বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের পথ-চলাঃ শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ

    Punyabrata Gun লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৪ মার্চ ২০১৮ | ১১৬৯ বার পঠিত
  • ১৯৯৮-এ আমি, অমিতাভ আর সুমিত ভাবলাম এবার একটা সংগঠন বানানো দরকার, সেই সংগঠন-শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ সোসাইটি হিসেবে রেজিস্টার্ড হয় ১৯৯৯-এর ডিসেম্বরে। আমরা তখন কাজ করি চেঙ্গাইলের শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। আমি ১৯৯৫ থেকে, অমিতাভ আর সুমিত যথাক্রমে ১৯৯৭ ও ১৯৯৮ থেকে।

    ৯০-এর দশকের গোড়ায় কানোরিয়ার শ্রমিক আন্দোলন যখন তুংগে তখন, শ্রমিকরা ঠিক করেন যে তারা ছত্তিশগড়ের শ্রমিকদের মত এক স্বাস্থ্য কর্মসূচী শুরু করবেন শহীদ হাসপাতালের ধাঁচে। ১৯৯৫-এর ২১শে মার্চ চেঙ্গাইলের বেলতলায় এক পরিত্যক্ত মুরগীর চালায় শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের আরম্ভ।

    সরকার যখন আধুনিক চিকিৎসা ব্যয়বহুল বলে নাগরিকের চিকিৎসার দায় থেকে হত ধুয়ে ফেলছে, আধুনিক চিকিৎসার বদলে AYUSH (আয়ুর্বেদ-ইউনানী-সিদ্ধা-হোমিওপ্যাথি)-কে উৎসাহিত করছে, চিকিৎসা ক্ষেত্রটা খুলে দিচ্ছে বেসরকারী পুঁজির সামনে, তখন আমরা কি করব? আমাদের মনে হয়েছিল প্রমাণ করে দেখান যাক-ঠিকঠাক ভাবে কাজ করলে কম খরচে আধুনিক চিকিৎসা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

    রোগীর একটা বড় খরচ হয় ডাক্তারের ফি বাবদ। মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র দেখালো খুব কম খরচ রোগীর কাছ থেকে নিয়েও কর্মসূচী চালানো যায়। শুরুতে নেওয়া হতো রোগীপিছু ১টাকা, ১৯৯৬ থেকে ২ টাকা, ১৯৯৯ থেকে ৪ টাকা, ২০০২ থেকে ৫ টাকা, ২০১৩ থেকে ১০টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। স্পেশালিস্ট ডাক্তার দেখানোর খরচ ১৯৯৮-এ ছিল রোগীপিছু ৮ টাকা, ২০০২ থেকে ১০ টাকা।

    ডাক্তারী পড়ার সময় আমাদের শেখানো হয় কি ভাবে রোগীর ইতিহাস নিতে হয়, রোগীকে পরীক্ষা করতে হয়। ডাক্তার হওয়ার পর আমরা তেমনটা করি না। অনেক সময় আউটডোরে রোগীর চাপ, অনেক সময় রোগীপিছু কম সময় দিলে একই সময়ে বেশী রোগী দেখে বেশী রোজগার করা যায়…..। মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে আমরা সমস্যার সমাধান করলাম স্থানীয় ছেলে-মেয়েদের মধ্যে থেকে একদল স্বাস্থ্যকর্মী গড়ে তুলে, তারা রোগীর ইতিহাস নেওয়ায় দক্ষ, ভালভাবে নাড়ির গতি, শ্বাসগতি, তাপমাত্রা, রক্তচাপ মাপতে পারে। ইতিহাস ও পরযবেক্ষণের ফল তারা নথিবদ্ধ করে এক ফর্মে। রোগী যাতে নিজের স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত তথ্যগুলো জানতে বুঝতে পারেন, তাই এই ফর্মের ভাষা বাংলা। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে রোগী যান সাধারণ চিকিৎসকের কাছে, তিনি ইতিহাস পড়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করেন, আরও শারীরিক পরীক্ষা করেন, তারপর ওষুধ লেখেন বা ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করতে পাঠান বা বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠান। দেখা গেল এভাবে কাজ করে রোগ-নির্ণয় সঠিকতর হচ্ছে, ল্যাবরেটরী পরীক্ষা অধিকাংশ ক্ষেত্রে করাতে হচ্ছে না, যেখানে করাতে হচ্ছে সেখানে করাতে হচ্ছে অল্প কিছু পরীক্ষা, ফলে রোগীর খরচ কমছে।

    ডাক্তারের ফি-এর থেকেও বেশী অনেকক্ষেত্রে খরচ হয় পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। মনে করুন জ্বর নিয়ে আপনি ডাক্তারের কাছে গেছেন। ভাল করে ইতিহাস নিয়ে বা না নিয়ে, ভাল করে পরীক্ষা করে বা না করে ডাক্তার অনেক সময় এক ফর্দ ধরিয়ে দেন—রক্তের ও পেচ্ছাপের সাধারণ পরীক্ষা, রক্তে ম্যালেরিয়ার পরজীবী দেখা, টাইফয়েডের জন্য ভিডাল পরীক্ষা, পেচ্ছাপের কালচার-সেন্সিটিভিটি পরীক্ষা…..। বড় ডাক্তার হলে তিনি হয়ত আরও লিখবেন রক্তের কালচার, ম্যালেরিয়া এন্টিজেন, ডেংগুর জন্য রক্তপরীক্ষা….। সব সময়ে যে রোগীর প্রয়োজনে পরীক্ষা লেখা হয় এমন নয়। এখন অনেকেই জানেন পরীক্ষা লেখার জন্য ডাক্তার কমিশন পান এবং অনেকে নেনও।

    আমাদের কাজের এলাকায় প্যাথলজি পরীক্ষায় ডাক্তার পান ৫০% কমিশন, এক্স-রে-তে প্লেটপিছু অন্তত ৩০ টাকা, আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে ২৫% কমিশন, সিটি স্ক্যানে ৩৩%....। আমাদের কমিশন নেওয়ার প্রশ্ন ছিল না। যখন আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল না, তখন আমরা সেখানেই কেবল রোগী পাঠাতাম যারা কমিশনের অংশটা রোগীর দেয় থেকে বাদ দেবে। আর সাধ্যমত একের পর এক পরীক্ষার পরিধি বাড়িয়ে চললাম- ১৯৯৫-এই অল্প কিছু প্যাথলজি পরীক্ষার শুরু, ইসিজি ৯৬ থেকে, ৯৮ থেকে গ্লুকোমিটারে ব্লাডসুগার মাপা, ২০০২ থেকে বায়োকেমিস্ট্রি, ২০০৪-এ এক্স-রে, ২০০৯-এ আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, স্পাইরোমেট্রি….।

    সীমিত সাধ্যের মধ্যে কম খরচে যুক্তিসংগত চিকিতসার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি, স্বাস্থ্যকেন্দ্রকে ঘিরে আরও ডাক্তাররা জড়ো হচ্ছেন, এমন সময় কানোরিয়ার শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যবিত্ত শ্রেণী থেকে আসা উপদেষ্টাদের সঙ্গে মতপার্থক্য শুরু হল। স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালনার জন্য প্রধান উপদেষ্টা এক ট্রাস্ট তৈরীর প্রস্তাব করলেন, ট্রাস্টে স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে থাকব আমি আর এক আকুপাংচারবিদ, ইউনিয়ন থেকে থাকবেন প্রধান উপদেষ্টা ও ইউনিয়ন সম্পাদক, আর থাকবেন তৎকালীন শাসকদলের ঘনিষ্ঠ এক পত্রিকা সম্পাদক, এক সাময়িকীর সম্পাদিকা। আমরা রাজী হতে পারলাম না।

    ট্রাস্টের গঠনতন্ত্র এমন-ই যে যিনি একবার ট্রাস্টি হলেন তাঁকে সরানোর কোনো উপায় নেই, যদি না তিনি পদত্যাগ করেন, মারা যান, পাগল হয়ে যান বা অপরাধ করে জেলে যান। আমাদের প্রস্তাব ছিল স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সমস্ত চিকিৎসক, চিকিৎসাকর্মী, অন্যান্য কর্মীকে নিয়ে এক সোসাইটি তৈরী করা, যাতে সদস্য হিসেবে থাকবেন সহযোগী শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিরাও। মতপার্থক্য এমন জায়গায় গেল যে ১৯৯৮ থেকে কানোরিয়ার শ্রমিকদের সংগে আমাদের সম্পর্কতো রইল, কিন্তু ইউনিয়নের সংগে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রইল না। মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে তখন দুটো সংস্থা চলে-একটাতে আকুপাংচার ও হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা হয় চিকিৎসকরা ইউনিয়ন উপদেষ্টার ঘনিষ্ঠ, অন্যটায় আমরা আধুনিক চিকিৎসা করি।

    শহীদ হাসপাতালে আমরা নিজেদের পরিচয় দিতাম শহীদ হাসপাতাল গ্রুপ হিসেবে। এখানে আমরা সংগঠনের অন্য নাম নিতে বাধ্য হলাম একই নামে দুটো স্বাস্থ্যকেন্দ্র চলে বলে। শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিকাশের জন্য অর্থসংগ্রহের কাজ শুরু করল। মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রের কাজে উৎসাহ পেয়ে নতুন নতুন ডাক্তার আমাদের কাজে যুক্ত হতে লাগলেন, তাঁদের কিছুজনকে মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্রে যুক্ত করা গেল, কয়েকজন যুক্ত হলেন সল্ট লেকে শুরু করা অরিজিত জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রে (১৯৯৯-এ আরম্ভ এই কর্মসূচী ২০০২-এ বন্ধ করে দিতে হয় এলাকাবাসীর উৎসাহের অভাবে), কয়েকজন বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে মদন মুখার্জী স্মৃতি জনস্বাস্থ্যকেন্দ্র নামে মাসিক স্বাস্থ্যশিবির শুরু করলেন ১৯৯৯ থেকে।

    ২০০০ সালে আমাদের সংগঠনের কাজে যুক্ত হল ডা ভাস্কর রাও জনস্বাস্থ্য কমিটি। বাউড়িয়া হাওড়ার এক পুরোনো শিল্পাঞ্চল, জুট শিল্প-টেক্সটাইল শিল্প-কেবল ফ্যাক্টরী এই এলাকায়, গত শতকের তৃতীয় দশকে কমিউনিস্ট সংগঠকরা এখানে শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। কানোরিয়ার শ্রমিক আন্দোলন থেকে উৎসাহিত হয়ে বাউড়িয়া কটন মিলের শ্রমিকরা সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন গড়ে তোলেন ১৯৯৫-এ। এহেন জায়গায় আমাদের দুই স্বাস্থ্য সংগঠন বাউড়িয়া শ্রমিক-কৃষক মৈত্রী স্বাস্থ্য কেন্দ্র নামে কাজ শুরু করল ২০০০-এর ১লা মার্চ থেকে।

    স্বাস্থ্য-কর্মসূচীতে ফান্ডিং-এর বিরোধী আমরা, কেননা ‘external funding means external control’। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগী দেখে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, ওষুধ বিক্রি করে যা আয় হয় তার ওপর দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাবলম্বী ১৯৯৮ থেকেই, তার আগে অবধি আমার মাসিক ভাতা যোগাতেন কানোরিয়ার শ্রমিকরা চাঁদা তুলে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আয় থেকে দৈনন্দিন খরচ ওঠে বটে, কিন্তু তা থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বিকাশ সম্ভব নয়, তাই আমরা দান নেব ঠিক করলাম কেবল মাত্র আমাদের সমর্থক বন্ধুদের কাছ থেকে। যাঁরা স্বাস্থ্যের অধিকার সম্বন্ধে আমাদের সংগে সহমত পোষণ করেন না, এমন কারুর কাছ থেকে আমরা দান নেব না ঠিক করলাম। তাই অর্থ এল ধীরে ধীরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রও বিকশিত হতে লাগল ধীরে ধীরে। ’৯৯-এ চেংগাইলে ৩ কাঠা জমি কেনা হল, ২০০২-এ স্বাস্থ্যকেন্দ্র ভবনের প্রথম তলা তৈরী হল। কাজ শুরু করার ৮ বছর পরে আমরা মুরগীর চালা ছেড়ে উঠে এলাম পাকা বাড়ীতে ২০০২-এর শ্রমিক দিবসের দিন। দোতলার অর্ধেকটা তৈরী হল ২০০৩-এ, সেই অংশে নতুন ল্যাবরেটরী ও ফিজিওথেরাপি কক্ষ শুরু হল ২০০৩-এর ২৫শে মে (২৫শে মে দিনটা বসন্তের বজ্রনির্ঘোষের দিন, ভিলাই শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসেও এক স্মরণীয় দিন)। ২০০৪-এ ভূপাল গ্যাসকান্ডের ২০তম বার্ষিকীতে উদবোধন হল দোতলার বাকী অংশের।

    কম খরচে চিকিৎসা করা আমাদের মতে বড় কোন কাজ নয়, এর মাধ্যমে কেবল সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। আর আমরা যে সংখ্যক মানুষকে কম খরচে চিকিৎসা দিই তারা আমাদের দেশের দরিদ্র জনসংখ্যার এক অতি ক্ষুদ্র ভগ্নাংশ। শুরু থেকেই আমরা জানি যে আমাদের আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজ মানুষকে রোগের আর্থ-সামাজিক কারণ সম্পর্কে সচেতন করা। তাই ২০০০-এর মে দিবস থেকে ‘ফাউন্ডেশন ফর হেলথ একশন’-এর সংগে বাংলা দ্বিমাসিক স্বাস্থ্য-পত্রিকা ‘অসুখ-বিসুখ’ বার করা ২০১১-র জানুয়ারী অবধি ৬৩টা সংখ্যা। আর ২০১১-র সেপ্টেম্বর থেকে নবরূপে নতুন স্বাস্থ্য-পত্রিকা ‘স্বাস্থ্যের বৃত্তে’। এছাড়া স্বাস্থ্য বিষয়টাকে ধোয়াশামুক্ত করার জন্য, স্বাস্থ্যক্ষেত্রে পুজির শোষণের স্বরূপ উদ্ঘাটন করার জন্য প্রকাশনা…..।

    ছত্তিশগড়ের স্বাস্থ্য আন্দোলনের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে স্বাস্থ্য আন্দোলনকে,স্বাস্থ্য কর্মসূচীকে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-সংস্কৃতি-র আন্দোলনের সংগে যুক্ত করতে না পারলে তা বিন্দুমাত্র সফল হতে পারে না। (ছত্তিশগড়ের স্বাস্থ্য আন্দোলন সম্পর্কে অন্য কোনো পরিসরে বলব।) ১৯৯৫-এ অন্য কোথাও স্বাস্থ্যের কাজ শুরু না করে চেংগাইলে শুরু করার কারণও ছিল তাই-নব্বই-এর দশকের গোড়ার দিকে পশ্চিমবাংলাকে উত্তাল করা ন্যায্য শ্রমিক আন্দোলনের সংগে যুক্ত থাকা। আমাদের মনস্কামনা পূর্ণ হয়নি, কিভাবে শ্রমিক ইউনিয়নের সংগে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল আগেই বলেছি। উপদেষ্টাদের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বে গত দশকের গোড়ার দিকে কানোরিয়া জুট সংগ্রামী শ্রমিক ইউনিয়ন ভেঙে তিন টুকরো হয়েছে। কাজের এলাকায় শ্রমিক আন্দোলনহীনতা আমাদের ঠেলে নিয়ে গেছে দূর-দূরান্তে। ন্যায্য আন্দোলনের সংগে থাকতে আমরা ছুটে গেছি সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-পস্কো-লালগড়ে। নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময় শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগের আহ্বানে ৪২টা সংগঠন মিলে গড়ে তুলেছে ‘নন্দীগ্রাম গণহত্যাবিরোধী প্রচার উদ্যোগ’। ‘নন্দীগ্রাম স্বাস্থ্য উদ্যোগ’-এর ব্যানারে শতাধিক ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মী ২০০৭-এর মার্চ থেকে জুন, নভেম্বর থেকে ২০০৮-এর জানুয়ারী প্রত্যেক সপ্তাহান্তে চিকিতসাশিবির চালিয়েছেন নন্দীগ্রামে। প্রতি শনিবার সেখানে রোগী দেখে, সন্ধ্যায় আন্দোলনের কর্মীদের স্বাস্থ্যকর্মী প্রশিক্ষণ দিয়ে রবিবার সারাদিন রোগী দেখে রাতে কলকাতায় ফিরেছেন তারা।
    ছাত্রসংগঠন করার সময় থেকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ধর্ম। সেই ধর্ম আমরা পালন করে চলেছি আজও। ১৯৯৯-এ মালদায় বন্যা, উড়িষ্যায় সুপার সাইক্লোন, ২০০১-এ সারা বাংলা জুড়ে বন্যা, সুনামি, ২০০৯-এর আয়লা—যখন যেমন সাধ্য আমরা কাজ করেছি। কেবল আমরা নই আমাদের সংগঠন-বহির্ভূত বন্ধুদেরও আমরা ত্রাণে সামিল করেছি।

    ডাক্তার-ডাক্তারী ছাত্র-ছাত্রীদের সামাজিক-আর্থিক-রাজনৈতিক-আইনী সমস্যাগুলো আমাদের আলাপ-আলোচনার পরিধিতে থেকেছে। গণতান্ত্রিক ডাক্তার-ডাক্তারী ছাত্র-ছাত্রীদের মতামত আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে আমরা বার করেছি ‘Doctors’ Dialogue’ নামের ত্রৈমাসিক বুলেটিন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নৈতিকতা বজায় রাখতে গিয়ে যারা শহীদ হয়েছেন ডা চন্দন সেন, ডা সুশীল পালের মত সেই সব চিকিতসকদের হত্যার বিচার চেয়ে আমরা সরব হয়েছি। মানবাধিকার কর্মী ডা বিনায়ক সেন গ্রেপ্তার হলে, যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হলে ‘Free Binayak Sen Campaign’-এ সক্রিয় হয়ে ওঠে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ। সমমনস্ক কিছু চিকিতসক সংগঠনকে নিয়ে গড়ে তোলে ‘Free Binayak Sen Campaign-Doctors in Solidarity’, বেশ কিছু গণসংগঠনকে নিয়ে ‘বিনায়ক সেন মুক্তি মঞ্চ’। সোনি সোরির মুক্তির দাবীতে, ডা সুশীল বিশ্বাসের মুক্তির দাবীতে সংগঠকে ভূমিকা পালন করে আমাদের সংগঠন।

    শেষ করার আগে আরেকটা বিষয়ে বলব—আমাদের দেশে পাশকরা ডাক্তারের সংখ্যা প্রয়োজনের চেয়ে কম, যারা আছেন তারাও অধিকাংশ শহরাঞচলে। দেশের বড় সংখ্যক মানুষ থাকেন গ্রামীণ চিকিতসক বা ওষুধের দোকানীর ভরসায় বা কোনো চিকিতসা না পেয়ে। অথচ আমাদের দেশের মারণরোগগুলোর মধ্যে প্রধান দুই রোগ ডায়রিয়া আর শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ (সর্দিকাশি)-এর প্রাথমিক চিকিতসার জন্য কিন্তু ডাক্তার লাগে না, প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীই অনেকদূর অবধি এসবের ব্যবস্থা করতে পারেন। এমনটা আরও বেশ কিছু সাধারণ রোগের জন্য প্রযোজ্য। ২০০৭ থেকে শ্রমজীবী স্বাস্থ্য উদ্যোগ ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর কর্মীদের স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দু মাসের এক আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী চালাচ্ছে। ২০১০-এর ২১শে মার্চ, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ১৫ বছর পূর্তির সময় তিনতলায় গড়ে উঠেছে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য ক্লাসঘর, ডর্মিটরি, লাইব্রেরী। বাংলার প্রত্যন্ত জেলাগুলো ছাড়া পার্শ্ববর্তী রাজ্য ঝাড়খন্ড-বিহার, একটু দূরের রাজ্য ত্রিপুরা-উত্তর প্রদেশ-মধ্য প্রদেশ-উত্তরাখন্ড-এর কিছু গণসংগঠনের শতাধিক কর্মীকে আমরা প্রশিক্ষণ দিয়েছি। তাদের জন্য পাঠ্য তৈরী করা হয়েছে বাংলা ছাড়াও হিন্দীতে।
  • ব্লগ | ০৪ মার্চ ২০১৮ | ১১৬৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Punyabrata Gun | 52.110.139.146 (*) | ০৪ মার্চ ২০১৮ ০২:১৪63937
  • কথাশিল্প থেকে প্রকাশিত "পায়ে পায়ে পথচলা' থেকে।
  • Punyabrata Gun | 52.110.139.146 (*) | ০৪ মার্চ ২০১৮ ০২:১৪63936
  • কথাশিল্প থেকে প্রকাশিত "পায়ে পায়ে পথচলা' থেকে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন