• হরিদাস পাল
  • খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে... (হরিদাস পাল কী?)
  • কৃত্যা

    Prosenjit Bose ফলো করুন
    ব্লগ | ০৫ এপ্রিল ২০১৮ | ৬১ বার পঠিত

  • কৃত্যা : দ্বিতীয় পর্ব
    প্রসেনজিৎ বসু

    বাস্তবিকই রাজবধূর কেশাকর্ষণ ! বলপ্রয়োগ ! অন্যান্য সভাসদদের সানন্দ উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময়ে প্রচণ্ড এক চরণবিক্ষেপের সঙ্গে দ্বারপ্রান্তে দেখা যায় উজ্জ্বল শ্যামবর্ণা এক নারীকে।

    দৃপ্ত ভঙ্গিতে দণ্ডায়মানা। আকুলিত কুন্তলরাশি বিবরবিমুক্ত সর্পকুলের মতো ছড়িয়ে রয়েছে পৃষ্ঠে ও বাহুতে । পূর্ণযৌবনধন্য দেহখানি বেষ্টন করে রেখেছে একটিমাত্র পীত বসন যা দেখে সহসা বিভ্রম জাগে। কৃষ্ণবর্ণ ভস্মের কাজ পীত বর্ণের অগ্নিকে আচ্ছাদিত করা। এখানে বিপরীত ধর্ম প্রকাশিত। যেন পীতবর্ণের ভস্ম আবৃত করেছে কৃষ্ণবর্ণ অগ্নিকে। কিন্তু তাঁর প্রসারিত দক্ষিণ হাতটি তখনও দ্বারের অন্তরালে। সভার প্রতি একটি শীতল ও ক্রূর দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কৃষ্ণা দ্রৌপদী সবেগে হাতটিকে নিজের দিকে আকর্ষণ করেন। উপস্থিত সকলেই বিস্ময়ে ও আতংকে শিহরিত হন। সেই হাতটিতে ধরা রয়েছে দুঃশাসনের কেশমুষ্টি এবং ভূলুণ্ঠিত দুঃশাসন ক্রমাগত নিজেকে মুক্ত করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।

    বজ্রমুষ্টিতে দুঃশাসনের বৃষভতুল্য দেহটিকে অনায়াসে টানতে-টানতে দ্রৌপদী সভায় প্রবেশ করেন। "আঃ দুষ্টা ! মুক্ত কর আমায় ! ছাড় ! কুরুপুত্রকে লাঞ্ছিত করার ফল তুই অচিরেই পাবি। ছাড় !" -- দুঃশাসনের এবম্বিধ ক্রোধসম্ভাষণ দ্রৌপদীর মধ্যে কোনও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না।

    তবে যত অগ্রসর হন দ্রৌপদী, তাঁর অন্য একটি দেহলক্ষণ সকলকে বিচলিত করে তোলে। দ্রৌপদী ঋতুমতী। তাঁর কামাগারনিঃসৃত ঋতুশোণিত পীতবস্ত্রের একাংশে রক্তরেখা সৃষ্টি করে বাম উরু বেয়ে নেমে এসেছে বাম পদতলে। গম্ভীরাননা দ্রৌপদী অগ্রসর হতে থাকেন। ভীষ্ম লক্ষ করেন, রজঃরঞ্জিত বাম চরণটির ছাপ অলক্তকের মতো পড়ছে শিলানির্মিত সভাতলে। শুধু বাম চরণটির ছাপ। পড়ছে... পড়ছে... পড়ছে...। যেন একপায়ে হেঁটে আসছে কেউ। শুধু এক পায়ে। গঙ্গাবাক্যটি স্মরণে আসতেই মরিয়া হয়ে ওঠেন ভীষ্ম। ইচ্ছামৃত্যু ? ইচ্ছামৃত্যু কামনা করবেন তিনি ? এখনই ? তেমনই তো ছিল দেবীর নির্দেশ ! কিন্তু তাও কি সম্ভব ?

    সভার নাভিকেন্দ্রে এসে দাঁড়িয়ে দুঃশাসনের কেশমুষ্টি শিথিল করেন দ্রৌপদী। সন্ত্রস্ত দুঃশাসন ছিটকে দূরে সরে যায়। কিন্তু আক্রোশে পশুবৎ চাপা একটি গর্জন করতে থাকে।

    ধৃতরাষ্ট্র অনুমান করতে পেরেছেন, পরিস্থিতি আশানুরূপ নয়। " কী ? কী ঘটিত হচ্ছে এখানে ? মহামাত্য, কী ঘটিত হচ্ছে ?" মহামাত্যকে কিছু বলতে হয় না। বলতে হলেও তিনি পারতেন না। রজস্বলা রাজকুলবধূ কেশাকর্ষণ করে রাজপুত্রকে বলপূর্বক সভায় নিক্ষেপ করছেন -- এমন সুসংবাদ ইতিপূর্বে কোনও মহামাত্যকে রাজসকাশে পরিবেশন করতে হয়নি।

    দ্রৌপদী নিজেই শ্লেষখচিত কণ্ঠে বলেন, "প্রণতি, কুরুরাজ ! হস্তিনার নবনিযুক্তা দাসী স্বভঙ্গিমায় আপনার সেবায় উপস্থিত ! কী আজ্ঞা হয় ?" দুর্যোধন দন্তঘর্ষণ করে হুঙ্কার দিয়ে ওঠেন। " স্বভাবদুষ্টা পাঞ্চালি ! এত স্পর্ধা, এমন ধৃষ্টতা তোমার ! নারী হয়ে, কুলবধূ হয়ে, আর্যপুরুষের উপর নির্যাতন করো ! এর প্রতিফল তুমি অবিলম্বে পাবে !"

    "মার্জনা যুবরাজ ! অসহমতি জ্ঞাপন করছি।" দ্রৌপদীর শ্লেষবিষ বিবর্ধিত হয়। "কুলবধূ ! কোথায় কুলবধূ ! পঞ্চপুরুষের শয্যাসঙ্গিনী আমি ! এ কি কুলবধূসুলভ কার্য ? বেশ্যা ! কেবল বেশ্যার দ্বারাই এ কার্য সম্ভবে। বেশ্যার পক্ষে পুরুষনিগ্রহ দূষণীয় নয়। সম্প্রতি সেই কাজটিই আমি করেছি।" দ্রৌপদীর সদম্ভ আত্মঘোষণা যেন পরবর্তী ঘটনাক্রমকে উদ্দীপিত করে তোলে। দ্রোণ আসন্ন বিপদের অস্পষ্ট এক আভাস পান। কৃত্যা পরিকল্পিত ভাবে উত্তেজিত করে তুলছে প্রতিপক্ষকে।

    "বেশ্যা ! নিজেকে তুই স্বমুখে সর্বসমক্ষে বেশ্যা বলিস ধৃষ্ট নারী ! এতদূর নির্লজ্জা তুই !" অঙ্গরাজ কর্ণের তীব্র নিনাদে সভা কম্পিত হয়। "বেশ। তাহলে বেশ্যার ন্যায় বিবস্ত্রা হয়ে সভামধ্যে দণ্ডায়মান থাক ! গণিকার মতো তুইও সকলের দৃষ্টিভোগ্যা হ।"

    "উত্তম প্রস্তাব ! এই মুহূর্তেই এই বহুগামিনীকে বিবস্ত্র করা হোক ! যে দেহ দশটি নেত্রের তৃপ্তিবিধান করে, আর কয়েকটি নেত্রের আনন্দবর্ধনে তার কার্পণ্য হবে কেন ?" সোল্লাসে ঘোষণা করেন দুর্যোধন। সভাসদগণের বুকের ভিতর উত্তেজনার মৃদঙ্গ বেজে ওঠে। একমাত্র ধিক্কার জানান কৌরব বিকর্ণ। দুর্যোধনের ক্রোধকশায়িত চক্ষু তাকেও স্তব্ধ করে দেয়।

    দ্রৌপদীর পদ্মনেত্রে চকিতে বিদ্যুৎ খেলে যায়। অধরে রহস্যপূর্ণ অর্ধহাস্য। "সাধু অঙ্গেশ্বর, সাধু ! কুরুকুলের বীর্যবান পুরুষরা শুনেছি পরনারীর বস্ত্রমোচনে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ! মহর্ষি বেদব্যাস অনিচ্ছুক ভ্রাতৃবধূদ্বয়ের নীবিবন্ধমোচন করে তাঁদের সন্তানবতী বানিয়েছিলেন। সেই সন্তানেরই উপযুক্ত বংশধর এই কুরুযুবরাজ। তাঁর দ্বারা এ-কাজ বিলক্ষণ সম্ভব। কিন্তু এর পরিণতিটি উত্তমরূপে বিবেচিত হয়েছে তো ?"

    "পরিণামের দুশ্চিন্তা এখন তোর পুংশ্চলী ! এযাবৎকাল যত দুঃসাহস প্রদর্শন করেছিস, তার চরমতম পরিণামের জন্য প্রস্তুত হ। ইষ্টদেবতাকে স্মরণ কর, যদি তিনি তোর লজ্জারক্ষা করেন ! দুঃশাসন ! এই কুলটার ঋতুরক্তলিপ্ত এই ঘৃণ্য বসনটি সত্বর বিদূরিত করো। বেশ্যার ঋতুবিচার অনাবশ্যক।"

    দুঃশাসন এমনই কোনও আদেশের অপেক্ষায় ছিলেন। সভামধ্যে যে নিদারুণ অপমানের সম্মুখীন তিনি হয়েছেন, এমন নির্মম প্রতিদান ছাড়া তার অপনোদন সম্ভব নয়। তাই সহর্ষে, অথচ সাবধানে তিনি দ্রৌপদীর দিকে অগ্রসর হতে থাকেন।

    দ্রৌপদীর দৃষ্টি দুঃশাসনের দিকে ফেরে। ধীরে, অতি ধীরে, পূর্ণ দৃষ্টিতে পদ্মলোচনা দ্রৌপদী দুঃশাসনের নেত্রে নেত্রযোগ করেন। অপলক সম্মোহক দৃষ্টি। দ্রৌপদী তাঁর দুটি বাহু সঙ্কুচিত নয়, বরং বক্ষের দুপাশে প্রসারিত করে দেন। আহ্বানের মাদক স্বরে ডাকেন, "এসো দুঃশাসন ! জ্যেষ্ঠভ্রাতার আদেশ পালন করো ! প্রমাণ করো, তুমি উপযুক্ত কুরুপুত্র !"

    যন্ত্রচালিতের মতো দুঃশাসন এগোন। তাঁর কামকম্পিত হাত পৌঁছয় দ্রৌপদীর ভূমিস্পর্শী অঞ্চলে। আঁচলটি কুড়িয়ে নিতেই কৌরবদের উল্লসিত অট্টহাসে সভা পরিপূর্ণ হয়। সভাসদগণ এতক্ষণের অবরুদ্ধ উৎকণ্ঠা ত্যাগ করে সেই হাস্যে যোগ দেন। আর কুণ্ঠার কী আছে ! ঘটনা যদি এতদূরই গড়িয়ে থাকে, তাহলে অবশিষ্ট অংশটুকু এবার নিশ্চিন্তে উপভোগ করাই যায়। যস্মিন দেশে যদাচার। হা হা হা হা হা।

    "স্বেচ্ছামৃত্যু ? আমার কি এখনই স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে নেওয়া উচিত ? নতুবা কোন নৃশংস পরিণামের সাক্ষী ও ভাগীদার হতে হবে আমাকে ?" ভীষ্ম প্রাণপণে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকেন। "অন্তিম সময় উপস্থিত। বিষদন্তা সর্পিণীর মুখবিবরে হাত ঢোকাচ্ছে কৌরবগণ। রক্ষা নেই।" ভাবতে-ভাবতে অবসন্ন দেহে আসনে গা এলিয়ে দেন দ্রোণ। এই শেষবেলায় তাঁর মনে হচ্ছে, যত নষ্টের মূল তিনি নিজে। দ্রুপদের বিরুদ্ধে পাণ্ডব-কৌরবদের নিয়োগ না করলে আজ এই মূর্তিমতী অভিশাপের উৎপত্তি হত না। পাণ্ডবগণ অধোনেত্রে নীরব ও ধৃতরাষ্ট্র অন্ধনেত্রে সরব -- এমন সময়ে দুঃশাসন দ্রৌপদীর বস্ত্রাঞ্চল ধরে সজোরে টান দেন।

    (ক্রমশ)
  • বিভাগ : ব্লগ | ০৫ এপ্রিল ২০১৮ | ৬১ বার পঠিত
আরও পড়ুন
সতী - Prosenjit Bose
আরও পড়ুন
সতী - Prosenjit Bose
আরও পড়ুন
ক্ষমা - Rumela Saha
  • আমার গুরুবন্ধুদের জানানকরোনা

  • পাতা : 1
  • | 116.193.164.97 (*) | ০৭ এপ্রিল ২০১৮ ০৫:১২62282
  • .....
  • করোনা

  • পাতা : 1
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত