• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • কৃত্যা

    Prosenjit Bose ফলো করুন
    ব্লগ | ০৭ এপ্রিল ২০১৮ | ৫৮ বার পঠিত

  • কৃত্যা : তৃতীয় পর্ব
    প্রসেনজিৎ বসু

    [পাণ্ডবগণ অধোনেত্রে নীরব এবং ধৃতরাষ্ট্র অন্ধনেত্রে সরব -- এমন সময়ে দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রাঞ্চল ধরে সজোরে টান দেন।]

    প্রবল উল্লাসধ্বনির মাঝে প্রথমে কিছুই বোঝা যায় না। পৈশাচিক আমোদে সভা তখন মত্ত। আঁচল খসে যায়, কিন্তু দ্রৌপদীর স্কন্ধদেশ অনাবৃত হতে-হতেও যেন হয় না। কিন্তু সভার প্রত্যন্ত এক কোণ থেকে একটি মর্মান্তিক আর্তনাদ ওঠে, যা বিপুল হর্ষধ্বনির মাঝে কারুর শ্রুতিগোচর হয় না। মত্ত জনতা লক্ষই করে না, দুঃসহ নামক এক কৌরবভ্রাতা রক্তাক্ত দেহে সভাকক্ষে লুটিয়ে পড়লেন।

    ওদিকে দ্রৌপদী সুস্থির ভঙ্গিমায় দণ্ডায়মান। দুঃশাসন স্থানচ্যুত বস্ত্রাঞ্চলটি টানতে-টানতে দ্রৌপদীর দেহটিকে একবার পরিক্রমা করেন। আবারও খানিকটা বস্ত্র খুলে আসে, কিন্তু দ্রৌপদীর দেহাংশ অনাবৃত হয় না। উল্লাসমগ্ন জনগণের অবশ্য অত ভ্রূক্ষেপ নেই। তারা আবারও লক্ষ করে না, রক্তাপ্লুত দেহে ভূমিশয্যা নিচ্ছেন দুঃশল, জলসন্ধ, বলবর্ধন ও চিত্রবাণ -- এই চার কৌরব। দুঃশাসন পুনরায় পরিক্রমা করে দ্রৌপদীর দেহ। নিষঙ্গী, বৃন্দারক, দৃঢ়বর্মা ও দৃঢ়ক্ষত্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে-করতে সাহায্যের জন্য বৃথাই আর্তচিৎকার করতে থাকেন।

    আরও এক পাক। প্রায় অর্ধেক বস্ত্র এখন দুঃশাসনের হাতে। অথচ একবসনা দ্রৌপদীর দেহ যেন অন্য কিছুতে আবৃত। এইবার কেউ-কেউ লক্ষ করেন বিষয়টি। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই কবচী, ক্রথন, কুণ্ডী ও ভীমরথের ক্ষতবিক্ষত দেহ সভায় আছড়ে পড়ে এবং এতক্ষণে বিষয়টি কারুর কারুর বোধগম্য হয়। যাঁরা দুটি ঘটনার সম্পর্কসূত্রটি বুঝতে পারেন, তাঁরা আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন ও অন্যদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে যান। কিন্তু মত্ত জনতার অন্য কোনও দিকেই মনোযোগ নেই। যেমন নেই দুঃশাসনের।

    আরও এক পাক। জনতার উল্লাস। কিন্তু শকুনি জিজ্ঞাসা করেন, "একবস্ত্রা দ্রৌপদীর গায়ে পীতবস্ত্র ছাড়া আবার কীসের আবরণ ওটি ? কীসের, ভাগিনেয় ? চর্ম ? ওটি কি চর্ম ? হ্যাঁ, দুর্যোধন, চর্মই তো ! নরলোমযুক্ত নরচর্ম কি ?! দুর্যোধন ! এ আমি কী দেখছি ! দ্রৌপদী কি নরচর্মপরিহিতা ? তাই কি তার দেহ এখনও অনাবৃত ? এ কী করে সম্ভব !"

    আনতমুখ ভীষ্ম এতক্ষণে মুখ তোলেন। যা দেখেন, যা বোঝেন, তাতে বিভীষিকায় স্তম্ভিত হয়ে যান ! "থামাও দুর্যোধন ! হতবুদ্ধি দুঃশাসনকে থামাও ! ও কুরুকুলকে নিজের হাতে ধ্বংস করে দিচ্ছে ! চেয়ে দেখো দুর্যোধন, দ্রৌপদীর বস্ত্র আকর্ষণ করার সাথে-সাথে কিছু সংখ্যক কৌরবের সমগ্র দেহচর্ম আপনা হতেই কর্তিত হয়ে অলক্ষ্যে যুক্ত হচ্ছে দ্রৌপদীর বসনে ! চর্মহীন কুক্কুরের মতো ছটফট করতে করতে তারা মারা যাচ্ছে দুর্যোধন ! তুমি কি এর কিছুই বুঝছ না ? দ্রৌপদী সামান্যা নারী নয় দুর্যোধন, সে কুরুকুলের নিয়তি !"

    ভীষ্মের এবম্বিধ কাতরোক্তি যেন দুর্যোধনের আদৌ কর্ণগোচর হয় না ! তখনও তিনি সোল্লাসে দুঃশাসনকে বস্ত্রলুণ্ঠনকর্মে উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। মাতুল শকুনির কথাতেও তিনি কর্ণপাত করেন না।

    আকুল ভীষ্মের স্কন্ধে হাত রাখেন দ্রোণ। "শান্ত হোন, গঙ্গাপুত্র। আপনার কোনও প্রয়াস ফলপ্রসূ হবে না। দুর্যোধন ও অন্যান্য কৌরবগণ বর্তমানে সম্মোহিত। দেখছেন না, দ্রৌপদীর পীতবস্ত্র বহুপূর্বেই নিঃশেষিত এবং বহুক্ষণ ধরে দুঃশাসন তার ভ্রাতাদের মেদমাংসরক্তময় চর্মই নিজের হাতে আকর্ষণ করে চলেছে, তাও তার কোনও বিকার নেই ! আপনি প্রকৃতই বুঝেছেন গাঙ্গেয়। দ্রৌপদী সামান্যা নারী নয়। সে কে জানেন ? কৃত্যা ! অথর্ব বেদোক্ত আভিচারিক ক্রিয়ায় উৎপন্ন কৃত্যা। কুরুকুল বিনাশের জন্যই তার জন্ম। কী ? পাণ্ডবদের সচেতন করবেন ? কী মনে করেন আপনি ? পাণ্ডবগণ এই বিনাশযজ্ঞ থেকে অব্যাহতি পাবে ? পাঞ্চালজয়ের নেপথ্যে পাণ্ডবগণের ভূমিকাই সর্বাধিক ছিল, এ-কথা আপনি বিস্মৃত হতে পারেন, কৃত্যা বিস্মৃত হয়নি। বিস্মরণ কৃত্যার স্বভাব নয়।"

    অসহায় বৃদ্ধ ভীষ্ম মাটিতেই বসে পড়েন। চোখের সামনে দেখেন মৃত্যুর মহোৎসব। দ্রৌপদীর শরীর ঘিরে দুঃশাসনের পরিক্রমা, যেন শনির চারপাশে শনির বলয় ! কামমত্ত কৌরব ও অন্যান্য সভাসদগণ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কদর্যতম মৃত্যুর শিকার হতে লাগলেন। নরচর্মের স্তূপ তৈরি হল। সভাগৃহ নররক্তে পিচ্ছিল ও নরমেদমাংসে পঙ্কিল হতে লাগল।

    কিয়ৎক্ষণ পর। পাণ্ডব-কৌরব উভয়পক্ষই নিঃশেষিত। মৃতদেহের স্তূপের মাঝে নির্বিকারে দাঁড়িয়ে আছেন বিমুক্তকুন্তলা, নরচর্মবসনা দ্রৌপদী। জীবিত তখনও মাত্র দু'জন। ভীষ্ম, দ্রোণ।

    শীতল কণ্ঠে দ্রৌপদী বলেন, "গঙ্গাবাক্য স্মরণ করো ভীষ্ম। স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করা ছাড়া তোমার গত্যন্তর নেই। আর দ্রোণ ? তোমার জন্য অন্য ব্যবস্থা। শবসৎকারের উপায়ও তো করতে হবে !"

    রজঃলিপ্ত বাম পায়ের বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দিয়ে কৃত্যা দ্রৌপদী সভাভূমিতে মাত্র একটি শব্দ লিখলেন। মাত্র একটি মন্ত্রপদ।

    "স্বাহা"।

    ঋতুরক্তে লিখিত সে নাম আগুন হয়ে দপ করে জ্বলে উঠল। সাথেসাথে জ্বলে উঠল সমগ্র কুরুসভা। দগ্ধ মৃতদেহের কটূগন্ধে আবিল হয়ে উঠল চারিদিক। নিস্পৃহ ভীষ্ম প্রাণত্যাগের সংকল্পমন্ত্র পাঠ করছেন আর নিশ্চেষ্ট দ্রোণ চেয়ে রয়েছেন লেলিহান অগ্নিশিখার দিকে, এমত অবস্থায় দ্রৌপদী বেরিয়ে এলেন অগ্নিগ্রস্ত কুরুসভা থেকে।

    পাঞ্চালের এক গহিন বনে তখন মহর্ষি উপযাজ বসেছেন প্রত্যাহার হোমে, তাঁর সফলকৃত্য কৃত্যাকে জগতের আরেক প্রান্তে ফেরত পাঠাবেন বলে।

    (সমাপ্ত)
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৭ এপ্রিল ২০১৮ | ৫৮ বার পঠিত
আরও পড়ুন
সতী - Prosenjit Bose
আরও পড়ুন
সতী - Prosenjit Bose
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • সুতপা | 57.11.142.253 (*) | ০৭ এপ্রিল ২০১৮ ০৩:৫৪62433
  • বাকরুদ্ধ!!!
  • | 116.193.164.97 (*) | ০৭ এপ্রিল ২০১৮ ০৫:১৬62434
  • ....
  • শঙ্খ | 126.206.220.245 (*) | ০৭ এপ্রিল ২০১৮ ০৭:৪৮62435
  • কী জিনিস নামিয়েছেন গুরু!
  • dd | 193.82.19.52 (*) | ০৮ এপ্রিল ২০১৮ ০৩:০৭62436
  • ভালো লাগলো।

    তবে এর পরে যখন লিখবেন ,একাধিক পর্বে, তখন আলাদা আলাদা করে তিনটে ব্লগ না খুলে, একটার নীচে আরেকটা জুড়ে দিবেন। পড়তেও সুবিধে হয়।
  • dc | 132.174.170.133 (*) | ০৮ এপ্রিল ২০১৮ ০৩:৩৫62437
  • প্রথম পর্বটা বেশ ভালো লেগেছিল। দ্বিতীয় পর্ব আর বিশেষ করে তৃতীয় পর্বে খুব তাড়াহুড়ো করে লেখা শেষ হয়েছে মনে হলো।
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত