• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • বেশ্যাদ্বার

    Prosenjit Bose ফলো করুন
    ব্লগ | ২৪ নভেম্বর ২০১৭ | ১০২ বার পঠিত

  • বেশ্যাদ্বার (দ্বিতীয় পর্ব)
    প্রসেনজিৎ বসু

    "কেন !? কেন এখন সমুদ্রলঙ্ঘন আর সম্ভব নয় ঋক্ষরাজ ?" রাম ও হনুমানের যৌথ প্রশ্নে জাম্বুবান বলতে শুরু করেন -- "প্রভু রঘুবীর ! অবধান করুন। দেবীপূজার লগ্ন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। আপনার বিজয়কামনায় দেবগণও নিজ-নিজ লোকে দুর্গারাধনারত, যাতে সকলের মিলিত প্রার্থনায় মহেশ্বরী আশু প্রসন্না হন। বরুণদেবও যথারীতি সমুদ্রগর্ভে দেবীপূজা করছেন। এমতাবস্থায় হনুমান যদি সমুদ্র ডিঙোতে যায়, তাহলে তা দেবীমণ্ডপ-লঙ্ঘনের মহাপাপে পরিণত হবে। চণ্ডিকা অবধারিতভাবেই কুপিতা হয়ে হনুমানকে নিদারুণ অভিসম্পাত দেবেন। তার এবং আপনার -- উভয়েরই কার্যনাশ হবে। হে রঘুবীর ! একটি পূর্বকথা প্রসঙ্গবশে স্মরণ করিয়ে দিই। স্বয়ং ভুবনপালক বিষ্ণু একদা যোনিপীঠবাসিনী মহামায়াকে অবজ্ঞা করে গরুড়বাহনে নীলপর্বত অতিক্রম করছিলেন। ক্রুদ্ধা দেবী বিষ্ণুকে বাহনসমেত সিদ্ধসূত্র দ্বারা বন্ধন করে সমুদ্রজলে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং তাঁর বলবুদ্ধি হরণ করেছিলেন। হনুমানও পূজাকালে দেবীক্ষেত্ররূপী সমুদ্র লঙ্ঘন করে সমজাতীয় অপরাধই করতে চলেছে। আপনি কি দুর্গার কৃপার পরিবর্তে দুর্গার সর্বসংহারক ক্রোধ উপার্জন করতে চান ?"

    রাম সভয়ে বলেন, "না মহাত্মন, কদাপি নয়। দেবীর অপ্রীতিকর কোনও কার্য করা নিতান্তই অবিধেয়। অন্য উপায় খুঁজতে হবে।" হনুমান জাম্বুবানের কথায় নিরাশ হচ্ছিলেন, আবার উদ্যমী হয়ে উঠলেন। "আমায় অনুমতি করুন প্রভু। আমি লঙ্কার ভিতর থেকেই ঐ মৃত্তিকা নিয়ে আসছি।" সবাই বিস্মিত। রামও। "বৎস হনুমান, বিভীষণ তো বললেনই, লঙ্কায় গণিকা প্রথার চলন নেই। বেশ্যাই যদি না থাকে, বেশ্যাদ্বারই বা কীকরে থাকবে ? আর বেশ্যাদ্বার না থাকলে তৎ-সংলগ্ন মৃত্তিকাই বা পাবে কোথায় ? এ যে বন্ধ্যাপুত্রের বিবাহে নিমন্ত্রণ পাওয়ার মতো অসম্ভব ঘটনা !"

    হনুমান স্পষ্ট অথচ বিনয়ী ভঙ্গিতে বলেন, "প্রভু, প্রথম যেবার লঙ্কায় এসেছিলাম, সীতামাতার অন্বেষণে, সেবার রাবণের অন্তঃপুরে প্রবেশ করার প্রয়োজন পড়েছিল। সেখানে দেখেছিলাম, রাবণ স্বর্গের অনেক অপ্সরাকে দাসী করে রেখেছে। অপ্সরা মানে তো স্বর্গবেশ্যা, তাই না ? তাহলে রাবণের অন্তঃপুর বেশ্যাগার হবে না কেন প্রভু ?"

    বানরসেনার মধ্যে সদর্থক একটা সাড়া জাগে। সত্যিই তো ! পবনপুত্রের যুক্তি তো অকাট্য !

    "মার্জনা করবেন প্রভু।" আবার ! আবার জাম্বুবানের কঠিন কণ্ঠ ! বানরগণ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে। আবার কী প্রতিযুক্তি দেখাবে এই ভল্লুক ! রাম কিন্তু শান্ত ও সংযত স্বরে জাম্বুবানকে মতামত প্রকাশের অনুমতি দেন। জাম্বুবান বলেন, "হে দাশরথি ! হনুমানের একটু ভুল হচ্ছে। রাবণ যে অপ্সরাদের অন্তঃপুরে স্থান দিয়েছে, তারাও রাবণের বিবাহিতা পত্নী। উপপত্নী নয়। কোনও নারী বিবাহপূর্ব জীবনে বেশ্যা থাকলেও বৈবাহিক সংস্কারের পর তাঁকে বেশ্যারূপে গণ্য করা যায় না। তখন তিনি পত্নীপদবাচ্যা। উত্তরকালে অপ্সরা উর্বশীও এইভাবে রাজা পুরুরবার রক্ষিতা নয়, পত্নী হবেন এবং তাঁর থেকেই চন্দ্রবংশ অগ্রগতি লাভ করবে। ফলে রাবণের অন্দরমহলকে গণিকালয় হিসেবে গণ্য করা অশাস্ত্রীয় হবে। দেবী এই উপচার গ্রহণ করবেন না। পূজা ভঙ্গ হবে।

    সবাই নিশ্চুপ। হনুমান নির্বাক। রাম স্তব্ধ। "তবে কি কোনও উপায় নেই ঋক্ষরাজ ? অন্য কোনও ভাবেই কি এই সমস্যার মীমাংসা করা যায় না ? -- লক্ষ্মণের আকুল জিজ্ঞাসা।

    "উপায় আছে প্রভু লক্ষ্মণ।" -- জাম্বুবান নিরানন্দিত মুখে বলতে থাকেন। "শাস্ত্রমতে, অষ্টবিধ মৃত্তিকার অভাবে কেবল গঙ্গামৃত্তিকা দিয়েই দেবীর মহাস্নান সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু এখানেও সমস্যা রয়েছে প্রভু। বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকার পরিবর্তে গঙ্গামৃত্তিকা দিলে, তা হবে অনুকল্প অর্থাৎ আসল জিনিসটির বদলে চলনসই অন্য দ্রব্য দান। অনুকল্পে পূজা সম্পন্ন হয় বটে, কিন্তু তা কখনোই মূল দ্রব্যের সমতুল্য নয়, তার থেকে হীন। বিপত্তিটা হল, রাবণ এতকাল ধরে একটিও অনুকল্প ব্যবহার না-করে, প্রত্যেকটি মূল দ্রব্য সহযোগে দেবীপূজা করেছে এবং দেবীকে তুষ্ট করেছে। রঘুবীর যদি অনুকল্পে দেবীপূজা করেন, তাহলে দেবী কি যোগ্যতর ভক্তকে ত্যাগ করে কমযোগ্য ভক্তের পক্ষ অবলম্বন করবেন ? কখনোই নয়। ফলে পূজা সম্পূর্ণ হলেও পূজার উদ্দেশ্য সফল হবে না। দেবী রাবণবধের আশীর্বাদ দেবেন না।"

    রাম একটি দীর্ঘশ্বাস মোচন করেন। সীতা-উদ্ধার আর হল না। নবপত্রিকার দিকে তাকিয়ে দেখেন, আরও শুকিয়েছে সেটি। নুইয়ে পড়েছে কদলীর দীঘল পাতাগুলি। রামেরও মাথা হতাশায় নুইয়ে আসে।

    "প্রভু !" কে ডাকে ! ভিড় সরিয়ে এগিয়ে এসেছে কিষ্কিন্ধ্যার তরুণ সুদর্শন যুবরাজ অঙ্গদ। এতক্ষণ সে চুপ করে সব শুনছিল। রাম চোখ তুলে তাকে দেখলেন ও দেখে চোখ নামিয়ে নিলেন। হনুমান আর জাম্বুবানই যখন নিরুপায়, তখন অঙ্গদ আর কী-এমন সুবুদ্ধি দেবে ! অঙ্গদ অবশ্য রামের কাছে এসে কোনও সুবুদ্ধি দেয় না। বরং সে যা করে, তা এক বীরপুত্র, বীর যোদ্ধা ও বীর যুবরাজের দ্বারাই সম্ভব। সে সরাসরি বলে, লঙ্কার পশ্চিমদিকের বেলাভূমিতে কয়েকটি লতামণ্ডপ আছে, যা এককালে শিকারের জন্য ব্যবহৃত হলেও এখন পরিত্যক্ত। প্রভু রামের অনুমতি থাকলে, এগুলির মধ্যে কোনও একটিতে অঙ্গদ এক্ষুনি গমন করছে। রাজভগিনী শূর্পণখাকে যেন সংবাদ পাঠানো হয়, অঙ্গদ তার সঙ্গে রমণের অভিলাষী ও সেই কারণে লতাকুঞ্জে প্রতীক্ষমান। বিভীষণ যেন তাঁর স্ত্রী সরমার মধ্যস্থতায় এই সংবাদ এখনই শূর্পণখার কাছে প্রেরণ করেন। এই বলে সে চুপ করে। এক দৃঢ় প্রত্যয়ে তার মুখ আলোকিত দেখে সবাই, এমনকি রামও অবাক হয়ে যান।

    শূর্পণখা! সত্যিই তো ! শূর্পণখাই তো লঙ্কার একমাত্র স্বৈরিণী ! কে না জানে, রাবণের এই বিধবা ভগিনীটি অতীব দুশ্চরিত্রা ! স্বামীবিয়োগের পর রাবণের প্রশ্রয়ে বহু পুরুষের অঙ্কশায়িনী সে ! রাম নিজেও স্মরণ করেন, কীভাবে এই কুলটা নারী নির্লজ্জের মতো তাঁকে বিবাহের প্রস্তাব দিয়েছিল এবং রাম অস্বীকৃত হওয়ামাত্রই সে আকৃষ্ট হয়েছিল লক্ষ্মণের প্রতি ! এই নারী বেশ্যা না হলে বেশ্যা কে ! সানন্দে অনুমতি দেন রাম। বানরসেনা আনন্দে গর্জন করে ওঠে।

    তার্কিক জাম্বুবান এইবারও কী-একটা বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বানরদলের কোলাহলে তা চাপা পড়ে যায়। অগত্যা চুপ করে যান তিনি। তবে দুটো পরামর্শ তিনি না দিয়ে পারেন না। রাম যেন অঙ্গদ না ফেরা পর্যন্ত আসনত্যাগ না করে দেবীর চরণপদ্মে মতি স্থির রাখেন। নইলে এত দীর্ঘ বিরতিতে পূজা ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। আর অঙ্গদও যেন লগ্ন শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই ফেরে। নইলে পূজা লগ্নভ্রষ্ট হওয়ার আশংকা।

    (ক্রমশ)
  • বিভাগ : ব্লগ | ২৪ নভেম্বর ২০১৭ | ১০২ বার পঠিত
আরও পড়ুন
সতী - Prosenjit Bose
আরও পড়ুন
সতী - Prosenjit Bose
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • শঙ্খ | 113.242.197.74 (*) | ২৪ নভেম্বর ২০১৭ ০৪:১৩60016
  • ইন্টারেস্টিং!
  • রৌহিন | 233.223.131.4 (*) | ২৫ নভেম্বর ২০১৭ ০৪:০৭60017
  • ভালই চলছে। বাকিটা আসুক -
  • AS | 53.251.175.130 (*) | ২৬ নভেম্বর ২০১৭ ১১:৪২60018
  • অতঃপর ?
  • Blank | 213.132.214.86 (*) | ২৭ নভেম্বর ২০১৭ ০১:৩২60019
  • একটাই প্রশ্ন, এটা কি পুরোটাই নিজের বানানো? নাকি রামায়নের কোনো একটা প্রচলিত ভার্সানে এর কিছু রেফারেন্স আছে?
  • Prosenjit Bose | 116.203.136.229 (*) | ২৮ নভেম্বর ২০১৭ ০৫:৪২60020
  • রামায়ণে রামচন্দ্রের দুর্গাপুজো করার গল্পটা আছে। কিন্তু বেশ্যাদ্বার মৃত্তিকা সংক্রান্ত কোনও কিছুর উল্লেখ নেই। ফলত প্রায় সবটাই আমার বানানো।
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত