আমাদেরই হয়েছে।

    কি কারণে যেন গাড়ি কয়েকমুহূর্ত থেমেছিল। অনুলিপি দেখি আমার দিকে ইশারা করল। ডানদিকে তাকিয়ে দেখি রাস্তার পাশেই গাছের পাতার ওপর বসে একটি গার্ডেন লিজার্ড। তেমন গ্রেট কিছু নয়, কিন্তু মজার ব্যাপার হল ব্যাটাচ্ছেলে তখন খোসা ছাড়াচ্ছিল। সেটা আবার ছবি তোলার সময় বুঝিনি। ক্যামেরার মনিটরে বড় করে দেখে বুঝলাম। এর আগে সাপ ছাড়া অন্য কোনো সরীসৃপের মৌল্টিং দেখার সুযোগ হয় নি। তাই বেশ মজা লাগল।


    জঙ্গলের বাকি রাস্তাটা কোনো ঘটনাহীন কেটে গেল। দুটো প্রায় বাজে। এইসময় কোনো পাখির দেখা পাওয়ার কথা নয়। হাতিফাতি দূরস্থান, একটা হরিণের শিংয়ের ডগাটুকু অবধি দেখতে পাওয়া গেল না। যদিও মানসে চিতল, শম্বর, হগ ডিয়ার , বার্কিং ডিয়ার ছাড়াও বারাশিঙার আবাস রয়েছে।

    সওয়া দুটো নাগাদ জঙ্গল হঠাৎ পাতলা হয়ে এল।একটা বিশাল ফাঁকা জায়গায় এসে পৌঁছলাম। বড় বড় গাছে ছায়া করা একটা ঘাসে ঢাকা জায়গা, মানুষজন চোখে পড়ছে; একটা কংক্রিটের রাস্তা চলে গেছে উঁচু টিলার মাথায়, সেখানে একটি কাঠের বাংলো। বুঝতে পারলাম এই হচ্ছে সেই বিখ্যাত মাথানগুড়ি বাংলো। পরে জেনেছিলাম মাথানগুড়ির বাংলো আসলে দুটি। একটা পুরনো বাংলো টিলার ওপরে,তার নাম আপার মাথানগুড়ি , যেখানে আগামী তিন দিন আমরা থাকবো। অন্যটি অপেক্ষাকৃত নতুন লোয়ার মাথানগুড়ি বাংলো, নীচের দিকে।আপার মাথানগুড়ি বাংলোর ঠিক নিচ থেকেই টিলা খাড়া নেমে গেছে বেকি নদীর বুকে। বেশ অনেকখানি উচ্চতা। টিলায় ওঠার একটি শর্টকাট রাস্তা রয়েছে পাকদন্ডী মত, অন্য রাস্তাটি ঐ যে বললাম কংক্রীটের-সেটি অনেক ঘুরে। গাড়ি যাবার পথ। টিলায় উঠতে হাঁপ ধরে যায়। বেকি নদীর বুক থেকে উঠে আসা হাওয়া শন শন করে বইছে; এই হাওয়াই সন্ধ্যের পর ঝোড়ো আর হাড়কাঁপানো হয়ে উঠবে, কয়েকঘন্টা পরে জেনেছিলাম। বেকি নদীটি মানস নদীর একটি শাখানদী, বিশাল চওড়া, ঘন নীল, খরস্রোতা আর বেশ গভীর। পাহাড়ী নদী এত চওড়া আর গভীর হয় জানা ছিল না। পরে জলে হাত দিয়ে বুঝেছি, পুরো বরফ গলা জল। হাত কেটে যায়, অসাড় হয়ে যায়। মানস নদীর জন্ম অরুনাচল প্রদেশে, পরে সেটি ভুটানে এসে ঢোকে এবং আরো দুটি নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে হিমালয়ের বরফ -গলা জল আসামের উপত্যকায় বয়ে নিয়ে আসে।

    টিলা বেয়ে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে আপার মাথানগুড়ি বাংলোয় উঠতে উঠতে একটি ফিল্মের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছিল-লা আভেন্তুরা। সেই সমুদ্রের বুকে গজিয়ে ওঠা আগ্নেয়দ্বীপে দলবল সমেত বেড়াতে আসা। তেমনি ঝোড়ো হাওয়া। তফাৎ শুধু এই যে , সেই দ্বীপটি এমন সবুজ ছিল না মোটে। কিন্তু আরেকটু হলেই যে আমাদের বেলাতেও একটা বড়সড় ট্রাজেডি ঘটে যেতে পারত, ঐ লা আভেন্তুরা ফিল্মের মতই , সে কথা তখনো জানতাম না।


    বাংলোর সামনের ছড়ানো এলাকা
    ---------------- ---------------------


    বেকি নদীর বুক থেকে উঠে গেছে টিলা; টিলার মাথায় আপার মাথানগুড়ি বাংলো
    ------------------------------------------


    কংক্রীটের রাস্তা চলে গেছে বাংলোর দিকে
    ----------------------------------------
    দিব্য বাংলো। এইবার যে যার ঘরের চাবিটি নিয়ে টুক করে ঘরে ঢুকে যাবো, এট্টুখানি গায়ে-মাথায় জল ছেটাবো, তাপ্পর গরমাগরম লাঞ্চ খাবো-সৌমিত্রদা'রা নিচের ডরমিটরি-র সামনে উনুন জ্বালিয়ে তার যোগাড়যন্তর শুরু করে দিয়েছেন। তারপর ইচ্ছে হলে বিকেলের ঝোঁকে একটু ইদিক-সিদিক ঘুরবো, নয়তো বাংলোর ব্যালকনিতে বসে বসে চা খেতে খেতে বেকি নদীর বুকে সূর্যাস্ত দেখব। আমাদের আবার দোতলার ঘর দিয়েছে, আই মাই গড !

    কিন্তু ঘরের চাবি? চাবি কই ! কেয়ারটেকার (নাকি বীট অফিসার-পরে জেনেছি) কইলেন-চাবি নাই। আমাদের ঘরের বাসিন্দা যাঁরা, তাঁরা এখনো ঘর ছাড়েন নি। ঘরদোর লক করে তাঁরা কোথায় না জানি বেরিয়েছেন, সোজাসরল গোলগাল কেয়ারটেকার তার সন্ধান জানেন না-তাঁরা ফিরে এসে লাঞ্চ খাবেন , তবে ঘর ছাড়বেন। আমরা বললাম-ধ্যাত, কী হচ্ছেটা কী, বেলা আড়াইটে বাজে, পৃথিবীর সর্বত্র বারোটায় কি তার আগে চেক আউট, আর আপনারা কীসব আটভাট বকছেন ! ইয়ার্কির সময় ঠাট্টা ভাল্লাগে না মাইরি, চাবি দিন, ঘরে ঢুকে ফ্রেশট্রেশ হই। বাচ্চাগুলো গা মোড়ামুড়ি দিচ্ছে, রাত্তিরের মাথা ঘোরাচ্ছে, বমি পাচ্ছে।

    কত্তা ও তাঁর স্যাঙাত্গণ বল্লেন-তাঁরা যারপরনাই সিরিয়াস, এয়ার্কি দিচ্ছেন না।

    এরপর মাথা গরম হতে শুরু করল। কিঞ্চিৎ কড়া কথা মুখ থেকে বের হতে থাকল। তখন কত্তা কইলেন, ঠিক আছে, একটা নিচের ঘর তাঁরা ছেড়ে দিচ্ছেন, সেখানে আমরা লাগেজ রাখতে পারি, টয়লেট ইত্যাদি যেতেটেতে পারি। আহ, কী বদান্যতা! বেলা পৌনে তিনটের সময় ন' জন লোকের জন্য একখানি ঘুপচি মত ঘর খুলে দেয়া হল, তাও আবার চোখমুখ পাকিয়ে !

    মহিলারা এক এক করে ফ্রেশ হওয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন; আমি বিরক্ত, হতাশ হয়ে সামনের চাতালে বেঞ্চের ওপর বসে থাকলাম। কেন আমাদের সঙ্গে বারবার এরকম হয় ! পেরিয়ার গিয়ে এই এক কান্ড-সেবার অবশ্য ঘরে গেস্ট আছে বলে নয়, ঘর রেনোভেট করা হচ্ছে বলে প্রথম রাত্তিরে নির্দিষ্ট ঘরে থাকতে পারিনি, কেরালা ট্যুরিজমের আরেকটি কম দামের ও কম মানের ঘরে থাকতে হয়েছিল; এবং কর্তাদের সঙ্গে খুব একচোট হয়েছিল। পোর্ট ব্লেয়ারে কাকভেজা হয়ে বারাটাং আইল্যান্ড থেকে ফিরে এসে হোটেলে ঢুকে দেখি , আমাদের বিন্দুমাত্র না জানিয়ে আমাদের লাগেজ এক ঘর থেকে অন্য ঘরে শিফট করে দেওয়া হয়েছে; আবার একপ্রস্থ চিৎকার-চেঁচামেচি। এবার ঠিক করেছি, যত উস্কানিই আসুক না কেন, মাথা একদম ঠান্ডা রাখবো, বাকিরা যা পারে করুক গে।

    বেকি নদী কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে, এতসব হ্যাংনামের কথা তার জানা নেই, জানলেও তার বয়েই গেল (পানদোষ খ্যাল কর্বেন)। একটি পাইড কিং ফিশার ঘুরে ঘুরে জল মাপছে এবং সময়-সুযোগ মত মাছের তালাশে জলের বুকে ডাইভ দিচ্ছে, তার ঠোঁট থেকে ছলকে উঠছে নদীর জল। কয়েকটি গ্রেট করমোর‌্যান্ট কোণাকুণি নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, ওপারে তাদের একটা ঝাঁক তীরে বসে ভেজা ডানা ঝাপটাচ্ছে। কিন্তু এসব কিছুই ভাল্লাগছে না, ক্যামেরা খুলতে ইচ্ছে করছে না; মনের মধ্যে কে যেন বলছে- হেরো, হেরো !

    তিনটে বাজে, সওয়া তিনটে বাজে, সাড়ে তিনটে। কারোর কোনো দেখা নেই। স্যাঙ্গাতদেরও কোনো হেলদোল নেই। বীটবাবুর তো দেখাই নেই। চারপাশে অনেক আর্মির লোক( নাকি পুলিশ/প্যারামিলিটারি) ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়াচ্ছে , কাঁধে ভারী ভারী সব অস্তর, অটোম্যাটিক কি সেমি অটোম্যাটিক রাইফেলের মত লাগছে। এরা কেন? এতজন কেন? ক্কচিৎ তারা নদীর দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাচ্ছে- কথাবার্তায় বোঝা গেল কেউ বা কারা নদীবক্ষে র‌্যাফটিংয়ে বেরিয়েছে, এরা তারই ফিরে আসার প্রতীক্ষায় রয়েছে।এই নদীবক্ষবিহারী ব্যক্তিরাই কি আমাদের ঘরের অধিকারী, আওয়ার ম্যান? এদের সঙ্গে পুলিশ/মিলিটারির কী সম্পর্ক?

    চারটের সময় সেঁজুতি একদম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। সঙ্গে দীপাণ্বিতাও। আর তো সহে না। বাক্যবাণে আমার মনের মধ্যেকার গান্ধিবিরোধী জয়াভিলাষী সহিংস লোকটাও চেগে উঠল-আমার একটু আগের শান্ত থাকার প্রতিজ্ঞা বেকির জলে ভেসে গেল; কান লাল হয়ে উঠল, আমরা ক'জন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে শুরু করে দিলাম। যাকেই ধরি,সে-ই পাল্টা চিল্লিয়ে বলে, আমায় বলছ কেন, আমি এসবের কি জানি! বীটবাবুকে তো খুঁজেই পাওয়া গেল না, কোথায় গা-ঢাকা দিয়েছেন কে জানে!

    এমন সময় দেখা গেল, কয়েকটি র‌্যাফ্ট এসে এপাড়ে ভিড়ল; ভেজা গায়ে বেশ কয়েকজন লোক টিলা বেয়ে উঠে এল এবং বিনা বাক্যব্যয়ে দোতলার ঘরে ঢুকে দোর দিল। সেঁজুতি বলল- এরাই মনে হয় সেই লোক, চল ওদের গিয়ে বলি, একটু তাড়াতাড়ি আমাদের ঘর ছেড়ে দিতে।

    দোতলার সিঁড়ি বেয়ে উঠে আমি আর সেঁজুতি একটি ঘরের দরজা ঠকঠকালাম। টিশার্ট-হাফ প্যান্ট পরিহিত একটি মাঝবয়সী লোক বেরিয়ে এল- ইয়েস?

    -এক্সকিউজ আস, এটা কি রুম নাম্বার ওয়ান?
    -আমি সেসব জানি না।
    -আমরা যদ্দুর জানি, এটা রুম নাম্বার ওয়ান। এই ঘরটায় আমাদের বুকিং আছে আজ থেকে, আপনারা কি দয়া করে একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেবেন?
    -আমি ওসব জানি না, যাও গিয়ে কেয়ারটেকারকে বলো।

    -আমরা কেয়ারটেকারকে পাচ্ছি না; তাছাড়া এত বেলা অবধি আমাদের বাইরে বসিয়ে রেখে আপনি ঘর দখল করে থাকতে পারেন না !

    -আই ক্যান পুট ইউ ইন জেল, ব্লাডি বাস্টার্ডস!
    -হু দ্য হেল ডু ইউ থিংক ইউ আর? পুট আস ইন জেল ইফ ইউ ক্যান !!

    এইবার গলা চড়তে শুরু করেছে; নিজেদের মাথার ওপরে নিজেদেরই আর কন্ট্রোল নেই আমাদের। কান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে, হার্ট মিনিটে একশো চল্লিশ বার পাম্প করছে। এইজন্য, এইজন্য রাগারাগি আমি এত অপছন্দ করি! একটু আগেই জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে আসতে আসতে বলছিলাম, আয়াম ইন ফুল কন্ট্রোল অফ মাই ভেগাস নার্ভ। এই মুহূর্তে ভেগাস নার্ভ আমার স্নায়ুতন্ত্রের কোথাও, কোনো কোণে-ঘুপচিতেও ঘাপটি মেরে আছে বলে টের পাচ্ছি না। সবই সিমপ্যাথেটিক ওভারড্রাইভের খেলা। এইসব করতে কেউ বেড়াতে আসে ! ছ্যা!

    মুহূর্তের মধ্যে চারদিক দিয়ে পুলিশ/প্যারামিলিটারি বাহিনী আমাদের ঘিরে ফেলল। প্রত্যেকের মুখ থেকে ভকভক করে অ্যালকোহলের গন্ধ বেরোচ্ছে ঐ চারটের সময়েই, প্রত্যেকের মুখেই বাপ-মা তুলে গালাগালি। এ যে ঠিক কিরকম ব্যুহ আমি জানিনা, ডিডি দেখলে ভালো বলতে পারতেন; তবে এটুকু বুঝছি আমরা ন-জনেই অভিমন্যুর মত এই ব্যুহের ভেতরে ঢুকে পড়েছি বেরোনোর কৌশল না জেনেই এবং যে কোনো সময়ে আমাদের পতন অনিবার্য। ঘাড়ের আগ্নেয়াস্ত্র আর একটু তপ্ত হয়ে উঠলেই ঘাড় থেকে নেমে আসতে দ্বিধা করবে না, এবং আর্মির লোকেদের ঘাড় ত্যাঁড়ানো -গোঁয়ার্তুমি যেহেতু কুবিদিত, তদুপরি সিমপ্যাথেটিক ওভারড্রাইভের সাথে সাথে ওদের আছে বাড়তি কোহলড্রাইভ, কাজেই যে কোনো মুহূর্তে আমাদের কারো জ্যান্ত মানুষ থেকে কপালে ছ্যাঁদাওয়ালা লাশ বনে যেতে তেমন বেগ পেতে হবে না। লা আভেন্তুরা'র অ্যানা'র মতই আমরা যে কেউ যে কোনো সময় হারিয়ে যেতে পারি, ফিরে আসার ন্যুনতম কোনো প্রতিশ্রুতি না রেখে। বেকি নদীর পারে পারে কত চিতা, বনবেড়াল, শেয়াল-শকুনের আড্ডা ! একটা-আধটা লাশ গায়েব হতে আর কত সময় লাগবে! জঙ্গলে বেড়াতে এসে অবিমৃষ্যকারী ট্যুরিস্ট তো এরকম কতই বিপদে পড়ে। বাংলা কাগজের ছয়ের পাতায় এক কোণে তিন-চার লাইনের খবর হয়ে যেতে এর চেয়ে বেশী কিছু লাগে না।

    রক্তের মধ্যে ঝনঝন করে বাজছে টি-শার্ট পরিহিত লোকটির মাতাল স্বর-"আই অ্যাম ফ্রম হিয়ার!" সে এখানকার ভূমিপুত্র, অতএব তার অধিকার জন্মে যায় গেস্টকে ঘরে ঢুকতে না দিয়ে নদীবক্ষে র‌্যাফটিং করে বেড়াবার। ব্লাডি বাস্টার্ড বলে, বাপ-মা তুলে গালি দেবার। জেলে ঢুকিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়ার। মেরে অঙ্গনে মেঁ তুমহারা ক্যা কাম হ্যায় ! ভারতবর্ষ নামে একটা দেশ কি সত্যি আছে?

    এটি একটি অ্যানেকডোট, তবে সত্যি। অনেক বছর আগে,আমাদের কিশোরবেলার ঘটনা। এই আসামেরই ঘটনা। অমিতাভ বচ্চন তখন সবে রাজনীতিতে পা রেখেছেন। কংগ্রেসের হয়ে আসামের কোথাও একটা সভা করতে গেলে আসু তাঁকে গান গেয়ে অভ্যর্থনা জানায়- মেরে অঙ্গনে মেঁ তুমহারা ক্যা কাম হ্যায় ! অমিতাভ যে জবাবটি দিয়েছিলেন সেটি এই ন্যারেটিভের জন্য জরুরি নয়, তাও মনে আছে বলে তুলে দেওয়ার লোভ সামলানো গেল না- ভারত মেরা অঙ্গন হ্যায় অওর কংগ্রেস মেরা কাম হ্যায়। তখন ছিলাম ঘোর কংগ্রেসবিরোধী, তাই অমিতাভের এই হাজির-জবাব তেমন পছন্দ হয় নি। তখনো অবশ্য আসু তার সম্পুর্ণ খাপ খোলে নি। বংগাল খেদা'র এথনিক পার্জিং সম্বন্ধে তেমন ধারণাও ছিল না।

    বেশ পলিটিক্যালি ইনকারেক্ট , গুরুচণ্ডালীর পক্ষে প্রায় ব্লাসফেমাস কথা বলছি,আর তাছাড়া বেড়ানোর গপ্পে এসব বলাও ঠিক না, কিন্তু না বলেও নাচার। গোটা নর্থ ইস্ট জুড়ে চোরাগোপ্তা কিম্বা খোলাখুলি রকম রিভার্স রেসিজম চলে। মেনস্ট্রীম ভারতীয় মানেই সেখানে সন্দেহভাজন ও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। সে তারা সোস্যাল মিডিয়ায়, পাড়ার রকে যতই থাংজম মনোরমা কিম্বা ইরম শর্মিলা'র হয়ে গলা ফাটাক না কেন। অন্যতম শান্ত রাজ্য অরুনাচলে গিয়ে বেশ পরিষ্কার অ্যাপ্যাথি টের পেয়েছি; শিলংয়েও খানিক খানিক; এবার মানসে এই ঘটনা। খাসি সমাজে বাকি ভারতীয়রা উদ্খার। ডিমাপুরে এই সেদিন রেপের দায়ে অভিযুক্তকে জেল থেকে টেনে বের করে মব লিঞ্চিং করা হল; সে নাগাল্যান্ডের, উত্তরপূর্বের ভূমিপুত্র ছিল না।আর আসামের কথা বলতে বসলে ফুরোবে না। আমার সবচেয়ে পছন্দের জায়গা, প্রিয় জায়গা উত্তর-পূর্ব।



    লা আভেন্তুরা'র সেই মেডিটেরানিয়ান দ্বীপ। বেকি নদী এতটা না ফুঁসলেও আমাদের গপ করে গিলে নেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
    ----------------------------------------------
    সন্ধ্যার সে শান্ত উপহার
    ------------------------------------

    ততক্ষণে প্রত্যয় হতে লেগেছে লোকটি একজন কেউকেটা। কেমন কেউকেটা সেটা অবশ্য পরিষ্কার নয়। একবার সে বলল বটে -আয়াম দ্য রেঞ্জার। কিন্তু খটকা লাগল, রেঞ্জার কি এভাবে নিজের জঙ্গলে নিজেই ঘর দখল করে বসে থাকবে ! আর ন্যাশনাল পার্কের নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে জঙ্গলের মধ্যে সাঙ্গোপাঙ্গ জুটিয়ে মদ গিলবে! তবে হতে পারে; সবই হতে পারে। সে আর্মি কিম্বা পুলিশের হোমড়াচোমড়াও হতে পারে। গোলমালের আওয়াজ শুনে ছুটে আসা বীট অফিসারকে যেরকম কম্যান্ডিং গলায় বলল-এদের বুকিং ক্যান্সেল করে দাও। বীট অফিসারও তাই শুনে আমাদের ডেকে বললেন-চলুন , আপনাদের বুকিং ক্যান্সেল করে দিচ্ছি। সেঁজুতি তখনও ফুঁসছে- আপনি ভাবলেন কি করে যে এত দূর থেকে এত টাকা খরচা করে এসে আপনার কথায় আমরা বুকিং ক্যান্সেল করে ঘরে ফিরে যাব? দেখি, কিভাবে আপনি বুকিং ক্যান্সেল করেন। বুবুল ব্রহ্মকে ফোনটা দিন!
    -ম্যাডাম, এটা হোটেল নয়। এখানে যখন ইচ্ছে যে কারো বুকিং ক্যান্সেল হতে পারে। ভিআইপি এলে পরে জেনারেল পাবলিকের বুকিং ক্যান্সেল হয়ে যেতেই পারে।

    - কিন্তু বুবুলবাবু পরিষ্কার বলেছেন, এখন এখানে কোনো ভিআইপি-র বুকিং নেই ! (পাঠিকা, বুবুল বাবুর উক্তি খেয়াল করে দেখুন !)

    তারপর শুরু হল রিকনসিলিয়েশনের পালা। ঠিক আছে, আপনারা আমায় বললেই তো পারতেন! খামোকা ওনাকে চটাতে গেলেন কেন ! আমি তো আমাদের একটা ঘর ছেড়ে দিয়েছিলাম! আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, ঘর ঠিকই পাবেন।

    সেই ঘর পেলাম পাঁচটা- সাড়ে পাঁচটা নাগাদ।

    তার মধ্যে অবশ্য সৌমিত্রদা নিচ থেকে ডাক পাঠিয়েছেন খাবার হয়ে গেছে বলে। তখন আমাদের খেয়াল পড়ল সৌমিত্রদা বলে একজন ভদ্রলোক আছেন, যিনি এযাত্রা আমাদের দলনেতা; যাঁর ইতিমধ্যে পনেরো-ষোলোবার মানসভ্রমণ হয়ে গেছে; এখানকার অনেককেই নামে চেনেন। সেই ভদ্রলোককে একবার না জানিয়ে নিজেরাই বুল ফাইটিংয়ের ষণ্ডের মত গোঁ গোঁ করে আগ বাড়িয়ে লড়তে যাওয়া খুব বুদ্ধিমানের মত কাজ হয় নি। হয়তো অনেক ট্যাক্টফুললি ব্যাপারটা ম্যানেজ করতে পারতেন । এত বান্দেরিলার খোঁচা হজম করতে হত না।

    গরমাগরম ভাত আর মাছের ঝোল পরিবেশন করতে করতে সৌমিত্রদা গোটা ব্যাপারটা খুব ঠান্ডা মাথায় শুনলেন। তারপর জিগ্গেস করলেন-আপনারা বীট অফিসার মিঠিবাবু'র(বা মেথিবাবু) সঙ্গে কথা বলেছিলেন?
    আমরা বললাম, কে আপনার মেথিবাবু জানি না; তবে গোলগাল একজন কর্তা মতন লোক ছিলেন, উনিই মনে হয় বীট অফিসার।

    চেহারার বর্ণনা শুনে সৌমিত্রদা বলল্ন-উনিই মেথিবাবু। বীট অফিসার। এমন তো করেন না সাধারনতঃ ! আমার সঙ্গে ভালো আলাপ আছে।

    আমাকে জিগ্গেস করলেন- ঐ টি-শার্ট পরা লোকটিকে চিনিয়ে দিতে পারবেন?

    আমি বললাম-তা পারি; তবে খামোখা আবার ঝামেলা খুঁচিয়ে তুলবেন?
    মেয়েরা কয়েকজনও হাঁ হাঁ করে উঠলেন-জানেন না, একদম ড্রাংক। প্রচুর আর্মির লোক সঙ্গে । যা তা গালাগাল দিচ্ছে। যা খুশি করে ফেলতে পারে।

    সৌমিত্রদা হেসে বললেন-আরে , এত ডরপোক হলে চলে? লোকটা কে, জেনে তো আসি ! রেঞ্জার তো হবেই না। রেঞ্জার কখনো নিজের এলাকায় বসে এ কাজ করবে না।

    বলে একটা পাতলা টি শার্ট পরেই নদীর চরের দিকে হাঁটা লাগালেন, সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুলিশরা দাঁড়িয়ে রয়েছে। বলেছি কি, সূর্য ডুবি ডুবি করছে তখন, আর ঝপ করে ঠান্ডা নেমে এসেছে। নদীর ঝোড়ো হাওয়া কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

    বেশ খানিকক্ষণ পরে ফিরে এসে যা বললেন, তার অস্যার্থ হল- লোকটি বোড়োল্যান্ড টেরিটোরিয়াল কাউন্সিলের এক নেতা-সোজা বাংলায় পলিটিশিয়ান এবং সম্ভবতঃ প্রাক্তন বোড়ো জঙ্গী। মেথিবাবু গোটা ব্যাপারটার জন্য লজ্জিত, কিন্তু ওঁকেও তো চাকরি বাঁচাতে হবে। সৌমিত্রদা বললেন-আমি তো মেথিবাবুর কাছে লোকটার সামনেই বললাম, এই ভদ্রলোক আমাদের লোকেদের যাচ্ছেতাই অপমান করেছে; ও তো উত্তরে কিছু বলতে পারল না, মাথা নিচু করে চুপচাপ শুনল; অন্যায় করে কি বেশীক্ষণ মাথা উঁচু করে থাকতে পারবে !

    আমি মনে মনে সৌমিত্রদা'র সাহস, সারল্য আর ঠান্ডা মাথার প্রভূত প্রশংসা কল্লেম। ওঁর এই ঠান্ডা মাথার পরিচয় পরেও পেয়েছি।


    এক এক করে পুলিশের গাড়িগুলি বেরিয়ে গেল। ঝপ করে নেমে এল নিস্তব্ধতা। নদীর কল কল আওয়াজ আর শন শন হাওয়া। কমলা -বেগুনী আলোর মধ্যে সূর্য ডুবছে। বেকি'র ওপাড়ের চরে একটা ওয়াটার বাফেলো প্রাণপণ দৌড়চ্ছে। বেচারা এসেছিল জল খেতে। অক্স্মাৎ মনুষ্য সমাগম। প্রচুর আর্মির লোক দেখা যাচ্ছে ওপাড়ের চরে। পিল পিল করে কোথা থেকে বেরিয়ে আসছে ওরা। কী যেন খুঁজছে । আবার আর্মি! এই গোধূলিতে জঙ্গলের মধ্যে কী করছে ওরা! ফিরবে কখন!

    নীরবতা ভেঙ্গে সৌমিত্রদা বললেন- এই ব্যাপারগুলোই ভালো লাগে না!
    বললাম-কী?
    -এই যে, এত লোকলস্কর! নিরিবিলি ভাবটাই নষ্ট করে দেয়।

    তারপর-যাক গে, যা হয়েছে হয়েছে ; ভুলে যান। মনে করুন যেন কিছু হয় নি। এখন থেকে আমাদের বেড়ানো শুরু হল। চলুন, বেরোই।
    - এই অন্ধকারে ! কোথায়!
    -চলুন, পেছনের দিকের রাস্তাটা ধরে হেঁটে গেলে ভুটানের জঙ্গল পড়বে। কিছু যদি দেখা -টেখা যায় !
    - অন্ধকারে ভয় নেই তো !
    -আরে না না, এতজন আছি তো !

    হাঁটা শুরু হল। রাস্তাটা নেমে গেছে বেকির পাড় বেয়ে। একদিকে খাড়া খাদ, পা হড়কালেই সোজা কয়েক শো ফিট নিচে বেকি'র পাথুরে পাড়, মাথার খুলি গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাবে। অন্যদিকে পাহাড় উঠে গেছে জঙ্গল বুকে নিয়ে। কিছুদূর গিয়েই একটি তোরণ। ভুটানী আর্কিটেকচার- ওয়েলকাম টু রয়াল মানস ন্যাশনাল পার্ক, ভুটান। আমরা খুব আনসিরিমোনিয়াসলি ভারতবর্ষ পেরিয়ে ভুটানে ঢুকে গেলাম। কোনো কাঁটাতার, সান্ত্রী নেই এ বর্ডারে। কাঠবেড়ালী, প্রজাপতি, সাপ, চিতাবাঘের মতই মানুষও নির্ঝঞ্ঝাট পার হয়ে যায় এই আন্তর্জাতিক বর্ডার। জিজ্ঞেস করলাম- এই যে কোনো পাহারা নেই, ঝামেলা হয় না?
    সৌমিত্রদা বললেন- না, ঐ জন্যই তো বাঁশবাড়িতে চেকপোস্ট রয়েছে। তছাড়া ঝামেলা কি আর হয় না! আলফা জঙ্গীরা তো কত এই রাস্তা দিয়ে ভুটানের জঙ্গলে গিয়ে গা ঢাকা দিত।

    শুধু কি আর আলফা? বোড়ো জঙ্গীরাই বা কম যায় কিসে! বস্তুতঃ মানসের জঙ্গল এতকাল তারাই দখলে রেখেছে। ৯০এর দশকে এদেরই কল্যাণে মানসের জন্তুজানোয়ার ও গাছপালা সাফ হয়ে যেতে বসেছিল। জঙ্গী ও সরকারে, জনজাতিতে-জনজাতিতে, মানুষে-মানুষে যুদ্ধ হয়,আর তারই কোল্যাটার‌্যাল ড্যামেজ হয় হাতির দাঁত, গন্ডারের শিং, বাঘ আর হরিণ, জঙ্গলের দামি কাঠ-গাছপালা। মানস ন্যাশন্যাল পার্কের জঙ্গলে দীর্ঘসময় বোড়ো জঙ্গীরা (এন ডি এল এফ-সংবিজিত গ্রুপ) দীর্ঘসময় শেল্টার নিয়ে থেকেছে; বেশ কিছু জঙ্গলরক্ষী এদের হাতে খুন হয়েছে। আর খুন হয়েছে মানসের জীববৈচিত্র। এইসব জন্তুজানোয়ার বেচা টাকায় নতুন নতুন আগ্নেয়াস্ত্র, আবার নতুন করে পোচিং- এ এক ভিসিয়াস সাইকল। সেই সাইকল দীর্ঘদিনের চেষ্টায় কিছুটা ভাঙা সম্ভব হয়েছিল; যারা এককালে পোচার-মিলিট্যান্ট ছিল, তারাই একসময় জঙ্গলরক্ষায় এগিয়ে আসে। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৫ মানস ন্যাশনাল পার্ক ভিজিটরদের জন্য বন্ধ ছিল। একটা কনসার্ভেটিভ এস্টিমেটেও মানসের ৫০% গণ্ডার, ৩০% বাঘ মারা পড়ে ঐ সময়। আর্থিক ক্ষতি ২ মিলিয়ন ডলারের বেশী।

    কিন্তু কিছুকাল ধরে আবার মানসের আকাশে কালো মেঘ। গত ডিসেম্বর মাসেই মানস সংলগ্ন কোকরাঝোড় আর শোনিতপুর জেলায় অজস্র মুসলিম ও অ-বোড়ো জনজাতি এথনিক ভায়োলেন্সে মারা যায়। বাচ্চা-বুড়ো নির্বিচারে গুলি করে তাদের লাশ ভাসিয়ে দেওয়া হয় বেকি নদীতে। পার্ক বন্ধ থাকে তিন দিন। এখনো সংবিজিৎ গোষ্ঠীর জঙ্গীরা জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে আছে বলে শোনা যাচ্ছে। আর্মি কি তাদের খোঁজেই এই সন্ধ্যায় সার্চলাইট জ্বালিয়ে জঙ্গল তোলপাড় করছে? ওদের কাছে কি কোনো নির্দিষ্ট খবর আছে?

    সূর্যের শেষ আলোটুকু এবার নিভে যাচ্ছে। একটা মরা গাছের ফাঁক দিয়ে লাভা-লাল গলন্ত তারাটির একফালি ক্যামেরায় তুলে রাখছে ভাস্কর। ওপারে ইন্ডিয়ান আর্মির লোকেরা কাঠকুঠো জড়ো করে আগুন জ্বালিয়েছে; তাদের আগুনের শিখা আর সার্চলাইটের আলোয় জঙ্গল কয়েক সেকেন্ডের জন্য আলোময় হয়ে ওঠে। এই ঠান্ডায় কি করে রাত কাটাবে ওরা?
    এদিকে রয়াল মানসের জঙ্গলেও টিমটিম করে জ্বলে উঠছে একটা-দুটো আলো। জঙ্গলের মধ্যে আলো? ভাস্করদা জানালেন, ওখানে বনকর্মীদের স্টাফ কোয়ার্টার, তারই আলো জ্বলছে। যাবো একদিন নিয়ে-বললেন।নদী পার হয়ে যেতে হয়।

    আকাশের বুকেও একটা-দুটো করে তারা ফুটে উঠছে। এখন ফেরার পালা। ঘন অন্ধকার। টর্চ জ্বালিয়ে ফিরছি। একটা -আধটা নাইটজার বা স্লো লরিস কি হঠাৎ করে চোখে পড়তে পারে না? কিম্বা সাঁৎ করে হয়তো একটা ফিশিং ক্যাট বা গোল্ডেন ক্যাট চলে গেল! কপাল ভালো থাকলে লেপার্ডই বা নয় কেন !

    কিক কিক করে একটা পাখী ডেকে উড়ে গেল। এখন অতল অন্ধকার। অতল শান্তি ও নীরবতা। ওপারে রয়াল মানসের স্টাফ কোয়ার্টারে হয়তো লোকজন গরম ভাত চাপিয়েছে। ভাতের সুগন্ধে ম ম করছে জঙ্গল। ঝিঁ ঝিঁ পোকার রিন রিন আওয়াজ চারিদিকে, যেন পূজারী বামুন জঙ্গলের মধ্যে মন্দিরে বসে খুব জোরে জোরে ছোট ঘন্টা বাজাচ্ছে। এই শান্তির মধ্যে, অন্ধকারের মধ্যে, জঙ্গলের গন্ধ- শব্দ আর নিঃশব্দের মধ্যে সারা দিনের শ্রম, সারা দিনের অপমান ধুয়ে ফেলা যায়।

    সন্ধ্যার সে শান্ত উপহার।




    গ্রেট করমোর‌্যান্ট নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে
    ------------------------------------------------------



    ব্লু রক থ্রাশ-নদীর পাড়ে বসে আছে
    ---------------------------------------



    বেকি নদীর বুকে সূর্যাস্ত
    -----------------------------------
    সরি, একটু যান্ত্রিক গোলযোগ হল- এই যে সূর্যাস্ত'র ছবিঃ


    ফির সুব্‌হ হোগি
    ---------------------
    মানসে কারেন্ট নেই। সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা -সাতটা নাগাদ জেনারেটর চালানো হয়, রাত নটা-সাড়ে ন'টা নাগাদ বন্ধ হয়ে যায়, যেদিন যেমন লোকেদের ইচ্ছে হয়। আমরা যখন ফিরে আসলাম, তখন গোটা বাংলো ঘুটঘুটে অন্ধকার, শুধু ডাইনিং রুম বাদে, সেখানে সোলার আলো জ্বলছে। আমরা তো ওখানে খাবো না, আমাদের খাবার সাপ্লাই করবেন সৌমিত্রদা অ্যান্ড কোং। খেতে হবে নিচে নেমে গিয়ে, সৌমিত্রদা'দের ডরমিটরিতে গিয়ে। আজ রাত্তিরে আবার কচি পাঁটার প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

    আকাশ অজস্র তারায় ছাওয়া। আরো ভালো দেখা যাচ্ছে কেননা চারিদিক পিচ কালো, আগামীকাল অমাবস্যা। কালীপূজা। আকাশ ভরে এত তারা বহুকাল পরে দেখছি। সেই একবার দেখেছিলাম নদীয়া জেলায় এক ক্ষেত্রসমীক্ষা করতে গিয়ে, বেথুয়াডহরীতে এক বিশাল খোলা মাঠের মধ্যে একটি বাংলো প্যাটার্নের বাড়িতে রাত কেটেছিল।ধান কাটা হয়ে গেছে তখন, যতদূর চোখ যায় হা হা শূন্যতা। দিগন্ত চোখে পড়ে। সে রাতও কি অমাবস্যা ছিল? মাঠের মাঝখান দিয়ে হ্যারিকেন দোলাতে দোলাতে দুটি মানুষ ফিরে যাচ্ছিলেন, ওঁরা আমাদের খাবার দিতে এসেছিলেন। ওঁদের ছায়াগুলো হ্যারিকেনের দুলুনির সাথে সাথে ছোট-বড় হতে হতে একসময় বড় রাস্তায় উঠে মিলিয়ে গেল।

    বায়ুর চেয়ে ক্ষিপ্রগতি মন আবার ফিরে আসে বেকি নদীর জলে। রাদার, জলশব্দে। ও শীতে। আর একটু ঘন হয়ে বসি সবাই, গায়ের চাদর টেনে নিই। সাতটা বেজে গেছে, এখনো জেনারেটর জ্বলে নি কেন ? কর্মীরা ফ্ল্যাশলাইট হাতে নিয়ে ব্যস্ত ঘোরাফেরা করছে, এ তার জুড়ছে, ও তার খুলছে। জানা গেল গতকাল বোড়োল্যান্ডী কর্তার আদেশে সারা রাত আলো জ্বলেছে। দুবলা জেনারেটর এত চাপ নিতে পারে নি, সে বিগড়ে বসেছে। সে নিছক যন্ত্র, তার তো আর কর্তার ভয় নেই।

    আধা ঘন্টার চেষ্টায় জেনারেটর বাগে এল। ঘরে ঢুকে বসা গেল। বাইরে হাওয়ায় বেশ শীত কচ্ছে। আলো বেশ দুবলা। এবং চারিদিক পোকামাকড়ে ভর্তি; মথজাতীয় পোকাই বেশী। এতক্ষণে নড়বড়ে খাটের ওপরে টাঙানো মশারী'র উপযোগিতা বোঝা গেল।

    ঘুম পেয়ে যায়। বাকিরা নিচে নামে। চা-চর্চা হবে, গান-গপ্পো হবে। আমার ইচ্ছে করে না। আগের রাত প্রায় জেগে, আর আজকের দিনটা যত তাড়াতাড়ি ভুলতে পারি। কাল আবার সুয্যি উঠবে, এইটাই ভালো খবর। কম্বলের তলায় ঢুকি।


    গেছে এ পথ দিয়ে
    --------------------------

    বেড়াতে গিয়ে কিঞ্চিৎ সকালেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। সকাল বলতে এই চারটে -সাড়ে চারটেয়। তারপর শুয়ে থাকি, এপাশ ফিরি, ওপাশ ফিরি। জল খাই, বাথরুমে যাই। আলো ফোটার জন্য ছটফট করি। ওদিকে রাত্তির-টুংকাই গভীর ঘুমে ডুবে আছে। আলো ফুটলেই রাত্তিরকে টা টা করে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বেরোবো। এই আমিই নাকি উইকডে'তে সাড়ে আটটার আগে চোখ খুলতে পারি না।

    আজ কিন্তু সবাইকেই তাড়াতাড়ি উঠতে হয়েছে। কেননা ছ'টা নাগাদ গাড়ি করে বেরোতে হবে। যাই বলুন, জঙ্গলে এসে ঐ খোলা জিপসিতে না চড়লে কিন্তু জঙ্গলভ্রমণ হয়েছে বলেই মনে হয় না। আমার প্রথম জঙ্গলভ্রমণের কথা মনে পড়ে যায়। ২০০০ সালে সারিস্কা। জয়পুরে এ পি আই কনফারেন্স থেকে একটু সময় ম্যানেজ করে ঘন্টা আড়াইয়ের একটা জিপ ভ্রমণ। নীলগাই, সম্বর,চিংকারাদর্শন। জঙ্গলের মধ্যে টিলামত জায়গার নাম পান্ডুপোল, সেখানে নাকি বনবাসের সময় পান্ডবরা এসে থাকতেন। তার মাথায় হনুমানমন্দির। রাশি রাশি মানুষ সেখানে পূজা দিতে আসছেন। পুরুতমশাই লাল পোষাক পরা(লালই তো? কবেকার কথা !), দাড়ি-ওলা। সবাই এসে ঢং করে ঘন্টা বাজিয়ে যাচ্ছে। সিঁড়ি বেয়ে মন্দিরে উঠতে হয়। বাঁদরেরা প্রায়ই মানুষের অনুকরণে ঘন্টা বাজায়; ঘন্টার দড়ি বেয়ে দোল খায়। সেই গভীর বেঘো জঙ্গলে (তখনো সারিস্কা বাঘশুন্য হয়ে যায় নি; আমরা আসার কয়েকদিন আগেই এক সায়েব না মেম'কে বাঘে টেনে নিয়ে গিয়েছিল) এই ঘন্টার আওয়াজ, বনের হাওয়া, পাতার খসখস, হরিণের কল, পাখীর ডাক-সব মিলিয়ে সে এক অদ্ভুত সিম্ফনি। জঙ্গলের আওয়াজ সেই প্রথম শোনা। জঙ্গলের ডাক। এখনো নিয়ম করে ডাকছে। ডেকেই চলে।প্রত্যেক বছর তাই শুনে দৌড়তে হয়।

    জলখাবার ফিরে এসে খাওয়া হবে, এখন শুধু গরমাগরম চা আর কুকি খেয়েই গাড়িতে ওঠা। একটি হুডখোলা জিপসি, অন্যটি একটি বড় গাড়ি। আমরা জনাতিনেক ক্যামেরাম্যান ও সৌমিত্রদা বড় গাড়ির ছাদে চেপেছি, বাকিরা জনা-পাঁচেক জিপসিতে, অন্যরা বড় গাড়ির ভেতরে। বালকদের প্রবল বায়না, তারা গাড়ির মাথায় চড়বে। চড়েওছিল, ফেরবার সময়। আমরা গাড়ির ছাদে ক্যারিয়ারের ফাঁকে ফাঁকে পা ঢুকিয়ে বসেছি। হাতে ক্যামেরা নিয়ে তৈরী সব। জিপসি আগে আগে, আমরা পেছনে।

    গাড়ি একটু এগোতেই লালচেমত একটা কি জন্তু দৌড়ে গেল রাস্তার ওপর দিয়ে। ক্যামেরা তুলবার আগেই সে হুপ করে লাফ দিয়ে গাছের নিচু ডালে, সেখান থেকে মগডাল। ক্যাপড্‌ লাঙ্গুর! ছবি উঠল বটে, তবে বলবার মত কিছু না। এক তো অনেক উঁচুতে, তার ওপরে ঠিক আলো'কে পিছনে নিয়ে। কালোমত ছবি। আমাদের গাইডসায়েব বললেন-হবে হবে ! ক্যাপড লাঙ্গুর এখানে প্রচুর আছে।

    বাঁক ঘুরতেই সেই অপরূপ দৃশ্য। জঙ্গলে বেড়াতে এসে এ ছবি দেখতে না পেলে মন ভরে না। সেই শিশিরে ভেজা সবুজ, গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে ভোরের সূর্যের আলো সেই সরু-মোটা নানান রে-তে ভাগ হয়ে এসে পড়ছে। দেখে দেখে আশ মেটে না। ভাস্কর খুব ভালো ছবি পেয়েছে এর।

    দুয়েক মিনিট যেতে না যেতেই দেখি জিপসির সামনে রেড জাঙ্গলফাউল রাস্তার ওপরে ঘোরাফেরা করছে। ছেলে-মেয়ে দুজনেই। আমাদের গাড়িই মনে হয় এই রাস্তা দিয়ে প্রথম বেরিয়েছে, নইলে এতক্ষণে এ ঝোপে ঢুকে যেত। খুব চটপটে আর সতর্ক পাখি, এদের গৃহপালিত ও গৃহভোজ্য জাতভাইদের মত একেবারেই নয়। কতবার হাত নেড়ে জিপসিকে বললাম থামাতে, তা অনুলিপিরা সেসব শুনলে তো ! পাখিরাও চলন্ত গাড়ি দেখে ঝপ করে ঝোপে ঢুকে গেল। আমরাও একটা ভালো ছবি থেকে বঞ্ছিত হলাম। এত কাছ থেকেও ওরা দেখতে পেল না, হয় নাকি! পরে জেনেছিলাম, দেখতে ঠিকই পেয়েছিল, কিন্তু-আরে দূর ! এ তো জাঙ্গল ফাউল! এর ছবি তুলে হবেডা কী ! বলে ঘেন্নাপিত্তি করে গাড়ি আর থামাতে বলে নি।

    কিছুদূর যেতে গাড়ি আপনি থেমে গেল। প্রথমে আমাদের গাড়ি, পরে দাঁড়াও ! দাঁড়াও ! আওয়াজ শুনে জিপসিও। ব্যাপারখানা কি? কাছেপিঠে তো জন্তুজানোয়ার কিছু দেখা যাচ্ছে না! সৌমিত্রদাদা লাফ দিয়ে নেমে পড়েছেন দেখছি। কাঠি হাতে নিয়ে মাটির দিকে দেখাচ্ছেন। বাঘের পায়ের ছাপ ! টাটকা। হয়তো আজ ভোরবেলাতেই এ পথ দিয়ে হেঁটে গেছেন তিনি। বাঘ নয়, বাঘিনী। আর একটু এগোতে চিতাবাঘের পদচ্ছাপ মিলল, তবে সে কিছুদিনের পুরনো। সাধারণতঃ বনের যে অংশে বড় বাঘ থাকে, সেখানে চিতাবাঘ আসতে চায় না চট করে।

    হায় হায় ! এত কান্ড করে শেষে কিনা বাঘের পায়ের ছাপ ! ন্যাজের একটা ডগাটুকু অবধি না !

    এই সেই ডর্মিটরি। দিনের মধ্যে পঞ্চাশবার আমাদের এখানে নামতে হয়
    --------------------------------------------


    ভোরের ভ্রমণ
    -------------------

    না দিদি ! যা ভাবছেন, তা নয়। লেপার্ডের পায়ের ছাপ
    ----------------------------------------------------------
    বাঘ নেই তাই বাঘের মাসী
    ----------------------------

    আমরা যাচ্ছি কুরিবিল ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। এর চারপাশের বিশাল গ্রাসল্যান্ডে গন্ডারের দেখা মেলে হামেশাই। কিন্তু গন্ডারের চেয়েও আমাদের বেশী উৎসাহ অন্য একটি প্রাণীর জন্য। বেঙ্গল ফ্লোরিকান। বাস্টার্ড প্রজাতির এই পাখী দিনদিন কমে আসছে। এই মুহূর্তে সে IUCN এর ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জার্ড লিস্টে রয়েছে। ২০১৩ সালে সারা পৃথিবী জুড়ে এদের সংখ্যা ছিল ১৫০০-র কম।

    রাস্তার দুধারে গাছের তোরণ। মাঝেমধ্যেই ডালপালা এসে মাথায় ঠোক্কর দিয়ে যায়।কুরিবিল কাছে আসতেই অবশ্য গাছেরা দূরে সরে যায়। চারপাশে অপার খোলা জায়গা। অনেকক্ষণ বাদে এতটা মুক্ত প্রান্তর দেখতে পেলাম। দূর থেকে দেখি দুটি গন্ডার মুখ বুজে ঘাস খাচ্ছে। টাওয়ার থেকে বেশী দূরেও নয় তারা। পটাপট টাওয়ারে ওঠা গেল।রেলিংয়ে আবার নানান ধরণের অ্যান্টিলোপের শিং-সমেত খুলি সাজানো রয়েছে। খুলি দেখে এদের চেনার মত জ্ঞানগম্যি আমার নেই।

    বেশ খানিকক্ষণ ছবি তোলার পর মনে হল- না! জমছে না। নিচে নেমেই বা কেন তুলব না, বিশেষ করে গণ্ডাররা যখন এত কাছে। দেখেও তো তেমন ঝগড়াটে মনে হচ্ছে না; ভাস্কর তো ঐ যে নিচে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে, কই কিছু তো বলছে না!। অতএব দলবল সমেত নিচে নেমে আসা হল; তারপর চলল অনেক সময় ধরে নানান বিভঙ্গে , বেঁকিয়েচুরিয়ে গন্ডার-শুটিং। এক্কেবারে লুটি তো ভান্ডার। বনরক্ষীরা প্রথমে কয়েকবার -কাছে যাবেন না! বললেও বোঝা গেল, ওসব এমনি এমনি বলা, কাছে গেলেও কিছু বলবেন না। তাহলে আরেকটু কাছে যাওয়া যাক; তারপর আরো একটু। পেছন থেকে বৌয়েরা বলতে থাকে-আর যেয়ো না, এই আর যেয়ো না। কিন্তু কিছুসময় পরে ভাস্কর না শাঁওলি কে যেন সত্যি বেশ আপ , ক্লোজ অ্যান্ড পার্সোনাল হয়ে পড়ে। এবার আমাদেরই মনে হয় ব্যাপারটা ভালো হচ্ছে না। গন্ডার যদিও চোখে খুবই কম দেখতে পায়, কিন্তু ঘ্রাণশক্তি প্রবল; নিশ্চয় আমাদের দিক থেকে হাওয়া বইছে না বলে টের পাচ্ছে না। কিন্তু যদি টের পায়? গন্ডারের গোঁ বড়ই মারাত্মক, কাজিরঙ্গায় তার প্রমাণ পেয়েছি, প্রায় আধ মাইল খামোখা আমাদের জিপকে দৌড় করিয়েছিল। তার আগের দিন নাকি জিপ উল্টে দিয়ে একজন বনরক্ষীকে মেরেও ফেলেছিল। এখানকার গণ্ডারেরা অবশ্য দেখতে পাচ্ছি অনেক ভদ্র, সাত চড়েও রা কাড়ে না টাইপ। ঘাস খেয়ে যাচ্ছে তো খেয়েই যাচ্ছে। আর তাদের গায়ে-মাথায় বসা জাঙ্গল ময়নারা পোকা খুঁটে যাচ্ছে, খুঁটেই যাচ্ছে। ভালোই একটা ফটো সেশন হল, যা হোক।

    কিন্তু সে কই? যাকে দেখতে আসা? রক্ষীরা জানালেন, বেঙ্গল ফ্লোরিকানের সময় এটা নয়। ব্রিডিং সীজনে তাদের দেখা মেলে, মে থেকে অগাস্ট মাস অবধি। যা, মিস হয়ে গেল, আর কি মানস আসা হবে? কাজিরঙ্গা কিম্বা ডিব্রু শইখোয়ায় যদি দেখা পাই!

    এইখানে সবাই একটু হাত-পা ছাড়িয়ে নিচ্ছে,নিজেদের মধ্যে ফটো তোলাতুলি চলছে। বাচ্চারা এবার গাড়ির মাথায় উঠেছে, ক্যাপ উল্টো করে পরে হাতে লাঠি নিয়ে বালকবীরের মত তারা পোজ দিচ্ছে; চারিদিক থেকে একগাদা শাটারের ক্লিক ক্লিক। আমি একটু তফাতে যাই-ওয়াচ টাওয়ারের নীচে বেশ সুন্দর চাষাবাদ হয়েছে-পুঁই মাচা, লাল শাক, বেশ কিছু লেবু গাছ, অজস্র লেবু ফলেছে তাতে।সামনেই তুলসী মঞ্চ। একটা মেনি বেড়াল পায়ে পায়ে ঘুরছে। বেশ মিশুকে, আমাদের গাড়ির টায়ারের ওপরেও ঘুরে পরখ করে দেখল বাসযোগ্য কিনা। বাঘের ছবি তো আর হল না, খালি ন্যাজ দেখেই তুষ্ট, অগত্যা বাঘের মাসিকেই তুলি। বনবেড়ালের ছবি বলে পরে চালিয়ে দেওয়া যাবে। আর অ্যাদ্দিন বনে থেকে থেকে কিছু কি আর বনবেড়ালত্ব পায়নি?




    বেঙ্গল ফ্লোরিকানঃ নেট থেকে
    --------------------------------



    ভদ্রসভ্য রাইনোটি
    ---------------------



    বাঘের মাসী
    ----------------------
    লাদেন! লাদেন !
    -----------------------

    হেমন্তের অরণ্যে আমরা কয়েকজন বিফল ক্যামেরাম্যান। বেঙ্গল ফ্লোরিকানের কোর্টশিপ ডান্স বা পুর্বরাগ নৃত্য ক্যামেরাবন্দী করা গেল না। সে এক আশ্চর্য জিনিষ। পুরুষ পাখিটি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে খানিক খানিক ইতিউতি তাকায়, আর থেকে থেকে স্পট জাম্প দিতে থাকে। প্রাণীকুলের অলিম্পিকে স্পট জাম্পিংয়ের সোনা মনে হয় এদের বাঁধা। এদের একমাত্র যাকে বলে Run for their money দিতে পারে এদেরই সগোত্রীয় লেসার ফ্লোরিকান। ইউটিউবে লেসার ফ্লোরিকানের নাচ রয়েছে; দেখে নিতে পারেন-https://www.youtube.com
    /watch?v=bs3_KSt_0-Y
    বেঙ্গল ফ্লোরিকানের নৃত্য ক্যামেরায় তুলে রাখার সৌভাগ্য মনে হয় খুব লোকেরই হয়েছে। যে হারে দিন দিন এরা কমে আসছে! ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফার জেরেমি হলডেনের একটা কথা সেদিন পড়ে বেশ মনে লাগলো, কোট করবার লোভ সামলাতে পারছি নাঃ Seeing a rare creature is always a thrill, but for me it is often accompanied by a sense of sadness, too. I realised while I was looking at the males displaying – driven by their instincts and completely unaware of how precarious their situation is – that if this population does decline to a single male, he would continue to display and scan the horizon for rivals or a cryptically-coloured mate. A futile activity, but he would have no choice.

    যাক ! আপাততঃ আমরা ফিরে আসছি। মাঝে একবার পানবাড়ি রেঞ্জ থেকে অন্য একটি রেঞ্জে (সম্ভবতঃ দইমারি)যাওয়ার চেষ্টা চালানো হয়েছিল, কিন্তু রাস্তার ওপর দিয়ে সরু নদী বয়ে যাওয়ায় সে চেষ্টা ছাড়তে হল। সরু হলেও সে এখনো বেশ গভীর, গাড়ি করে তাকে পেরিয়ে যাওয়া যাবে না, জলে-কাদায় গাড়ির চাকা বসে যাবে।
    ফেরা হচ্ছে একটু অন্য রাস্তায়; কেন , সে কথা এখন ভুলে গেছি। কিন্তু কবি বলেছেন নান্য পন্থা বিদ্যতে অয়নায়, অর্থাৎ কিনা অন্য পথে গেলে উচিত শিক্ষা পাবে বাপু, আর কবির সেই বিদ্যেই আমরা কিনা বেমালুম ভুলে গেলাম। ফল যা হওয়ার তাই হল- কর্ণের রথচক্রের মত বড় গাড়ির চাকা মেদিনী গ্রাস করিল। আগের বর্ষার জলে-কাদায় মানস এখনো নরমসরম। ফেরার পথে ঠাঁইবদল হয়েছে, বাচ্চাদের তুমুল বায়নার কাছে হেরে গিয়ে আমরা বড়রা ক'জন এখন জিপসিতে, বাচ্চারা ও তাদের মাসীরা জিপের মাথায়। হাজার ঠেলাঠেলিতেও গাড়ি কিছুতেই উদ্ধার হয় না, এদিকে হাল্কাফুল্কা জিপসি সেসব পথের বিপদ পেরিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে শুকনো রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। দুপাশে ঝোপঝাড় ঘন হয়ে এসেছে। কানের পাশ দিয়ে , নাকের পাশ দিয়ে নানারকম প্রজাপতি-মথ- পোকামাকড় উড়ে যাচ্ছে। নীরবতা। মানুষজনের গলার আওয়াজ। ইঞ্জিনের গোঁ গোঁ। দেখি তো-বলে দেবর্ষি জিপসি থেকে নেমে গেল। কত দীর্ঘ, দীর্ঘক্ষণ বাদে সমবেত জয়োল্লাস। বাচ্চাদের গলার আওয়াজই বেশী। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তার বাঁক থেকে গাড়ির মুখ দেখা গেল; ছাদের ওপরে বাচ্চারা লাঠি হাতে, মাসীগণের মুখে হাসি। শোনা গেল শাঁওলিমাসীকে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেই গাড়ি নাকি কাদা থেকে উঠে এসেছে, শাঁওলী আর একটু হলেই পপার চ।

    ফিরে এসে লুচি-তরকারি দিয়ে জলখাবার। খেয়ে উঠে সৌমিত্রদা-চলুন , একটু পায়ে হেঁটে ঘুরে আসা যাক! বলে আমাদের কয়েকজনকে নিয়ে চরতে বেরোলেন। বাংলোর হাতার মধ্যেই জঙ্গলের একটা উঁচু , সরু ট্রেইল চলে গেছে বেশ খানিকটা দূর, সেই পথ ধরে যাওয়া। যদি কিছু পাওয়াটাওয়া যায়; এখানে অনেকসময় বার্কিং ডিয়ার, সম্বরটম্বর থাকে। কিছু না হোক আসাম ম্যাকাক আর ক্যাপড লাঙ্গুর তো পাবেনই;আপনার সকালের ছবি তুলতে না পারার দুঃখ দূর হয়ে যাবে-সৌমিত্রদা উবাচ।

    কিন্তু ঐ যে বললাম,হেমন্তের অরণ্যে আমি একজন ব্যর্থ ক্যামেরাম্যান ! গোটা রাস্তাটা জুড়ে একটিও অ্যান্টিলোপ তো দূরে থাক, একটা বাঁদরের কানের লতি অবধি দেখা গেল না। শুধু রাশি রাশি প্রজাপতি আমাদের সঙ্গে সঙ্গে নেচে নেচে উড়ে চলেছে; পাখপাখালি-সেও নেই। ট্রেইলটি হঠাৎ করে শেষ হয়েছে এক জায়গায়, সেখান থেকে সে খাড়া নেমে গেছে একটা মরা নদীর চওড়া সোঁতায়, সেখানে রাশি রাশি নুড়ি-পাথর আর বালি। সেইখানে সৌমিত্রদা একটি ক্রেস্টেড সার্পেন্ট ঈগল স্পট করলেন; কিন্তু ক্যামেরা তোলার আগেই সে ধাঁ। রাস্তা বড়ই অপুর্ব, কিন্তু গোটা পথে তুলে রাখার মত একটাই ছবি হল- একটি ওয়েভার অ্যান্টের বাসা। কত যত্ন করে রাশি রাশি পিঁপড়ে লার্ভাল সিল্ক দিয়ে পাতার পর পাতা মুড়ে এমন অদ্ভুত বাসা বানায়, দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়।




    বসে বসে আর কী করবো, প্রজাপতির ছবি তোলা ছাড়া? উদিকে তখন গাড়ি-উদ্ধার পর্ব চলছে
    -----------------------------------------------



    হয়েছে, হয়েছে, রথচক্র মেদিনীগ্রাসমুক্ত হয়েছে ! জনতার হাসি কী !
    -------------------------------------------------



    ওয়েভার অ্যান্টের বাসা
    ------------------------------
    খেয়েদেয়ে উঠতে উঠতে বেশ দেরী হয়ে যায়। মধ্যাহ্ন কেটে গিয়ে অপরাহ্ণ। আলো কমে আসছে দ্রুত। এক্ষুনি বেরিয়ে না পড়লে কিছুই দেখতে পাবো না। এক্ষুনি বেরোলেও কিছু দেখতে পাবো কিনা সন্দেহ।
    ঝাঁপিয়ে পড়ে গাড়িতে উঠি। গাড়ি যাচ্ছে বুড়াবুড়ি টাওয়ারের দিকে। ঐখানে হাতির পাল আসে প্রায়ই। আজ কি আসবে?

    বুড়াবুড়ির কাছে প্রায় চলে এসেছি, এমনি সময় ফিরতি গাড়ির দেখা মেলে। সে গাড়ির গাইড অর্থপূর্ণ হাসি হাসে। বলে-যাও, যাও, তাড়াতাড়ি চালায়া যাও। হাতি। এই এতগুলা।
    অ্যাড্রিনালিন রাশ বেড়ে যায়। গাড়ি সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছে। এসে গেলাম বুড়াবুড়ি। কুরিবিলের মত অমন খোলা প্রান্তর নেই। ছোট্ট একটু মাঠ। মাঠের চারপাশ জুড়ে হাতির দল। নানা সাইজের হাতি। কিন্তু এখন গোধূলি। আর হাতিরা ফিরে যাচ্ছে। ওয়াচ টাওয়ারে ওঠার ভালো বন্দোবস্ত নেই। কম আলোয় ভালো ছবিও হয় না। আরেকটু আগে এলে কী ক্ষতি হত ভেবে হাত কামড়াচ্ছি। এমন সময় কে বলে ওঠে-দেখো!

    দেখি, হাতির দল ফিরে আসছে। কেন কে জানে। বেশ সন্দেহজনক তাদের নৈকট্য। আমরা ওয়াচ টাওয়ার থেকে নেমে আসি। মাঠেই দাঁড়িয়ে আছি। যেটুকু যা ছবি ওঠে। সৌমিত্রদা গল্প জুড়েছেন- হাতিদের সাবধান করে দেওয়ার ভঙ্গি ভারি অদ্ভুত। প্রথমে হাঁটু গেড়ে মাটিতে পা ঠোকে। তারপর ট্রাম্পেটিং। তাতেও কাজ না হলে তেড়ে আসে। সেটা কিন্তু চার্জ করা নয়। কিছুদূর তেড়ে এসে থেমে যায়। মানে , এই শেষবারের মত ওয়ার্নিং দিলাম। চলে যাও, নইলে....

    হ্যাঁ, নইলে কী সে তো বোঝাই যায়। চার্জ করতে চাইলে হাতি তো আর ওয়ার্ন করবে না। যেমনটা খ্যাপা হাতি করে। মস্ত হাতি। হাতি খুব নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারে। অতবড়ো জানোয়ার! কখন ঠিক ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে, কেউ বুঝতে না বুঝতেই তুলে আছাড়। কিম্বা পদপিষ্ট।

    এই দলটায় প্রায় প্রায় পনেরো-কুড়িটা মত হাতি রয়েছে। কাচ্চাবাচ্চা সমেত। বাচ্চাদের মায়েরা মাঝে মধ্যে ডেকে উঠছে। গা ছমছমে বৃহংণ। প্রাক সন্ধ্যার আধো আলোয় কেমন কেমন লাগে। একটি বিশালাকার দাঁতাল হাতি তাদের পাহারা দিয়ে চলেছে। সজাগ চোখ এদিক-ওদিক ঘুরছে। একজন বনকর্মী বললেন- লাদেনটা ! সৌমিত্রদা বললেন- এ লাদেন নয়। আসল লাদেন মারা গেছে। সে সাইজে আরো বড় ছিল। অনুলিপি বলছে, লাদেন কেমন করে হবে! হাতিদের লিডার তো মেয়ে!

    লিডার মেয়ে! এতকাল তাহলে ভুল জানতাম! চিরকালই যে যুথপতি শব্দটা শুনে এসেছি! মেয়েরাও দাঁতাল হয় তাহলে। পরে বাড়ি ফিরে পড়বো এবং জানবো, হাতিদের সম্বন্ধে কত ভুল ধারণাই ছিল এতকাল। হাতিদের সমাজ গহনভাবে মাতৃতান্ত্রিক। যুথের সবচেয়ে প্রাচীন ও সবচেয়ে বড় মেয়ে হাতিটিই-যুথপতি নয়-যুথনেত্রী হয়। পুরুষ হাতি, সে চির উদাসীন, পাগলা ভোলার মত এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়; টেস্টোস্টেরনের অত্যধিক ক্ষরণে কখনো কখনো "মস্ত" হয়ে ওঠে। সে অবস্থায় সে প্রবল উন্মাদ এবং হিংস্র। অন্যদিকে যুথনেত্রী ঠান্ডা মাথায় দল চালায়, মেয়েদের শেখায় সন্তানপালন; জানে স্বাদু ঘাস ও মিষ্টি জলের সন্ধান। মাইলের পর মাইল রাস্তা চিনিয়ে এই প্রাজ্ঞ প্যাকিডার্ম তার দল ও চলমান সমাজকে পৌঁছে দেয় নিরাপদ চারণজমিতে।

    কীসব ভুলভাল! করবেটে ধিকালার গ্রাসল্যান্ডে অমনি এক বিশালাকার হাতি দেখেছিলাম। রাস্তার দুদিকে অজস্র জিপ দাঁড়িয়ে রয়েছে, তারি মধ্যে সে তার দলবলকে পার করে দিচ্ছে। অন্য হাতিরা ওপারে চলে গেছে রামগঙ্গা নদীর পাড়ে সবুজ ঘাসে ছাওয়া প্রান্তরে, সে কিন্তু রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়েই রয়েছে- নড়েও না, চড়েও না। মাঝেমধ্যেই ডাক ছেড়ে কয়েকটি মেয়ে হাতি ওপাশ থেকে এপাশে এসে তার সঙ্গে শুঁড়ে শুঁড় ঠেকিয়ে কীসব পরামর্শ করে যাচ্ছে। সে আবার যেন তাদের ভরসা দিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিচ্ছে। নিজে কিন্তু নট নড়নচড়ন। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে মাথা ও শুঁড় হেলিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা ভাবছি-মর্দ হো তো অ্যায়্সা। কেমন পাহাড়ের মত চেহারা ও সাহস নিয়ে পুরো দলটাকে পার করছে। আর কী প্রবল আত্মবিশ্বাস ! যে, যো হোগা দেখ লেঙ্গে। সবই ঠিক, কিন্তু এইসব চারিত্রিক ট্রেইট-এ হাতিদের মধ্যে একমাত্র মহিলাদেরই হক। বিশেষ করে দলনেত্রীর।

    আমরা হয়তো ওদের কমফর্ট জোনের লক্ষণরেখা টপকে গিয়ে থাকবো। কেননা লাদেন এবার একটু অন্যরকম বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখাতে থাকল। বাকি হাতিদের কভারে রেখে সে এবার স্ট্রেট আমাদের দিকে এগিয়ে আসতে থাকল। একদম স্টেডি পায়ে, দৌড়ঝাঁপ নয়, তাড়াহুড়ো নেই। এতক্ষণ ওরা আর আমরা প্যারালালি ছিলাম;খুবই কম দূরত্ব, কিন্তু তাও প্যারালালি। কিন্তু এবার হাওয়ায় বিপদের গন্ধ ভাসছে। লাদেনের সঙ্গে আমাদের দূরত্ব আরো কমে আসছে; কিম্বা বলা ভালো, বিপজ্জনক নৈকট্য ঘনিয়ে আসছে। হাড়ে একটা শিরশিরানি টের পাচ্ছি; আমরা সবাই পড়িমড়ি করে ওয়াচটাওয়ারে গিয়ে উঠলাম। ওয়াচটাওয়ারের পাশেই একটা বড় গাছ। লাদেন সে গাছের গায়ে এসে থামলো। ভাবুন একবার অবস্থাটা! একটি জীর্ণ ওয়াচ টাওয়ার, তাতে রাশি রাশি লোক (আমরা ছাড়াও আরো তিনটে পার্টি ততক্ষণে এসে জড়ো হয়েছে), আমাদের ভারেই টাওয়ারটির ভেঙ্গে পড়ার দশা। তার গায়ে গায়ে গাছ, আর সেই গাছের গায়ে গা ঘষছে একটি ভরন্ত হাতি, আর মাঝে মাঝেই জ্বলন্ত চোখ দিয়ে আমাদের দিকে তাকাচ্ছে। না চাইলেও তার চোখে আমাদের চোখ পড়ে যাচ্ছে আর বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠছে। আমাদের উপস্থিতি সে যে মোটে পছন্দ করছে না, এটা একেবারে আন্ডারস্টেটমেন্টের হদ্দমুদ্দ।

    এমন সময় বনকর্মী দুজন নিচের বাথরুমের টিনের দরজা একটা লাঠি দিয়ে পেটাতে শুরু করলেন; বলা বাহুল্য, ওঁরা নিচেই দাঁড়িয়ে আছেন। আর চীৎকার করতে থাকলেন-হঠ ! হঠ ! লাদেন, হঠ ! সাহস বটে! যেন পোষা কুকুরবেড়াল তাড়াচ্ছেন। ঢাল নেই তরোয়াল নেই, নিধিরাম সর্দার। ঐ তো টঙ্গের একখানি ঘর। আর অস্তর বলতে লাঠি। হয়তো বন্দুক আছে, কিন্তু সে তো চোখে দেখলাম না।দিনের পর দিন এমন নিধিরাম সর্দারেরাই এইসব জন্তুজানোয়ারদের আগলে রাখছেন। আর্মি জওয়ানদের থেকে এঁরা কম কিসে !

    পাঁচ-সাত মিনিট বাদে ঐ চীৎকারেই হোক কিম্বা গন্ধবিচার করে আমাদের নেহাত নিরিমিষ্যি মনে হওয়াতেই হোক, লাদেন একটু আলগা দিলেন। আমরাও আর এধার-ওধার না দেখে সটান গাড়িতে উঠে বসলাম। সৌমিত্রদা বললেন, চলো হে, চালিয়ে চলো! হাতিরা খুব বুদ্ধিমান হয়। অনেক সময় গাছের ডালপালা ভেঙ্গে মাটিতে বিছিয়ে দিয়ে রাস্তা আটকে দেয়। কারো মুখে কথাটি নেই। কাল ছিল মাতাল বোরোনেতা, আজ পাগলা হাতির দল।

    অ্যাডভেঞ্চারের একেবারে চূড়ান্ত।



    দেখুন ! লাদেনকে দেখুন !
    ----------------------------------------



    আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে ! খুব কম দূরত্ব। ওয়াচটাওয়ারে ওঠার আগে এটাই শেষ ছবি( আর হ্যাঁ ! একেই খুব কম আলো, তার ওপর ভয়ে-ভক্তিতে হাত কেঁপে গিয়ে থাকতে পারে। একটু নয়, অনেকখানি ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে হবে)।
    ------------------------------------------------

    ফিরছি অন্ধকারের মধ্য দিয়ে। মিশকালোর চেয়ে এক পোঁচ হাল্কা শেডের অন্ধকার। সৌমিত্রদা'র হাতের ফ্ল্যাশলাইট ঝলসে উঠছে এধার-ওধার। কিছুটা সেফটি মেজার হিসেবে, অনেকটা অন্ধকারের মধ্য দিয়ে যদি কিছু দেখতে পাওয়াটাওয়া যায়, এই আশায়। রাতবিরেতে ঘোরার ব্যাপারটা মানসে দেখলাম অনেক লিবারেল। করবেটে তো ছ'টা মানে ডট ছ'টাতে গাড়ি হুড়মুড়িয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকিয়ে দেবে। ট্যুরিস্ট সুরক্ষা ওখানে অনেক বেশী প্রাধান্য পায়। সবকিছুই বেশ অর্গ্যানাইজড। এর জন্য বলে আমার রামগঙ্গা নদীর তীরে গ্রাসল্যান্ডে সূর্য ডোবার সময় জন্তুজানোয়ারদের স্যিলুয়েট তোলা হল না। দেখেছিলাম ওরকম একখানা ছবি, রথিকা রামস্বামীর তোলা। ব্যাপক।

    তো মানসের সন্ধ্যায় ফিরে আসি। জঙ্গল মাঝেমধ্যেই ফালাফালা হয়ে যাচ্ছে ফ্ল্যাশলাইটের আলোয়। ঝিঁঝিঁপোকার রিনরিন আর গাড়ির চাকার আওয়াজ। এছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।হঠাৎ বাঁদিকে অনেকখানি উঁচুতে এক জোড়া হলদে-সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। একটি বিশাল সম্বর। ঐ অন্ধকারেও তখনো তার কনট্যুর কিছুটা হলেও বোঝা যাচ্ছে। বিশাল স্ট্যাগ। জটাজুটধারী প্রবীন ব্যক্তি। গায়ে আলো এসে পড়তেই সে হড়মড়িয়ে দৌড় লাগালো বনজঙ্গল ভেঙ্গে। ওয়া, জঙ্গলে নাইট সাফারির মত রোমাঞ্চকর আর আছেটা কী !

    তারপর থেকে সবাই কাছে-দূরে নানান আলো দেখতে পেতে শুরু করল। তবে কিনা সেসব হল গে চোখের ধাঁধা। কিন্তু এই ধাঁধা বলে উড়িয়ে দিতে দিতেই সত্যি সত্যি বেশ কয়েকজোড়া আলো দূরে দেখতে পাওয়া গেল। নড়ছে-চড়ছে, পালিয়ে যাচ্ছে না। যদিও বেশ দূরে। ড্রাইভার বললেন- বাইসনের পাল।

    বাংলোর কাছে এসে পড়েছি। ক্যাম্পাসের ঠিক বাইরে বনরক্ষীদের কোয়ারটারের আলো জ্বলছে। নদীর কুলকুল শব্দ আবার শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।

    এ রাত্রের মত আমাদের যাত্রা শেষ। আবার কাল ভোরবেলা।
    (লিখবার উৎসাহ ক্রমেই কমে আসছে। কিন্তু কিছুটা পিতৃত্ব'র দায়, কিছুটা রবিঠাকুরের বাঙ্গালিব্যাশিং ইত্যাদি মিলিয়ে লেখাটা কোনোক্রমে শেষ করতে চাই, এই আর কি।কত লেখাই আধখ্যাঁচড়া পড়ে রইল !)

    মাঙ্কিক্যাপ
    --------------------
    আগের দিনের সেই পুরনো ট্রেইল ধরে আরেকবার। এবার আমাদের দলপতির ইচ্ছে একটু অন্যরকম। ঐ ট্রেইল-এর শেষে একটি মরা নদীখাত রয়েছে আগেই বলেছিলাম-বালি আর পাথরে ভরা। সেই নদীখাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে যদি জলের ধারে পৌঁছনো যাওয়া যায়। সেখানে প্রাটিনকোলেরা ডিম পাড়ে। জলের ধারে গিয়ে পৌঁছলেই তারা নাকি বাসা ছেড়ে চ্যাঁ চ্যাঁ করে উড়তে থাকে। স্মল প্রাটিনকোল সম্ভবতঃ।

    এই যাত্রায় বেশী লোক নেই। আমি, ভাস্কর, অনুলিপি, শাঁওলি, দীপাণ্বিতা আর সৌমিত্রদা। বাকিরা কেন এল না মনে করতে পারছি না। দুপুরবেলা গাড়ি চড়ে ভুটানের দিকটা যাওয়া হবে। তাই হয়তো সকালটা গা এলিয়ে দিয়েছে।

    জঙ্গল শেষ হয়ে নদীখাত শুরু হয়েছে অনেকটা নীচে। হাঁচোড়-পাঁচোড় করে নামা হল। এবার ধু ধু বালি-পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটা। প্রবল শনশনে হাওয়ার দাপট। বালির ছোটোখাটো ঝড় বইছে যেন। শনের মত একধরণের ঝোপ গজিয়েছে, হাওয়ায় তাদের প্রবল মাথা দোলানি। নুড়ি আর পাথরের ওপর দিয়ে হাঁটতে অস্বস্তি লাগে। প্রতি মুহূর্তে মনে হয় এই বুঝি পা মচকালো। ঘরপোড়া গরু!

    অনেকদূর হাঁটা হয়ে গেল। জলের সন্ধান মেলে না। হাঁটতে হাঁটতে অনেকের হাঁপ ধরে যাচ্ছে নাকি! ঘাসঝোপের পাশে একটা কবেকার মরা গাছের গুঁড়ি পড়ে রয়েছে। তার ওপরে খানিক বসা হল। আশেপাশে কোনো জনপ্রাণীর সন্ধান নেই। শুধু কিছু শুকনো মাকড়সা ইলিবিলি হেঁটে বেড়াচ্ছে। মরুভূমির স্যান্ড ডিউনের মতই উড়ন্ত বালি এখানেও বালির ঢেউয়ের প্যাটার্ন বানিয়েছে। সেই বালির আল্পনার মধ্যে দিয়ে বাদামী রঙা কিছু ব্যাংয়ের ছাতা মাথা তুলেছে। ছবি তোলাতুলি হয়।

    অবশেষে জলের ধারে এসে পৌঁছই। না, প্রাটিনকোল নেই। কোত্থাও নেই। অন্য কোনো জলের পাখিও না। দূরে শুধু ক'টি ছটফটে খঞ্জনা। আবার হাঁটতে হাঁটতে ঐ চওড়া নদীখাত পেরোনো।

    জঙ্গলের মধ্যের সরু রাস্তা দিয়ে প্রায় বনবাংলোর কাছাকাছি এসে পড়েছি। সৌমিত্রদা'কে বললাম-কিরকম ব্যাডলাক ভাবুন , একটা ক্যাপড লাঙ্গুরের অবধি ঠিকঠাক দেখা পাওয়া গেল না। আসাম ম্যাকাক তো দূরে থাক। সৌমিত্রদা হঠাৎ থমকে গেলেন। তারপর ওপর দিকে তাকিয়ে বললেন-আপনার জন্যেই যেন বসে আছে। দেখুন।

    ওপরে তাকিয়ে দেখি একঝাঁক ক্যাপড লাঙুর। ছোট-বড়-বুড়োধাড়ি-সবে মা হয়েছে- শিগগির মা হবে-সব মিলিয়ে সে একদম ক্যাপড লাঙ্গুরের ছড়াছড়ি। এত ক্যাপড লাঙ্গুর দিয়ে আমাদের আজীবন সুখে-শান্তিতে কেটে যাবে। দিব্যি সুন্দর মাঙ্কি ক্যাপ পরে এডালে-ওডালে লম্ফঝম্প করে বেড়াচ্ছে। পেটটি নাদা পোয়াতি মা নড়ছে-চড়ছে না অবিশ্যি, এক জায়গায় বসে ফল-পাতা চিবিয়ে যাচ্ছে; আদ্ধেক খাচ্ছে, আদ্ধেক ফেলছে। একটি পুঁচকে ছানা অতি ইনকুইজিটিভ, মা'র কোল ছেড়ে মাঝেমধ্যেই বেরিয়ে এসে জুলজুল করে দুনিয়াদারি চেয়ে চেয়ে দেখছে।




    <

    <

    <




    (আগের দিন লেখাকে যে জায়গায় ছেড়ে এসেছি, সেখানে তার থাকার কথা ছিল না মোটেও; তরতরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল আরো কিছু দূর। কিন্তু ঠিক সেখানে একটা খারাপ ফোন কল এসে তার গতি আটকে দিয়ে গেছে। মন অশান্ত করে দেওয়া ফোন কল। তবে কিনা খারাপ সময় কেটে যায়, লেখারা জেগে থাকে; বুলগাকভ ঠিক এরকম কোনো কথা বলেন নি, যদিও বলা উচিত ছিল। এই তো এখন আমি কম্পিউটারের সামনে, গায়ে কম্বল জড়িয়ে, চেম্বার কেটে লেখা লিখছি, এইমাত্র চিঁড়ে ভাজা, কমলা লেবু আর চিকেন পপকর্ণ খেয়ে উঠলাম; পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ!)

    প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে
    -------------------------------------

    টুপি পরা বাঁদরেরা আমাদের অনেক পোজ দিচ্ছে। আরো ভালো ছবি পাওয়ার জন্য ভাস্কর ক্যামেরা হাতে উঁচু রাস্তা থেকে নিচের জঙ্গলতলায় নেমে গেল। আমিও তার পিছুপিছু। নামতেই দেখি স্যাঁতসেঁতে জঙ্গলের মেঝেতে পড়ে-থাকা কাঠের গুঁড়িতে অপরূপ হলদে-খয়েরী রঙা ব্যাঙের ছাতা গজিয়েছে, কোনো মায়াবী কুমোরের চাকে গড়া পোড়ামাটির স্কাল্পচার যেন। মানসের একটা বড় অংশ আর্দ্র পর্ণমোচী গাছের জঙ্গল; আমরা এখন সেরকমই একটি অংশে দাঁড়িয়ে আছি। সেই বনতল ভেজাভেজা; পচা পাতা, বাহারী ফার্ণ আর ব্যাঙের ছাতা দিয়ে সাজানো।

    বাঁদরদের ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করে না, তারাও আমাদের ছেড়ে নড়ছে না তেমন। বুঝেছে, আমাদের হাতের ক্যামেরাগুলো বন্দুকটন্দুক বা ঐরকম সন্দেহজনক কিছু নয়, আর হলেও ওরা তার রেঞ্জের বাইরে। তাই তারা বেশ স্বচ্ছন্দ। কিন্তু এগিয়ে যেতেই হয়। দুপুরে ভুটানভ্রমণ আছে, তার আগে বাচ্চাদের প্রতিস্রুত নদীতে-স্নান আছে। অনেক কাজ।

    এতক্ষণে জঙ্গল জেগে উঠেছে। যেদিকে তাকাই, পাখীদের কিচিরমিচির আর ওড়াউড়ি, ছোট ছোট জন্তুজানোয়ারদের ছোটাছুটি। বেশ কয়েকটা ব্ল্যাক ক্রেস্টেড বুলবুল দেখলাম, তবে তেমন ভালো ছবি হল না। সৌমিত্রদা একটা ট্রী-ক্রিপার দেখালেন, কিন্তু সে বড় লাজুক, ছবি তুলবার অবসরটুকু দিল না। তার দিকে তাক করতে করতে অন্য একটি পাখী আমার লেন্সে ধরা পড়ে গেল-চেস্টনাট বেলিড নাটহ্যাচ; আপনমনে গাছের গুঁড়ির বাকল খুঁটে খুঁটে পোকা খাচ্ছে। অবশ্য সেদিক থেকে দেখতে গেলে, নাটহ্যাচরা ট্রিক্রিপারের একধরনের কুটুমই বলা যেতে পারে। একটা কাঠবেড়ালী দেখলাম, খুব ক্ষিপ্র, লাফ দিয়ে লাফ দিয়ে গাছের গুঁড়ি বেয়ে উঠছে, যেন প্রায় উড়ে যাচ্ছে। যদিও উড়ুক্কু কাঠবেড়ালী নয় মোটেই, কিন্তু আমাদের চেনা পিঠে তিন ছাপ-ওলা পাম স্কুইরেলের মত লাগছিল না। পাম স্কুইরেলের পক্ষে অনেক ছোট ও সরু ন্যাজ তার। সৌমিত্রদাও চিনতে পারলেন না; পাম স্কুইরেলের কোনো জুভেনাইল হবে হয়তো। নেট ঘেঁটেও ঐ ধরণের অচেনা কোনো কাঠবেড়ালীর অস্তিত্ব মানসে আছে বলে জানতে পারি নি। এমনটা নিশ্চয় নয়, যে আমরা কাঠবেড়ালীর কোনো নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেছি !

    জঙ্গল ছেড়ে খোলা জায়গায় বেরিয়ে এসেছি, একটা গাছের দিকে তাকিয়ে সৌমিত্রদা উত্তেজিত-দেখুন ! দেখুন ! দেখি দুটি মোটকা সোটকা গুল্লু গুল্লু কাঠবেড়ালী জাতীয় প্রাণী গাছ বেয়ে ওঠানামা করছে। পুরুষ ও মেয়ে প্রাণী নিশ্চয়, কেননা উভয়ের মধ্যে প্রেমপর্ব চলছে মাঝেমধ্যেই। সৌমিত্রদা বললেন-হোরি বেলিড স্কুইরেল (hoary bellied squirrel)। মনে হয় বাসা বানানোর তালে আছে।

    মালয়ান জায়েন্ট স্কুইরেল দেখতে পাওয়া গেল না; কিন্তু তাও আমরা জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এলাম তৃপ্ত ও সুখী-যা পেয়েছি তার অনেক কিছুই আমাদের লিস্টে ছিল না। তবে কিনা আসাম ম্যাকাক দেখা হল না। অবশ্য আগামীকাল সকালটা তো রয়েছে ! আর ভুটানের জঙ্গলে গোল্ডেন লাঙ্গুর দেখবার আশা আছে, তারা নাকি আজকাল মানসের ভারতীয় স্ট্রেচকে অ্যাভয়েড করে ভুটানবাসী হয়ে গেছে-কেন কে জানে ।

    বাংলোর হাতায় এসে পৌঁছেছি-নদীর ওপাড়ে তাকিয়ে মন ভরে গেল। এক গাদা বুনো মোষ (wild water buffalo) জল খেতে এসেছে। জল খাচ্ছে, জল ছেটাচ্ছে, গায়ে কাদা মাখছে ইত্যাদি। আর শুধু কি তাই? আজ দিনটাই দেখছি দুষ্টু কিউপিডের- একটি বড়সড় মোষ মুহুর্মুহু জনৈক নারী ভঁইসের প্রতি তার প্রেমনিবেদন করছে-বেশ আদিম ও জৈবিক প্রেম। বদ সেঁজুতি ওপরের ঘর থেকে আওয়াজ দিল-ইন্দ্রনীল, দেখছিস?
    আমি বললাম-হুঁ ! শুধু এই নয়, আরো দেখেছি। যেমন বুনো মোষ, তেমনি গাব্দা কাঠবেড়ালী।

    ছোট থেকে বড়, সবারই জন্য প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবনে।

    খানিক বাদে সঙ্গীতা এসে জানাল-আমাদের ফেলে গেছো বলে ভেবোনা আমরা লুজার। আমরাও খারাপ কিছু দেখিনি; সকালবেলা মা-হাতি এসেছিল তার বাচ্চাকে জল খাওয়াতে।

    আহ, কেবলি দৃশ্যের জন্ম হয় !



    বনের তলায় ব্যাঙের ছাতা।


    হোরি বেলিড


    বুনো মোষের পাল। বাট নো টাঁড়বারো।


    চেস্টনাট বেলিড নাটহ্যাচ


    বুনো মোষের প্রেম।



    কাঠবেড়ালীর প্রেম।


    অচিনা কাষ্ঠবিল্লী, রোগাভোগা। এই ছবিটি কুমুদিকে নিবেদিত।
    রিভার স্পা ও গ্রেট হর্নবিলের খোঁজ
    --------------------------------------------

    বাচ্চাদের কাছে আগেই প্রমিস করা ছিল একদিন নদীতে স্নান করা হবে। আসলে সৌমিত্রদাই লোভানি দিয়ে রেখেছিলেন। আর আজই সেই দিন; কারণ কাল চলে যাব, কাল আর সময় হবে না। প্রথমে ভাবা গিয়েছিল নদীতে নেমেই চান হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল তা অসম্ভব না হলেও খুব বিপজ্জনক। নুড়িপাথরে ভরা নদীর পাড় খুব শ্যাওলাপিচ্ছিল এবং বেশ গভীর। স্রোতের কথা তো ছেড়েই দিলাম। আর, সকলেই দেখলাম পাড়ে দাঁড়িয়ে বালতিতে জল ভরে বালতি থেকে মগ দিয়ে জল মাথায় ঢেলে ঢেলে স্নান কচ্ছেন। তো আমরাও একই পন্থা নিলেম। সৌমিত্রদা'রা আসতে দেরী করছেন দেখে আমিই বীরের মত দুই পুত্রকে দু-হাতে ধরে নদীপাড়ে গিয়ে হাজির হলাম। কিন্তু তাদের কি আর ধরে রাখা যায় ! রোদ্দুর একটু সাবধান মত, সে খুব একটা লাফাঝাপি করছে না। টুংকাইয়ের বিপদের জ্ঞান নেই , সে বারবার হাত ছাড়িয়ে দূরে চলে যেতে চায়, নদীর জলে নামতে চায়। এদিকে নদীর জল ঐ ভরদুপুরে চড়া সূর্য মাথায় নিয়েও কনকনে ঠান্ডা, কেটে বসে যায়।আর তেমনি পা হড়কানোর সম্ভাবনা। একবার পিছলে পড়ে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। যাহোক করে বালতি ভরে ওপর থেকে ( নীচের জলে বালির ভাগ বেশ বেশী) জল তুলে মগে ঢেলে তাদের চান করানো হল। প্রতিবার জল ঢালার সঙ্গে তারা শিউরে শিউরে উঠছে, এত ঠান্ডা। কোনোমতে তাদের চান-টান করিয়ে, নিজে চান করে গা-মাথা মুছে নদীপাড় দিয়ে উঠে আসছি, দেখি সৌমিত্রদা'রা নামছেন। বাচ্চাদের দেখে বললেন-হয়ে গেল? এত অল্পে কখনো নদীতে চান হয়? আয় আমার সঙ্গে, আজ নদীতে চান করা কাকে বলে দেখবি। একেবারে রিভার স্পা করিয়ে ছাড়বো। আর বাচ্চাদের পায় কে ! আমি বললাম-আমি আর নেই ! বলে বাচ্চাদের সৌমিত্রদা-ভাস্করের হাতে সমপর্ণ করে উঠে এলাম।

    তারপর শুরু হল তাদের স্নানখেলা। বাংলোর দোতলার বারান্দায় চেয়ারে বসে রোদ্দুরে গা এলিয়ে দিয়ে চেয়ে চেয়ে সে দৃশ্য দেখতে লাগলাম। রিভার স্পা-ই বটে ! গায়ে-মাথায় আচ্ছা করে সাবান মাখিয়ে ঝামা পাথর (নদীখাত থেকেই সদ্য সংগ্রহ করা) দিয়ে ঘষে, রগড়ে, দরকার হলে ঘাড়ে-পিঠে দু-একটা রদ্দা কষিয়ে সে এক থরো স্নানকৃত্য। টুংকাইয়ের স্নান হয়ে গেলে পরে রোদ্দুরের টার্ন। ততক্ষণে দু-দফা মিলিয়ে প্রায় আধ ঘন্টার ওপরে চান হয়ে গেছে টুংকাইয়ের। তাও সে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল নদীপাড়ে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হ্যাংলার মত রোদ্দুরের চান -করা দেখে গেল; যদি আরেকবার কেউ চান করতে ডাকে !

    বেকি নদীটি আর এই অরণ্যপ্রকৃতি মোটামুটি ঘরবাড়ির মত হয়ে গেছে সৌমিত্রদা'র । এখানে উনি ১৬ বার এসেছেন। এ মাসের শেষেই আর একবার আসবেন অন্য টিম নিয়ে। এই জায়গাটিকে, এই নদীটিকে উনি বড় ভালোবাসেন বোঝা যায়। আর বাচ্চাদেরও বেশ ভালোবেসে ফেলেছেন।

    ওপাড়ে মোষের দল এতক্ষণ ধরে চান করছিল-রোদ পোয়াচ্ছিল ঘন্টার পর ঘন্টা। এবার তারা এক এক করে রিভারবেড থেকে উঠে আসছে। আমাদেরও সময় হয়ে এল বেরোনোর।

    ------
    আবার সেই বাংলোর পেছনদিকের চড়াই ভেঙ্গে ওঠা, প্রথমদিন সন্ধ্যায় যে পথে গিয়েছিলাম। তবে সেবার ছিল পায়ে- হেঁটে ওঠা, এবার গাড়িতে। কিছুদূর যেতেই সেই তোরণ। আমরা ভুটানের স্থলসীমায় প্রবেশ করছি। শুরু হল রয়াল মানস ন্যাশনাল পার্ক। অবশ্য আমরা এখনো বেকি নদীর এপাড়েই রয়েছি।
    বেশ খানিকটা পাহাড় বেয়ে উঠে রাস্তা নীচে নামতে শুরু করল। নামতে নামতে একসময় সে নদীপাড়ের লেভেলে নেমে এসেছে। এইখানে কোথায় একটা বাঁদিকে জঙ্গলের স্ট্রেচের মধ্যে বোঁ করে ঘুরিয়ে দিয়ে গাড়ি গিয়ে থামলো বালি আর এলিফ্যান্ট গ্রাসে ঢাকা উপত্যকা-মত জায়গায়। কয়েকমাইল জোড়া জায়গা। তারপর থেকেই নদীপাড়। এখানে নদী কিছুটা কম চওড়া, এপাড় থেকে ওপাড় দেখা যায় দিব্য। ওপাড়ের জঙ্গল, জঙ্গলের মধ্যে ওপাড়ের বাড়িঘর ইত্যাদি।ঐ হল রয়াল মানসের আসল বিস্তার। ওপাড়ে একটি নৌকো বাঁধা রয়েছে। কিন্তু মাঝির দেখা নাই। বেশ খানিকক্ষণ ঘাটে বসে থাকা হল আনমনে, কেননা আর কিছু করার নেই। মাঝি এলে তাকে অনুরোধ করা হবে ওপাড়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে। তারপর যদি কপালে থাকে, ওপাড়ের জঙ্গলে ঘোরার অনুমতি মেলে। নাকি সাধারণতঃ মিলে যায়। রোদ্দুর খুব চড়া আর এখানেও ধুলোবালি বইছে খুব। দেবর্ষি কয়েকটি গ্রে বুশচ্যাট (পুরুষ-মহিলা উভয়) তাক করে যাচ্ছে, কিন্তু তারা ওকে কোনো ডিসেন্ট ফটোশটের সুযোগই দিচ্ছে না। বাচ্চারা নদীপাড়ে প্রজাপতি আর ওয়াগটেইলের পেছনে দৌড়াদৌড়ি করে ক্লান্ত। আমরা গাড়ির ভেতরে বসে ঝিমোচ্ছি। যেতেছে বহিয়া সুসময়। এমন সময় সৌমিত্রদা-ধুত্তোর ! বলে উঠে এলেন। বললেন-চলুন একবার প্যানব্যাং গ্রাম ঘুরে আসি। ততক্ষণে মাঝি এসে পড়বে খন। তবে কিনা- বলেই উৎকর্ণ হলেন।

    দূরে একটা পাখী কটর কটর করে ডাকছিল। খানিক শুনে বললেন-গ্রেট হর্নবিলের ডাক। এ পাড়েই কোথাও আছে। চলুন দেখি, খুঁজে দেখা যাক। বলে আমাদের নিয়ে জঙ্গলে ঢুকে পড়লেন। কিছুটা যেতেই আওয়াজ আরো জোরে হল। পুরুষ হর্নবিল তার নারীকে ডাকছে। কিন্তু দেখা আর মেলে না, না পুরুষ, না মহিলা। আওয়াজ ক্রমে ধীর হল, কমে এল, দিক বদলালো, তারপর কে একজন বলল- ঐ যা ! সে নাকি মেয়ে পাখীটিকে উড়ে যেতে দেখেছে। পুরুষ পাখীর ডাকও আর শোনা গেল না। হা হতোস্মি! এই আজীবন-মনোগ্যামাস, নিয়ার থ্রেটেন্ড সুদর্শন পাখীটিকে এযাত্রা আর আমাদের দেখা হল না।

    প্যানব্যাং গ্রামটি বেশ অদ্ভুত। ভুটানের শেষ সীমায় অবস্থিত এই গ্রামের লোকেরা যাতায়াতের জন্য ভারতের রাস্তাঘাটের ওপরেই পুরোপুরি নির্ভরশীল। ভুটানের অন্য এলাকার সঙ্গে এর কোনো যোগাযোগের রাস্তা নেই। এক যদি না রয়াল মানসের মধ্য দিয়ে বুনো পথকে রাস্তা বলে ধরা হয়। প্যানব্যাংয়ে আমাদের বেশ সময় গেল এন্ট্রি পারমিট ইত্যাদি বানাবার জন্য। সেই সময়টা আমরা রকমারি প্রজাপতির পেছনে ধাওয়া করে কাটালাম। এক গাদা নানা রংয়ের প্রজাপতি রাস্তার পাশেই মাড পাডলিং করছিল । এই টার্মটা অনুলিপির কাছে শুনলাম, আগে কখনো শুনি নি। ভেজা মাটির ওপর বসে প্রজাপতিরা মাটি- পচা উদ্ভিদ-মরা প্রাণী-গোবর ইত্যাদির রস শুষে খায়, তারই নাম মাড পাডলিং; সোসেন প্রমুখ আমাদের বায়োলজিস্টরা ভালো বলতে পারবে।

    প্যানব্যাংয়ে সত্যি বলতে দেখার তেমন কিছু নেই। শুধু সুন্দর ঝকঝকে রাস্তা (সম্ভবতঃ ভারতের বানানো;নিজেদের দেশে এমন রাস্তা কেন যে বানায় না !), রাস্তার দুপাশে দোকান-পাট, হাসিমুখ ভুটানী লোকজন ঘো/কিরা পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর দেখবার বলতে একটি ব্রীজ, তার নাম প্যানব্যাং ব্রীজ। মানস নদীর ওপরে (ভুটানে মানসের নাম দ্রাংগমে চু- ভুল উচ্চারণ হলে একক ঠিক করে দিও) তৈরী এই স্টীল আর্চ ব্রীজ উদ্বোধন হয়েছে সম্প্রতি-২০১৪-র এপ্রিলে। এটি নাকি ভুটানের দীর্ঘতম ব্রীজ। পাশেই পুরনো সাসপেনশন ব্রীজটি রয়েছে। স্টীলরজ্জু দিয়ে তৈরী এই পুরনো ব্রীজটিতে উঠলেই বিপজ্জনক ভাবে মড়মড় করে, মনে হয় এই বুঝি পড়ে গেলাম। বাচ্চা আর বুড়োদের জন্য ভয়ের, সন্দেহ নেই। গাড়ি যাতায়াতের তো প্রশ্নই নেই। সেই ব্রীজের মাঝখানে বসে স্টীলের দড়ির মাঝ দিয়ে পা গলিয়ে বসে স্থানীয়রা নিশ্চিন্ত মনে ছিপ ফেলে মাছ ধরছে, কী মাছ কে জানে। সৌমিত্রদা'রা পায়ে পায়ে সেখানে পৌঁছে গেলেন। অমনি টুংকাই আর রোদ্দুরেরো সেখানে যাওয়া চাই। ওদের হাত ধরে গিয়ে অবশ্য লাভ হল একটা-গিয়ে দেখি ভাস্কর মন দিয়ে একটি চিত্রবিচিত্র গার্ডেন লিজার্ডের ছবি তুলছে। আমিও ওর দেখাদেখি ছবি টুকলি করলাম।

    ফিরে এসে দেখি সঙ্গীতা চোখ গোলগোল করে একটি বোর্ড দেখাচ্ছে-সেখানে কঠিন ইংরেজী ভাষায় লেখা রয়েছে-এই স্থানটি অত্যন্ত ম্যালেরিয়া সংকুল, বেশীক্ষণ মশারীর বাহিরে না থাকাই উচিৎ, থাকিলে নিজ দায়িত্বে......

    আরে , চলো চলো চলো! আগে বলতে হয় ! এই ভরদুপুরে মশারি কোথা পাবো! পেলেও রাস্তার মাঝখানে খাটাবোই বা কোথায়?

    কী সব লজিস্টিক ঝামেলা !


    চকোলেট গ্রাস ইয়েলো(পরিচিতি সৌজন্যঃ কাজি নাসির)



    কমন ইওম্যান (পরিচিতি সৌজন্যঃ কাজি নাসির)



    মাড পাডলার।


    লার্জ ক্যাবেজ হোয়াইট( পরিচিতি সৌজন্যঃ কাজি নাসির)



    কুমুদি নাহয় এই ছবিটা না-ই দেখলেন !
    ওঃ, তোমরা তো খুব লাকি !
    পার করে দে আমারে
    ------------------------

    এইবেলা মাঝির খোঁজ পাওয়া গেল। নৌকো নিয়ে সে এদিকেই আসছে। আমাদের হাঁকডাক শুনতে পেয়েছে। ভুটান সরকারের মাঝি; ও তার সাহায্যকারী( ভাগ্নে অথবা ভাতিজা)। দিব্যি হিন্দি বলে, কারণ তারা ভুটানী নয়কো মোটে। মঙ্গোলয়েডই নয়, বিহার কিম্বা উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা, যদ্দুর মনে পড়ছে। তবে কিনা পার করে দেওয়ার প্রশ্নে দোদুল্যমান, যেমনটি তাদের নৌকা-মানসের ঢেউয়ে ঢেউয়ে। কেননা আমাদের যদি ওপাড়ে যাবার পারমিট না থাকে, তাহলে ন্যায্যত আমরা তার নৌকায় চড়বার অধিকারী নই। বুঝিয়েসুঝিয়ে বলা হল, আমাদের সঙ্গে রেঞ্জারসাহেবের বহুত দোস্তি হ্যায়, একবার ওপাড়ে পৌঁছে দিলে তিনি জামাই-আদর করে তুলে নিয়ে যাবেন। অগত্যা তারা নিমরাজী; মানুষ ভালো, সিনিক নয়কো মোটে। মনে হয় বড় শহরে থাকে নি কখনো। খুব সম্ভবতঃ রবীন্দ্রনাথ পড়েছে, কেননা মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সেকথা জানে। এবং এলিয়ট পড়ে নি।

    মানসের জল কেটে চলছে আমাদের ইঞ্জিনলাগানো যন্ত্রচালিত নৌকো। খুব অল্প সময়েই ওপাড়ে পৌঁছে যাবো। নদীর ওপর দিয়ে পাক খাচ্ছে কী একটা র‌্যাপটর। সম্ভবতঃ কোনো ফিশ ঈগল। মাঝেমধ্যেই প্রায় নেমে আসছে নদীর বুকে। অনেক দূরে আসামের দিকটায় কী একটা নীল বিন্দু মত দেখতে পেয়ে শাঁওলী উত্তেজিত-কী পাখি , ওটা কী পাখি। লেন্সে চোখ লাগিয়ে দেখি-ইন্ডিয়ান রোলার। ওর নীলকন্ঠ নামটা একদম মিসনোমার। সৌমিত্রদা মাঝির সঙ্গে খেজুর করছেন। নদীর ডেপ্থ কত? মাঝির ভাতিজা একগাল হেসে তার বিশাল লগি দেখিয়ে বলল- এর তিন-চতুর্থাংশ; মাঝনদীতে। সৌমিত্রদা জানতে চাইছেন- সেই যে অসমীয়া রসুইকর দেখে গেছিলাম আগের বার , সে আর নেই? রাজার রসুইকর, জিগ্গেস করাতে বলেছিল-তার কাজকম্ম কিছুই প্রায় করতেটরতে হয় না, আরামের চাকরী, কেননা রাজা এই জঙ্গলে আসেন কালেভদ্রে ছুটি কাটাতে।

    ওপাড়ে গিয়ে সৌমিত্রদা কিন্তু সত্যি কামাল করলেন; রেঞ্জার না হোক, অন্য কোনো ভারপ্রাপ্ত কর্তার সঙ্গে কথাবার্তা বলেটলে ঠিক পারমিশন আদায় করে ফেললেন ওপাড়ের জঙ্গলে ঢোকার। সেঁজুতি বলল, আগেরবার নাকি সত্যি রেঞ্জারসাহেব ছিলেন; নিপাট ভদ্রলোক, নিজে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে জঙ্গল দেখিয়েছিলেন।
    নদীর পাড় অতীব খাড়া এবং পাথরে-শ্যাওলায়-কাদামাটিতে পেছল। খুব আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে গাছের ঝুলন্ত শেকড় ধরে ধরে পাড়ে ওঠা গেল। এক গাল হাসি হেসে ভুটানী কর্তা আমাদের অভ্যর্থনা করলেন। জায়গাটা ঠিক পুরোপুরি জঙ্গল নয়, জঙ্গলের শুরু বলা যেতে পারে। চারদিকে ছড়ানো -ছিটোনো ঘরবাড়ি, আর্মি ব্যারাকের মত। এক জায়গায় একটি পার্ক, ছোটদের দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি রয়েছে। হাতির পিঠে ওঠার সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো জায়গা রয়েছে, সেটি বানানোও হয়েছে হাতির মত করে। একফালি ছোট খেলার মাঠে বনকর্মীরা ভলিবল খেলছে। একজন গাইড আমাদের সাথে সাথে চলেছেন। বাড়িঘরের মধ্য দিয়ে, এর উঠোন, তার তুলসীতলা বাঁচিয়ে, রাশি রাশি হাতির গোবর সাবধানে পেরিয়ে, ঝরা শাল -সেগুনের পাতা, অচেনা ফুলের ঝরে পড়া মঞ্জরী পায়ে দলে আমরা চলেছি। খাদের পাড়ে এসে একটি সজনে গাছের দিকে আঙুল দেখালেন উনি। গাছটি কে বা কারা যেন মুড়িয়ে নিয়ে গেছে, এই মুহূর্তে প্রায় ন্যাড়া। হেসে বললেন-গোল্ডেন লাঙ্গুরের কীর্তি। এই তো আধঘন্টা আগেও ছিল; দেখুন, এদিক-ওদিক তাকিয়ে , চোখে পড়ে নাকি ! তাই শুনে খুব একচোট ঘাড়টাড় ঘোরানো হল। কিন্তু চেষ্টাই সার। সোনালী বাঁদরের দল হালকা হাওয়ায় ভ্যানিশ হয়ে গেছে, এ যাত্রা আর তাদের দর্শন মিলল না।

    এবার ফেরার পালা। বেশীসময় থাকার উপায় নেই, বেশী দূর যাওয়ার সুযোগ নেই। রাজার বাড়ি দেখতে পেলাম, ভুটানী স্টাইলে কাঠ কুঁদে কুঁদে বানানো। ছুটি কাটাতে রাজা ক্কচিৎ এখানে এসে থাকেন। এখানে বিপন্ন পশুদের চিকিৎসা ও রিহ্যাবও করা হয় বোধ হয়। একটি সম্বর দেখলাম দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তার পিঠে একটি শুকিয়ে আসা ক্ষত। গুলির দাগ, না হিংস্র জন্তুর কামড়, কে জানে। সে দেখলাম বেশ গৃহপালিত মত, মানুষ দেখে দেখে অভ্যস্ত, আমাদের কাছে এসে পোজটোজ দিল। ঝোপের মধ্য দিয়ে আরেকটি বড়সড় বাছুরের মত প্রাণী বেরিয়ে এল, তার চার পায়ে যেন সাদা মোজা পরানো। অনুলিপি বলল-এটা মিথুন, বস ফ্রন্টালিস, গাউরের আত্মীয়। এরও পিঠে দেখলাম একই রকম একটি ঘা, শুকিয়ে এসেছে। এ-ও মানুষ দেখে পাত্তা দিল না।

    ফেরার অংশটুকু একটুখানি ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। রিন রিন করে সেই মন্দিরের ঘন্টার মত ঝিঁঝিঁর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি; এছাড়া সমস্তই শান্তিকল্যাণ।জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে। সেই সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে রিন রিন শব্দের একটি উৎসকে দেখতে পেলাম- বেশ বড়সড় একটি ঝিঁঝিঁ পোকা। আওয়াজটাওয়াজ থামিয়ে সে চুপচাপ বসে আছে ঝোপের ওপরে, যেন ভাজা মাছটি উল্টে খেতে জানে না-এতই সুবোধ। তার আশেপাশে পুবালী হাওয়ায় পাতা ঝরে ঝরে পড়ছে অনেক উঁচু থেকে।হাওয়ায় পাক খেতে খেতে শুকনো খয়েরী-বাদামী পাতার ঝরে পড়া দেখলে মন কেমন করে।

    জঙ্গল পার হয়ে আমরা নৌকায় উঠে বসি। কাল দুপুরে এই নদী, এই জঙ্গল ছেড়ে চলে যাব। পানকৌড়িরা নদীর জলে ডিগবাজি খাচ্ছে। পাড়ের বালি এলোমেলো হয়ে যায় আনমনা হাওয়ায় হাওয়ায়।




    চেঞ্জেবল হক ঈগল। না, একে ভুটানের আকাশে দেখিনি। তবে মানসেই তোলা।



    রয়াল মানসের জঙ্গলে সম্বর



    আহত মিথুন (বেশ বাল্মীকি বাল্মীকি শোনালো, অহো !)


    মিসনোমার নীলকন্ঠ (এটি অবশ্য করবেটে তোলা)


    ইহা হয় ক্রিকেট।
    রাইট। হানি বাজার্ড। শুধরে নিলাম।
    জংলা কালীর থান
    -------------------------

    কার্তিক মাসের অমাবস্যা। আজ কালীপূজা। মানসের জঙ্গলেও কালীপূজা হয়। জঙ্গলেই বরং কালীকে মানায় ভালো। সকল কালের সূচনার আগে, সকল কালের অন্তে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে এক কৃষ্ণা নগ্নিকা।ঋত্বিকের প্রাইমরডিয়াল মাদার। শহরে এঁর মহিমা আর কতটুকু? জঙ্গলের শেয়াল-শকুনের মধ্যেই বরং এই আদিম কালো মূর্তিটি থাকুক।

    কারা যেন খবর দিল, জঙ্গলগার্ডদের কোয়ার্টারে কালীপূজায় সবার নেমন্তন্ন। অমনি আমাদের আমুদে পার্টির বাই উঠল- কালীপূজা দেখতে যাবো। আমি চিরকালের শান্তিপ্রিয় মানুষ, ঘুম আমার জেতের পেশা, আমি কোন দুঃখে কালীপূজা দেখতে যাবো? পূজাফুজা জম্মে দেখি না। আমি গিয়ে ঢুকলাম আমার কম্বলের গভীরে। বাকিরা সব হৈ হৈ করে বেরিয়ে চলে গেল।

    সে বেশ অনেক রাত হবে, যখন লোকজন ফিরে এসে আমার ঘুম ভাঙালো। ঘুমচোখে অনিচ্ছুক শীতের অন্ধকার রাতের মধ্য দিয়ে নীচের ডর্মে নামা। খেতে বসা। কলকলিয়ে মেয়েরা বলল- ওঃ, যা একটা জিনিষ মিস করলে না ! নেহাত ঐ অন্ধকারে ক্যামেরা কাজ করল না বলে ছবি তুলে রাখা গেল না। নইলে তোমাকে দেখাতাম। তাদের নাকি দুর্দান্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে। সে এক জম্পেশ গা ছমছমে ব্যাপার! সবাই টুকরো টুকরো করে গপ্পোটা আমায় শোনালো। আমারো মনে হল- না গিয়ে ভুলই হয়েছে। আর কখনো এই সুযোগ পাবো না। এই ঘোর বেঘো জঙ্গলে বোরো জনজাতির অদ্ভুত রিচুয়ালে ভরা কালীপুজো দেখা।কিন্তু সৌমিত্রদা গোমড়া মুখে বসে কেন?

    এর পরে যে গপ্পো ফাঁদবো, তার সবটাই আমার শোনা কথা। পরের মুখের ঝাল। ভুত জোলাকিয়া'র মত জম্পেশ কিনা আপনারা বিচার করবেন। এই খানিকক্ষণ আগেও রাত্তিরের কাছ থেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে শুনছিলাম সে রাত্তিরের বিবরণ। রাত্তির আবার পুরোটা বলতে না পেরে সেঁজুতিকে ফোন করল। ফোনের ওপার থেকে সেঁজুতি বলল- ফোনটা ইন্দ্রনীলকে দে! তারপর হিসহিসিয়ে ক্রুদ্ধ বেড়ালীর মত বলল- তোকে কিছু বলবো কেন? তোকে কিচ্ছু বলা উচিৎ না। তুই আমার লেখাটা লিখে দিয়েছিলি?( ওর কলেজের সায়েন্স ম্যাগাজিনের জন্য একটা ডাক্তারী লেখা চেয়েছিল; অনেক তা না না করে কাটিয়ে দিয়েছি। এই হল পূর্ব ইতিহাস।)

    ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন খেতে খেতে শুনছি ওদের গল্প। জেনারেটরের আলো নিভে গেছে। এদিক-ওদিক মোমবাতি জ্বলছে। একটা বিরাট মথের ওড়াউড়ি অবিরত; তার পাখার কালো ছায়া বিশাল হয়ে দেয়ালে এসে পড়ছে। বাইরে মিশকালো আদিম অন্ধকার। এই ঘোর অমাবস্যার কালরাত্রে ওরা টর্চ সম্বল করে একজনের পেছনে আরেকজন দল বেঁধে জঙ্গুলে রাস্তা পেরিয়ে বনরক্ষীদের আবাসনে পুজা দেখতে গেছে। আবাসনের মধ্যেই একটি মন্দির, তার ওপরে কালীমূর্তির অধিষ্ঠান। তার সামনে ত্রিপল খাটিয়ে বেঞ্চি পেতে দর্শকদের বসার ব্যবস্থা। ওরা যেতেই খুব আপ্যায়ন করে সামনের বেঞ্চিতে নিয়ে গিয়ে বসানো হল। ওখানে মেধিবাবুই হর্তাকর্তা; বীট অফিসার। ওদের জন্য প্রচুর চিনি দেওয়া চা, ঝুরিভাজা আর বোঁদে আনানো হল। খেতে খেতে ওরা পুজার ব্যবস্থা দেখছে। ক'টি টুনিলাইট জ্বলছে মন্দির প্রাঙ্গন ঘিরে। টুনির ঐ জ্বলানেভাতে অন্ধকার আরো জমকালো হয়েছে। অবাক ব্যাপার এই- রোজ সন্ধ্যে হতে না হতেই নদীর দিক থেকে যে শনশনে ঝোরো হাওয়া বয়, আজ তার ছিঁটেফোঁটাও নেই। ঐ হাওয়া থাকলে আর দেখতে হত না, ত্রিপলফিপল উড়ে কোথায় চলে যেত ! জংলা কালীর আশ্চর্য দৈবী মহিমা?

    ওদিকে গমগমে গলায় অদ্ভুত সুরে পুরোহিত মন্ত্র বলছেন। তারায় ভরা ঝুঁঝকো অন্ধকার। বলির জন্য বেঁধে রাখা পাঁঠারা নীরবে ঘাস খেয়ে যাচ্ছে। মাঝেমধ্যে রাতচরা পাখীর অচেনা গলার ভীত আওয়াজ। সব মিলিয়ে গা ছমছম করে। ওরা যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যে এক টাটা সুমো ভর্তি বোরো মহিলারা এসে নামলেন। তাঁরা নানা বয়সের, কিন্তু সকলেরই পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি, সঙ্গে আলাদা আলাদা রংয়ের শাল (বোরো ভাষায় বলে শিমা) অথবা সোয়েটার। গলায় জড়ানো স্কার্ফ জুম্গরা। এঁরা এসেছেন পূজা দেখতে ও তাতে অংশ নিতে। কিন্তু একটু দেরী হয়ে গেল, কেননা মাঝরাস্তায় এঁদের গাড়ি আটকে দেয় বুনো হাতির পাল। তখন ওয়াকি টকির মাধ্যমে বনরক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ আর বনরক্ষীদের গিয়ে হাতি তাড়িয়ে তাঁদের নিয়ে আসা। কিন্তু সে আর এমন কি, এ তো হামেশাই হচ্ছে-এমনি ভাব। গাড়ি থেকে নেমে আর সময় নষ্ট না করে এঁরা কাজ শুরু করে দিলেন। কাজ বলতে গান গাওয়া। একজন লিড ভোক্যালিষ্ট-তিনি পদটি ধরে দিচ্ছেন, বাকিরা সমবেত গলা মেলাচ্ছেন। কেউ কেউ বাজনা বাজাচ্ছেন- দুটি আয়তাকার কাঠের ব্লক ঠুকে ঠুকে (সম্ভবতঃ এর নাম থারখা), অথবা লম্বা ড্রাম বাজিয়ে(খামঃ- কাঠের তৈরী, ছাগলের চামড়া দিয়ে বাঁধা), বা বড় বড় খঞ্জনীর মত বাজনা(খাওয়াং?)। সে এক অদ্ভুত সুর; অদ্ভুত পরিবেশ-কুচকুচে কালো অন্ধকার রাত, জঙ্গল, বুনো পাখির ডাক, বুনো গানের সুর, পুরুতের গলায় অচেনা মন্ত্র, কুচকুচে কালো আদিম ভীমা ভয়ংকরী নগ্নিকা। টুনির আলোর ঐ জ্বলে ওঠা, ফের নিভে যাওয়া। কেমন আবেশ ঘনিয়ে আসে, হাজার বছর আগেকার রিচুয়াল মনে হয়। এখনো কি নরবলি হয়? গানের ইন্টারভ্যালে ওরা উঠে আসে। এখানে আসার পথে সৌমিত্রদা'র মোবাইল হারিয়ে গেছে; জঙ্গলের অন্ধকারে কোথায় পড়ে গেছে, কে জানে; যা ভুলো ! কিন্তু আসল কথা , আদিম রাত সভ্যতার চিহ্নগুলিকে এক এক করে গিলে খেয়ে নেবে। পালিয়ে আসাই ভালো।

    হঠাৎ করে আলো জ্বলে ওঠে। জেনারেটর । বাংলোর লোকজন ফিরে এসেছে মনে হয়। মথটা জানলা খোলা পেয়ে পালিয়েছে। সৌমিত্রদা'র মুখটা একটু কালো দেখায়; ঐ মোবাইলে ওঁর যাবতীয় কনট্যাক্ট রয়েছে, ব্যবসার সব যোগাযোগ। কিন্তু সৌমিত্রদা বিয়িং সৌমিত্রদা, মন খারাপ ঝেড়ে ফেলে হেসে ওঠেন, -যাগ গে, ছাড়ান দ্যান, মনে করুন মোবাইল ছিল না কোনো দিনও। এই ভাস্কর, দ্যাখো তো, বড় ডাক্তারবাবুর পাত খালি, ওঁকে আর একটু রাইস আর মাংস দাও। এ কি সেঁজুতিদি, উঠে পড়লেন যে, চাটনি খাবেন না?


    জানলার কাচে বাতাস ধাক্কা দিচ্ছে
    ----------------------------------------

    তিন মাস হয়ে গেল প্রায় মানস থেকে ফিরে এসেছি। সময়ের হিসেবে খুব বেশী দিন নয়। স্মৃতিরা তাই এত টাটকা আছে, এখনো সবুজ। এই তো সময় মানসের স্মৃতি লিখে ফেলবার। তাই লেখা। আর কিছু নয়। নইলে ভুলে যাই, দিনগুলি জড়িয়ে যায় এর-ওর সঙ্গে, আলাদা করে চিনতে পারি না কাউকেই। আমি স্বভাবতঃ বিস্মৃতিপ্রবণ, আত্মঘাতী। আমার স্মৃতিতে মাকড়সাজাল, সময়ের ধুলো সহজে জমে। আমি পুরনো কথা সহজে ফেলে আসতে পারি সিঁড়িঘরের কোণার অবহেলায়। তাই লেখা হয়ে উঠল না কোনোদিনই কোনোকিছু। কেননা লিখতে তো সেই পারে যে সব কিছু মনে রাখতে পারে। ছেলেবেলাকে। অতীতকে। লেখা মানে লড়াই। ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই। বিস্মৃতির বিরুদ্ধে লড়াই।ভুলে যাই বলে আমি ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়িনি কখনো। লড়াই হবে না আমার দ্বারা। লেখা হবে না। নিজের চরিত ছবি আঁকতে দিলে আমি কী আঁকবো? একটা শিল্যুয়েটের মানুষ, যে তার দুহাঁটুর মাঝখানে মাথা গুঁজে বসে আছে ঘরের কোণে, আর তার মুখ দেখা যাচ্ছে না কোনো মতেই? মুংকের ছবির মানুষের মত সে সাঁকোর মাঝখানে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চীৎকার করে ওঠে না। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে সে ডাকঘর নাটক করাতে পারে না ছেলেমেয়েদের দিয়ে। যদিও চেঁচাতে পারলে ভালোই হত। ভালো হত রাজকবিরাজ সাজলে।

    লেখা তাই বিকল্প এক পথ। যেমন ছবি তোলা। ভুলে যাবো বলে দিনের স্ন্যাপশট দিনের দিন তুলে রাখি। কালে কালে তারা রং হারাবে, ফ্যাকাসে হবে। সিপিয়া টোনের সেইসব ফ্যাকাসে আবছায়ার গায়ে আমি যত্নে হাত বোলাবো অনেক কাল পরে। বুড়ো বয়সে। বুড়ী চাঁদ যখন গেছে ডুবে বেনোজলে ভেসে।

    এইভাবেই আমি বিস্মৃতির সঙ্গে লড়াই করি। যেমন মাকোন্দোর মানুষ। সবকিছুর গায়ে নাম লিখে রাখি। এর নাম গরু, এ দুধ দেয়। দুধ একটি সাদা রংয়ের তরল। তাকে খেতে হয়। খেলে গায়ে বল আসে। এই আমার জঙ্গল। এখানে নদী ছিল। পাখী। এ আকাশে ওড়ে। আকাশ নীল।

    এইসব। ব্যর্থ লড়াই। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যেমন ইন্দ্রজিত। কোশাকুশি যা হাতে পাচ্ছে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারছে।

    এইমাত্র। আর কিছু নয়।
    -------

    দুপুরে আমাদের যাওয়া। তিনটে কুড়িতে ট্রেন নিউ বঙ্গাইগাঁও থেকে। এই স্টেশন থেকে দুদলের পথ দুদিকে বেঁকে যাবে।আমরা- আমি, সঙ্গীতা, টুংকাই যাবো গুয়াহাটি, সেখান থেকে বড়াপানি। বাকিরা ফিরে যাবে কলকাতা। সৌমিত্রদা-ভাস্কর নেমে যাবে আলিপুরদুয়ারে। সেখানে ওদের আর একটি ট্রিপ পরের দিন থেকে অন্য একটি পার্টির সঙ্গে। রায়মাটাং-বক্সা।

    সকাল দশটার মধ্যে তাই বেরিয়ে পড়তেই হবে সবাইকে । রাস্তা খানাখন্দময় , অনিশ্চিত। আমরা, আগেই বলেছি, ঘরপোড়া গরু। রাজধানী মিস-করা। এবারেও রাজধানী। ডিব্রুগর- রাজধানী। ওদের ট্রেন আমাদের পঁচিশ মিনিট পরে, তাও একইসঙ্গে আগেভাগে বেরোনো। সাবধানের মার নেই। পথে কিছু সময় যাবে সৌমিত্রদার থানায় ঢুঁ মারতে। হারানো মোবাইলের জন্য রিপোর্ট লেখানো আছে।

    দশটায় বেরোনো, তাও ভোরবেলাটা আমার। যদি জঙ্গল হঠাৎ করে কিছু দেয়! সাতটা নাগাদ ক্যামেরা ঝুলিয়ে বেরোতে গিয়ে দেখি শাঁওলিও নামছে। দীপাণ্বিতা আর অনুলিপি আগেই বেরিয়ে গেছে। শাঁওলি আর আমি একসাথে জঙ্গলের সেই ট্রেইলটা ধরলাম। চেনা ট্রেইল, দুদিন গেছি এ পথ দিয়ে। এখানেই ক্যাপড লাঙ্গুরের দলবলের সঙ্গে দেখা হওয়া। নাটহ্যাচ আর হোরি বেলিড কাঠবেড়ালীর দেখা পাওয়া। যাই, দেখি।

    বেশীদূর যেতেও হল না। দূরে গাছপালার মড়মড়ানির আওয়াজ শুনে চোখ তুলে তাকাই। খুব কাছে নয়, খানিকটা দূরে-বেশ খানিকটা দূরেই বলবো- কয়েকটি বাঁদর লাফ মেরে এগাছ থেকে ও গাছে চলে যাচ্ছে। খুব ছটফটে। ক্যাপড লাঙ্গুরের মত শান্ত নয়। ক্কচিৎ স্থির হয়ে বসছে, কিন্তু তাও সাবধানে । গাছপালার আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে। ছবি তোলা যায় না। তাড়াহুড়োয় শাটার টিপি। হাত নড়ে যায় উত্তেজনায়। সকালের নতুন রোদ আর ঘন গাছের ছায়ায় বেশ কনট্রাস্ট তৈরী হয়েছে। ক্যামেরার মিটারিং ঘেঁটে যায়। শাঁওলির দিকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকাই। ও মাথা নেড়ে বলে -না। এরা ক্যাপড লাঙ্গুরই। হতাশ হই।

    আরো দুয়েক পা এগোতেই আবার মড়মড়। একটা কচি ডাল ভেঙ্গে পড়ল বানরের অত্যাচারে। এবার একটু ফাঁকায় দেখা যাচ্ছে। দু-তিনজনের দল। একজন পালিয়ে গেল ছায়ায়। একজন বসে আছে, রিলেটিভলি শান্ত। নাহ, ক্যাপড লাঙুর নয়। এই সেই এলিউসিভ আসাম ম্যাকাক। এসে ইস্তক এদের খুঁজে যাচ্ছি। যাওয়ার দিনে দেখা দিল।

    জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসি খুশী মনে। কত কি দেখা হল না। বড় বাঘ, ছোট বাঘ, বনবেড়াল -কিছু না। গোল্ডেন লাঙ্গুর,স্লো লরিস, পিগমি হগ, হিসপিড হেয়ার,রুফড টার্টল-মানস বিখ্যাত এদের জন্য-দেখা হল না। হর্নবিলের ডাক শুনতে পেলাম, ডানার চ্ছটা দেখতে পেলাম না। তবু যা পেয়েছি, তাই কম কী?

    সৌমিত্রদার হাঁকডাক শুরু হয়ে গেছে। অনেকে স্নান করে রেডি। ব্রেকফাস্ট সার্ভড হচ্ছে হাতে হাতে। আলু পরোটা আর আচার। আর কয়েক ঘন্টা বাদেই আমরা নিউ বঙ্গাইগাঁও স্টেশনে পৌঁছবো। কিন্তু সে তো ততক্ষণে অন্য একটা স্টেশন। একই নদীর জলে যেমন দুবার স্নান করা যায় না, একই রেলস্টেশনেও তেমনি দ্বিতীয় বার ফেরা যায় না। আজকে আর সেদিনের সেই ধোঁয়া ওঠা নিপাট নিভাঁজ সকাল নেই। দৌড়ে বেড়ানো কালো হাঁসেরা নেই। ঘাসের গায়ে শিশির নেই। ট্রেনতৃষার্ত হাসিনা নেই।

    পায়ে পায়ে প্ল্যাটফর্মে উঠে আসি। রসুইধারক ভোলাদা আমাদের হাতে হাতে তুলে দেন প্যাক করা ফ্রায়েড রাইস আর চিলি চিকেন। রাস্তায় খাবো। আমাদের জন্য আলাদা করে রেখেছেন।সঙ্গে সেই প্রাণ জুড়োনো পেটেন্ট হাসি। সৌমিত্রদাকে জড়িয়ে ধরি। কবে আর দেখা হবে , জানি না। ওঁরা আমাদের তুলে দিতে আসেন অন্য প্ল্যাটফর্মে। সৌমিত্রদা, ভাস্কর, দেবর্ষি। ফিরেও যান একে একে। দেবর্ষি একটা সিগারেট ধরায়, আনমনে।

    বসে থাকি। ট্রেন আসে না। পাইড স্টার্লিংয়ের একটা দল ঝাঁক বেঁধে রেল লাইন থেকে ময়লা তুলে খাচ্ছে। সাধে কি নাম গুয়ো শালিখ ! দুপুরের ঝিম ধরা আলস্য স্টেশন জুড়ে। একজন মুটে খৈনি ডলছেন। আমাদের পাশে বসে থাকা এক বাঙ্গালী মুসলিম মহিলা টুংকাইয়ের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেন। চেহারায় দারিদ্রের ছাপ।ওঁর নাতিটি এই বয়সী। বড় হয়ে সে কেমন দেশ দেখবে? যেখানে বাঙ্গালী মুসলমানের গলা কেটে লাশ ভাসিয়ে দেয় বোড়ো জঙ্গী?

    ট্রেন আসে না। বসে থাকি।বিদায়ের বোধ জাগে না। দুপুরের ঝিমভাব গায়ে এসে লাগে। ওদের প্ল্যাটফর্মে গাড়ি লেগেছে। সরাইঘাট এক্সপ্রেস। ওরা গাড়িতে উঠছে নিশ্চয়। আমরা ওদের দেখতে পাই না। দেখতে দেখতে গাড়ি ছেড়েও দেয় ভোঁ বাজিয়ে। আমাদের উল্টো দিকে। হাওড়ার দিকে। যদিও হিসেবমত ছিল আমাদের পঁচিশ মিনিট পর।

    আমাদের গাড়ি আসে না। আমরা বসে থাকি নিউ বঙ্গাইগাঁও স্টেশনের ঝিম-ধরা এক নভেম্বর দুপুরের মধ্যে।একটি অনন্ত মুহূর্তের মধ্যে।।

    (শেষ)



    আসাম ম্যাকাক
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৮ নভেম্বর ২০১৫ | ১১৩৭ বার পঠিত | | জমিয়ে রাখুন পুনঃসম্প্রচার
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • aranya | 3478.160.342312.238 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৩:৩৮66733
  • অসাধারণ সব ছবি আর তেমনই লেখা
  • dc | 127812.49.9008912.200 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৩:৪২66734
  • ঘরে বসে ঘুরতে চাইলে একটা ভিআর হেডসেট কিনে নিন আর ভিআর অ্যাপ ইনস্টল করে নিন।
  • সুকি | 90045.205.012323.215 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৪:৫১66737
  • আগে পড়া হয় নি - খুব খুব ভালো লাগল
  • Tim | 89900.253.8956.205 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৬:০৩66738
  • আবার পড়লাম। ইন্দোদার লেখা এরকমই হবে এই হলো কথা।
  • I | 3445.239.2389.218 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৬:৫৮66739
  • আচ্ছা, ভালো কথা। ঐ রোগা কাঠবিল্লীটির নাম আবিষ্কার করেছি।Himalayan striped squirrel।
  • aranya | 3478.160.342312.238 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৬:৫৮66740
  • মানসে অল্প কিছু বাঘ আছে, দেখা পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার
  • ন্যাড়া | 890112.217.782323.153 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৭:২৮66735
  • আগে পড়িয়াছি। আবার পড়িলাম। ফের প্রকাশিত হইলে ফের পড়িব।
  • arpita | 7845.11.677812.198 (*) | ০২ ডিসেম্বর ২০১৮ ১০:০৩66736
  • লেখা ও ছবি দুই বড়ো ভালো
আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত